শামীম রুনা | চোখবন্ধ অন্ধ সময়

0

এগারো

  সারা রাত না ঘুমিয়ে নিজের স্টাডি রুমে বসে কাটিয়েছে জায়েদ। ওর চোখ জোড়া ভয়ানক রকম লাল হয়ে উঠেছে, যত না নির্ঘুম রাতের জন্য তার চেয়ে বেশি মাথার প্রচণ্ড যন্ত্রনার কারণে। গতকাল যখন মা ওকে  ফোন করে জানিয়েছিল, রাহেলা; তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে তখন থেকে মাথার যন্ত্রনার সূত্রপাত। মায়ের ফোন পাওয়ার পর পরই ওর বাসায় ফেরা উচিত ছিল, কিন্তু সে সময় দলের একটি গুরুত্বর্পূণ মিটিং-এ বসেছিল; রেহানার জন্য দলের প্রবীন সদস্যদের উপস্থিতিতে মিটিং ছেড়ে চলে আসাকে জায়েদ গুরুত্ব দেয়নি। এমনিতে রেহানার জন্য গত কিছু দিনে পার্টির লোকজনের কাছে ওকে অনেক বিব্রত ও হেনস্থা হতে হয়েছে।

  এখন মনে হচ্ছে গতকাল সে সময় ফিরে এলে ভালো হতো। রেহানার ফেরার অপেক্ষা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সকলের সামনে দিয়ে বজ্জাত নারীটিকে চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসলে উচিত শিক্ষা হতো। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে জায়েদের দেরী হয়ে গিয়েছে,কাল রেহানা বাড়ি ফিরেনি;আদপে ও ভাবতে পারেনি,না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেহানা বাসা থেকে বেরিয়েছে। জায়েদ তাজ্জব বনে যায় রেহানার উদ্ধত সাহস দেখে! বিগত কিছু দিন ধরে স্ত্রী’র এমন বেয়াড়াপণা আচরণে ও বিস্মিত হয়েছিল,আজ  স্তম্ভিতও বটে। রেহানাকে এতটা তেজস্বী ওর আগে কখনও মনে হয়নি, আগে এমন মনে হয়নি;এই ধারণা করতে না পারা এখন ওকে আরও ক্রোধাম্বিত করে তুলছে। সে সঙ্গে মা’র তির্যক কথার হুলের ভয়াবহ আক্রমণ তো রয়েছে।

  সন্ধ্যা পেরিয়েও রাহেলা যখন বাসায় ফিরে না তখন জায়েদের ভাবনায় রাগের সঙ্গে অন্য আশঙ্কাও ছড়িয়ে পড়ে,সত্যি যদি রাহেলা বাসায় না ফিরে আসে! ওকে এতটা হেনস্থা না করলেই কি নয়,একজন বিদুষী নারী হয়ে কী করে রাহেলা স্বামীর মর্যাদাকে অবহেলা করে! রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল জায়েদের আশঙ্কাকে সত্যি করে রাহেলা বাসায় ফিরে আসছে না। রাত দশটার দিকে জায়েদ প্রবল অনিচ্ছায় গিয়েছিল গাজীপুরে, রেহানার মায়ের বাড়িতে। ও ধরে নিয়েছিল, রেহানা মায়ের বাড়িতেই আছে। মা ছাড়া ওর আর যাওয়ার জায়গা আছেই বা কোথায়? বড় বোন প্রবাসী আর এক ছোটচাচার বাসা ছিল, কিন্তু ছোটচাচা নিজেই হাসপাতালে আর চাচী তো ভয়ে বাসায় থাকছে না।

  জায়েদ কলিংবেল বাজালে শাশুড়ী কাঁচা ঘুম থেকে জেগে দরজা খুলে দিয়েছিলেন, এতো রাতে তাকে দেখে অবাক হন। মৃদু কণ্ঠে সালাম উচ্চারণ করে কোনা ভনিতা না করেই ও বলেছিল; রেহানাকে বলেন আমি ওকে নিতে এসেছি।

  অঞ্জুকে নিতে আসছো মানে! অঞ্জু কই?

  রেহানা আপনার বাড়িতে আসে নাই?

  সে তো কাল আসছিল। আবার চলেও গেল সন্ধ্যায়।

  আজ কে আসে নাই?

  না তো। সে কই গেছে?

  জানি না। সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছে, এখনও ফিরে নাই বাসায়।

  ফোন করো ওকে। কোনো বিপদ আপদ হয়নি তো?

  ফোনের সুইচ অফ করে রেখেছে। কোনো বিপদ হয়নি, সে আমার মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে।

  অঞ্জু তোমার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে মানে! ও তো এমন মেয়ে না।

  সে কেমন মেয়ে? খুব ভাল মেয়ে? এতো রাত পর্যন্ত কোন্ ভাল মেয়ে বাসার বাইরে কাটায়? কোনো ভাল মেয়ে সংসার সন্তান ফেলে ছেলে বন্ধু নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? কোন ভাল মেয়ের স্বামী বউকে রাত-বিরাতে খুঁজে বেড়ায়? আপনার মেয়ে এইসব করে, তারপরও আপনার মেয়েকে ভাল বলেন?

  অঞ্জু আসলে একটা বেকুব মেয়ে। শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী মেয়ে হয়েও কী করে আদিম মহিলাদের মতো চোখ কান বন্ধ করে থাকে আমার বুঝে আসে না।

  মানে? কী বলতে চান আপনি?

  আমি আর কী বলবো? তবে ওর মতো বেকুব মেয়ে ভয়াবহ কোনো কারণ ছাড়া এমনি এমনি বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না।

  এমন কোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটেনি যে ওকে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে। সব পরিবারে টুকটাক খিটিমিটি লেগে থাকে, আম্মা তো বয়ষ্ক মানুষ, পরিবারের মুরব্বীজন, তাঁর কথায় এমন করে মাইণ্ড করার কী আছে? তখন আমিও বাসায় ছিলাম না, আম্মার কথা এতো অপছন্দ হলে  সে না হয় আমার ফেরার অপেক্ষা করতে পারতো,আমি দেখতাম বিষয়টা। আর  কোনো মা কী করে বাচ্চাকে ফেলে রেখে এভাবে যেতে পারে?

  তুমিও তো টিনটিনের বাবা, তুমি তোমার সন্তানকে রেখে দিনের পর দিন বাইরে থাকো,না? তখন তো ওর দেখাশোনায় অঞ্জু কোনো গাফলতি করে না। আর এক বেলার জন্য অঞ্জু কোথাও গেল বলে তুমি এমন রাগারাগি করছো?

  জায়েদ শাশুড়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে শক্তকণ্ঠে বলে, আমি একজন পুরুষ মানুষ আর রেহানা একজন মহিলা, আমাদের দু’জনের মধ্যে পার্থক্যটা আল্লাহ্তালা করে দিয়েছেন, সন্তান লালন-পালনের জন্য পিতামাতার আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছ। একজন মা কখনও বাবার ভূমিকা নিতে পারে না। এটা আইয়ামে জাহেলিয়ার মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা না নারীর ভূমিকা পুরুষের চেয়ে বেশি বা সমান সমান হবে, বুঝতে পারছেন নিশ্চয়। ভুলটা আমিই করেছি, ওকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়ে ফেলেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, আপনার মেয়ে স্বাধীনতার মানে স্বেচ্চাচারিতাকে ধরে নিয়েছে। স্বাধীনতার মানে ধর্মহীনতাকে ধরে নিয়েছে। আমারই বোঝা উচিত ছিল, মেয়েদের বোধ জ্ঞান নেই,নিজেদের লিমিটেশন সম্পর্কে ধারণা নেই। আমি একবার ওকে পেলে, স্বাধীনতা কী বুঝিয়ে ছাড়বো…

  চুপ করো জায়েদ। তুমি অনেক কঠিন কথা বলছো। তুমি ভুলে যাচ্ছ অঞ্জু আমার মেয়ে।

  রেহানা আপনার মেয়ে না,সে আমার অবাধ্য স্ত্রী। আমি আমার অবাধ্য স্ত্রীকে শাস্তি দেবার কথা বলছি, ওকে শাসন করার অধিকার আমার আছে, জানেন নিশ্চয়? ও যতটা উড়েছে এবার ততটাই ওকে বন্দী করে রাখবো। প্রয়োজনে যা করা উচিত তাই করবো। রেহানা বিধর্মী লোকটার জন্য ধর্ম, সংসার, স্বামী সব কিছু তুচ্ছ জ্ঞান করছে। ও কি বুঝতে পারছে না বিধর্মীর উচিত শাস্তি হয়েছে। আল্লাহ্ রহমতে বেঁচে গেছে, কোথায় তাকে আল্লাহ্’র রাহে আসার জন্য হেদায়েত করবে উল্টা নিজেও চাচার পথে হাঁটা ধরেছে। আসলে নাস্তিকতার বেলাল্লেপনা ওর চোখে মোহ ছড়াচ্ছে। ওর এই মোহ কী করে ছাড়াতে হবে আমি জানি।

  জায়েদের কথা শুনে মা’য়ের ভেতরটা ভয়ে হিম হয়ে আসে,দৃষ্টিতে আতঙ্ক দেখা দেয়। তিনি শূণ্য দৃষ্টিতে জায়েদের দিকে তাকিয়ে থাকেন,একজন মানুষ পাশাপাশি বাস করা সঙ্গিনীর জন্য এতটা বিষ কী করে অন্তরে ধারণ করে! জায়েদের এতটা বিষাক্ত আর চণ্ডালরূপ আগে কখনও দেখেননি তিনি, অঞ্জুর ক্রমান্বয়ে অপ্রতিভ হয়ে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক প্রশ্ন তার মনে এলেও নিজের ভাবনাকে ভুল ভেবে তা এড়িয়ে গেছেন, ভেবেছেন; এভাবে খোলস বদলে মেয়ে যদি সুখী হতে চায়, হোক। জায়েদের এই মুহূর্তের এক নাগাড়ে তিক্ত কথা শুনে বুঝতে পারলেন আগেই মেয়েকে সাবধান করা তার কর্তব্য ছিল। অঞ্জু প্রচণ্ড এক ভুল মানুষকে নির্বাচন করেছে, ভুলকে সঠিক ভেবে সংসার করে এসেছে এতটা বছর ধরে।

  গাজীপুর থেকে ফেরার পথে জায়েদ অনুভব করে ওর ভেতরে ক্রোধের আগুন দাবানলের মতোই কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ছে। মাথার ভেতরে ক্রোধের স্ফুলিঙ্গগুলো আগ্নেয়গীরির তপ্ত লাভার মতো তীব্র বেগে টগবগিয়ে ফুটছে, একবার যদি রেহানাকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়; এতদিন ধরে করে আসা নিজের প্রতিটি ভুল কড় গুনে শোধরে নিবে! নারীকে ভালবাসা আর প্রশয় দিয়ে কিছু হয় না, প্রয়োজনে নারীকে কঠোর শাস্তি প্রধান করে সুপথে আনতে হয়;পার্টির গুরুজনরা অহরহ এই শাস্ত্রকথা সবাই’র কানে নসিহত করে চলেছেন কিন্তু ওরা কিছু পশ্চিমা শিক্ষাপ্রাপ্তরা নারীদের প্রতি সদয় থাকাকে আধুনিক জীবনধারা মনে করেছে। তাই তো সেও রেহানার প্রতি কখনও কঠোরতা দেখায়নি, খুব বেশি রেগে গেলে দু’একবার গায়ে হাত তুলে নিজেই শরমিন্দা হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে সেসব ভাবনা চিন্তা ভুল ছিল, স্ত্রীর প্রতি কঠোর না হয়ে বরং ভুল করেছে। উপরওয়ালা সবজান্তা। তাই তো হাজার শত বছর আগে সমাজ চালানার সহি নির্দেশনা তিনি ধর্মের মাধ্যেমে মানুষকে দিয়ে রেখেছন।

  হাসপাতালে ছোটচাচার কেবিনে জায়েদের যেতে ইচ্ছে করে না, ড্রাইভারকে রেহানার খোঁজে কেবিনে পাঠিয়ে গাড়িতে একা বসে থাকার সময় ওর মনে হয়;মুনাফেক লোকটি কেনো বেঁচে আছে এখনও? গাড়িতে বসে জায়েদ লক্ষ্য করে, ড্রাইভার হাসপাতাল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে অন্য একটি লোকের সঙ্গে আন্তরিক ভঙিতে কথা বলতে বলতে দু’জন কিছু দূর গিয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় লোকটিকে জায়েদের চেনামুখ মনে হলেও ঠিক চিনতে পারে না কোথায় দেখেছে।

  ড্রাইভার ফিরে এসে গলা খাকরি দিয়ে বলে, স্যার, হানিফের সাথে দেখা হলো…

  হানিফ কে?

  আমাদের পার্টির লোক তো, সালেহ্ ভাই’র সাথে কাজ করে।

  ও।

  হানিফ বললো ম্যাডাম আসছিল,সন্ধ্যার আগেই চলে গেছে।

  ও। বাসায় চলো এখন।

  বাসায় ফেরার পথে জায়েদ হিসাব মেলাতে চায়, সালেহ্’র লোকজন ছোটচাচার আশে পাশে মানে এটি তবে পার্টির কাজ? নজর রাখা হচ্ছে ভিক্টিমের ওপর; অথচ ও জানে না। ওকে কি পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? ও পার্টিকে বরাবরই জানিয়ে এসেছে, সম্পর্কে কনক রাইয়ান হয়ত ওর স্ত্রী’র পক্ষের আত্মীয় কিন্তু ওর কাছে ধর্ম বড়। পার্টির কাজ বড়। পার্টির মতাদর্শে সঙ্গে ও তো কোনো ভিন্নতা পোষন করে নাই তাহলে কেনো ওর সঙ্গে লুকোচুরি? ওর থেকে সালেহ্ কী করে পার্টির কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? সব কিছুর মূলে রেহানা এবং ছোটচাচা কনক রাইয়ানকে দাঁড় করায় জায়েদ।

  প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, রুষ্ট আর অপমানিত জায়েদ মধ্যরাতে যখন বাসায় ফেরে তখনও মা জেগে। মা’র সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে না,মা’য়ের থমথমে  রাগী মুখটাকে এই মুহূর্তে ভীষণ ভয় হয় ও’র। মা বারবার মনে করিয়ে দেবে সব কিছু ওর ভুলের জন্য হয়েছে, বাড়ির বউকে আশকারা দিয়ে মাথায় তুলেছে সে। স্ত্রীকে যথাযথ শাসন করতে পারেনি বলে বাড়ির বউ’র এত বাড় বেড়েছে।

  স্ত্রীর ভাবনায় জায়েদের আবার মন হয়, রেহানা কোথায় যেতে পারে? ওর যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা তো নাই! কোনো আবাসিক হোটেলে রাতে থাকতে পারে? ভাবনাটি তাৎক্ষনিক উড়িয়ে দেয়, রেহানা হয়ত জেদ করে বাসা থেকে বেরিয়েছে, কিন্তু অতটা সাহসী মেয়ে না হোটেলে একা রাত কাটাবে। আমাদের সমাজে একাকী নারীর পক্ষে হোটেলে রাত কাটানো খোলা রাস্তায় রাত কাটানোর মতোই বিপদজনক ভাবনা। ঢাকা শহরে একবেলা সময় কাটানোর মতো কোনো বান্ধবী নেই রেহানার সেখানে একটি রাত কোথায় গিয়ে থাকতে পারে! অন্য একটি ভাবনা জায়েদের মাথায় আসে, জেদের বশে আত্মহত্যা করে বসবে না তো? ভাবনাটি মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে এক ঝটকায় তা নাকচও করে দেয় সে, না; রেহানার পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয়। কঠিন ধাঁচের মেয়ে নয় সে, ও হলো এমন এক নারী যে কারো না কোরো ওপর হেলান দিয়ে থাকতে চায়, যেন স্বর্ণলতা। নিজের তামাম গুন সম্পর্কে অজ্ঞ, রেহানা সে ঘরানার নারী যার  নিজস্ব বোধ-বুদ্ধি-অহংকার বা সাহস নেই। সত্যি কি নেই? তাহলে এই মধ্যরাতে রেহানাকে খুঁজতে হচ্ছে কেন ওকে? বোধ-বুদ্ধি-অহংকার-সাহস কিছুই যদি না থাকে তবে রেহানা কিসের ওপর ভিত্তি করে বাসা ছাড়লো? জায়েদের মাথা ব্যথা বাড়তে থাকে,নিজের হিসাবের গড়মিল বুঝতে গিয়ে বুঝতে পারে; রেহানা আর আগের মতো সহজ নাই।

  রেহানার সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার কিছু দিনের মধ্যে জায়েদ বুঝতে পেরেছিলো, ছোটচাচা; কনক রাইয়ানের প্রচণ্ড প্রভাব কাজ করে মেয়েটির ওপর। ছোটচাচার প্রসঙ্গ কথা বলতে গেলে কেমন একটি মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে রেহানার চোখে মুখে। কোন বই পড়া উচিত, কোন কবিতার ভাবার্থ কী,কোন গানে কোন সুর লয় ব্যবহার করা হয়েছে সবই রেহানা জানতো ছোটচাচার মাধ্যমে। ইয়টস কী সমকালের কবি মার্গারেট এটউডস,রবীন্দ্রনাথ কী সৈয়দ শামসুল হকের সমকালিন কবিতা রেহানা আবৃত্তি করতো  ছোটচাচার টেষ্ট অনুসরণ করে। প্রথম দিকে ছোটচাচার বিষয়টি জায়েদকে তেমন ভাবাতো না, কিন্তু একদিন রাস্তায় এক লোকের হাত সাফাইয়ের জাদু খেলা দেখে রেহানা হেঁয়ালি কণ্ঠে বলেছিল,জাদুবিদ্যা তো ধর্মেরই সমার্থক। তারপরও মানুষ ধর্ম বিশ্বাস করে আর জাদুবিদ্যাকে তামশা ভাবে। বিষয়টা অদ্ভূত না! রেহানার কথা ঠাস্ করে জায়েদের কানে ধাক্কা দেয়, অজান্তেই ভুরু কুঁচকে উঠেছিল ওর, এই মেয়ে বলে কি? তারপরও ও রেহানার সঙ্গ ছাড়তে পারেনি, মনে মনে ভেবে নিয়েছিল, রেহানাকে এক দিন সত্যিটা ও জানাবে সে, ধর্মের আলোয় রেহানার পথ ও আলোকিত করে তুলবে। আর একজন অজ্ঞ বেদ্বীন মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে পারলে ওরই সোয়াব হবে।

  এর পরে ঘটে আর এক ঘটনা, তখনও জায়েদ পার্টির সঙ্গে তেমন সম্পৃক্ত নয়; আসা-যাওয়া আর পার্টির বিভিন্ন অধিবেশনে উপস্থিত হওয়া ছিল তার একমাত্র কাজ। যার হাত ধরে ওর পার্টিতে আসা সে হোসেনভাই একদিন বললেন; যে মেয়ের সঙ্গে চলাফেরা করো জান তো সে কার মেয়ে?

  জায়েদ অবাক হয়ে মাথা নেড়ে জানিয়েছিল, সে জানে না রেহানার সবকিছু। প্রেমিকার বাবা বা বংশ পরিচয় তখনও ওর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

  তখন হোসেনভাই রেহানার বাবা এবং ছোটচাচা সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানিয়েছিল জায়েদকে। বলেছিলো; বড়ভাই’র আদর্শে চলে ছোটভাই, দু’জন একই মতাদর্শের। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ,দু’জনেই মুরতাদ,বেদ্বীন।

  রেহানার সে মুরতাদ বাবা’র সঙ্গে দেখা হওয়ার মতো দুর্ভাগ্য জায়েদের হয়নি, তার আগে ভদ্রলোককে খুন করা হয়, সবই আল্লাহ্’র ইচ্ছা; অনেকে এই পৃথিবীতে কৃত কর্মের শাস্তি ভোগ করে যান।

  রেহানার বাবার মৃত্যুর মাধ্যমে জায়েদ খুব দ্রুতই ওদের পরিবারের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছিল,যা হয়ত রেহানার বাবা বেঁচে থাকলে কঠিন হয়ে যেত ওর পক্ষে। মেয়েটি আশ্চর্য রকম নির্ভরতায় বিশ্বাস করেছিল জায়েদকে, কোনো কিছুতে অবিশ্বাস দূরে থাক দ্বিমতই পোষন করতে পারতো না। তাই তো অনেক অমিলের পরও জায়েদ রেহানার প্রতি অনুরক্ত ছিল, মনে হয়েছিল; ও রেহানাকে নিজের মতো গড়ে নিতে পারবে। সিক্ত এঁটেল মাটির ডেলার মতো কুড়িয়ে পাওয়া রেহানাকে নিজের পছন্দ অনুসারে গড়েও নিয়েছিল সে।

  রেহানাকে বোকাও মনে হতো জায়েদের, অল্পতে বিশ্বাস করে নিত সে। পারিবারিক অবাধ স্বাধীনতার কারণে ছেলেমেয়ে সবাই’র সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল রেহানার, অথচ ছেলে মেয়ের মধ্যে অবাধ বন্ধুত্ব যে হতে পারে না সে ধারণাটি ছিল না। গলা খুলে নিজের মনোভাব প্রকাশ করার মতো দৃঢ়তা জায়েদের ব্যক্তিত্বে তখনও গড়ে ওঠেনি, তাই ওকে কৌশলী হতে হয়েছিল। খুব ভেবে চিন্তে প্ল্যান করে সব বন্ধুদের থেকে রেহানাকে আলগোছে সরিয়ে এনেছিল, একেবারে নিজের অনুগত করে নিতে চেয়েছিল। তখন ওর পার্টির সঙ্গে হাল্কাপাতলা যোগাযোগ গড়ে উঠেছে মাত্র, পার্টির মতাদর্শ ওর মতাদর্শ আর  পারিবারিক  মূল্যবোধের সঙ্গে চমৎকার মিলে যাচ্ছিল তাই ও সেদিকে ঝুঁকে পড়েছিল, তখন একদিন ওর রুমমেট সুমন জানতে চায়, তুই কি হোসেনের বিষয়ে কিছু জানিস?

  কোন বিষয়ের কথা বলছিস?

  হোসেন কিন্তু নিষিদ্ধ ইসলামি গ্রুপের সদস্য।

  ওহ্ হোসেনভাই? এক সময় ছিল,এখন আর নাই।

  শিওর তুই?

  হুম। কেউ নামাজ-তাবলিগ করলেই নিষিদ্ধ ইসলামি গ্রুপের সদস্য হবে এমন মতান্ধা কেন তোরা?

  আমি কিন্তু মতান্ধার মতো কথা বলিনি। আমি জানি ওর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলাও আছে। লোকটি বিপদজনক, তাই তোকে সাবধান করছিলাম।

  এখন আর মামলা নেই। তিনিও কোনো দলের সদস্য না। আমার সাথে নামাজ-রোজা নিয়ে টুকটাক আলাপ করে ব্যস ওটুকুই।

  সুমনের মুখের দিকে তাকিয়ে জায়েদ বুঝত পেরেছিল ওকে বিশ্বাস করেনি বন্ধু। আর সুমনকে যা বলেছিল জায়েদ তাও সত্যবাক্য নয়, হোসেনভাই ইসলামের পক্ষে কাজ করেন,ধর্মের জন্য কাজ করেন। দেশে তথা সমগ্র বিশ্বে খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছেন তিনি এবং তার পার্টি। হোসেনভাই’র মতে, খিলাফতের পূর্ণ:প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশ কোনো ভাবেই মুসলিম দেশ হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে না। দেশে ইসলামের অবমাননা রোধ করা, ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা, ইসলামী শাসন ব্যবস্থ্যা কায়েম-ধর্মপ্রান প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ের দাবী। দেশে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নেই বলে, ওদের সংগঠনকে সন্ত্রাসী দল হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সত্যিকার অর্থে ওরা জিহাদী। নবী করিম(সাঃ)কেও তো ইসলামের সূচনায় বিভিন্ন অপনামে ডাকা হতো, কিন্তু তিনি কে তা পরে আরবসহ বিশ্ববাসী জেনেছে। তাঁর উম্মদ হিসাবে সকল মুসলিমের অবশ্য উচিত ইসলামের পথে নিজে হাঁটা এবং পথভ্রষ্টদের সুপথে আনা। এর জন্য কিছু জীবন উৎর্সগ করতে হলে, কোরবান করতে হলে, কিছু জান নিতে হলে তা সবই করা হবে। ইসলামের পূনরুত্থানের জন্য জীবনবাজী রাখাদের পতাকা তলের একজন হোসেনভাই । পরবর্তীতে হোসেনভাই অস্ত্রসহ ধরা পড়ে পুলিশ রিমান্ডে মারা গেলে পত্রিকায় খবর হয়,বন্দুক যুদ্ধে সন্ত্রাসী নিহত। একজন ধর্মীয় শহীদ সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যায়িত হয় ধর্মহীন দেশে,আহা! হোসেনভাই’র শহীদ হওয়ার পর জায়েদ কিছু দিন বিমর্ষ হয়েছিল পরে সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে আরও জড়িয়ে নেয় এবং হোসেনভাই’র স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন এবং লক্ষ্য হিসাবে দেখতে শুরু করে।

  সুমন নিজের পড়াশোনা আর নতুন নতুন গড়ে ওঠা ব্লগে অল্প স্বল্প লেখালেখি নিয়ে আলাদা বন্ধুর দলে চলে যাচ্ছিল। সুমনের বচন,দৃষ্টিভঙি, ভাবনা সবকিছুতে জায়েদ অন্য এক স্বর শুনতে পেতো যা পুরনো সুমনের  সঙ্গে খাপ খায় না। সুমনের অন্য ঢঙের কাপড় পরা বা বাঁ বাহুর ওপর আঁকা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উল্কিতে জায়েদের আপত্তি ছিল প্রবল, নাউযুবিল্লাহ্! নাউযুবিল্লাহ্! বলতে বলতে জায়েদ মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিল আর সুমন হৈ হৈ করে হেসে উঠতো তাতে। জায়েদ বলতো, শরীরে উল্কি আঁকা পাপ সুমন। অজু হয়না,নামাজ কবুল হবে না তোর।

  আমি তো নামাজ পড়ি না।

  এখন পড়িস না, মুসলমানের সন্তান যখন তখন তো কখনও না কখনও নামাজ পড়বি।

  যা আমি বিশ্বাস করি না তার জন্য উপাসনা কেনো করবো?

  উপাসনা আবার কী? বল,নামাজ…

  উপাসনায় সমস্যা কী? অর্থ তো একটাই ? খাঁটি বাংলা শব্দ বুঝি আল্লা পছন্দ করেন না?

  আল্লাহ্ নারাজ হন ওভাবে বললে।

  আল্লাহ্ কে? আল্লা নারাজ হলে আমার কী যায় আসে? সে তো আমাদের ভার্সিটির চ্যান্সেলর না যে গেট আউট করে দেবে।

  নাউজুবিল্লাহ্। তুই একটা….

  শুয়োরের বাচ্চা? মানুষের বাচ্চা হইতে পারলে শুয়রের বাচ্চা হইতে সমস্যা কী? মানুষও প্রানী শুয়োরও প্রানী।

  প্রায় দিন এ ধরণের কথা কাটাকাটির এক পর্যায় এসে জায়েদের সঙ্গে সুমনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অথচ ভার্সিটির প্রথম বর্ষ থেকে ওরা তিন বছর এক রুমে নিজেদের ভাললাগা মন্দলাগা শেয়ার করে ছিল। এমন কি বিছানাও শেয়ার করেছিল, তখনও সুমন গায়ে উল্কি আঁকেনি আর জায়েদও ফরজ-সুন্নত-হাদিস নিয়ে এত ভাবা শুরু করেনি। সুমনের গায়ের উল্কি যতটা জায়েদকে পাপ-পুণ্যের হিসাবে ফেলতো ততটা হিসাব ও করতো না সুমনের উদোম শরীর দেখে। ছোটবেলা থেকে সে বেহেস্তের বর্ণনা শুনে বেড়ে উঠেছিল,জেনেছে মুক্তাবর্ণ গিলমানদের কথা। যতটা রূপময়ী হুরের বর্ণনা ওকে আমোদিত করতো তারচেয়ে বেশি সবুজ পোশাকের গিলমানের বর্ণনায় সে মুগ্ধ হতো। গিলমানের সন্ধানে বেহেস্ত ওকে আকর্ষণ করতো; যেমন এক সময় সুমনকে খুব আকর্ষণীয় মনে হতো। সুমনের শরীরের দিকে তাকিয়ে মনে হতো, গিলমান কি সুমনের চেয়ে বেশি আকর্ষনীয় হতে পারে? কিন্তু সুমন ছিল চঞ্চল, অনেক বেশি বাস্তববাদী আর যুক্তিবাদী। বিজ্ঞানের নিত্য নতুন অগ্রযাত্রার খবর ও গোগ্রাসে গিলতো কিন্তু যে কোনো ধর্মের বিষয়ে ওর জ্ঞান ছিল শূণ্যে কোঠায়। বলতো, রূপকথার গল্প অত মনে রাখতে হয় না, বানিয়ে টানিয়ে বললে রূপকথা হয়ে যায়। গিলমানের কথা সে বিশ্বাস করতো না যেমন তেমনি নীরবে নিভৃতে জায়েদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পক্ষপাতীও ছিলনা। সুমনের ধর্মে বিশ্বাস ছিল না কিন্তু জায়েদ ধর্মে বিশ্বাসী ছিল;সে জানতো গিলমানের বর্ণনা পবিত্র গ্রন্থে স্থান পেলেও সমাজ সহজ ভাবে তেমন সম্পর্ক বাস্তবে মেনে নিবে না। জায়েদ সমাজের লৌকিকতা আর লোকচক্ষুকে ভয় করে চলতো।

  তখন সুমনের সঙ্গে জায়েদ আর রুম বা বিছানা শেয়ার করে না,দু’জন যদিও কথা বলে কিন্তু সম্পর্কে শীতলতা। জায়েদ রেহানার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও ওর ভেতরে গোপন ভয় ঘুন পোকার মতো কাটছিল,সুমন যদি রেহানাকে ওদের সম্পর্কের বিষয়ে জানায়? ততদিনে রেহানার সঙ্গে জায়েদের সম্পর্ক একটি পরিণতির দিকে যাচ্ছিল। যতই গিলমান ভালো লাগুক, সংসার কিন্তু নারীর সঙ্গে করতে হয়। অনেক ভেবে জায়েদ রেহানাকে কাল্পনিক গল্প শুনিয়েছিল, সুমন তোমাকে স্বপ্নে দেখেছে। সে তোমার ন্যাংটো শরীরে হাত বুলাচ্ছে। চুমো খাচ্ছে।

  জায়েদের কৌশলী আর কাল্পনিক গল্পের ফল ছিল মারাত্বক, রেহানা এরপর কখনও সুমনের সঙ্গে সহজ ভাবে মিশতে পারেনি। সুমন রেহানার আড়ষ্টতাকে এড়িয়ে যাওয়া ভেবে দূরে সরে গেছে।

  আর তাই সুমনের সঙ্গে রেহানার পুণরায় দেখা হওয়ার কথা শুনে গতকাল রাতে জায়েদ পুরোপুরি ভড়কে যায়, ওর ধারণা ছিল সুমন চিরতরে দেশ ছেড়েছে। সুমন আবার দেশে ফিরতে পারে এ সম্ভাবনা জায়েদের মনে আসেনি তাই সে মানসিক স্বস্তিতে ছিল। কিন্তু কাল রাতে ওর সে স্বস্তি বাস্তবিকই উবে যায় রেহানা কী সব জেনে গিয়েছে এই সম্ভাবনা মনে হওয়াতে। সত্যি কি সব বলে দিতে পারে সুমন? সুমন দেশে ফিরে ওর সঙ্গে দেখা না করে রেহানার সঙ্গে দেখা করার কারণ ও বুঝতে পারে না। রেহানার সঙ্গে সুমনের যোগাযোগের মাধ্যমও ছোটচাচা, আর ওদের দু’জনের একান্ত ঘুরে বেড়ানো সবকিছু জায়েদের কাছে অশুভ কিছুর আলামত মনে হওয়াতে গতকাল রাতেই ও দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। সে সিদ্ধান্তের কারণে মা’কে সকালে বলে গিয়েছিল, রেহানাকে বাসা থেকে বেরুতে না দিতে আর একজনকে নির্দেশ দেয়েছে সুমন সম্পর্কে বিস্তারিত খবর সংগ্রহ করতে, দেখা যাক কী খবর আসে।

  সুমনের কথা শুনে জায়েদ আর রেহানার দিকে তাকাতে পারছিল না, ও যদি এক্ষুনি বলে, সুমন আমাকে সব বলেছ, ওর সাথে তোমার কী সম্পর্ক ছিল আমি জানি! তুমি একজন সমকামি! সমকামি হয়েও তুমি আমাকে বিয়ে করেছো? বছরের পর বছর তুমি আমাকে বঞ্চিত করে আসছো? জায়েদ কি রেহানার কথা মেনে নিতে পারবে? ওর গোপনীয়তা সমাজের জেনে যাওয়াকে জায়েদের ভীষণ ভয়, সমাজের কাছে ও নিজেকে পুত পবিত্র ফেরেস্তা বানিয়ে রাখত চায়। ধর্মগ্রন্থে প্রলোভন থাকলেও সব কিছু লোকচক্ষুর সামনে আনা জায়েজ নয়, এই বিষয়টিও তেমনই একটি ধারা; আর তাই তো রেহানার সঙ্গে ইহ্ জগতের সংসার-সন্তান নিয়ে পরিবার গঠন। মানুষ রেহানাকে ও ভালবাসে কিন্তু মানবী রেহানার শরীরের প্রতি ওর সুতীব্র আকাঙ্খা কোনো সময় ছিল না,শুধু সামাজিকতার কারণে সংসার করা।গত কয়েক দিন ধরে ছোটচাচার জন্য রেহানার বিশৃঙ্খলতার কথা পার্টির মুরব্বীদের কানেও পৌঁছে যায়, আর পৌঁছাবে না বা কেনো; পার্টি তো সব সময় ওই লোকের ওপর নজর রাখছে;তাই একজন বড়ভাই বললেন, আপনারা  আধুনিক ছেলেরা অনেক কিছু বুঝতে চান না, ভাবেন আমরা প্রাচীন জামানার মানুষ কী আর বুঝি। কিন্তু এটা তো মানেন, ধর্ম সবকিছুর সমাধান দিয়েছে।

  জায়েদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে তাকালে তিনি হেসে বলেন, এক চোখও চোখ নয়রে ভাই, এক সন্তানও সন্তান নয়। যাই বলেন, নারীরা কিন্তু সন্তানকে ভালবাসে নিজের চেয়েও বেশি।আরও দু’একটি সন্তান স্ত্রীর কোলে দিয়ে দেন দেখবেন, আপনার স্ত্রী অন্য দিকে তাকানোর সময় পাবে না, আপনার সমস্যাও মিটে যাবে।

  সে ইচ্ছেতে গতকাল রাতে নিজেদের বেডরুমে এসেছিল জায়েদ কিন্তু সুমনের প্রত্যাবর্তন সংবাদ ওকে নপুংসক করে দিয়েছিল। ওর শরীরের রক্ত বাস্তবিক অর্থে জমে হিম হয়ে গিয়েছিল। রেহানাই বা সন্তানকে কতটা ভালবাসে! ছোট্ট ছেলেকে ফেলে রেখে যেতে পারে কতটা পাষাণ নারী?

  আপাতত সুমনকে নিয়ে ও আর কিছু ভাবতে চায়না, যেভাবে হোক কাল রেহানাকে খুঁজে বের করতে হবে তারপর প্রথম সিদ্ধান্তটি যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর করতে হবে।

  রেহানার সারল্যের প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণবোধ সব সময় জায়েদের ভেতর ছিল, এই আকর্ষণের কারণে রেহানার প্রতি ওর আচরণ ছিল সদয় আর নমনীয়। নিজের অনেক বিষয় সে রেহানার কাছে খুলে বলতে যেমন পারেনি তেমনি পুরুষ মানুষের সব কর্মকাণ্ড ঘরের স্ত্রী’র জানতে হবে বলেও ও মনে করতো না। তাই ব্যবসায়িক জায়েদ সম্পর্কে রেহানা যেমন খুব বেশি জানতো না তেমনি স্ত্রী’র এই না জানাটাও ওকে স্বস্তি দিত। রেহানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে, যেটাকে জায়েদ কটাক্ষ করে মাস্টারী বলে; আর ছেলেকে নিয়ে নীরবে সংসার করতে পছন্দ করতো। ধর্ম মেনে, পর্দা করে ঘরের বউ বাইরে কাজ করলে আপত্তির কিছু নাই, অবশ্য রেহানার চাকরী করা নিয়ে মা’র অনুযোগের স্বরে ও নিজেও মাঝে মধ্যে তাল মেলাতে স্ত্রীকে চাকরী ছাড়তে বলতো কিন্তু বিষটি তেমন গুরুতর ছিল না। কিন্তু এখানেও ছোটচাচা না মরে বেঁচে গিয়ে রেহানাকে হাসপাতালে টেনে নিয়ে আবার পুরনো ধ্যান ধারণাগুলো ওর মগজে ঢুকিয়ে দিয়ে যত অশান্তির উৎপত্তি করলো।

  জায়েদ নিজের ব্যবসা শুরু করতে পেরেছিল পার্টির বদ্যনতায়, পার্টি ওকে সাহায্য করে কোনো ভুল করেনি তার প্রমানও জায়েদ দিতে শুরু করেছিল। এর মধ্যে রেহানার সঙ্গে সম্পর্ক, বিয়ে সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে অন্য এক মাত্রায় যখন নিয়ে যাচ্ছিল তখন রেহানার জীবনে পুনর্বার ফিরে এসেছিল ছোটচাচা।

  ছোটচাচার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে, তার সম্পর্কে পছন্দ না করার মতো অনেক তথ্য জেনে গিয়েছিল জায়েদ, নাস্তিক মানসিকতার প্রচণ্ড রকম যুক্তিবাদী আর বিজ্ঞানমনস্ক একজন মানুষ,দু’কলম লিখে কী লিখে না তবে ধর্ম নিয়ে রয়েছে চুল ছেঁড়া বিরূপ সমালোচনা,সব প্রশ্নের চাই যথাযথ উত্তর-প্রতিত্তুর। সৃষ্টির আদিতে প্রেরিত আল্লাহ্তালার ধর্মগ্রন্থের যথাযথ উত্তর করা কী সাধারণ মানুষের কর্ম! আল্লাহর প্রেরিত কোনো নবী-রসুল যদি এই যুগে থাকতো তাঁরা হয়ত তার প্রশ্নের জবাব দিতে পারতেন, সেই যুগও নাই নবী-রসুলও নাই। যাই হোক এমন মুরতাদ লোকের ছায়া মাড়ানোও পাপ, অথচ রেহানার ভালবাসা সে চাচার জন্য আবে হায়াতের মতো অমরতার রূপ পেয়েছিল। ছোটচাচার প্রতি রেহানার মাত্রারিক্ত ভক্তির প্রতি জায়েদ সম্পূর্ণ উপেক্ষা দেখায়, ওই উপেক্ষার ফলও ছিল চমৎকার, ছোটচাচা ক্রমে রেহানার জীবন থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। সব চেয়ে ভালো হতো, ছোটচাচা যদি আর কখনও দেশে না ফিরতেন, তাহলে লোকটিকে ওর কখনও দেখতে হতো না, রেহানারও ছোটচাচার জন্য এত ভালবাসা অনাকাংক্ষিত বানের পানির মতো হুড়মুড়িয়ে বাড়ত না।এত জখম হয়ে বেটা কী করে মরে না,ক্রুদ্ধ জায়েদের ইচ্ছে করে নিজে গিয়ে ছোটচাচার জানটা নিয়ে নেয়। সাক্ষাৎ ইবলিশের দোসর,শকুনের জান!

  ফজরের আযান শেষ হতে না হতে প্রথম সিদ্ধান্তের অগ্রগতির সুখবর নিয়ে ফোনটি আসে, তুরস্ক বেড়াতে যাবার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে, আলহামদুল্লিাহ্!

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »