Ranadipam Basu/ নাস্তিক্য বনাম আস্তিক্য, শুধুই কি সত্যাসত্য দ্বন্দ্ব ?

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

১.
ইদানীংকালে আস্তিক্য-নাস্তিক্য নামক একটা বিভ্রান্তিমূলক বিষয়কে কেন্দ্র করে যে তুলকালাম ঘটনাপ্রবাহ বয়ে গেল আমাদের জাতীয় জীবনে তা কতটা যৌক্তিক বা জরুরি ছিল তা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা বিস্তর আলাপ-আলোচনা বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন তাঁদের নিজ নিজ অবস্থান ও দায়িত্ববোধ থেকেই। তবে সচেতন নাগরিকমাত্রেই আমাদের স্ব-স্ব চিন্তাজগতে অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনা যে অনেকগুলো কপাল-ভাঁজ করা প্রশ্নবোধক চিহ্নেরও জন্ম দিয়েছে তা নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাওয়ার সাথে আস্তিক্য-নাস্তিক্যবাদের কী সম্পর্ক, কিংবা জাতীয় নির্বাচন-প্রক্রিয়ায় আস্তিক্য-নাস্তিক্য চিন্তাধারা কোন্ অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করে, অথবা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালন-দক্ষতা ও সততার সাথে ব্যক্তিগত আধ্যাত্ম বিশ্বাস-অবিশ্বাস কী প্রক্রিয়ায় জড়িত এসব বিষয়-আশয় রাজনীতি-অপরাজনীতির অবলম্বন হতে পারে হয়ত। কিন্তু দর্শন-তাত্ত্বিক বিচারে আমাদের সমাজ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তা কতটা অনিবার্য, এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বিচারটাও সমকালীন প্রেক্ষাপটে জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু যিনি বা যারা এই বিচার করবেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কতটা প্রভাবমুক্ত সেটাও বিবেচ্য নয় কি?

যতটুকু মনে হয়, দর্শন-তাত্ত্বিক বিবেচনায় নিরপেক্ষতা একটা আহাম্মকি শব্দ। হাঁ এবং না এর মাঝামাঝি কোনো অবস্থান থাকা কি বাস্তবে আদৌ সম্ভব? যুক্তিশাস্ত্রও তা অনুমোদন করে কিনা জানি না। তবে এই নিষ্ক্রিয় মধ্যবর্তী জড়-অবস্থান যে সত্য ও মিথ্যার মাঝামাঝি থাকার মতোই একটা পরাবাস্তব-রূপ শূন্য অবস্থা, তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও আমরা অনেকেই যে এই পরাবাস্তব সত্তা প্রদর্শন করতে পিছপা হই না, সেটা কি আমাদের আপাত নিষ্ক্রিয়তা, না কি সুযোগ-সন্ধানের সুবিধাবাদী অবস্থান, তাও এক জটিল প্রশ্ন বৈ কি! মানব সভ্যতার আদি লগ্ন থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়তবা এরকম পরাবাস্তববাদী গোষ্ঠি যুগে যুগে ছিল, আছে এবং আগামীতেও থাকবে। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই যারা এই সুবিধাবাদী পরাবাস্তব অবস্থায় থাকতে পছন্দ করেন তারা আমাদের সমাজ-জীবনে কতটা জরুরি প্রয়োজন সংরক্ষণ করেন বা আদৌ করেন কিনা তাও বিশ্লেষণের দাবি রাখে বৈ কি। আমাদের ভুলে গেলে চলে না যে, কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ-বিকাশেই এ ধরনের সুবিধাবাদী প্যারামিটার কোনো ইতিবাচক স্রোতকে সমৃদ্ধ তো করেই না বরং এর স্বভাবগত প্রক্রিয়া নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতাকেই উৎসাহিত করে থাকে। আর একইভাবে আমাদের প্রচার-মাধ্যমগুলোও যে সম্ভাব্য এই প্যারামিটারের বাইরের কিছু নয় সেটিও ভুলে যাওয়া বোধ করি সঙ্গত হবে না।

আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রবাহের আলোকচ্ছ্বটায় আমাদের সমাজ-দেহ কোথায় কতটুকু আলোকিত হয়েছে তা নির্ণয়ের ভার সমাজ-বিজ্ঞানীদের কাঁধে অর্পিত আছে। তারা নিশ্চয়ই খুঁজে দেখবেন সমাজদেহের কোন্ কোন্ ঘুপচিময় অন্ধকার অলিতে-গলিতে এখনো জ্ঞানের যথার্থ আলোটুকু পৌঁছুতে পারে নি এবং তা কেন হয়নি ও কী করলে কীভাবে ওগুলোকে একটু একটু আলোকিত করে তোলা যাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বল আলোকধারায় সেটারও অনুসন্ধান করবেন। কিন্তু সমাজদেহের যেটুকুকে আমরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত বলে ধরে নিয়েছি বস্তুত তা-ই বা কতটা সত্য ও স্বচ্ছ? আমরা জানি যে, প্রাতিষ্ঠানিকতার সনদ থাকে, কিন্তু জ্ঞানের কোনো সনদ হয় না। কোনো বিষয়ে ধারণা অর্জন আর বিষয়ের উপলব্ধ হওয়া সম্পূর্ণই ভিন্ন জিনিস। তাই সনদপ্রাপ্ত বলে আমরা যতই লম্ফঝম্ফ করি না কেন, যুক্তি আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্বমুখরতাই আসলে নির্ধারণ করে দেয় কার অবস্থান কোথায়, ঘুপচিতে না উদার উজ্জ্বলতায়। দুনিয়া জুড়েই যুক্তি আর বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব এখনো বহমান একটি বিষয়। কিন্তু যুক্তিকে বিশ্বাস আর বিশ্বাসকে যুক্তি বলে গুলিয়ে ফেলাও এক ধরনের পরাবাস্তব অবস্থা। বাস্তবও নয় আবার অবাস্তবও নয় এই যে অবস্থা, প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা এটিকে বলেন অনির্বচনীয়। অর্থাৎ সৎও (সত্য বা অস্তিত্বশীল) নয়, অসৎও (অসত্য বা অস্তিত্বহীন) নয়, আবার সৎ বা অসৎ কোনোটিই বলা যায় না তাকে বলে অনির্বচনীয়। যুক্তি ও বিশ্বাসের জবরজং অবস্থার মতোই আমাদের সমাজদেহে আস্তিক্য-নাস্তিক্য বিষয়ক ধারণাটাও বোধ করি বর্তমানে এরকমই এক অনির্বচনীয় অবস্থায় বিরাজ করছে।

এখানে নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঠবে, এরকম মনে করার কারণ কী? খুব সহজ-সরল ভাষায় একবাক্যে এর জবার দেওয়ার উপায় নেই যদিও, তবু মনে হয়, এই কারণটুকু খুঁজতে হলে আমাদেরকে প্রথমেই এটা ভাবনায় রাখতে হবে যে, আস্তিক্য-নাস্তিক্য দ্বন্দ্বটা আসলে প্রকারান্তরে মানব-সভ্যতার সেই চিরায়ত সত্য-মিথ্যারই ভিন্নতর এক দ্বন্দ্ব। এই সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বের সাথে কিছু আধ্যাত্মিক উপাদান যুক্ত হয়ে একই দ্বন্দ্বই আস্তিক্য-নাস্তিক্যের নতুন চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছে কেবল। সত্যি কি তাই? তবে খুব ভালো করে খেয়াল রাখা উচিত যে, এটি মূলত একটি প্রাচীন দার্শনিক দ্বন্দ্ব। এখন আমরা তাকে জেনে বা না-জেনে বুঝে বা না-বুঝে যতই সামাজিক ও রাজনৈতিক অপ-ব্যবহার করি না কেন, প্রকৃতপক্ষে আস্তিক নাস্তিক শব্দগুলো পরিপূর্ণভাবেই ভারতীয় দার্শনিক পরিভাষার অন্তর্গত সংস্কৃতাগত শব্দ এবং তার সাথে ধর্ম বা অধর্মের আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা অবশ্যই বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবু যেহেতু এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ভিন্ন আকার-আকৃতি-চেহারায় সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বটাও অন্তর্নিহিত, তাই আমাদের বোধকরি এটাও উপলব্ধিতে রাখা দরকার, সত্য বলতে আমরা আসলে কী বুঝি, মিথ্যাই বা কী, এবং তাদের স্বরূপটাই বা কেমন?

২.
সত্য ও মিথ্যা, আপাতদৃষ্টিতে সাদাসিধে এই শব্দ দুটোর অর্থ বোঝেন না এমন একজন লোকও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আমার সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া সন্তানকে জিজ্ঞেস করলাম, বলো তো সত্য কী? এতটুকু সময় না নিয়ে ঝটপট উত্তর, যা সত্য তাই সত্য! বাহ্, কী দ্বিধাহীন জবাব! আবারো প্রশ্ন করলাম, তাহলে মিথ্যা কী? যা সত্য নয় তাই মিথ্যা! একেবারে জুতসই জবাব! সপ্তম শ্রেণির এক কিশোর ছাত্রের কাছে মূলত উত্তর পাওয়ার জন্যে প্রশ্নটা করা হয়নি, বরং কী ধরনের উত্তর আসে তা যাচাই করার কৌতূহল থেকেই এটি করা। এই একই প্রশ্ন যখন আমার এমএ পাশ সহকর্মীটিকে করলাম, তিনিও প্রায় একই ধরনের উত্তর দিলেন। তবে সত্যের সংজ্ঞায় তিনি বললেন, যা বাস্তব তাই সত্য। তাঁর এই উত্তরের প্রসঙ্গ ধরেই আরেকটি প্রশ্ন মুখের উপর চলে এসেছিল প্রায়, কিন্তু অতিশয় ধার্মিক বন্ধুটির অনুভূতিতে আবার কোনো কারণে অহেতুক আঘাত লেগে যায় কিনা ভেবে প্রশ্নটি আর করা হয়নি। তবে একটু ঘুরিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলাম, তবে কি যা সত্য তাই বাস্তব? একটু থতমত খেয়ে বন্ধুটি শেষমেষ উত্তর খোঁজার বদলে প্রশ্নের উদ্দেশ্য নিয়েই সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠলেন।

তাঁর এই সন্দিহান হয়ে ওঠা আসলে বর্তমান বাস্তবতায় তেমন অস্বাভাবিক নয়। কেননা অকস্মাৎ কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হলে ওই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য নিয়েও একটা অব্যক্ত প্রশ্ন জেগে ওঠে, তিনি কেন এই প্রশ্ন করছেন? এবং প্রশ্নের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে প্রশ্নকর্তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মনে মনে অনেকগুলো ইতিবাচক বা নেতিবাচক ধারণাও তৈরি করতে থাকি আমরা। আর এই ধারণার ভিত্তি হিসেবে সক্রিয় থাকে প্রশ্নকর্তা ব্যক্তিটির সম্বন্ধে আমাদের পূর্বকৃত অভিজ্ঞতা। অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে সামনে পেয়ে নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন করতে পারি না যে, আপনি কি সত্যি বিয়ে করেছেন? কিংবা কোনো অপরিচিতা রমণীকে অহেতুক প্রশ্ন করা যায় না যে, আপনার বাসাটি ঠিক কোথায়? আবার প্রশ্নের প্রকৃতি ভেদে পরিচিতজনের কাছেও অনেক প্রশ্নের উত্তর আশা করা যায় না।
নিজের সময়েই অসম্ভব জনপ্রিয় ও বিখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর কাছে নাকি এক ভক্ত জানতে চাইলেন, তিনি কোন্ বই কী অবস্থায় লিখেছেন? এ ব্যাপারে কিছু বলতে অনীহ লেখক যতই প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চাইলেন প্রশ্নকর্তা ততই পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত রসিক লেখক সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন, দেখো, সুইস মনোস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুস্তাফ জাং একদা তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, কিছু লোক আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কীভাবে লিখি। এ ব্যাপারে আমাকে একটা কথা বলতেই হয়, কেউ চাইলে তাকে আমরা আমাদের সন্তানগুলো দেখাতে পারি, কিন্তু সন্তানগুলো উৎপাদনের পদ্ধতি তো দেখাতে পারি না!

স্থান-কাল-পাত্র ও পরিস্থিতি ভেদে একটি আপাত নির্দোষ অভিন্ন প্রশ্নও যে ভিন্নমাত্রিক উত্তর ও কখনো কখনো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ারও সৃষ্টি করতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমানও হতে পারে, অদৃশ্যমানও হতে পারে। যদি বলি কেন এ প্রতিক্রিয়া হয়, এরকম প্রশ্ন হাস্যকর মনে হতে পারে। তবে এর পেছনে যে আসলে ব্যক্তি-মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বোধটুকু জড়িত তা হয়ত অস্বীকার করা যাবে না। এই নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই কোনো ব্যক্তি তার নানান প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে, যতটাই কার্যকরি হোক, জানতে বা অজান্তে আসলে একধরনের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেন। অন্যকে অবৈধ আক্রান্ত না করে নিজেকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখার অধিকার নিশ্চয়ই প্রতিটি ব্যক্তির রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রশ্ন যখন বস্তুত কোনো ব্যক্তিকে নয়, আসলে আক্রান্ত করে কোনো মতাদর্শকে, সেখানে কি ব্যক্তির ওই সমীকরণ বিবেচ্য থাকে? থাকার কথা নয়। সেখানেও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় বটে, তবে এর দৃষ্টিকোণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তখন বিবেচনায় এসে পড়ে উত্থিত প্রশ্নের একান্ত বৈশিষ্ট্য বা শক্তিমত্তার বিষয়টি। এই শক্তিমত্তা আসলে কী?

প্রশ্নের শক্তি হলো তার উত্থিত যুক্তি, যা কোনো সীমানা মানে না। সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে আরোহ ও অবরোহ পদ্ধতির এসিড টেস্টে গলিয়ে গলিয়ে কার্যের পেছনে কারণ এবং তারও পেছনের সূচনা-বিন্দুকে খুঁজে বের করতে যে কিনা সদা তৎপর। যুক্তির এই ঐকান্তিক তৎপরতাই মূলত প্রশ্নের শক্তি। যে প্রশ্ন যুক্তির সিঁড়ি বেয়ে উঠতে জানে না, সে প্রশ্ন আদতে শক্তিহীন। আর শক্তিহীন প্রশ্ন আসলে কোনো প্রশ্নই নয়। আর তাই বলা যায়, যার মধ্যে কোনো উত্তর নেই সেটা কোনো প্রশ্ন নয়, প্রতিটি প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর নিহিত থাকে। এবং সাথে সাথে আমাদের এটাও খেয়াল রাখার দরকার হয় যে, উত্তর জানা না-থাকা আর উত্তর না-থাকার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। জগতে এমন কোনো বিষয়ই নেই যার কোনো উত্তর নেই। হতে পারে উত্তরটি আমাদের জানা নেই, তাই বলে উত্তর নেই তা বলা যাবে না। অতএব এমন জিজ্ঞাসা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, প্রশ্নের এই যে যৌক্তিক শক্তি এটা প্রকৃত কার জন্যে হুমকি হতে পারে? বুদ্ধিমান পাঠকের কাছে এর উত্তর নিশ্চয়ই অধরা নয়। প্রশ্ন হুমকি হয় আসলে মিথ্যার কাছে। কেন? কারণ, মিথ্যার কোনো সত্যনিষ্ঠ ভিত্তি থাকে না। প্রশ্নের শক্তির কাছে মিথ্যার ফানুস টিকতে পারে না, চুপসে যায়। বাইরের চকমকি চেহারার ভেতরে ভিত্তিহীন অবলম্বনগুলো মুহুর্মূহু প্রশ্নের ধাক্কায় ভেঙে গেলে মিথ্যার সৌধটা হুড়মুড় করে ধসে পড়ে। আর তাই মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত কোনো তত্ত্ব বা মতবাদ প্রশ্নকেই বেশি ভয় পায়। সেক্ষেত্রে প্রশ্নকারীই হয়ে ওঠে তার অনাকাঙ্ক্ষিত শত্রু। তাহলে আবারো সেই শুরুর প্রশ্নেই ফিরে যেতে হয়, সত্য আসলে কী?

৩.
অনেকেই কৌতুক করে বলেন, সহজ জিনিস নিয়ে ঘোট পাকাতে সিদ্ধহস্ত নাকি দার্শনিকেরা। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথও কম যান না, কী অবলীলায় বলে ফেলেন-‘সহজ করে বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে’! অর্থাৎ তিনিও সহজ জিনিসকে এত সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নন। তাহলে সত্য জিনিসটা প্রকৃতই কী বিষয় তা কি আমাদেরকে সেই মাতাল গাড়ি-চালকের চোখ দিয়েই উপলব্ধি করতে হবে!
কৌতুকটা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। দুর্ঘটনার পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া চালককে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, এই স্পষ্ট দিবালোকে সেতুতে উঠার এত চওড়া ফাঁকা রাস্তা থাকা সত্ত্বেও তুমি রাস্তা ছেড়ে খাদে পড়লে কী করে? উত্তরে চালক বলল, মোড় ঘুরতেই দেখি সামনে খুব দ্রুতবেগে একটা ট্যাক্সিক্যাব ধেয়ে আসছে ঠিক আমার দিকে। আমিও খুব দ্রুততার সাথে ওটাকে সাইড দিয়ে দিলাম। এরপরই দেখি একটা বিরাট কাভার্ডভ্যান! স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে ওটাকে সাইড দিতে না দিতেই দেখি আস্ত একটা ব্রিজ একেবারে গায়ের উপর এসে পড়ল বলে! চোখ-মুখ বন্ধ করে অল্পের জন্য সংঘর্ষ এড়িয়ে ওটাকেও সাইড দিয়ে দিলাম।

বিষয়টা কৌতুককর হলেও চালকের বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে কি? চালক তার নিজের অবস্থান থেকে যেভাবে যা দেখেছে বা উপলব্ধি করেছে সে অনুযায়ীই তৎপর হয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু মাতাল থাকার কারণে তার বিবেচনাবোধে যে ঘাটতি ছিল তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। বিবেচনাবোধের এই ঘাটতিটা কী? হতে পারে বিভ্রম বা সচেতনতার অভাব, ব্রিজটা তার দিকে ধেয়ে আসা। অর্থাৎ ব্রিজটা নয়, সে-ই যে ব্রিজের দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল এই বোধটাই হারিয়ে ফেলেছিল সে, বা একটা বিপরীত বোধ তৈরি হয়েছিল তার। অর্থাৎ চালকের বোধ এখানে সত্য নয়, ভ্রান্ত। কিন্তু ওই চালক যদি মাতাল না হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক হতো তাহলেও কি এর ব্যতিক্রম কিছু দেখত বা উপলব্ধি বোধ হতো? উপলব্ধির ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে তেমন কোনো ব্যতিক্রমই হতো না হয়ত, তবে তখন সচেতন বিচারবোধটুকু যে অন্তত সক্রিয় থাকত সেটা ধারণা করা চলে। ফলে ব্রিজ পাশ কাটিয়ে গাড়িটাকে খাদে যেতে হতো না হয়ত। এখন প্রশ্ন, এই যে বিবেচনাবোধের ঘাটতি বিচার করা হচ্ছে, এই বিচার আসলে কে করছে? আমরা করছি। এই আমরা কারা? আমরা যারা ব্রিজটিকে স্থির বিবেচনা করে গাড়িটি রাস্তা ছেড়ে খাদের দিকে ধাবিত হয়েছে বলে অনুমান করছি। অথবা ধরা যেতে পারে যে আমরা অনুভূত স্থির ব্রিজটির পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছি। চালক যদি প্রথম পক্ষ হয়, আমরা এখানে দ্বিতীয় পক্ষ যারা মনে করছি যে আমাদের বোধ সত্য, অর্থাৎ আমাদের বিবেচনাবোধে ব্রিজটি স্থির অবস্থায় রয়েছে। আমাদের বোধ এখানে ভ্রান্ত নয় সত্য বলে প্রতিপাদন করছি আমরাই।

ঠিক এ অবস্থানে দাঁড়িয়ে এখন আমরা যদি আমাদের সত্য বিবেচনাবোধকে আরেকটু প্রসারিত করে সূর্যটার দিকে তাকাই, কী দেখব আমরা? সূর্যটা পূর্ব দিক থেকে উদিত হয়ে চক্রবাল ঘুরে একটু একটু করে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। সত্যি কি তাই? অথচ বিজ্ঞান-দৃষ্টির এ যুগের জ্ঞান-কাঠামোয় আমরা এটা নিশ্চিত করে জানতে পারছি যে সূর্য নয় আসলে পৃথিবীটাই আবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানের ভাষায় সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির স্কুল-পাঠ্য জ্ঞান দিয়েই আমরা বুঝতে পারি যে, পৃথিবীটাকে স্থির উপলব্ধি করাটাই আমাদের ভ্রান্ত উপলব্ধি। পৃথিবীর প্রচণ্ড আবর্তন গতির কারণে আমরা যে পৃথিবী-পৃষ্ঠ থেকে এক ঝটকায় ছিটকে যাচ্ছি না সেটা আমাদের উপর পৃথিবীর টেনে রাখা মাধ্যাকর্ষণ বল ও গতি-জড়তার কারণে। তবু এই ভ্রান্ত উপলব্ধিকে আমাদের কাছে যে ভ্রান্ত মনে হচ্ছে না বরং সত্য উপলব্ধি মনে হচ্ছে, তাতে করে সেই মাতাল চালকের সাথে আমাদের বস্তুত পার্থক্যটা কোথায়? সত্য-সন্ধানি দৃষ্টিতে বিচার করলে বলতেই হয় যে, আসলেই কোনো পার্থক্য নেই। এই পার্থক্য উপলব্ধ না হওয়ার কারণটাই হলো আপেক্ষিকতা। অর্থাৎ আমরা যার যার আপেক্ষিক অবস্থান থেকেই বাকি সব কিছুকে বিচার করছি। তার অর্থ কি এই নয় যে, আমাদের কাছে প্রতিভাত সত্যটাও আসলে একটা আপেক্ষিক সত্য? অর্থাৎ স্থির বা পূর্ণ সত্য নয়! যদি তাই সত্যি হয় তাহলে মিথ্যা বলতে কী বোঝায়?

মহাবিজ্ঞানী নিউটনের মহাকর্ষিক সূত্র বা মহামতি আইনস্টাইন তাঁর ভূবনবিখ্যাত আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব দিয়ে উচ্চতর বিজ্ঞানের খোলনলচে পাল্টে দেবার আগেও সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবর্তন অনাদিকাল থেকে চলে আসছিল এবং পৃথিবীতে অবস্থানকারী প্রতিটা ব্যক্তি-মানুষই সূর্যকে ঠিকই পূর্ব থেকে পশ্চিমেই হেলে পড়তে দেখে এসেছে। কিংবা চলমান মোটরযান আরোহী যেকোনো ব্যক্তিই নিজের আপাত স্থির অবস্থানের সাপেক্ষে আশপাশের প্রকৃতি গাছপালা মাঠঘাট প্রভৃতিকে বিপরীত দিকে পেছনে সরে যেতে দেখে এসেছে, আজও দেখছে। ফলে আমাদের ইহজাগতিক আপেক্ষিক অবস্থানের সাথে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির যে বোধ তার সাথে বৈজ্ঞানিক জটিল তত্ত্ব বোঝা না-বোঝার আপাত কোনো সম্পর্ক আছে কি! সত্য আপেক্ষিক বলেই হয়ত এ ব্যাপারেও নিশ্চয় করে কিছু বলার উপায় নেই। তবে ব্যক্তিক এই উপলব্ধিকে আমাদের প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা যে সেই দু-তিন হাজার বছর আগেই দর্শন ও জ্ঞানচর্চার মূখ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বস্তুগত বহু বহু বিষয়ের প্রামাণ্য ও ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হলেও এমন কিছু বিষয় থেকে যায় যেগুলো আসলে বাহ্যবস্তুর বা প্রত্যক্ষ উপলব্ধির অতীত। এবং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা পেতে আমাদেরকে অবশ্যই যুক্তি-বিজ্ঞানের শৃঙ্খলা চর্চায় ঢু মারতে হয়। কেউ কেউ এটিকেই বলেন দর্শন-চর্চা। আর ঐতিহ্য অনুসারে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের সমৃদ্ধিও কিন্তু অনস্বীকার্য।

এখানে উল্লেখ্য, দর্শনের নাম শুনেই তাতে অনাধুনিকতার ছোঁয়া ভেবে মুখ গোমড়া করে ফেলার কারণ নেই। কেননা সচেতন বা অবচেতনেই হোক, বিজ্ঞান ও দর্শন আমাদের জীবন-যাত্রারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানব-সভ্যতায় নিরাকার জ্ঞান-চর্চার যে সূত্রপাত তা-ই প্রাচীন দর্শন হলে, কালে কালে সেগুলোই বিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হতে হতে আধুনিক জ্ঞান-মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়ে আজ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে আমাদের জাগতিক অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। আর তাই বিজ্ঞান, দর্শন এবং আমাদের অস্তিত্ব এই তিনে মিলে যে সম্মিলিত সত্তা সেটাই আমাদের বর্তমান অবস্থান। তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, মহামতি আইনস্টাইন কিংবা স্টিফেন হকিং-এর মতো বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের আলোড়নসৃষ্টিকারী সমস্ত মহাজাগতিক তত্ত্বই কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে তাঁদের করোটির মধ্যে অর্থাৎ চিন্তা-জগতে, যা হাতে-কলমে প্রমাণ করার মতো বিষয় ছিল না। এবং সেগুলি যে একান্তই যুক্তি-বিজ্ঞানের শৃঙ্খলা মাত্র তা হয়ত বলার অপেক্ষা রাখে না, কেননা তার প্রামাণ্য আসলে শুধু কিছু গণিতের শুদ্ধ সমীকরণ মাত্র। আর উচ্চতর গণিত-শাস্ত্রের ছাত্রমাত্রই এটা বোঝেন যে গণিতও আসলে যুক্তির কঠিন শৃঙ্খলায় বাঁধা সংখ্যা ও প্রতীকের চিহ্নধারী দর্শন ভিন্ন কিছু নয়। অতএব আগামীকাল কোন পোশাক-পরিচ্ছদে সেজে কখন কীভাবে কোথায় প্রথম প্রিয়-সন্দর্শনে যাব এবং প্রিয়তম বা প্রিয়তমাকে কোন পর্যায়ে কী সম্ভাষণ করব এরকম ভাবনা যেমন দর্শন-বহির্ভূত নয়, তেমনি আস্তিক্য-নাস্তিক্য নির্ধারণে জ্ঞান ও তার প্রামাণ্য কী, সত্য কী, মিথ্যা কী এইসব ভাবনারাজিকে দর্শন-চর্চা ভেবে এড়িয়ে যাবারও উপায় নেই, আবার এতে আঁৎকে ওঠারও কিছু নেই। কেননা বক্ষ্যমান নিবন্ধটার এ পর্যন্ত এসে যদি পাঠক হিসেবে আপনার মনে হয় যে আপনি এবার বুঝি দর্শন-চর্চায় ঢুকতে যাচ্ছেন, তাহলে আপনার ভ্রান্তি নিরসনকল্পে এই বলে আশ্বস্ত করছি যে, আপনি আসলে শুরু থেকেই দর্শনের রাস্তা মাড়িয়েই এটুকু পথ এসেছেন। নতুন করে আর দর্শনে ঢোকার অবকাশ নেই।

৪.
ধরা যাক আপনি কোথাও ভ্রমণে বেরোবেন যেখানে আগে কখনো যাননি। যেহেতু বেশ দূরবর্তী হাঁটার রাস্তা, তাই অতি প্রত্যূষে অন্ধকার থাকতেই বেরিয়ে পড়েছেন এবং বাড়ি থেকে কিছুদূর এগিয়েই সামনে রাস্তায় কিছু একটা বস্তু আড়াআড়ি পড়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। বিষাক্ত সাপই তো মনে হচ্ছে! যাত্রার শুরুতেই এরকম একটা অপয়া বাধা পড়ায় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আপনার। এখন কি বাড়ি ফিরে যাবেন, না কি তুচ্ছ অপয়া চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সাপটিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবেন তা ভাবছেন। ইতোমধ্যে সকালটা আরো ফর্সা হয়ে উঠতেই বিস্ময়ের সাথে দেখলেন যে, আরে ওটা তো সাপ নয়, আসলে একটা মোটা দড়ি বা রজ্জু পড়ে আছে! দেখতে অনেকটা সাপের মতোই লাগছিল তখন। আশ্বস্ত হয়ে আবার এগিয়ে চললেন। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে বেলা বেড়ে বেশ গরম হয়ে ওঠছে। হাঁটতে হাঁটতে যতই বেলা বাড়তে লাগল ততই সামনের এলাকাটা গাছপালাহীন খা খা বিরান ভূমিতে পরিণত হতে লাগল। এদিকে মধ্য দুপুর হয়ে মাথার উপর সূর্যটা তার গনগনে আগুন ঢেলে দিচ্ছে যেন। ঘেমে নেয়ে একাকার আপনার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কিন্তু সাথে পানি না থাকায় এদিক ওদিক খুঁজছেন কোথাও পানির সন্ধান পাওয়া যায় কিনা। আসার পথে কয়েকটা পুকুর জলাশয় পেরিয়ে এসেছিলেন বটে, তাও বেশ আগে, কিন্তু এখন আর তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ বেশ দূরে পানির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে বলে মনে হলো। ছায়া-ছায়া মতো গাছপালাও হবে হয়ত ওখানে, যা কিনা পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। সেদিক লক্ষ্য করেই ছুটলেন এবার। কিন্তু হায় যতই এগুচ্ছেন ওটা একই দূরত্বেই পেছনে চলে যাচ্ছে! তবুও ঐ দূরের ঢিবিটার পাশে চকচকে পানির অস্তিত্ব ঠিকই বুঝতে পারছেন। আরো বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে যখন ঢিবিটার পাশে এলেন তখন দেখা গেল ঢিবিটা আছে ঠিকই কিন্তু পানির কোনো চিহ্নই নেই। কেন এমন হচ্ছে! আর কোনোভাবেই যখন পানির কাছে ভিড়তে পারলেন না তখনই উপলব্ধি হলো যে, আরে ওটা তো পানি ছিল না, মরীচিকা! পানির পিপাসায় বুকটা বুঝি এবার সত্যিই ফেটে যাবে। এখন কী করা? আবারো এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন। দূর থেকে এবার একটা দিঘির মতো কিছু নজরে এলো। এগিয়ে চললেন। একসময় পৌঁছেও গেলেন। টলটলে পানিই তো দেখা যাচ্ছে। সকালের সাপের ঘটনা এবং কিছুক্ষণ আগের মরীচিকার বিষয়টি মনে এলো আপনার। তাই যত টলটলেই হোক পানি স্পর্শ না করে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না যে ওটা সত্যিই পানি কিনা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, ওটা আসলে পানিই। হাতমুখ ধোয়ে শীতল পানিতে গা’টা মুছে নিয়ে প্রাণ ভরে পান করে তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলেন। যাক এবার শান্তি। নিশ্চয়ই আপনার গন্তব্যও আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু এ পর্যন্ত ভালোই অভিজ্ঞতা হলো বলতে হবে।

এই ছোট্ট ঘটনা বা কাহিনী থেকে আমাদের কী কী অভিজ্ঞতা হলো এবং তা থেকে কী সিদ্ধান্তে আসা গেল? এই দায়টা যদি কোনোভাবে আমাদের সেই প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায় তাহলে বিস্ময়ের সাথে দেখব যে, এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলোকেই মহান আচার্যরা কী করে একেকটা কালজয়ী তত্ত্বে রূপ দান করে যুক্তিজাল বিস্তারের মাধ্যমে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত কতকগুলো দার্শনিক প্রস্থানেরও ভিত্তি বানিয়ে ফেলেছেন! যার একটির সাথে অন্যটির সংরাগ-বিরাগ ঐক্য-অনৈক্যের অম্ল-মধুর সম্পর্কের জ্ঞান-চিহ্ন দর্শনের পাতায় পাতায় কালের সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে। এ পর্যায়ে আমরা বরং সেখানে না ঢুকে আমাদের প্রাসঙ্গিক বিষয়টুকুই খুঁটে খুঁটে তুলে আনার চেষ্টা করতে পারি।

এ প্রেক্ষিতে প্রথমেই প্রশ্ন আসে, জ্ঞান কী? সহজ কথায়, কোনো বিষয় সম্বন্ধে প্রাপ্ত উপলব্ধিই হলো জ্ঞান। দর্শনের ভাষায় যাকে বলে ‘প্রমা’। তবে প্রমার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো প্রকৃষ্ট জ্ঞান। প্রকৃষ্ট জ্ঞান বলতে সেই জ্ঞানকেই বোঝায় যে জ্ঞান অন্য জ্ঞানের দ্বারা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত না হয়। যেমন রজ্জুতে সাপ দেখার জ্ঞানকে প্রমা বলা যাবে না। কারণ প্রথম জ্ঞানটি সাপ-বিশিষ্ট হলেও পরবর্তীতে অন্যভাবে প্রাপ্ত রজ্জুজ্ঞান প্রথম জ্ঞানটিকে মিথ্যা প্রমাণ করে যে, ওটা আসলে সাপ নয় রজ্জু। জ্ঞানের এই যে ভ্রান্তি তাকে দর্শনের ভাষায় বলে ভ্রম। এই ভ্রমকে বলা হয় মিথ্যা জ্ঞান বা অযথার্থ জ্ঞান। একইভাবে মরীচিকায় জলের জ্ঞানও মিথ্যা জ্ঞান। তবে দিঘিতে যে জলের সন্ধান পেয়েছিলাম আমরা, সেখানে জলে জল-জ্ঞান হলো যথার্থ জ্ঞান বা সত্য জ্ঞান। কেন তা যথার্থ জ্ঞান? কারণ সেই জল পান করে বা হাত-মুখ ধোয়ার মাধ্যমে প্রবৃত্তি নিবারণ করে আমরা উপলব্ধি করেছি যে এই জল আসলে জলই, অন্য কিছু নয়। নইলে আমাদের প্রবৃত্তি নিবারণ হতো না।
এখান থেকে কী সিদ্ধান্ত পাওয়া গেল? জ্ঞান দু’প্রকারের-প্রমা বা যথার্থ জ্ঞান এবং অপ্রমা বা অযথার্থ জ্ঞান। যথার্থ জ্ঞানের যে যথার্থতা বা সত্যতা তাকে বলে প্রামাণ্য। আর অযথার্থ জ্ঞানের যে অযথার্থতা বা মিথ্যাত্ব তাকে বলে অপ্রামাণ্য। কারো কথায় কোনো সন্দেহ দেখা দিলে আমরা কিন্তু তৎক্ষণাৎ বলে ফেলি, তোমার কথা যে সত্যি তার প্রমাণ কী? এটা কিন্তু আমরা এমনি এমনি বলি না। জানতে বা অজান্তেই আমরা আসলে আমাদের সেই হাজার বছরের দার্শনিক যুক্তির ধারাবাহিকতাটুকুই পালন করে যাচ্ছি। অর্থাৎ যে-কোনো প্রামাণ্য বা সত্যতা নির্ণয় করা হয় প্রমাণের মাধ্যমে।

এতটুকু পর্যায় পর্যন্ত সবগুলো ভারতীয় দর্শনই প্রায় একমত ছিল। জ্ঞানের এই প্রামাণ্য নির্ণয়কল্পে ভারতীয় দর্শনে প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান, শব্দপ্রমাণ, অর্থাপত্তি, অনুপলব্ধি এসব নানা প্রকার প্রমাণের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে সবগুলো দর্শন সম্প্রদায় কিন্তু সবগুলো প্রকারের প্রমাণকে একইসাথে স্বীকার করেন নি। কেউ কেবল প্রথমটি অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রত্যক্ষকেই একমাত্র প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করেন, আমরা যেমন পানিটুকু স্পর্শ করে এবং পান করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রত্যক্ষের মাধ্যমেই নিশ্চিত হয়েছি যে ওটা পানিই ছিল। কেউ আবার প্রথম দুইটিকে অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও অনুমানকে প্রমাণ মানেন, কেউ প্রথম তিনটি, কেউ প্রথম চারটি, পাঁচটি বা ছয়টিকে প্রমাণ বলে স্বীকার করেন। কিন্তু আমাদের আলোচ্য বিষয় মূলত এটি নয়।

বিভিন্ন দর্শন সম্প্রদায়গুলির মধ্যকার মূল বিতর্কটি হচ্ছে মূলত জ্ঞানের প্রামাণ্য বা সত্যতা এবং অপ্রামাণ্য বা মিথ্যাত্ব এর প্রকাশ ও অবগতির উপায় বা প্রক্রিয়া নিয়ে। আরেকটু সহজ করে বললে, যেমন জ্ঞানের বিষয় হিসেবে সাপ বা রজ্জু বা জল বা মরীচিকা ইত্যাদি প্রমা বা অপ্রমার যে প্রকাশ ঘটে তা কীভাবে ঘটে এবং আমরা যে উপলব্ধি করি এটা সাপ বা রজ্জু বা জল বা মরীচিকা তার সত্যতা বা মিথ্যাত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়াই বা কী, তার উপর নির্ভর করেই বিভিন্ন দর্শন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরাট বিতর্কের সৃষ্টি এবং তা থেকেই প্রত্যেকেরই নিজস্ব একেকটি প্রামাণ্যবাদ গড়ে উঠেছে। একদলের সাথে অন্যদলের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক তফাৎও রয়েছে। এই যে একটি বিষয় নিয়ে একেক দলের একেকটি অবস্থান, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রধান আলোচ্য আস্তিক্য ও নাস্তিক্য বিষয়ক ধারণার মূল সূত্রটুকু। আর এটুকু বোঝার জন্যেই আসলে এতক্ষণ এই ভণিতাটুকু করে আসতে হয়েছে। সহনশীল পাঠক এটুকু মার্জনা করবেন নিশ্চয়ই।

বাকি বিষয়টুকু বোঝার জন্যে আমাদেরকে অবশ্য প্রামাণ্যবাদের জটিল দর্শন-পাঠে ঢোকার প্রয়োজন হবে না। বরং এর সীমান্ত ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতেই আমরা আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের আপাত সন্তোষজনক একটা ব্যাখ্যা মোটা দাগে পেয়ে যাবার আশা করছি। তবে যেহেতু বিষয়টা আস্তিক-নাস্তিক সম্পর্কিত, এবং বিষয়-বিচারে অনেকটা সংবেদনশীলও, তাই এ ট্র্যাকের বাইরের পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটা তথ্য জানিয়ে রাখা আবশ্যক। তা হলো, ভারতীয় দর্শনের উল্লেখযোগ্য প্রধান নয়টি দার্শনিক-প্রস্থানের তিনটিকে বলা হয় নাস্তিক দর্শন, এবং বাকি ছয়টিকে একসাথে বলা হয় আস্তিক ষড়দর্শন। নাস্তিক দর্শন তিনটি হলো চার্বাক-দর্শন, জৈন-দর্শন ও বৌদ্ধ-দর্শন। একটু ভেবে দেখুন তো, পৃথিবীতে জনসংখ্যার আধিক্য বিবেচনায় প্রধান চারটি ধর্মাবলম্বীদের একটি হলো বৌদ্ধ। অথচ এই বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্ম দাঁড়িয়ে আছে প্রতিষ্ঠিত দুটি নাস্তিক দর্শনের উপর! অন্যদিকে ছয়টি আস্তিক দর্শন হলো ন্যায়-দর্শন, বৈশেষিক-দর্শন, সাংখ্য-দর্শন, যোগ-দর্শন, মীমাংসা-দর্শন ও বেদান্ত-দর্শন। এই সবগুলো দর্শন আবার সম্মিলিতভাবে জড়িয়ে আছে প্রচলিত সনাতন বা হিন্দু ধর্ম তথা বৈদিক সংস্কৃতির সাথে। কিন্তু? হাঁ, এখানেও বড়োসড়ো একটা কিন্তু রয়ে গেছে।

এই সরল বিভাগ থেকেই যদি আস্তিক ও নাস্তিক সম্পর্কিত ধারণাটি সহজে নির্ধারণ করা যেত তাহলে পাঠক-ধৈর্য্যের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত অবিচার করে এতটা কাসুন্দি ঘাঁটার প্রয়োজন হতো না। কারণ এই দর্শনগুলির মধ্যে আবার অদ্ভুত ধরনের আরেকটি আকর্ষণীয় শ্রেণিবিভাগ রয়ে গেছে। বাহ্যবস্তুবাদী ও ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গি। বাহ্যবস্তুবাদী মতাদর্শীরা আমাদের চারদিকে এই যে প্রত্যক্ষগ্রাহ্য পরিমণ্ডল বা বাহ্যজগত গাছ-পালা নদী-পাথর আকাশ-বাতাস জীব-জন্তু ইত্যাদি রয়েছে তার বাস্তব অস্তিত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করেন না বরং এদের অস্তিত্বকে অনিবার্য সত্য বলেই স্বীকার করেন। অন্যদিকে ভাববাদী মতাদর্শীরা এই ইহজগতকে মনে করেন স্বপ্নদর্শনের মতোই অসত্য অলীক বা মিথ্যা মায়া। আসল সত্য নিশ্চয়ই অন্য কোথাও অন্যলোকে। আমাদের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে হয়ত সরল হিসাবে বলে ফেলতে পারি যে নাস্তিকেরা নিশ্চয়ই বাহ্যবস্তুবাদী হবেন আর আস্তিকেরা হবেন অবশ্যই ভাববাদী। কিন্তু জটিলতার আকর্ষণটা এখানেই যে, এই বাহ্যবস্তুবাদীর দলে যেমন নাস্তিক মতাদর্শী রয়েছেন তেমনি আস্তিকও রয়েছেন বহাল তবিয়তে। একইভাবে ভাববাদীর দলেও আস্তিক নাস্তিক মিলিয়ে কয়েকটি দর্শনের মুখর উপস্থিতি। যেমন, নাস্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যে চার্বাক দর্শন এবং আস্তিক সম্প্রদায়ের ন্যায়, বৈশেষিক ও মীমাংসা দর্শনগুলো হলো দারুণভাবে বাহ্যবস্তুবাদী। আর বাহ্যজগতকে অসত্য বা মিথ্যা মায়া বলে মনে করা চরম ভাববাদী দর্শনের কাতারে রয়েছে নাস্তিক সম্প্রদায়ের জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন এবং আস্তিক সম্প্রদায়ের সাংখ্য, যোগ ও বেদান্ত দর্শন।

জটিলতার এখানেই শেষ নয়। জগত-স্রষ্টা হিসেবে কোনো সর্বজ্ঞ-সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার প্রসঙ্গে আবার দর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্ন রকমের শ্রেণিবিভাগ। জগৎস্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে যারা স্বীকার করেন তাদেরকে বলা হয় ঈশ্বরবাদী এবং যারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না তাদেরকে বলা হয় নিরীশ্বরবাদী। আমাদের কাণ্ডজ্ঞানের বিবেচনা এখানে নিশ্চয়ই বলবে যে আস্তিকেরা অবশ্যই ঈশ্বরবাদী আর নাস্তিকেরা নিরীশ্বরবাদী, তাই না? কিন্তু এখানেও বিধি বাম! ঈশ্বরবাদীর দলে কোনো নাস্তিক দর্শনের উপস্থিতি না থাকলেও নিরীশ্বরবাদীর দলে কট্টর আস্তিক্যবাদী দর্শনের উপস্থিতি আমাদের বিস্ময় না জাগিয়ে পারে না। ঈশ্বরের অস্তিত্বকে চরমভাবে অস্বীকারকারী নিরীশ্বরবাদী দর্শনগুলোর মধ্যে জড়বাদী নাস্তিক চার্বাক দর্শন, ভাববাদী নাস্তিক জৈন ও বৌদ্ধ দশর্নের পাশাপাশি আস্তিক শিরোমণি মীমাংসা দর্শনের উপস্থিতি গোটা ভারতীয় দর্শন জগতের জন্য কেবল যে বিস্ময় তা-ই নয়, দার্শনিক অবস্থানগত কারণেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব খণ্ডনে মীমাংসকেরা একেবারে সম্মুখ সারিতে উপস্থিত হয়ে যেসব বৈপ্লবিক যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তা আধুনিক মনন-দৃষ্টিতেও বিস্ময়কর বলে প্রতীয়মান হয়। এ ব্যাপারে এতটুকু সন্দেহ থেকে থাকলে যুক্তিশীল পাঠকদের উদার বিবেচনার জন্য যথাস্থানে প্রখ্যাত মীমাংসক আচার্যদের উত্থাপিত ক্ষুরধার যুক্তির সামান্য কিছু নমুনা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে প্রায় নিষ্ক্রিয় কেবল নামমাত্রে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ঈশ্বরবাদী দর্শনগুলো হলো বাহ্যবস্তুবাদী আস্তিক ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শন এবং ভাববাদী সাংখ্য দর্শন। যদিও প্রাচীন সাংখ্য-দর্শনকে বিদ্বজ্জনেরা নিরীশ্বর-সাংখ্য বলেও উল্লেখ করে থাকেন। আর চরমভাবে ঈশ্বরবাদী দর্শনগুলো হলো যোগ ও বেদান্ত দর্শন। অবশ্য অদ্বৈত-বেদান্ত দার্শনিকেরা আবার প্রতিপক্ষ দার্শনিকদের যুক্তির জালে আটকে ঈশ্বর প্রসঙ্গ এড়িয়ে নিজেদেরকে কৌশলে ব্রহ্মবাদী হিসেবে দাবী করে থাকেন।

এছাড়া নিত্য আত্মার অস্তিত্ব কিংবা স্বর্গ নরক মোক্ষ ও পরকাল বিষয়ক ধারণা প্রসঙ্গেও দর্শনগুলোর মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে। বিভেদ রয়েছে জগত-সৃষ্টির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গেও। যে উৎস-গ্রন্থ বেদের প্রামাণ্য স্বীকার-অস্বীকারের মধ্য দিয়ে মূলত বৈদিক দর্শনগুলোর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয় সেই বেদের নিত্যতা নিয়েও রয়েছে দর্শনগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক মত-পার্থক্য। এক্ষেত্রে আবার কট্টর বেদপন্থী হিসেবে দর্শনজগতে সুপরিচিত মীমাংসকরা হিন্দু বা বৈদিক ঐতিহ্যে অত্যন্ত প্রভাবশালীও।

অতএব, এতসব জটিলতার নিরসন না করেই কাউকে একবাক্যে নাস্তিক বলে খারিজ করে দেওয়া কিংবা আস্তিক বলে বুকে টেনে নেয়ার বিভ্রান্তিকর প্রবণতা আমাদের একালের ধর্মবাদীদের বাহুল্য রেওয়াজে পরিণত হলেও বর্তমানের সাপেক্ষে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভাবনীয় পর্যায়ে পিছিয়ে থাকা সেকালের প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যে কিন্তু এই নেতিবাচক প্রবণতার নিদর্শন খুব একটা দেখা যায় না। যদিও ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্ণাশ্রম প্রথার উচ্চ-নীচ স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য বর্ণভেদজনিত অমানবিক সমাজ ব্যবস্থা তৎকালীন শ্রমজীবী উৎপাদনমুখী বৃহত্তর জনজীবনকে দারুণভাবে বিষিয়ে তুলেছিল। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রেক্ষিত, যা আমাদের বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক নয়।

৫.
না চাইলেও বিষয়গত কারণে আলোচনাটা যে দর্শনকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে, এতে করে অন্তত এই ধারণাটুকু পেতে সহায়ক হবে যে, আমাদের যাপিত জীবনের মনোজাগতিক ভূমিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা দর্শন-দৃষ্টিটুকু রুদ্ধ হয়ে গেলে আমাদের সম্ভাবনাময় অস্তিত্বটা অন্যের যুক্তিহীনতার ক্রীড়নক হয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মুখগামিতাকেই স্তব্ধ করে দিতে পারে। কীভাবে?

যে পাঠক এ মুহূর্তে এ লেখাটা পড়ছেন, তিনি নিশ্চয়ই কোনো মাধ্যমের সহায়তায় পড়ছেন। হতে পারে কোনো সংবাদপত্র বা গ্রন্থ কিংবা কোনো কম্পিউটারের মনিটরে? যদি বলা হয় যে, না, আপনি আসলে একটা মিথ্যার মধ্যে অবস্থান করছেন, এই যে সংবাদপত্র বা গ্রন্থ বা কম্পিউটার দেখছেন এগুলো আসলে কিছু নয়, সব বিভ্রম, সব মিথ্যা, এমনকি এই লেখাটা যে পড়লেন তাও মিথ্যা বিভ্রম, আপনি আসলে পড়েননিই, তখন কেমন মনে হবে আপনার? এই আবিষ্কারগুলো কি তবে মিথ্যা আবিষ্কার ছিল? কেমন মনে হবে যদি বলা হয়, আপনার পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিজন-ব্যক্তিটি আসলে কেউ নন, কখনো ছিলেনও না, এখনও নেই, তবুও আপনি যে তাঁকে সামনে দেখছেন তা মিথ্যা বিভ্রম বা ব্যক্তি-প্রতীতি মাত্র? তার মানে মিথ্যে বসতির মিথ্যে সংসারে মিথ্যে উত্তরাধিকার বানাচ্ছেন? আপনি হয়ত দুপুরে লাঞ্চ করছেন। কিন্তু বলা হলো, এসব মিথ্যা, কারণ আপনার সামনের ওই ভাত-তরকারি নামক খাদ্যবস্তুগুলি আসলে কিছু নয়, এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই, সবই বিভ্রম, স্বপ্নে যেমন আমরা মিথ্যা বস্তু দেখি সেরকম, তাহলে কি আশ্চর্য হবেন? হয়ত বা নিজের শরীরে চিমটি কেটে উফ করে ওঠে বললেন, কই, আমি তো স্বপ্ন নয় বাস্তবেই দেখছি সব! তাহলে এর কী ব্যাখ্যা থাকতে পারে? ব্যাখ্যাটা আপাত-দৃষ্টিতে কিঞ্চিত নিরস মনে হলেও কিছুটা অন্তর্দৃষ্টির দাবি রাখে।

ভাববাদীরা বলেন, বুদ্ধি বা জ্ঞান হলো প্রতীতি বা চেতনামাত্র। চেতনা না থাকলে যেমন কোনো কিছুরই অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমরা অবগত হই না, তেমনি বাহ্যবস্তু বলে কিছু নেই, আমরা যা দেখি বা অনুভব করি তা আসলে বাহ্যবস্তুর প্রতীতি বা চেতনা কেবল। যে মতবাদে জগতের সমস্ত জ্ঞান বা প্রতীতিকে মিথ্যে বলে ঘোষণা করা হয়, আপাত-দৃষ্টিতে মতবাদটিকে অতি-অদ্ভুত মনে হতে পারে। কেননা, রজ্জুতে সর্পজ্ঞান অবশ্যই ভ্রম, কিন্তু রজ্জুতে রজ্জুজ্ঞান কী করে ভ্রম হতে পারে? কিন্তু প্রকৃত ভাববাদী দার্শনিকের পক্ষে এ জাতীয় মতবাদের প্রস্তাব অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ভাববাদী মতে বহির্জগত বলে কিছু নেই, বাহ্যবস্তু বলে কিছু নেই। অথচ আমাদের সাধারণ প্রতীতি বলতে যে বাহ্যবস্তুর প্রতীতি বুঝি, ভাববাদীদের মতে তা হলো যা নেই তারই প্রতীতি। অবস্তুতে বস্তুর প্রতীতি। অতএব এ সব মিথ্যা। তাদের মতে রজ্জুতে সর্পজ্ঞান মিথ্যা তো বটেই, কিন্তু জগতে রজ্জু বলে সত্যিই যদি কিছু থাকত তাহলে রজ্জুতে রজ্জুজ্ঞানও সত্য হতে পারত। তথাকথিত রজ্জুও শেষপর্যন্ত স্বপ্নপ্রতীত বিষয়ের মতোই মিথ্যা, অথচ আমাদের রজ্জুজ্ঞান রজ্জুর বাহ্যত্বরূপের জ্ঞান। কিন্তু ভাববাদীদের সিদ্ধান্ত হলো, সমস্ত বুদ্ধিই নিজের অবাহ্য আকারকে বাহ্যত্বরূপে বিষয় করায় মিথ্যাবুদ্ধি। তাঁদের মতে, জ্ঞানের অযথার্থত্ব বা মিথ্যাত্ব স্বতঃসিদ্ধ। আর অযথার্থত্ব স্বতঃসিদ্ধ হলে স্বীকার করতে হবে যে জ্ঞানমাত্রই ভ্রম বা অপ্রমা।
এর দার্শনিক ব্যাখ্যা হলো, যে কারণ বা কারণ-সামগ্রির ফলে জ্ঞানের উৎপত্তি ও জ্ঞপ্তি বা প্রকাশ সেই একই কারণেই অপ্রমারও উৎপত্তি ও জ্ঞপ্তি হলে কোনো জ্ঞানের পক্ষেই যথার্থ হবার সুযোগ থাকে না, জ্ঞানমাত্রেই স্বতঃসিদ্ধভাবে মিথ্যা হতে বাধ্য। ফলে তথাকথিত যথার্থজ্ঞানও আসলে অযথার্থই।

উপরিউক্ত ভাববাদী ব্যাখ্যা অনুসারে লোকব্যবহারমূলক সমস্ত প্রতীতিই মিথ্যা, বিষয়-বস্তু সবই মিথ্যা, কেননা তা অবস্তুতে বস্তুর প্রতীতি, চেতনাপদার্থেরই বাহ্যবস্তুরূপে প্রতীতি। আপনি যে ভাত-তরকারি নিয়ে খেতে বসেছেন এবং খাচ্ছেন তা আসলে ভাত-তরকারি নামক কোনো বস্তু নয়, আপনার বস্তুগত জ্ঞান আসলে মিথ্যা জ্ঞান, তা কেবলই চেতনাগত বিভ্রম, বাস্তবে কিছুই নেই। কেননা তা সবই মিথ্যা প্রতীতি। একটা মিথ্যা মায়াময় জগতে মিথ্যা আমাদের মিথ্যা বসবাস। এই অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গি যে তীব্র ভাববাদে আকীর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে প্রশ্ন আসে, এই বাহ্যজগতে অবস্থান করে দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মাদির প্রত্যক্ষ উদ্যাপন করেও ভাববাদীরা এই যে প্রমাণ-প্রমেয়স্বরূপ বাহ্যজগতটাকে ‘অধ্যাস’ বা মিথ্যা-মায়া বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তাহলে তাদের কাছে প্রাত্যহিক লোকব্যবহারের প্রত্যক্ষতা কি অর্থহীন, মিথ্যা? ভাববাদী দর্শন বস্তুত তা-ই বলে। উল্লেখ্য, ভারতীয় দর্শনের দৃষ্টিতে জগতের যাবতীয় বস্তু বা বিষয় তা সত্যই হোক আর মিথ্যাই হোক সবই প্রমাণ-প্রমেয়র অন্তর্গত। ভাববাদী দার্শনিকেরা এই প্রমাণ-প্রমেয়স্বরূপ জগতটাকেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে উৎসাহী।

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বিচারে এই ভাববাদী সম্প্রদায়ের বিপরীত-ধর্মী অবস্থানে রয়েছেন বাহ্যবস্তুবাদী সম্প্রদায়। এরা বাহ্যজগতকে সত্য বলে স্বীকার করেন। তবে তার যথার্থতা প্রমাণ হয় অন্য আরেকটি বাহ্যজ্ঞান দ্বারা। তাদের মতে, জ্ঞান-জ্ঞপ্তির কারণ-সামগ্রি ছাড়া অন্য কিছুর ফলে যথার্থ জ্ঞান বা প্রমার জ্ঞপ্তি বা প্রকাশ ঘটে। কেননা, জ্ঞান-জ্ঞপ্তির কারণ-সামগ্রির সাথে প্রবৃত্তি-সামর্থ্য যুক্ত থেকে প্রমা বা যথার্থ জ্ঞানের প্রকাশ হয়। প্রবৃত্তি-সামর্থ্য মানে প্রয়োগক্ষেত্রে সাফল্যদানের ক্ষমতা। অর্থাৎ, একটি জ্ঞান প্রমা বা যথার্থ কিনা তা জানা যায় কী করে? জ্ঞানটির প্রবৃত্তি-সামর্থ্য আছে কিনা তা থেকে। জ্ঞানটি সফল-প্রবৃত্তির জনক হলেই তার প্রামাণ্য নিশ্চয় সম্ভব হয়। যেমন, জলে যে-জল দর্শন সেই জ্ঞানকে অবলম্বন করে বাস্তবিকই তৃষ্ণা নিবারণ সম্ভব হয় অর্থাৎ, এই জ্ঞান তৃষ্ণা-নিবারণ নামের সফল-প্রবৃত্তির জনক হয় এবং সেই কারণেই তা যথার্থ বলে জ্ঞাত হয়। তাই প্রামাণ্যের জ্ঞপ্তি বা প্রকাশ জ্ঞান-জ্ঞপ্তির কারণ-সামগ্রি ছাড়াও অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল। আপনার সামনে ভাত-তরকারি জাতীয় বস্তুগুলো যে প্রকৃতই খাদ্যবস্তু এই জ্ঞানটি যথার্থ বা প্রামাণ্য নিশ্চিত হয় স্বাদগ্রহণ বা ক্ষুধানিবারণস্বরূপ প্রবৃত্তি-সমর্থ হলে।
একইভাবে বাহ্যবস্তুবাদী মতে, উৎপত্তি বা জ্ঞপ্তি কোনো দিক থেকেই জ্ঞানকে স্বতঃসিদ্ধভাবে অপ্রমা বা অযথার্থও বলা যায় না। কেননা, তাঁদের মতে, যে-কারণসামগ্রি থেকে জ্ঞানের উৎপত্তি হয় তার থেকেই অপ্রমার উৎপত্তি হতে পারে না, তার বদলে ‘দোষ’ নামের একটি বাড়তি কারণ থেকেই অপ্রমার উৎপত্তি। এবং যে-কারণসামগ্রি থেকে জ্ঞান-জ্ঞপ্তি অর্থাৎ জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে তা থেকেই অপ্রমা-জ্ঞপ্তি বা অপ্রমার প্রকাশ ঘটে না, তার পরিবর্তে ‘প্রবৃত্তি-অসামর্থ্য’ বলে স্বতন্ত্র কারণ থেকে অপ্রমার জ্ঞপ্তি বা প্রকাশ হয়। অর্থাৎ, অপ্রামাণ্যের উৎসে এই ‘দোষ’ বলে বাড়তি কারণ বর্তমান। অতএব, জ্ঞান-কারণ-বাহ্য কারণে অপ্রামাণ্যের উৎপত্তি। যেমন, প্রত্যক্ষজ্ঞানের কারণ-সামগ্রি বলতে ইন্দ্রিয়াদি। কোনো কিছুর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করতে হলে আমাদের চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা ইত্যাদি ইন্দ্রিয়কে কারণ-সামগ্রি হিসেবে থাকতে হয়। কিন্তু এই ইন্দ্রিয়ে যদি কোনো দোষ থাকে তাহলে জ্ঞানটি অপ্রমা হয়। উদাহরণস্বরূপ দার্শনিকেরা বলেন, পিত্তদোষ থাকলে শ্বেত শঙ্খ পীত বলে প্রতীত হয়, চক্ষুদোষ থাকলে একই চন্দ্র দ্বিচন্দ্র বলে প্রতীত হয়। বা প্রয়োজনীয় আলোর উপস্থিতি না থাকলে রজ্জুকে সর্প বলে ভ্রম হয়। অতএব, অপ্রামাণ্য এই দোষ-জনিত। জ্ঞান-কারণ-সামগ্রিজনিত নয়।
তাহলে ভাববাদী ও বাহ্যবস্তুবাদী দর্শনের জ্ঞানতাত্ত্বিক পার্থক্যটি নিশ্চয়ই আঁচ করতে পারছি আমরা। বাহ্যবস্তুবাদীরা বাহ্যজগতকে অস্বীকার তো করেনই না, বরং বাহ্যজগতবিষয়ক জ্ঞানকে প্রবৃত্তি-সামর্থ্যের ভিত্তিতে প্রামাণ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তাদের মতে জ্ঞাত জ্ঞান স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রমাও নয় অপ্রমাও নয়। প্রমা বা যথার্থতা নির্ণীত হয় প্রবৃত্তি-সামর্থ্যের ভিত্তিতে, আর অপ্রমা বা অযথার্থতা নির্ণীত হয় প্রবৃত্তি-অসামর্থ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু ভাববাদীরা এই বাহ্যজগত বিষয়ক জ্ঞানমাত্রকে একবাক্যে মিথ্যা অলীক বলে প্রতিপন্ন করেন। তবে ভাববাদীরা বাহ্যজগতটাকে ‘অধ্যাস’ বা মিথ্যা-মায়া বলে উড়িয়ে দিলেও অর্থাৎ সমস্ত জ্ঞানকেই স্বতঃসিদ্ধভাবে অপ্রমা বিবেচনা করলেও তথাকথিত অর্থে এবং ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কোনো জ্ঞানকে যথার্থ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ নিজের জলজ্যান্ত অস্তিত্ব ও নিজের প্রবৃত্তিকে কত আর মিথ্যা বলে অস্বীকার করে থাকা যায়! তাই তথাকথিত সত্য হিসেবে শেষপর্যন্ত মেনে নিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাদের ব্যাখ্যাটা আকর্ষণীয় বটে।
তাদের মতে, পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রমাণ-প্রমেয় মিথ্যা স্বীকৃত হলেও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা নয়। যেমন, ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে রজ্জুতে রজ্জুজ্ঞান সত্য, রজ্জুতে সর্পজ্ঞান মিথ্যা। অর্থাৎ, রজ্জুতে রজ্জুজ্ঞান শেষ পর্যন্ত মিথ্যা হলেও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথাকথিত অর্থে সত্য। ভাত-তরকারি খাদ্যবস্তুর জ্ঞান প্রকৃত অর্থে মিথ্যা হলেও ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথাকথিত অর্থে সত্য। কারণ তা আপনি খাচ্ছেন, স্বাদ উপলব্ধি করছেন। অর্থাৎ, তাঁদের মতে দার্শনিক বিচারে সমস্ত জ্ঞানই অযথার্থ, তবুও ব্যবহারিক জীবনের দিক থেকে কোনো কোনো জ্ঞানকে তথাকথিত অর্থে যথার্থ বলে গ্রহণ করা হয়। কোনগুলিকে? যেগুলির প্রবৃত্তিসামর্থ্য বর্তমান। তার মানে, ভাববাদী মতবাদটির সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো, দার্শনিক বিচারে সমস্ত জ্ঞানই জ্ঞান হিসেবে ভ্রান্ত হলেও যে-জ্ঞান কর্মজীবনে কার্যকরি হয় তাকে ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে তথাকথিত অর্থে যথার্থজ্ঞান বলা হবে। নইলে লোকব্যবহার জীবনযাত্রা সবই যে অর্থহীন হয়ে যায়! না মেনে উপায় কী!

অন্যদিকে বাহ্যবস্তুবাদীরা বলছেন যে, কোনো জ্ঞানই স্বতঃসিদ্ধভাবে সত্য বা মিথ্যা বলা যাবে না, তা নির্ভর করবে ওই জ্ঞানের জ্ঞানবাহ্য অন্য একটি জ্ঞান-কারণের উপর, সেটি হলো প্রবৃত্তি-সামর্থ্য বা প্রবৃত্তি-অসামর্থ্য। যেমন, মরীচিকা জল নয় কারণ তার জল-রূপ জ্ঞানের প্রবৃত্তি-সামর্থ্য নেই। এটা ভ্রম। তবে এই ভ্রমজ্ঞানের ক্ষেত্রেও বিষয়টা কিন্তু অলীক বা অসৎ নয়, সত্যই। অর্থাৎ জ্ঞান নির্বিষয়ক হয় না। কেননা মরীচিকায় জল-জ্ঞান অপ্রমা বা মিথ্যা হলেও বিষয় হিসেবে জল কিন্তু অলীক বিষয় নয়। নইলে আমরা জলের বিষয়টা ভাবলাম কী করে বা কল্পনা করলাম কী করে!

এখানে আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ভাববাদীরা জগতকে যে মায়া-মরীচিকা বা স্বপ্ন-প্রতীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখান, বাহ্যবস্তুবাদী দার্শনিকদের মতে এই দৃষ্টান্ত ব্যবহারের যুক্তিও ভাববাদীদের নিজেদের বিপক্ষেই যায় বলে তারা মনে করেন। কেননা প্রমা বা প্রকৃষ্ট জ্ঞান বলতে সেই জ্ঞানকেই বোঝায় যা অন্য জ্ঞান দ্বারা বাধিত বা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। সেক্ষেত্রে স্বপ্ন-প্রতীতি যে মিথ্যা জ্ঞান সেটা উপলব্ধি হয় জাগ্রত হয়ে যখন স্বপ্ন-প্রতীতির কথা স্মরণ হয়। স্বপ্ন-দর্শনকারী যতক্ষণ মিথ্যা স্বপ্নে অবস্থান করেন ততক্ষণ তার কাছে সেটাই সত্য বলে প্রতীত হবে। সেটা যে মিথ্যা-স্বপ্ন তা উপলব্ধির জন্যেই পরবর্তী বাধক-জ্ঞান হিসেবে জাগ্রত উপলব্ধির প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভাববাদীরা তো বলেন যে জগতটাই মিথ্যা, আমি মিথ্যা আপনি মিথ্যা, যা দেখছি তা মিথ্যা, যা উপলব্ধি করছি তাও মিথ্যা, সবই মিথ্যা। তাহলে তিনি কোন জাগ্রত বা সত্য প্রতীতিতে অবস্থান করছেন?

রসিক পাঠক হয়ত এবার কিঞ্চিৎ অসহিষ্ণু হয়ে সেই প্রশ্নটিই করতে পারেন, আস্তিক্য-নাস্তিক্যর সাথে জ্ঞানের প্রামাণ্য-অপ্রামাণ্য জাতীয় দর্শন-তত্ত্বের সম্পর্ক কোথায়? নিঃসন্দেহে যথার্থ প্রশ্ন। কিন্তু জ্ঞানের প্রামাণ্য-অপ্রামাণ্য বিষয়ক এই দার্শনিক তাত্ত্বিক বিতর্কটা আসলে আমাদের কোন দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা কি উপলব্ধি করতে পারছি? প্রকৃতপক্ষে লৌকিক ও অলৌকিক বিষয়ক যে ধারণা-প্রপঞ্চটি আমাদের চিন্তাজগতে এক অনির্বচনীয় সত্তা নিয়ে অবস্থান করছে তারই একটি নিষ্পত্তি-প্রক্রিয়া মাত্র। একইসাথে এটিকে ইহকাল ও পরকাল বিষয়ক বিতর্ক বললেও বোধকরি অত্যুক্তি হবে না। তাই এ বিতর্কটা যে আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন নয়, আস্তিক ও নাস্তিক শব্দ দুটোর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালেই তা অনেকাংশে স্পষ্ট হয়ে ওঠবে আশা করি। কিন্তু তার আগে অনিবার্যভাবেই আমাদেরকে আরেকটি দার্শনিক সমস্যা অবলোকন করে যেতে হয়, যা একাধারে আকর্ষণীয় ও বিতর্কিতও। নইলে বক্ষ্যমান আলোচনাটি কার্যত অসম্পূর্ণ হিসেবে অস্পষ্ট হয়ে যায়। সেটি হলো কোন সর্বজ্ঞ-সর্বশক্তিমান স্রষ্টা নামক অদৃশ্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব থাকা-না-থাকা বিষয়ক দার্শনিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ধারণাগত দ্বন্দ্ব ও অবস্থানের মতদ্বৈধতা।

তবে এ পর্যায়ে এসে বিচক্ষণ পাঠককে বিশেষভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, দর্শন-তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবে বক্ষ্যমান লেখাটিকে কেউ যেন ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ছকে ফেলে নিজের মানস-চেতনাকে অহেতুক উৎপীড়িত না করেন এবং উদারনৈতিক যুক্তিশীল অবস্থান থেকেই বিভিন্ন দার্শনিক-মতের নিজ নিজ যুক্তি-তর্কের উপস্থাপন হিসেবে উপভোগ করেন।

৬.
প্রচলিত অর্থে আমাদের কাছে কথিত জগত-স্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীদেরকে আস্তিক এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসীদেরকে নাস্তিক হিসেবে মনে হলেও আস্তিক-নাস্তিক বিষয়ক ধারণার নিজস্ব উদ্গাতা প্রাচীন ভারতীয় দর্শনেই তার কোন সমর্থন আমাদের চোখে পড়ে না। বরং সেখানে ঈশ্বর বিশ্বাসীদেরকে ঈশ্বরবাদী এবং ঈশ্বরে অবিশ্বাসীদেরকে বড়জোর নিরীশ্বরবাদী হিসেবেই চিহ্নিত হতে দেখা যায়। কেননা সেখানে দেখা যায় যে, আস্তিক-নাস্তিক বিভেদের প্রধান বিবেচনাই হচ্ছে স্মৃতিশাস্ত্র বেদের প্রামাণ্যে নিরঙ্কুশ বিশ্বাস ও অবিশ্বাস। এবং তা থেকেই দর্শনগুলোর প্রাথমিক পরিচয়ে আস্তিক-দর্শন ও নাস্তিক-দর্শন নামকরণের উদ্ভব, যা এখনো বহমান। ফলে নিরীশ্বরবাদী দর্শনগুলোর পঙ্ক্তিতে একদিকে চার্বাক, জৈন ও বৌদ্ধদর্শনের মতো নাস্তিক দর্শনগুলোর স্বাভাবিক অবস্থানের পাশাপাশি এই নিরীশ্বরবাদিতায় মীমাংসা-দর্শনের মতো কট্টর আস্তিক দর্শনের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে ঈশ্বরে বিশ্বাস-অবিশ্বাস আদৌ আস্তিক্য-নাস্তিক্য বিচারের মাপকাঠি নয়। ঈশ্বর-মত খণ্ডনের যুক্তি বিচারে এই নিরীশ্বরবাদী দর্শনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মতৈক্যে অদ্ভুত সামঞ্জস্য থাকলেও অন্যান্য অনেক বিষয়ে এদের মধ্যেই পরস্পর মতবিরোধ এত তীব্র ও মৌলিক যে, কোনোভাবেই এদেরকে এক পঙক্তিতে ফেলার উপায় নেই। ভাববাদ-বাহ্যবস্তুবাদ প্রসঙ্গে ইতোপূর্বের আলোচনাতেই আমরা এদের এবং অন্য ঈশ্বরবাদী দর্শনগুলোর অবস্থানের ভিন্ন বিন্যাস অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। একইভাবে অন্যান্য প্রসঙ্গেও আবার তাদের দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থানের পুনর্বিন্যাস রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে আমাদের প্রসঙ্গ ঈশ্বর বিষয়ক।

নিরীশ্বরবাদিতায় নাস্তিক দর্শনগুলোর অবস্থান আমাদের কাছে সহজেই অনুমেয়, এরা ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন। কিন্তু একান্ত বেদনির্ভর প্রচণ্ড আস্তিক দর্শন হয়েও মীমাংসক দার্শনিকেরা যে তাঁদের নিজস্ব যৌক্তিক অবস্থান থেকে কতটা চরম নিরীশ্বরবাদী হতে পারেন তারই সামান্য কিছু নমুনা আমাদের বিবেচনাবোধকে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে সংক্ষেপে উপস্থাপন করতে পারি। এ প্রেক্ষিতে আমাদের এই আলোচনার উৎস হলো মহর্ষি জৈমিনির মীমাংসাসূত্রের প্রখ্যাত ভাষ্যকার শবরস্বামীর ভাষ্য এবং তার ব্যাখ্যাকার দার্শনিক প্রভাকর মিশ্র ও কুমারিল ভট্টের উত্থাপিত যুক্তি। তবে এ বিষয়টাতে বিভিন্ন দার্শনিক সম্প্রদায়ের পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান সাপেক্ষে তাঁদের স্ব-স্ব যুক্তি-বিস্তার এত জটিল-সম্বন্ধযুক্ত ও বিশাল-বিস্তৃত যে, তা থেকে তুলে আনা গুটিকয় নমুনা দিয়ে ক্ষণিক স্বাদটুকু হয়ত আঁচ করা যেতে পারে, বিষয়ের গুরুত্ব ও গভীরতা পরিমাপ করা আদৌ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পণ্ডিত দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়-কৃত ‘ভারতীয় দর্শন’ এবং মহামহোপাধ্যায় হেমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়-কৃত ‘বৈদিকধর্ম ও মীমাংসা-দর্শন’ গ্রন্থ দুটিকে এ বিষয়ে আপাত সহায়কসূত্র হিসেবে নেওয়া হয়েছে।

ঈশ্বর প্রসঙ্গে এ-জাতীয় কোনো স্রষ্টার কল্পনা যে অবাস্তব সে-বিষয়ে মীমাংসক শবরের যুক্তি হলো, তৎ-সম্বন্ধে প্রমাণাভাব- অর্থাৎ, কোনো প্রমাণের সাহায্যেই স্রষ্টার সত্তা সিদ্ধ হতে পারে না। প্রত্যক্ষ প্রমাণের দ্বারা তাঁর অস্তিত্ব সিদ্ধ নয়, কেননা এ-জাতীয় স্রষ্টারা প্রত্যক্ষ হয় না। প্রত্যক্ষ প্রমাণের দ্বারা সিদ্ধ নয় বলেই অন্য কোনো প্রমাণও তাঁর সত্তার প্রতিপাদক হতে পারে না, কারণ অপরাপর অনুমান উপমান ইত্যাদি প্রমাণ প্রত্যক্ষমূলক। কেননা, যুক্তিন্যায় মতে-‘সাধ্যের সাথে নিয়ত সম্বন্ধবিশিষ্ট কোনোও ধর্ম যদি প্রত্যক্ষ গ্রাহ্য না হয়, তাহলে সেই সাধ্য প্রমাণান্তরের বিষয় হতে পারে না।’

ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রতিপাদনার্থে ঈশ্বরবাদী নৈয়ায়িক দার্শনিকদের উপস্থাপিত যুক্তির মধ্যে প্রধান যুক্তি হলো, জগৎ-স্রষ্টা হিসেবে ঈশ্বরের সত্তা অবশ্য-স্বীকার্য; কারণ মাটি, জল প্রভৃতি সমস্ত সংহত বা জটিল বস্তুই কার্যাত্মক, কেননা এগুলি অবয়বদ্বারা গঠিত; এবং কার্য বলেই এগুলির কারণ থাকতে বাধ্য এবং সেই কারণ কোনো বুদ্ধিমান কর্তা না হয়ে পারেন না। সহজ কথায়, অবয়ব দ্বারা গঠিত সমস্ত বস্তুই কার্য এবং কার্য বলেই কার্য-কারণ তত্ত্ব অনুযায়ী তার কারণও থাকবে। যেহেতু মাটি, জল প্রভৃতি পরমাণু নামের অবয়ব দ্বারা গঠিত সেহেতু এগুলিও কার্য। তাই পরমাণুপুঞ্জ থেকে সুসমঞ্জস্য ও নির্দিষ্ট আকারে ক্ষিতি বা মাটি, জল প্রভৃতি সংহত বা জটিল বস্তুগুলি কোনো বুদ্ধিমান কর্তার নিয়ন্ত্রণ ব্যতীত উৎপন্ন হতে পারে না; অতএব এই বুদ্ধিমান কর্তা অর্থে জগতের নিমিত্তকারণ হিসেবে সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর অনুমেয়-তাঁরই নিয়ন্ত্রণে সৃষ্টি ও প্রলয় ঘটে।
এর উত্তরে নিরীশ্বরবাদী মীমাংসক প্রাভাকররা বলেন, জাগতিক বস্তুগুলি অবশ্যই অবয়ব দ্বারা গঠিত, অতএব এগুলির উৎপত্তি ও বিনাশ আছে। কিন্তু তাই বলে সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো সৃষ্টি বা প্রলয়ের কথা কল্পনামাত্র; অতএব জগতের সৃষ্টি ও প্রলয়ের নিয়ন্ত্রণকর্তা ঈশ্বরের পরিকল্পনাও অবান্তর। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক বস্তুগুলির দৃষ্টান্তে সুস্পষ্টভাবেই অভিজ্ঞতা হয় যে শুধু প্রাকৃতিক কারণেই সেগুলির জন্ম হচ্ছে-যেমন মানুষ ও জীবজন্তুর দেহ শুধু তাদের পিতামাতার দরুনই উৎপন্ন হয়। এবং এ-জাতীয় অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে অতীত ও ভবিষ্যতের বস্তুগুলিরও উৎপাদন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অতএব, জাগতিক বস্তুগুলির স্রষ্টা হিসেবে কোনো অতি-প্রাকৃত নিয়ন্ত্রাতার কথা অনুমিত হয় না।

নৈয়ায়িকরা আরো দাবি করেছেন, ব্যক্তির ধর্মাধর্ম পরিচালনা করার জন্য সাধারণভাবে কোনো পরিচালক অর্থাৎ ঈশ্বর স্বীকারযোগ্য।
তার উত্তরে প্রাভাকররা বলেন, প্রথমত যার ধর্মাধর্ম সেই এ-জাতীয় পরিচালক হতে পারে, অতএব ঈশ্বর বলে স্বতন্ত্র পরিচালকের প্রসঙ্গ অবান্তর। দ্বিতীয়ত, একের ধর্মাধর্ম সংক্রান্ত জ্ঞান অপর কারুর পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়; অতএব তথাকথিত ঈশ্বরের পক্ষে কোনো মানবের ধর্মাধর্ম জানাই সম্ভব নয়।
প্রাভাকররা আরো বলেন, তথাকথিত ঈশ্বরের পক্ষে মানবাদির ধর্মাধর্ম সংক্রান্ত জ্ঞানই যদি সম্ভব না হয় তাহলে তাঁর পক্ষে এই ধর্মাধর্মের পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ওঠে না। তাছাড়া, উক্ত জ্ঞানের সম্ভাবনা থাকলেও ঈশ্বরের পক্ষে ধর্মাধর্ম পরিচালনা করা সম্ভব হতো না। কেননা, পরিচালনার জন্য সম্বন্ধ প্রয়োজন; কিন্তু ঈশ্বরের সঙ্গে মানবাদির ধর্মাধর্মের কোনো সম্বন্ধ অসম্ভব। ন্যায়মতেই সম্বন্ধ মাত্র দুরকম হতে পারে- সংযোগ ও সমবায়। ঈশ্বরের সঙ্গে ধর্মাধর্মর সংযোগ সম্ভব নয়; কারণ ধর্মাধর্ম হলো গুণ এবং ন্যায়-মতেই শুধু দ্রব্যের সঙ্গে দ্রব্যের সংযোগ সম্ভব। ঈশ্বরের সঙ্গে ধর্মাধর্মের সমবায়-সম্বন্ধও সম্ভব নয়; কারণ এই ধর্মাধর্ম মানবাদিরই গুণ, অতএব মানবাদির সঙ্গেই তার সমবায় হতে পারে-মানবাদির গুণের সঙ্গে ঈশ্বরের সমবায় অসম্ভব। কেননা ন্যায়মতে, কেবল সংশ্লিষ্ট দ্রব্যের সঙ্গেই তার গুণের সমবায়-সম্বন্ধ সম্ভব।

এক্ষেত্রে নৈয়ায়িকরা সূত্রধর বা ছুতোরের উপমা দিতে পারেন। অবশ্যই দেহবিশিষ্ট বলে এই ছুতোরের সঙ্গে তার যন্ত্রপাতির এবং যন্ত্রপাতির সঙ্গে কাষ্ঠাদি বস্তুর সংযোগ সম্ভব; কিন্তু তথাকথিত ঈশ্বর দেহবিহীন বলেই পরিকল্পিত, অতএব তাঁর দৃষ্টান্তে এ জাতীয় প্রশ্ন ওঠে না।
প্রাভাকরা আরো বলেন, নৈয়ায়িকরা এ কথাও বলতে পারেন না যে পরমাণুসমূহ ঈশ্বরের ইচ্ছায় পরিচালিত হয়ে জগৎ সৃষ্টি করে। কারণ এ-জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনার কোনো দৃষ্টান্তই অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায় না। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, একমাত্র দেহস্থ আত্মাই দেহকে পরিচালনা করতে পারে; কিন্তু পরমাণুসমূহ বা মানবীয় ধর্মাধর্মও ঈশ্বরের দেহ নয়, অতএব ঈশ্বরের পক্ষে এগুলির পরিচালনাও সম্ভব নয়। আর যদিই বা তর্কের খাতিরে এগুলিকে ঈশ্বরের দেহ বলেই পরিকল্পনা করা হয় তাহলেও এগুলির নিয়ন্ত্রণের জন্য ঈশ্বরের ইচ্ছা এবং প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করতে হবে এবং সে ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা যদি নিত্য হয় তাহলে পরমাণুসমূহের সৃষ্টিকার্যকেও, অর্থাৎ জগতের সৃষ্টিকেও, নিত্য বা নিয়ত ঘটনা বলে স্বীকার করতে হবে।
ঈশ্বরবাদী ন্যায়-বৈশেষিকরা বলে থাকেন, মানবদেহ বুদ্ধিহীন বলেই তার নিয়ন্ত্রণের জন্য এক বুদ্ধিমান স্রষ্টা বা ঈশ্বর অনুমেয়।
উত্তরে নিরীশ্বরবাদী মীমাংসক প্রাভাকররা বলছেন, নিয়ন্ত্রণ-কার্য উদ্দেশ্যবিহীন হতে পারে না; কিন্তু এই তথাকথিত নিয়ন্ত্রণের পেছনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য কী হতে পারে? তাছাড়া, নৈয়ায়িকরা যে যুক্তিবলে বুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রণকর্তা প্রমাণ করতে চান সেই যুক্তি অনুসারেই উক্ত নিয়ন্ত্রণকর্তা দেহ-বিশিষ্ট বলেই প্রমাণিত হবেন। কেননা, কাষ্ঠাদি বস্তুর উপর সূত্রধর-এর নিয়ন্ত্রণ-কার্যর দৃষ্টান্ত অনুসারেই তাঁরা জগৎ-স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণ প্রমাণ করতে চান; কিন্তু সূত্রধর দেহবিশিষ্ট, তারই উপমান অনুসারে কল্পিত ঈশ্বরও দেহবিশিষ্ট বলে প্রমাণিত হবেন। কিন্তু দেহবিশিষ্ট কারুর পক্ষেই পরমাণু বা ধর্মাধর্মের মতো সূক্ষ্ম বিষয়কে বুদ্ধিসম্মত এবং কার্যকরিভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এবং যদিই বা তা সম্ভব হয় তাহলে দেহবিশিষ্ট বলেই তাঁর পরিচালনার জন্য আরো কোনো স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ-কর্তার কথা স্বীকৃত হতে বাধ্য, আবার এই স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ-কর্তার পরিচালনার জন্য অপর কোনো এক নিয়ন্ত্রণ-কর্তার কথা স্বীকৃত হতে বাধ্য এবং এইভাবে অনবস্থা-দোষ ঘটবে।

এইভাবে প্রাভাকররা স্রষ্টা বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব খণ্ডন করেছেন। এবং তাঁরা সৃষ্টি বা প্রলয় মানেন নি বলেই বিশ্বজগৎ তাঁদের কাছে নিয়ত পরিবর্তনশীল ঘটনাস্রোত বলেই প্রতীত হয়েছে। তবে স্বকীয় দার্শনিক গুরুত্বের দিক থেকে বিখ্যাত নিরীশ্বরবাদী মীমাংসক কুমারিল ভট্টের যুক্তিগুলি সাধারণভাবে ভারতীয় দর্শনের পটভূমিতে প্রায় বৈপ্লবিক বলে প্রতীত হতে পারে। কুমারিল বস্তুত নিরীশ্বরবাদের সূচনা করেছেন সর্বজ্ঞতা-খণ্ডনের দ্বারা।

সর্বজ্ঞ মানে যিনি বিশ্বজগতের ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সবকিছু জানেন। কী করে জানেন? আমরা মানুষ, তাই মানুষ যেভাবে জানে, সেভাবে জানার বাইরে অন্য কোনো অতিমানবিক উপায় যদি থাকে তা আমরা কী করে জানবো, আর না জানলে কী করে বলবো আমাদের মানববুদ্ধির অগোচরে এক সবজান্তা অতিমানব আছেন যিনি কোনো অতিমানবিক উপায়ে বিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা প্রতিটি অণুপরমাণু ও প্রতিটি বীজাণু পর্যন্ত আপন নখদর্পণে প্রত্যক্ষ করেন। জানার উপায়কে বলে প্রমাণ, যেমন প্রত্যক্ষ ও অনুমান। প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপায় আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়, চোখ, কান, জিহ্বা প্রভৃতি। জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলিকে বলে প্রত্যক্ষপ্রমাণ যা দ্বারা প্রত্যক্ষ জ্ঞান উৎপন্ন হয়। প্রত্যক্ষ কেবল বর্তমানগ্রাহী, যেমন চক্ষু শুধু বর্তমান বস্তুকেই গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু অতিদূর স্থিত, অন্তরালিত, অতীত বা ভবিষ্যৎ বস্তুকে গ্রহণ করতে পারে না। এখন যদি কেউ সর্বজ্ঞ হন, তিনি কোন ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু প্রত্যক্ষ করবেন?
মানুষের ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা প্রকৃতির নিয়মে সীমাবদ্ধ। তাই কোনো ইন্দ্রিয়ের দ্বারাই বিশ্বের সবকিছুই জানা সম্ভব নয়। ‘সব’ ইন্দ্রিয়ের ‘অবিষয়’ অর্থাৎ অগোচর- এটাই স্বভাবনিয়ম বা প্রাকৃতিক নিয়ম। কেউ সর্বজ্ঞ হলে তাকে হতে হবে এই প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম। আমরা কিন্তু ব্যতিক্রম নই। তাহলে আমরা কী করে বুঝবো যে এমন কোনো সত্তাপুরুষ আছেন যিনি স্বভাবনিয়মের ব্যতিক্রম? বুঝতে হলে আমাদেরও ব্যতিক্রম হতে হবে। তাই কুমারিল বিদ্রূপ করে বলেছেন (শ্লোকবার্তিক-২/১২২)-যিনি কোনো সর্বজ্ঞ পুরুষ আছে বলে কল্পনা করেন তিনি বোধহয় চোখ দিয়ে বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। অর্থাৎ চোখের দ্বারা দেখে, কানের দ্বারা শোনে, জিহ্বার দ্বারা রসগ্রহণ-এই প্রাকৃতিক নিয়মের উর্ধ্বে তিনি বিচরণ করেন। একথাই কুমারিল আরেকটি সাধারণ সূত্রাকারে উপস্থিত করেছেন- যে নিজে অসর্বজ্ঞ সে অন্য কাউকে সর্বজ্ঞ বলে সাব্যস্ত করতে পারে না। ( শ্লোকবার্তিক- ২/১৩৫)

ঈশ্বরবিশ্বাসীরা কিন্তু ঈশ্বরকে আক্ষরিক অর্থেই সর্বজ্ঞ মনে করেন, অর্থাৎ তাদের মতে ঈশ্বর বিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু প্রত্যক্ষ করেন। যোগদর্শনে যোগভাষ্যকার বেদব্যাস ঈশ্বরানুমান প্রণালী প্রমাণ করেন বিচিত্রভাবে-
কেউ স্বল্পজ্ঞানী, কেউ তার তুলনায় অধিকতর জ্ঞানী, কেউ আরও অধিকতর জ্ঞানী; সুতরাং এমন একজন আছেন যিনি অধিকতম জ্ঞানী। ইনি হলেন নিরতিশয় জ্ঞানী, যার জ্ঞানের চেয়ে বেশি জ্ঞান আর সম্ভব নয়; সুতরং তিনি সর্বজ্ঞ। সবজান্তার ওপর আর কোনো জ্ঞানী থাকা সম্ভব নয়। এহেন সর্বজ্ঞ পুরুষই হলেন ঈশ্বর। (যোগভাষ্য-১/২৫)

মানুষের জ্ঞানের তারতম্য থেকে ‘অমানুষ’ সর্বজ্ঞ পুরুষে পৌঁছানোর অনুমান-প্রণালীটি কুমারিলের দৃষ্টি এড়ায়নি। ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা যে প্রাকৃতিক নিয়মে সীমাবদ্ধ, স্বাভাবিক অবস্থায় তার ব্যত্যয় ঘটে না, সর্বজ্ঞত্ব-খণ্ডনে কুমারিল এই স্বভাবনিয়ম প্রয়োগ করেই বলেন-দূরসূক্ষ্মাদি বস্তুদর্শনে কোনো ব্যক্তির যে জ্ঞানাধিক্য পরিলক্ষিত হয় তা কিন্তু জ্ঞান ও বিষয়ের সুনির্দিষ্ট স্বাভাবিক সম্বন্ধকে লঙ্ঘন করে না, যেমন কোনো সমধিক জ্ঞানী ব্যক্তিও কর্ণের দ্বারা বস্তুর রূপ গ্রহণ করে না।
এরপর কুমারিলের যুক্তি হলো, যদি বলেন সর্বজ্ঞ পুরুষ প্রকৃতির নিয়মে বাঁধা নন, তিনি সব নিয়ম লঙ্ঘন করে সবকিছু দেখতে পান তা হলেও একটা দুরুত্তর প্রশ্ন থেকে যায়। সর্বজ্ঞ পুরুষ নাকি অন্তহীন ভবিষ্যৎকেও বর্তমানের মতো স্পষ্ট প্রত্যক্ষ করেন। এ ধরনের উদ্ভট দাবি কোনো অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারাও সমর্থিত হতে পারে না। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বে কোথাও জন্মগ্রহণই করেনি, যা এখনও কোথাও নেই সেই না-থাকা বস্তুগুলিকেও এখনই কেউ আক্ষরিক অর্থে প্রত্যক্ষ করছে, কেবল কল্পনা করছে না-এরকমের বক্তব্য প্রমত্তের প্রলাপ ছাড়া আর কী হতে পারে? তাই কুমারিল বলছেন-‘ভবিষ্যৎ বস্তুর জ্ঞানে প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিন্দুমাত্র সামর্থ্যও পরিদৃষ্ট হয় না’। (শ্লোকবার্তিক-২/১১৫)
কুমারিল আরো বলেন, যদি কোনো সর্বজ্ঞ-বিশ্বাসী বলেন-সমগ্র ভবিষ্যৎ সর্বজ্ঞ পুরুষের প্রত্যক্ষ জ্ঞানে ধরা না পড়ুক, তিনি অনুমানের দ্বারা অনন্ত ভবিষ্যতের অনন্ত বস্তু জানতে পারেন, তবু কিন্তু সর্বজ্ঞতা সম্ভব নয়। অনুমান জ্ঞান হয় সামান্যাকারে। আমরা বিশ্বাস করি সকল মানুষ মরণশীল। এই সাধারণ সূত্র দেখে আমরাও অনুমান করতে পারি বর্তমানে জীবিত কোনো ব্যক্তিবিশেষও অমর নয়, একদিন তাকে মরতেই হবে। ‘সকল মানুষ মরণশীল’ এই সাধারণ সূত্রটি যখন আমরা জানি তখন অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষের অনন্ত কোটি চিতার আগুন সারিবদ্ধভাবে একে একে আমাদের কল্পনার আকাশে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে না। তিনকালের কোন লোকটি কীভাবে কোথায় কখন মরেছে বা মরবে তা কিন্তু আমাদের পক্ষে অনুমান করা অসম্ভব। আমরা প্রত্যেকেই একদিন মরবো, কারণ আমরা মানুষ এবং মানুষমাত্রেই মরণশীল-এ ধারণাটা হয় সামান্যাকারে বা সাধারণভাবে। প্রত্যেকটি মানুষকে আলাদা করে একে একে গুনে গুনে হয় না, কে কোথায় কখন কীভাবে মরবে তাও জানা যায় না। সর্বজ্ঞ হতে হলে কিন্তু এসব কিছুই বিশেষভাবে, বিভক্তরূপে আলাদা আলাদা করে জানতে হবে। না হলে আমাদেরই বা সর্বজ্ঞ হতে বাধা কোথায়। একথাই কুমারিল সংক্ষেপে বলেছেন-ভবিষ্যৎ বস্তুর জ্ঞানে প্রত্যক্ষ প্রমাণের বিন্দুমাত্র সামর্থ্যও পরিদৃষ্ট হয় না। বিশ্বের সকল বস্তু সম্বন্ধে অনুমান করার কোনো ‘হেতু’ বা সূচক চিহ্ন নেই। (শ্লোকবার্তিক-২/১১৫)

কুমারিলের এ সকল আপত্তির পিছনে রয়েছে আসলে ন্যায়শাস্ত্রের অনুমানতত্ত্বের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা। আমাদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জানা থেকে অজানার দিকে কতটা উল্লম্ফন করা যুক্তিগত এই পরিমিতিবোধটুকু না থাকলে যে কোনো অসম্ভবকে সম্ভব বলে প্রতিপন্ন করার জন্য বল্গাহীন কল্পনার আশ্রয় নেয়া যেতে পারে। যে কোনো আজব কল্পনাকে সজীব করে তোলা যেতে পারে। মানুষের জ্ঞানের ক্রমিক উৎকর্ষ অনস্বীকার্য। কিন্তু এই উৎকর্ষ থেকে কোনো সর্বজ্ঞ পুরুষে পৌঁছানোর যৌক্তিক প্রয়োজন নেই। তাই সর্বজ্ঞতা খণ্ডনের দ্বারা পরোক্ষভাবে বা প্রকারান্তরে ঈশ্বরকেই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কারণ সর্বজ্ঞ পুরুষ না হলে ঈশ্বর ঈশ্বর হতে পারে না।
এরপরই কুমারিল যখন সরাসরি ঈশ্বর খণ্ডন করেছেন তখন আর তিনি আলাদা করে ঈশ্বরের সর্বজ্ঞতা খণ্ডন করেননি। সেখানে তিনি নতুন নতুন যুক্তির অবতারণা করেছেন, যে যুক্তির গুরুত্ব অসাধারণ।
কুমারিল বিশ্বস্রষ্টা প্রজাপতির পরিকল্পনা নিয়ে নানা রকম বিদ্রুপ করেছেন। তিনি বলেন, যদি বলো কোনো এককালে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছিল তাহলে প্রশ্ন করব, সৃষ্টির আগে বিশ্বের অবস্থা কী ছিল?
ঈশ্বরবাদী তখন হয়ত বলবেন, তৈত্তিরীয়-সংহিতায় বলা আছে ‘সৃষ্টির পূর্বে প্রজাপতি একাই ছিলেন’-(তৈত্তিরীয়-সংহিতা-২/১/১)। আবার ঋগ্বেদের প্রজাপতি-সূক্তেও বলা হয়েছে-‘সর্ব প্রথমে কেবল (প্রজাপতি) হিরণ্যগর্ভই বিদ্যমান ছিলেন। তিনি জাত মাত্রই সর্বভূতের অদ্বিতীয় অধীশ্বর হলেন। তিনি এ পৃথিবী ও আকাশকে স্বস্থানে স্থাপিত করলেন।’ (ঋগ্বেদ-১০/১২১/১)

কুমারিলের প্রশ্ন, সৃষ্টির পূর্বে বিশ্বই যদি তখন না থাকে তাহলে বিশ্বস্রষ্টা প্রজাপতিই বা কোথায় ছিলেন? তাঁর রূপই বা কী রকম ছিল? থাকার জন্য কোনো অধিকরণ বা আশ্রয় প্রয়োজন। তা ছাড়া সৃষ্টির জন্য উপাদানগুলি তিনি কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন? তিনি ছাড়া আর কিছুই তো ছিল না।
কুমারিল বলেন, যদি বলো ঈশ্বর তার ইচ্ছাবলেই জগৎ সৃষ্টি করেছেন, দেহবিশিষ্ট চেতনপদার্থেরই ইচ্ছা থাকতে পারে। ঈশ্বর তো অশরীরী। যদি বলো ঈশ্বরেরও দেহ আছে, তবে শরীরের উপাদানগুলি কোথা থেকে এলো? তবে কি ঈশ্বরের দেহ তৈরি করার উপাদানগুলি আগে থেকেই ছিল? অর্থাৎ ঈশ্বরের পূর্বেই জগৎ ছিল? তাহলে বলতে হবে জগৎ ঈশ্বরের সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেনি।

কুমারিল আবার প্রশ্ন করেন, সৃষ্টির পূর্বে তো কোনো মানুষেরই অবস্থান সম্ভব নয়; তাই তোমাদের মতে প্রজাপতি তখন যে উপস্থিত ছিলেন এ কথা কার পক্ষেই বা জানা সম্ভব? এবং কেই বা পরবর্তীকালে সৃষ্ট মানুষদের কাছে প্রজাপতির কথা পৌঁছে দিতে পারেন? যদি বলো, প্রজাপতির পক্ষে কোনো মানুষেরই প্রত্যক্ষাদি জ্ঞানের বিষয় হওয়া সম্ভব নয়, তাহলে প্রশ্ন করব তাঁর যে একান্তই কোনো রকম অস্তিত্ব আছে সে কথাই বা জানা গেল কীভাবে? তোমাদের মতে কোনো এককালে বিশ্বের সৃষ্টি বা শুরু হয়েছিল; কিন্তু তা কীভাবে সম্ভবপর হতে পারে? প্রজাপতির ইচ্ছায় সৃষ্টি শুরু হলো? কিন্তু সে-কথা তোমরা কী করে বলবে? কেননা, তোমাদের মতেই স্রষ্টা দেহ-বিশিষ্ট নন; এবং দেহ ছাড়া ইচ্ছা সম্ভবই নয়। তাই দেহহীন স্রষ্টার পক্ষে সৃষ্টি করার ইচ্ছাও অসম্ভব। যদি বলো, স্রষ্টার দেহ আছে, তাহলে সেই দেহটিকেও তো তাঁরই সৃষ্টি বলতে পারো না। অতএব তাঁর দেহ সৃষ্টির জন্য আর একটি স্রষ্টার কথা, আবার তাঁরও দেহ সৃষ্টির জন্য আর একটি স্রষ্টার কথা-এইভাবে অবিশ্রাম ভেবে যেতে হবে। স্রষ্টার দেহকে নিত্য বা অনাদিও বলতে পারো না, কেননা সৃষ্টির পূর্বে ক্ষিতি অপ্ প্রভৃতি দেহের উপাদান পঞ্চভূতই যখন নেই তখন কী দিয়ে তাঁর দেহ নির্মিত হতে পারে?
তাছাড়া, প্রাণীদের পক্ষে নানা রকম জ্বালা-যন্ত্রণায় পূর্ণ এই পৃথিবীটি সৃষ্টি করবার ইচ্ছেই বা তাঁর হলো কেন? এ-কথাও বলতে পারো না যে প্রাণীদের কর্মফলের দরুনই পৃথিবীতে এই সব জ্বালা-যন্ত্রণা। কেননা, সৃষ্টির পূর্বে এ জাতীয় কর্মফল সম্ভবই নয়। অতএব প্রাণীদের কর্মফল অনুসারে স্রষ্টার পক্ষে পৃথিবী সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়।

কুমারিল বলেন, উপকরণাদি ব্যতিরেকেও সৃষ্টি সম্ভব নয় এবং সৃষ্টির পূর্বে এ-জাতীয় উপকরণ বলে কিছুর অস্তিত্ব অসম্ভব। উর্ণনাভ বা মাকড়সার জালও উপাদানহীন সৃষ্টি নয়, কেননা ভক্ষিত পতঙ্গ থেকে মাকড়সার লালা উৎপাদন হয় এবং জালের উপাদান হিসেবে এই লালা ব্যবহৃত। আর এ কথাও বলা যায় না যে, করুণা বা দায় থেকেই স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন; কেননা, সৃষ্টির আগে কোনো প্রাণীই ছিল না, অতএব করুণা বা অনুকম্পা দেখাবার মতো কোনো জীবই ছিল না, কাকে অনুকম্পা দেখাবেন? যখন করুণার কোনো পাত্রই নেই তখন করুণাও সম্ভব নয়। তাছাড়া করুণা বা দয়া-পরবশ হয়ে সৃষ্টি করলে তিনি শুধু সুখী ব্যক্তিই সৃষ্টি করতেন। যদি বলো, কিছুটা দুঃখ না থাকলে জগতের সৃষ্টি বা স্থিতি সম্ভব নয়, তাহলে উত্তরে বলবো, তোমাদের মতে সবই তো স্রষ্টার শুধু ইচ্ছার উপরই নির্ভরশীল, তাই তার পক্ষে আবার অসম্ভব কী হতে পারে? আর সৃষ্টির জন্য তাঁকেও যদি নিয়মাদির উপর নির্ভরশীলই হতে হয় তাহলে তাঁর আবার স্বাধীনতা কোথায়? তোমাদের মতে তাঁর মধ্যে সৃষ্টির ইচ্ছা জেগেছিল; কিন্তু বলতে পারো কোনো উদ্দেশ্য চরিতার্থতার জন্য তাঁর এই ইচ্ছা জেগেছিল-এমন কোন্ উদ্দেশ্যই বা সম্ভব হতে পারে যা কিনা সৃষ্টি-ব্যতিরেকে চরিতার্থ হওয়া অসম্ভব? নির্বোধও উদ্দেশ্যবিহীন কাজ করে না। অতএব তিনি যদি বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে তাঁর বুদ্ধিকে নিষ্ফল বলতে হবে। যদি বলো, এই সৃষ্টি তাঁর লীলা- প্রমোদ বা বিলাসমাত্র, তাহলে তাঁকে আর সদানন্দ বা চিরসন্তুষ্ট বলতে পারো না, অর্থাৎ সৃষ্টির পূর্বে তিনি নিশ্চয়ই প্রমোদের অভাব অনুভব করেছিলেন, অতএব তখন তাঁর সন্তুষ্টির অভাব ছিল। তাছাড়া সৃষ্টি-ব্যাপারে যে পরিমাণ দুর্ভোগ ও পরিশ্রম প্রয়োজন তার তুলনায় প্রমোদ আর কতটুকুই বা? আর সৃষ্টি যদি প্রমোদের জন্যই হয় তাহলে তোমরা যে প্রলয়ের কথা বলো তারই বা ব্যাখ্যা কী?
আর সর্বোপরি কথা হলো, কারুর পক্ষেই এ জাতীয় স্রষ্টাকে জানা সম্ভব নয়। যদিই মানা যায় যে তাঁর রূপ সংক্রান্ত অবগতি সম্ভব, তবুও তিনিই যে স্রষ্টা এ বিষয়ে জ্ঞান অসম্ভব। সৃষ্টির শৈশবে যে সব প্রাণীদের আবির্ভাব তাদের পক্ষে কতটুকুই বা বোধ সম্ভবপর? অতএব, কীভাবে তাদের জন্ম হলো এবং সৃষ্টির পূর্বে পৃথিবীর অবস্থা কী ছিল- এ সব কথা তাদের পক্ষে বুঝতে পারা অসম্ভব, অর্থাৎ বুঝতে পারা অসম্ভব যে প্রজাপতিই সৃষ্টি করেছিলেন। যদি বলো, প্রজাপতিই সেই প্রাণীদের বলে দিয়েছিলেন যে, তিনিই স্রষ্টা তাহলেও তাদের পক্ষে তাঁর কথায় আস্থা স্থাপন সম্ভব নয়; কেননা, এমনও তো হতে পারে যে, তিনি নিজের শক্তিসংক্রান্ত শুধু দম্ভই প্রকাশ করেছেন।

সাধারণ লোকের ধারণায়, প্রজাপতি যে স্রষ্টা এ-কথা বেদ-এ আছে। কিন্তু কুমারিল বলছেন, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আসলে কয়েকটি বিধির প্রশংসামূলক বাক্যের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা থেকে এ ধারণার উদ্ভব- কোনো একটি বাক্যের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাক্যের সঙ্গে সঙ্গতি ব্যতিরেকে ব্যাখ্যা করতে গেলে এ জাতীয় ভ্রান্তির উদ্ভব হয়। কুমারিল আরো দাবি করছেন, মহাভারত ও পুরাণের কাহিনী থেকেও প্রমাণ হয় না যে, প্রজাপতিই স্রষ্টা। আসলে নিছক কাহিনী হিসেবে কোনো কাহিনীই সার্থক নয়; অতএব তথাকথিত কাহিনীগুলিকে নিছক কাহিনী হিসেবে না বুঝে প্রকৃতপক্ষে বিধি বা যজ্ঞকর্মের প্রশংসা বা অর্থবাদ হিসেবেই বুঝবার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

ঈশ্বরবাদী ন্যায়-বৈশেষিকরা ঈশ্বরকে কেবলমাত্র নিমিত্তকারণ বলে স্বীকার করেন। তাদের মতে, জগৎ সৃষ্টির ব্যাপারে ঈশ্বরের পরিপূর্ণ স্বাতন্ত্র্য বা স্বনির্ভরতা নেই। জীবের কর্ম ও অদৃষ্টের ওপর ঈশ্বরকে নির্ভর করতে হয়। তাছাড়া নিমিত্ত-কারণ কখনো উপাদান-কারণ হতে পারে না। ঘটের উপাদান-কারণ মৃত্তিকা। কুম্ভকার মাটি দিয়ে ঘট তৈরি করে, কুম্ভকার কখনো নিজেই মৃত্তিকা হতে পারে না। কুম্ভকার ঘটের নির্মাতা, মাটি উপাদান। জগতের উপাদান পরমাণু, ঈশ্বর পরমাণুর সাহায্যে জগৎ নির্মাণ করেন জীবের কর্ম ও অদৃষ্ট অনুসারে।
নিরীশ্বরবাদী কুমারিল এখানে বলেন, প্রথমত, বৈশেষিকরা যে মনে করেন ঈশ্বরের ইচ্ছায় অকস্মাৎ সৃষ্টি হয় তা সম্ভব নয়; কেননা ঘট প্রভৃতি নির্মাণের দৃষ্টান্তে দেখা যায় একটি বস্তুর নির্মাণ ক্রমপদ্ধতি মাত্র। দ্বিতীয়ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রলয় স্বীকার করা যায় না, কেননা তার কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া প্রলয়ের কথা স্বীকার করলে মানতে হবে যে ঈশ্বরের মনে প্রলয়ের ইচ্ছা জাগে; কিন্তু এ জাতীয় ইচ্ছায় লাভ কী? অর্থাৎ বুদ্ধিমান স্রষ্টার পক্ষেই নিজের সৃষ্টিকে ধ্বংস করবার ইচ্ছা জাগা সম্ভব নয়।

বৈশেষিকরা বলেন, প্রলয়কালে মানবাত্মার ধর্মাধর্ম নিষ্ক্রিয় বা সুপ্ত অবস্থায় থাকে। কুমারিল বলছেন, তা কোনোমতেই সম্ভব নয়। প্রথমত কৃতকর্মের ফলাফল অবশ্যম্ভাবী; তাই এমন কোনো অবস্থা সম্ভবই নয় যখন কৃতকর্মের পরিণাম স্থগিত থাকবে। বৈশেষিকরা বলবেন, ঈশ্বরের ইচ্ছা নামক কর্মটির দরুন বাকি সকলের কর্মফল এইভাবে স্থগিত থাকে; কিন্তু তাও সম্ভব নয়, কারণ একজনের একটি কর্মের ফলে বাকি সকলের কর্মফল স্থগিত থাকতে পারে না।
যদি বলা হয়, প্রলয়কালে সকলের ধর্ম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাহলে কুমারিল বলছেন, আর কখনো সৃষ্টির সম্ভাবনাও থাকবে না, কেননা সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কর্মগুলিকে আবার কীভাবে সঞ্জীবিত করা যাবে?
বৈশেষিকরা যদি বলেন, ঈশ্বরের ইচ্ছায় তা সম্ভব হতে পারে, তাহলে, কুমারিল বলছেন, শুধু এই ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা বলাই তো যথেষ্ট-বৈশেষিকরা আবার কেন সৃষ্টির জন্য ধর্মাধর্মের কথা তোলেন? তাছাড়া, ঈশ্বরের ইচ্ছাও সম্পূর্ণ অকারণ হতে পারে না; এবং ঈশ্বরের ইচ্ছার কারণ হিসেবে যদি কিছু স্বীকার করা হয় তাহলে সেই কারণটির সাহায্যেই তো সৃষ্টির ব্যাখ্যা সম্ভব, তদুপরি ঈশ্বর মানার প্রয়োজন কী?

ন্যায়-বৈশেষিকরা ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করবার উদ্দেশ্যে বলেন, গৃহাদির দৃষ্টান্তে দেখা যায় বিভিন্ন অবয়ব দ্বারা গঠিত বস্তুর উৎপত্তি বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণব্যতীত সম্ভব নয়; অতএব অবয়ব-বিশিষ্ট মানবদেহের নিয়ন্তা বা নিয়ন্ত্রণ-কর্তা হিসেবেও বুদ্ধিমান ঈশ্বর অনুমেয়।
কিন্তু কুমারিল বলছেন, এই বুদ্ধিমান নিয়ন্তা অর্থে ঈশ্বরের কথা বাহুল্য মাত্র। কেননা সকলেই জানে যে মানবাদি বুদ্ধিমান জীবের নিয়ন্ত্রণ ফলেই পৃথিবীতে যাবতীয় উৎপাদন সম্ভব হয়; অতএব তার জন্য ঈশ্বর মানবার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া বৈশেষিকরা যে বলেন, ঈশ্বরেচ্ছায় আকস্মিকভাবে বা হঠাৎ জগৎ সৃষ্ট হয় তাও মানবার কারণ নেই; কেননা গৃহাদি নির্মাণের দৃষ্টান্তেই দেখা যায় কোনো কিছুই নির্মাণকর্তার ইচ্ছা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকস্মিকভাবে সৃষ্টি হয় না।

বৈশেষিকরা বলেন, সকলের দেহই বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন। কুমারিল বলছেন, কিন্তু এই যুক্তি অনুসারে ঈশ্বর-দেহের নিয়ন্ত্রণকর্তা কে হবেন? তথাকথিত ঈশ্বরের দেহও দেহ, এবং আমাদের দেহের মতোই অবয়ব-গঠিত; অতএব তারও কোনো নিয়ন্তা স্বীকার্য। যদি বলো, ঈশ্বরের ইচ্ছাই এই নিয়ন্ত্রণের কারণ, তাহলে তোমাদের নিজেদেরই মূল যুক্তির বিরুদ্ধে যেতে হবে; কেননা তোমাদের মূল যুক্তি হলো, অবয়ব-গঠিত বস্তুর নিয়ন্তা হিসেবে স্বতন্ত্র কোনো বুদ্ধিমান অনুমেয়। তাছাড়া, ঈশ্বরেচ্ছার দ্বারাই বা কীভাবে তাঁর দেহ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে? কেননা, ঈশ্বর যদি তাঁর দেহ সৃষ্টি করতে চান তাহলে তাঁকে দেহীপূর্ব বা দেহবিহীন অবস্থাতেই এ প্রয়াস করতে হবে, উক্ত প্রয়াসের পূর্বে তাঁর দেহের অস্তিত্বই সম্ভব নয়। এবং দেহবিহীন অবস্থায় ঈশ্বরের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়।

ঈশ্বরানুমানের জন্য বৈশেষিকরা কুম্ভকারের দৃষ্টান্ত ব্যবহার করেন-অবয়ব-বিশিষ্ট ঘট যেমন কুম্ভকারের সৃষ্টি, অবয়ব-বিশিষ্ট সমগ্র জাগতিক বস্তুও তেমনি ঈশ্বরের সৃষ্টি।
কিন্তু কুমারিল বলছেন, ঘটাদি যদি প্রকৃতপক্ষে কুম্ভকারের সৃষ্টি হয় তাহলে তা ঈশ্বরের সৃষ্টি হতে পারে না, অর্থাৎ সমস্ত জাগতিক বস্তুর স্রষ্টা ঈশ্বর হতে পারেন না; অপরপক্ষে যদি বলো, ঘটাদি প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরেরই সৃষ্টি- অর্থাৎ কুম্ভকারের সৃষ্টি নয়, তাহলে যে দৃষ্টান্তের উপর নির্ভর করে তোমরা ঈশ্বর অনুমান করো সেইটিই প্রত্যাখ্যান করতে হবে-অর্থাৎ ঈশ্বরানুমানের দৃষ্টান্তাভাব ঘটবে। তাছাড়া, ঘটাদির সৃষ্টি সাধারণত যেভাবে কুম্ভকারাদির কীর্তি বলে স্বীকৃত হয়, বৈশেষিকরাও যদি তা স্বীকার করেন তাহলে তাঁদের সিদ্ধান্তই খণ্ডিত হবে; কেননা, তাহলে মানতে হবে জীবদেহ প্রভৃতিও মরলোকের জীবদেরই সৃষ্টি-ঈশ্বরের সৃষ্টি নয়।

উত্তরে বৈশেষিকরা বলবেন, ঈশ্বরের সৃষ্টিকাজ কুম্ভকারাদির মতো নয়; বস্তুত ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুসারে পরিচালিত হয়ে পরমাণুসমূহই সৃষ্টিকাজ সম্পাদন করে।
এক্ষেত্রে কুমারিল বলছেন, এ কথাও যুক্তিযুক্ত হবে না; কারণ পরমাণুসমূহ জড় বা অচেতন, অতএব তাদের পক্ষে ঈশ্বরেচ্ছা অনুসারে কোনো কাজ করাই সম্ভব নয়; কেননা অচেতন পরমাণুর পক্ষে ঈশ্বরেচ্ছার অবগতিই সম্ভব নয়।

ঈশ্বর এবং সৃষ্টি-প্রলয় সংক্রান্ত ন্যায়-বৈশেষিক মত খণ্ডন করেই কুমারিল ক্ষান্ত নন; এই প্রসঙ্গে তিনি বৈদান্তিক সৃষ্টিতত্ত্বও খণ্ডন করতে অগ্রসর হয়েছেন এবং সাংখ্যমতেরও সমালোচনা করেছেন। তাছাড়া মীমাংসা দর্শনে কেবল ঈশ্বরই নয়, বৈদিক দেব-দেবীর অস্তিত্বও স্বীকৃত হয়নি স্রেফ দেবতার নামটুকুর উপস্থিতি ছাড়া।

জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে জগতের প্রচলিত লোকব্যবহারের দৃষ্টান্তমূলক তাবৎ বিষয়কেই তৎকালীন দার্শনিকেরা যুক্তি-তর্কের মোক্ষম হাতিয়ার বানাতে দ্বিধা করেননি। কেননা বিজ্ঞানের শনৈ শনৈ উন্নতির ফলে বিজ্ঞানদৃষ্টির বর্তমান অভূতপূর্ব বহিঃ ও অন্তর্মুখী শক্তিমত্তা সেই প্রাচীনকালের চিন্তকদের কাছে কল্পনারও অগম্য ছিল। কিন্তু নিজস্ব পরিমণ্ডলের সাপেক্ষে তাঁদের যুক্তির শৃঙ্খলা, পরিশীলতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্নের শক্তিমত্তাকে অবমূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই। অথচ হাজার হাজার বছর পেরিয়ে এসে একালে এই আমরাই যখন আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিমুখ হয়ে যুক্তিশীলতাকে পাশকাটিয়ে অর্থহীন প্রপঞ্চ নিয়ে বিপজ্জনক খেলায় মেতে উঠি তখন নিশ্চয়ই তা অবহেলায় এড়িয়ে যাবার উপায় থাকে না।

যুক্তি ও বিশ্বাস কখনোই একে অপরের পরিপূরক হয় না। নিজস্ব বিশ্বাসে একান্তই আবিষ্ট থাকার অধিকার যেমন যে-কোনো ব্যক্তির রয়েছে, তেমনি যুক্তিশীল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অধিকারও ব্যক্তির জন্য প্রশ্নহীন অধিকার। যুক্তি প্রামাণ্য নির্ভর, বিশ্বাস তা নয়। একটিকে আরেকটির উপর চাপানোর বিষয়টাই অযৌক্তিক। যুক্তি মানেই প্রশ্নের বহমান ধারা, যার প্রতিটাকে সমাধান করে করেই যুক্তিকে এগুতে হয় এবং এভাবেই এর যথার্থতা নির্ণিত হয়। বিশ্বাসের এ দায় নেই বলেই তার সাথে জ্ঞানচর্চার সংগতি খোঁজারও প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সমাজ-বিকাশের ধারায় যুক্তি ও বিজ্ঞানকে সংগতির দায় কাঁধে নিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। অথচ যুক্তিকেই যদি বিশ্বাসের দায় নিতে বলা হয়, তারই নাম হবে অযাচিত আধিপত্য। এটি হলো যুক্তিকে জোর করে থামিয়ে দেওয়া, প্রশ্নকে স্তব্ধ করে দেওয়া, সমাজের জ্ঞান-তাত্ত্বিক বিকাশকে রুদ্ধ করে দেওয়া, সমস্ত বৈজ্ঞানিক অর্জনকে অস্বীকার করার নামান্তর। এটি কোনো সুস্থ সমাজ বা রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না, তা সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কময় একটি অথর্ব প্রবণতারই ইঙ্গিতবাহী কেবল।

তৎকালীন ভূ-কেন্দ্রিক বাইবেলীয় ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করায় ব্রুনোকে পুড়িয়ে কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের জনক বলে খ্যাত দার্শনিক গ্যালিলিওকে অবরুদ্ধ করেও যেমন সূর্যকে পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করানো যায় নি, পৃথিবীই বস্তুত সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, তেমনি সমাজ-সভ্যতার এই বর্তমান লক্ষ্যণীয় বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একটি প্রাচীন পরিত্যক্ত আস্তিক-নাস্তিক দ্বন্দ্বকে বিকৃত ও কৃত্রিমভাবে জাগিয়ে তোলার মধ্যেও পেছন-দিকে হাঁটার আধ্যাত্মবাদী রাজনৈতিক কূটাভাস ছাড়া ইতিবাচক কিছু রয়েছে বলে মনে হয় না। আগেই বলা হয়েছে যে এটি একটি সুস্পষ্ট প্রাচীন জ্ঞানতাত্ত্বিক দার্শনিক দ্বন্দ্ব। অন্তত ঈশ্বর নামক কোনো জগতস্রষ্টার অস্তিত্বে স্বীকার বা অস্বীকার করার সাথে যে আস্তিক্য-নাস্তিক্যের কোনো সম্পর্কই নেই তা যেমন আমরা দেখেছি, তেমনি এ বিষয়ে পক্ষাপক্ষ অবস্থান ও বিরোধিতার নৈতিক হাতিয়ারও ছিল চিন্তকদের মধ্যে জ্ঞান-যুক্তি ব্যবহারের যুক্তিশীল চর্চা। সেকালে তার কতটা প্রভাব বা গ্রহণযোগ্যতা ছিল তা এর বুৎপত্তিগত ইতিহাসও আমাদেরকে পথ দেখাতে পারে।

৭.
যদি ব্যুৎপত্তিগত ইতিহাসে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়, এখানে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই যে, সত্য উপলব্ধির দার্শনিক প্রপঞ্চে ভারতীয় দর্শন-চিন্তার ক্রমবিকাশে প্রধানত দুটি পরস্পর বিপরীত ধারা লক্ষ্য করা যায়। একটি হলো আস্তিক ধারা, অন্যটি নাস্তিকপন্থী। বর্তমান প্রচলিত অর্থে যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন তাঁদেরকে আস্তিক এবং যাঁরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না তাঁদেরকে নাস্তিক বলা হলেও প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে আস্তিক ও নাস্তিক শব্দদুটি বর্তমান অর্থে নয়, বরং এক বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

এক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় ব্যাকরণের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’র সংশ্লিষ্ট ব্যাকরণসূত্র উল্লেখ করা যেতে পারে। পাণিনির প্রাচীনত্ব নিয়ে দ্বিমত না-থাকলেও তার আনুমানিক সময়কাল ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৬০০-৪০০ এর মধ্যে। পাণিনি তাঁর ব্যাকরণসূত্রে ‘অস্তি নাস্তি দ্বিষ্টং মতিঃ’-এর মাধ্যমে দুটি বিপরীত মত-গোষ্ঠির উদ্ধৃতি টেনেছেন। এই সূত্রানুসারে ‘দ্বিষ্টং পরলোকো অস্তি’ অর্থাৎ পরলোক আছে এরূপ বুদ্ধি বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আস্তিক এবং ‘দ্বিষ্টং পরলোকো নাস্তি’ অর্থাৎ পরলোক নাই এরূপ বুদ্ধি বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নাস্তিক বলা হয়েছে।

পাণিনি সূত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ব্যাকরণকার পতঞ্জলি (অন্যূন খ্রিস্টপূর্ব ১৫০) তাঁর ‘মহাভাষ্য’ গ্রন্থে ‘আস্তিক’ ও ‘নাস্তিক’ শব্দের সংজ্ঞা সম্বন্ধে কিছুটা আলোকপাত করেছেন। পতঞ্জলির মতে ‘অস্তি’ বা ‘আছে’ এই ধারণার বশবর্তী লোকেরা আস্তিক এবং এর বিপরীত ‘ন অস্তি’ বা ‘নাই’ এই ধারণায় প্রভাবিত লোকেরা নাস্তিক পদের দ্বারা অভিধেয় (মহাভাষ্য ৪/৪/১)। অর্থাৎ আস্তিকেরা যে বিশেষ বস্তু বা ধারণার অস্তিত্ব স্বীকার করেন, সেগুলিকে স্বীকৃতি না-দেওয়ার জন্য নাস্তিকেরা স্বতন্ত্র এক গোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্যে’ এসবের বিস্তৃত বিবরণ না থাকলেও অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থে নাস্তিক শব্দের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আরো কিছু আভাস পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে মহাভারত থেকে উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মহাভারতের (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ) বিভিন্ন স্থানে নাস্তিকদের দ্বারা অস্বীকৃত বিভিন্ন ধারণার সঙ্গে বৈদিক সমর্থনকে যুক্ত করার প্রয়াস দেখা যায়। যেমন-
বেদবাদাপবিদ্ধাংস্তু তান্ বিদ্ধি ভূশনাস্তিকান্।
ন হি বেদোক্তমুৎসৃজ্য বিপ্রঃ সর্ব্বেষু কর্ম্মসু।। (মহাভারত : ১২/১২/৫)।
দেবযানেন নাকস্য পৃষ্ঠমাপ্নোতি ভারত!
অত্যাশ্রমানয়ং সর্ব্বানিত্যাহুর্বেদনিশ্চয়াঃ।। (মহাভারত : ১২/১২/৬)।
ব্রাহ্মণাঃ শ্র“তিসম্পন্নাস্তান্নিবোধ নরাধিপ!
বিত্তানি ধর্ম্মলব্ধানি ক্রতুমুখ্যেস্ববাসৃজন্ ।। (মহাভারত : ১২/১২/৭)।
অর্থাৎ : সম্ভব থাকিলেও যাহারা কর্ম্ম ত্যাগ করিয়া সন্ন্যাস অবলম্বন করে, আপনি তাহাদিগকে বেদবাক্য পরিত্যাগী অত্যন্ত নাস্তিক বলিয়া অবগত হউন। ৫।
ভরতনন্দন! বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ সমস্ত কর্ম্মের মধ্যে বেদোক্ত কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া দেবযানে স্বর্গে যাইতে পারেন না। বিশেষতঃ বেদবিশ্বাসী লোকেরা এই গৃহস্থাশ্রমকে সমস্ত আশ্রমের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলিয়া থাকেন। ৬।
নরনাথ! যে সকল ব্রাহ্মণ বেদজ্ঞানসম্পন্ন, আপনি তাঁহাদিগকে জানিয়া রাখুন। যাঁহারা ন্যায়ার্জিত ধন উত্তম যজ্ঞে বিতরণ করিয়াছেন, তাঁহারাই বেদজ্ঞান-সম্পন্ন। ৭।

এছাড়া প্রাচীন গ্রন্থ মনুস্মৃতিও (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে ২০০ খ্রিস্টাব্দ) প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, মনুর মতে বেদনিন্দুকেরাই ‘নাস্তিক’ আখ্যায় অভিহিত হওয়ার যোগ্য। যেমন-
যোহবমন্যেত তে মূলে হেতুশাস্ত্রাশ্রয়াদ্ দ্বিজঃ।
স সাধুভি র্বহিষ্কার্যো নাস্তিকো বেদনিন্দকঃ।। ২ / ১১।। (মনুসংহিতা)।
অর্থাৎ : যে দ্বিজ হেতুশাস্ত্র অর্থাৎ অসৎ-তর্ককে অবলম্বন করে ধর্মের মূলস্বরূপ এই শাস্ত্রদ্বয়ের (শ্রুতি ও স্মৃতির) প্রাধান্য অস্বীকার করে (বা অনাদর করে), সাধু ব্যক্তিদের কর্তব্য হবে-তাকে সকল কর্তব্য কর্ম এবং সমাজ থেকে বহিষ্কৃত করা (অর্থাৎ অপাঙ্ক্তেয় করে রাখা)। কারণ, সেই ব্যক্তি বেদের নিন্দাকারী, অতএব নাস্তিক।

বেদবিরোধী নাস্তিকদের কার্যকলাপে বৈদিক ঐতিহ্যের ধারক বাহক মনুর সমর্থন না থাকাই যে স্বাভাবিক তা মনুসংহিতার বিভিন্ন স্থানে নাস্তিকদের নির্দ্বিধ নিন্দা করার মধ্যেই পরিস্ফুট হয়। যেমন-
অনপেক্ষিতমর্যাদং নাস্তিকং বিপ্রলুম্পকম্ ।
অরক্ষিতারমত্তারং নৃপং বিদ্যাদধোগতিম্ ।। ৮/৩০৯।। (মনুসংহিতা)।
অর্থাৎ : যে রাজা শাস্ত্রবিধি ও শিষ্টাচারের উপর প্রতিষ্ঠিত ধর্মব্যবস্থা রক্ষা করেন না, কিন্তু নাস্তিক এবং অযথা অন্যায় অর্থদণ্ডাদির দ্বারা যিনি প্রজাবর্গের ধন হরণ করেন, যিনি প্রজাগণকে রক্ষা করেন না, অথচ যিনি সেই প্রজাদের দ্রব্য সমূহের অত্তা অর্থাৎ ভোগকারী, এইরকম রাজা নরকে পতিত হয়েছেন বলে বুঝতে হবে।

উল্লেখ্য, মনুসংহিতার টীকাকার মেধাতিথি উপরিউক্ত শ্লোকে উল্লিখিত ‘নাস্তিক’ শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে-
‘নাস্তি পরলোকা নাস্তি দত্তং নাস্তি হুতমিতি নাস্তিকঃ।’ (মনুসংহিতা)।
অর্থাৎ : পরলোক বলে কিছু নেই, যাগ-দান-হোম এগুলিও কিছু নয়- এইরকম কথা যিনি বলেন এবং এই বিশ্বাসে যিনি চলেন তিনি নাস্তিক।

অতএব, দেখা যাচ্ছে, বৈদিক ঐতিহ্যের প্রভাবপুষ্ট সকলের কাছে ‘নাস্তিক’ সংজ্ঞাটি আসলে বৈদিক প্রাধান্যের বিরোধীদের অর্থেই ব্যবহার্য। ভারতীয় দর্শনগুলিকে ‘আস্তিক’ ও ‘নাস্তিক’ এই দুটি সুনির্দিষ্ট বিভাগে চিহ্নিত করার মূলেও রয়েছে এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রেরণা। অর্থাৎ যাঁরা বেদের সিদ্ধান্ত প্রমাণরূপে গ্রহণ করেন তাঁদেরকে আস্তিক এবং যাঁরা বেদের সিদ্ধান্তকে অভ্রান্তরূপে গ্রহণ করেন না তাঁদেরকে নাস্তিক সম্প্রদায় বলা হয়। তাই বৌদ্ধ ও জৈনগণ পরলোক স্বীকার করলেও বেদনিন্দা করে নাস্তিক আখ্যায় অভিহিত হয়েছে। আর চার্বাকরা বেদ ও পরলোক উভয়ই অস্বীকার করে একেবারে নাস্তিক শিরোমণি আখ্যায় ভূষিত হয়েছে। তাই হয়ত চতুর্দশ শতকের বেদান্তবাদী দার্শনিক মাধবাচার্য্য তাঁর ‘সর্বদর্শনসংগ্রহ’ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন-‘নাস্তিকশিরোমণিনা চার্বাকেণ’। অপরদিকে বেদ এবং উপনিষদানুসারী ষড়দর্শন যথা-সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত হলো সম্পূর্ণই বেদবিহিত আস্তিক দর্শন। যদিও মীমাংসকরা অবিসংবাদিতভাবেই কট্টর নিরীশ্বরবাদী।

৮.
নিজের বেলায় আঠারোআনার হিসাবটা যে সর্বকালেই প্রযোজ্য ছিল এবং আছে, তা হয়ত আমাদের আর বোঝার বাকি থাকে না। দর্শন জগতে লোকায়ত-চার্বাক-মতের তীব্র বিরোধিতায় বাদবাকি সবগুলো আস্তিক-নাস্তিক দর্শনই যে সবসময় একাট্টা ছিলেন তা ভিন্ন কারণে প্রসিদ্ধ। কিন্তু বাহ্যবস্তুবাদী ন্যায়-বৈশেষিকদের সাথে মীমাংসকরা মিলেমিশে চরম ভাববাদী বৌদ্ধ ও বেদান্ত-মতকে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে যে হারে তুলোধূনো করার চেষ্টা করেছেন দর্শনের জ্ঞান-তাত্ত্বিক ইতিহাসে তাও উপেক্ষণীয় নয়। তবে বেদবিহিত নয় বলে বেদনিন্দুক বৌদ্ধ নাস্তিকদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে এসে আস্তিক দর্শনগুলোর আক্রমণ যে কেবল জ্ঞানজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল তা বলা যাবে না। আস্তিকদের নিজেদের মধ্যে যত জ্ঞান-তাত্ত্বিক অন্তর্দ্বন্দ্বই থাকুক না কেন, সেখানে ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনো বিবেচ্য বিষয়ই নয়, মূল সংঘাতটা মূলতই বৈদিক শাস্ত্রগ্রন্থ বেদের বিরোধিতাকারী বৌদ্ধদের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণটাই বোধ করি নিজেদের অনিবার্য দায় হিসেবেই মনে করা হয়েছিল। নইলে মৌলিক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বিচারে বৌদ্ধ ও বেদান্ত দর্শনের মধ্যে বিদ্বজ্জনদের বিবেচনায় তেমন একটা পার্থক্য পরিলক্ষিত না হলেও প্রাচীন ভারতীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক ইতিহাসে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হাতে বৌদ্ধদের নিপীড়িত হওয়ার ইতিহাসের অন্য কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা মেলে না।

তার মানে কী দাঁড়াল? বর্তমান আর প্রাচীন উভয় প্রেক্ষাপটেই একটা চিরায়ত সমস্যার অভিন্ন রূপ দেখতে পাচ্ছি আমরা। বেদবিহিত হলেই আস্তিক, নইলে নাস্তিক। তবে কি যুক্তিটা এই যে, নিজের শাস্ত্রগ্রন্থ বা বিশ্বাসই চূড়ান্ত আস্তিকতা, আর তাতে অবিশ্বাস বা বিরোধিতাই নাস্তিকতা? তার সাথে অবশ্য আরেকটি বিষয়কে অনিবার্যরূপেই যুক্ত করতে হয়, ক্ষমতা। কারণ ক্ষমতাবানরাই মূলত নিজের সাপেক্ষে অন্যের অবস্থানটাকে নিয়ন্ত্রিত করেন। সমাজ-রাষ্ট্রে আইন প্রণীত হয় মূলত ক্ষমতাবানদেরই অনুকূলে সমাজ-শাসনের সুবিধার্থে। ফলে নিজের বিশ্বাসই সত্য-বিশ্বাস, আর নিজের সাপেক্ষে ভিন্ন বিশ্বাস হয় অসত্য অপ-বিশ্বাস!
সত্যনিষ্টতার এই আপেক্ষিক অবস্থান স্বীকার করে নিলে কি তা-ই স্বীকার করতে হয় না যে, নিজের ধর্মবিশ্বাসে যিনি আস্তিক, তাঁর নিজের সাপেক্ষে ভিন্ন-বিশ্বাসীরা সবাই নাস্তিক? এবং এই যুক্তি-ন্যায় অনুযায়ী কেবল নিজের বিশ্বাসটাই যদি আস্তিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচ্য হয়, তাহলে আপেক্ষিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে জগতে শেষপর্যন্ত আর একটিও পরম আস্তিক সত্তা কি খুঁজে পাওয়া যাবে আদৌ? আপেক্ষিকতার এই ঘোরপ্যাঁচে পড়ে শেষতক সবাই কি নিজ নিজ বিশ্বাসের ভিত্তিতে একে অন্যের সাপেক্ষে পরস্পর নাস্তিক হয়ে যাই না!

যুক্তির শৃঙ্খলা মানলে চেতনাগত অবস্থানে তাই হবার কথা। এরকম বিভ্রান্তিকর দ্বন্দ্বে কোনো স্থির সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না বলে নিরন্তর আপেক্ষিক-অবস্থান পরিবর্তনের কারণে এটি আসলে একটি অস্থির অবস্থাই। আর তখন না-চাইলেও একটি প্রভাবকের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় হাজির হয়েই যায়, যার নাম ক্ষমতা। অর্থাৎ যে বিশ্বাসী গোষ্ঠি যেকোনোভাবেই ক্ষমতাবান বলে বিবেচিত হবে, তার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় প্রেক্ষাপট। এবং তখন ক্ষমতাবানের বিশ্বাসটিই সত্য হিসেবে চেপে বসে অন্যান্য বিশ্বাসের উপর। ফলে প্রশ্ন, যুক্তি আর মুক্তচিন্তার অবলুপ্তির সাথে জ্ঞান-তাত্ত্বিক পরিমণ্ডলটাও হারিয়ে যায় তখন। যেহেতু যুক্তি আর বিশ্বাস একে অন্যের পরিপূরক হয় না কখনোই। তখন কি যোগ্য সে লোকটি আর অবশিষ্ট থাকবেন যিনি অষ্টাদশ-শতকের ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি আওড়াতে আসবেন-‘তুমি যা বলছো তার সাথে আমি একমত নই, কিন্তু তোমার এ কথা বলার অধিকারের জন্য প্রয়োজনে আমি জীবন দেবো।’

যুক্তিশীল হলে সতর্ক পাঠক নিশ্চয়ই স্ব-স্ব বিবেচনাবোধ থেকেই হিসাব কষে বের করে ফেলতে পারেন, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানমুখী সমাজ-প্রগতির সম্মুখগামী ধারায় পরিত্যক্ত প্রাচীন আস্তিক-নাস্তিক দ্বন্দ্বটি কেন আজ একান্তই অস্বাভাবিক, বিভ্রান্তিকর ও বেখাপ্পাও বটে। তারপরও এটিকে কৃত্রিমভাবে আরোপ করার উদ্দেশ্য যে কোনোভাবেই সুবিবেচনাপ্রসূত নয়, বরং আমাদের এবং আগামী প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরের সমাজ-বিকাশে এগিয়ে যাবার পথে এক বিষবৃক্ষের দেওয়াল বসানোর অপচেষ্টা মাত্র, তা বুঝেও যারা চুপ থেকে না-বোঝার ভান করব তাদের জন্য পরিশেষে হয়ত সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তিগুলোই অবশিষ্ট থাকবে-

‘যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল,
আমি কোনো কথা বলিনি, কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।

তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের
লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল,
আমি নীরব ছিলাম, কারণ আমি শ্রমিক নই।

তারপর ওরা যখন ফিরে এসে ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে
ভরে মারতে,
আমি তখনও চুপ করে ছিলাম, কারণ
আমি ইহুদি নই।

আবারও এলো ওরা ক্যাথলিকদের
ধরে নিয়ে যেতে, আমি টুঁ শব্দটিও উচ্চারণ
করিনি, কারণ আমি ক্যাথলিক নই।

শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে,
আমার পক্ষে কেউ কোনো কথা বলল না, কারণ,
কথা বলার মতো তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।’

-মার্টিন নেমলার

Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.
Share.

About Author

Leave A Reply