আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ‘প্রস্থান’—পেছনের বাস্তবতা: বিজয় প্রসাদের সাথে নোয়াম চমস্কি।

অনুবাদকের ভূমিকা : তালিবান বাহিনী কাবুলের দখল নিয়েছে। ‘দখল’ শব্দটা ব্যবহার করলাম খুব সচেতনভাবেই। কেননা রাষ্ট্রক্ষমতা আসলে ‘দখল’ই হয়ে থাকে, অন্তত আফগানিস্তানের ইতিহাসে রাষ্ট্রক্ষমতা সবসময় ‘দখল’ই হয়েছে কেননা দেশটিতে আজ পর্যন্ত কখনও সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার ধারাই গড়ে ওঠেনি যা থেকে জনগণের ভেতর থেকে নিজেদের শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে এবং নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকারের বদল ঘটতে পারে। মোটা দাগে প্রায় গত পঞ্চাশ বছর ধরে দেশটি হয় দখল হয়েছে বাইরের শক্তি দিয়ে নয়তো নিজের দেশের ভেতরেই জড়িয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধে। প্রবল গোত্রগত পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চা আর গোত্রগত যুদ্ধবাজ নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ দেশটির সাধারণ জনগণের জীবনকে কখনও স্থিতিশীল হতে দেয়নি। আর এর উপরে  যুক্ত হয়েছে ভিনদেশি দখলদারদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ সংগ্রামের ইতিহাস।

যদিও খুব সাম্প্রতিক ইতিহাসও বলছে তালিবানের সাথে দখলদার আমেরিকার ছিলো ঐতিহাসিক ভাবেই দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হচ্ছে তালিবানের সাথে আমেরিকার স্বার্থগত কোনও দ্বন্দ্ব ছিল না, বরং তালিবান ঐতিহাসিকভাবেই আমেরিকার বশংবদ একটি বাহিনী হিসাবে কাজ করেছে এবং পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন সুযোগ সুবিধার একটা সিংহভাগ উপভোগ করেছে। মূলত তালিবানের সাথে আমেরিকার এই দ্বন্দ্বের শুরু হয় ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর করার মার্কিন অনুরোধ প্রত্যাখ্যানের পর থেকে।

আফগানিস্তানে তালিবানের এই ক্ষমতা দখল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা দুনিয়ার প্রায় সকল সংবাদ মাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়েছে।বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে হাজারো প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ হাজির করা হচ্ছে। আফগানিস্তানের মতো একটি চরম দারিদ্রক্লিস্ট ছোট্ট দেশকে নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের এই বিপুল সময় ব্যয় করাই বুঝিয়ে দেয় আফগানিস্তানকে নিয়ে পশ্চিমের সুদূর প্রসারী স্বার্থের প্রশ্নটিকে। বাংলাদেশেও অনেকেই এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করছেন সংবাদপত্রে, ব্লগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আন্তরজাল কেন্দ্রিক আলোচনা ও টক-শো গুলোতে।প্রথাগত মূলধারার বিশ্লেষক ও ইসলামি ঘরানার বিশ্লেষকদের সাথে সাথে যারা নিজেদেরকে প্রথাবিরোধী, বিকল্প ধারার, মুক্তিমুখীন চিন্তক হিসাবে দাবি করেন এমন মানুষেরাও শামিল হয়েছেন এই সকল বিশ্লেষণে। প্রথমত বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা মনে করছেন আফগানিস্তানে তালিবানের ‘বিজয়’ আসলে সারা পৃথিবীতে ইসলামের বিজয়ের সূচনাবিন্দু। তালিবানের পথ ধরেই সারা পৃথিবীতে ইসলামের বিজয় সূচিত হবে আবারও এবং সেই পথ খুব দূরে নয় এমনটাও মনে করছেন কেউ কেউ। দ্বিতীয়ত – কেউ কেউ বিষয়টিকে খুব বস্তুগতভাবে দেখছেন, অর্থাৎ এটাকে এই অঞ্চলের ভুরাজনৈতিক সমীকরণের একটি নতুন হিসাব নিকাশ হিসাবে দেখছেন।দ্বিতীয় বর্গের বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আবার খুব সতর্ক থাকছেন বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে, ‘গ্রাউন্ড রিপোর্ট’ এর অপেক্ষা করছেন, কেবল আদর্শবাদের ‘লেন্স’ দিয়ে পুরো সময়টিকে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছেন না। তৃতীয়ত – মুক্তিমুখীন দাবিদার বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ ‘এই তালিবান সেই তালিবান নয়’ এ ধরনের ব্যাখ্যা হাজির করছেন এবং সেই সাথে দাবি করছেন তালিবানের ‘বিজয়’ আসলে আফগান জনগণের ‘বিজয়’। এদের কেউ কেউ তালিবানকে আফগান জনগণের নেতৃত্ব ও প্রতিনিধি হিসাবে হাজির করছেন, তালিবানকে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুক্তি সংগ্রামী হিসাবে হাজির করছেন। এই বর্গের কেউ কেউ এটা দাবি করছেন ইতিমধ্যেই যে আগের পর্বে (১৯৯৬ – ২০০১) তালিবান কিছু ‘ছোটোখাটো’ ‘ভুল ত্রুটি’ করলেও এইবার তালিবান খুব সাবধান। আগের পর্বের তালিবান নারী প্রশ্নে ‘কিছু ভুল’ করেছিল যা এইবার হবে না, কেননা এইবার তালিবান আরও অনেক ‘পরিণত’ ও ‘অভিজ্ঞ’এধরনের ভবিষ্যৎবাণীও হাজির করছেন কেউ কেউ।  এই গোত্রের বুদ্ধিজীবীরা আফগানিস্তানের নারীদের অবস্থাটিকে এক ধরনের পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা হিসাবেও উল্লেখ করে থাকেন আর এটা মনে করিয়ে দিয়ে থাকেন যে আফগান নারীর অবস্থা আফগান সমাজের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ এবং এ বিষয়টিকে পশ্চিমের  দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা দিয়ে মাপলে চলবে না। এই সকল নানান বয়ান, ব্যাখ্যা আমরা পাঠ করতে শুরু করেছি। সন্দেহাতীত ভাবে সামরিক গোষ্ঠী হিসাবে তালিবানের ক্ষমতা দখল নিয়ে আরও অনেক ব্যাখ্যা আমরা পাঠ করব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বুদ্ধিজীবী ও বিশ্লেষকদের কাছ থেকে। তালিবানের কাবুল দখল করার আগে, মে মাসের সাত তারিখে অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি ভারতীয় ইতিহাসবিদ, সম্পাদক ও সাংবাদিক বিজয় প্রসাদের কাছে একটি ছোট্ট অভিমত ব্যাখ্যা করেন। আকারে খুব ছোট্ট অভিমত হলেও এই মতামতটি অনেকের জন্যে আগ্রহউদ্দীপক হতে পারে। বিশেষত যারা মনে করছেন তালিবান ‘আফগান জনগণের হয়ে’ দেশ শত্রুমুক্ত করেছে, এবং সেজন্যে তালিবান কে বিজয়মাল্য পরিয়ে দিচ্ছেন, তাদের জন্যে এই ছোট মতামত প্রবন্ধটি আরও বেশি আগ্রহ উদ্দীপক হতে পারে। বলাই বাহুল্য, বরাবরের মতোই চমস্কি তার মতামত ব্যাখ্যা করেছেন দারুণ নির্মোহভাবে, ভাবাবেগ বিবর্জিতভাবে।

চমস্কির মতামত একান্তই তাঁর নিজের, অনুবাদ প্রশ্নে যেকোনও মতামত, সমালোচনা ও পরামর্শ স্বাগত। মূল লেখাটি ছাপা হয়েছিল আন্তরজালিক পত্রিকা অল্টারনেট ডট অরগ এবং নোয়াম চমস্কির নিজের ব্লগ চমস্কি ডট ইনফোতে

লেখাটি পাঠ করার সময় মনে রাখা দরকার চমস্কি এই মতামত দিচ্ছেন তালিবান বাহিনী ক্ষমতা দখল করার প্রায় তিন মাস আগে।

 

অনুবাদক: মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

 

 

 

‘আমেরিকা চলে যাবে? সত্যিই?’  

আফগানিস্তানে ২০০১ সালের অক্টোবরে যে মার্কিন হামলা তা নিশ্চিত ভাবেই একটা অপরাধমূলক কাজ ছিল। এটা অপরাধমূলক ছিল দুটি কারণে – প্রথমত একটা ভয়ংকর শক্তি ব্যবহার করে আফগানিস্তানের নিজেদের স্থানীয় অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া আর দ্বিতীয়ত আফগানিস্তানের মানুষের জীবন ও সামাজিক বন্ধনকে ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়ার জন্যে।

সেবছরই, অর্থাৎ ২০০১ সালের অক্টোবরের এগারো তারিখ পাকিস্তানের পেশোয়ারে অবস্থানরত আফগান রাজনৈতিক নেতা আব্দুল হক একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন সাংবাদিক আনাতোল লিভেন এর কাছে। এক সময় আফগানিস্তানে যারা তালিবানকে প্রতিরোধ করেছিল আব্দুল হক হচ্ছেন তাদের একাংশের নেতা, তিনি আমেরিকার বোমা হামলার ছায়ায় আফগানিস্তান ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু আমেরিকা যেভাবে যুদ্ধটা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় তাতে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। আব্দুল হক সাংবাদিক লিভেনকে বলেছিলেন “বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো রকমের সামরিক পদক্ষেপ কেবল বিষয়গুলোকে আরও কঠিন করে তুলবে – বিশেষ করে যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলতে থাকে এবং অনেক বেসামরিক লোক নিহত হয়”। যুদ্ধটা বিশ বছর ধরে চলল এবং  প্রায় একাত্তর হাজার তিনশ’ সাধারণ মানুষ নিহত হলো।

আব্দুল হক আরও বলেছিলেন “আমেরিকার জন্যে সবচাইতে লাভজনক পথ হতে পারে আফগানিস্তানের সকল পক্ষকে নিয়ে একটা সমন্বিত রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা। তা না হলে অন্য যেকোনো পথই এই ভিন্ন ভিন্ন উপদলগুলো যারা আঞ্চলিক ভাবে ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট, তাদের মাঝে গভীর মতভেদ ও দূরত্বকে কেবল বাড়তেই উৎসাহিত করবে”। এই কথাগুলো সেই সময়ের জন্যে ছিল দারুণ দূরদর্শী ভবিষ্যৎবাণী কিন্তু জনাব হক জানতেন যে কেউ তাঁর কথা শুনবে না। “সম্ভবত” হক তখন লিভেনকে বলেছিলেন” আমেরিকা আসলে ঠিক করেই ফেলেছে তারা কি করবে, তাই আমার যেকোনো পরামর্শই আসলে অসময়ের সুপারিশ হবে”।

প্রায় বিশ বছরের একটা ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পরে, বিদ্যমান আফগান গোষ্ঠীগুলোর চরম শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি হবার পর আমেরিকা সেই একই সমাধানের পথে ফিরে আসল যা বিশ বছর আগে আব্দুল হক সুপারিশ করেছিলেন: রাজনৈতিক সংলাপ।

আব্দুল হক আফগানিস্তানে ফিরে এসেছিলেন এবং ২০০১ সালের অক্টোবরের ২৬ তারিখ তালিবান বাহিনী তাঁকে হত্যা করে। তাঁর সুপারিশ এখন বাস্তবতার বাইরের প্রশ্ন। তখন ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আফগানিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক উপদলগুলো রাজনৈতিক সংলাপের জন্যে একরকমের তৈরি ছিল। আমেরিকান যুদ্ধবিমান কখন আফগান আকাশে জাহান্নামের দরোজা খুলে দেয় সেই ভয়ে তারা খানিকটা অগ্রসরও হয়েছিলো রাজনৈতিক সংলাপের পথে। কিন্তু এখন বিশ বছর পরে তালিবান ও অন্যান্য উপদলগুলোর মাঝে বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে ফলে আলাপ আলোচনার পথ আর খোলা নেই বললেই চলে।

 

আফগান গৃহযুদ্ধ 

এবছর ২০২১ সালের ১৪ এপ্রিল আফগানিস্তান জাতীয় সংসদের স্পিকার মীর রহমান রাহমানি তাঁর পক্ষ থেকে হুশিয়ারি ব্যক্ত করেছিলেন যে আফগানিস্তান প্রায় একটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। কাবুলের রাজনৈতিক মহলেও একটা আলোচনা প্রায় সরব হয়ে উঠেছিলো যে সেপ্টেম্বর মাসের এগারো তারিখে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক বিদায়ের প্রাক্বালে সারাদেশে একটা গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। সে কারণেই পরের দিন অর্থাৎ পনেরোই এপ্রিল কাবুলের মার্কিন দূতাবাসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে টলো-নিউজের শরীফ আমীরী মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি কোনও গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখছেন কিনা। মার্কিন সচিব অ্যানটনি ব্লিংকেন উত্তর দিয়েছেন যে “আমার মনে হয় না একটা গৃহযুদ্ধের দিকে আফগানিস্তান থেকে ঠেলে দেয়াতে কারও কোনও স্বার্থ আছে, আফগানিস্তানের জন্যে একটা গৃহযুদ্ধ মানে আসলে একটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। এমন কি আমরা তালিবানদের কাছ থেকেও শুনেছি, এতে তাদেরও আগ্রহ নেই”।

বাস্তবত, প্রায় অর্ধ শতক ধরে আফগানিস্তান একটা গৃহযুদ্ধের সাথে দিন পার করছে, অন্তত মুজাহিদিন গঠন হবার পর থেকে আব্দুল হকসহ অন্যরা আফগানিস্তান পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। এই যুদ্ধটা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল যখন আমেরিকা আফগানিস্তানের সবচাইতে সংরক্ষণবাদী চরম ডানপন্থী দলগুলোকে সমর্থন ও সাহায্য দিতে শুরু করল, যারা পরবর্তী কালে আল-কায়েদা, তালিবান ও অন্যান্য চরমপন্থি ইসলামি দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতিহাসের এই কালপর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনও কোনও শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়নি বরং এই সকল উত্থান পতনকে কাজে লাগিয়ে কাবুলকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়েই বেশি ব্যগ্র ছিল তারা।

 

আমেরিকা চলে যাবে? 

এমন কি এবছরের এপ্রিলের শেষ দিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের যে ঘোষণা দেয়া হয় যা কার্যত মে মাসের এক তারিখ থেকে শুরু হবার কথা, সেই ঘোষণাটিও খুব পরিষ্কার ও সরাসরি ছিল না। চৌদ্দ এপ্রিল মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ঘোষণা করলেন “মার্কিন সেনাদের ঘরে ফেরার সময় হয়েছে এখন”। সেদিনই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর থেকে নিশ্চিত করা হলো যে আড়াই হাজার মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ত্যাগ করবে এবছর সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখের মধ্যে। অথচ মার্চের চৌদ্দ তারিখের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে আফগানিস্তানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার আমেরিকান সৈন্য রয়েছে যদিও “জনসমক্ষে উল্লেখ করা হয় আড়াই হাজার সৈন্যের উপস্থিতির কথা”। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সৈন্যের সংখ্যা এভাবে কম করে বলা এক ধরনের অস্পষ্টতা। পরে মার্কিন সহকারী প্রতিরক্ষা সচিবের কার্যালয়ের একটি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৬০০০ ঠিকাদার রয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরণনের পরিষেবা প্রদান করে, যার মধ্যে সম্ভবত সামরিক সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত।এই ঠিকাদারদের কেউই বা অতিরিক্ত অদৃশ্য এক হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য নির্ধারিত ঘোষণা বা পরিকল্পনার অংশ নয়, এমন কি ড্রোন হামলাসহ বিমান থেকে বোমা হামলা শেষ হবে কিনা, কিংবা বিশেষ বাহিনীর মিশনেরও হয়তো শেষ হবে না।

এপ্রিলের একুশ তারিখ ব্লিংকেন বলেছেন যে আমেরিকা আফগানিস্তানের গণি সরকারকে প্রায় সাড়ে তিনশ’ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দেবে। আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি আশরাফ গনি, যিনি তাঁর পূর্বসূরী হামিদ কারজাই এর মতোই আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতির চাইতে কাবুলের মেয়রের মতো করেই জনসমক্ষে হাজির হয়ে থাকেন, তিনি আগাগোড়াই তাঁর বিরোধীদের হাতে পর্যুদস্ত হয়েছেন। কাবুল এখনই সরব হয়ে উঠেছে আমেরিকার প্রস্থানের পরে কে সরকার গঠন করবে সেই আলোচনায়, ইতিমধ্যেই প্রস্তাব চলে এসেছে, হিজব – ই – ইসলামীর নেতা গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার এর নেতৃত্বে সরকার যেখানে তালিবান অন্তর্ভুক্ত নয়। এরই মধ্যে অবশ্য আমেরিকা তাদের সম্মতি জানিয়েছে যে আসন্ন সরকারে তালিবানের একটি ভূমিকা থাকবে এবং এটা একরকমের প্রকাশ্যভাবেই চলে এসেছে যে আগের বারের তুলনায় তালিবান এবারে একটু নরম সরম হয়ে শাসন করবে।

এখন মনে হচ্ছে আসলে আমেরিকা দুইটি শর্তে তালিবান কে ক্ষমতায় ফিরতে দিতে চায়। প্রথমত – আফগানিস্তানে মার্কিন উপস্থিতি থাকবে এবং দ্বিতীয়ত কাবুলের উপর আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়ার কোনও ভূমিকা থাকবে না। আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ২০১১ সালে ভারতের চেন্নাইতে এক বক্তৃতায় একটি নতুন সিল্করুট বা বাণিজ্য সংযোগ সড়ক এর প্রস্তাব করেছিলেন যা মধ্য এশিয়াকে আফগানিস্তান ও ভারতের বন্দরগুলোর মাধ্যমে সংযুক্ত করবে এবং এই নতুন বাণিজ্য সংযোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত রাশিয়াকে মধ্য এশিয়ার সাথে বিযুক্ত করা এবং চীনের নিজস্ব বাণিজ্য সংযোগ সড়ক প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করা, যা এখন প্রায় তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত হতে চলেছে।

স্থিতিশীলতা আফগানিস্তান প্রশ্নে কোনও উদ্দেশ্য নয় কারও। এই জানুয়ারিতে উজবেকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভ্লাদিমির নরোভ ইসলামাবাদ পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর আয়োজনে একটি ওয়েবিনারে বক্তৃতা করেন। সেখানে তিনি বলেন দায়েশ এবং আইসিস তাদের যোদ্ধাদের সিরিয়া থেকে সরিয়ে আফগানিস্তানের উত্তর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আইসিস এর যোদ্ধাদের এই আফগানিস্তানের দিকে সরে যাওয়া কেবল আফগানিস্তানের জন্যেই আতংকের কারণ নয় তা চীনের জন্যেও দুশ্চিন্তার কারণ। ওয়াশিংটন পোস্ট গতবছর ২০২০ সালে প্রকাশ করেছিল যে আমেরিকা আইসিস এর বিরুদ্ধে সুবিধা অর্জনের জন্যে তালিবানদেরকে বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে। তালিবানের সাথে যদিও শান্তি চুক্তি হয়েছে কিন্তু আইসিস তাঁকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

 

ভুলে যাওয়া সম্ভাবনাগুলো 

  • আফগান নারীর জন্যে উদ্বেগের শব্দগুলো ভুলে যাওয়া হয়েছে, যে শব্দগুলো ২০০১ এর অক্টোবরে আমেরিকাকে আফগানিস্তান আক্রমণের বৈধতা দিয়েছিলো। রাসিল বসু, জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তা, ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত আফগানিস্তান সরকারের নারী উন্নয়ন বিষয়ক ঊর্ধ্বতন পরামর্শক হিসাবে কাজ করেছেন। আফগানিস্তানের সংবিধান ১৯৮৭ সালে নারীদের সমঅধিকার দেয় যা দেশটির নারী সংগঠনগুলোকে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক সংস্কার ও নারীর উপরে চাপিয়ে দেয়া নানান বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সুযোগ করে দেয়, তাদেরকে পরিবারে ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার সুযোগ করে দেয়। রাসিল বসু আরও জানান, যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে বহু আফগান পুরুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেই শূন্যতা পূরণের জন্যে বিপুল সংখ্যক নারী বিভিন্ন পেশায় সংযুক্ত হয়েছিল। নারীর অধিকার ও নারীশিক্ষায় একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন সম্ভব হয়েছিল এই সময়টিতে যার একটি বড় অংশই নস্যাৎ হয়েছে আমেরিকার এই দুই দশক দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে।

এমন কি ১৯৮৮ – ৮৯ সালে, আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত চলে যাবার আগেও, গুলবুদ্দিন হেকমোতিয়ার যে ব্যক্তি এখন আবারও ক্ষমতার জন্যে নাচানাচি করছেন, তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সোভিয়েত আমলের যা কিছু অর্জন তাঁর সবকিছুকেই তারা ধ্বংস করবেন, ফিরিয়ে নেবেন আগের যায়গায়। রাসিল বসু আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন নারীদের উদ্দেশ্যে প্রচার করা ও নারীদের মাঝে বিলি করা নোটিশগুলো যেখানে নারীদেরকে সতর্ক করে দেয়া হোতো এই সকল পিতৃতান্ত্রিক বিধিনিষেধ না মানলে কি পরিণতি হবে সে বিষয়ে (আফগানিস্তানে কি ভয়াবহ পরিস্থিতি আসছে সে প্রসঙ্গে একটি মতামত প্রবন্ধ তিনি পাঠিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোষ্ট ও মিস ম্যাগাজিন পত্রিকায়, সকলেই প্রবন্ধটি ছাপতে অপারগতা জানিয়েছিলেন)।

আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সমর্থিত শেষ সরকার প্রধান মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ (১৯৮৭ – ১৯৯২) যে জাতীয় সমন্বয় নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিলো সেই প্রস্তাবিত নীতির শীর্ষে। পরবর্তীকালে আমেরিকা সমর্থিত ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এসে তাঁর পুরোটাই প্রত্যাখ্যান করে, এদের অনেকেই এখনও বিভিন্ন ক্ষমতাসীন পদে বহাল রয়েছেন।

ইতিহাস থেকে কোনও শিক্ষা নেয়া হয়নি। আমেরিকা আসলে নিজেদের “প্রত্যাহার” করে নেবে, কিন্তু তাদের কিছু হিসাব নিকাশ ঠিকই রেখে দেবে আফগানিস্তানে চীন ও রাশিয়াকে মোকাবিলা করার জন্যে। এই সকল ভু-রাজনৈতিক বিবেচনাগুলো সবসময়ই আফগান জনগণের জন্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে, তাদের স্বার্থকে গ্রাস করবে। #

 

 

More Posts From this Author:

    None Found

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top