অভিমত | রোহিঙ্গা জেনোসাইড: আর্তনাদ শোনার কেউ নেই | সহুল আহমদ  

0

জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, জেনোসাইড হচ্ছে কোনো হচ্ছে নির্দিষ্ট কোন একটা গোষ্ঠীকে (National, ethnical, racial or religious) পুরোপুরি কিংবা আংশিক ধ্বংসের নিয়তে: ১) গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা, ২) গোষ্ঠীর সদস্যদেরকে মারাত্মকভাবে শারীরিক  ও মানসিক ক্ষতি সাধন করা, ৩) ইচ্ছাকৃত ভাবে হানা দিয়ে গোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা পুরোপুরি কিংবা আংশিক ধ্বংস করা ৪) আইন প্রণয়ন করে গোষ্ঠীর ভেতর জন্মরহিত করণ চালু করা, এবং ৫) জোরপূর্বকভাবে গোষ্ঠীর শিশুদেরকে অন্য গোষ্ঠীতে ঢুকিয়ে দেয়া। জেনোসাইডে সরাসরি অংশগ্রহণ করা, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করা, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উস্কানি দেয়া, জেনোসাইডের চেষ্টা করা এবং এতে সহায়তা করা- এসবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

 

That day felt like the last day of this world as if the whole world was collapsing. I thought judgment day had arrived.

সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের উপর সবচেয়ে নির্মম জেনোসাইড শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে, ব্যাপকহারে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ বা বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু হয় একইদিন। কিন্তু এটা ছিল বহু বছর ধরে চলে আসে কাঠামোগত নিপীড়নের চূড়ান্ত বিন্দু। সাধারণত এই জেনোসাইড শুরু হওয়ার অনেক পূর্ব থেকেই রোহিঙ্গাদের বলা হতো দুনিয়ার সবচাইতে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। সম্ভবত ২০১৫-১৬ সালে টাইম ম্যাগাজিন রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা আর্টিকেল প্রকাশ করেছিল, সেখানে একজন রোহিঙ্গা নারী বলেছিলেন, হয় দুনিয়া আমাদের সাহায্য করুক, আর না হলে বোমা ফেলে একসাথে মেরে ফেলুক!

রোহিঙ্গাদের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে জাতিসংঘ কিছুদিন পরই ‘এথনিক ক্লেনজিং এর টেক্সট বুক উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, এটাকে ‘এথনিক ক্লেনজিং এর টেক্সটবুক উদাহরণ হিসেবে গণ্য করলেও একে জেনোসাইডের উদাহরণ হিসেবে গণ্য করে নি। এর একটা কারণ হতে পারে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে জেনোসাইডকে যেমন অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, এথনিক ক্লেনজিংকে সেভাবে করা হয়নি। সাধারণত জেনোসাইড ও এথনিক ক্লেনজিং এর মধ্যকার জায়গাটা খুবই ঝাপসা, অধিকাংশ এথনিক ক্লেনজিং দিনশেষে জেনোসাইডে পর্যবসিত হয়।

জেনোসাইড একদিনের কোনো ‘ঘটনা’ নয়, বা হঠাত ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাও নয়, বা প্রাথমিক কোনো পদক্ষেপও নয়। বরঞ্চ নানান রকমের সহিংসতা, নিপীড়ন, বর্ণবাদের চূড়ান্ত বিন্দু। বার্মা রাষ্ট্রের মধ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত নিপীড়ন যা জেনোসাইডের পথ সুগম করেছিল তার সন্ধান কেউ কেউ ১৯৬২ সালে খুঁজে পান, কেউ কেউ বলেন ১৯৮২ সালে, যখন থেকে কিনা তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে রাষ্ট্রহীন করে দেয়া হয়।১৯৭৭-এ একবার তারা দেশত্যাগে বাধ্য হন, ১৯৯২ সালে আরেকবার। আজিম ইব্রাহিম ২০১৬ সালে রোহিঙ্গা জেনোসাইডের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, জেনোসাইড সংঘটন কোনো সহজ কাজ নয়। এমনকি যারা কোনো একটা গোষ্ঠীকে ঘৃণা করে বা গোষ্ঠী সম্পর্কে বিভিন্ন কুসংস্কার ধারণ করে তারাও সহজে সহিংস কর্মকাণ্ডে বা হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠতে পারে না। এর জন্য দরকার পড়ে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় পলিসি। বিভিন্ন প্রভাবক তৈরি করতে হয় যা সময়মতো ট্রিগার করবে। দিনশেষে প্রতিটি জেনোসাইডই রাষ্ট্রীয় পলিসির কারণেই ঘটে, বিশেষত যখন রাষ্ট্র নিশ্চিত হয় ঘরে ও বাইরে খুব সহজেই পার পাওয়া যাবে তখন সেটা আরো সহজ হয়। আজিম ইব্রাহিমের বইয়ের প্রথম সংস্করণ যখন প্রকাশিত হয় তখন এর নাম ছিল ‘The Rohingyas: Inside Myanmar’s Hidden Genocide’; কিন্তু পরবর্তী সংস্করণে বইয়ের নামে একটু পরিবর্তন হয়: ‘The Rohingyas: Inside Myanmar’s Genocide’। বোঝাই যাচ্ছে, প্রথম সংস্করণের ‘হিডেন’ শব্দটা উধাও হয়ে যায় দ্বিতীয় সংস্করণে। কারণ যে জেনোসাইড ‘লুক্কায়িত’ ছিল সেটা ‘প্রকাশিত’ হয়ে পড়েছে।

রোহিঙ্গা জেনোসাইডের একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, উপনিবেশের থকথকের দাগের উপর দাঁড়িয়ে কীভাবে উত্তর-উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোগত বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করে ক্রমাগত ‘আদার’ নির্মাণ করে, এবং কীভাবে ধীরে ধীরে চল্লিশ-বছর যাবত জেনোসাইডের পাটাতন তৈরি করে তার এতো জ্বলজ্যান্ত সাম্প্রতিক উদাহরণ আর একটিও পৃথিবীতে নেই। ২০১৭ সালের গণহত্যার পর অনেকেই এর রাজনৈতিক-অর্থনীতির সুলুক সন্ধান করেছিলেন রাখাইনে জমি দখল এবং বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট চালুর নৈপথ্য বা ফলাফল হিসেবে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচনার মুখে পড়ে, কারণ, এই তথ্যের যেমন কিছুটা স্থানিক সমস্যা রয়েছে, তেমনি এই তথ্য উল্লেখিত মেগাপ্রজক্টের আরো বহু আগে যেসব একের অধিক রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও শরণার্থী সংকটের ঘটনা ঘটেছিল, তা ব্যাখ্যা করতে পারে নি। সমালোচকরা এই সংকট খোঁজার জন্য তাগিদ দিয়েছেন উপনিবেশিক লিগ্যাসির মধ্যে। তারা বলেন যে, বার্মা রাষ্ট্রের যে সংকট সেটা তার জন্মগত ত্রুটি থেকেই; রাষ্ট্রের ধরণ-ধারণ হবে সে বিষয়ে জনগণের কোনো ধরণের সম্মতি ছাড়াই রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। এবং উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে বারেবারে চাপিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর। এটা লক্ষ্য করা যায় ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে। সেখানে দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধ কেবল রাখাইনেই যে হচ্ছে এমন নয়, কাচিন ও শান প্রদেশেও হচ্ছে।

 

 

রোহিঙ্গা এবং জেনোসাইড

জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, জেনোসাইড হচ্ছে কোনো হচ্ছে নির্দিষ্ট কোন একটা গোষ্ঠীকে (National, ethnical, racial or religious) পুরোপুরি কিংবা আংশিক ধ্বংসের নিয়তে: ১) গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা করা, ২) গোষ্ঠীর সদস্যদেরকে মারাত্মকভাবে শারীরিক  ও মানসিক ক্ষতি সাধন করা, ৩) ইচ্ছাকৃত ভাবে হানা দিয়ে গোষ্ঠীর প্রকৃত অবস্থা পুরোপুরি কিংবা আংশিক ধ্বংস করা ৪) আইন প্রণয়ন করে গোষ্ঠীর ভেতর জন্মরহিত করণ চালু করা, এবং ৫) জোরপূর্বকভাবে গোষ্ঠীর শিশুদেরকে অন্য গোষ্ঠীতে ঢুকিয়ে দেয়া। জেনোসাইডে সরাসরি অংশগ্রহণ করা, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করা, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উস্কানি দেয়া, জেনোসাইডের চেষ্টা করা এবং এতে সহায়তা করা- এসবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

জেনোসাইডের সংজ্ঞায় একটা উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ইন্টেন্ট বা নিয়তের উপস্থিতি থাকা। অর্থাৎ, কেউ কোনো একটা গোষ্ঠীর সদস্য কেবল এই নিয়তেই তাকে হত্যা করা হচ্ছে, বা তার সাথে উপরোক্ত কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ আগস্টে আরসার আক্রমণের পর উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় তাতে যেমন জেনোসাইডাল এক্টের আলামত পাওয়া যায়, তেমনি জেনোসাইডের নিয়তও স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট থেকে শুরু করে, রোহিঙ্গাদের নিয়ে যে সকল গবেষক গবেষণা করেছেন তাদের গবেষণাতেও এই রোহিঙ্গা নিধনের সুস্পষ্ট ‘নিয়ত’ ও রাষ্ট্রীয় পলিসি ধরা পড়ে। ইন্ডিপেনডেন্ট ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন যে বিষয়গুলো থেকে ‘জেনোসাইডাল ইন্টেন্ট’ বা নিয়তের প্রমাণ পেয়েছে তা হচ্ছে: ‘…broader oppressive context and hate rhetoric; specific utterances of commanders and direct perpetrators; exclusionary policies, including to alter the demographic composition of Rakhine State; the level of organization indicating a plan for destruction; and the extreme scale and brutality of the violence committed.’ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমনপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ আখ্যা দিয়েছে। হত্যা-ধর্ষণ-উচ্ছেদের বিপুল আলামত পাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ৪টি ক্ষেত্র শনাক্ত করেছে এইচআরডব্লিউ। সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রগুলো হলো: ক) কোনও জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরিত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করা, খ) হত্যা, গ) ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সন্ত্রাস এবং ঘ) আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম স্ট্যাচুর বিবেচনায় নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড করা।

যে কোনো অঞ্চলে জেনোসাইড ঘটবে কি না, তা অনুমান করার জন্য গবেষকরা কিছু বৈশিষ্ট্যের দিকে খেয়াল রাখার কথা বলেন। যেমন, পূর্বে এথনিক উত্তেজনা ছিল কি না, রাজনৈতিক অস্থিরতা আছে কি না, শাসক এলিটরা কি কোনো একটা নির্দিষ্ট এথনিক গ্রুপের কি না, এই শাসকরা কোনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার মতাদর্শ ধারণ করে কিনা, শাসনামল প্রচণ্ড স্বৈরাচারী কি না, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের উপস্থিতি সীমিত কি না, সংখ্যালঘুরা ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার কি না। এইসব কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে আজিম ইব্রাহিম বলেন, এর সবকটি বৈশিষ্ট্য রাখাইনে প্রয়োগ যায়। গবেষক বার্বারা হার্ফ ২০০৪ সালেই আশংকা প্রকাশ করেছিলেন যে, বিশ্বের মধ্যে মিয়ানমারেই জেনোসাইডের সবচেয়ে বড়ো ঝুঁকি রয়েছে।

ফলে ২০১৭ সালের আগস্টে যা ঘটেছে সেটা ‘অভূতপূর্ব’ নয়, বরঞ্চ অনেকদিন ধরে চলতে থাকা কাঠামোগত দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পর্যায়। নূর ইলিয়াস নামের একজন শরণার্থীর জবানবন্দিতে সেটা ফুটে উঠে, ‘কয়েক বছর যাবত আমি নিজের গ্রামেই বন্দি হয়ে যাচ্ছিলাম। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত আমি অন্যান্য জায়গায় চলাফেরাও করতে পারতাম না – এবং এটা করতে গিয়ে আমাকে প্রচুর টাকাও খরচ করতে হয়েছে। পরিস্থিতি ২০১২ সাল থেকেই খারাপ হচ্ছিল। ঐ বছরের জুন মাসে, রাখাইনের কিছু লোক টংগু গ্রামের ১০ জন রোহিঙ্গাকে খুন করে। পরে আমরা শুনেছিলাম  বিভিন্ন শহর ও জেলায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিধনে এই লোকগুলো এবং সরকার জড়িত ছিল। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়, গুলি করেও মারা হয়।অনেক নারীকে ধর্ষণ করা হয়। গ্রামগুলো পুড়িয়ে দেয়া হয়, এবং রোহিঙ্গাদের গ্রেফতার করা হয়। অনেকেই জেলে মারা যান।… চারবছর পর, আমার বয়স যখন ২৬, মায়ানমারের সামরিক বাহিনী প্রায় ৩০০ গ্রাম  পুড়িয়ে দেয়। মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতেও আগুন দেয়া হয়। অসংখ্য রোহিঙ্গাদের গ্রেফতার করা হয় এবং জেলে বন্দি করা হয়…আমি গ্রেফতারের ভয়ে আতঙ্কিত থাকতাম। ২০১৬ সালের অক্টোবরের নাগাদ আমি নিজের বাড়িতে ঘুমানো বাদ দিয়ে দেই। কখনো কাদায়, কখনো ঝোপঝাড়ে, কখনো পাহাড়ে ঘুমাতে হয়েছে। মিয়ানমার সরকার আমাদেরকে আরাকান থেকে বের করে দিতে চাচ্ছে বহু দিন যাবত। গত বছর তারা সফল হয়েছে।’

২০১৭ সালেই রয়টার্স রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন চিকিৎসক দল থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে গণধর্ষণেরও শিকার হয়েছেন রোহিঙ্গা নারীরা। যুদ্ধে-বিগ্রহে ধর্ষণ হাজির হয় একটা মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে; আক্রান্ত জনগোষ্ঠিকে তাড়িয়ে দিতে বা উচ্ছেদ করতে, লাঞ্চিত করতে, মনবোল ভেঙ্গে দিতে এই অস্ত্রকে ব্যবহার করা হয়। তখনই জাতিসংঘ জানিয়েছিল, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নারীরা ধারাবাহিকভাবে সে দেশের সেনাবাহিনীর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। সেনাবাহিনী সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবেব্যবহার করছে। গার্ডিয়ানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে একজন রোহিঙ্গা নারী তার ঘটনা তুলে ধরেন। তার গ্রামে যখন আক্রমণ করা হচ্ছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, মানুষের উপর গুলি ছোড়া হচ্ছে, তিনি তখন মাত্র তিন মাসের বিবাহিতা। কলিমার স্বামী ও ছোট বোন গুলিতেই মৃত্যু বরণ করেন।কয়েকজন পুরুষ এরপর তাঁকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং ধর্ষণ করে, একসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি তাঁর চাচা ও কাজিনের সাথে বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন। ২০ বছর বয়সী এই নারী বলছিলেন, ‘আমি জানি না, আল্লাহ কেনো আমাকে মরতে দেন নি’।মানবাধিকার সংস্থা নারী নির্যাতন নিয়ে প্রচুর গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

গবেষক আফসান চৌধুরী এথনিক ক্লেনজিং এর তিনটা মডেলের কথা উল্লেখ করেছিলেন। কসোভো, বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গাদের সাথে তুলনামূলক আলোচনা করে তিনি রোহিঙ্গা ঘটনার লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্যগুলো দেখান। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া পতন কসোভোতে জ্বালানি দিয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমাতে অনেকটা অকস্মাৎ আক্রমণ করা হয়েছিল, এবং রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদের পাটাতন তৈরি হইছে। তিনি এথনিক ক্লেনজিং এর কথা বললেও আমরা একে জেনোসাইড হিসেবেও পাঠ করতে পারি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নেই, দল নেই। এমনকি একাত্তরে বাংলাদেশের যেমন সশস্ত্র একটা বাহিনী তৈরি হইছিল, সেই সম্ভাবনাও নেই। বাংলাদেশ যেভাবে ভারত-রাশিয়ার মতন রাজনৈতিক সহায়তাকারী দেশ পেয়েছিল, রোহিঙ্গাদের সেটাও নেই। তাদের কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় সমর্থন নেই। তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত নেয়াতে আদৌ কোনো পরাশক্তি রাষ্ট্রের লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই, বরঞ্চ এদেরকে শরণার্থী হিসেবে রেখে অনেকেই মিয়ানমারেই অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারবেন। ফলে রোহিঙ্গা-সংকট বাংলাদেশ ব্যতীত আপাতত আর কোনো দেশের জন্যই সমস্যা হিসেবে হাজির হয় নি। চীন তো শুরুতেই এটাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন ইস্যু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। যদিও এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীনের ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার কে রক্ষা করতে চীন আর ভেটো দেবে না। কিন্তু এটাকেও বিশ্লেষকরা চীনের দ্বিমুখী আচরণ হিসেবে দেখছেন।  আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী সহায়তা পাঠাতে আগ্রহী হলেও, রোহিঙ্গাদের সংকট সমাধানে খুব একটা আগ্রহী নয়।

 

জেনোসাইড অস্বীকার

জেনোসাড স্টাডিজের গবেষক গ্রেগরি এইচ স্ট্যান্টন জেনোসাইড সংঘটনের ৮টি (পরে ১০) ধাপের কথা বলেছিলেন। সেখানে শেষ ধাপটা হচ্ছে‘ডিনাইয়েল’, বা অস্বীকার। দুনিয়ার প্রায় সব ক্ষেত্রেই জেনোসাইডকারীরা ‘জেনোসাইড’কে অস্বীকার করেছে। এই অস্বীকার করাটা এতোটাই অনিবার্য যে, একেও একটি ‘ধাপ’ হিসেবে জেনোসাইড স্টাডিজের গবেষকরা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ‘Every genocide is followed by denial’।

মিয়ানমার সরকার বরারবরের মতো জেনোসাইডকে অস্বীকার করে আসছে। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে বা আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে আফ্রিকার মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গাম্বিয়া। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পিস প্যালেসে ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর মামলার শুনানি চলে। ১০ ডিসেম্বর গাম্বিয়ার প্রতিনিধি দল আদালতে গণহত্যার বিষয়ে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন, এবং পরদিন মিয়ানমারের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের সরকার প্রধান অং সান সু চি। সেখানে তিনি তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

রোহিঙ্গাদের উপর জেনোসাইড চালানো হয়েছে এটা অং সান সুচি অস্বীকার করেছেন; তা মোটেও অবাক করার মত বিষয় নয়। কারণ, ‘অস্বীকারের’ ইতিহাস। গবেষকরা সাধারণাত জেনোসাইড অস্বীকারের যত কলাকৌশলের কথা উল্লেখ করেন, এসবের মধ্যেই সুচির যুক্তি ঘোরপাক খাচ্ছিল।জেনোসাইডকারীরা জেনোসাইডের যাবতীয় নিদর্শন মুছে ফেলার চেষ্টা করে, যেমন, গণকবরের চিহ্ন মুছে ফেলা, লাশ পুড়িয়ে ফেলা, দলিলাদি নষ্ট করে ফেলা ইত্যাদি। তারা যে শুধু অস্বীকারই করে তা না, উল্টো ভিকটিমকেই দোষারূপ করে। কারণ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠির মানুষকে হত্যা ও তাদের সাংস্কৃতিক উপাদান ধ্বংসের পর শুধু স্মৃতিটুকুই রয়ে যায়। এরপর এই স্মৃতিটুকুও আক্রমণের শিকার হয়। মানুষকে পুরোপুরি নির্মূল করতে তাঁর স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলা দরকার। জেনোসাইড অস্বীকারের কিছু প্রবণতা আছে। মানে, কিছু নির্দিষ্ট ভাষিক ও ব্যবহারি ‘পদ্ধতি’ আছে। যেমন জেনোসাইডে নিহতের সংখ্যাকে ‘exaggeration’ বলা হয়, বা কখনো কখনো ‘খুব একটা মারা যায়নি’ বলা হয়। জেনোসাইডের সময়কার ছবি ভিডিও এইসবকে ভুয়া অসত্য বলে উড়িয়ে দেয়া হবে। সূচিও একইভাবে তাদের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগকে ‘incomplete and misleading’ বলেছেন।

অস্বীকারের আরেকটি উপায় হচ্ছে, আত্মরক্ষার তত্ত্ব প্রচার করা। নিহতদের বিদ্রোহী, সন্ত্রাসী ইত্যকার নামে চিত্রায়িত করে দাবি করা হবে যে, জেনোসাইডকারীরা নিজেদের রক্ষা করার জন্যে আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় প্রতিটা রাষ্ট্রই তাদের কৃতকর্মকে এই উপায়ে জায়েজ করার চেষ্টা চালিয়ে থাকে। তাই মিয়ানমার ও যখন আরসার আক্রমণের কথা বলে, সন্ত্রাসীর আক্রমণের কথা বলে তখন খুব একটা অবাক হই না।

জেনোসাইডের সংজ্ঞার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নিয়ত (intent)। জেনোসাইড প্রমাণ করতে এর নিয়তও প্রমাণ করতে হয়। বর্তমান জমানায় যেখানে রাষ্ট্রগুলো চরম আমলাতান্ত্রিক সেখানে আদালতের সামনে ‘নিয়ত’ প্রমাণ করা খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়। গবেষকরাও এই ‘নিয়ত’ ইস্যুতে প্রচুর তর্ক বিতর্ক করেছেন। কিন্তু, এখন গবেষকরা প্রায়শই বলেন যে, জেনোসাইড চালানো – মানে মেরে ফেলা, শারীরিকভাবে ক্ষতি করা, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, সিস্টেমেটিক্যালি ধর্ষণ করা ইত্যাদি – কোনোভাবেই ‘অনিচ্ছাকৃত’ভাবে বা এক্সিডেন্টলি সম্ভব না। ‘it is not plausible that a group of some considerable size is victimized by man-made means without anyone meaning to do it!’ বিশেষত, সামরিক আক্রমণের কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকতেই হবে, যদিও কাগজে-কলমে প্রমাণ করা কষ্টসাধ্য। তাই অস্বীকারের একটা মোক্ষম ও জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে ‘নিয়ত’কে প্রশ্নবিদ্ধ করা। বলা হয় যে, There was no central direction বা not intentional। মিয়ানমারের পক্ষের উকিল প্রফেসর উইলিয়াম সাবাস এই নিয়ত বা ‘intent’কে সামনে এনেছেন। বলেছেন যে, Gambia had not addressed the issue of intent to conduct genocide।

ফলে, সুচি যখন আদালতে যান এটা প্রায় নিশ্চিত ছিল যে তিনি জেনোসাইড অস্বীকার করবেন। কারণ, তার অস্বীকারের মধ্য দিয়ে, এক অর্থে, স্ট্যান্টন বর্ণিত ধাপগুলো ‘পূর্ণতা’ পেয়েছে। যদিও সুচির শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তি বা পূর্বেকার বহু কারণে অনেকে বোধহয় অন্যকিছুর প্রত্যাশা করেছিলেন কিন্তু, এটা হয় নি, হওয়ার কথাও ছিল না। জেনোসাইড অস্বীকার আসলে জেনোসাইডেরই একটা অংশ।

তবে, অস্বীকার করলেও, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় মিয়ানমারের প্রতি চারটি নির্দেশনা দেয় আইসিজে। রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে, রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সে সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চারমাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয়মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে। তবে, এই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত, রাশিয়া ও চীনের নীরবতায় অনেকে হতাশাও ব্যক্ত করেন।

 

রোহিঙ্গা শরণার্থী: করাতের জীবন

 ২০১৭ সালের আগস্টের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল নামে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেয়া হয়, প্রায় ৭-৮ লক্ষ রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেন।জেনোসাইডের শিকার একটা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ অনেক ‘প্রশংসা’ কুড়িয়ে নিলেও, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও প্রচুর অভিযোগ উঠছে। যেমন, গত বছর ‘রোহিঙ্গা জেনোসাইড দিবস’ উপলক্ষে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাইলে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়, রোহিঙ্গাদের কাছে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়। মহামারির সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানানো হলেও আমলে নেয়া হয়নি। সামরিক বাহিনী শরণার্থী শিবিরের চতুর্দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে। এটা চলাফেরার করার স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করবে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের লোকজন বলছেন যে, ভাসানচর শিবিরে তাদের আত্মীয়রা বিভিন্ন ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চরের কর্তৃপক্ষরা খারাপ ব্যবহার করছেন। রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রশ্ন করেছেন, আমরা কি মানুষ না! অনেক রোহিঙ্গারা ‘সন্ত্রাসী’ পরিচয়ে ক্রসফায়ারেরও শিকার হচ্ছেন।

শরণার্থী শিবিরেও বাড়ছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। ধর্ষণের একটি ঘটনার সাথে বাংলাদেশের আর্মির এক সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। কখনো শিবিরের কারো দ্বারাই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারীরা। আবার, রোহিঙ্গা নারীরা স্বামীর হাতে মারধরের শিকার হচ্ছেন, মানে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের।নারীরা জানাচ্ছেন, মিয়ানমারে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় স্বামী কখনোই এই ধরণের আচরণ করতেন না। কিন্তু, এখন এই পরিস্থিতিতে সবকিছু পাল্টায়ে গেছে। গার্ডিয়ানে সারাহ মার্শের প্রতিবেদন আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কিভাবে বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের সহিংস করে তুলছে।

রোহিঙ্গারা তাদের রাষ্ট্রে কয়েক যুগ ধরে রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন। মিয়ানমারে তাদের ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যবহার না করে ‘বাঙ্গালি’ পরিচয় ব্যবহার করা হয়। এমনকি সুচিও মনে করেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা বলে কোনো এথনিক গোষ্ঠী নাই, যারা আছে এরা বাঙালি। রোহিঙ্গাদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ ‘খারাপ’ হিসেবে তুলে ধরে জেনোসাইডকে জাস্টিফাই করার প্রয়াস ইতোমধ্যেই আমরা দেখেছি। মিয়ানমার রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের ‘সন্ত্রাসী’ ‘বর্বর’ ইত্যাদি বলে যে ডিহিউম্যানাইজেশন শুরু করেছিলো তার ঢেউ শেষেমেষে এসে বাংলাদেশেও পড়ে। শরণার্থী সংকটের সাথে বর্ণবাদীতা হাত ধরে ধরে আসে।বাংলাদেশেও তাই হয়েছে। কিছুদিন পর পর আমরা দেখি, হঠাত করে বাংলাদেশের মিডিয়া সমূহ রোহিঙ্গাদের ডিহিউম্যানাইজ করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। ‘কালের কণ্ঠ’ এর মতো জাতীয় পত্রিকা রোহিঙ্গা সংক্রান্ত খবর শেয়ার করে ‘ফিলিং অ্যাংগ্রি’ ইমো দেয়। ফেসবুকে কিছু গ্রুপ খোলা হয়েছিল, এবং এখনো বোধহয় আছে, রোহিঙ্গা খেদাও, বাচাও দেশ ইত্যাদি নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দেখেছি, যারা এমন ভয়ংকর বর্ণবাদী আচরণ করছেন তাদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সারা বছর গলা ফাটান। দুঃখের কথা হচ্ছে, মিয়ানমার যে প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে তাদের ওপর জেনোসাইড সংঘটন করেছিল, আমাদের এখানেও একই প্রোপ্যাগান্ডা চালিয়ে ডিহিউম্যানাইজ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বর্বর, এরা খারাপ, এরা খালি বাচ্চা উৎপাদন করে, এরা মাথায় টুপি পরে, এরা সন্ত্রাসী- এই ধরণের বর্ণবাদী দৃষ্টভঙ্গি ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা ঘুরপাক খেতে দেখেছি।

বিরাট সংখ্যক শরণার্থী যখন যে কোনো এলাকায় প্রবেশ করবে তখন সেই এলাকায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিবেই, কিন্তু এখানে যে বিষয়টা মাথায় রাখা অতীব গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, শরণার্থীরা ভিক্টিম; প্রাণঘাতী সমস্যার উপস্থিতি ব্যতীত সে নিজের এলাকা ছেড়ে যেতো না। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক জেনোসাইডের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে যখন বাঙালিরা শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করলো, সেই অভিঘাতে ভারতেও বিবিধ সমস্যা দেখা দিয়েছিল। শরণার্থীদের বিষয়ে কোনো তুলনা করা চলে না, কারণ শরণার্থীদের অবস্থা সব দেশেই মোটামুটি সমান। শরণার্থী সমস্যা আর যাই হোক ‘রেসিজম’ চর্চা করে বন্ধ করা যাবে না। স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বিভিন্ন বাস্তবতার অভিঘাতে একধরণের ক্ষোভ সৃষ্টি হয়ে থাকে স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু কিন্তু সেই ক্ষোভ ‘ঘৃণা’র রাজনীতির জন্ম দিবে কি না সেটা নির্ভর করবে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সম্মতি উৎপাদনওয়ালাদের উপর।

শরণার্থীরা বাংলাদেশেও থাকতে চায় না। তারা নিজ দেশে ফিরতে চান, কিন্তু নাগরিক অধিকার সহ। যেমন একজন বলছিলেন, ‘আমরা যদি লম্বা সময় ধরে এই ক্যাম্পগুলোতে থাকি, আমাদের কমিউনিটি তাঁর ধর্ম ও ঐক্য হারিয়ে ফেলবে। আমাদের সন্তানেরা শিক্ষিত হবে না। তাই সবকিছুর পরেও, আমরা মায়ানমারে ফেরত যেতে যাই – কিন্তু একমাত্র নাগরিকত্ব ও আমাদের অধিকার সহ। বহু দিন পূর্বে মিয়ানমার সরকার আমাদের যে অধিকার কেড়ে নিয়েছে, সে অধিকার ছাড়া প্রত্যাবাসনে আমরা কখনো রাজি হবো না। আমি প্রায়ই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি, এমনকি আমার ভবিষ্যৎ নিয়েও। এখানে আমাদের কোন শিক্ষা নেই, স্কুল নেই। ভয় হয়, যদি এভাবে শরণার্থীর জীবন কাটাতে হয় তাহলে আমাদের ও আমাদের সন্তানদের জীবন পশুর মতো হয়ে যাবে।’

 

রোহিঙ্গা থেকে আসাম: জাতিরাষ্ট্রের সংকট

আধুনিক রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ ‘ঘটনা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জেনোসাইড’। কীভাবে জেনোসাইডের জমিন তৈরি হয় তা পূর্ব থেকে আন্দাজ করার অনেক প্যারামিটার থাকলেও কার্যত কোনোভাবেই জেনোসাইড বন্ধ করা যাচ্ছে না। জাতিসংঘের বিভিন্ন ধরণের এখতিয়ার থাকলেও তার নিজস্ব কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে জেনোসাইড বন্ধে শান্তিপূর্ণ হস্তক্ষেপের নজির খুব একটা নাই। যেমন, মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন ও সাইমা আহমেদ বলছেন, ‘Throughout its history the UNSC had been paralysed numerous times because of the use of veto by its permanent members’।

বাংলাদেশ পঞ্চাশ বছরের মধ্যে দুটো জেনোসাইড দ্বারা আক্রান্ত হলো। একটা প্রত্যক্ষ। আরেকটা পরোক্ষ, মানে জেনোসাইডের ফলে সৃষ্ট শরণার্থীর বোঝা। ফলে, দুনিয়াব্যাপী জেনোসাইড বিরোধী ক্যাম্পেইনে বাংলাদেশের পথ দেখানো উচিত ছিল, যদিও এর থেকে আমরা বহু দূরে আছি বলে মনে হচ্ছে। আবার, এও মনে রাখা দরকার, খোদ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও পাহাড়ে ‘জেনোসাইড’ এর অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে এবং ঐতিহাসিকভাবে এমন এক অবস্থানে আছে যে তাকে শান্তিতে বসবাস করতে হলে কিছুটা তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের অবস্থার ওপর শর্তায়িত ও নির্ভর থাকতে হয়। সেটা ভারত ও মায়ানমারের বিদ্যমান অবস্থা দেখে আন্দাজ করা যায়। চোখের সামনে থাকা রোহিঙ্গা সংকট এর সমাধান হলে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ ছাড়া আর কারোরই লাভ হবে না, কিন্তু এই সংকট জীয়য়ে রাখলে লাভ অনেকের। একই ভাবে মাত্র কিছুদিন পূর্বে আসামেও আমরা উত্তপ্ত পরিস্থিতি দেখেছি।

তবে, দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যমান পরিস্থিতি আমাদেরকে জাতি রাষ্ট্রের সঙ্কটের দিকেই মনযোগ দিতে বাধ্য করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে একটা বিতর্ক পড়েছিলাম, বাহাত্তর সালের। সেখানে একজন বুদ্ধিজীবী [নাম মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে] বোধহয় বলছিলেন যে, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে সাম্প্রদায়িকতা থাকে, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে সাম্প্রদায়িকতা থাকে না। এধরণের ডিসকোর্স খুব শক্তিশালী আমাদের এখানে। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের উচিৎ এইসব পূর্বানুমান ভিত্তিক কথাবার্তা ছেড়ে বাস্তবতার জমিনে পা দেয়া। আমাদের দেশে যারা জাতিবাদী রাষ্ট্র, মানে জাতি রাষ্ট্রের পক্ষে উকালতি করেন, তাদের আমি চোখ খোলার সময় এসেছে। জাতি রাষ্ট্র ধারণা যে ‘বর্জনমূলক’ চরিত্রের যা বর্ণবাদীতা ও সাম্প্রদায়িকতা জন্মের উর্বর ভূমি তা যদি এখনো উপলব্ধি করতে না পারেন তাহলে সেটা দুঃখজনক। শাবিপ্রবিতে একবার হলোকাস্ট নিয়ে একজন জার্মান শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন যে, হলোকাস্টের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ যে ‘ধারণা’ হিসেবে কতটা মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর তা বুঝতে পারা। তখন আমাদের অনেক শিক্ষক রীতিমতো প্রতিবাদ করে উঠেছিলেন। দুঃখের বিষয়, মুক্তিযুদ্ধকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নাকি জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম সেটা এখনো তাদের পক্ষে ঠাওর করা সম্ভব হয় নাই। আসাম ও রোহিঙ্গা ইস্যু দেখে অন্তত এইবার বুঝতে পারা উচিৎ। মিয়ানমার ও ভারত একটা জাতিরাষ্ট্র হতে চায়। তাকে বিভিন্নভাবে কাউকে না কাউকে ‘বর্জন’ করতেই হবে। রাষ্ট্রহীন ‘মানুষ’ তৈরি করবেই সে। মূল প্রশ্ন হতে হবে কীভাবে আমরা রাষ্ট্র হিসেবে এই সংকটকে মোকাবিলা করবো, যে রাষ্ট্র কিনা মানুষকে ‘অপর’ বানিয়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়। এই সংকট মোকাবেলায় কে কবে মিয়ানমার গেছে, আর কে কবে বাংলাদেশে আসছে, আর কে কবে আসাম গেছে এইসব প্রশ্ন অবান্তর। এমন জাতীয়তাবাদী চোখ উপড়ে ফেলা এখন বাধ্যতামূলক।

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে ‘উত্তাপ’ময় সময় বোধহয় এখন জারি আছে,  যখন সবধরণের জাতীয়তাবাদী ও মতাদর্শিক টুলি খুলে রেখে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে সমস্যাকে উপলব্ধি করার দরকার সবচেয়ে বেশি। যেমন আমাদের জন্য, তেমনি রোহিঙ্গাদের জন্য।

 

Sohul Ahmed, activist, and author. Topics of interest are politics, history, liberation war, and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

 

Share.

Leave A Reply

Translate »