কামালউদ্দিন নীলু | বিবৃত্ত গৃহগোধিকা

0

অনেকদিন হয়ে গেল অসলো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বার্লিন-এর ফ্রাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রে থিয়েটারের জটিল বিষয় নিয়ে কাজ করছি। থাকতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত অ্যাপার্টমেন্ট- আই. বি. জেড-এ। ঠিকানা- ১৮ নম্বর ওয়াইসবাড্‌নেরস্ট্রাসা, ঠিক রডেনহাইমের প্লাটস-উ-বান স্টেশনের গা ঘেঁষে। কর্মস্থল খুব একটা দূরে নয়। নিবাস থেকে মিনিট দশেকের পথ, ফলে যাওয়া-আসা করতে সময়ের ব্যাঘাত ঘটার কোনো সুযোগ নেই। মাঝে-মধ্যে মধ্যরাত অবধি কাজ করতে হয়। আড্ডা দেবার ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠে না, যেহেতু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটা শেষ করতে হবে।

 

লেখার জন্যে দু-তিনটি আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকার নিরন্তর তাগাদা। ইতমধ্যে বিশ্বের একটি প্রসিদ্ধ প্রকাশনা সংস্থা চিঠি দিয়ে বসে আছে বই-এর জন্যে। এই উৎপাত শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ফর রিসার্চ-এর কংগ্রেসে গবেষণা প্রকল্পটি উপস্থাপন করার পর থেকেই। ইতমধ্যে থিয়েটারের ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ কিছু লেখা শেষ করতে হয়েছে এবং এর অনেকগুলোই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকাতে ছাপাও হয়ে গেছে। কিন্তু এই কাজটি কোনোভাবেই এগিয়ে নিতে পারছি না, যদিও বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ইউরোপের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারও দিয়ে ফেলেছি। বিশ্ব থিয়েটারের নামিদামি গবেষকরা উৎসুক হয়ে আছে কাজটি হাতে পাবার জন্যে।

 

নিজের উপর নিজেই বিরক্ত। আসলে এই গয়ংগচ্ছ অবস্থার কারণ একটাই, আর তা হচ্ছে বহুমুখী বিষয়ের মধ্য থেকে করতে হচ্ছে বলেই, ফলে যা হবার তাই। যতো দিন যাচ্ছে ততোই কাজটি হয়ে উঠছে জটিল। মাঝেমধ্যেই চরম হতাশা আর নৈরাশ্য চেপে ধরে। মনটা ছুট দিতে চায় অন্যপথে। নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন, এ আমি কোন পরিযায়ী ব্যক্তি!

 

এইসব হিজিবিজি ভাবনা নিয়ে মধ্যরাতে বসে আছি বৈঠকখানার অলিন্দে। চলছে বিরামহীন ধূমপান। একটি শেষ না হতেই আরেকটি। মধ্যে মধ্যে পুলিশের গাড়ি ছুটছে। গাড়ির হেডলাইটের আলোর ফাঁকে ফাঁকে মাতাল ভ্রাম্যমান ভবঘুরেদের ছায়া এসে পড়ছে অ্যাপার্টমেন্টের এখানে-সেখানে। আকাশে কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়ে যাওয়া রঙচটা চাঁদ হয়ে উঠছে ছেড়ে আসা নষ্ট-বিনষ্ট বন্ধুদের মুখ। ঐ সকল বন্ধুরা এখন কেবলই ফ্রান্সিস বেকনের ক্যানভাসে আঁকা ‘পেইন্টিং ১৯৪৬’।

 

ওদের মগজের বিশ্রী দুর্গন্ধ বুড়িগঙ্গার বাতাসে ভেসে আসছে বার্লিনের অ্যাপার্টমেন্টের অলিন্দে। অলিন্দের সুখাসন ছেড়ে উঠতেই ভ্রাম্যমান ভবঘুরেদের ভাঙা ভাঙা সমবেত সংগীত-

If you repeat A

Lie often enough

It becomes Politics,

Yes it’s fucking Political

Everything’s Political,

All I know is this

Fuck the Politics…

এরই মধ্যে দ্রুতগতিতে একটি অ্যামবিউল্যান্স সাইরেন বাজাতে বাজাতে কানফাটা শব্দে ছুটে বেরিয়ে গেল। অ্যামবিউল্যান্সের আলোর ঝটকা মুখে এসে লাগতেই ভবঘুরে বাউন্ডুলেদের দলছুট হট্টবিলাসিনী তার হাতের বিয়ারের কৌটা ছুঁড়ে মারল আমার দিকে। মাথাটা সরিয়ে নিতেই বিয়ারের কৌটা এসে পড়লো মেঝেতে। মুহূর্তে যবসুরার কটুগন্ধ ছড়িয়ে পড়লো। নিজেকে কোনোভাবে সামলে নিয়ে কৌটাটা রেলিংয়ের উপর দিয়ে ওকে ফিরিয়ে দিতেই হট্টবিলাসিনী ওভারকোটের বোতামগুলো খুলে মেলে ধরলো শরীর। মুখে হাসি। চকিতে হাতের আঙুল দিয়ে মেলে দিলো ওর ভগ-এর খিড়কি। ও যেন জানান দিলো আমার জন্মের কথা। আলো ছায়ায় মুহূর্তের মধ্যে মানুষটি হয়ে উঠলো শিল্পী শিরিন ফাকহিম-এর ‘তেহরান প্রস্টিটিউট’-দের একজন।

কী সাংঘাতিক অভিব্যক্তি। ও যেন পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে সভ্যতার মুখে প্রস্রাব করছে। ছুঁড়ে দিচ্ছে হাজারো প্রশ্ন। কী প্রচণ্ড সাহস! ওর সামনে নিজেকে মনে হচ্ছিলো নিতান্ত নিবীর্য নপুংসক। হায়! পুরুষ কতো ভীরু, দুর্বল, অথর্ব, বিকল! আচমকা অলিন্দের কাচের দরজা সরিয়ে চুপিসারে সটকে যেতেই ও চিৎকার করে উঠলো- Don’t move, motherfucker. Show your dick! হ্যান্ড গ্রেনেডের মতো ছুঁড়ে দেওয়া শব্দগুলো কানে আসতেই হয়ে পড়লাম গৃহগোধিকা। ভীত গৃহগোধিকারা ঘরের দেয়ালে যেভাবে গুঁড়িসুঁড়ি মেরে থাকে, ঠিক এই মুহূর্তে আমিও যে তাই। গোলাকার অক্ষিপটল তুলে পিটপিট করে ওদের দেখছি। ঝট তুরন্ত ভবঘুরে বাউন্ডুলেদের কোরিফিয়াস অর্ধস্ফুট গলাভাঙা স্বরে বয়ান করে চলেছে:

 

আমরা এইভাবে বেঁচে থাকি, হাসি,

ভালোবাসি, খিস্তি করি এবং

তারপর হারিয়ে যাই।

বয়ান শেষে নিমেষের মধ্যে হারিয়ে গেল। একি প্রপঞ্চ! কী অদ্ভুত! এ যে জেমস জয়েস-এর অ্যাভাগার্ড কমিক ফিকশন ফিন্নেগ্যানস ওয়েইক- এর ঘুম এবং স্বপ্নের ফাঁদে আঁটা শব্দ সমষ্টির প্রতিধ্বনি- ‘They lived and Laughed and loved and left.’

 

দরদর করে ঘামছি। আচমকা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি বিকট শব্দে ত্বরিত গতিতে ছুটে গেল। অলিন্দের রেলিং ধরে নিজেকে সামলে নিতেই চোখ সরে গেল ভ্রমরকৃষ্ণ আকাশে,

 

আকাশে কোনো তারা নেই

কেবলই বাদুড় আর প্যাঁচা

ছুটে চলে সঙ্গে নিয়ে পাপী চাঁদ!

 

চিন্তার জালগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে। সিৱপিং গাউনের পকেট থেকে সিগারেটের বাক্স আর লাইটার বের করে বারকয়েক নাড়াচাড়া করতেই ক্লারা বেনিন-এর কথা মনে পড়লো-

 

বেশ কিছুদিন ধরেই আমি নিষ্প্রভ,

সঙ্কট জড়িয়ে ধরছে আষ্টেপৃষ্ঠে।

রক্ত ঝরতে ঝরতে শহরটা এখন বিবর্ণ,

পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে আছে যে স্বপ্ন

সেটাও এখন পুড়ে ছাই।

সিগারেট আর লাইটার

ধীরে ধীরে পোড়ে হায়

দ্রুত বিলীন হয়ে যায়।

 

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »