অভিমত | স্বৈরাচার, স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্র | সারোয়ার তুষার

Share this:

একটা গণঅভ্যুত্থানকে স্রেফ “সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা”র দিকে নিয়ে গিয়েছিল তৎকালীন পলিটিকাল পার্টিসমূহের নানামুখী জোট। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন ঘটেছিল এইসব পার্টির হাতেই।

 

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই রাষ্ট্রগঠনের ‘আদিপাপ’ এর মীমাংসা না করেই এখানে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামীলীগ পার্টির একক ইচ্ছায়। সেই ‘আদিপাপ’টা হলো স্বাধীন দেশের জন্য নতুন সংবিধান সভার নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা সংবিধান প্রণয়ন ও সেই সংবিধানের পক্ষে জনতার সম্মতি আদায় না করা।

ফলে একব্যক্তির হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার মতো একটা সংবিধান প্রণিত হয়েছিল দলীয় অনুগত উকিলদের মাধ্যমে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে যারা তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে ‘৭০ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের এলএফও’র (যার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল পাকিস্তান হবে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’) অধীনে ; সেই তারাই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশের সংবিধান সভায় বসে সংবিধান পাশ করেছেন। নতুন সংবিধান সভার জন্য কোন নির্বাচন আর হয়নি।

এই সংবিধান সভা এবং জনতার সম্মতি /অনুমোদনের ভিত্তিতে একব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচারী ক্ষমতা বন্দোবস্তের সংবিধান পাল্টানোর সর্বশেষ সুযোগ এসেছিল ‘৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ে। সেই আলাপও উঠেছিল।

সেই আলাপ, দাবিকে, একটা গণঅভ্যুত্থানকে স্রেফ “সাংবিধানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতা”র দিকে নিয়ে গিয়েছিল তৎকালীন পলিটিকাল পার্টিসমূহের নানামুখী জোট। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন ঘটেছিল এইসব পার্টির হাতেই।

এরাই, আজকে পর্যন্ত আমাদের গণতন্ত্রের ‘মাস্টার’ হয়ে বসে আছে। গণতান্ত্রিক বুলির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে রাষ্ট্রগঠনের ‘আদিপাপ’ সংশোধনের দাবি।

বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই-প্রতিরোধ গড়ে তোলার একাধিক অভিজ্ঞতা আছে। সেই অভিজ্ঞতারই চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। এরপর স্বাধীন রাষ্ট্রেও তারা ভাঁড় ও স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটিয়েছিল অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

কিন্তু জনতার এই বীরোচিত উত্থানকে মিনিংফুল করার দায় ছিল যাদের, স্বৈরাচারের উৎখাতকে একটা নূন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা যাদের ; সেইসব পলিটিকাল পার্টিই এরশাদকে তাদের ভোটের রাজনীতির পুতুলে পরিণত করেছিল।

ফলে স্বৈরাচার যায়, নানা মোড়কের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র থেকে যায়।

এইদেশের মানুষ ভেবেছিল আইয়ুব-ইয়াহিয়াকে হটিয়েছি, এরশাদকেও গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করলাম ; এবার যাদেরকে আমাদের ভালো-মন্দের দায়িত্ব দিয়েছি, সেইসব ‘গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কাউকে না কাউকে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসাবো এবং সুখে শান্তিতে দিনযাপন করব।

ব্যস, গণতন্ত্রের ধারণা সংকুচিত হতে হতে গিয়ে ঠেকল নির্বাচনে। একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবিন্যাস যদি মিনিমাম ডেমক্রেটিক না হয়, তাহলে নির্বাচন যে কোন কাজেই আসেনা বরং নির্বাচনের মাধ্যমে “নৈর্বাচনিক স্বৈরতন্ত্র” কায়েম হতে পারে ; বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক বোঝাপড়ায় এই ধারণা বরাবরই অনুপস্থিত ছিল এবং আছে।

আপনার কাছে যদি কিছুই না থাকে, নিজের বাছাই করা প্রতিনিধি যদি আপনার জীবন-মৃত্যুর প্রভু হয়ে ওঠে, তাহলে কেবলমাত্র নির্বাচনি ব্যবস্থা থাকা একটা নির্মম পরিহাস ছাড়া আর কিছুই হয়না। এখন তো সেই নামকাওয়াস্তে নির্বাচনি ব্যবস্থাই নাই!

নির্বাচন সরকারে কোন দল আসবে তার একটা পদ্ধতি ছাড়া আর কিছুই না। কেবলমাত্র নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ‘গণতন্ত্র’ বলে প্রচার করার শয়তানি এক্সপোজ করার কথা যাদের ; সেই বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ নিজেদের ‘বিভ্রান্তি’ পত্রিকায় লিখে জানাচ্ছেন।

এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন করেছিলেন। এজন্য, যথার্থই, এরশাদ এইদেশের প্রগতিশীল মহলে যথেষ্ট নিন্দিত।

কিন্তু ক্ষমতায় এসেই ইচ্ছামতন সংবিধান কাঁটাছেড়া করার ব্ল্যাংচেকটা কোথায় থাকে? সেটা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য নেই কেন?

‘৭২ এর সংবিধান রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহিকে যে নিরঙ্কুশ, লাগামহীন স্বৈরাচারী ক্ষমতা উপভোগের সুযোগ করে দিয়েছে, তার উপর ভর করে চাইলেই যখন যেভাবে খুশি সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রের মৌলিক আকাঙ্ক্ষাকে পালটে দেয়া যায়।

আপনি মুখে বলবেন রাষ্ট্রের মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ; আর ক্ষমতা দিয়ে রাখবেন একব্যক্তির হাতে, তাকে রাখবেন সমস্তকিছুর ঊর্ধে।

গোটা সংবিধান সহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার একক স্বৈরাচারী ক্ষমতার করতলগত থাকবে ; এরপর এই নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী ক্ষমতা বন্দোবস্তের সমালোচনা করলে ‘প্রগতিশীল’ ফতোয়া দেয়া ; হয় নির্বুদ্ধিতা অথবা শয়তানি।

এই দোহাই সেই দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের বিবদমান বিভিন্ন পক্ষ আসলে চায় নিজের পার্টিকে, নিজের মতাদর্শকে, আজীবন ক্ষমতায় দেখতে এবং একটা চরম স্বৈরাচারী ক্ষমতা উপভোগ করতে।

বর্তমান বাংলাদেশের ভয়াবহ পরিস্থিতি বিবেচনায় সত্যিকার অর্থেই যেকোন স্বৈরাচারবিরোধী, গণতন্ত্রমনা, কর্তৃত্ববিরোধী মানুষের আসলে মহান মহান দোহাই আর সাইনবোর্ডের এর আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছাড়া কোন উপায় নাই।

এই চরম ও নিরঙ্কুশ স্বৈরতন্ত্রের কালে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক ইনক্লুসিভ গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের লড়াই গড়ে তোলা বাংলাদেশের আপামর জনতা এবং তাদের পক্ষের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিসমূহের প্রধান কর্তব্য। বর্তমানের এই নিরঙ্কুশ স্বৈরতান্ত্রিক সময়ে নব্বই এর গণঅভ্যুত্থান এর তাৎপর্য কী? তাৎপর্য এটাই যে স্বৈরাচার চলে যায়, কোন নির্দিষ্ট রেজিমের পতন ঘটে কিন্তু স্বৈরতন্ত্র থেকে যায়। স্বৈরতন্ত্র থেকে যাওয়ার মতো ক্ষমতা-কাঠামোকে বদলানোর দিশা খোঁজার কোন বিকল্প বর্তমানে নাই।

এর বাইরে আসলে সমস্ত আলাপই রেটরিক মাত্র।

 

ছবি: ইন্টারনেট

 

Sarwar Tusher is an author and activist; interested in studying the state, power, authority, sovereignty, violence, and social relations.

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top