ধর্ষণ আইন সংস্কারে দশ প্রস্তাবনা

Share this:

ধর্ষণ এর বিচার শেষ করে তারপর প্রমানিত হলে ফাঁসি দেয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেইপর্যন্ত যেতে যে পথ পাড়ি দিতে হবে সেই পথটার খানাখন্দ কতটাবিপদসংকুল-তা নিয়ে আলোচনাই দশ প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য। এই সংগঠনগুলি নানানসময়ে গ্রামে এবং শহরে নানা ধরনের নারীকে আইনী এবং অন্যান্য সহযোগিতা দিতে গিয়েই এইসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সংস্কার প্রস্তাব এনেছে।

 

ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের সংস্কার বিষয়ে প্রচারণা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য ছিল ধর্ষনের শিকার নারীর জন্য, ন্যায়বিচার রোধ করে যেসব আইনী-প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ফাঁকফোকর- সেগুলো সনাক্ত করা এবং সেগুলো কাটিয়ে উঠতে প্রস্তাবনা দিয়ে আইন সংস্কার করা। সেই প্রচারণার কোথাও সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি ছিলনা। রেইপ ল রিফর্ম কোয়ালিশন নামে ১৬ টি সংগঠনের সমন্বয়ে এটি গঠিত হয়েছিল। ১০ দফা দাবী ছিল সেইখানে। দশদফা দাবী পরে উল্লেখ করছি। তার আগে বলে নিতে চাই, এই দশদফা দাবী নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা দেখা যায়নি। তার আগেই ফাঁসির আইন পাশ হয়ে গেছে!

এখন, এর-মধ্যেই নোয়াখালিতে আবার ধর্ষণ এবং বিবস্ত্র করে ভিডিও করাসহ আরো কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। ক্রমাগত চিৎকার করে গেছি যে, ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দেয়ার চেয়েও জরুরী হলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে আইনী প্রক্রিয়া র্পযন্ত যাওয়ার সবধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, আদালতে জেন্ডার সেনসেটিভ পরিবেশ তৈরি করা, সমাজে এবং রাষ্ট্রে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর উদ্যাগ গ্রহন। অবশ্য আমার,আমাদের বা কারোরই কোনও চিৎকার, যাদের শোনার কথা- তারা শুনে না। ফলে তেমন কোনও ফলাফলও আসে না।

 

১০টি আইনগত সংস্কার প্রস্তাবনা:

১. মানবাধিকার মানদন্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণ আইনের সংস্কার:

ধর্ষণের শিকার বা ধর্ষণ অপরাধের মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ( লিঙ্গ, জেন্ডার, যৌনতা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, প্রতিবন্ধিতা ও বয়স নির্বিশেষে) সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারে অভিগম্যতা নিশ্চিত করতেএবং নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সকলের অধিকার রক্ষা করতে বাংলাদেশের সংবিধানে যে মৌলিক অধিকার দেয়া আছে সেই অনুযায়ী এবং আন্তর্জাতিক যেসব মানবাধিকার আইন আছে তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণ আইন সংস্কার করতে হবে।

 

২. ধর্ষণের সংজ্ঞা, আইন বিস্তৃত করে তা বৈষম্যহীন করা: অপরাধী বা ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জেন্ডার নির্বিশেষে সম্মতিহীন সব ধরনের পেনিট্রেশনকে আওতাভুক্ত করে ধর্ষণের সংজ্ঞা পুন: সংজ্ঞায়িত করা।

 

৩. সকল ধরনের ধর্ষণকে আইনের আওতাভুক্ত করার জন্য “পেনিট্রেশন”কে সংজ্ঞায়িত করা:

পেনিট্রেশন এর সংজ্ঞা এমন হতে হবে যাতে করে ধর্ষণের শিকার বা ধর্ষণ অপরাধের মধ্য দিয়ে যাওয়া ব্যক্তির যোনি, মলদ্বার বা মুখে যৌনাঙ্গ পেনিট্রেশনসহ বিভিন্ন বস্তুর বা অপরাধীর শরীরের অন্যান্য অংগের পেনিট্রেশন অর্ন্তভূক্ত করা হয়।

 

৪. শাস্তির আনুপাতিকতা্ নির্দেশিকা দেয়া:

সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারকদের সুবিবেচনা প্রয়োগের সুযোগ করার জন্য আইন সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় সাজা দেয়ার নির্দেশিকা থাকা যাতে শাস্তির আনুপাতিকতা নিশ্চিত করা যায়। এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং শিকার উভয়ের বিভিন্ন দিক লক্ষ্য রাখতে হবে।

 

৫.ফৌজদারী  কার্যবিধি ১৮৯৮ আধুনিক করা:

এইখানে ভাষা, শ্রবণ ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে ধর্ষণ মামলায় সাক্ষ্য দিতে পারে এমন ব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে।

 

৬. ধর্ষণ মামলায় ধর্ষণের শিকার ব্যাক্তির চরিত্রগত সাক্ষ্যের ব্যবহার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ করা:

সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ এর ৪ ধারা এবং এ সংক্রা্‌ন্ত অন্যান্য ধা্রা সর্ম্পূর্ন রদ করতে হবে। আসামীপক্ষের আইনজীবীরা জেরার সময় অভিযোগকারীর চরিত্র নিয়ে অবমাননাকর কোনও প্রশ্ন করতে পারবে না।

 

৭. সাক্ষী সুরক্ষা আইন:

ভিকটিম ও সাক্ষীগণের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, জরুরী আশ্রয়, জীবিকা নির্বাহের সহায়তা, মনো-সামাজিক সহায়তা এবং প্রয়োজেন অনুসারে তাদের পরিচয় গোপনের সুরক্ষা, স্থানান্তরের সুরক্ষা এবং হুমকী না থাকার বিষয়সমুহ নিশ্চিত করা।

 

৮. ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালিত ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন:

ধর্ষণ প্রমাণ হওয়া সাপেক্ষে এই তহবিল থেকে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরনপ্রদানের ব্যব্স্থা রাখা।

 

৯. বিচারব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জেন্ডার সংবদেনশীলতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ:

পুলিশ, আইনজীবী( প্রসিকিউসন/ডিফেন্স), বিচারক এবং সমাজকর্মীদের জন্য জেন্ডার সংবদেনশীলতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন করা, যাতে  বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ধর্ষনের শিকার ব্যক্তির সাথে যথাযথ জেন্ডার সংবেদনশীল আচরণ নিশ্চিত করা যায়।

 

১০. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মতি সম্পর্কিত পাঠ অন্তর্ভূক্ত করা:

জেন্ডার এবং নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং প্রচলিত নারী বিদ্বেষী সামাজিক রীতিনীতি পরিবর্তন করার করার জন্য সম্মতি ও পছন্দের ধারণাসহ তথ্য প্রাথমিক থেকেই পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

 

এই হলো দশ প্রস্তাবনা। ১৬টি সংগঠনের মধ্যে রয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র, আইসিডিডিআরবি, উই ক্যান, উইম্যান ফর উইম্যান, এ্যাকশন এইড, এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন, ওয়াইডব্লিউসিএ, কেয়ার বাংলাদেশ, ব্রাক, নারীপক্ষ, বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস সহ আরো কয়েকটি সংগঠন।

এই দশ প্রস্তাবনার মধ্যে কোথাও ফাঁসি চাই দাবী নেই আগেই বলেছি। কেউ যদি খুব ভালোভাবে পয়েন্টগুলো পড়েন তাহলে এর যৌক্তিকতা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা না। এই সংস্কার সাধিত হলে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির যেসব দুর্ভোগ হয় তা এমনিতেই অনেকাংশেই কমে যাবে। ধর্ষণ এর বিচার শেষ করে তারপর প্রমানিত হলে ফাঁসি দেয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, সেইপর্যন্ত যেতে যে পথ পাড়ি দিতে হবে সেই পথটার খানাখন্দ কতটাবিপদসংকুল-তা নিয়ে আলোচনাই দশ প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য। এই সংগঠনগুলি নানানসময়ে গ্রামে এবং শহরে নানা ধরনের নারীকে আইনী এবং অন্যান্য সহযোগিতা দিতে গিয়েই এইসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সংস্কার প্রস্তাব এনেছে।

আমার মনে হয়েছে, এই সংগঠনগুলির এইসব প্রস্তাবনা আবারও আলোচনায় আসা উচিত। যারা রাস্তায় সংগ্রাম করেন তারা যেমন তুলে ধরতে পারেন এইসব প্রস্তাবনা, গণমাধ্যম এবং স্যোসাল অ্যাকটিভিস্টদেরও এসব নিয়ে বারবার বারবার কথা বলা উচিত। ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত না করে, আদালতের পরিবেশ নারীবান্ধব না করে “ফাঁসির আইন” নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার সুযোগ আছে কি না তা ভাবতে হবে।

 

Israt Jahan Urmi is a journalist and activist.

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top