অভিমত | All the Prime Minister’s Men কেন আলোচনার লক্ষ্যবস্তু?

আজকে বাংলাদেশের চরম বাস্তবতা হচ্ছে, স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চললেও মুক্তিযদ্ধের অন্যতম মূল দর্শন–মুক্তভাবে চিন্তা এবং মত প্রকাশের পরিবেশ—তা আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। এর দায় শুধু সামরিক শাসকরাই নন, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তার নেতৃত্বের উপরেও একই সাথে বর্তায়।

                  

১ ফেব্রুয়ারি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইলেকট্রনিক মিডিয়া আল জাজিরাতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি All the Prime Minister’s Men বাংলাদেশে নজিরবিহীন আলোচনা/সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিমধ্যে, বাংলাদেশের হাইকোর্ট এ ডকুমেন্টারিটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সব ধরনের সামাজিক মাধ্যম থেকে অবিলম্বে সরাতেও বিটিআরসিকে নির্দেশ দিয়েছে।

যারা এ ডকুমেন্টারিটি পছন্দ করছেন না, তারা বলছেন এতে নতুন কিছু নেই, এর সবকিছুই তাঁদের জানা। তাঁরা এর নির্মাণ কৌশল, কারিগরি মান, সাংবাদিকতার নীতিমালা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।এটিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বা আরো স্পষ্ট করে বললে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তাঁরা দেখছেন।

অপরদিকে যারা এটিকে পছন্দ করছেন, তাঁদের কাছে ডকুমেন্টারিটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। এর কারিগরি দক্ষতার মানও অনবদ্য। এর মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যে ব্যাপক দুর্নিতির সাথে যুক্ত, সেটি নতুন ভাবে উন্মোচিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোর মূল ফোকাস যে সমস্ত রাষ্ট্র, বাংলাদেশ তার অন্যতম নয়।  আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোতে বাংলাদেশ নিয়ে সংবাদ হয় কালেভাদ্রে, কদাচিৎ। আবার সংবাদ যখন হয়, তখন তা প্রায় কোন সময়ই মূল বা প্রধান সংবাদ হিসাবে গুরুত্ব পায় না।

কিন্তু আল জাজিরা তাদের ওয়েব পেইজে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বাংলাদেশ নিয়ে এ ডকুমেন্টারিটি প্রকাশ করেছে। এরপর কয়েকদিন একে ঘিরে কতগুলি ফলোআপ সংবাদও তারা করেছে।

এখন প্রশ্ন হল, এ গুরুত্ব দেবার কারণেই কি ডকুমেন্টারিটি ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে?

এটি একটি কারণ হলেও এর মূল কারণ হল যারা ডকুমেন্টারিটি দেখেছেন, তাঁদের একটা বড় অংশের কাছে মনে হয়েছে, বেশ কিছু জানা এবং একই সাথে জনমানসে কিছু পূর্ব ধারণার বিষয় নিয়ে এটি নির্মিত হলেও, যে ঢঙ্গে, আঙ্গিকে, কারিগরি দক্ষতায় এটি নির্মিত হয়েছে এবং যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গের নাম ক্রাইম থ্রিলার মুভির স্টাইলে এতে উপস্থাপিত হয়েছে, সেরকম কিছু তৈরির দক্ষতা বা সক্ষমতা যেমন বাংলাদেশের কোন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নেই, তেমনি সেরকম রাজনৈতিক পরিবেশও দেশে বিদ্যমান নেই। তাঁদের কাছে এটি একটি নিষিদ্ধ বিষয়ের বিষয়বস্তু মনে হয়েছে। আর যা কিছু নিষিদ্ধ, তার প্রতি মানুষের আগ্রহ সহজাত

সামরিক শাসক এরশাদ আমলে যখন সংবাদপত্রের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হত, তখন বিভিন্ন পাড়া মহল্লার দোকানের সামনে বিবিসি এবং ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা সংবাদ প্রচারের সময় ভিড় জমে যেত। যখন এ বিধিনিষেধ শিথিল থাকত, সংবাদপত্রগুলি আন্দোলনরত দলগুলোর খবর প্রকাশ করতে পারত, তখন কাউকে তেমন ভিড় করতে দেখা যেত না। সেসময় এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী প্রয়াত মেরি মমতাজের খবর ব্রিটিশ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তার গোপন ফটোকপি পাবার প্রবল আগ্রহ অনেকের মাঝে দেখা গিয়েছিল।

উদার গণতান্ত্রিক দাবীদার দেশগুলিতে প্রায় সবকিছুই প্রকাশ/প্রচার করা যায় বলে কোন কিছু সম্পর্কে এ সমস্ত রাষ্ট্রের জনগণের প্রবল আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। গণতান্ত্রিক দাবীদার রাষ্ট্রগুলির মূল বৈশিষ্ট্য হল, এখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোসমূহের উপর জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত। সে সমস্ত দেশের সংসদীয় কমিটিগুলো সামরিক/বেসামরিক, সরকারী/বেসরকারী যেকোন কর্মকর্তাকে জবাবদিহি বা জেরা করবার জন্য ডেকে পাঠাতে পারে। এ সমস্ত জেরা সাংবাদিক এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের সামনে হয়। অনেক সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লাইভও প্রচারিত হয়।

উদার গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানই যেমন সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে, তেমনি মিডিয়া রাষ্ট্র এবং সরকারের যেকোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, তাদের কার্যকলাপ বা আর্থিক লেনদেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলতে বা প্রশ্ন করতে পারে।এ ধরণের গণতন্ত্রে আদালত নির্দেশ দিয়ে প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত কোন সংবাদের প্রচার বা প্রকাশ নিষিদ্ধ করে দেয় না। একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র কতটা কার্যকর সেটি বোঝার জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে আদালত কতটা সহনশীল বা স্বাধীনভাবে এ বিষয়ে রায় দিতে পারে–এটি একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাপক।

উল্লেখ্য যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা কোন বিমূর্ত বিষয় নয়। এর চর্চা মিডিয়ার মাধ্যমেই হয়। তাই মত প্রকাশের স্বাধীনতার মানে হচ্ছে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার স্বাধীনতা। একটি দেশে এ সমস্ত মিডিয়া যত স্বাধীন, সে সমস্ত দেশে মত প্রকাশের তত বেশি স্বাধীনতা রয়েছে।

আজকে বাংলাদেশের চরম বাস্তবতা হচ্ছে, স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর হতে চললেও মুক্তিযদ্ধের অন্যতম মূল দর্শন–মুক্তভাবে চিন্তা এবং মত প্রকাশের পরিবেশ—তা আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি। এর দায় শুধু সামরিক শাসকরাই নন, বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তার নেতৃত্বের উপরেও একই সাথে বর্তায়।

পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের অধীনে যেহেতু বাধাহীনভাবে মত প্রকাশ করা যেত না, তাই বাঙালি জনমানসে এ আকাঙ্ক্ষা প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল যে, স্বাধীন দেশে আর যাই হোক, সবাই মুক্তভাবে কথা বলতে পারবে। কেননা, পরাধীনতার মানেই হচ্ছে কথা বলতে না পারা।

বাধাহীনভাবে যেকোন মত প্রকাশ করবার পরিবেশ পঞ্চাশ বছরে তৈরি না হবার ফলে জনমানসের বড় অংশের মাঝে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে যে ধারণা গড়ে উঠেছে সেটি হল, যে যে মতাদর্শে বিশ্বাস করে, মিডিয়াতে শুধু তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়ার মানেই হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে একই সাথে যে, নিজ নিজ চিন্তা ও মতের ঠিক বিপরীত মতাদর্শ প্রকাশের পরিবেশ থাকা–এ ধরণের ধারণা রাজনৈতিক দল এবং সিভিল সোসাইটি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর ফলে রাষ্ট্র এবং সমাজ, এ দুই জায়গাতেই শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় চিন্তা ও মত প্রকাশের ক্ষেত্র বা স্পেস খুব বেশি প্রসারিত হতে পারেনি; তবে  সামরিক/বেসামরিক বিভিন্ন সরকারের সময় এর কিছুটা মাত্রাগত হেরফের দেখা গেছে।

পশ্চিমের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার মডেল হিসাবে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশে মত প্রকাশের এ ধরণের স্বাধীনতা কেন নেই এ প্রশ্ন যখন আসে, তখন দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক থেকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ মননে এখনো সে ধরণের পরিপক্কতা অর্জন করেনি। ফলে তাদের পশ্চিমের মত সমস্ত বিষয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিৎ নয়।

রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি সবকিছুতেই কম বেশি সেন্সর এবং self-censorship থাকা উচিৎ বলেই তারা প্রায় সবাই মনে করেন। গত পঞ্চাশ বছরে এ ধরণের ভাবনার ক্রমাগত চর্চার ফলে গণমানসে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে এ ভাবনাটিই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

মনোজগতে উপনিবেশিক মনোবৃত্তি ধারণ করবার ফলে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক এলিটরা এখনো ভাবতে পারেন না যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে উদারনৈতিক ধারার গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সেক্যুলারিজম ইত্যাদির ক্ষেত্রে “তৃতীয় দুনিয়ার” সামনেতো বটেই, এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের সামনেও মডেল হিসাবে গড়ে তোলা যায়। কেননা সেখানেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অধিকাংশ মিডিয়া হাউস নিয়ন্ত্রিত হবার ফলে মত প্রকাশের অবারিত ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি।

দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন আমাদের এলিটদের (রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক) মনোজগতের যে ক্ষতিটা করেছে সেটা হল, পশ্চিমের চেয়ে চাইলে তাঁরা যে উন্নত চিন্তা করতে পারেন, এ বোধটাকেই নষ্ট করে দেয়া। প্রাচ্যের এলিট এবং চিন্তাবিদদের মানসিক দীনতার এ দিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইরানের চিন্তাবিদ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হামিদ দাবাশি, তাঁর Can Non-Europeans Think? গ্রন্থে।

উপনিবেশিক শাসন বাংলাদেশের মত উত্তর- ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলিতে যে সমস্যা তৈরি করেছে সেটা হল, এসব দেশের সরকারের চেয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী হয়ে উঠা। ফলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মত জনগণের প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান এবং এদের প্রতিনিধিকে সরকার তার অধীন এবং দায়বদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়।

শুধু গণতান্ত্রিক নয়, চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা ইত্যাদি বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক দেশেও সমস্ত সামরিক/বেসামরিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর সরকার এবং কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং কর্ত্ত্বত্ব রয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, ভারতের মত দুই একটি রাষ্ট্র বাদে, প্রায় কোন উত্তর- ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রেই সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগূলির উপর পূর্ণ কর্ত্ত্বত্ব স্থাপন করতে পারেনি।

এর মূল কারণ হল উপনিবেশিক প্রভুরা যখন এ সমস্ত রাষ্ট্র ছেড়ে চলে যায়, তারা তখন সেখানে তাদের শাসন বজায় রাখবার জন্য তৈরি করা শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামো (সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র) রেখে যায়। এ সমস্ত কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলি তাদের যাত্রা শুরু করে।

উপনিবেশিক প্রভুরা নিজেদের দেশে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বজায় রাখলেও উপনিবেশগুলোতে তারা শাসন করেছে অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে। গণতান্ত্রিক চিন্তা, চেতনা, চর্চার কোন পরিবেশ তারা সেখানে গড়ে উঠতে দেয়নি।

রাজনৈতিক দল এবং সিভিল সোসাইটি বিকাশের কোন অনুকূল পরিবেশ উপনিবেশগুলোতে ছিল না। স্বাধীন হবার পর রাজনৈতিক দলগুলি সেসব দেশে প্রথম সরকার গঠন করে। ক্ষমতায় যাবার পর শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের সামনে তাদের দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠে। পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার অনভিজ্ঞতার ফলে নানাভাবে তাদেরকে আমলাদের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়।

দুর্বল রাজনৈতিক দলের সরকার আমলাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। রাজনীতিতে আমলাদের ভূমিকা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে সেই উপনিবেশিক আমলের মত নানা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দুর্নীতি প্রকট ভাবে দেখা দিতে থাকে।

রাষ্ট্র যত অগণতান্ত্রিক হতে থাকে এবং তার সাথে পাল্লা দিয়ে দুর্নীতি যত বাড়তে থাকে—দেখা গেছে, সে সময় রাষ্ট্রে সমানুপাতিক হারে মিডিয়ার উপর সেন্সরশিপও বাড়তে থাকে, যাতে এ সমস্ত অনিয়ম, দুর্নীতির কথা জনসম্মুখে বা বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশিত না হয়।

বাংলাদেশে একমাত্র ১৯৭২-৭৫, এ সময়টাতেই রাষ্ট্রযন্ত্র রাজনৈতিক দল পরিচালিত সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল—যেটা পরবর্তীতে আর কোন সময় সেভাবে দেখা যায়নি।১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্যে দিয়ে সামরিক আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের সম্পূর্ন দখল নিয়ে নেয়।

এর মধ্যে দিয়েই পাকিস্তান আমলের মত সেনাবাহিনী আবার সরাসরি রাজনীতিতে প্রবেশ করে, যার জের অব্যাহত থাকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক দলসমূহের যৌথ নেতৃত্বে জনগণ গণঅভ্যুথানের মাধ্যমে সামরিক আমলাতন্ত্রের হাত থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে।

১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হবার পর সবার মনে এ ধারণা জন্মেছিল যে, এবার হয়ত ক্রমশঃ গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্থাপিত হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতান্ত্রিক ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন না হলেও সাময়িক ব্যবস্থা হিসাবে নির্বাচনকালীন সরকার হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা রাজনৈতিক দলগুলি মেনে নিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির দুই দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচন করবার চেষ্টা, ১/১১ এর মাধ্যমে সেনা আমলাতন্ত্রকে আবার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করে।

বস্তুত ১/১১ এর মাধ্যমে ১৯৯০ পরবর্তী সময় থেকে চলে আসা রাষ্ট্র এবং সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়।সরকার পরিচালনার নানা ক্ষেত্রে আমলা নির্ভরতা এবং রাষ্ট্রের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। এছাড়া এ দেশের মানুষ সরকারী-বিরোধী দল সমন্বয়ে যে ধরণের  রাজনৈতিক গতিধারার (political dynamics) সাথে এতদিন যাবত পরিচিত ছিল, ১/১১ এর মাধ্যমে তারও সম্পূর্ন পরিবর্তন ঘটে।

নির্বাচন ব্যবস্থা কেমন হবে এ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে অনৈক্য এ গতিধারা এবং ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রধান কারণ। এ অনৈক্যই সরকারকে পাশে কাটিয়ে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক শক্তিতে পরিণত করে।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার মূল ভিত্তিও হল নির্বাচন। একটি নির্বাচনকে তখনই গ্রহণযোগ্য মনে করা হয় যখন নির্বাচনে পরাজিত প্রধান রাজনৈতিক দল এর ফল মেনে নেয় এবং বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানায়।পার্শ্ববর্তী ভারতসহ সব গণতান্ত্রিক দেশে এটাই হচ্ছে ঐতিহ্য। কিন্তু বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেসহ এমন কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নাই, যেখানে পরাজিত পক্ষ ফল মেনে বিজয়ী পক্ষকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার মূল শর্ত হল প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির মাঝে নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতিসহ রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু মৌলিক নীতিমালা সম্পর্কে ঐক্যমত্য থাকা। এ ঐক্যমত্য যে সমস্ত রাষ্ট্রে থাকে না, সরকার সেখানে দুর্বল হয়। সরকার পরিচালনা জন্য তাদেরকে তখন সামরিক/বেসামরিক আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। রাষ্ট্র সেসময় সরকারের উপর চেপে বসে।

দেখা গেছে গণতন্ত্র যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে নাই, সে সমস্ত রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর আমলা নির্ভরতা প্রবল। আর যেখানে আমলা নির্ভরতা  প্রবল, সেখানে সব সময় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ডালপালা মেলে। আরো দেখা গেছে, নির্বাচন যে সব দেশে সরকার পরিবর্তনের গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে, সেসব দেশে ক্যু, গণঅভ্যুথান বা বিদেশি হস্তক্ষেপে কখনো সরকার পরিবর্তন হয়নি।

সে সমস্ত রাষ্ট্রে যদি অনাখাঙ্খিত ব্যক্তি বা দল ক্ষমতাসীন হয়, তাঁতে জনগণ এ ভেবে উদ্বিগ্ন হয়না যে, তারা স্থায়ী ভাবে ক্ষমতায় থেকে যাবে। কেননা তারা জানে, পরবর্তী নির্বাচনে তারা চাইলে, তাঁকে বা তাঁর দলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে। ফলে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা বর্তমান ভারত এবং তুরস্কের ধর্মভিত্তিক দলের মোদী বা এরদোগানকে ক্ষমতা থেকে কখনো সরানো যাবে না—এ প্রশ্নে সেসমস্ত দেশের জনগণ উদ্বিগ্ন নয়।

আবার এটাও দেখা গেছে, যে সমস্ত রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে সে সমস্ত রাষ্ট্রের জনগণ তাদের দেশ সম্পর্কে বিদেশী মিডিয়ার ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোন খবর নিয়েই আগ্রহান্বিত বা উদ্বিগ্ন নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদি নানা গণতান্ত্রিক দেশ এবং তাদের নেতাদের সম্পর্কে সারা দুনিয়ার প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় অহরহ নানা নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু এসব নিয়ে তাদের দেশের জনগণের কোন আগ্রহ বা মাথা ব্যাথা নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রিটেন সহ যেকোন গণতান্ত্রিক দাবীদার রাষ্ট্রের জনগণের মূল আগ্রহ তাদের নিজেদের দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত বা প্রচারিত সংবাদের প্রতি। কেননা তারা জানে, তাদের দেশীয় মিডিয়া তাদের অভ্যন্ত্রীণ ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেকোন  বিষয় সম্পর্কে বিদেশি মিডিয়ার চেয়ে ভালো রিপোর্ট করতে পারবে। কাজেই বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট জেনে তাদের কোন লাভ নেই।

বাংলাদেশের মিডিয়াও যখন প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহের মিডিয়ার মত নিজ দেশ সম্পর্কে একই মান, দক্ষতা ও সক্ষমতায় সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করতে পারবে, তখন এ দেশের জনগণও বিদেশি প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

 

Dr. Sayeed Iftekhar Ahmed is a faculty member at the School of Security and Global Studies at the American Public University System. He is the author of Water for Poor Women: Quest for an Alternative Paradigm.

 

 

All reputable online pharmacies will ask you a series of questions to gather important information about you in order to determine whether or not you are able to take the treatment. This doctor will issue you a prescription if he deems you fit to take Levitra, which will mean you can then buy the drug online, depending on the prescribed dose. This whole process only usually takes around 24 hours and will never take longer than 48 for you to receive your treatment in the post. levitra malaysia This is a great alternative for those who have a busy schedule.

More Posts From this Author:

    None Found

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top