“ইসলামের সাথে রাষ্ট্রক্ষমতাকে যুক্ত করতে চাওয়াটা একটা মৌলিক বিভ্রান্তি” – জিয়াউদ্দিন সরদার এর সাথে একটি দীর্ঘ আলাপ

Share this:

অনুবাদকের ভূমিকা : জিয়াউদ্দিন সরদার পাকিস্তানী বংশদ্ভুত একজন বৃটিশ ইসলামী স্কলার। সরদারকে শুধুমাত্র ইসলামী স্কলার বলাটা তার সীমিত পরিচয় হবে, কেননা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার বিচরণের  এলাকা দারুণ ভাবে বৈচিত্র্যময় ও প্রসারিত।পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশুনা করেছেন, পরবর্তী কালে অধ্যাপনা করেছেন, মালয়েশিয়া সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন, পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে এমন কি বিজ্ঞান বিষয়ক অত্যন্ত সম্মানজনক একাডেমিক জার্নাল ‘নেচার’ ও ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ এর হয়ে কাজ করেছেন।  তিনি বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে লিখেছেন। সঙ্গীত, চলচ্চিত্র ও আরও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে সমালোচক হিসাবে সুখ্যাতি লাভ করেছেন। ব্রিটেন কেন্দ্রিক হয়েও তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছেন তার গড়ে তোলা প্রকল্প ‘ক্রিটিক্যাল মুসলিম’ এর মাধ্যমে। প্রায় পঞ্চাশটি বই লিখেছেন এবং অজস্র পিয়ার রিভিউড প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে ইসলামের ‘সংস্কারক’বা রিফরমিস্ট হিসাবে কাজ করছেন, বহু ইসলামী ও সেকুলার মানুষদের সাথে নিয়মিত বিতর্ক করে চলেছেন। ইসলাম ও ধর্ম প্রসঙ্গে জনাব সরদারের মতামত খুব স্পষ্ট ও সহজ। তিনি মনে করেন ধর্ম হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত প্রকল্প, এটা ক্ষমতাতান্ত্রিক বিষয় নয়। তিনি মনে করেন সকল ধর্মীয় টেক্সট কে পড়তে হবে সমকালীন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে এবং ধর্মীয় বয়ানের ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রসঙ্গে আলাপ করার সমস্যা অনেক। ইসলামপন্থীদের সাথে তো বটেই, বরং যারা নিজেদেরকে উদারনীতিবাদী ও ভবলে দাবী করেন তাদের সাথেও ইসলাম নিয়ে আলোচনা করার স্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। এমন কি বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তকদের সাথেও ইসলাম নিয়ে আলাপ আলোচনা কঠিন হয়ে উঠেছে। ইসলামপন্থীদের সাথে আলোচনার প্রধান সমস্যা হচ্ছে পারস্পরিক সহিষ্ণুতার অভাব ও সংখ্যাগুরুর ক্ষমতার দাপট প্রদর্শন। তাই জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ইসলামী নেতাদের দেখা যায় প্রায়শই তাঁরা ৯০% জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসাবে ক্ষমতার হুমকি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন, ফলে কোনও বিষয় নিয়ে যারা তাদের মত করে ভাবেন না বা ভিন্ন ভাবে ভাবেন তাদের মতপ্রকাশের স্থান সংকুচিত হয়ে যায় ক্লেবল ভিন্নমত বা সংখ্যালঘু মতামত হবার কারণেই। ইসলামকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর  প্রধান সমস্যা হচ্ছে এঁরা যেহেতু জনতুস্টিবাদী রাজনীতি করে থাকেন, অন্তত সমকালীন প্রেক্ষিতে, তাই কখনোই সংখ্যা গরিষ্ঠের বিপক্ষে যায় এমন কোনও প্রসঙ্গে এঁরা আলোচনায় সংশ্লিস্ট হতে চান না। বাংলাদেশে ‘ইসলাম’ সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্ম – বিশ্বাস, শুধু সংখ্যাগরিস্ট বলাটা ভুল হবে, ভয়ংকর রকমের সংখ্যাগরিস্ট অথবা বলা দরকার যে সংখ্যাগরিষ্ঠের সকল ভয়াবহতা নিয়েই ইসলাম বাংলাদেশে হাজির। ফলে ইসলামের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনও আলাপেই আমাদের এই সকল জনতুস্টিবাদী রাজনীতিবিদেরা অংশ গ্রহণ করেন না। বরং ইসলাম কে সুরক্ষা দেবার জন্যে  করুণ ভাবে ‘ডিফেন্সিভ’ বা ‘আত্মরক্ষাবাদী’ হয়ে ওঠেন যা যেকোনো সুস্থ আলাপ ও বিতর্কের জন্যে অন্তরায়। এঁরা পশ্চিমের সমালোচনা কে ইসলামের সমালোচনার প্রতিপক্ষ হিসাবে দাড় করাতে ভালোবাসেন। এই দুটির মাঝে এক ধরনের সক্রিয় বাইনারী তৈরি করেন। অর্থাৎ পশ্চিমের সমালোচনা করলে ইসলামের সমালোচনা করা যাবেনা কিংবা উল্টোটা, কেউ একজন ইসলামের সমালোচনা করা মানেই হচ্ছে তিনি হয় ‘পশ্চিমা আনুগত্যবাদী’ কিংবা ‘প্রাচ্যবাদী’ ইত্যাদি তকমায় ভূষিত হওয়া। এঁরা ভাবতেই পারেন না যে কোনও একজন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গে পশ্চিমেরও কঠোর সমালোচক হতে পারেন এবং একই সাথে ইসলামেরও নানান বিষয়ের সমালোচক হতে পারেন। এঁরা ভাবতেই পারেন না যে খোদ পশ্চিমা সমাজের সকল অনুষঙ্গের মাঝে বসবাস করেও পশ্চিমের সমালোচনা করা যায় এবং একই ভাবে ইসলামের অন্তর্গত থেকেও ইসলামের সমালোচনা করতে পারাটা জরুরী।এই রকমের একটি প্রেক্ষিতেই প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার জিয়াউদ্দিন সরদারের এই সাক্ষাৎকারটিকে প্রাসঙ্গিক মনে করেছি। জনাব সরদার মনে করেন ইসলাম কে রক্ষা করার জন্যেই ইসলামের সমালোচনা দরকার, তিনি খুব শক্ত ভাবে মনে করেন যে,  ‘ইসলাম’বলে আমরা যা দেখি, দেখে এসেছি তার আমূল ও নবায়িত ব্যাখ্যা জরুরী। শুধু নবায়িত ব্যাখ্যা হাজির করলেই হবে তা নয় বরং ইসলামের যে বিপুল ‘জঞ্জালপূর্ণ’ ব্যাখ্যা, যাকে জিয়াউদ্দিন সরদার বলছেন ‘Nonsense’ এবং’irrelevant’  সেই সকল জঞ্জাল সরিয়ে ইসলামের এই নবায়িত ব্যাখ্যাকে মূলধারা হিসাবে দাড় করানোর কাজটি আরও  অধিক জরুরী। কিন্তু ইসলামের প্রতি আমাদের সকলের এই ধরনের ‘আনক্রিটীক্যাল’ সমর্থন ও পাশ কাটিয়ে যাওয়া উপরভাসা পর্যালোচনার চর্চা আসলে কেবল ইসলামের অনুসারী মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই বিপদের দিকে ঠেলে দেয়া নয় বরং এক অর্থে মূলধারা হয়ে চেপে বসে থাকা ইসলামের সবচাইতে ‘গোঁড়া ও অন্ধ ধারা’র সাথে পরোক্ষ ভাবে শামিল হওয়া। জনাব সরদার  ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের যে ধারণা সেটাকে ‘ম্যানুফ্যাকচারড আইডিয়া’ বলে মনে করেন। ইসলাম, ক্ষমতা ও উত্তরআধুনিকতা প্রসঙ্গে ফুকো, দেরিদা থেকে হরে দরে ‘উদ্ধৃতি ব্যবহার’ করার ক্ষতিকর প্রবনতার কথা উল্লেখ করেছেন যা আমাদের মাঝেও আতঙ্কজনক ভাবে উপস্থিত। জিয়াউদ্দিন সরদারের এই ধরনের অজস্র লেখালেখি রয়েছে যেখানে তিনি একই সাথে পশ্চিমের এবং ইসলামের সমালোচনা করছেন যা আমাদের আজকের সময়ের জটিলতাকে বুঝতে সাহায্য করে। এই লেখাটি যারা বিশ্বাসী মুসলিম তাদেরকে যদি খানিকটা চিন্তার খোরাক যোগায় তাহলে অনুবাদটি সার্থক হবে বলে আমি মনে করি। আর বাংলাদেশের প্রতিশীল বন্ধুদের ইসলামের সমালোচনার ক্ষেত্রে পলায়নপর প্রবণতা থেকে খানিকটা আত্মঅনুধাবন তৈরি করে তাহলেও এই অনুবাদটির পরিশ্রম সার্থক হবে।

অনুবাদ প্রসঙ্গে যেকোনো পরামর্শ ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করা হবে। তবে সরদার জিয়াউদ্দিনের মতামতের দায় একান্তই তাঁর নিজের, অনুবাদকের এই নিয়ে খুব বেশী কিছু বলার নেই।   

২০১৫ সালে ‘The News on Sunday’ তে প্রকাশিত  মূল সাক্ষাৎকার  এখানে। 

অনুবাদ: মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার

 

মূল সাক্ষাৎকার

জিয়াউদ্দিন সরদার খুব আন্তরিক ভাবেই বিশ্বাস করেন মুসলমানদের সাথে সংযুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে এবং তিনি শরীয়াহ ব্যবস্থাকে আগাগোড়াই বুঝতে চান বর্তমান সময়ের প্রয়োজনের নিরীখে। যদিও এই বোধটি বর্তমান সময়ের ইসলাম বিষয়ক মূলধারার বোঝাপড়া নয়, যেখানে ইসলামকে বোঝার ক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই একে জুড়ে দেয়া হয় এক ধরনের সহিংসতার সাথে। তাঁর নিজের ভাষাতেই বলা যায় – “দুর্ভাগ্যক্রমে ইসলামের সবচাইতে পশ্চাৎপদ, সংকীর্ণ এবং অস্পষ্টবাদী ধারাটিই আতঙ্কজনক ভাবে প্রধান ও প্রভাবশালী ধারায় পরিণত হয়েছে। ”

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত (২০১৫) লাহোর সাহিত্য উৎসবে জিয়াউদ্দিন সরদার এবং পারভেজ হুডভয়কে যে বা যারাই  একই প্যানেলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্য অন্তত খুব অর্থবহ ছিলোনা কেননা এই দুজন গুণী মানুষের গত  কয়েক দশকের ইতিহাস খুব সুখকর কিছু ছিলোনা।  যদিও এই আলোচনা অধিবেশনটির শ্রোতারা এই দুই গুণী ‑মানুষের মজাদার মতবিনিময় পুরোপুরি উপভোগ করেছেন, যা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই বিরোধী ঘরানার  উপস্থাপনা। এদের একজন একদিকে যেমন করডোবা কে ইতিহাসের সহিষ্ণুতার উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন অন্যদিকে অন্যজন উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক কালে কোনও রাষ্ট্রের পক্ষেই করডোবার মতো করে অস্তিত্বমান থাকা সম্ভব নয়। এদের একজন যেমন ‘ইসলামী বিজ্ঞান’ কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন অন্যজন সেখানে তাঁর সকল প্রশংসাই হাজির করেছিলেন পশ্চিমা বিজ্ঞানের স্বপক্ষে।

মজার বিষয় হল, দু’জনই শ্রোতাদের মনে যথেষ্ট চিন্তা ও ভাবনার খোরাক দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় অধিবেশনে সরদার জিয়াউদ্দিনের মূলত কথা ছিলো তাঁর সাম্প্রতিক পুস্তক “মক্কাঃ দ্যা স্যাক্রেড সিটি” নিয়ে আলাপ করার। কানায় কানায় পূর্ণ হলের দর্শক অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন এই মেধাবী বুদ্ধিজীবীর কথা। স্পষ্টতই সরদার জিয়াউদ্দিনের স্বপ্নের শহর (মক্কা) যেনো প্রতিটি মুসলমানের মাঝেই অনুরণিত হয় সর্বত্র। যদিও তাঁর কণ্ঠ্যে সবসময়ই লেগে ছিলো হালকা মেজাজের হাস্যরস যা একটা আপাত পবিত্র বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সাথে হয়তো যথাযথ ভাবে যায়না।

লাহোর এভাবেই তার এক সন্তানকে আবারও স্বাগত জানালো, ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যে এই শহরটিকে ছেড়ে গিয়েছিলো উনিশশো ষাট সালে প্রায় নয় বছর বয়সে এবং পরবর্তীকালে প্রায় পঞ্চাশটি পুস্তকের রচয়িতা হয়েন ওঠেন এবং একজন গভীর ইসলামী পণ্ডিত ও গণবুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ‘দ্যা নিউজ অন সানডে’ পত্রিকার সাথে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি মুসলিম সমাজের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং সেসব মোকাবিলা করার পথ নিয়ে আলোচনা করেন।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আপনি ‘ক্রিটিক্যাল মুসলিম’ বলে একটি প্রকল্প চালাচ্ছেন, বলা হয়ে থাকে যে উৎসগত দিক থেকে এটা আরব বসন্তের সংগ্রামের সাথে যুক্ত, আসলে আরব বসন্তের অনুঘটক কি ছিলো আর কেনই বা এটা মুখ থুবড়ে পড়লো?

জিয়াউদ্দিন সরদার – বাস্তব সত্য হচ্ছে কোনও মানুষই স্বৈরতন্ত্রের অধীনে বাস করতে চায়না। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা যে আরব জনগণ গত চল্লিশ বছর ধরে স্বৈরশাসকের অধীনে বেশ ভালোই ছিলো। বরং তাঁরা গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্যে নানান ভাবেই সঙ্ঘবদ্ধ হচ্ছিলো।

প্রশ্ন হচ্ছে কেনো তাঁরা এখন সফল হলো আগে হতে পারেনি। এর কারণ হচ্ছে আমরা মানব ইতিহাসের এমন এক যুগে অবস্থান করছি এখন যা বেশ কয়েকটি কারণে এক ধরনের অসাধারণত্ব বা অনন্যতা অর্জন করেছে। এখন প্রায় সকল প্রজন্মের মানুষই বলছেন যে এই যুগটিই আসলে অসাধারণ, ভিন্ন রকমের। ষাটের দশকের সেই অস্থির সময়ে তাঁরা দাবী করেছিলো যে তাঁরা প্রকৃতি ও যৌনতা এই সকল বিষয়কে আবিষ্কার করতে পেরেছে। কিন্তু বিষয়গুলোকে আমাদের আরেকটু দীর্ঘ সময় নিয়ে দেখতে হয়েছিলো অন্তত আমাদের সময়ের সাথে তার অস্বাভাবিকত্ব কে বোঝার জন্যে। সমগ্র প্রশ্নটাই ছিলো পরিবর্তন প্রসঙ্গে। আগেকার যুগে কোনও কিছুর পরিবর্তন হোতো শতাব্দী ধরে, এরপরে তা হতে শুরু করলো দশকের মধ্যে আর এখন সবকিছুর পরিবর্তন হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। পরিবর্তনের গতি এখন এতো দ্রুত যে কখনো কখনো তা প্রায় রুদ্ধশ্বাস পরিবর্তনের মতই।

দ্বিতীয়ত, আমরা এর আগে আর কোনও যুগেই এই রকমের পরস্পর সংলগ্ন ও সংযুক্ত জনগোষ্ঠী ছিলাম না। আজকে পৃথিবীর প্রায় সকলেই কোনও না কোনোভাবে একে অন্যের সাথে সংযুক্ত, নানান ধরনের যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে যেমন ইমেইল, ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম আর চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ মাধ্যমগুলো তো আছেই।

তৃতীয়ত এখন সবকিছুই বিশ্বায়নের অন্তর্গত এবং এক অর্থে দুনিয়াটা দারুণ ভাবেই ছোট হয়ে এসেছে। সেজন্যেই আমাদের সময়ের এই পরিবর্তনের মাত্রা, তার গতি এবং বিশ্বব্যাপী এই সংযোগ সবকিছু মিলিয়ে একটা জটিল বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। ফলে আমাদের বেশীরভাগ সমস্যাই এখন খুব জটিল তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক যাইই হোক না কেনো।

যখন আপনি এই ধরনের আন্তঃসংযোগের মধ্যে দিয়ে যাবেন, সবকিছু যখন পরিবর্তিত হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে,তখন আপনি সবসময়ই এক ধরনের সদর্থক বা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়ে থাকেন এবং এই সব ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিষয়গুলোকে জ্যামিতিক হারে পরিবর্তন করতে থাকে। সবকিছু এতো দ্রুত বদলে যেতে থাকে যে এক ধরনের ‘ক্যাওটিক’ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরি হয়। আমি এটাকে বলি ‘স্বাভাবিকতা-উত্তর’ সময় যা আসলে বোঝা দরকার। আজকের দুনিয়াতে আমরা আসলে যাকে স্বাভাবিক বলে জানি তা ক্রমশই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। অর্থনীতি স্বাভাবিক নিয়মে আর  কাজ করছেনা, সামাজিক সম্পর্কগুলো আর তার চিরাচরিত স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করছেনা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, নৃতত্ত্ববিদ্যায় আমাদের যে ধরাধার্য বোঝাপড়া গুলো ছিলো তার কোনও কিছুই আর আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছেনা।

আরব বসন্তের আন্দোলন সেই অর্থে একটা স্বাভাবিকতা-উত্তর প্রপঞ্চ। এটা এই সময়ের আগে হওয়া সম্ভব ছিলোনা কেননা পূর্ববর্তী কোনও সময়েই আজকের মত ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগ সম্ভাব্যতা ছিলোনা, বিভিন্ন বিষয়ের পরিবর্তনশীলতার এই মাত্রা ছিলোনা, পরিবর্তনের এই গতি ছিলোনা। ভেবে দেখুন শুরুর বিষয়টা একটা খুব ছোট গৌণ ঘটনা ছিলো, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাঁর নিজের বঞ্চনার কারণে নিজের শরীরে আগুণ ধরিয়ে দিয়েছিলো আর তা থেকেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো এক ধরনের ‘চেইন রিয়াকশন’এর মত ধারাবাহিক প্রতিবাদ এবং প্রতিক্রিয়া। শুধুমাত্র তিউনিসিয়াতেই নয় আশেপাশের দেশগুলোর মিডিয়াগুলোতেও দিন রাত ধরে সেই দৃশ্যটা দেখানো হয়েছিলো। ফলে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনাও দারুণ প্রভাব তৈরি করেছিলো যার ফলাফল হলো আরব বসন্ত।

কিন্তু একটা আগ্রহ উদ্দীপক বিষয় হচ্ছে যে, এই যে স্বাভাবিকতা-উত্তর সময় সেটাই কত সহজে গণতান্ত্রিক শক্তির স্বপক্ষে কাজ করতে পারে আবার ঠিক একইভাবে এই সময়টিই কখনো কখনো স্বৈরশাসকদের স্বপক্ষেও কাজ করতে পারে। যেমনটা হয়েছে মিশরের বেলায়, প্রথমে আমরা দেখলাম মুবারককে সরিয়ে মোহাম্মদ মুরসী আসলেন ক্ষমতায়, তারপরে আবার মুরসিকেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হলো ঠিক যেভাবে মুবারককে সরানো হয়েছিলো। যদি খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে তাহলে পুরো ব্যবস্থাটির স্থিতিশীল হতে সময় লাগে আর এই অস্থিতিশীল সময়ের সুযোগ নিয়ে অপরাপর শক্তিগুলোও তাদের নিজেদের স্বপক্ষে এই পরিবর্তনকে নিয়ে যেতে পারে।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আমরা কি আবার ‘ক্রিটিক্যাল মুসলিম’ প্রকল্পের প্রসঙ্গে ফিরে আসতে পারি?

জিয়াউদ্দিন সরদার – এটা আমার নিজস্ব বোঝাপড়া যে মুসলিম দুনিয়া নিয়ে আলাপগুলো শেষপর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াবে কয়েকটি প্রসঙ্গে, সমালোচনার অভাব, বিশেষ করে আত্ম-সমালোচনার অভাব যা আরেকভাবে বলা যেতে পারে ভাবনা চিন্তার সৃজনশীলতার অভাব।আমরা যদি সত্যিই আমাদের চারপাশের বিষয়গুলোর এক ধরনের সদর্থক পরিবর্তন করতে চাই, তাহলে আমাদের চারপাশের পৃথিবীর সাথে দারুণ পর্যালোচনামূলক ভাবে, বিশ্লেষণমূলক ভাবে যুক্ত হতে হবে। এমন কি এই যুক্ত হবার আগেই আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে,স্বীকার করতে হবে যে আমরা একটা বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে ‘সত্য’ ধারণাটি নানান রকমে – রূপে হাজির রয়েছে। অর্থাৎ এই বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী পৃথিবীকে স্বীকার করে নেয়ার মানে হচ্ছে সত্যের এই নানান ধারণাকেও স্বীকার করে নেয়া এবং এই নানান ধরনকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে দেখা এবং এটা করলে, আমরাই একমাত্র সত্যান্বেষী এই ধরনের ধারণাকে একেবারেই উদ্ভট মনে হবে।

একই সাথে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে ও আমাদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনামূলক বা পর্যালোচনামূলক ভাবে ভাবতে হবে। এসবের একটা বড়ো অংশই আসলে ঐতিহাসিক ভাবে বানানো গোঁড়ামি, এমন কি এদের কিছু কিছু আমাদের চোখের সামনেই বানানো যাকে জায়েজ করা হয়েছে ওই সকল হাদিস দিয়ে যার সত্যতার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। সেকারণেই সমালোচনা খুব জরুরী। আমাদের ‘ক্রিটীক্যাল মুসলিম’ প্রকল্প হচ্ছে ইসলাম, মুসলিম ও সারা দুনিয়ার দিকে এই সমালোচনা বা পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিতে তাকানোর একটি উদ্যোগ। আমরা সবকিছুকে সমালোচনা-পর্যালোচনা করি, তা সে হোক পশ্চিমা সমাজ, মুসলিম সমাজ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি। আমরা বিশ্বাস করি, যে কোনও বিষয়ে গভীর সমালোচনা- পর্যালোচনা ছাড়া সত্যে পৌঁছানো সম্ভব নয় এবং সমাজের জন্যে কোনও সদর্থক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: সেদিক থেকে দেখলে আজকের পশ্চিমা দুনিয়ায় যেভাবে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কে বোঝা হয় ও অনুশীলন করা হয় যা প্রাশয়ই মুসলমানদের জন্যে বিরক্তি ও বিব্রত হবার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাকে কিভাবে দেখবেন?

জিয়াউদ্দিন সরদার –  সবার আগে আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে আজকের এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে নানান মানুষের নানান মত আছে এবং থাকবে এবং মানুষ তাদের সেসব ভিন্ন ভিন্ন মতামত নানান ভাবে প্রকাশ করবে। ধরুন একজন বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে আমি কখনোই আমার নবীর প্রতি অমর্যাদা করবোনা কেননা তিনিই আমার সকল আচরণগত আদর্শিক মডেল। কিন্তু আমাদেরকে এটা বোঝা দরকার যে আজকের যে পৃথিবীতে আমরা বাস করি তার পাঁচভাগের চারভাগ মানুষই ‘বিশ্বাসী’ নন এবং সে কারণেই আমার নবী সম্পর্কে তাদের ভিন্ন মতামত থাকতেই পারে, ঠিক যেভাবে পশ্চিমা জীবন ও মূল্যবোধ সম্পর্কে আমাদের ভিন্নমত আছে এবং আমরা সমালোচনা করি।

কিন্তু এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে ক্ষমতা। ক্রিটিক্যাল মুসলিম এর পক্ষ থেকে আমরা আরেকটা বিষয়ের সাথে খুব সন্দিগ্ধ ভাবে যুক্ত হই তা হচ্ছে ক্ষমতার বিশ্লেষণ। আপনি যদি আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যবহার করেন কোনও একটি জনগোষ্ঠীকে হেয় করার জন্যে, যাদের সত্যিকার অর্থে কোনও ক্ষমতা নেই, যারা ইতিমধ্যেই প্রান্তিক তাহলে আপনি এক ধরনের অন্যায্য কাজ করছেন। সেক্ষেত্রে আমি যেকোনো জায়গাতেই আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো কেননা আপনি একটা বেইনসাফ কাজ করছেন, অন্যায্য কাজ করছেন। শারলি এব্দো’র ঘটনাটি এখানে উল্লেখযোগ্য হতে পারে, হ্যাঁ আমি অবশ্যই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বিশ্বাস করি কিন্তু মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ক্ষমতাহীন, ইতিমধ্যেই প্রান্তিক হয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীকে হরে দরে হেয় করাকে সমর্থন করিনা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে চর্চা করার এটা কোনও মর্যাদাকর পথ হতে পারেনা।

বাস্তবত মত প্রকাশের স্বাধীনতার চর্চার সবচাইতে ভালো ব্যবহার হতে পারে যদি আমরা ক্ষমতাকে সমালোচনা করি, যদি ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাকে ব্যবহার করা হয়।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: সেদিক থেকে বিবেচনা করলে এটাতো মুসলিম সমাজের জন্যে খুব জটিল হয়ে যায় কেননা মুসলমানেরা তো আত্মসমালোচনা করেনা।

জিয়া উদ্দিন সরদার – হ্যাঁ, মুসলমানদেরকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে আজকের দুনিয়ার জটিলতা,বৈচিত্রময়তা ও বহুত্ববাদ কে বোঝার ক্ষেত্রে। আপনি যদি অনুভূতিতে আঘাত পান এবং সাথে সাথেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বসেন তাহলে সেই প্রতিক্রিয়ার একটা পরিণতি আছে যা শুধু আপনার জন্যেই নয় বরং আপনার সাথে সম্পর্কিত সমাজের সকল অংশের জন্যেই। পশ্চিমে ঘটে যাওয়া কোনও একটি ঘটনায় আহত হয়ে ক্ষিপ্ত মুসলমানেরা যখন রাস্তায় বাস পোড়ায় যে বাসটি হয়তো তাদেরকেই পরদিন সকালে অফিসে পৌঁছে দেয়ার কথা কিংবা যে মুদি দোকানটিতে আগুণ ধরিয়ে দেয় যেখানে হয়তো প্রতিদিনই তাদেরকে যেতে হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার সদাই করার জন্যে। এই ধরনের ঘটনা শ্রেফ নির্বুদ্ধিতা। আমাদেরকে একটু স্থির হয়ে ভাবতে হবে এবং ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার ও প্রতিবাদের আরও কার্যকর পথ খুঁজে বের করতে হবে।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আপনাদের প্রকল্পটির এক ধরনের আকাডেমিক ধরন আছে। কিন্তু মুসলিম জনগোষ্ঠী যেহেতু পাঠের সাথে খুব বেশী সম্পৃক্ত নন, আপনারা কি অন্যান্য মাধ্যমগুলোর কথা বিবেচনা করে দেখেছেন, যেমন নাটক,চলচ্চিত্র ইত্যাদি?

জিয়াউদ্দিন সরদার – নিশ্চিত ভাবেই প্রকল্পটির একটা একাডেমিক বা বিদ্যায়তনিক ধরন আছে এবং সেই সাথে আছে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক মননশীলতাও, কিন্তু এটা শুধুমাত্র বিদ্যায়তনিক মানুষদের জন্যেই নয়, বরং মোটামুটি ভাবে পড়তে ও চিন্তা করতে পারেন এমন সবার জন্যেই। আমরা গল্প লিখি, আমাদের পত্রিকার প্রতি পর্বে কিছু ছোটগল্প এবং কবিতাও থাকে। আমাদের প্রাথমিক যুক্তি হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিজেদেরকে প্রথমত মানুষ ভাবতে হবে, আর মানুষের তো সঙ্গীত, শিল্পকলা, সাহিত্য, দর্শন, প্রযুক্তি সবকিছুই দরকার তাইনা? কেবল ধর্ম নিয়ে তো কেউ মানুষ হয়ে ওঠেনা। ধর্ম হয়তো আপনার কিছু কিছু প্রয়োজন মেটায়। আমাদের প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা যারা নিজেদেরকে এমনভাবে নির্মাণ করবেন যেনো নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এবং সমাজের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে নানান বিষয়কে নিজেরাই মোকাবিলা করতে পারে, কেবল তখনই এঁরা হয়তো পরিবর্তনের অনুঘটক হিসাবে কাজ করতে পারেন। কখনো কখনো খুব সামান্য কয়েকজন চিন্তকও গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারেন।

হ্যাঁ, এটা সত্যি যে মুসলমানেরা খুব বেশী একটা পড়াশুনা করেন না, কিন্তু সবজায়গায় এটা একই রকমের নয়। যেমন ধরুন পাকিস্তান বা মিশরে মুসলিম জনগোষ্ঠী খুব একটা পড়াশুনা করেন না কিন্তু ইন্দোনেশিয়া বা তুরস্কে আবার চিত্রটা ভিন্ন রকমের, এঁরা যথেষ্টই পড়াশুনা করেন। মুসলমানদের নিয়ে আসলে সাধারণীকরণ করাটা কঠিন।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: তো সেই অর্থে পৃথিবীর আর কোথাও কি এই একই ধরনের পর্যালোচনামূলক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা চলছে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – হ্যাঁ সেটা তো চলছেই। ধরুন তুরস্কে, তারা ইসলামের বেশকিছু দিক নিয়ে নতুন করে  চিন্তা করেছে। ইন্দোনেশিয়াতে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলছে যে আদৌ কি একটি রাষ্ট্র ’ইসলামিক’ হতে পারে কিনা তা নিয়ে, অনেক গভীর ও বিস্তারিত বিতর্ক, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পরে তাঁরা উপসংহার টেনেছেন যে ইসলাম ও রাজনীতি দুটি সম্পর্কিত বিষয় কিন্তু সেই সম্পর্কটা রাষ্ট্রের মধ্যে দিয়ে নয়, বরং ইসলামী রাজনীতির সম্পর্কটা নাগরিক সমাজের মাধ্যমে। এর অর্থ হচ্ছে আপনি যদি সমাজ সচেতন মুসলিম নাগরিক হয়ে থাকেন তাহলে আপনি সামাজিক বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আপনার নিজস্ব মূল্যবোধ ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো প্রকাশ্যে বলবেন,আলোচনা ও বিতর্ক হাজির করবেন। নিজেকে রাজনৈতিক নাগরিক হিসাবে মেলে ধরার জন্যে এটা একধরনের সৃজনশীল পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু এটা মতাদর্শ হয়ে উঠতে পারেনা এই অর্থে যে মতাদর্শগত ভাবে ইসলামী রাষ্ট্র ধারণাটি পুরোটাই একটা বানানো ধারণা। ইন্দোনেশিয়াতে তাঁরা পুরো বিষয়টিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন, এই নতুন ভাবনায় রাজনৈতিক নাগরিক হয়ে ওঠার মানে হচ্ছে সকলে মিলে একটা নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার জন্যে কাজ করা।

ধরুন, মরক্কোতে তাঁরা শরীয়া’র ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দিকটিকে সম্পূর্ণ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে, আমি বলছি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইনের প্রসঙ্গ, ফৌজদারি আইনি দিকটি নয়। আপনি নিজেই খোঁজ নিয়ে দেখুন, mudawana শব্দটি গুগোলে লিখে দেখুন, সব জানা যাবে।

এই নতুন শরিয়া আইনে, বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীরাও সমান অধিকার লাভ করেছেন । বিবাহ বিচ্ছেদ হলে মা সন্তানের অধিকার লাভ করবেন এবং তাঁর প্রাপ্য ভাতা লাভ করবেন, এই আইনে পুরুষ চাইলেই তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবেন না, বরং তাকে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করে আদালতে দাঁড়াতে হবে, আদালত কে ব্যাখ্যা করতে হবে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনের স্বপক্ষে, প্রথম স্ত্রী বেঁচে থাকতে বা বর্তমান থাকতে কোনও পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না, কথায় কথায় বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার সুযোগও নেই। এই ধরনের অজস্র প্রথাগত বাজে চর্চাগুলোকে শ্রেফ বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং এই কাজটি কিন্তু করা হয়েছে কুরআন ও সুন্নাহর সূত্রগুলোকে ব্যবহার করেই। আপনি যদি ওদের পুরো সংবিধানটিকে একটু ভালো করে বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখবেন এই আইনগুলোর স্বপক্ষে অজস্র মৌলিক উৎস টীকা হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটাও শরিয়া,প্রচলিত শরিয়ার মতোই কিন্তু এই শরীয়া তাঁর নিজের সময়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে আরও অনেক বেশী প্রস্তুত।

সময় বদলাচ্ছে। যেমন মরক্কোতে শরিয়াকে আধুনিকায়ন করার জন্যে মরক্কোর রাজা প্রথাগত ইসলামী আলেমদের না ডেকে বরং সমাজের সংশ্লিস্ট মানুষদেরকে ডেকেছেন তাদের মতামতের জন্যে, যেমন ধরুন তিনি নারী আইনজীবী ও অন্যান্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ডেকেছেন, এঁরা হয়তো প্রথাগত অর্থে ইসলামী আলেম নন কিন্তু সমকালীন বাস্তবতা নিয়ে এদের অনেক অভিজ্ঞতা ও বোঝাপড়া রয়েছে। প্রথাগত চিন্তা ও কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ না করলে এক ধরনের বিবেচনাহীন চিন্তাই সবসময় রাজত্ব করবে।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আপনাকে একই সাথে উত্তরাধুনিক ও উত্তরাধুনিতাবাদের সমালোচক হিসাবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে প্রায়শই …

জিয়াউদ্দিন সরদার – এটা খুব আগ্রহ উদ্দীপক যে মানুষ অন্যকে খুব সহজেই একটা কাঠামোর মাঝে ঢুকিয়ে দিতে পছন্দ করেন। এঁরা কেবল সাদা আর কালোটাই দেখেন। আমার কাছে এটা খুব অদ্ভুত মনে হয়, এধরনের ক্ষেত্রে মানুষ তাঁর চারপাশের জটিলতার সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারেননা। আমার ক্ষেত্রে আমি সম্ভবত একই সময়ে অনেক কিছু আবার কখনো হয়তো কোনোকিছুই নই। হ্যাঁ আমি উত্তরাধুনিক যখন উত্তরাধুনিকতা বলে যে প্রান্তিক মানুষের কথা আমাদের শোনা দরকার, ক্ষমতাহীন মানুষের মতামতও সমান ভাবে মূলধারায় যুক্ত হওয়া দরকার, আমার সারাজীবন ধরে আমি সংগ্রাম করেছি ক্ষমতাহীন মানুষের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে। কিন্তু আমি আবার উত্তরাধুনিক নই যখন উত্তরাধুনিকতাবাদ দাবী করে যে উদারনীতিবাদী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই প্রান্তিক মানুষের কথা শোনার নিশ্চয়তা দিতে পারে। আমি মনে করি প্রান্তিক মানুষের নিজেদের কথার মধ্যে দিয়েই, তাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই তাদের কণ্ঠস্বর প্রকাশিত হওয়া উচিত, কোনও বিশেষ তন্ত্রের মাধ্যমে নয়। আমি তখন উত্তরাধুনিক যখন তারা বলে যে সত্য একই সঙ্গে নানান রকমের হতে পারে কিন্তু আমি আবার উত্তরাধুনিক নই যখন তারা বলেন যে সত্যের আরেকটি অর্থ হচ্ছেযে,  সকল মহা-আখ্যানই (Meta-Narrative) আসলে অর্থহীন, আমার কাছে তো ইসলাম অর্থহীন নয়, তাইনা?

এটা খুব সহজ বোঝাপড়া নয়। উত্তরাধুনিকতাবাদের কিছু কিছু অংশের সাথে আমি একমত পোষণ করি আবার কিছু কিছু মতামতের সাথে আমি বেশ শক্ত ভাবে দ্বিমত পোষণ করি। আমার একটি বইতো রীতিমতো পূজনীয় হয়ে উঠেছে যার শিরোনাম ছিলো Postmodernism and the Other  যার মূল বিষয় ছিলো উত্তরাধুনিকতা কিভাবে অন্যান্য সংস্কৃতিকে দেখে থাকে। বইটির উপশিরোনাম ছিলো New imperialism of Western Culture অর্থাৎ পশ্চিমা সংস্কৃতির নয়া সাম্রাজ্যবাদী স্বরূপ প্রসঙ্গে, বাস্তবত এই উপশিরোনামটিই উত্তরাধুনিকতা সম্পর্কে আমার উপসংহার বলে দিয়েছিলো আর কি।

পশ্চিম থেকে প্রতিদিনই অজস্র তত্ত্ব বেরিয়ে আসছে যা আমরা কোনও রকমের বাছবিচার না করেই গ্রহণ করছি। এই সকল তত্ত্বের অনেকগুলোই দেখা যাচ্ছে যে বিদ্যমান স্থিতাবস্থাকে (Status Quo) ধরে রাখার এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রচেষ্টার অংশ, পশ্চিমা ক্ষমতাকাঠামোকে সুভালাভালি ধরে রাখার, বজায় রাখার প্রচেষ্টা। সে কারণেই,পশ্চিমের এই সকল তত্ত্বকে কোনও রকমের বিচার বিবেচনা ছাড়াই গ্রহণ করার বদলে এই সকল তত্ত্বের সাথে ভালো করে পরিচিত হওয়া দরকার, এদেরকে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার, ভেঙ্গে দেখা দরকার, এই গভীর বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি দিয়ে দেখলে  প্রায়শই দেখা যায় এই তত্ত্বগুলো কতটা ভঙ্গুর।

তত্ত্ব বা থিওরি নিয়ে আমাদের সবার মাঝেই এক ধরনের মোহাবেশ তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন সব বিষয়েই তত্ত্ব চান, তা সে সংস্কৃতি বিষয়ক অধ্যয়ন কিংবা নৃবিজ্ঞানের বিষয়েই হোকনা কেনো। নিশ্চিতভাবেই আমাদের তত্ত্ব দরকার কিন্তু তত্ত্ব যেনো নিজেই এক ধরনের বদ্ধ কাঠামোতে পরিণত না হয় যা আমাদেরকে আমাদের স্বাভাবিক চিন্তা বা কাজ করতে না দেয়। আমাদের পাকিস্তানের অনেক বিদ্যায়তনিক চিন্তকদের আমি দেখেছি কথায় কথায় সাঈদ, ফুকো বা দেরিদা কে আওড়াতে, যখন তাদের আসলে দেখা দরকার তাদের নিজেদের চারপাশে কি ঘটছে, তাদের নিজের চারপাশের সাংস্কৃতিক – বৌদ্ধিক পরিসর থেকেই নতুন মৌলিক চিন্তা নিয়ে আসা দরকার।

তত্ত্বর প্রতি এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য যা অনেকটাই অবিবেচনা প্রসূত, আমি এর বিরোধিতা করি।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আপনার কাজকে অনেকেই আশিষ নন্দীর কাজের সাথে তুলনা করছেন, আপনার কি মনে হয় এই তুলনাটা যৌক্তিক?

জিয়াউদ্দিন সরদার – হ্যাঁ, কিছু কিছু বিষয়ে আমি আর আশিষ মোটামুটি ভাবে একইরকমের করে ভাবি। আমরা দুজনেই দারুণ ভাবে ট্র্যাডিশন বা ঐতিহ্যকে সমালোচনা করি কিন্তু আমরা দুজন আবার খুবই ট্র্যাডিশন বা প্রথাগত ঐতিহ্যতে বিশ্বাস করি। আমরা দুজনেই বিশ্বাস করি আপনি কখনোই আপনার নিজের একটা শক্ত আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে পারবেন না যদিনা আপনার পেছনে একটা শক্ত সমর্থ ঐতিহ্যগত ইতিহাস থাকে। কিন্তু এরপরে মনে রাখা দরকার ঐতিহ্য প্রায়শই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, গলা টিপে ধরার মত অবস্থা তৈরি করে, জীবন কে অস্বীকার করে। আমি মনে করি দিনের শেষে আমরা দুজনেই ক্ষমতাকে দেখে নিতে চাই, আমরা ক্ষমতার অবিনির্মাণ করতে চাই। আমরা ক্ষমতা কাঠামো ভেঙ্গেচুরে দেখতে চাই, আমরা এর শক্তিকে ক্ষুণ্ণ করতে উদগ্রীব, কিন্তু সেটা একরৈখিক সহজ সরল পথে করতে চাইনা, বরং তাকে বুঝতে চাই, তাকে ক্ষুণ্ণ করতে চাই আমাদের জীবনের সকল জটিলতার মধ্যে দিয়েই।

আর আমার মতই আশিষও এক রকমের বহুশাস্ত্রজ্ঞ (Polymath) ধরনের মানুষ। মানে আমরা দুজনেই অনেক ধরনের বিস্তৃত বিষয়ের প্রতি আগ্রহী। আশিষ চলচ্চিত্র, প্রযুক্তি, ইতিহাস, আমাদের দেশবিভাগের ইতিহাস, বিশ্বায়ন ইত্যাদি নানান ধরনের বিষয়ের প্রতি আগ্রহী । আমার মনে হয়না তিনি এভাবে কখনো নিজের বিষয়ে ভেবে দেখেছেন, কিন্তু আমার মতে সত্যিই তিনি একজন বহুশাস্ত্রজ্ঞ মানুষ।

আমাদের চারপাশের যে জটিলতা এবং যে দ্রুত পরিবর্তনশীলতা, তাকে বোঝার জন্যে আসলে জ্ঞানের নানান শাখার বোঝাপড়া থাকাটা জরুরী, কখনো কখনো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থাকাটাও দরকারি। কেবল একটা বিদ্যায়তনিক শাখার চোখ দিয়ে দুনিয়াকে দেখাটা খুব একটা কাজের কাজ কিছু হয়না, বরং আপনার দরকার আন্তঃবিভাগীয় এমন কি বহুবিভাগীয় বিদ্যায়তনিক জ্ঞানের সম্মিলন এবং সেই সাথে দরকার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিত ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেবার, খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: একটা বিশ্বাস আছে আমাদের মাঝে যে আল্লাহ চান মুসলমানদেরকে এই দুনিয়াতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সেজন্যে মুসলমানদেরকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে। একজন মুসলমান হিসাবে আপনি নিজে কি এই ধরনের ধারণায় বিশ্বাস করেন আপনার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – সত্যি বলতে কি এই দুটি ধারণাই বানানো। প্রথমত আপনি আসলে কিভাবে জানেন যে আল্লাহ কি চান? এটা কেবল আল্লাহই জানেন। আমরা বড়োজোর যা করতে পারি তা হচ্ছে আমাদের নিজেদের জীবনের ক্ষেত্রে একটা নৈতিক জীবনবোধের সংগ্রাম শুরু করা এবং সেই নৈতিক জীবনবোধকে আমাদের আশেপাশের সম্প্রদায়ে এবং এক পর্যায়ে বৃহত্তর সমাজের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। সেটাই আমাদেরকে ইসলামের কাছে নিয়ে যাবে, এবং আমরা কেবল সেটাই করতে পারি।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: কিন্তু এটা আসলে নির্ভর করছে আপনি কিভাবে দেখছেন বিষয়টাকে। জামাতে ইসলামী, জমিয়তে উলামা, কিংবা আইসিস কি যার যার মতো করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের কথা বলছেন না? তাদের প্রত্যেকের পথ হয়তো ভিন্ন কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যটা কি একই নয়?

জিয়াউদ্দিন সরদার – হ্যাঁ, তাদের উদ্দেশ্যটা একই এবং সেখানেই মৌলিক ভুলটি। আপনি যদি ইসলাম কে রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে যুক্ত করে দেখতে চান, তাহলে আসলে ধর্মটা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের একটা কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এবং তখন ধর্মের শক্তি হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র, এর মানে হচ্ছে মূলত আপনি একটা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা তৈরি করছেন ধর্মকে ব্যবহার করে। ইসলামকে রাষ্ট্রক্ষমতার সমান করে ভাবার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী সমীকরণ। আমাদের খুব বেশী দূরে যেতে হবেনা, কেবল আমাদের নিকট অতীতের দিকে তাকালেই হবে। যেখানেই ইসলাম ও রাষ্ট্রকে সমার্থক করা হয়েছে সেখানেই তা এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে,দেখুন না ইরানে, সৌদি আরবে, সুদান কিংবা আফগানিস্তান আরও অজস্র নাম বলা যাবে।

রাষ্ট্র ও ইসলামের এই ধরনের বোঝাপড়া আমাদেরকে আরও বলে যে ক্ষমতা বিষয়টাকে আমরা কতটা সীমিত ভাবে বুঝি। দেখুন, আজকের বিশ্বে, ক্ষমতা ও তার শক্তি নানান ভাবে আসে, নানান উৎস থেকে আসতে পারে,আজকের দুনিয়ার সবচাইতে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গুগোল, সেটা কিন্তু কোনও রাষ্ট্র নয়, আমাদের মতামত কে বদলে দেবার জন্যে সবচাইতে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান হচ্ছে টুইটার, সেটা কিন্তু কোনও রাষ্ট্র নয়। আপনি দেখুন কিভাবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত তার ক্ষমতা কাঠামোর বদল ঘটিয়েছে, এটা ঘটেছে তাদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে। পাকিস্তানে বিগত ষাট বছরে এর সকল ধর্মীয় দলগুলো এবং তালিবান মিলে যে প্রভাব বিস্তার করেছে ভারতের বলিউড তার চাইতেও অনেক বেশী প্রভাব বিস্তার করেছে পাকিস্তানের জনগণের উপরে।

আমাদের বোঝা দরকার যে ক্ষমতা ও শক্তি নানান উৎস থেকে আসতে পারে আর এর কয়েকটি প্রধান উৎস হচ্ছে সংস্কৃতি, জ্ঞান এবং চিন্তা। একই ভাবে এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হচ্ছে ক্ষমতা ও শক্তির একটা প্রধান উৎস যখন আমাদের সমাজে এর লেশমাত্র নেই।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: কিন্তু এভাবেই তো আমরা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনগুলোকে জেনেছি বা জানি, এই আন্দোলন গুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। যদি এটা নাইই হবে তাহলে আমরা যে চাই একটি আদর্শ ইসলামি সমাজ তার মানেটা কি? আর ধরুন সেক্ষেত্রে জনগণেরই বা কি ভূমিকা?

জিয়াউদ্দিন সরদার – আসলে আমরা যদি একটা আদর্শ ইসলামী সমাজ চাই, সেটা অনেকটাই কাল্পনিক বা ইউটোপিয়ান চাওয়া, অর্থাৎ আমরা একটা কাল্পনিক বিষয়কে অর্জন করতে চাচ্ছি যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু ইসলামকে আসলে বেঁচে থাকতে হবে বাস্তব দুনিয়ার মানুষের জীবনের মধ্যে দিয়ে।  এটা আসলে আমাদের ব্যক্তিজীবনের দৈনন্দিন সংগ্রাম, নৈতিকভাবে উন্নত হয়ে ওঠার সংগ্রাম। এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আমরা এমন কি জানিনাও যে আমাদের সমসাময়িক কালে  ’আদর্শ’ ইসলামী বলতে আসলে কোনও কিছু কেমন হতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া আর দাড়ি রাখাকে যদি কেউ ইসলামী বলেন তাহলে তার চাইতে হাস্যকর কোনও ধারণা আর নেই। আমাদের একটা লম্বা তালিকা আছে কি করা যাবে আর কি করা যাবেনা সেসব নিয়ে যার সাথে বর্তমান সময়ের কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। আমাদের একটা আইন ব্যবস্থা (শরিয়া) আছে যা নবম শতকের সামাজিক বাস্তবতায় নির্মিত যার সাথে আজকের একুশ শতকের বাস্তবতার কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই।

আর এসবের পরেও আছে, আমরা ইসলাম নিয়ে আমাদের বোঝাপড়া অন্যের উপরে চাপিয়ে দিতে চাই। জামাতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দলগুলো যা করছে সেটা শুধু রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলই নয়, তারা চেষ্টা করছে অন্য সকল মানুষের উপরে তাদের ইসলাম বিষয়ক বোঝাপড়াটা চাপিয়ে দিতে।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: পশ্চিমা গণতন্ত্রের সাথে আপনি এই বিষয়গুলোর সম্পর্ককে আপনি কিভাবে দেখেন? কোনও মুসলিম দেশ কি এভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অর্থাৎ নির্বাচন ও সংসদের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক ও ইসলামিক রাষ্ট্র হিসাবে বিকশিত হতে পারে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – সমকালীন সময়ের বেশীরভাগ মুসলিম সমাজেরই প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমরা আমাদের আদিম গোত্রীয় সত্ত্বা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। ইরাকের দিকে দেখুন, তারা এখনও দারুণ ভাবে আদিবাসী গোত্রীয় ধরনের জনগোষ্ঠী। সিরিয়া খুব ভালো একটা উদাহরণ হতে পারে, পুরো দেশটাই এক ধরনের গোত্রীয় যুদ্ধ চালাচ্ছে, এক গোত্র আসাদের নামে আরেক গোত্র আইসিস এর নামে যুদ্ধ করছে। এটা একেবারেই আদিম গোত্রগুলোর মাঝে হওয়া যুদ্ধের মতো। পাকিস্তানেও অজস্র আদিম গোত্রগত সংস্কার কে ইসলামের নামে জায়েজ করা হয়েছে, যেমন ধরুন নারীর উপরে যে নিপীড়নমূলক প্রথাগুলো। ঐতিহাসিক ভাবেও এটা হয়েছে কেননা ইসলাম বহু আদিম গোত্রগত প্রথাকে শরীয়ার অন্তর্গত করেছে যাকে আমরা ঐশ্বরিক বা স্বর্গীয় আদেশের অংশ বলে মনে করি।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটা নতুন দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কিভাবে আমরা এই যুদ্ধরত আদিম গোত্রের মত জনগোষ্ঠীগুলোকে এক যায়গায় নিয়ে আসতে পারি, আর এই চ্যালেঞ্জটি গণতন্ত্রের চাইতেও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: কিন্তু পশ্চিমা গণতন্ত্র তো এইসব সমস্যার অনেক গুলোকেই মোকাবিলা করতে পেরেছে।

জিয়াউদ্দিন সরদার – পশ্চিমা গণতন্ত্রের অনেক ভালো দিক আছে কিন্তু আবার এর অনেক অংশই আমাদের সাথে ঠিক যায়না। যেমন ধরুন, হোয়াইট হাউসে ঢোকার জন্যে অন্তত আধা বিলিয়ন ডলার দরকার হয়,সিনেটের সদস্য হবার জন্যে অন্তত একশো মিলিয়ন ডলার আর নিম্ন কক্ষের সদস্য হবার জন্যে অন্তত পঞ্চাশ থেকে ষাট মিলিয়ন ডলার থাকতে হবে পকেটে, অথচ দিনের শেষে সত্যিকারের ক্ষমতা আসলে থাকে ব্যবসায়ী আর লবিস্টদের হাতে এই সকল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে নয়, এটাকে গণতন্ত্র বলবেন? এটা নির্ভর করছে আপনি কিভাবে প্রশ্নটিকে দেখছেন। যে গণতন্ত্র বড়লোককে কেবল বড়োলোক করে, একটা স্থায়ী অভিজাততন্ত্র গড়ে তোলে, সমাজের সম্পদকে কেবল ক্ষুদ্র কয়েকজনের হাতে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর জন্যে জমিয়ে তোলে, তা আর যাইই হোক সত্যিকারের গণতন্ত্র নয়।

আমাদের জন্যে যা দরকার তা হচ্ছে একটা মুক্ত, জবাবদিহিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক শাসন ব্যবস্থা যা আমরা এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। ‘শসনব্যবস্থা’ ধারণাটা জটিল, আমরা মনে করি পাকিস্তানকে পরিচালনা করা বোধ খুব সহজ, কিন্তু আসলে তা খুবই কঠিন, কোনও একক পার্টি বা দলের পক্ষে তা সম্ভব নয় কারণ পাকিস্তান সত্যিই একটি জটিল সমাজ। ‘শাসনব্যবস্থা’ বিষয়টিই খুব জটিল একটা ব্যাপার। ইউরোপ, ব্রিটেন এবং আমেরিকায় আমরা শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত জটিলতাগুলো দেখেছি। খোদ আমেরিকাতে আমরা দেখেছি শাসনব্যবস্থার জটিলতায় পুরো প্রশাসন কয়েক সপ্তাহ ধরে অচল হয়ে ছিলো, ইতিহাসে আর কোথাও এমনটা দেখেছেন?

 

দ্য নিউজ অন সানডে: মুসলিম ভ্রাতৃত্ব একটা খুব মহিমান্বিত ধারণা অথচ সারা দুনিয়াতেই মুসলমানেরা সেকট বা সম্প্রদায়গত উপদলে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মানুষ বলছে ধর্মই আসলে এসব করে কিন্তু যা হচ্ছে তা আসলে মানুষের সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছু নয়। আপনাদের পত্রিকায় আপনি এই বিষয়টি নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করেছিলেন কিন্তু আজকের অবস্থা দেখে আপনার কি মনে হয় যে সমস্যাটিকে আদৌ মোকাবিলা করা গেছে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – সমগ্র মানব ইতিহাসে তো এমনটাই ঘটেছে, মানুষ তো এমনই করেছে, যেকোনো মতাদর্শের ইতিহাসেই দেখুন। ধরুন মার্ক্সবাদের কথা, সেখানে আপনি পাবেন লেনিনের অনুসারী, ট্রটোস্কির অনুসারী, বিপ্লবী, প্রতিবিপ্লবী এই রকমের নানান দল – উপদল। দিন শেষে কোনও একটি দল অন্য সকলকে পরাজিত করে, হত্যা করে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, নিজেরা হয়ে ওঠে ক্ষমতাবান মূলধারা।

মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের এই ধারণাটি খুবই মহান কিন্তু সত্য হচ্ছে ইতিহাসে এর কোনও অস্তিত্ব নেই, ছিলোনা।ভেবে দেখুন, ইসলামের গড়ে ওঠার পর্বে আমাদের চার খলিফার তিনজনই মারা গেছেন আততায়ীর হাতে,আপনি খেয়াল করে দেখুন নবীজীর মৃত্যুর প্রথম চল্লিশ – পঞ্চাশ বছরের মাঝেই কত অজস্র দল – উপদলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো মুসলিম জনগোষ্ঠী। খোদ নবীর স্ত্রী তাঁর জামাতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, নবীজির নাতিকে বর্বর ভাবে খুন করা হয়েছে কারবালার ময়দানে। তো এসব ঘটনা কিন্তু ‘উম্মাহ’ নিয়ে খুব মহিমান্বিত কিছু বলেনা। সুতরাং প্রত্যাশা হিসাবে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বিষয়টা খুব মহিমান্বিত একটা ধারণা, কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে কখনোই এর কোনও অস্তিত্ব ছিলোনা।

ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই এর ‘অপরায়ন’ এর সমস্যা ছিলো, সেটা ভিন্ন বোঝাপড়ার মানুষদের প্রতি,নারীদের প্রতি, খ্রিষ্টান বা ইহুদী কিংবা সাবিয়ানদের প্রতি। ইসলামের এই অপরায়ন বা Otherness কে কখনোই মোকাবিলা করা হয়নি। নবীজি বিষয়টিকে মোকাবিলা করেছিলেন উম্মাহ বা কমিউনিটির ধারণা দিয়ে যা মদিনা সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো। মদিনা সনদ ছিলো খুবই উল্লেখযোগ্য ভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সনদ যেখানে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রগুলোর অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয়েছিলো। নাম ধরে ধরে উল্লেখ করা হয়েছিলো কারা পৌত্তলিক, কারা ইহুদী কারা সাবিয়ান যা একটি বহুত্ববাদী সমাজের পূর্বশর্ত। কিন্তু নবীর মৃত্যুর পরে এই বহুত্ববাদী চেতনার বিকাশ ঘটেনি যা হবার কথা ছিলো। সুতরাং যতদিন পর্যন্ত আমরা এই ‘অপর’দের বিষয়ে একটা বোঝাপড়ায় আসতে না পারবো এমন কি ইসলামের বিভিন্ন সেকট বা বিশ্বাসগত সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক না হবে, ততদিন পর্যন্ত মুসলিম সভ্যতা নামের কোনোকিছু আমরা গড়ে তুলতে পারবোনা।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: সহিংসতা বিশেষত ধর্মীয় সহিংসতা পাকিস্তান কে একটা বিশেষ রূপ প্রদান করেছে, অন্তত এই পর্যায়ে। আপনার কাছে কি পাকিস্তানকে একটা বিশেষ উদাহরণ হিসাবে মনে হয় যেখানে নাগরিকদের উপরে তাদের মুসলিম পরিচয়টাকে অনেকটাই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে কেননা দেশটির জন্মই হয়েছিলো ইসলামের নামে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – আপনাকে যদি জোর করেই আপনার নিজের আত্মপরিচয়কে প্রকাশ করতে হয় তাহলে বুঝতে হবে যে হয় আপনার আত্মপরিচয় বিষয়ে আপনি অনিশ্চিত নয়তো নিরাপত্তাহীন। আপনার আত্মপরিচয়কে যদি আপনার দাড়ির মাধ্যমে বা আপনার টিশার্ট এর মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার মাঝে কোনও সিরিয়াস গণ্ডগোল আছে, আপনার খুব দ্রুত মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী। সেই অর্থে বেশীরভাগ পাকিস্তানীরই আসলে চিকিৎসকের সাহায্য নেয়া দরকার।

কিন্তু এটা শুধু পাকিস্তানেরই সমস্যা নয়, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এটা প্রায় সকল জায়গার মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমস্যা। এবং এটা আসলে সাম্প্রতিক সমস্যা, ঐতিহাসিক সমস্যা নয়। মূলত সত্তর দশকের পর থেকে শুরু হয়েছে এই ধরনের প্রপঞ্চগুলো, যখন থেকে একটা বিশেষ ধরনের ইসলামকে নানান ভাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপরে। আর এই বিশেষ ধরনটা হচ্ছে ওয়াহাবিজম, যা ইসলামের একটা বিশেষ ধরন যারা ইসলামের একটি অত্যন্ত প্রাচীনপন্থী বোঝাপড়ার উপরে দাঁড়িয়ে আছে এবং যা অন্যদেরকে সহিষ্ণুতার সাথে গ্রহণ করতে পারেনা। আর এই মতবাদকে অর্থায়ন করেছে সৌদি আরব, হাজার হাজার মসজিদ বানিয়ে দিয়েছে পশ্চিমে, ইসলামাবাদে, দুনিয়ার আরও বহু স্থানে, মাদ্রাসাগুলোতে অর্থায়ন করেছে।

আমাদের ইতিহাসে এটা একটা অদ্ভুদ সময় পার করছি আমরা, যেখানে ইসলামের একটি ধরন, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে যা সবচাইতে সংকীর্ণ, পশ্চাদপদ এবং অস্পস্টবাদী, এই ধারাটিই আতঙ্কজনক ভাবে মূলধারায় পরিণত হয়েছে। এটা যদি চলতে থাকে তাহলে নিশ্চিত ভাবেই আমরা হারিয়ে যাবো, ইসলাম একটা জড় একশিলা বা মনোলিথিক চেতনায় পরিণত হবে, কোনও মনোলিথিক আদর্শই আজকের জটিল, বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবেনা।

 

দ্য নিউজ অন সানডে: আপনার ‘মক্কা’ বইটি তো দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আপনি কি মনে করেন এই বইটি মক্কা’র মতো শহরের আরও রূপান্তর কে বা বদলে যাওয়া থামিয়ে দিতে পারবে?

জিয়াউদ্দিন সরদার – না, তা পারবেনা, শহরটি আমাদের ধারণার অতীত রকমের বদলে গেছে ইতিমধ্যেই। মক্কায় এখন আর কোনও ইতিহাস, ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি নেই। যে পরিবর্তন হয়ে গেছে ওখানে, সেটাকে আর ফেরানো সম্ভব নয়, আমার বইটি কেবলই আমাদের হারানো ইতিহাসের জন্যে এক ধরনের অনুতাপ ও দীর্ঘশ্বাস।

 

 

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top