অভিমত | বাকস্বাধীনতা: কি ফজিলত তাতে? | সহুল আহমদ

0

বাক-স্বাধীনতা মানে যে কোন বাক্যের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র একটি ব্যবস্থাই নেয়া যেতে পারে: আরেকটা বাক্য, লাগলে আরো একশ-হাজার বাক্য। বাক-স্বাধীনতা মানে মানুষের লিখিত বা উচ্চারিত কোন বাক্যের বিরুদ্ধেই বাক্য ছাড়া আর কোন ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। বাক্যের বিরুদ্ধে বাক্য ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম ফ্যাসিবাদ।  – বখতিয়ার আহমেদ, ফেসবুক, ১৬ জুন ২০২০

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাক-স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার বেহাল দশার খবর বহু আগেই দুনিয়া জুড়ে রটে গিয়েছে, করোনাকালে এর এক তীব্র রূপ আমরা প্রত্যক্ষ্য করেছি এবং কার্যত এখনো করছি। তবুও এখানে বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কে নানাবিধ সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। যেমন, বাক স্বাধীনতা পেলে মানুষ গালাগালি করবে, অশালীন বক্তব্য দিবে। বাকস্বাধীনতা থাকলে ইতিহাস বিকৃতি করবে।‘অশিক্ষিত’ ও ‘মূর্খ’দের জন্য দরকার ‘সীমিত ও শর্তায়িত’ বাক ও মতের স্বাধীনতা। ফলে অনেকেই ‘শালীন’ ও ‘সংযত’ ভাষা ব্যবহারের নীতিমালাও দেখিয়ে থাকেন। এই প্রবণতা এতই প্রবল যে, রাষ্ট্রের সবচাইতে ‘মুক্ত ও গণতান্ত্রিক’ স্থান হওয়ার কথা যে বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলের তাতেও এর উপস্থিতি দেখা যায়। এই স্বাধীনতাকে খর্ব করার যত আইন করা হয় তার কারণ হিসেবে জনপ্রিয় চালু-মত হচ্ছে, মানুষ মূলত খারাপ, অফুরন্ত স্বাধীনতা পেলে সে যা ইচ্ছা তাই করবে। কিন্তু বাস্তবে ইতিহাস আমাদেরকে দেখায় যে, এমন আইন কেবল তাদের উপর প্রয়োগ করা হয় যারা মূলত বিভিন্নভাবে (লেখা-গান-কবিতা-ছবি-ব্যঙ্গোক্তি-কৌতুক ইত্যাদি) ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

এমন পরিস্থিতিতে আলোচ্য প্রবন্ধে বাকস্বাধীনতার দুয়েকটা ফজিলত তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। তবে শুরুতেই বলে নিচ্ছি, আলোচ্য ‘ফজিলত’গুলো মোটেও নতুন কোনো বিষয় নয়, বহুদিন-বহুবছর যাবত চিন্তার বাজারে চালু থাকা মত। সম্ভবত জনপ্রিয়ও বটে। বাংলাদেশের বিদ্যমান নাজুক আবহাওয়াই এমন চালু মতকে হাজির করতে প্রণোদনা দিচ্ছে।

 

অন লিবার্টি: একটি ধ্রুপদী পাঠ

বাকস্বাধীনতার ফজিলত সম্পর্কিত আলাপে সবচেয়ে ধ্রুপদী রচনা হচ্ছে স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’। কথা বলা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে লিখিত এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫৯ সালে।  ধ্রুপসী পাঠ হিসেবে তা এখনো কেবল স্মরণীয়ই নয়, কার্যত বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার যে কোনো আলাপে-তর্কে মিলের সেই পাঠ এখনো হাজিরা দেয়। মিল উপযোগবাদী, ফলে তিনি যখন কথা বলার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তখনও মূল জিজ্ঞাসা ছিল এর উপযোগিতা কি? কেন কথা বলার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার দরকার? মত প্রকাশে বাধা দিলে, তা রাষ্ট্র কর্তৃক হোক বা সমাজ কর্তৃকই হোক, এতে ক্ষতি কি?

বাক স্বাধীনতা প্রশ্নে মিলের চিন্তার একেবারে দুটো গোড়ার জায়গা আছে। প্রথমত, সত্য জানা লাগবে, এবং দ্বিতীয়ত, সত্য সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত না।শতভাগ অভ্রান্ততা কেউ দিতে পারবেন না, এমনকি যিনি শতভাগ নিশ্চয়তার দাবি করেন তিনি সেটা নাও হতে পারেন। মিল স্থান কালের বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিগত কালের অনেক ‘অভ্রান্ত’ সত্য বলে প্রতীয়মান কথা এইকালে এসে স্রেফ উড়ে গিয়েছে। এর ভ্রান্ততা নিয়ে এখন আর কেউ কোনো কথাই বলেন না। স্থানের বেলাতেও একই; কপালের ফেরে আরবদেশে জন্ম নেয়া ব্যক্তি আল্লা নিয়ে যে ‘অভ্রান্ত’ ধারণা, চীন দেশে জন্ম নেয়া কনফুসিয়াসবাদী ব্যক্তির সেটা আলাদা। ফলে, শতভাগ সত্যবচন বলে কিছু নেই, আজ যিনি দাবি করছেন তার বচন অভ্রান্ত, কয়েকযুগ পর সেটা ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হতে পারে। এটাই ইতিহাসপ্রাপ্ত শিক্ষা।

মিলের কাছে ‘সত্য’ জানা জরুরি, এই জরুরতের কারণে তিনি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। স্বাধীনতা পেয়ে সত্য-মিথ্যা দুটোই মানুষ বলতে পারে। সত্য বা মিথ্যে দুটো বলার স্বাধীনতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বাধীনতা যদি না থাকে তাহলে দুটো ঘটনা ঘটতে পারে। এক, যে আলাপটাকে রুদ্ধ করা হচ্ছে সেই আলাপ যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে আমরা খোদ সত্য থেকেই বঞ্চিত হবো। দুই, আলাপটা যদি মিথ্যে হয়ে থাকে তাহলে এই মিথ্যের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে সত্যের আরো স্পষ্ট ও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হবে। ফলে দুটোই মিলের কাছে সমান জরুরি। সত্য হোক মিথ্যে হোক কোনো অবস্থাকেই বাকস্বাধীনতাকে বাধা দেয়া চলবে না। বাধা দিলে দিনশেষে ‘সত্য’প্রাপ্তি থেকেই আমরা বঞ্চিত হবো। ফলে মিল বলেন, যদি একজন ব্যতীত দুনিয়ার সকল মানুষও একটা মতের দিকে যান, তাহলে এই একজনের যেমন অন্যদের মতকে দমন করার এখতিয়ার নেই, তেমনি বাকি সকলের এখতিয়ার নেই সেই একজনের মতকে দমন করার।

মিলের যুক্তি হচ্ছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা চিন্তার আদান-প্রদানের বাজার যদি মুক্ত-স্বাধীন হয়ে থাকে তাহলে এটি যে কোনো বিষয়ে সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ ফল এনে দিতে পারে। ভুল-ত্রুটিকে কমিয়ে ‘সঠিক’ পথ বাতলাতে সাহায্য করবে। এমন জীবন্ত আলাপ-আলোচনার পরিসর বজায় রাখার পক্ষে এবং যে কোনো ধরণের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করার পিছনে মিলের চারটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, নিষিদ্ধ মতটি সত্য হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এমনকি যদি সেই মতটি মিথ্যেও হয়ে থাকে, এতে কিছুটা সত্য থাকতেও পারে। তৃতীয়ত, যদি একেবারেই মিথ্যে হয়ে থাকে, তবুও এই নিষিদ্ধ মতটি সত্যকে‘ডগমা’ হয়ে উঠা থেকে বিরত রাখতে পারবে। এবং চতুর্থত, ডগমা হিসেবে যে কোনো ‘আনচ্যলেঞ্জড’ মত তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। মিল বলেন, এমনকি আমি যদি আমার মতের সত্যতা বা সঠিকতা নিয়ে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসীও থাকি এবং পুরদোমে বিশ্বাস করি যে এটাই ঠিক, তবু এটা স্বাধীনভাবে খোলা ময়দানে আলোচিত না হলে দিনশেষে একটা মৃত মতবাদ বা ডগমাতেই পর্যবসিত হবে। যে কোনো মত যদি নিয়মিত প্রশ্ন ও তর্কের সম্মুখীন না হয় তাহলে মিলের কথা অনুযায়ী সেটা তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ মতেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যাবে, যা কিনা মানবজাতির জন্যই হুমকিস্বরূপ।

স্টুয়ার্ট মিলের ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের বহু সমালোচনাও আছে, বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদের সমর্থক হিসেবে। আমরা সেদিকে যাবো না। আমাদের নির্দিষ্ট বিষয়ের আলোচনার খাতিরে ‘অন লিবার্টি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলাপেই সীমাবদ্ধ থাকবো। মিলের উপরোক্ত আলোচনা সংক্রান্ত একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৯৪ সালে হলোকাস্ট গবেষক ও ইতিহাসবিদ দেবোরা লিপস্টাড তাঁর বইতে আরেক ইতিহাসবিদ ডেভিড আরভিংকে ‘হলোকাস্ট অস্বীকারকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আরভিং মানহানির মামলা করলে লিপস্টাডকে প্রমাণ করতে হয় যে তাঁর বক্তব্য সঠিক। মানে, আরভিং হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। দীর্ঘ গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের বহু সাক্ষ্য-প্রমাণাদি দিয়ে লিপস্টাড প্রমাণ করেন যে, আরভিং ইতিহাস বিকৃতি করেছেন। এখানে, আরভিং একাডেমিক পদ্ধতিতে লিপস্টাডের সাথে তর্ক-বিতর্ক না করে সরাসরি আইনের আশ্রয় নেন তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্য। এই মামলার একটা বড় পার্শ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে বলা হয়, হলোকাস্ট গবেষকরা তাদের গবেষণা আরো বিস্তৃত করেছিলেন, যেটা অনেকক্ষেত্রে পূর্বে হয়নি। আবার, উল্টো আরেকটি ঘটনা ঘটে। অস্ট্রিয়াতে হলোকাস্ট ডিনায়েল আইন আছে। ফলে ২০০৬ সালে যখন আরভিং ভিয়েনা যান তখন সেই আইনের অধীনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় আরভিং নিজেকে একধরনের ‘বাকস্বাধীনতার শহিদ’ হিসেবে হাজির করেন। এই দুটো ঘটনাই মিলের উপরোক্ত যুক্তির একটা বাস্তবতা হাজির করে। আরভিং এর বক্তব্য নির্জলা মিথ্যে হওয়া সত্ত্বেও লন্ডনের খোলামেলা তর্কবিতর্ক ‘সত্য’ উদঘাটন করতে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার আইন তাকে এক ধরণের নায়করূপ দেয়।

 

 

বাকস্বাধীনতা, নাকি রাষ্ট্রের হাতে ‘সত্য-মিথ্যা’ নির্ধারণের ভার

১৯৭৮-১৯৭৯ এর দিকে রবার্ট ফুরিসন নামক এক ফরাসী অধ্যাপক তাঁর লেখায় এবং টিভি সাক্ষাতকারে হলোকাস্ট অস্বীকার করেন, বিশেষ করে নাৎসী বাহিনীর গ্যাস চেম্বারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তিনি কয়েক স্থানে আক্রমণেরও শিকার হোন। তখন নোয়াম চমস্কি সহ প্রায় ৬০০ জন বুদ্ধিজীবী একটি খোলা চিঠিতে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তারা ফুরিসনের বাকস্বাধীনতার এবং মত প্রকাশের অধিকার পক্ষে দাড়ান, এবং তাকে নিরব করিয়ে দেয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ জানান। এই খোলা চিঠি ফ্রান্সে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করে। তখন অনেকের অনুরোধে চমস্কি আরেকটি নিবন্ধ লিখেন, যেখানে বাকস্বাধীনতা নিয়ে একেবারে ‘এলিমেন্টারি’ কিছু কথাবার্তা বলেন। যে কেউ চাইলে তাঁর এই নিবন্ধ ব্যবহার করতে পারবেন, এই অনুমতি চমস্কি দেন।

১৯৮০ সালের দিকে যখন ফুরিসনের এই সংক্রান্ত বই প্রকাশিত হয় তখন চমস্কি লিখিত এই নিবন্ধ ‘মুখবন্ধ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়; কিন্তু চমস্কি এটা জানতেন না। পরে জানার পর তিনি এটা সরানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কেননা এতে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তখন বড্ড দেরি হয়ে যায়, বই প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে চমস্কি বলেছিলেন, লেখা সরানোর অনুরোধ করাটা তার ঠিক হয় নি।

এই ঘটনার পর চমস্কিকে ঘিরে আরো বেশি বিতর্কের ঢেউ উঠে। চমস্কির বিভিন্ন সেমিনার-বক্তৃতায় ঘুরেফিরে এই প্রসঙ্গ হাজির হতো, দর্শক-শ্রোতার কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাকে। আগ্রহী পাঠক চমস্কি ও ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন। চমস্কিও বিভিন্ন সময়ে এই ঘটনা নিয়ে লিখেছেন, মন্তব্য করেছেন।

চমস্কির অবস্থান কি ছিল? চমস্কির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, হলোকাস্ট অস্বীকারকারীকে সমর্থন করার মাধ্যমে তিনিও হলোকাস্ট অস্বীকার করেছেন। চমস্কি তার বিভিন্ন লেখা বা বক্তৃতায় দুটো বিষয় স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। প্রথমত, কারো বাকস্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো মানে তার মতের পক্ষে দাঁড়ানো না, বা তার মতকে সমর্থন করাও না। আমি কারো মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিলাম, তার মানে এই নয় যে, আমি তার মতকে সমর্থন করি। তার প্রকাশিত মতকে সমর্থন না করেও আমি তার মত প্রকাশের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ জারি রাখতে পারি। রোজা লুক্সেমবার্গ যেমন করে বলেছিলেন, বাকস্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে আসলে ভিন্নমতাবলম্বীর বাকস্বাধীনতা।

চমস্কি যে কেবল এই প্রথম এমন ‘বিতর্কিত’ অবস্থান নিয়েছেন, তা না। তিনি এর পূর্বে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধীদের একাডেমিক স্বাধীনতা, গবেষণা করার স্বাধীনতা, সেই গবেষনার ফল প্রকাশ করার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থানকে অনেকেই ‘absolutist’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু, চমস্কি তার এই অবস্থান থেকে কখনোই সরে দাড়ান নি। হাল আমলে ক্যান্সেল কালচার নিয়ে চমস্কির অবস্থানও সমান বিতর্কের মধ্যে পড়ে। ঐতিহাসিকভাবে, বাক স্বাধীনতার প্রশ্নে চমস্কির এই অবস্থান মোটেও নতুন কিছু নয়। চমস্কির বারবার ভলতেয়ারকে উদ্ধৃত করেছেন, আমি তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জান দিতে পারি।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, চমস্কি ফুরিসনের ঘটনাকে দেখছেন ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ণয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হিসেবে। তার মতে, বোধহয় এই প্রথম পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্ট্যালিনবাদী ও নাৎসীবাদী মতাদর্শ মেনে নিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রই ইতিহাসের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করে দিবে এবং এর থেকে বিচ্যুতি ঘটলে শাস্তি দিবে, এই আদর্শ মেনে নিল। তিনি বলেন, হলোকাস্টের শহিদদের আত্মার প্রতি সবচেয়ে বড়ো বেইমানি হচ্ছে এটাই যে, তাদের খুনীদের মতাদর্শকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

 

উন্নয়নেও বাকস্বাধীনতা

উন্নয়ন প্রশ্নটা আমাদের রাষ্ট্রে খুবই জরুরি ‘প্রসঙ্গ’; এতই জরুরি যে, যে রাষ্ট্র ক্রমাগত গণআন্দোলন ও জনযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছে, যে রাষ্ট্রের জন্ম প্রক্রিয়াতে ‘গণতন্ত্র’ সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ও স্পষ্ট ছিল, সেই রাষ্ট্রে হঠাৎ করে খোদ ‘গণতন্ত্র’ই উন্নয়নের জন্য ‘উটকো ঝামেলা’ হিসেবে হাজির হয়েছে।তাই, ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ এমন ডিসকোর্স শক্তিশালী হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু, যুক্তির খাতিরে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা মেনে নিলেও এই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অত্যাবশ্যকীয়; এটা আমার কথা নয়, অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেনের কথা।

উনিশ শতকে দুনিয়াজুড়ে খুব স্বাভাবিক বিষয় ছিল কোন কোন দেশ ‘গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত’ আর কোন কোন দেশ অনপযুক্ত তা নিয়ে আলাপ করা।এই বিশ শতকে এসে দেখা গেলো, খোদ এই প্রশ্নটাই সমস্যা-জর্জরিত, এবং ভুল। জনগণ গণতন্ত্রের জন্য ‘ফিট’ কি না এটা কোনো প্রশ্নই হতে পারে না, বরঞ্চ গণতন্ত্রের মাধ্যমেই জনগণকে ‘ফিট’ করে তুলতে হয়। ফলে, অর্মত্য সেনের কাছে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বোধের সার্বজনীনতা সাম্প্রতিক প্রপঞ্চ। তার মূল জিজ্ঞাসা হচ্ছে এই গণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতার বোধ কীভাবে উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে?

২০০১ সালে অর্মত্য সেন এক বক্তৃতায় মিডিয়া কেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন। নির্দিষ্টভাবে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করলেও আমরা এটাকে সার্বিকভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে পাঠ করতে পারি।

অর্মত্য সেন শুরুতে বলে নেন যে, বাক-স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে মানব স্বাধীনতারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই যে অপরের সাথে কথা বলতে পারা, অপরের কথা শুনতে পারার সক্ষমতা, এটি হচ্ছে মানুষ হিসেবে আমাদের মূল্যবান হওয়ার কেন্দ্রীয় কারণ। যেমন করে মনিষী এরিস্টটল বলে গিয়েছিলেন, আমরা সামাজিকভাবে পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল বা ইন্টারেক্টিভ প্রাণী; জীবনের পূর্ণতার জন্যই ঘর ও বাইরের মানুষদের সাথে পারষ্পরিক সহযোগীতা, আলাপ-আলোচনা, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কথা বলা তাই মানব জীবনেরই একটা অংশ, এবং বাক-স্বাধীনতা তাই মানব স্বাধীনতারই একটি মৌলিক অঙ্গ।

অর্মত্য সেনের মতে, উন্নয়নের জন্য চারটি কারণে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কারণ হচ্ছে কথা বলা এবং যোগাযোগের সহজাত গুণের সাথে এই স্বাধীনতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উন্নয়নকে কেবল জিডপি বা জিএনপি ইত্যাদি দিয়ে মাপা যাবে না, বরং দেখতে হবে দায়িত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি যা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সেটা করার স্বাধীনতা তার আছে কি না। উন্নয়ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটার উপকারিতা নির্ভর করে উন্নয়নের সাথে জড়িত মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার হালচালের উপর। তার কাছে স্বাধীনতা উন্নয়নের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়। ফলে, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত বা বাকস্বাধীনতার দমন সরাসরি মানব স্বাধীনতাকেই হ্রাস করে, এবং উন্নয়নকেই দুর্বল করে দেয়।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যম তথ্যের যোগান দেয়, যা সমাজে বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা ছড়িয়ে দিতে এবং পর্যালোচনামূলক কাজকারবারে উৎসাহ দেয়। তার মতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষাকবচ হিসেবে সামাজিক নিরাপত্তাতেও ভূমিকা রাখে। অর্মত্য সেন ব্যাখ্যা দিয়ে দেখান যে, ১৯৫৮-৬১ সালের চীনের দূর্ভিক্ষের একটা বড়ো কারণ ছিল সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকা। সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীন ভাবে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারতো, তাহলে হয়তোবা এই দুর্ভিক্ষ এড়ানো যেতো। তিনি বলেন, কর্তৃত্বমূলক সরকারব্যবস্থা সেন্সরশিপের কারণে যে বিরাটসংখ্যক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, তা আসলে খোদ সেই সরকারকেই দিনশেষে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। সংবাদমাধ্যম স্বাধীন না থাকলে কেবল জনগণই অন্ধকারে থাকে না, খোদ সরকারও অন্ধকারে থাকে।

তৃতীয় কারণটা হচ্ছে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের ‘প্রটেক্টিভ’ ভূমিকা’; সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে জনগোষ্ঠীর অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং সুবিধাবঞ্চিত অংশের জবান উঠে আসতে পারে, যা সামাজিক নিরাপত্তাকেই মজবুত করে। বিভিন্ন দুর্ভিক্ষের ইতিহাস থেকে অর্মত্য সেন দেখিয়েছেন, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে দুর্ভিক্ষের আশংকা বেড়ে যায়। কারণ, সেন্সরশিপ একদিকে সঠিক তথ্য তুলে আনতে বাধা প্রদান করে, অন্যদিকে সরকারি সিদ্ধান্তের যথার্থতা নিয়ে আলাপ-আলোচনাও রুদ্ধ করে দেয়।

অর্মত্য সেনের কাছে চতুর্থ কারণ হচ্ছে এর ‘গঠনমূলক’ ভূমিকা; মুক্ত আলাপ-আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক সমাজে বিভিন ধ্যান-ধারণার উদ্ভব ঘটাতে, মূল্যবোধ গঠনে এবং জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ফলে সামাজিক ন্যায়বিচার সহজলভ্য হয়। কোথায় কোথায় আমাদের অভাব রয়েছে, আমাদের অসুবিধে রয়েছে, এর থেকে উত্তরণের উপায় কি, এসব নিয়ে বোঝাপড়া তৈরির জন্য আলাপ-আলোচনার স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা জরুরি।

 

 

বাকস্বাধীনতা: এশীয় মূল্যবোধ?

মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে একটি অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও ‘এশীয় মূল্যবোধ’ বাAsian Values এর দোহাই দিয়ে অনেকেই মানবাধিকারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ করেন; বিভিন্নভাবে বলা হয় মানবাধিকার, বিশেষত মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার প্রতি এশীয়মূল্যবোধ সমর্থন জোগায় না।

এশীয় মূল্যবোধগুলো কি? সামষ্টিকতা বা কালেক্টিভিজম, আদর্শ মেনে চলা, আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ, পারিবারিক স্বীকৃতির জন্য অর্জন, নম্রতা, পিতারমাতার প্রতি ভক্তি, কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি। যেমন, ‘ব্যক্তির মঙ্গলের চেয়ে গোষ্ঠীর মঙ্গলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে’, ‘কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো’, ‘যাই ঘটুক না কেন, একজন পুত্র বা কন্যা হিসেবে পিতা-মাতার কথা অবশ্যই মানতে হবে’ ইত্যাদি বহু বিবৃতি এশীয়মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ব্যাপারে এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে দুইভাবে সমালোচনা হতে থাকে। একপক্ষ দাবি করেন যে, এগুলো এশীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় অথবা এর সঙ্গে মাননসই নয়। এশীয় সংস্কৃতিতে সমাজের মৌলিক ভিত্তি হলো পরিবার, ব্যক্তি নয়। দ্বিতীয় পক্ষের সমালোচনা অন্যরকম, তারা দাবি করেন, এশীয়সংস্কৃতি মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের জন্য এখনো ‘প্রস্তুত’ নয়। এখানে উন্নয়ন আগে ঘটাতে হবে; অর্থনৈতিক উন্নয়নের অধিকার মানবাধিকার বা বাকস্বাধীনতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও প্রায় সমান গুরুত্বই বহন করে।

এসবের বিপরীতেও প্রচুর যুক্তি দেয়া হয়েছে। এশিয়া কোনো সমগোত্রীয় ভৌগলিক সত্তা নয়। ফলে পুরো অঞ্চলকে একটি নির্দিষ্ট মূল্যবোধের সুতোয় বাঁধা যাবে না। ‘এশীয় মূল্যবোধ’ তত্ত্ব বহনকারীদের বিপক্ষে আরেকটা ‘রাজনৈতিক’ যুক্তিও হাজির করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক কারণেই এশীয় মূল্যবোধের দোহাই দেয়া হচ্ছে; মূলত স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা দেয়ার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, এশীয় মূল্যবোধ গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক তো নয়ই, বরঞ্চ পরিপূরক।

সময় পাল্টেছে, এখন মত প্রকাশের একটা বড়ো ময়দান হচ্ছে ইন্টারনেট। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন আরও বৃদ্ধি করে। ইন্টারনেটের ব্যবহার গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরণের ইতিবাচক প্রভাবও ফেলে। তো, এই সময়ে (মানে ইন্টারনেটের জমানায়) এসে প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ পর্যায়ে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে এশীয় মূল্যবোধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাথে ইতিবাচক নাকি নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। এই প্রশ্নকে সামনে রেখেই ফেই শেন ও লুকমান সুই তাদের গবেষণা চালান। এগারোটা দেশে (উল্লেখ্য এখানে বাংলাদেশ নেই, ভারত-পাকিস্তান আছে) ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়। তিনটা দিক থেকে তারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পরিমাপ করেছেন: ব্যক্তিগত বাকস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা।

ফেই শেন ও লোকমান সুই যে তথ্য-উপাত্ত পান তাতে দেখা যায়, বেশির ভাগ এশীয় দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বাক ও ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা চেয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমের প্রশ্নে বৈচিত্রপূর্ণ মতামত পাওয়া গিয়েছে। তবে, সব বিষয়ে পাকিস্তান সম্পূর্ণ চিত্র থেকে আলাদা থেকেছে।গবেষকদ্বয় তাদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানাচ্ছেন, সামাজিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রায় এশীয় মূল্যবোধ থাকার সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি কম সমর্থনের কোনো প্রমাণ নেই। ব্যক্তি পর্যায়েও দেখা যায়, এশীয় মূল্যবোধের সাথে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কোনো নেতিবাচক সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তার মানে তারা একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌছাচ্ছেন, এশীয় মূল্যবোধ থাকা মানেই এই নয় যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কম থাকবে।তাদের ভাষায়, ‘এশীয় মূল্যবোধ থিসিসকে বাতিল করে দেয়ার মতো যত প্রমাণ পাই, তার সমর্থনে তত প্রমাণ পাইনি।’ যদিও তারা যে কয়টা এশীয়মূল্যবোধের মাত্রা ব্যবহার করেছেন তার দুইটার সাথে (আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য) মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও বাকিগুলোর সাথে এই সম্পর্ক ইতিবাচক। বলছেন, ‘কিছু এশীয় মূল্যবোধ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থনকে দমন করে; কিন্তু অন্যান্য এশীয় মূল্যবোধ বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনের সমতুল্য’।

তাদের ফলাফলে আরো দেখা যায় যে, ইন্টারনেটের ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়াটা একটি মুক্তিকামী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি করে। যেসব মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, তারা মুক্তবাকের প্রতি বেশি ঝোঁকে; যেসব দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার বেশি, সেখানে বাকস্বাধীনতার প্রতি সমর্থনও বেশি।

গবেষকদ্বয়ের মূল কথা হচ্ছে, কেউ ‘এশীয় মূল্যবোধ’ ধারণ করলেই যে সে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতি সমর্থন কম দিবে বিষয়টা এমন নয়। বরঞ্চ’ব্যক্তি অধিকারের ধারণার সঙ্গে প্রথাগত এশীয় মূল্যবোধের কোনো বিরোধ নেই।’

 

 

বাংলাদেশ: দৌড় শুরু করতে হবে অনেক পিছন থেকে 

 যে ডিসক্লেইমার শুরুতেই দেয়া দরকার ছিল, সেটা এখন দেই। বাকস্বাধীনতাকে মানবীয় কর্তাসত্তার সাথে মিলিয়ে পাঠ করার রেওয়াজ আছে; ফরহাদ মজহার, বখতিয়ার আহমেদ এ নিয়ে লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। কথা বলার স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক অধিকারই নয়, আমাদের মানবীয়তারও অংশ। বন্ধু ও কমরেড সারোয়ার তুষারও সম্প্রতি কয়েকটা লেখাতে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মানুষের মানবীয়তার সাথে সম্পর্কিত করে বোঝার কমনসেন্স তৈরি উপর জোরারোপ করেছেন। সঙ্গত কারণেই আলোচ্য প্রবন্ধে এই বিষয়টি উল্লেখিত হয় নি, বরঞ্চ কেবল বাকস্বাধীনতার উপকারিতা বা উপযোগীতার দিকেই নজর দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিখ্যাতজনের বরাত দিয়ে।

বাংলাদেশে তাহলে আমাদের হালচাল কেমন? বাংলাদেশে আসলে আমাদের এই দৌড়টা অনেক পিছন থেকে শুরু করতে হবে। কারণ, উপরে যে বাকস্বাধীনতার ফজিলত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেই ‘বাকস্বাধীনতা’ কীভাবে প্রয়োগ করা হবে তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক বিভিন্ন সমাজে আছে।প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনী নতুন নতুন তর্ক-বিতর্ক হাজির করছে। সময়ের সাথে সাথেও এর নানান মাত্রা দিয়ে আলাপ হয়েছে, হচ্ছে। যেমন, সত্তরের দশকে ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ নামে একটা আন্দোলন হয়েছিল। মানে ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী মত প্রকাশকারীদের জন্য প্লাটফর্ম দেয়া হবে না। কেউ কেউ একে বাকস্বাধীনতা হরণ বলে অভিহিত করলেও অনেকে বলেছেন, কোনো একটা প্ল্যাটফর্মে কথা বলার সুযোগ না দেয়া মানেই যে কারো কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া তা কিন্তু না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, এই যে মঞ্চ না দেয়া বা ‘নো প্ল্যাটফর্ম’ একধরণের নিরব ও পরোক্ষ সেন্সরশীপ চালু করতে পারে। সমাজে এই ধরণের তর্ক-বিতর্ক জারি থাকা সজীবতার লক্ষণ। নাগরিকগণ ক্রমাগত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রায়োগিক বিষয়াদি ঠিক করে নিবেন।

এখানেই বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া। বাংলাদেশের রাষ্ট্রের নাগরিকদের সবচেয়ে বড়ো সংগ্রাম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞাকে উপড়ে ফেলার সংগ্রাম। অন্যত্র দেখিয়েছিলাম, আমাদের সংবিধান চিন্তা করার স্বাধীনতা দিলেও নাগরিকদের সেই চিন্তাকে হাজির করার স্বা্ধীনতা দেয় নি। নানান শর্তের জালে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে বন্দী করে রেখছে। বাকস্বাধীনতাকে কীভাবে কাজে লাগাবে এই জিজ্ঞাসার পূর্বে তাকে স্বাধীনতার সেই অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য রাজপথে নামতে হচ্ছে। মরার ওপর খাড়ার ঘা স্বরূপ যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছিল ৭৩২টি, গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ৬০৭। এবং ২০২০ সালে প্রথম ৫ মাসেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ৪০৩টি, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫৩ জন। অর্থাৎ, করোনাকালে কথা বলার দায়ে দমন-পীড়নের হার বেড়ে গিয়েছে। মামলার প্রধান প্রধান ‘খাত’ হচ্ছে: মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ‘মিথ্যা সংবাদ’ পরিবেশন, ফেসবুকে লেখা, বঙ্গবন্ধু, তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী, প্রধানমন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ফেসবুকে ‘কটূক্তি’, করোনাভাইরাস ও এর চিকিৎসা নিয়ে ‘গুজব ছড়ানো’, ত্রাণ চুরির‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানো ও সংবাদ পরিবেশন, সরকারবিরোধী প্রচারণা, পুলিশের সমালোচনা করে সংবাদ পরিবেশন ও ফেসবুক লেখা, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ইত্যাদি।

অর্মত্য সেন স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, উপনিবেশকালে কেবল যে সরকারের সমালোচনা করলেই গ্রেফতার করা হয়েছে, তা কিন্ত না; সুযোগ পেলে সরকারের সমালোচনা করতে পারে এই ‘আন্দাজ’ থেকে ‘সম্ভাব্য দুষ্কৃতিকারী’কে গ্রেফতার করা হতো। আমাদের গর্দানের উপর জারি থাকা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এমন ঔপনিবেশিক আমলের ইশারা আছে। এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আপনার না করলেও চলবে, কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি মনে করে অপরাধ ‘হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে’ তাহলেও আপনাকে গারদে ভরতে পারবে। অর্থাৎ যদি উর্দিওয়ালাদের মনে হয় আপনার অপ্রকাশিত ‘মত’ খতরনাক হতে পারে তাহলে আপনি আইনের জালে বন্দী হতে পারেন।

আবার, করোনা মহামারির প্রভাব পড়েছে সংবাদপত্রশিল্পের উপর; যেমন, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) কিছুদিন আগে এক বিবৃতিতে সংবাদপত্রশিল্পকে রক্ষায় সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা এবং সরকারের কাছে পাওনা বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের বিল দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকদের মূল দ্বন্দ্ব তাই রাষ্ট্রের সাথেই। এই রাষ্ট্র সাংবিধানিক ভাবেই মত প্রকাশকে বিবিধ শর্তের অধীন করে করেছে, উপরন্তু দিনকে দিন মানুষের বাকস্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়ার জন্য আরো বেশি আইনি হাতিয়ার তৈরি করছে। আবার, ইতিহাস-বিকৃতি রোধের জন্য বিভিন্ন আইন তৈরির খায়েশ রয়েছে জাতীয়তাবাদী মহলেরও; ইতিহাসের সত্য- মিথ্যা নির্ধারনের ভার আমরা তুলে দিতে চাই রাষ্ট্রের হাতে। [উল্লেখ্য, একসময় আমিও ইতিহাস-বিকৃতি রোধের আইনের পক্ষে ওকালতি করেছি। ইতিহাসের সত্যমিথ্য নির্ধারণের ভার আদালত বা রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিতে চেয়েছি। নিঃসন্দেহে এই লেখা আমার পূর্বের অবস্থান থেকে একটি ‘উত্তরণ’; এবং কেন- সেটাও এই লেখাতে হাজির করতে পেরেছি বলে মনে করি।] ফলে, একদিকে এমনিতেই এই রাষ্ট্র বাকস্বাধীনতার অনুমোদন দেয় না, অন্যদিকে যেটুকু স্বাধীনতা আছে সেটুকুও কেড়ে নেয়ার বাস্তবতা শাসকগোষ্ঠী ক্রমাগত তৈরি করছে। ফলে, আমাদের লড়াই একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। আমার কথা বলার উপর রাষ্ট্রীয় খবরদারিকে  নস্যাৎ করতে হবে। এর ফজিলত কি- তার কিছুটা আভাস মাত্র উপরে দেয়া হয়েছে।

বহুদিন যাবত বলা হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে একধরণের অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে। মাত্রাগত রকমফের হচ্ছে কখনো সখনো। ফলে এখানে রাষ্ট্রের কাছে মহামারি মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা। অন্য অর্থে, খোদ নাগরিকের বিরুদ্ধেই এক অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। ডিজিটাল নিরাপত্ত আইন বাতিল এবং সংবিধানে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার আমাদের এই লড়াইয়ে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পাল্টানোর।

 

 

 

দোহাই:

১) John Stuart Mill, On Liberty, 1859

২) Nigel Warburton, Free Speech: A Very Short Introduction, OUP Oxford, 2009

৩) Noam Chomsky, Some Elementary Comments on The Rights of Freedom of Expression, [Appeared as a Preface to Robert Faurisson, Mémoire en défense, October 11, 1980], chomsky.info

৪) The Faurisson Affair, Noam Chomsky writes to Lawrence K. Kolodney, Circa 1989-1991, chomsky.info

৫) Faurisson affair, Wikipedia

৬) Film: Manufacturing Consent: Noam Chomsky and the Media, 1992

৭) Amartya Sen, ‘Speaking of Freedom: Why Media Is Important for Economic Development’, The Country of First Boys, 2015

৮) ফেই শেন ও লোকমান সুই, ‘এশীয়মূল্যবোধ ফিরে দেখা: ইন্টারনেটের ব্যবহার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, প্রতিচিন্তা, ২০১৮। [অনুবাদ: খলিলুল্লাহ]

৯) ফরহাদ মজহার, প্রস্তাব, আগামী প্রকাশনী, ১৯৭৭

১০) বখতিয়ার আহমেদ, ‘ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবসত্তা: একটি নৃবৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা’, রাষ্ট্রচিন্তা, ২০২০

১১) সারোয়ার তুষার, ‘বাকস্বাধীনতা রাজনৈতিক শর্তের অধীন নয়, মানবীয়তার অংশ’, সময়ের ব্যবচ্ছেদ, গ্রন্থিক, ২০১৯

 

Sohul Ahmed, activist, and author. Topics of interest are politics, history, liberation war, and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

 

Share.

Leave A Reply

Translate »