অভিমত | পুলিশের ‘ভাব’ বনাম পুলিশের ‘মূর্তি’ | সহুল আহমদ

0

তবে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর জুলুমের মাত্রা ও তীব্রতা বেড়েছে বহুগুনে। পুলিশ বাহিনীর আগ্রহ যতটা ‘অপরাধ’ দমনে তার চাইতে বেশি আগ্রহ সমাজে ‘নৈতিকতা’র খবরদারির করার দিকে। সেলুনে ঢুকে কার চুলের স্টাইল কেমন হবে, পার্কে কে কীভাবে প্রেম করতে যাচ্ছে সেসব বিষয়ে নৈতিক খবরদারি করাই যেন আপাতদৃষ্টিতে পুলিশের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একেবারে সাম্প্রতিক আরেকটা ঘটনার কথা বলা যায়। একজন চিকিৎসক বিয়ে করেছেন নাপিতকে, কিন্তু বিষয়টা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না সিআইডির এসপি। এটা রীতিমতো ঘটা করে পুলিশ প্রেসকনফারেন্সও আয়োজন করে। সেখানে পুলিশ সুপার মিলু মিয়া বিশ্বাস জানান, একজন নাপিতকে বিয়ে করায় নারী চিকিৎসক অন্যায় করেছেন। স্বাধীনতা আছে বলেই তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। তিনি শুধু পরিবার নয়, চিকিৎসক সমাজকে লজ্জায় ফেলেছেন।

বাংলাদেশের পুলিশের ‘ভাবমূর্তি’ আবারো মারাত্মক ‘সঙ্কটে’ পড়েছে, তবে সেটা তাদের কর্মকাণ্ডে নয় বরঞ্চ কর্মকাণ্ডের চিত্রায়নের কারণে। অর্থাৎ পুলিশের কর্মকাণ্ডে তাদের ‘ভাবমূর্তি’র খুব একটা ক্ষতি হচ্ছে না, ক্ষতি হচ্ছে কেবল সেই ‘কাণ্ড’টাকে উপস্থাপন করলে। ফলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক যখন নবাব এলএলবি সিনেমার পরিচালক গ্রেফতার নিয়ে মন্তব্য করেন তখন তার বিষয়বস্তু পুলিশের ‘কাণ্ড’ থাকে না,  বরঞ্চ ‘কাণ্ডসমূহ’ তার কাছে ‘দুই-চারজনের নৈতিকতার স্খলন’ হিসাবে হাজির হয়। তার আর্জি [বা বলতে পারেন হুকুম] হচ্ছে, পুলিশের অবদানকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

পুলিশ ফাঁড়ির দেয়ালে দেয়ালে পুলিশের ‘ভাব’ নিয়ে নানান শ্লোগান সাটা থাকলেও পুলিশের আসল ‘মূর্তি’ কিন্তু মোটেও অমন নয়। অর্থাৎ পুলিশ একটা প্রতিষ্ঠান বা বাহিনী হিসাবে যে চেহারা নিয়া আমজনতার সামনে মূর্ত হয়ে উঠে সেটা মোটেও ‘পুলিশ জনতার বন্ধু’ শীর্ষক ভাবখানার সমান্তরাল কিছু নয়। সেই উপনিবেশ আমল থেকেই পুলিশ নামক প্রতিষ্ঠানের খাসলত হচ্ছে উল্টো জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন-পীড়ন করা।

তবে বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর জুলুমের মাত্রা ও তীব্রতা বেড়েছে বহুগুনে। পুলিশ বাহিনীর আগ্রহ যতটা ‘অপরাধ’ দমনে তার চাইতে বেশি আগ্রহ সমাজে ‘নৈতিকতা’র খবরদারির করার দিকে। সেলুনে ঢুকে কার চুলের স্টাইল কেমন হবে, পার্কে কে কীভাবে প্রেম করতে যাচ্ছে সেসব বিষয়ে নৈতিক খবরদারি করাই যেন আপাতদৃষ্টিতে পুলিশের অন্যতম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একেবারে সাম্প্রতিক আরেকটা ঘটনার কথা বলা যায়। একজন চিকিৎসক বিয়ে করেছেন নাপিতকে, কিন্তু বিষয়টা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না সিআইডির এসপি। এটা রীতিমতো ঘটা করে পুলিশ প্রেসকনফারেন্সও আয়োজন করে। সেখানে পুলিশ সুপার মিলু মিয়া বিশ্বাস জানান, একজন নাপিতকে বিয়ে করায় নারী চিকিৎসক অন্যায় করেছেন। স্বাধীনতা আছে বলেই তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। তিনি শুধু পরিবার নয়, চিকিৎসক সমাজকে লজ্জায় ফেলেছেন।

তবে পুলিশের ‘ভাব’ ও ‘মূর্তি’ এর সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে সাম্প্রতিক এলএলবি নবাব সিনেমার ইস্যুতে। সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায় ধর্ষণের শিকার একজন নারী থানায় গিয়ে কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারের তরফ থেকে বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর মনে হয়েছে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে, ফলে তারা সিনেমার পরিচালকের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফির মামলা দায়ের করেছেন। পরিচালককে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

এখানে কয়েকটা প্রশ্ন একে একে তোলা দরকার; প্রথমত পুলিশ বাহিনীকে হেয় করে উপস্থাপন করার জন্য যদি মামলা করতে হয় তাহলে তো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মঞ্চে উপস্থিত ছিল, সেটা না করে পর্নোগ্রাফির মামলা করতে হলো কেন? এর কোনো উত্তর জানা নাই। হতে পারে যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে গত ছয়মাসে যে দারুণ সামাজিক প্রতিবাদ দেখা গিয়েছে তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ পুলিশবাহিনী সেটা ব্যবহার করতে চায় নি। বরঞ্চ খানিকটা অপরিচিত পর্নোগ্রাফির মামলা করাই শ্রেয়। আরেকটা সম্পূরক কারণ হতে পারে, পর্নোগ্রাফি যে খারাপ এমন একটা ধারণা সমাজের সর্বত্রই বিরাজ করে, ফলে এর বিরুদ্ধে সহজে প্রতিবাদ দানা নাও বাধতে পারে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন তোলা যেতে পারে যে দৃশ্যের জন্য আপত্তি জানানো হয়েছে সে দৃশ্যের জন্য কি আদৌ পর্নোগ্রাফির মামলা করা যায়? পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে তাহলে এমন কিছু আছে যা এমন একটা কথোপকথনের দৃশ্যকেও অভিযুক্ত করতে পারে? আইন অনুযায়ী পর্নোগ্রাফির সংজ্ঞাটা ব্যাপক: ‘যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোন অশ্লীল সংলাপ, অভিনয়, অঙ্গভঙ্গি, নগ্ন বা অর্ধনগ্ন নৃত্য যাহা চলচ্চিত্র, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোন উপায়ে ধারণকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য এবং যাহার কোন শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য নেই; যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী অশ্লীল বই, সাময়িকী, ভাস্কর্য, কল্পমূর্তি, মূর্তি, কাটুর্ন বা লিফলেট’। অর্থাৎ, দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘যৌন উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোনো অশ্লীল’ বিষয় এবং ‘শৈল্পিক বা শিক্ষাগত মূল্য’ থাকা বা না থাকা। এই দুটো বিষয় এতো বেশি মাত্রায় ‘সাবজেক্টিভ’ এবং সংজ্ঞার পরিধি এতো ব্যাপক যে যে কোনো চলচ্চিত্র বা বই এর বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা যাবে।

তৃতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশকে যে চেহারায় উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা কি সমাজে অনুপস্থিত? মানে পুলিশের এমন চেহারা কি ‘বিমূর্ত’ নাকি ‘মূর্ত’? যেদিন সিনেমার পরিচালককে গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশিত হয়, সেদিন আরেকটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল ‘টাকা ছিনতাইয়ে দুই পুলিশ সদস্য গ্রেফতার’ শিরোনামে। ক্রসফায়ার বাণিজ্যের সাথে পুলিশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। লালমনিরহাটে মাদক মামলার আসামি সুজিত কুমার অভিযোগ করেন যে, তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়ে ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট সদর থানায় কর্মরত অবস্থায় এসআই সেলিম রেজা দুই দফায় তার কাছ থেকে ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করেন। একই ধরণের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল ব্যবসায়ী সোহেল মীর এর সাথে। তিনি থাকেন কেরানীগঞ্জে। মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন, তল্লাশী করে পকেটে যে টাকা পান সব তারা নিয়ে নেন। সোহেল মীর টাকা ফেরত চাইলে এলোপাতাড়ি মারতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে আরো কয়েকজন লোক এসে ঘটনা জানতে চান। একজন পুলিশ সদস্য নিজের পকেট থেকে ইয়াবা বের করে দেখান যে, এর কাছে ইয়াবা পাওয়া গেছে, তার নামে নাকি জেএমবির মামলা রয়েছে। এরপর থানায় নিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হয়। পরে পুলিশকে সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান। চট্টগ্রামের ওমান প্রবাসী মো. জাফর দেশে ফিরেছেন মার্চ মাসে। ৩১ জুলাই, ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে কক্সবাজারের চকোরিয়া এলাকায় পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ সদস্যরা বারেবারে তাদের কাছে ফোনে ৫০ লক্ষ টাকা চেয়েছেন, কিন্তু না দেয়াতে ৩৭ বছর বয়সী জাফরকে মেরে ফেলা হয়। এমন অভিযোগ হারহামেশাই পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে উঠছে। মেরিন ড্রাইভের ক্রসফায়ার বাণিজ্য নিয়ে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এখন প্রকাশ্যে কোনো পুলিশ সদস্যকে মাসোহারা আদায়ের কাজে লাগানো হয় না। পথেঘাটে কোনো পুলিশ সদস্য চাঁদাবাজিতে নেই। কিন্তু ভেতরে চলছে ভয়ংকর কারবার। অভিযোগ উঠেছে, যারা ‘ক্রসফায়ারের’ শিকার হয়, মৃত্যুর আগে তাদের কাছ থেকেও বিপুল চাঁদা আদায় করা হয়।’

ধর্ষণের শিকার নারীরা যে থানায় পুলিশ কাছ থেকে ‘সুনাম রাখার মতো’ ব্যবহার পান না তা বহু প্রতিবেদনেই উঠে এসেছে। বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচারের হালহকিকত নিয়ে একটা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ‘ধর্ষণের বিচারহীনতার কারণ হিসেবে ভিকটিম এবং নারী অধিকার কর্মীরা পুলিশের গাফিলতির প্রসঙ্গটি বারবারই সামনে আনে।…থানায় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে ভিকটিমের সঙ্গে আচরণ, তদন্ত এবং অপরাধীকে গ্রেপ্তার সবক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।’

অর্থাৎ, খুব নির্দিষ্টভাবেই দেখানো সম্ভব, পুলিশ বাহিনীর এসব কর্মকাণ্ড মোটেও ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা নয়; যদি কর্তাব্যক্তিরা ‘নিরবিচ্ছিন্ন’ আকারে সেটা দেখাতে পছন্দ করেন। উপরোক্ত ঘটনায় বা প্রতিবেদনে পুলিশ বাহিনীর যে চেহারা হাজির হচ্ছে সেটার সাথে সিনেমায় উপস্থিত চেহারার অমিল কদ্দুর? বাস্তবের সাথে কতটা অসঙ্গতিপূর্ণ? এ ক্ষেত্রে তো সিনেমায় হাজির পুলিশের চেহারার সাথে প্রতিবেদনে হাজির পুলিশের চেহারা সমরূপ। বাংলাদেশের আমজনতার অভিজ্ঞতাও এমন কিছুর দিকেই ইঙ্গিত দেয়।

চতুর্থত যে প্রশ্ন তোলা দরকার, যদি উপস্থাপিত চেহারা বাস্তবিক নাও হয়, তবুও পুলিশ বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী এমন ব্যবস্থা কি নিতে পারে? চলচ্চিত্রে কি দেখানো হবে, কি হবে না, কীভাবে চরিত্র হাজির হবে, কে ভিলেন হবে, আর কে নায়ক হবে, কার সুনাম হবে কার দুর্নাম হবে সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী খবরদারি করতে পারে কি না? এটা কি সরাসরি শিল্পস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়? এই ঘটনার প্রতিবাদ অনেকে করলেও খোদ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি উল্টো পরিচালককেই দোষারূপ করছে। পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশ‌ফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘অনন্য মামুনের কর্মকাণ্ডে পরিচালক হিসেবে আমরা খুবই লজ্জিত; আমরা এটাকে সমর্থন করি না।… ছবির বিষয়বস্তু রাজনৈতিক হতে পারে, ছবিতে কারও সমালোচনাও থাকতে পারে; কিন্তু ছবিতে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তা শুধু নিন্দনীয়ই নয় একেবারেই পরিত্যাজ্য..।’ বিডিনিউজ আরো জানায়: ‘নবাব এলএলবি’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ভাষার জন্য পরিচালকদের ‘মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না’ বলে আশঙ্কা করছেন ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ ৭৫ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পরিচালক গুলজার। অর্থাৎ, সর্বক্ষেত্রেই মাথার উপর হুজুর-হেডস্যার বসে থাকেন যারা সময়ে সময়ে ‘নিন্দনীয়’ ‘পরিত্যাজ্য’ ভাষা বিষয়ক ফতোয়া দেন। এবং তাদের ফতোয়ারও একটা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক থাকে।

পুলিশ বাহিনীর এই হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অনেকে বলছেন, সেন্সরবোর্ড তো আছেই। সেন্সরবোর্ড ছাড়পত্র দেয়ার পর পুলিশ বাহিনী কেনো সিনেমার বিরুদ্ধে মামলা করবে? এখানেই আমাদের পঞ্চম প্রশ্ন তোলা দরকার। সিনেমার ভালো-মন্দের দায়ভার সেন্সরবোর্ডের হাতে ছেড়ে দেয়া যাবে কিনা! আলমগীর কবির তো বহু আগেই বলেছিলেন, ‘কয়েকজন হাতে গোনা আমলা এবং তাদের দ্বারা নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষিত কিন্তু আধুনিক চলচ্চিত্রজ্ঞান বিবর্জিত ব্যক্তিবর্গ দ্বারা দেশের পাঁচ কোটি চলচ্চিত্র দর্শকের কি দেখা উচিৎ বা উচিৎ নয় তা নির্ধারণ করা কেবল অসম্ভবই নয় এই মুষ্টিমেয়ের চলচ্চিত্রিক অক্ষমতাকে চাপিয়ে দিতে সারা জাতির সাংস্কৃতিক বীর্যকে নিঃস্পৃহ করার শামিল।’ সারাহ নাফিসা সাহিদ তাঁর একটা লেখায় এই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেন্সরশীপের সুলুক সন্ধান করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে সেন্সরশীপের ধারণ-ধারন বদলে যায়, এবং কীভাবে সেটা রাজনৈতিক হাতিয়ারস্বরূপ ব্যবহৃত হয়। তাঁর মন্তব্যটা গুরুত্বপূর্ণ, ‘নৈতিক পুলিশের ধারণাটা ধরেই নেয় যে, জনতা নিজের ভালো বোঝার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধিমান নয়। এই মনোভাব একদম ভারতীয় সম্পর্কে বৃটিশদের মনোভাবের সমরূপ। অথবা পুরো বিপরীতটা হতে পারে- সিনেমার চিত্রায়নের স্বতন্ত্র শক্তিকে শাসকগোষ্ঠী হুমকিস্বরূপ দেখে। যাই হোক না কেনো, বাস্তবতা হচ্ছে, সেন্সরশিপ জাতীয় চলচ্চিত্রের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’

নবাব এলএলবি সিনেমার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং পরিচালককে গ্রেফতার একটি চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদী ঘটনা। বহুদিন যাবত বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমনপীড়ন করে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রেজিম টিকে আছে। এই দমনপীড়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। শিল্প-সাহিত্যে সবখানেই যে এই ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতি শূঢ় প্রবেশ করবে তাতে আমাদের অবাক হওয়ার কিছু নেই। যতদিন যাবে এমন খবরদারি, এমন জুলুমের তীব্রতা কেবল বাড়বে। সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন রকম ‘নৈতিক’ হুজুর-নেতার আবির্ভাব হচ্ছে, যারা প্রতিনিয়ত আমাদের বলে দেয়ার চেষ্টা করছেন: এই কাজ করা যাবে, এই কথা বলা যাবে, এটা বলা যাবে না, এখানে প্রেম করা যাবে, এখানে করা যাবে না, এখানে সিগারেট ফুঁকা যাবে, এখানে যাবে না, এই সিনেমা দেখা যাবে, ঐটা দেখা যাবে না, এই বই পাঠযোগ্য, ঐ বই পাঠ-অযোগ্য। সাম্প্রতিক ইস্যুগুলো এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পুলিশের এমন উপনিবেশিক খবরদারির সংস্কৃতি আসলে ব্যক্তি পুলিশের ভালো-মন্দের বিষয় নয়; এটা খোদ পুলিশ নামক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন।  সামজীর আহমেদ বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ চলে ঔপনিবেশিক টপ-ডাউন ভিত্তিতে, যেখানে উপর থেকে আদেশ আসে এবং তা নিচে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু জনগণের পুলিশ হতে হলে তার চলার কথা বটমআপ ভিত্তিতে, যেখানে নিচের প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাড়া দেবে উপর।’ আবার, ‘ঔপনিবেশিক প্রভাব কাটিয়ে পুলিশকে যদি জনগণের হতে হয় এবং জনগণের সেবার মধ্য দিয়েই সরকারের দায়িত্ব পালন করতে হয়, তবে পুলিশি ব্যবস্থার চেয়েও সরকার ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন অধিক জরুরি। সম্মতিভিত্তিক পুলিশিং পুলিশের একার কাজ নয়। পুলিশকে জনগণের হতে হলে পূর্বতন উপনিবেশগুলোর জন্য বিউপনিবেশায়নের রাজনীতির বিকল্প নেই’। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, যতদিন যাচ্ছে ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিতে আমরা ততই অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, আমাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সুর ক্ষীণ হয়ে উঠছে। এটাই সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়।

 

Sohul Ahmed, activist, and author. Topics of interest are politics, history, liberation war, and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

More Posts From this Author:

Share.

Leave A Reply

Translate »