আস্তিনে বিষণ্ণতা রেখে যেন সমুদ্রকে ডাক দেয়া

Share this:

 

সেতু ও ফোরলেন হাইওয়ে

১.১
উদ্যানে শস্যভিটায় আদম-হৃদয় পূণ্যভরা পুষ্প কী লাল : তারপর ও পাখিটি… ও পাখিটি! যেদিন সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম প্রজনন-বীজ কুড়োতে যাই… তারপর ওফ : কী দুর্ভিক্ষদাহ, অকল্পনীয় শস্যপতন… পঙ্গু হে! তুমি কি কোনো পাতা কুড়োচ্ছ?  তুমি কী মেঘ-সাদায় নিষিক্ত ছিলে কোনোদিন?

উদ্যানে ঝরাপাতা, উদ্যানে সে অদ্ভুত সাংকেতিক মেঘ-সাদা : আশ্চর্য! পাতা-শিরায় ফুটে থাকে বালিরেখা, রোকসানার ০১৭১৯০০০০৬৪ লুকানো নম্বর

১.২
বিষণ্ণ বিষণ্ণ কায়া—বিষণ্ণতা কুড়ানো: সবটুকু ছায়া লক্ষ লক্ষ্যদিকে আদমের কী পূণ্যভরা পুষ্পপাপড়িগুলি…

১.৩
হাঁটুজলে থাকে বৃক্ষদল; ওফ : নো নো সেবক-মাতা! জরুরি বলতে কিছু নেই; বৃক্ষ বৃক্ষ ডাকো—ডাকো গোলাপ গোলাপ! ডাকো বকুলজল বৈষ্ণব-বৈষ্ণবী পিতা-পিতামহরা!

১.৪
তুমি তো রোকসানা—হ্যাঁ, তুমি  তো দৃষ্টিফোটা রোকসানা… হ্যাঁ রোকসানা…

 


মনে পড়ে; মনে পড়ে এক গুহাদেবতার কথা—জানি না তাকে লেবুতল ছায়া কতটা নাড়াতো বা বিকেলের লাল আচ্ছন্নতায় সে ঘমুকাতুর হয়ে পড়তো কিনা। মনে পড়ে; মনে পড়ে তার লাল-ফোটা গড়নের দেহ-ধাচটা।  বলতো সে, বিপুল আবেশে বলতো, হিম রাত্রি হে!  এসো সৌর-প্রাজ্ঞরা, এসো তো কালিক, গুটিশুটি বরফের কুসুম এসো— এসো পাতালের দেশে যাই! নিমফল প্রতীকে আরো কিছু শরীর বানাই; এসো…

হে নারী! শুনো, শুনো এক গুহাদেবতার গল্প শুনো—সে ছিলো প্রুস্তুর এক হাতিয়ার। বন্য স্বভাব মতো দুর্বিনীত গতি ছিলো তার—সে নাকি সিংহের কেশরে হাত রেখে অহরহ মল্লখেলায় মেতে ওঠতে পারত। তার দুটি হাত নাকি সূর্যের লাল আবেশে পর্বতের শিখা ছুঁতে পারত—অপরূপ চিত্রিত করতো রৌদ্রময় মানুষের বন্দর…

হে বন্ধু! শুনো, সেই গুহাদেবতার কথা শুনো: পর্বতের অতল এক বন-মোরগের কথা শুনো, নীরবে গুহায় বিক্ষেপিত বিচিত্র রঙে যে আঁকতো পশুদের ছবি। মনে হতো, ঢেউ ভেঙে জল-আয়না ভেদে ছোটছে তার তুলি আর রঙ আর রেখা। তার কথা বলতে গিয়ে সিল্ক রোড মনে পড়ে যায়, মৌর্য সাম্রাজ্য; মৌর্য রাজ-রাজাদের মনে পড়ে যায়—খাইবার গিরিপথ মনে পড়ে যায়…

ও মন পাখি রে! ও মন পাখি… পাখিরে… হীরামন পাখি… ও মন পাখি রে…

 

৩.১
মূলত ইহা বৈদূর্যমণির এক লতা—যেমন : জীবন দিয়ে জীবনকে পেঁছিয়ে রাখা। আর জীবনকে ঘিরে যে শ্যামাঙ্গী থাকে তারও বেদ-বৃত্তান্ত যতো… কী এক দুরূহ ব্যাপার : আস্তিনে বিষণ্ণতা রেখে যেন সমুদ্রকে ডাক দেয়া… যে ডাক ডাকে  আবার তা ডকে না… হতে পারে জীবন-সঞ্চয়ে লিখা ইহা আরেকটা পাখির নাম। মনোযোগ দিয়ে মাটিকে ডাক দিয়ে যাওয়ার মতন

৩.২
আমার আছে এক ইচ্ছের রংমহল; নাচন নাচন ভঙ্গিতে সেখানে ঢেউ দোলা খায়। সে আরেক বৃষ্টি-মাদকতায় আচ্ছন্ন জীবন—ক্ষয়ে যায় না। যদিও পলায়নপর অভিজ্ঞান যতো সত্যজ্ঞান নিয়েই বাঁচা

৩.৩
স্টারমাইণ্ড নামে একটা সিনেমায় দেখেছি নায়ক কী কাতর! দৃশ্যে একটা ঈগল; ঈগলের দৃষ্টিতে মানুষ তাড়া খায়— দৌড়াতে থাকে! ঈগলের দৃষ্টি আরো তীক্ষ হয়…মানুষ আরো দৌড়ায়… আমি আমি!

৩.৪
আসলে স্বপ্ন-ক্রিয়ার আচরণ আর বাস্তবতা কী একাকার! জীবন তো আসলে ‘A pool among the rock… If there were the sound of water only…’

 

৪.১
আমি যে বাগানটায় যাইতে চাই তার দুইটা দুয়ার। কাসেম ও বিষু বাগান পাহাড়া দেয়। তাদের পহাড়া দেয়ার ভঙ্গি বেশ আরামপ্রদ।  গিন্নি সাততলা থেকে প্রতিদিন তাদের হুংকার শুনে; এবং মন্তব্য করে, এরা এঁটোপাতা খড়বিচালির মতন

তখন আমার মনে হয়, বাড়িটা বিপন্ন হাহাকার নিয়ে আটতলা অব্দি অযথা দাঁড়িয়ে আছে

বাগানের দুয়ারগুলো আকর্ষিলতায় ঘেরা। আকর্ষণ ক্ষমতাও কম না। আর আমাদের প্রত্যেকের মাথায় একটা করে পোকা। পোকার জালে আটকে থেকে নিসর্গরহিত আমরা নিয়ত ঘেউ ঘেউ করি। গিন্নি এইসব ডগ মনে করে। আসল কথা, আমাদের উপ-দল আছে। আরো  মজার  ব্যাপার, উপ-দলের দলনেতাও আছে—যে ভালো পান চিবোয় এবং মুখে জাবর তুলতেও বেশ পারঙ্গম

এই সময় মাথায় কী বল কাজ করে বুঝতে পারি না

৪.২
প্রসঙ্গত আমরা যা যা বিক্রি করি—স্বর্গ তেল তিসি নরক সেতু ও ফোরলেন হাইওয়ে ইত্যাদি। তবে মনে থাকা ভালো, আমরাও গায়ে পাউডার মাখি। এতে চুলকানি কমে। ইহার দেশ-কাল নাই এবং ঘামাচিনাশক

 


সেদিন রাত্তিরে অনন্ত ঢেউ ছিলো আল্লাহর আরশে। কে দেখেছে দুম দুম দিনে এমন ঢেউ জাগানিয়া আকাশ! আশা, তুমি জানো—কী মেঘ ছিলো চেখের মুখোমুখি. আহ্: ধুন্দুমার জংশন, চারপাশে আগুন, কাঠখড়ি, জ্বলমান কয়লা, কড়াই—আশা, তুমি কী আয়নার সামনে দঁড়ানোর কথা বলোনি সেদিন! শুভ রাত্রি… শুভ কামনা আশা…

গাছে ফোটা ছিল সহজ জবাফুল, কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল—তখন মাঘ মাস; বাতাসে অ্যাসপারাগাসের ঘ্রাণ, কোপর্নিকাসের চেতনায় আমরা অস্থির… তারপরই কী! নাকি তারও আগে ইটগুঁড়ো পথ হেঁটে গিয়ে সাদামাটা জবা গাছটা দুজনে ছুঁই! তুমি বল্লে, জবা! অমনি আমরা কামনার বহু সরীসৃপ…

বলো, আমাদের মনে কে বসিয়েছে কবে থেকে থোকা থোকা জবাফুল! এই শীতে আমরা কী সত্যি সরীসৃপ? বলো, আশা। তাকাতে পারি না। আমরা কী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আশা!

কে রুয়ে দিলো আত্মায় জেলিফিস, জবাফুল! আয়নার সামনে তর্জনী তোলা যাবে না; কোপর্নিকাস কী বলেছিল সেদিন! তাকাতে পারি না। আচ্ছন্ন চোখে লুকানো গর্ভফুল। নাভিটা চেপে ধরে আমরা কী নেব না নিঃশ্বাস! আশা…

এ-কী! তুমি বল্লে, রাত্রি-ত্রিশুল, শাদা চাঁদামাছ, ছাই—আহা! শুভ কামনা। শুভ কামনা আশা, শুভ কামনা সুন্দরী রমণীগণ…

 

 

প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: কবিতার নন্দন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

সৃজনশীলতাই লেখকসত্তাকে বয়ে নিয়ে চলে। তার উৎসে থাকে জীবনাভিজ্ঞতা—তিনি উপাদান নেন বিশ্বপ্রকৃতি থেকে এবং আমাদের ওপর ইম্প্রেশন তৈরি করেন। আমরা তখন আবেগতাড়িত হই। কৌতূহলী হয়ে পড়ি। আর লেখা ও লেখকের প্রতি আমাদের আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। আমাদের জানার আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। শিল্পকে সামনে রেখে মনে উদয় হতে থাকে নানা প্রশ্নের। লেখকের সৃজনশীলতার গুণে তাঁর সৃজন-সান্নিধ্যে এসে আমরা এক শিল্প-আকরের সুখানুভব করি। আর ইহা আমাদের  প্রাজ্ঞতা লাভের পথ দেখায়। তখন আমাদের ইান্দ্রয়দ্বারগুলি ক্রমশ খুলতে থাকে। আবার বলা যায়, লেখক তাঁর নিজের লেখার শৈলী-প্রকরণ দিয়ে আমাদের অনুভূতিকেও স্পর্শ করেন। তিনি যদি কবি হন তাহলে বলতে চান, প্রতিটি মানুষই স্বভাবতই আমৃত্যু কবি। আসলে জগৎ ও জীবন নিয়ে বিশেষত মানব মনের ঘাত-অভিঘাতের ভাবানুভব নিয়েই কবির ব্যস্ততা। কবির এই খেলার পেছনে লুকায়ে থাকে পাঠকের অন্তরে কল্প-জগৎ সৃষ্টির এক মহৎ উদ্দেশ্য।

তুমি ছেড়ে চ’লে গেলে। কি ছেড়ে কাথায় গেলে? কত ঘুম উজিয়ে তিব্বত?
কত ভ্রান্তি কত ক্লান্তি, বোয়ালে খোয়ালে আংটি, কেটে যাবে এই মলমাস?

                                                       “পেন্টিমেন্টো-৬”

কবির এই বোধ আমাদের মনে নতুন ভাবের উদ্রেক করে। এই ভাব আমাদের নতুন করে মননকে পুনঃসজ্জিত করে। এখানে কবি বিষয় ও বিষয়ী নিয়ে কতটা সিরিয়াস এবং কেন? বলা যায়, এখানে কবি যে বাক-খেলা খেলেছেন এই হেতু—সত্যি এখানে তিনি সিরিয়াস। এখানে বলা যায়, কবিতাপাঠ আমাদের যতদূর নিয়ে যায় তার চাইতে আমরা ঘুম উজিয়ে তিব্বতঅব্দি তাকাই। তাকিয়ে থাকি। কবি ও পাঠকের মনোজগতে এ কি তবে আলো-আঁধারি খেলার বাস্তবতা! হতে পারে।

         কিন্তু তার আগে-পরে ক্ষয়ার্শা ধারয়দ্বসু আর্তক্ষয়ার্শার পর্শুপুরে
খারাপ বাতাস লাগে, বুলন্দ দরওয়াজা খুলে রাত্রি-রাঙা কাঠের ঘোড়ায়

                                                          “পেন্টিমেন্টো-২”

এখানে সাম্প্রতিক বিশ্ববীক্ষার বাস্তবতা ও খেলা খেলা দুই বিপরীত অবস্থান থেকে আরেকটি বিবেচনা আমাদের সামনে দাঁড়ায় না কী! তখন শরীরে খারাপ বাতাস তো লাগতেই পারে। অথচ—

এ খেলা থেকে আমরা বিশ্রাম নিতে পারি না। আমাদের সকল সুখ উৎপাদন বন্দোবস্ত তখন ত্যাগ করতে হয়
আমরা আসলেই কথিত সভ্যতার ক্রীড়াকে নিজের সাথে সমীকৃত করতে পারি না
আমাদের আত্মতুষ্টি ও প্রেম-ভালোবাসা উৎপাদন বন্দোবস্তের কেন্দ্রটি রহিত হয়ে পড়ে। তাহলে—
আমরা অন্যতর উচ্চতায় জীবন-ব্যবস্থকে কী করে নিয়ে যাব?
আজ আমরা জানতে পারি না মানব অর্জনের অনুধ্যান কী হতে পারে! আমরা বিভ্রান্ত হই
প্রেম-ভালোবাসা কবিতায় গ্রন্থিত করে শুধু কবিই পারেন সুখ-অভিজ্ঞতাকে বর্জন করার কৌশল
কবি জানে, মানব মনের আনন্দ-বেদনা নিজের ভেতর অন্তর্লীন করা কতটা কঠিন।
কবির এই উচ্চারণ তাই জ্ঞান-কল্পকাণ্ডেরই দুর্গ
ইহা বিষয়ী নয়
এই উচ্চারণ পাঠককে সজাগ করণার্থে সঞ্চারি
ইহা সম্পৃক্ত পরিস্থিতিকে খাপ খাইয়ে না নেয়া জীবনের ছবিকৃতি
ইহা প্ররোচক নয়
এ-সব সংযুক্তির উপলক্ষ্যহীন বাধা। কবিমন এই বাধা দূর করতে আকূল,
দু’টি চক্ষুর মাঝে চিৎকার! নাকি সংজ্ঞার হলকর্ষণ?
নাকি নির্জ্ঞান? ওঠো, অগ্নি, শুভরাত্রি, শুভজন্ম!

                                                       “অগ্নিষ্ঠোম”

 

তিনি একজন স্মৃতিদগ্ধ সোচ্চার কবি
নিজ অভিজ্ঞানে পূর্ণ নির্জ্ঞান
অভীপ্সায় নির্দিষ্ট—প্রাজ্ঞতায় উত্তম
ইচ্ছাটি পূর্ণতা লাভের
ইচ্ছাটি রূপায়িত ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত।
এইভাবে উপলক্ষ থেকে দৃষ্টিমাঝে—দৃষ্টি থেকে জন্মলাভ দিকে: খেয়াল করেছেন কী!
দেখার উৎস যেখানে অগ্নিসমান ক্রোধ—বাসনা সেখানে ত্রিকালের দিকে
শুভজন্ম যেন মিলন—একত্রে মিলনের।
রুপালি সৈকতে এক চুলখোলা হিম্পানি তরুণী
পাইনের ছাওনিতে একা গাইছিল হয়ত কলতান,
বালিতে কুমির-রোদ পোহাতে পোহাতে আমরা শুনি
সমুদ্র গর্জন আর, হাওয়ার হুঙ্কার দিনমান—

                                                       “রুপালি সৈকতে”

এইটা বক্তব্য। এবং বক্তব্যকে স্পষ্ট করার এক উদাহরণ। ইহা আপনার কাছে কী ফেন্টাসির মতন লাগে? না। এইখানে বক্তব্যকে স্পষ্ট করতে কবির স্বপ্ন-সম্পর্কের মিলনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। কবির চরণ যখন সন্দেহপ্রবণ আমরা তখন তাঁর আবশ্যিক অথচ অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রজ্ঞায় আচ্ছন্ন। আগে স্বপ্ন পরে বাস্তবতার রূপস্বরূপ। এখানে কোনো লুকোচুরি নাই। আর যে-পরিস্থিতির বিষয়টি বর্ণিত যা আমাদের সামনে রাখা তাতেও নাই কোনো অস্পষ্টতার নির্দেশক। বক্তব্যে ইচ্ছাটি একটুও চেতন-অবচেতনের ভাবাঙ্গ ছিন্ন করে না। বরং দ্বি-মাত্রিক প্রকাশে তা আমাদের ইচ্ছাপূরণের কার্যকারণ সম্ভাবনাকে আরো ব্যাখ্যসফল করে তোলে। কেননা এইখানে কবির সঙ্গ-প্রসঙ্গগুলির উদ্ধৃতিগুলি বোধের অতীব গভীর থেকে উৎসারিত।

         বসুমতি জাগো, মৃতের পুস্তক, বইবেলের পাতা ছিঁড়ে,
তোমার বিয়ে হবে নীলনদের বাঁকে, আইসিসের মন্দিরে—

এই ট্রিপিক্যাল কাহিনি কবির অন্য এক মনোজগতের বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে। কল্পকেকেন্দ্রিকতা যার উৎস। যা আমাদের অবচেতন বাস্তবতার ঘুম-চরিত্রকে বিচিত্রমাত্রায় সজাগ করে। বলা যায়—

বাচনভঙ্গিতে ইহা বহুমাত্রায় আঁকা একটা নকশা
জীবনের জটিল আতঙ্ক থেকে ইহা সন্দেহাতীত বিবেচনাকে ধারণ করে। যা—
স্বাধীনতার অচল বেড়াজাল থেকে পূর্ণাঙ্গ না-হলেও জীবনের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে পরিবর্তনাকাঙ্ক্ষী
ইহা জগত-সেকুলঅর স্বপ্নের একটা নির্দেশও হতে পারে
আবেগ দ্বারা প্রভাবিত ইহা জাগরণের পথ নির্দেশক এবং কাব্যিক স্পর্শে অনেকটাই ফান্টাষ্টিক
দ দত্ত দাম্যত দ দয়ধ্বম্ অরে দক্ষ সতী দে সতী দে
আজীবিক বন্ধুতারা আমারে কিংজ ক্রস-এ করে, রাত্রি লেলিহান,
জম্বি বা পল্টারগাইস্ট, হে ক্রাইস্ট, হে ক্রাইস্ট, তমি ভেড়াশ্রেষ্ঠ, আইসো

                                                      “হায়াসিন্থ মেয়ে-৪”

এইটা একটা ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় জারিত অন্য একটা বিবেচনা। তবে যাহা, যথার্থ কিনা আমরা জানি না এবং বোধ করি বা বলতে পারি, হে ক্রাইস্ট, তমিও কী আজীবিক ভেড়াশ্রেষ্ঠ নও! হতে পারে ইহা বিনাশের বিপরীতে কবির ক্রুরতার প্রকাশ : আমরা যা বলতে পারি না। যা অনুমান করতে পারি, ইহা শিল্পসৃষ্টির লীলাবিলাসেরই ফলাফল যা পাঠান্তে পাঠকের প্রতিবারই ভিন্নার্থ ও নতুন পাঠাভিজ্ঞতা দিতে পারে। সৃষ্টির রসালোককে আরও উত্তীর্ণ করতে চাইলে কবি এমন বাকবিন্যাসে মনোযোগী হন। যখন কবির নিকট দুর্বোদ্ধতা নিজেই একটা শিল্প। তবে—কথা হলো—ইন্দ্রিয়াভিজ্ঞতায় ইহা কতটুকু নয়নাভিরাম? যদিচ রং-বেরংয়ের বহু আলোকস্পর্শের চরণত্রয় ঢাকা। শিল্পের বিষয়গত ধারণায় সর্ব পাঠকের জন্য চরণাংশগুলি কবি উম্মুক্ত করেননি। এইরূপ শব্দগ্রন্থনের মাধ্যমে শিল্পের আলো-ছায়ার যে খেলা কবি তা শুধু নির্দিষ্ট পাঠকের জন্যেই উম্মুক্ত রাখেন।

‘চুপ! চুপ!’— তুমি বললে— ‘কঙ্কাল কঙ্কালই শুধু যদি,
যদি আমরা ধ্রুবমৃত্যু, যদি আমরা গতাসু ওসুধি,
যদি আমরা অ্যালামাটি কিংবা ধামাচাপা সাদা ঘাস
আমরা তবু কুরুক্ষেত্র—
বিশ্বাত্মার— পুরো বারো-মাস;

                        “সমুদ্রসম্ভবা”

এ এক সৃষ্টির উন্মাদনা। অতীব কঠোর সাধনা ও দুরূহতাকে ভেদ করে কবি প্রকৃতির রূপ-স্বরূপ উদ্ঘাটনে রূপোন্মাদ। পাশাপাশি মানুষের বাঁচার লড়াইয়ে প্রত্যয়ী কবি। পূর্ণ-কাব্যলীলীয় যেখানে তাঁর মনোরাজ্য লীলাময় ও সংগ্রামী উদভ্রান্ত কাঙ্ক্ষায় শিল্পকর্তৃত্বে মানুষের চেতনাকে সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধারে নামেন কবি অবস্থার ব্যবচ্ছেদে তাঁর সন্ধানী চোখ কেটে কেটে ছবি আঁকে। বিহ্বল প্রাণ তাঁর যেহেতু বিপদসংকেত দিতে থাকে শুদ্ধ সঞ্চয়ের সন্ধনে অন্তর তাঁর বারবার মূর্তিমান। রূপ-সন্ধানেও কোন কিছু তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। মিতবাক নিয়ে বৃহত্তম ব্যঞ্জনায় শিল্পকুশলী তিনি রূপকল্পনায় বিভোর। কী যে নিদারুণ তাঁর অভাব। বাচনভঙ্গিতে কী অপরূপ আঁকা তাঁর লৌকিক এই শোভা। তিনি উপচে যান যত বিধিবদ্ধতা। ঐতিহ্যকল্পব্যাখ্যায় যথাযাহা পারঙ্গমতা তাঁর কবিতার শক্তি।

কী-গূঢ় ফিলিগ্রি-ঘেরা তোর বাতায়ন,
রে সোদরা! শ্বেতাম্বরা শঙ্খিনী কুমারী!
স্ফটিক-স্তম্ভের ঝাড় আলো ক’রে আছে তোর খাঁড়ি,
মোড়ে মোড়ে পাহারায় শত ওরায়ন!

                                    “পুলিপোলাও” (অংশত)

কী যে এক অনুসন্ধান, কী যে শিল্প-মায়ারূপে অতীব এক বাস্তবকে খোঁজা। নিগূঢ় এক অনুসন্ধিৎসাই এর উৎস। বাকসুষমায়। বাকবৈচিত্র্য তৈরির সাথে সাথে কবিতা রচনার প্রাক্-ভাবনাও কবিচেতনার মোড়ে মোড়ে পাহাড়ারত ছিল বুঝি কবিমন! বর্ণনার এই ভঙ্গি-রূপ- সংবেদ ত্রিশের সুধীন্দ্রনাথেও লুকিয়ে ছিল। বিবর্তন সাপেক্ষে আলোচ্য কবিও পূর্ণতর অর্থে তাঁর বাক্-প্রকৃতিকে পূর্ণতা দিতে সচেষ্ট। কবির আঁকা এই রূপকল্প জীবনপ্রতীকেরই এক ঘনিষ্ট ছবি। কতটা প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়েজনীয় এই বিবেচনা না করে সমাজ-সাম্রাজ্যের রূপকার হয়েই কবিকে কবি হয়ে ওঠতে হয়। কবি এখানে সমাজ বাস্তবতার শর্তকে সামনে রেখেই এ দায় সম্পন্ন করেছেন। যে কবি মানে না সরল বা রূঢ় নিয়মের নৈতিক নিয়ম সেই তো কবি।

         আমি রিকশা শুনছি
তুমি দেখছ হাতের ঘড়ি
ফলার রোডের মোড়ে
আমরা ভূতের মতো গরিব

                                 “নির্নিমেষ”

বিষয় ও ভাষা ব্যবহারের চমৎকারিত্বে এক প্রাগ্রসর দর্শনের কবি তিনি। সকল মূর্ত বিষয়বস্তুকেই (object) কবিতা ধারণ করে, এ আমাদের জানা। কবি এখানে একটা প্রকট বাস্তবতাকে উপস্থাপন করেছেন। ব্যবহার করেছেন সরল ভাষার আঙ্গিক। বাস্তবতার ভাবকে উসকে দিয়ে চিন্তকের ভূমিকায় নিয়ে যাইতে চাইছেন পাঠককে।

একজন কবির শব্দব্যবহারের কৌশলকে বুঝতে হলে শব্দ-পরম্পরার মধ্যকরা যে মিথস্ক্রিয়ার রূপ সেটিকেও বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, কবির শব্দচয়নের প্রধান অপ্রধান বৈশিষ্ট্যগুলিও। ফলত পাঠকের নিজের মতো করে ভাবের সার-নির্যাসের ভেতরে প্রবেশ করেই বিষয়রূপের রস-সৌন্দর্যকে আস্বাদন করতে হবে। বলা যায়, পাঠককে কবি-রচিত বয়ানভঙ্গি ভাব প্রক্ষেপণের কৌশল এ দুয়ের দ্বন্দ্বে আমাদের কাব্যমন রূপান্তরিত রসে বদলাতে থাকে বা বদলায়। একালের কবিতা তাই পাঠককের কাছে প্রতি পাঠেই তার ভাব ও ভাবরস আলাদা হয়ে প্রতিবারই বদলায়।

সমুদ্র-স্বনন। আর অশেষ ধানের খেতে ঘুড়ি ওড়ে বালিকার হাতে।
আবহসঙ্গীত বাজে গ্রেগরিয় চান্ট। তমি ছেঁড়া-শার্ট ময়লা-জুতা, তুমি
কত যে সুন্দর তুমি কত মিষ্টি হাসো তুমি আমার অপেক্ষা বিকালের।

                                                                “পেন্টিন্টো-১০”

বলাবাহুল্য শিল্পের বিকাশ ও আবেদন শিল্প-রসিকের নিকট সহৃদয় হৃদয়-সংবেদী। এইখানে পাঠক কী দেখতে পান না কবির অন্তরাশ্রুর প্রস্রবণ! এভাবেই খোলে যায় পাঠকের পাঠাভিজ্ঞতার দ্বার। ব্যথাতুর কবি-হৃদয়ের হাহাকার ও রক্তক্ষরণের ভাব ছাড়া শুধু ভাষাকে আশ্রয় করে বোঝা কঠিন। কবি যখন শিল্পী—প্রচলিত কোন সার্বিকতা দিয়ে তিনি ব্যক্তিরুচিকে ভাঙেন না। কবি তাঁর প্রতিভার জারক রসে কবিতাকে রসোত্তীর্ণ করেন। কবি তাই সুন্দর। পাঠক এই সুন্দরের সৌন্দর্য-সন্ধানী এক মানুষ।

         ভরো সৌরভে রৌরবও আজ, কিশোরী,
বেলি-মল্লিকা-বল্লী তোর কি শরীর?
ঢেলে মস্তানা পূর্বীতে আর পরজে
বোধি-আস্তানা নাস্তানাবুদ করো যে!

                                            “নাগপঞ্চমী-২”

মানুষের অন্তরে গোপন থাকে যে-সুন্দর একজন কবি তাঁর শিল্পসত্তা দিয়ে তিনি পাঠকের বোধিচিত্তকে জাগ্রত করেন। পাঠকের মন তখন সেই ছবিটি নিজের মতো করে প্রত্যক্ষ করেন এবং শিল্পরস আহরণ করেন। কবিতার শিল্প কখনও প্রকাশের জন্যে প্রকাশই নয়, বরং শিল্প প্রতিভানের মাধ্যমে পাঠকের মনে তা বিস্তার লাভ করে থাকে। মানুষের মনের জটিলতা এবং মানুষের মনে যে অবোধ প্ররোচনা আছে ঠাসা শব্দবুননে ভাবকে উগরে দেওয়ার চেষ্টায় কবি সচেষ্ট। এইখানে কবি রূপাশ্রয়ী বয়ান প্রাতিভাষিক উদ্ভাসে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। প্রতিভাষের এই বিন্যাস কবিমানসে সাঙ্গীতিক রূপেরই ভিন্ন এক মাত্রা। বলা যায়, ইহা প্রকাশধর্মী জ্ঞানবিকাশের এক বর্ণনাত্মক ধারা। আপতদৃষ্টিতে যা তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কাছে জটিল মনে হতে পারে। এইখানে কবির যা অনুভূত সত্য আমাদের কাছে তা জ্ঞাত সত্য হয়ে ধরা না-ও দিতে পারে। এখানে বুদ্ধিগত বা চক্ষুষ্মানগত অন্য কোনো আকর উদ্ধৃতাংশটির বেলায় প্রযোজ্য নয়। বরং বিবেচনাপ্রসূত কবির সাধারণ ধারণার একটি মিশ্রিত ‘বোধি’-ভাব কবিতাটিতে প্রস্ফুটিত। আসলে শিল্প সকলসময়ই সকল তর্কের ঊর্ধ্বে থাকে। শিল্পীর শিল্প-উপস্থাপন মূলত তাঁর মনেরই ফলিত রূপ। আমরা যখন কবিতায় অর্থ খুঁজি, ফলত তখন আমাদের জ্ঞান দ্বারা কবি-কল্পনার চিত্রিত বর্ণনার সৌন্দর্যকেই খুঁজি। আর কবি শিল্পের তত্ত্বগত ধারণা ও প্রতিভানের মিলনেই তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনাকে বয়ান আকারে আমাদের সামনে তুলে ধরেন।

কী চাই তোমাকে আমি? একটা প্রিয় মুখ?
নাকি নির্জনতা? নাকি একটুকরু আয়না?
কী চাই তোমার কাছে, সুব্রত, বলো না!

                           “তোমার জিজ্ঞাসা”

উদ্ধৃতাংশটি কবির জীবন ও জগতের প্রতি তাঁর জ্ঞানকাণ্ডের একটি রূপ। যা শৈল্পিক ও নন্দনতাত্ত্বিকভাবে কবিতায় জিজ্ঞাসার রূপ নিয়েছে। ইহা কী বাস্তব প্রেক্ষিত অবলম্বনে অস্তিত্ব-প্রশ্নের জিজ্ঞাসা নয়? আমাদের অজ্ঞিতাও তখন একই প্রশ্নের মুখোমুখি। নিজের ভেতর জগতকে খোঁজা ও তা অর্জনের প্রচেষ্টা এ দুই-ই মূলত কবির জ্ঞানকাণ্ড দ্বারা পরিশ্রুত ও উপস্থাপিত। ফলে তাঁর প্রকাশও সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়টি ভিন্নজাত গুণে গুণান্বিত হয়ে আরো প্রাজ্ঞ হয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেয়। একই সাথে ইহা দর্শন-প্রেক্ষিত উন্মোচনের বিষয়টিকেও আমাদের ভাবনায় নিয়ে আসার সচেষ্ট প্রয়াস করেন কবি।

অভ্যন্তর থেকে বাষ্পবৎ     ওঠে যে মদ
সন্ধ্যার সময়, সেটাতে কার
ঘ্রাণ পা’স? / আজ?          কেন, জান? তোমার? / বাবুটা, চুপ,
তোর এই জিহার করতে নেই

                                                  “সন্ধ্যা”

সাধারণজনের যে-জ্ঞান আর কবির জ্ঞানের ভেতর পার্থক্য অনেক। এইসব চরণে কবি তাঁর শিল্প-প্রকাশ-ভাব কীভাবে রচনা করেন তা পরিমাপের সূত্র নেই। সাধারণজনেরা সে-সূত্র খোঁজেও দেখেন না। চরণসমূহে পরিমাণবিশেষ কল্পনা, শিল্পের তুল্যমূল্য বিষয়কে ধরা আমাদের প্রয়োজনই-বা কী। এখানে হয়তো-বা শিল্পের উঠোন স্থান-কাল-মানুষ। এক অচেতন মূহূর্তে কবি তাঁর শিল্পমাত্রাগুণে স্থান কাল মনুষ্য জীবনের বাষ্পবৎ সময়ের রূপকে অংকন করেছেন। মানব-সমাজের সকল বৈষয়িক কাজই চেতনকাঠামো থেকে জারিত। কিন্তু শিল্পসত্য কখনও এ বিষয়টির সাথে জড়িত নয়। কেননা শিল্প এক সংবেদনশীল সত্তা। মনের প্রসাদগুণে এর ব্যাপ্তি। শিল্পে কেবল শিল্পীর মানসপ্রতিমাই প্রতিফলিত হয়। কাজেই এইখানে আমরা শিল্পের অপরিশ্রুত জলকে কীভাবে পরিশ্রুত করে আমাদের সামনে শিল্পসত্যকে তুলে ধরা হয়েছে তা না ভেবে আমদের উপলব্ধিজাত জারকে শিল্পসত্যকে আবিষ্কার করাই শ্রেয়। কবিতা তো প্রকৃতির আদর্শায়িত কোনো রূপ না। সময়-কাল ও তার উপকরণ থেকে কবি তাঁর উপাদান সংগ্রহ করে কবিমানস দ্বারা শিল্পকে শিল্পিত উপস্থাপনই কবির কাজ। এবং এইখানে তা-ই করা হয়েছে। কবি উদ্বেল হলে তাঁর মনে ঝড় ওঠে। কিন্তু তাঁর এই ঝড় কবিতায় টুংটাং করতে দেন না। তিনি তা ইন্দ্রিয়াবেগের সংবেদে তাঁর ভেতরের গর্জনশীল সমুদ্রঢেউকে বশীভূত করেন। এবং তিনি এমন এক সত্য উপস্থাপনে সচেষ্ট থাকেন যা কবিতায় নতুন আরেক সত্যের ধারণা আমাদের সামনে সমুপস্থিত হয়। তখন তিনি শুধুই আর একজন আবেগী মানুষ থাকেন না।

[গদ্যটির উদ্ধৃতাংশ ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’,  সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ‘ছোটকবিতা’ প্রকাশন (প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ২০১৮) থেকে নেওয়া।—লেখক]

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!