অভিজিৎ রায়ের শিক্ষা – চিন্তার স্বাধীনতা

Share this:

মুক্তবুদ্ধি এবং চিন্তার স্বাধীনতা বিষয়ক অনুধাবন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় অভিজিৎ রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ, মতামত প্রাসঙ্গিকতার বিচারে  অনন্য অবস্থানে থাকবে সবসময়

 

এক

১৯২২ সনে বার্টরান্ড রাসেল লিখলেন, ‘মনকিউর কনওয়ে, যার সম্মানে আমরা আজ একত্রিত হয়েছি, তিনি তাঁর জীবন দুটি মহান উদ্দেশ্যের জন্য উত্সর্গ করেছিলেন: চিন্তার স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা। তাঁর সময় থেকে এ পর্যন্ত এই দুটি উদ্দেশ্যের কিছু অর্জন হয়েছে, আবার কিছু হারিয়ে গেছে। এই স্বাধীনতার বিপক্ষে যে নতুন শক্তি সৃষ্টি হয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে যদি সচেতন ও জোরালো জনমত জাগ্রত না করা যায়, তবে এখনকার তুলনায় এক শ বছর পরে আমরা এদের আরো হারাব।’ এক শ বছর পার হয়ে গেছে রাসেলের এই বক্তৃতার পরে, এই এক শ বছরের আসলেই আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি।

কিন্তু কে ছিলেন মনকিউর কনওয়ে? আমেরিকায় দাস প্রথা বিলুপ্তির জন্য এক সোচ্চার কন্ঠ ছিলেন কনওয়ে, বিলেতে নারীদের ভোট দেবার অধিকার আদায়ে এবং সার্বিকভাবে মানুষের মুক্তচিন্তার সোচ্চার সমর্থক। আমার জন্য যেটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং সেটা হলো কনওয়ে ১৮৮৩-৮৪ সনে ভারতে ও সিংহলে গিয়েছিলেন, এবং ১৯০৫ সনে সেই ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে লিখলেন, ‘পুবের জ্ঞানী মানুষদের কাছে তীর্থযাত্রা’। বইটি সংগ্রহ করে আমি তাঁর কলকাতা ও বোধগয়া ভ্রমণের অংশটা পড়লাম, সেখানে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও সৈয়দ আমীর আলীর সঙ্গে সঙ্গে কনওয়ের সাক্ষাতের বিবরণ আছে। যে জিনিসটা আমাকে চমৎকৃত করল তা হলো মনকিউর কনওয়ে, যিনি উদারপন্থী ধারার ধর্মযাজক ছিলেন, কীভাবে তাঁর জন্য অনভ্যস্ত মতবাদ, বিশেষত প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক মতবাদকে বর্ণনা করেছেন। রাসেলের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে কনওয়ের কথাটি আনলাম, ১৮৮৩ সনে বাংলায় নবজাগরণ হচ্ছিল, পুরাতন সনাতন প্রথা থেকে বের হয়ে আসার জন্য সেসময় বহু বুদ্ধিবাদী বা যুক্তিবাদী (rationalist) মানুষের আবির্ভাব হয়ে, এতে ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রভাব নিঃসন্দেহে ছিল। যে জিনিসটা সে সময়েও যুক্তিবাদী মানুষেরা জোর দেন সেটা হলো বিচারমূলক চিন্তন (critical thinking)।

বিচারমূলক চিন্তন হলো, কোনো সমস্যার মূল এবং আনুষঙ্গিক প্রশ্নগুলোকে চিহ্নিত করে উত্তরে পৌঁছানোর পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট করা। একই সময়ে মূল সমস্যাটি যেভাবে উপস্থাপনা করা হয় তাতে যদি কোনো অনুল্লিখিত আইডিয়া থাকে, সেটিকে চিহ্নিত করাও এই চিন্তনের কাজ। ১৬২০ খ্রিষ্টাব্দে, ফরাসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক রেনে দেকার্ত বিচারমূলক চিন্তন অনুশীলনের জন্য ২১টি নীতি লিখে যান, এর মধ্যে ১২টি হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সংক্রান্ত। দেকার্ত লিখলেন, ‘যে বিষয়বস্তু নিয়ে আমরা অনুসন্ধান করব তা নিয়ে অন্য মানুষ কী ভেবেছে অথবা আমরা কী অনুমান করছি তা বিবেচ্য নয়, বরং আমাদের স্বজ্ঞা ও অবরোহন পদ্ধতিতে স্বচ্ছভাবে যা নির্ধারণ করব তাই গ্রাহ্য। জ্ঞান আহরণের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।’ কিন্তু বিচারমূলক চিন্তনের ইতিহাস আরো পুরোনো, এর জন্য আমাদের আড়াই হাজার বছর আগে ফিরে যেতে হবে সক্রেটিসের সময়ে যিনি কিনা কোনো কর্তৃপক্ষের প্রাধিকারকে অস্বীকার করেছিলেন। সক্রেটিস বেঁচে ছিলেন খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে, বলেছিলেন, ‘একটি অপরীক্ষিত জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা মূল্যহীন।’ সক্রেটিসের সময়টি ছিল যুদ্ধের, এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ, এথেন্সের নিজের মধ্যেও। সক্রেটিসকেও যুদ্ধে যেতে হয়েছিল। তাঁর পদ্ধতি ছিল প্রশ্ন, উত্তর, প্রতি-প্রশ্ন, প্রতি-উত্তর এসবের মাধ্যমে সত্যের সন্ধান করা। তাঁর নিজের কোনো লেখা ছিল না, কিন্তু তাঁর শিষ্য প্লেটোসহ অন্যান্যদের কাছ থেকে আমরা এই সক্রেটিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারি। সক্রেটিসকে এথেনীয় দেবদেবীর প্রতি কটাক্ষ ও তরুণদের বিপথগামী করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বর্তমান সময় সক্রেটিস বেঁচে আছেন এক কিংবদন্তীর মতন, ব্যক্তিগত মতবাদ হোক কি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা হোক, সেখানে জ্ঞান অর্জনের পন্থা হিসেবে অথবা নিজস্ব আইডিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে সক্রেটিসকে সবসময় স্মরণ করা হয়।

ইদানীংকালে critical thinking উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বলতে গেলে শিক্ষার শেষ উদ্দেশ্যই হলো মানুষের মনে এই পদ্ধতিকে প্রোথিত করা। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে সেটি শুধুমাত্র কিছু গাণিতিক প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধানে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বিচারমূলক চিন্তন কোনো জটিল প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি আভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া যা কিনা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে শানিত করবে। এই চিন্তা – একটি সেতু বানাতে গেলে কত কী ধরণের এবং কত পরিমাণ স্টিলের দড়ি লাগবে – শুধু সেই হিসাব নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট উপসংহারে উপনীত হতে হলে সামগ্রিকভাবে কী পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, অথবা একটি নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ঘটনাকে কীভাবে বিচার করা যায় সেটির অনুশীলন করায়।

তাই অনেকে জটিল সমীকরণ সমাধান করতে পারলেও জীবনের বহু ক্ষেত্রে তারা এমন সব ভাবনার বশবর্তী হয় যা কিনা বিচার-বুদ্ধি-বিবেচনার একেবারেই উল্টো। একজন দক্ষ প্রকৌশলী এমন সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করবে যা কিনা একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন মানুষও কল্পনা করতে পারবে না। মার্কিন দেশেই এরকম উদাহরণ প্রচুর – করোনা ভাইরাসে আসলে মানুষ মারা যায়নি, এটা একটা সরকারি চাল; কিংবা কোভিডের টিকার মধ্যে মাইক্রোচিপ ঢোকানো যা দিয়ে মানুষকে অনুসরণ করা যায়, অথবা জলবায়ু পরিবর্তন বলে কিছু নেই, এটাও একটা সরকারি প্রপাগান্ডা – এগুলো কয়েকটা উদাহরণ মাত্র। বাংলাদেশের এক রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে দেখলাম চাঁদে মানুষ আদৌ গেছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে, তার মূল যুক্তি হলো – যদি অত আগে গিয়েই থাকে তাহলে পরে যেতে পারল না কেন। কেন অ্যাপোলো প্রোগ্রাম গুটিয়ে ফেলা হলো (মূলত বাজেটের কারণে), মহাকাশে সোভিয়েতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কেমন করে আর গুরুত্বপূর্ণ রইল না, কেমন করে NASAর জন্য অন্যান্য জ্যোতির্বিদ্যার বিষয় প্রাধাণ্য পেল এসব তার এবং অন্যান্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষের সার্বিক চিন্তার মধ্যে আসবে না। এদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, এই সময়ের কারিগরি উদ্ভাবনের অন্যতম পথপ্রদর্শক ইলন মাস্কও দেখলাম এই দোষে দুষ্ট।

এত বড় উপক্রমণিকা করলাম এই জন্য যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের বিশ্বাস বিচারমূলক চিন্তনকে হারিয়ে দেয়, অনেক বিজ্ঞানীই বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারে না। এর মূল কারণ হলো তারা critical thinking-এর মর্মার্থ বুঝতে অক্ষম হয়েছে। অভিজিৎ রায় তাঁর সুবিশাল ‘অবিশ্বাসের দর্শনে’র ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের উপকার গ্রহণে আমরা যত না আগ্রহী তার চেয়ে বেশি আগ্রহী বিজ্ঞানের চেতনা পরিহারে।’

বিজ্ঞানমনস্ক না হবার একটি অন্তরায় হলো ‘জ্ঞান’-এর কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা নেই। এছাড়া জ্ঞানের প্রেরক (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,শিক্ষক, বই, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি) এবং গ্রাহকের (ছাত্র, সাধারণ মানুষ) মধ্যে যদি সাযুজ্য না থাকে তবে জ্ঞানের স্থানান্তরন হবে না; ছাত্রর যদি শিক্ষার বিষয়বস্তুকে গ্রহণ করে তার অন্তর্নিহিত অর্থকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে সেই শিক্ষা কার্যকরী হবে না। আমি অবশ্য ‘ছাত্র’ বলতে প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্র বলতে চাইছি না, বরং আরজ আলী মাতুব্বরের মতো ‘প্রাকৃতিক ছাত্র’ বোঝাচ্ছি। তাঁর ‘সত্যের সন্ধান’-এ প্রবন্ধে আরজ আলী লিখছেন ­–

‘‘দূরত্বহীন যাতায়াত কি সম্ভব ? শোনা যায় যে, স্বর্গীয় দূত জেব্রাইল আল্লাহর আদেশ মত নবীদের নিকট অহি (বাণী) লইয়া ’আসিতেন’ এবং তাহা নাজেল (অর্পণ) করিয়া চলিয়া ‘যাইতেন’। ‘আসা’ ও ‘যাওয়া’ – এই শব্দ দুইটি গতিবাচক এবং গতির আদি ও অন্তের মধ্যে দূরত্ব থাকিতে বাধ্য। আল্লাহতয়ালা নিশ্চয় নবীদের হইতে দূরে ছিলেন না। তবে কি জেব্রাইলের ‘আসা’ ও ‘যাওয়া’ দূরত্বহীন? আর দূরত্ব থাকিলে তাহার পরিমাণ কত (মাইল)?’’

বিচারমূলক চিন্তনের এটি একটি চমৎকার উদাহরণ। আরজ আলীর প্রশ্নটির কোনো ধর্মীয় দার্শনিক উত্তর হতে পারে, কিন্তু তাঁর চিন্তা দেকার্তের ‘স্বজ্ঞা ও অবরোহন পদ্ধতি’ অবলম্বন করে স্বচ্ছতা দাবি করছে। আমাদের সামগ্রিক বিকাশে এই ‘স্বচ্ছতা’র প্রয়োজন, এই স্বচ্ছতার বোধ না থাকলে শিক্ষক প্রকৃত শিক্ষক হয় না, আর ছাত্ররা যদি শিক্ষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা দাবি না করে তবে তারা প্রকৃত ছাত্রও হয় না।

দুই

অভিজিৎ রায় স্বচ্ছতা দাবি করেছিলেন। দাবি করেছিলেন নিজের কাছেই। সক্রেটিসের মতনই চেয়েছিলেন পরীক্ষিত জীবন। অভিজিতের চিন্তা বিচারমূলক চিন্তারই ফসল। এখানে সমস্যা হলো সব মানুষের গ্রহণক্ষমতা এক নয়, অনেকেই বুঝবে না ‘পরীক্ষিত জীবন’ কী। আগেই উল্লেখ করেছি প্রেরক ও গ্রাহকের মধ্যে সাযুজ্য থাকতে হবে। ভাষা এক হতে হবে, যুক্তির পন্থা এক হতে হবে। অভিজিৎ যে ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালবাসিলাম’ পথ বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই তা বুঝতে অক্ষম হয়েছে।

অভিজিৎ ‘অবিশ্বাসের দর্শনে’ উইলিয়াম প্যাল নামে এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ইংরেজ ধর্মযাজক প্যালে ১৮০২ সনে লিখলেন, ‘বনের পথ পাথরে হোঁচট খেলে আমরা আশ্চর্য হব না, পাথরটি সেখানে পড়ে ছিল অনন্তকাল ধরে; কিন্তু আমি যদি সেই বলে একটি ঘড়ির সন্ধান পাই নিশ্চয় আমি ভাবব না যে, ঘড়িটি সেখানে অনন্তকাল ধরে পড়ে আছে।’ অর্থাৎ ঘড়িটির একজন নির্মাতা আছে (বা ছিল)। এই কথনটি ‘ঘড়িনির্মাতার উদাহরণ’ নামে খ্যাত, যেটার মূল বক্তব্য হলো, মানুষ এত নিখুঁত যে সে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হতে পারে না, এর জন্য একজন ঘড়িনির্মাতা লাগবে।

এখানে প্রথমেই আপত্তি করা যেতে পারে যে, মানুষ খুব একটা নিঁখুত নয় – মানুষকে এরকম জৈবিক জড়ার শরীর না দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা যেতে পারত যা কিনা শুধুমাত্র আলো গ্রহণ করে বেঁচে থাকত, এবং নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে, গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে ভ্রমণ করতে পারত, অনন্ত মহাবিশ্বের সৃষ্টির অপার মহিমা আস্বাদন করতে পারত। আচ্ছা, এটা না হয় ছেড়েই দিলাম, যে ঘড়িনির্মাতা এই প্রকৃতি সৃষ্টি করেছে সে নিশ্চয় সরল কিছু নয়, কাজেই তাকেও সৃষ্ট হতে হয়েছে। প্যালের মতো মানুষের এখানে যুক্তি হবে – না, সেই ঘড়িনির্মাতা সৃষ্ট হয়নি, সে অনাদিকাল থেকে আছে। অথবা সে কোনো কোনো পুরাণের মতানুযায়ী (সব পুরাণের মত এক নয়) ব্রহ্মার মতো স্বয়ম্ভূ, অর্থাৎ স্বজন্ম বা নিজে নিজেই প্রকাশিত। আমাদের বিচারমূলক চিন্তন তখন বহু প্রশ্নের উদ্রেক করবে, একটি সূক্ষ্ণ ঘড়ির কলকব্জা বানাতে একজন ঘড়িনির্মাতার প্রয়োজন, সেই ঘড়িনির্মাতা নিশ্চয় ওই ঘড়ি থেকে জটিল ও সূক্ষ্ণ হবেন, তাহলে তাকে সৃষ্টি করার জন্য জটিলতর ঘড়িনির্মাতা দরকার, এভাবে আমরা একটা অসীম ধারার কথা চিন্তা করতে পারি যার রাশিগুলি হবে ঈশ্বর থেকে মহাঈশ্বর, মহাঈশ্বর থেকে মহামহাঈশ্বর, ইত্যাদি।

আর তিনি যদি স্বয়ম্ভূ হন, তবে কীসের থেকে তিনি স্বয়ম্ভূ হলেন, কীসের তাড়নায়, আর কেনই বা স্বয়ম্ভূ একটি সৃষ্টি এত জটিল অস্তিত্ব নিল? জটিল অস্তিত্ব এই জন্য বলছি তাঁকে পদার্থবিদ্যার নিয়মনীতি উদ্ভাবন করতে হলো, সেগুলো দিয়ে নক্ষত্র সৃষ্টি করলেন, নক্ষত্রের ভেতরে ভারি মৌল বানালেন যেগুলো বহু পরে মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজন, আট কোটি বছর অপেক্ষা করে সৌর জগৎ বানালেন, আরো সাড়ে পাঁচ কোটি বছর অপেক্ষা করলেন মানুষ বানাতে, এবং তাতেও ক্ষান্ত হলেন না, সেই মানুষের জন্য আবার নিয়মনীতি বেঁধে দিলেন। এতসব যিনি করবেন তিনি কোনো সরল কিছু নন, কাজেই আমাদের ধরে নিতে হবে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা শুরু থেকেই একটা জটিল অস্তিত্ব। এরকম জটিলতার স্বজন্ম হতে পারে কিনা সেটি একটি যথার্থ প্রশ্ন। দর্শন অর্থে এটি অথবা অনন্ত ঈশ্বরের সারি আলোচনাটি ইন্টারেস্টিং, আমাদের সীমিত জীবনে আমরা এই নিয়ে ভাবতে চাই, এটাকে চাপাতি বা সরকারি আইন দিয়ে ঠেকালে শুধু যে ব্যক্তিবিশেষের চিন্তার স্বাধীনতা খর্ব হবে না, যে সমাজ সেটা করতে চায় সেই সমাজের চিন্তা চেতনা ধীরে ধীরে বন্ধ্যা হতে বাধ্য।

শেষ বাক্যটির কি কোনো প্রমাণ আছে? স্পেনে ও পর্তুগালে দীর্ঘ সাড়ে তিন শ বছর ক্যাথলিক চার্চ ইনকুইজিশন নামে এক ভয়াবহ পদ্ধতি বজায় রেখেছিল, যেখানে তাদের মতে প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে মানুষদের নিপীরণ করা হতো। ইতালিতেও এটি বজায় ছিল এবং কিছুটা কম আকারে ফ্রান্সে। ইদানীংকালের গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্পেনের যে সমস্ত জেলায় ইনকুইজেশনের মাত্রা বেশি ছিল সেখানে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের মাত্রাই কম নয়, শিক্ষার মানের সাথে সেখানে মানুষের একে অপরের প্রতি বিশ্বাসও কম। একটি শিশুকে উপযুক্ত খাদ্য না দিলে তার মানসিক বিকাশ সম্ভব নয়, একটি জাতির মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করলে তার স্বাস্থ্য ভালো হবার পথ থাকে না।

তিন

তাহলে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে এসে আমাদের বিচারমূলক চিন্তা কোথায় অবস্থিত? ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিকল্প চিন্তার লেখকদের চরমপন্থীরা যে অজুহাতে হত্যা করেছিল এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে যে ভয়টি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল সেটি এখনো বিদ্যমান। এটির প্রভাব সাধারণ বিজ্ঞান লেখায়ও পড়েছে। অভিজিতের সাহসী বিজ্ঞান লেখা এখন অনুপস্থিত। পত্রিকার সম্পাদকেরা ‘বিবর্তন’, ‘এভোল্যুশান’ বা ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এরকম কথাগুলো এড়িয়ে যান; পাঠ্যপুস্তকে, এমনকি বিজ্ঞানের বইতে ধর্মীয় বাণী সংযুক্ত করা হয়। ঢাকার জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যাদুঘরে ভূমিকম্পের একটি প্রজেক্টের পাশে দেয়ালে একটি উক্তি দেখা যায় – ‘ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলায় শহর, বন্দর, জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, মহান সৃষ্টিকর্তার ক্ষমতার কাছে মানুষ কত অসহায়।‘ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন বিজ্ঞান শিক্ষার মূল্যকে অবনমন করানো হয়, তখন বেসরকারী পর্যায়ে কী আশা করা যায়? এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিমান ছাড়বার সময় সর্বশক্তিমানকে স্মরণ করে, এমনকি সরকারি লিফটের ভেতর ওপরে বা নিচে নামার জন্য বিশেষ দোয়ার সুপারিশ করা থাকে।

অনেকে বলতে পারেন, উন্নত দেশে যেখানে বিজ্ঞানশিক্ষা ও প্রকৌশল ব্যবহার অগ্রসর সেখানে কি সবাই প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বে বিশ্বাস করে? তারা সবাই কি পৃথিবীর প্রাচীনত্বে (পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে চার কোটি বছর) আস্থা রাখে? এর উত্তর হল ‘না,’ যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় অংশ বিবর্তনবাদ বা পৃথিবীর প্রাচীনত্বে বিশ্বাস করে না। কোভিড মহামারীর চরম সময়ে অনেকে টীকা নেবার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করেছে, এবং টীকার বিরুদ্ধে রাজনীতিও করেছে। এর পরিণতি যে মারাত্মক হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু এখানে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল মার্কিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় গবেষণা সংস্থাসমূহ ক্রমাগতই বিজ্ঞানকে,প্রকৌশলকে অগ্রসর করে যাচ্ছে, বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের একটি সিংহভাগ এদেশে আসে। এর অন্যতম কারণ হল সহযোগিতা ও স্বচ্ছতা। গবেষণাভিত্তিক যুক্তিনির্ভর তথ্যটি প্রকাশ করতে বিজ্ঞানীরা, বিজ্ঞান লেখকেরা ভয় পান না। কারণ সেখানে একদিকে ব্যক্তিগত বাক-স্বাধীনতা ও অপরদিকে শিক্ষা-প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা উভয় স্বাধীনতারই গ্যারান্টি আছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে এরকম মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে – “৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।” এই স্বাধীনতা কি কার্যত উপভোগ করা যায় কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয়।

এরপরে আসি academic freedom সম্পর্কে। ১৯৯৭ সনে ইউনেস্কো পৃথিবীর সব উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও গবেষকদের অধিকার নিয়ে কিছু সুপারিশ দিয়েছিল, এর মধ্যে এই বাক্যটি ছিল – “শিক্ষা, শিক্ষাদান এবং গবেষণার অধিকার সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসু হয় উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিতে একাডেমিক স্বাধীনতা এবং স্বায়ত্তশাসনের পরিবেশে। অনুসন্ধান, অনুকল্প এবং মতামতের উন্মুক্ত যোগাযোগই হল উচ্চশিক্ষার আদর্শ এবং এই পদ্ধতিটি জ্ঞান-অন্বেষণ, গবেষণার নির্ভুলতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার জন্য বড় নিশ্চয়তা।” ওই সুপারিশপত্রে আরো বলা হয়েছিল – “উচ্চ-শিক্ষার শিক্ষকদের, অন্যান্য সমস্ত গোষ্ঠী এবং ব্যক্তির মতো, সমস্ত নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারগুলি প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। অতএব, সমস্ত উচ্চ-শিক্ষার শিক্ষকদের চিন্তা, বিবেক, ধর্ম, মত-প্রকাশ, সমাবেশ ও সংঘের স্বাধীনতা, এবং সেইসাথে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এবং চলাফেরার স্বাধীনতা উপভোগ করা উচিত।” এই ধারণাগুলি বাংলাদেশের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে যথাযথভাবে প্রয়োগ হয় তা বলা চলে না, অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নির্দেশনামা দেন যা হয়তো একাডেমিক স্বাধীনতাকে খর্ব করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা একটি চলমান বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী (amendment) বা সংযোজনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখে এর পক্ষে রায় দিয়েছে। এখানে হয়তো প্রথম সংশোধনীটা উল্লেখ করা যেতে পারে, সেটিকে মোটামুটি এভাবে বলা যায় – “কংগ্রেস (কোনো বিশেষ) ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে আইন প্রণয়ন করবে না, আবার তার অবাধ অনুশীলন নিষিদ্ধ করতেও কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। অন্যদিকে বাক স্বাধীনতা অথবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করার জন্য, জনগণের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হবার বিরুদ্ধে এবং (কোনো) অন্যায়ের প্রতিকারের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করার অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।” (লক্ষ করুন এর সঙ্গে বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদটির মিল।)

ইদানীংকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাপক এবং গবেষকরা তাদের বক্তব্যের জন্য রাজনৈতিকভাবে বাম এবং ডান উভয় দিক থেকেই চাপ অনুভব করছেন। অনেকক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বরখাস্ত করলেও পরে আইনত (প্রথম সংশোধনী অনুসারে) তাদের আবার পুনর্বহাল করতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্টের রায় একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করছে। বলা প্রয়োজন যে, এইসব ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করার উপায় নেই এবং অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ ও নিষ্পত্তি সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই হয়, নইলে আদালতে যায়, কিন্তু এখানে রাষ্ট্রের সাধারণত কোনো ভূমিকা নেই।

এই জিনিসটা অন্তত বোঝা যাচ্ছে যে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে যৌক্তিক, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন, জ্ঞানভিত্তিক একটি সমাজে পরিণত করার জন্য ভীতিহীন একটা পরিবেশ দরকার যেখানে সক্রেটিক পদ্ধতির চর্চা সম্ভব। সেই ভীতিহীন যুক্তিবাদী সমাজ গড়া যে কী কঠিন সেটি আর একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। আপনাদের খেয়াল আছে যুদ্ধাপরাধী বিচারের সময়, ২০১৩ সনে, চাঁদে দেলোয়ার হোসেন সায়েদীর মুখাবয়ব দেখা যাচ্ছে বলে প্রচারণা চালানো হয় ও পুলিশ ফাঁড়ির ওপর আক্রমনে গ্রামবাসীদের প্ররোচিত করা হয়। কয়েকদিনের তাণ্ডবে বহু মানুষ নিহত হয়। চাঁদের বুকে যে কারুর অবয়ব ফুটে ওঠা সম্ভব নয় সেটা হল একটা ব্যাপার, আর উঠলেও সায়েদীর মতো কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীর ছবি কেন উঠবে সেটা হল আর একটা। প্রথমটি বিজ্ঞানের দৃষ্টি থেকে নাকচ করে দেয়া সহজেই, দ্বিতীয়টির কারণ আরো গভীর এবং সেটির নিরাময় সহজে সম্ভব নয়। দেশের জনগণের একটি বড় অংশ ১৯৭১-এর যে নৃশংসতা হয়েছে সে সম্বন্ধে অজ্ঞ, অথবা মনে করে যে, সায়েদী ১৯৭১-এ পাকিস্তান (বা ইসলাম) রক্ষার্থে যা করেছে তা সঠিক। এই দ্বিতীয় প্রপঞ্চটি আমাদের আলোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দার্শনিক মঞ্চের ওপর ভিত্তি করেই ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বিজ্ঞান লেখকের ওপর আক্রমণ করা হয় এবং সেটি যে ভীতির সঞ্চার করে তার প্রভাব আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। দেশের যাঁরা রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী তারা এই ব্যাপারটিকে সরাসরি মোকাবেলা করতে ভয় পেয়েছেন এবং ধীরে ধীরে সঠিক জায়গা থেকে সরে এসেছেন।

চার

অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর ন’টি বছর কেটে গেল। এর মধ্যে এক বছরের ওপর হয়ে গেল তাঁর হত্যায় সাজাপ্রাপ্ত দুজন পুলিশের হাত থেকেই পালিয়েছে, পুলিশ তাদের কোনো হদিশ করে পারেনি, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমেও এই খবরটি আর স্থান পায় না। অভিজিৎ রায় মানসিক চিন্তার স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, আরো অনেকে চেয়েছিলেন। নিহত লেখক ওয়াশিকুর রহমান বাবুর মা হয়তো এটা বলেছিলেন, একটা মানুষ কত কী-ই না ভাবে, শুধু সে জন্য তাকে মেরে ফেলতে হবে। একটি দেশ উন্নতির পথে পা বাড়িয়েছে, একই সাথে সে তার সত্তা হারাচ্ছে, এই হত্যাগুলো দেশ মেনে নিয়েছে। সেই সত্তা ফিরে পেতে দেশের চিন্তকদেরও সেরকম আর মাথাব্যথা নেই। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্যারাডাইম (paradigm) বা মৌলতত্ত্ব বদলে বাংলাদেশ এখন নতুন প্যারাডাইমে প্রবেশ করেছে। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পনেরো বছর কিছু সাহসী তরুণ যে চিন্তার বিকাশের যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার মূল্যায়ণ করতে সেই প্যারাডাইম অপারগ। এই সময়টা এরকমই, কিছুটা অন্ধকারের।

 

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!