শামীম রুনা | চোখবন্ধ অন্ধ সময়

0

তেরো

বাসের কাঁচভাঙা খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে ভোরের সতেজ বাতাস এসে ঝাঁপটা দিচ্ছে মণিষার মুখে। হা্ওয়ার তোড়ে মাথার লম্বা চুলগুলো রবারব্যাণ্ড আর ক্লিপ দিয়ে আটকানো নকল খোঁপার নিচ থেকে বেরিয়ে মুখে ক্রমশ চাবুকের মতো আঘাত করছে কিন্তু তাতে মণিষার ঘুমে কোনো ব্যঘাত হচ্ছে না, সে লোহার জানালার ফ্রেমে মাথা ঠেকিয়ে মুখ হা করে ঘুমিয়ে অকাতরে আছে; যেন কতকাল ঘুমায়নি।সিঁথিতে থ্যাবড়ে থাকা সিঁদুর ভোরের স্বচ্ছ আর মোলায়েম আলোতে কটকটে উজ্জ্বল,মেয়েটির মুখের দিকে তাকালে সিঁথিতে চোখ থমকে যায়। দেখে বোঝা যায়,মেয়েটি এখনও  ঠিকঠাক সিঁদুর দেয়া রপ্ত করেনি।

কতইবা বয়স মণিষার,ষোল না কি আঠারো? ওর মায়ের কড় গুনে হিসাব করা বয়স বলে,মাত্র সে ষোলতে ঢ়ুকলো। স্কুলের ক্লাস এইটের রেজিস্টশেন বুক বলে,পনেরো বছর তিন মাস। ভালো বিয়ের পাত্র পেয়ে তাড়াহুড়া করে বিয়ে দিতে চেয়ে বাপ-কাকারা আইনি জটিলতা এড়ানোর জন্য ইউপি চেয়ারম্যানের পরামর্শে নতুন করে জন্ম নিবন্ধনে বয়স করিয়েছে  আঠারো বছর এক মাস। গত দুই তিন দিন নিজের বয়স নিয়ে অল্প বিস্তর ভেবেছিল, তারপর এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে যে লোকটির সঙ্গে ওর বিয়ের কথা চলছিল,তার বয়স কত হতে পারে তা ভেবেছিল। ও পাত্রকে কখনও দেখেনি,শুনেছিল; খুব বেশি বয়স নয় পাত্রের;ত্রিশ বত্রিশ। পুরুষ মানুষের জন্য এটা কোনো বয়স নয়। গেল বছর গ্রামের আরতির,মণিষার এক্কা দোক্কা খেলার সই; হুট করে ওর বিয়ে হলো এক বিপত্নীকের সঙ্গে, লোকটি বিয়ে করতে আসে মুখের উপরের পাটির দুইটি দাঁতের শূণ্য ঘর আর  চারজন শিশু কিশার সন্তান নিয়ে। কৃষক লোকটি আরতিকে মূলত বিয়ে করেছিল তার সন্তান ও প্যারালাইজড বাপের দেখাশোনা করবার জন্য। কিন্তু বছর ঘুরার আগেই আরতিও জন্ম দেয় আর একটি কন্যা সন্তান। সদ্য ভূমিষ্ট কন্যা শিশু নিয়ে দুই দিনের জন্য আরতি বাপের বাড়ি বেড়াতে এলে, আরতির চামড়ায় মোড়ানো কঙ্কাল দেখে মণিষার কাছে বিয়ের স্বাধ বিমবিষা ঠেকে,কী দরকার এমন নিদারুণ বিবাহের!

ক্লাস এইট পড়ুয়া মণিষা আরতিকে দেখে বিয়ের প্রতি যতই বীতশ্রদ্ধ হোক না,নিজের বিয়ের বিষয়ে কোনো রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ওর নেই তা সে ভালো করেই জানতো। ওর বিয়ে যখন দূরের একটি গ্রামের বাসিন্দা মৃনাল দাসের সঙ্গে বাপ কাকারা ঠিক করে নেয়, মৃনালের বাপ ঠাকুরদা মণিষাকে দেখে পাকা কথা দিয়ে যায় আর সে কথা শুনে মুন্সি বাড়ির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে এনজিও’তে সদ্য চাকরীত প্রবেশ করা মেয়ে আফিফা ভুরু কুঁচকে বলেছিলো, তোর তো এখনও আঠারো বছর বয়স হয়নি।বিয়ে-বাচ্চা হওয়ার ধকল সামলাতে পারবি না তো!

মণিষা বাপের পক্ষ নিয়েছিল বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, বলেছিল;বাবা এফিডেবিট করিয়ে আমার আঠারো বছরের রেজিস্টেশন কাগজ বানায়ে নিয়েছে। কোনো সমস্যা হবে না।

গাধার মতো কথা বলিস না। তোর বাবা যদি তোর বিশ বছর বয়সের কাগজও বানায় তাতে কি তোর বয়স বিশ হবে? তুই না ক্লাস ফাইভে আর এইটে বৃত্তি পাওয়া মেয়ে? তুই জানিস না আঠারোর আগে  মেয়েদের বিয়ে হলে তা বাল্য বিবাহ আর বাল্য বিয়ে দন্ডনীয় অপরাধ?

বাবা বললো,পাত্রের কোনো ডিমান্ড নাই আপা। পাত্র ভালো আয়-রোজগার করে। বাজারে মুদির দোকান আছে,খাওয়া পরার অসুবিধা হবে না। ভালো রাখবে, ভালো থাকবো।

তাতে কী! আমি তোর বাপের বিরুদ্ধে থানায় কমপ্লেন করে দিবো, জেলে ঢুকিয়ে ছাড়বো।

না গো আপা।আমরা গরীব মানুষ। আমাদের এতো গুলান মানুষের খায়-খরচা চালাতে বাবার অনেক কষ্ট হয় গো।আমার বিয়ে যদি পণ ছাড়া দিতে পারে বাবার কত বড় বিপদ কাটবে তা তুমি বুঝতে পারতেছো না আপা তাই এমন করে বলতে পারতেছো। তাছাড়া আমার বিয়ে হয়ে গেলে বাড়িতে একজন মানুষের পোষণের খরচ কমবে। তাতে করে যদি ভাইগুলানের কিছুটা পড়ার খরচ হয়! আমি তো মেয়ে মানুষ, মেয়ে মানুষের জন্মই তো পরের ঘরে যাবার জন্য। আজ   না যাই, কাল তো যাবই।

ইশ্ তুই দেখি বিয়ের জন্য এক পায়ে খাড়ায়া আছিস। আফিফা ফোঁড়ন কাটে।

আমাদের মতো ঘরে জন্মালে তুমিও বিয়ের জন্য খাড়ায়া থাকতা।

শোন মণিষা, তুই অনেক ব্রাইট একজন মেয়ে। তুই বিয়ে না করে যদি পড়তি ভালো করতি। তোকে আমার খুব ভালো লাগে। তোর এমন অসময়ে বিয়ে আমি মেনে নিতে পারছি না। তারপরও, তুই নিজে বেশ ভালোই বুঝিস। আমরা বাহির থেকে কতটা বুঝতে পারবো!

আপা, তুমি কি মনে করো আমি শখ করে বিয়ে বসতে চাইতেসি। আমারও তোমাদের মতো পড়া লেখা করে চাকরী করার দারুণ ইচ্ছা হয় গো। কিন্তু গরীবের মেয়েদের সব ইচ্ছা কি আর পূরণ হতে পারে? পরের জন্মের জন্য ইচ্ছাটা তোলা রাখি আপা। ভগবান যদি সে জন্মে ইচ্ছা পূরণের আশির্বাদ দেয়।

মণিষার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আফিফার দুঃখ লাগে, ইচ্ছে করে; কোনোভাবে যদি মেয়েটিকে সাহায্য করতে পারতো, কিন্তু উপায় জানা নেই। সে নিজেও মাত্র নতুন একটি এনজিওতে চাকুরী নিয়ে ঢুকেছে। ব্যাগ থেকে সে নিজের ভিজিটিং কার্ডটি কী মনে করে বের করে মণিষার হাতে দেয়, বলে; এটা রাখিস তোর কাছে। যদি কখনও কোনো রকম সাহায্য লাগে আমার কাছে আসিস বা ফোন করসি। আমার ফোন নম্বর দেয়া আছে এতে।

কার্ডটি হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে মণিষা। একবারের জন্যও ভাবেনি ভাবেনি, কখনও এই কার্ডটিকে একমাত্র অবলম্বন করে অজানার পথে পা বাড়ানোর সাহস করবে সে। কোনো কিছু না ভেবেই, খুব যত্ন আর গোপনে নিজের ছোট হাতব্যাগে কার্ডটি রেখে দিয়েছিলো সে।

বিয়ের পর অজানা-অচেনা কিছু লোকের সঙ্গে শ্বশুড় বাড়ি রওনা হওয়ার সময় তার সে ছোট্ট হাতব্যাগে মা লুকিয়ে অল্প ক’টা টাকা দিয়ে বলেছিলো, আমার তিল তিল করে জমানো টাকা মাগো। বড় কোনো বিপদ ছাড়া এই টাকা খরচ করিস না যেন। সব সময় টাকাটা হাতে রাখিস, বিপদে সাহস পাবি।

বড় কোনো বিপদ কী হতে পারে তখন কোনো ধারণা ছিল না মণিষার। তবুও বিয়ের জরির শাড়ির আঁচলের নিচে শক্ত হাতে ব্যাগটি ধরেছিলো সে, মা’র মতো দুঃখী আর হিসাবী একজন মানুষ যখন সঞ্চিত টাকা হাতে ধরিয়ে দেয় তখন তা অমূল্য বিবেচ্য হয়ে উঠে।

এই যে এখন মণিষা জরির শাড়ি আর ত্যাবড়ানো সিঁদুর পরে হা করে বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, ওর হাতে এখনও সজোরে আকড়ে ধরা আছে হাতব্যাগটি। জরির আঁচলের নিচে, গোপনে-লুকিয়ে ও শক্ত করে ধরে রেখেছে। ও এই টাকার মর্ম বুঝে গিয়েছে, টাকাটা ধরে রাখতে হবে। এই টাকা থেকে বাস ভাড়া বাবদ তিনশ’টাকা খরচ হওয়ার পর এখনও নয়শ’পঞ্চাশ টাকা ব্যাগে রয়ে গেছে। আর আছে আফিফার কার্ড, দু’টিই এখন ভয়াবহ রকম গুরুত্বপূর্ণ ওর কাছে।

মণিষার আজ   শ্বশুড় বাড়ি থাকার কথা,সকালে ঘুম থেকে জেগে গোসল সেরে পাকঘরে ঢুকে শাশুড়ীর কথা মতোন পাক করার কথা ছিল-তেমনটাই তো ছোট কাকীমা ওকে বলেছিল। অথচ পরিবর্তে মণিষা একা একা বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এমন না যে সে অহরহ ঢাকা আসা যাওয়া করেছে আফিফার মতো,ওর বাবা কাকারাও কেউ কখনও ঢাকা আসেনি। একটি কার্ড আর সামান্য ক’টা টাকা নিয়ে বিপুল সাহস বুকে নিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত শহরে এমন হুট করে চলে আসা ছাড়া ওর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

গতকাল সন্ধ্যের পরে মণিষা স্বামী শ্বশুড়সহ আরও  তিন চারজনের  সঙ্গে শ্বশুড়বাড়ি গিয়ে ওঠে। ও একাই আসে, অনেক দূরের পথ বলে ওর বাপের বাড়ি থেকে সঙ্গী কেউ হয়নি। তাছাড়া বাপের বাড়ি করে ভাই টাইদের সঙ্গে আসার ই বা কী আছে,এখন থেকে শ্বশুড়বাড়ির মানুষগুলোই তো ওর আপনজন  হবে!নতুন বউকে বাড়ির মহিলারা ধূপ-দুর্গায় অভ্যর্থণা করলেও ঘরে না তুলে তুলসি তলায় পিঁড়িতে বসিয়ে রাখে। আশেপাশের বাড়ি থেকে দুই একজন প্রতিবেশী এসে নতুন বউ দেখে নাড়ু মুখে দিয়ে  চলে যায়। খুব পাড়া গাঁ বলে সন্ধ্যার পর পরই চারিদিক ভয়ঙ্কর নিঝুম হয়ে পরে, ঝোপঝাড়ে জোনাক ডাকতে শুরু করে। ওর অস্তিত্ব অগ্রাহ্য করে  ঘরের বউ-ঝিরা নতুন বউ;র সামনে দিয়ে দৈনন্দিন কাজ কর্ম সারে। বাড়ির পুরুষদের বাড়ির কোথাও চোখে পরে না, শুধু উঠানের মাঝে জল চৌকিতে বসে থেকে থেকে হুক্কা টানছিলো বা কেশে যাচ্ছিল মৃনাল দাসের ঠাকুরদা ভোলানাথ দাস। লোকটা কোনো কথা বলছিল না,মাঝে মাঝেই  সরাসরি অন্ধকারে মণিষাকে দেখার জন্য যেন দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকাচ্ছিল। মণিষা অন্ধকারেও লোকটির কড়কড়ে দৃষ্টি নিজের শরীরে অনুভব করে যেন,ইচ্ছে করে তুলসি তলা থেকে উঠে চলে যায়। ঘুমও পাচ্ছে খুব, অনেক দূরের পথ আসতে হয়েছে, বাস রিক্সা আর হাঁটা পথে; সব কিছু মিলে সে খুবই পরিশ্রান্ত। কিন্তু কেউ ঘরে না নিলে তো সে একা হেঁটে ঘরে ঢুকতে পারে না।

এক সময় মৃনাল দাসের ছোট বোন তুলসী ওর সামনে কাঁসার থালা ভাত রেখে বলে, নতুন বৌদি খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি। বাবা দাদার এলে তাদের সঙ্গে তোমাকে আবার যেতে হবে।

মণিষা খুব অবাক হয়ে জানতে চায়,কোথায় যেতে হবে?

সে আমি জানি না গো। মা বললো…

আহ্! বাড়ির বউদের এতো প্রশ্ন কেনো? ভদ্রতা শেখায়নি বাড়ির লোকরা? কোন বাড়ি থেকে আবার একে ধরে এনেছে ভগবানই জানে! অন্ধকার কোনো কোণ থেকে মৃনাল দাসের মা খেঁকিয়ে উঠে।

শাশুড়ীর হুঙ্কারে কানে না নিয়ে মণিষা প্রদীপের আলোয় তুলসী তলায় নিরামিস দিয়ে ভাত খেতে খেতে অনুভব করে,ওর ভয়ানক খিদে পেয়েছিলো। ভাত খেতে খেতে ভাবে,এই বাড়ির মানুষরা কী দুই বেলা গরম ভাত আর এক বেলা পান্তা খেতে পায়? ওরা ওকে কি রোজ ভাত খেতে দিবে? বাড়ি-ঘর দেখে তো মনে হয়,এরা বুঝি রোজ তিন বেলা খেতে পায়।

 

Shamim Runa is a novelist, playwright, film critic and women rights activists.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »