আরিফ রহমান । দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িক বাংলা এবং বিলুপ্ত-প্রায় হিন্দু সম্প্রদায়

0

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাথে বিশেষ করে ধর্ম নিরপেক্ষতার একটা সম্পর্ক আছে সেটা বলে দিতে হয় না। সেই বিবেচনায় আমাদের বাংলাদেশের মাটিতে হিন্দু ধর্মালম্বিদের সংখ্যা ওঠানামার চরিত্র বরাবরই এই জাতির ধর্ম নিরপেক্ষতার সূচকটা নির্দেশ করে দিয়েছে। এই নিবন্ধে বিষয়টি হাতেনাতে পরীক্ষা করে দেখা যাক।

প্রথমেই চলুন এই ভূখণ্ডে হিন্দু জনগোষ্ঠীর পর্যায়ক্রমিক সংখ্যা হ্রাসের বিষয়টিতে একটু চোখ বুলিয়ে আসি। বাংলাদেশে ১৯৪১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ২৮ ভাগ। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরে তা শতকরা ২২ ভাগে এসে দাঁড়ায়। এরপর থেকেই সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমাগত অত্যাচার এবং নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় দেশটিতে ক্রমশ হিন্দুদের সংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৬১ সালে ১৮.৫%, ১৯৭৪ সালে কমে দাঁড়ায় ১৩.৫%, ১৯৮১ সালে ১২.১%, এবং ১৯৯১ সালে ১০%-এ এসে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে হিন্দুদের শতকরা হার কমে ৮ ভগের নিচে নেমে এসেছে বলে অনুমিত হয়। ২০১১ সালে পরিচালিত জরিপ বলছে, ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ হিন্দু বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে।

১৯৬৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৫ দশকে মোট ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬১২ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিরুদ্দিষ্ট বা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। আর প্রতিদিন দেশ ছেড়েছেন গড়ে ৬৩২জন হিন্দু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের ‘বাংলাদেশে কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নিরুদ্দেশ প্রক্রিয়ার প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দু’তিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোনো মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
৪৭-এর ধর্মের নামে অযাচিত দেশভাগ নামক প্রক্রিয়াটি প্রথমবারের মতো ধর্মের বিচারে কোটি কোটি মানুষকে বিভক্ত করে ফেলার নগ্ন রূপটি এই ভূ-খণ্ড প্রত্যক্ষ করে। এতসব কিছুর পরেও এ-অঞ্চলের বিভিন্ন ধর্মের বেশ অনেকটা মানুষ তুলনামূলক সহনশীল অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ বিবেচনায় থেকে গিয়েছিলেন। মানুষ অসাম্প্রদায়িক হয় নিজের প্রয়োজনে, নিজের নিত্যদিনের কর্মে যখন বিভিন্ন শ্রেণি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সাথে চলতে হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে আর আমাদের দেশে ভিন্নমতের মানুষের একত্রে ভালোবেসে জীবনপাত করার ইতিহাস তো শত বছরের। দেশ ভাগের পর তথাকথিত অখণ্ড পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় এদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী। এই কথাটাকে কেবল বলার জন্য বলা নয় তার সপক্ষে কিছু প্রমাণাদি পেশ করা যাক-

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের সময় যেই ১২জন পাকিস্তানি জেনারেল পরাজয় স্বীকার করে নিতে চায়নি তাদের একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন। যিনি ছিলেন প্রচণ্ড হিন্দু বিদ্বেষী একজন মানুষ। তিনি তার অধীনস্ত বাঙালি সৈনিকদের নাম উচ্চারণ করতেন না, “বাঙাল” বলতেন। বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে তার মনোভাব ছিল-বাঙালরা নাচ গান এবং কবিতা খুব পছন্দ করে আর ভারতের হিন্দুরা নাচ, গান ও কবিতায় পারদর্শী। এসব কারণেই বাঙালি হিন্দুরা বাঙালি মুসলমানদের ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিল। উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা এদের ভেতরে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে এরা হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মের মাঝামাঝি একটা ধর্ম পালন করত। পাকিস্তান না টেকার পেছনে তার মতে একটা কারণই যথেষ্ট, পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানেরা আসল মুসলমান আর পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা হিন্দু। পরবর্তীতে এই জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন একবার ঢাকায় এসেছিলেন, একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে। সেই কথা গর্ব ভরে লিখেছেন নিজের বইয়ের ভেতর।

কনফারেন্সের দিন ছিল শব-ই-বরাতের দিন, তিনি দেখলেন হোটেলের টিভিতে বাংলায় শবেবরাতের ফজিলত বর্ণনা করা হচ্ছে। এরপর আজানের ধ্বনি। তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করলেন- “প্রতিদিনিই কি নামাজের সময় টিভি থেকে আজান প্রচারিত হয় এখানে…?”

ভৃত্য ক্ষুব্ধ গলায় বলল-“আপনি এখনও বুঝতে পারছেন না যে আমরা মুসলমান, হিন্দু ভেবে আমাদের বাপ-দাদাকে আপনারা হত্যা করেছেন…।” এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডঃ মুনতাসীর মামুন স্যারের লেখা “পাকিস্তানী জেনারেলদের মন” গ্রন্থে।

পূর্ববঙ্গের গভর্নর মালিক ফিরোজ খান একবার বলেছিলেন-“বাঙালি মুসলমানরা অর্ধেক মুসলমান অর্ধেক হিন্দু, তারা মুরগির মাংসটাও হালাল করে খায় না।” এই অপমানে মাওলানা ভাসানী তীব্র ভাষা ব্যবহার করে বলেছিলেন-“লুঙ্গী উঁচা করিয়া দেখাইতে হইবে আমরা মুসলমান কিনা?” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান শুনলে ধর্মনাশ হবে-এই দাবি তুলে পাকিস্তান আমলে পূর্ববাংলার গভর্নর মোনায়েম খান রবীন্দ্র সংগীত লেখার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মুসলমান শিক্ষকদের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলা বিভাগের মুসলমান শিক্ষকদের কেউই তাদের পূর্ণাঙ্গ জীবনকালে এবং তাদের পিতা-প্রপিতামহের জীবনকালেও একটি রবীন্দ্র-সংগীত রচনা করে যেতে পারেননি।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আর মাওলানা ভাসানীর যুক্ত ফ্রন্ট যখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ায় তখন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাদের একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছিল-“যুক্তফ্রন্ট নাস্তিকের দল, যুক্তফ্রন্টকে ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটদাতার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।” তাজউদ্দীন আহমেদ হিন্দু এবং নাস্তিক এই কথা বলে গোলাম আযম নিয়মিত কলাম লিখতেন সংগ্রামে-“বাংলাদেশ বাঙালিদের দ্বারা শাসিত হবে এই মতবাদ শ্রী তাজউদ্দিনের (দৈনিক সংগ্রাম ৮ মে, ১৯৭১)।” পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে হেলিকপ্টারে করে লিফলেট ছড়াত-“শ্রী তাজউদ্দিন হিন্দু্‌স্থানে গিয়া হিন্দু হইয়াছেন…”
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লাহ তার “ইস্ট পাকিস্তান টু বাংলাদেশ” গ্রন্থে শহীদ মিনারের বর্ণনা লিখেছে-
“…হাই স্কুল পেরুবার সময় আমরা দেখলাম একটা শহীদ মিনার, কোথাকার কোন ভাষা আন্দোলনের সময় নাকি ঢাকার দুই তিনজন ছাত্র মারা যায়… তারপর থেকেই হিন্দুয়ানি বাংলার প্রতিটি স্কুলে স্কুলে শহীদ মিনার গজায়। জিনিসটার একটু বর্ণনা দেই। মিনারের পাদদেশে আছে একটি কবর। প্রতিদিন সকালে মিনার প্রদক্ষিণ একটা রিচুয়াল। খালি পায়ে, হাতে ফুল নিয়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নিতে হয়।”
পাকিস্তানিরা প্রকাশ্যে যেভাবে হিন্দুদের হত্যা করছিল সেটার সানডে টাইমসের পাকিস্তান-প্রতিনিধি অ্যান্থনি ম্যারেসকানহাসের বিখ্যাত ‘জেনসাইড’ প্রবন্ধে পরিস্কার ভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়-

“আবদুল বারী ভাগ্যের ভরসায় দৌড় দিয়েছিল। পূর্ব বাংলার আরো হাজার মানুষের মতো সেও একটা ভুল করে ফেলেছিল-সাংঘাতিক ভুল-ও দৌড়াচ্ছিল পাকসেনাদের একটি টহল-সেনাদলের দৃষ্টিসীমার মধ্যে। পাকসেনারা ঘিরে দাঁড়িয়েছে এই চব্বিশ বছরের সামান্য লোককে। নিশ্চিত গুলির মুখে সে থরথরিয়ে কাঁপে। “কেউ যখন দৌড়ে পালায় তাকে আমরা সাধারণত খুন করে ফেলি,” ৯ম ডিভিশনের জি-২ অপারেশনস-এর মেজর রাঠোর আমাকে মজা করে বলেন।
“ওকে খুন করতে হবে কেন?” উদ্বেগের সঙ্গে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম।
“কারণ হয় ও হিন্দু, নয়তো বিদ্রোহী, মনে হয় ছাত্র কিংবা আওয়ামী-লীগার। ওদের যে খুজছি তা ওরা ভালমতো জানে এবং দৌড়ের মাধ্যমে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে।”
“কিন্তু তুমি ওদের খুন করছো কেন? হিন্দুদেরই বা খুঁজছ কেন?” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম। রাঠোর তীব্র কন্ঠে বলেন: “আমি তোমাকে অবশ্যই মনে করিয়ে দিতে চাই, তারা পাকিস্তান ধ্বংস করার কী রকম চেষ্টা করেছে। এখন যুদ্ধের সুযোগে ওদের শেষ করে দেয়ার চমৎকার সুযোগ পেয়েছি।”
অবশ্য, তিনি তাড়াতাড়ি যোগ করেন, “আমরা শুধু হিন্দুদেরই মারছি। আমরা সৈনিক, বিদ্রোহীদের মতো কাপুরুষ নই।”
পাকিস্তানিদের এই হিন্দু বিদ্বেষ যে কি ভয়াবহ রকম প্রকট ছিল সেটা আরও ভালো করে বুঝতে হলে আমাদের বর্তমান পাকিস্তানি পাথ্যপুস্তক গুলোতে একটু নজর বোলাতে হয়। দেখা যায় কি নির্লজ্জভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য এখনো দায়ী করা হয় ‘হিন্দু সম্প্রদায়’-কে। আসুন ঘুরে আসি পাকিস্তানের ক্লাস ফাইভ, ক্লাস নাইন এবং ক্লাস টেন-এর সরকারি পাঠ্যপুস্তক থেকে।
পঞ্চম শ্রেণি:
— ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সহযোগিতায় সেখানকার অধিবাসীদের পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে। পরে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে। ভারতের ষড়যন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়ে যায়।
নবম শ্রেণি:
— পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহুসংখ্যক হিন্দু শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। হিন্দু শিক্ষকেরা বাঙালিদের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে।
দশম শ্রেণি:
— পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় এক কোটি হিন্দু বাস করত। ভারত তাদের স্বার্থ বাস্তবায়নে এই হিন্দুদেরকে ব্যবহার করে। ভারত পূর্ব পাকিস্তান পৃথক করতে চেয়েছিল। অনেক হিন্দুই ভারতের চর হিসেবে কাজ করে।
তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার পাকিস্তানের সামরিক জান্তা, শিক্ষাবিদ, মৌলবাদী, প্রগতিশীল প্রতিটা শ্রেণিই এটা শিখে শিখে বড় হয়েছে যে কিছু “হিন্দু শিক্ষক” বাঙালির মাথা খেয়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করেছে, কারণ তারা তাদের পাঠ্যপুস্তকে এমনটাই শিখছে।
মজার বিষয় হোক প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে আমাদের দেশের অনেক মানুষের ভেতরেই এই ভাবনাটা এখনো বিরাজমান। ১৯৭১ সালে যে শর্ষীনার পীর সাহেবের জারি করা ফতোয়ায় বাঙালি হিন্দু নারীদের “মালে গণিমত” আখ্যা দিয়ে সাচ্চা ঈমানদার পাকিস্তানি ভাইদের জন্য হালাল ঘোষণা করা হয়। এই ফতোয়ার কথা উল্লেখ করা হয় দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ১৯শে ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। এরপর সংকলিত হয় স্বাধীনতা যুদ্বের দলিল অষ্টম খণ্ডে, পীরের বাহিনী কর্তৃক লাঞ্ছিত স্বরুপকাঠির বারতী রানী বসুর বর্ণনায়। এই কৃতকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ শর্ষীনা পীর সাহেব মাওলানা আবু জাফর মোঃ সালেহ স্বাধীনাতার মাত্র ৯ বছর পর ১৯৮০ সালে এবং ৪ বছর পর ১৯৮৫ সালে আবারো। মোট দুই দুই বার স্বাধীনতার পদক দেওয়া হয়। শুধু এটুকুই নয় এই বিশিষ্ট ব্যাক্তিকে একুশে পদক পর্যন্ত দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারও বাতিল করে নাই এই স্বাধীনতা ও একুশে পদক।
এখন প্রশ্ন এসে যায় এতকিছুর পরেও কেন বাঙালি হিন্দুরা যুদ্ধে গিয়েছিলেন? কেন জীবন দিয়েছিলেন? কথা সাহিত্যিক আহমদ ছফা তার ‘বঙ্গভূমির আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ : বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’ প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে সহজ কথাটা সহজে বলে গিয়েছেন-
“পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি ছিল বাঙালি তথা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানিদের স্বাধিকার আন্দোলনের মুখ্য দাবি। স্বভাবতই বাংলাদেশের হিন্দুরা এই আন্দোলনের সাথে নিজেদের জড়িত করে ফেলেন। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের আওতা থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাঁরা সেখানে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মতো সব রকম নাগরিক অধিকার পাবেন।
এই একটি মাত্র আকাঙ্ক্ষায় তাড়িত হয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এই যুদ্ধের কাছ থেকে তাঁদের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। তাঁদের জানমালের ওপর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে একক সম্প্রদায় হিসেবে অন্য কারো সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু-সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেছে-বেছে হিন্দু বস্তিতে আগুন লাগানো, তাঁদের বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, অধিবাসীদের হত্যা করা, মঠ-মন্দির ধ্বংস করা, এসবের পেছনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা সুগঠিত পরিকল্পনা ছিল…”
প্রবন্ধের শুরুতে বলেছিলাম কয়েক দশকের ভেতরেই হয়ত এদেশ হিন্দুবিহীন হয়ে যাবে। এই লাগাতার সাম্প্রদায়িক আক্রমণ, লুটপাট, খুন-ধর্ষণের বিপরীতে আমাদের সরকারকে তেমন একটা সোচ্চার হতে দেখা যায় না বরং তারা রক্ত দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রধর্ম হয়ে যায় ইসলাম।
অধিকাংশ মুসলামানের দেশ বাংলাদেশে এই যুক্তিতে যদি রাষ্ট্রধর্ম হয় ইসলাম তাহলে আমার যুক্তি হবে এই বাংলাদেশ গঠনের পেছনে যে লাখ লাখ অসাম্প্রদায়িক হিন্দু-মুসলিমের রক্ত লেগে আছে, যাদের পাকিস্তানিরা হত্যা করেছিল ধর্মের দোহাই দিয়ে-সেই নিহত শহীদদের জিজ্ঞাসা করা হোক তারা কি পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বিপরীতে আরেকটা ধর্মতান্ত্রিক মৌলবাদি রাষ্ট্রকে মেনে নেবে? সম্ভবত না।

অধ্যাপক বারাকাতের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণ করে আজ থেকে ৩০ বছর পরে যদি এই ভূখণ্ড থেকে হিন্দু সম্প্রদায় নিঃশেষ হয়ে যায় তাহলে সেই দিনটাকে আমি বলতে পারব ৭৫ বছর পর পাকিস্তানি আদর্শের শতভাগ পুনর্বিজয়।

Share.

Leave A Reply

Translate »