একুশ শতকে নারী-পুরুষ সম্পর্কের নব মেরুকরণ : প্রাসঙ্গিক আলাপসমূহ

বন্দীত্ব আজীবন দাগ রেখে যায়।তাই নারীবাদে বিশ্বাসী কোন নারী কোন ভুল করবে না, এমন বিশ্বাসও মৌলবাদের পর্যায়ে পড়ে।কারণ নারীর জন্য মুক্ত সমাজের অবকাঠামো নির্মাণ এখনো চলমান,এখনো গন্তব্য বহুদূর। 

 

 

১.
১৭৯২ সালে মেরি ওলস্টোনক্রাফটের(১৭৫৯-১৭৯৭) ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে নারীবাদী তত্ত্বের সূচনাকাল হিসেবে ইতিহাসে বিবেচনা করা হয়।আমাদের এখানে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রথম বিতর্কিত প্রবন্ধ ‘আমাদের অবনতি’ প্রকাশিত হয় ১৯০৪-এ।এই দুটো সময়কালের মধবর্তী পর্যায়ে ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার বিলুপ্তি(১৮২৯) এবং বিধবাবিবাহ প্রথার অনুমোদন(১৮৫৬)সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মতো বড় দুটো ঘটনা ঘটে। যদিও পশ্চিমা দেশগুলোর নারীবাদের ইতিহাসের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই  আমাদের সংগ্রামের  কোন সাযুজ্য পাওয়া যায় না। তাদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল ভোটাধিকার প্রয়োগ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে অধিকারের দাবি নিয়ে। অথচ আমাদের উপমহাদেশে এই দুটো বিষয়েই সরাসরি কখনো নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি, না ধর্মে না সামাজিকভাবে।কিন্তু মজার বিষয় হলো,ভোট দেয়া বা জন্মনিয়ন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নারী তার অভিভাবক পুরুষের ইচ্ছায় পালন করত এবং আজো তাই করে যাচ্ছে।সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতায় এদেশে সরকারের পক্ষেও নারীর উন্নয়নসূচক নারীনীতি ঘোষিত হতে পারে নি।তবুও,নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর বিতর্কে মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারী।রাষ্ট্র এবং প্রশাসন যন্ত্রকে সচল রাখতে স্বাভাবিক ভাবেই নারীকে বিভিন্ন কোটা বা প্রণোদনার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর আজকের নারী ও পুরুষ ক্রমেই মুখোমুখি হচ্ছে পরস্পরের।নারীবাদ সমতার বিশ্বের স্বপ্ন দেখে।তাই নারীর সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের সমস্যাকেও সমানভাবে চিহ্নিত করতে চায় নারীবাদ।বন্ধু-সঙ্গী-প্রতিবেশী-প্রতিদ্বন্দ্বী-সহকর্মী-সহমর্মী হওয়ার সাথে সাথে বাড়ছে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং সংকটও।
আজকের নতুন এই নারী-পুরুষের পদযাত্রা কতটুকু আশ্বাস দেবে আমাদের যৌথ ও নিরাপদ ভবিষ্যত নির্মাণের?নারী ও পুরুষের সম্পর্ক,তাদের দ্বন্দ্ব ও সংকট  প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ভাবনা নিয়ে আজ কথা বলা যাক।
২.
শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা পরিস্থিতি
বাল্যবিয়ে, রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানি,দারিদ্র্যের মতো মৌলিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারী শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য রকম এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৫১ ভাগ ছিল নারী।উচ্চ মাধ্যমিকে কিছুটা কম হলেও মাদ্রাসায় মেয়েদের সংখ্যা ১০ শতাংশ বেশি।শিক্ষার মতো কর্মক্ষেত্রেও অসংখ্য বাধা বিপত্তি নিয়েও নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখই নারী।জিডিপি উন্নয়নের পেছনে পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের অবদান সর্বজনবিদিত। কিন্তু প্রতি বছর তাদের মধ্যে ৮ ভাগ প্রসূতি নারীর মাত্র ৩ ভাগ নারী মাতৃত্বকালীন ছুটি পান। মৌখিক শারীরিক মানসিক নির্যাতনসহ যৌন হয়রানির শিকার হন ৮৫ ভাগ নারী।যাতায়াতের অপ্রতুল ব্যবস্থা,শৌচাগার সংকট,সন্তানের নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের দোটানায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় দেশের অধিকাংশ কর্মজীবী নারীকে।এ ছাড়াও রয়েছে নারীর নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাজনিত(পিরিয়ড,পিএমএস,পোস্ট পার্টাম ব্লুজ) সংকট,যেগুলো এখনো ‘শৌখিন সমস্যা’ হিসেবে পুরুষ সমাজে চিহ্নিত হয়ে থাকে।
এবার ভাবা যাক,অপর পক্ষের কথা।বহুমাত্রিক সমস্যার কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো কর্মক্ষেত্রেও নারীর পিছিয়ে আসার সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্য বটে।প্রতিবন্ধকতাগুলোকে মাথায় রেখেও এ কথা কি বলা যায় যে,আমাদের সমাজের পারিবারিক গঠনের অবকাঠামো এখনো পুরুষ প্রধান। একজন পুরুষকে বেড়ে উঠতে হয় এটা মাথায় রেখে যে সে তার বাবা মায়ের এবং নিজের অর্থাৎ দুটো পরিবারের প্রধান ভরনপোষণকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে।যে চাপ থেকে অনেকাংশে নারী এখনো মুক্ত।সেক্ষেত্রে সহপাঠী বা সহকর্মী হিসেবে একজন পুরুষ কীভাবে নারীকে সমতার লড়াইয়ে সহযোদ্ধা রূপে গ্রহণ করবে?
প্রধান ব্রেড আর্নারের ভূমিকায় পুরুষ প্রচন্ড চাপের মুখে বসবাস করে কিন্তু সে জানে এই ভূমিকা থেকে সরে এলে তার পৌরুষ বা মেল ইগো দ্বারা আধিপত্য বজায় রাখতে পারবে না। তাই সে নীরবে পুরুষতন্ত্রের সিস্টেম দ্বারা শোষিত হয়,বিপরীতে নারীর সম অধিকারের আন্দোলনকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে আর নিজের অজান্তেই বিদ্বেষ পোষণ  করে চলে।
এই বিষয়টিতে নারীর ভূমিকা বা করণীয় কী?এমন তো নয়,যে নারী পরিবারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে না।তার অদৃশ্য শ্রম ছাড়া পরিবার ব্যবস্থাই অচল হয়ে যেতে পারে। রোজগেরে নারীর অর্থও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে পরিবারে।কিন্তু আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গটি সমতার লড়াই নিয়ে।নারীর ইশতেহারে এই বিষয়টি যুক্ত না হলে ক্ষমতায়নের  মূল চাবিকাঠি সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারটি অধরাই থেকে যাবে।
৩.
প্রসঙ্গ  ধর্ষণ এবং বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ 
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে এই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ে প্রচুর সমালোচনা ও বিতর্কের অবতারণা ঘটেছে।
বাংলাদেশে ধর্ষণ প্রসঙ্গটি যতবেশি সমালোচিত,নিন্দার্হ ঠিক ততখানিই বিতর্কিত এই সম্পর্কিত আইন।প্রকৃতপক্ষে, কেবল নারীই নয়, পুরুষের জন্যেও আইনগুলো অসম্পূর্ণ এবং ক্ষেত্র বিশেষে অপমানজনক।
নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ধারা ৯(ক) ব্যাখ্যায় ধর্ষণের সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছে, কোন পুরুষ যদি বিবাহ বন্ধন ব্যতিরেকে ষোল বছরের অধিক বয়সী নারীর সাথে বিনা সম্মতিতে বা  ভীতি প্রদর্শনপূর্বক কিংবা ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়’ করে যৌন সংসর্গ করে তবে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।
অর্থাৎ সম্মতির পেছনে উদ্দেশ্যমূলক প্রতারণাকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে এমন একটি আইন প্রণয়ন করার মতো প্রেক্ষাপট রয়েছে বলেই আইনটি প্রণীত হয়েছিল এবং আজ অবধি তা বহাল তবিয়তে রয়েও গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিয়ে আজো যে শিক্ষিত নারীকে প্রলুব্ধ করতে পারে,সে কেমন শিক্ষা পেয়েছে?
অথচ আজো এদেশে বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটি নারীকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়,এ কথা কে অস্বীকার করতে পারবে?বিশেষত সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যতের আইনগত,সামাজিক ও মানসিক আশ্রয়ের জন্য এখনো পিতৃত্বের বিকল্প সৃষ্টি করা গেছে কি?
আসা যাক,ধর্ষণ প্রসঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে প্রাপ্তবয়স্ক, স্বাবলম্বী নারী স্বেচ্ছায় সম্পর্কিত হলে তা ধর্ষণ হয় কীভাবে? অথচ সম্মতির সম্পর্কেও ধর্ষণ হতে পারে এ কথা বিশ্বাস না করলে ম্যারিটাল রেপকে বর্তমান আইনে সংযুক্ত করার দাবি তোলা যাবে কোন শর্তে?আদৌ কি আমাদের সমাজ বৈবাহিক ধর্ষণকে স্বীকার করে?
আমাদের সমাজ অবকাঠামোতে এখনো নারী তার সংসার ও সন্তানের প্রধান লালনকারী (ভরনপোষণকারী নয়) রূপে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। আর সেজন্যই অগণিত ‘স্বামী পরিত্যক্তা'(‘স্ত্রী পরিত্যক্ত’ বলে কোন শব্দবন্ধ নেই কিন্তু) নারীরা আকাঙ্ক্ষা করে থাকে বেকার, নেশাগ্রস্ত, পঙ্গু হলেও তাদের একজন স্বামী থাকুক, যে-স্বামী তাদের ঘরের ‘ভাঙা দরজা’র মতো দৃষ্টিগ্রাহ্য রক্ষাকবচ হয়ে থাকবে।(আনু মুহাম্মদ)
এইসব পরিস্থিতির কারণেই আজো ভগ্নদশাগ্রস্ত আইনগুলোও বলবৎ রয়েছে। আর আইন থাকলে তার প্রয়োগ কিংবা অপপ্রয়োগও থাকবে স্বাভাবিকভাবেই।
কারণ আইন কাউকে চালিত করে না।সমাজ মনস্তত্ত্ব অনুসারে আইন প্রণয়ন হওয়াটা জরুরি।তাই সবার আগে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
এবার আসা যাক,বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ মামলার ঘটনায় পুরুষ পক্ষের কী পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না,এই আইনটির যথাযথ অপপ্রয়োগ একজন পুরুষকে মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত ভিকটিম করে তুলতে বাধ্য। কারণ পুরুষটি প্রতারিত হলে আইন তার জন্য কোন পথ খোলা রাখেনি।তবে সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়েটেশনের ক্ষেত্রে দেশ ও সমাজের প্রেক্ষিতে এখনো পুরুষের পাল্লাটিই ভারি রয়েছে।
আসলে প্রতারণা, ধর্ষণ কিংবা সেক্সুয়াল এক্সপ্লয়েটেশন সম্পর্কিত আইনগুলো জেন্ডার নির্বিশেষে সম সুযোগ সুবিধার ভিত্তিতে পরিবর্তন করাটা এখন সময়ের দাবি।
৪.
ধর্ষণের শিকার পুরুষ এবং পুরুষ নির্যাতন আইন প্রসঙ্গ
বিয়ে কিংবা প্রেমের প্রলোভনে প্রতারণার মতো পুরুষের ধর্ষণের জন্যেও বাংলাদেশে এখনো পর্যন্ত কোন আইন বলবৎ নেই। মাদ্রাসা সেক্টরে গত কয়েক বছরে আশংকাজনকভাবে নাবালক ধর্ষণ এবং ধর্ষণজনিত হত্যা ও মৃত্যু বৃদ্ধিতে পুরুষ ধর্ষণ প্রসঙ্গটি ব্যাপকভাবে প্রচার পায়।তখন বিভিন্ন আইনজীবী ব্যাখ্যা দেন নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ ধারায় ১৬ বছরের নিচে শিশু বলতে ছেলে ও মেয়ে উভয়কে বোঝানো হয়েছে।আবার দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেয়া আছে সেখানে কেবল যে-কোনো বয়সী নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি। আর যদি ধর্ষণের শিকার পুরুষটির বয়স ১৬ বছরের ওপরে হয় সেক্ষেত্রে সেই নির্যাতনকে ধর্ষণ হিসেবে স্বীকার করবে না রাষ্ট্র। বড়জোর দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় অস্বাভাবিক অপরাধের মামলা করা যাবে।সাধারণত পুরুষটি নিজের মেল ইগো আহত হওয়ার ভয়ে ধর্ষণের বিষয়টি অনবদমিত করে ফেলতে বাধ্য হয়।আর শুধু ধর্ষণই বা কেন,পুরুষ নির্যাতনের অন্যান্য প্রসঙ্গও প্রচলিত কৌতুকের ভঙ্গিমায় হাস্যরসাত্মকভাবে পরিবেশিত হয়ে থাকে।কিন্তু নারীর অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতায়িত নারীর ক্ষমতার অপপ্রয়োগও দেখা দিচ্ছে স্বাভাবিকভাবেই।জানা গেছে, গ্রামেগঞ্জে ধর্ষণ ও যৌতুক বিষয়ক মামলাগুলোর ৮০ ভাগই মিথ্যা মামলা।
প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে কিংবা শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা পেতে যোগসাজশে এই মামলাগুলো দেয়া হয়।কিন্তু তার মানে এই না যে,বাংলাদেশে কেবল ২০১৯ সালে ৫৪০০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যা স্মরণকালের ইতিহাসে ভয়াবহতম রেকর্ড, এগুলো মিথ্যা তথ্য। আসলে সত্যিকার মামলাগুলো অন্ধকারেই চাপা পড়ে যায়,হুমকি আর লোকলজ্জার ভয়ে।অন্যদিকে, পুরুষ নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে পুরুষ নিজেও সোচ্চার হয় না সেই একই কারণে,লোকলজ্জা আর পৌরুষত্বের গৌরব হারাবার ভয়ে।
শিল্প-সাহিত্যে,মাঠের আন্দোলনে,গবেষণায়,মিডিয়ায়  নারীর যৌন নির্যাতনের বিষয়টি যতখানি ফলোআপ হয় (ফলপ্রসূ যতটুকুই হোক না কেন)পুরুষ ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিষয়টি ঠিক ততখানিই অনালোচিত।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ফাঁসি’ গল্পে একজন প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোকের মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে অবশ্য তার স্ত্রীর মনোজাগতিক প্রতিক্রিয়া তুলে ধরাটাই মূল লক্ষ্য ছিল।গল্পের শেষে দেখা যায়,ফাঁসির হাত থেকে বেঁচে আসা স্বামীর স্ত্রীটি পরদিন সকালে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে।তাদের দুজনারই মনোজাগতিক প্রতিক্রিয়া অনুন্মোচিত থেকেই যায়।
তাই কেবল নারীর চোখে বিশ্ব দেখা নয়,পুরুষকেও মুখ খুলতে হবে,নিজেদের মনোবৃত্তি সম্পর্কে। এমনকি সুশীল, শিল্প ভাবনাসমৃদ্ধ, প্রগতিশীল পুরুষদের নির্মল আড্ডাগুলোও কেন ক্রমেই হয়ে ওঠে সংকীর্ণ, নারীবিদ্বেষী, নারীর প্রতি প্রবল ঘৃণার অবদমিত প্রকাশসূচক,কখনো কখনো প্রায় ধর্ষকামী।নিবিড়ভাবে অবলোকন করা প্রয়োজন পুরুষের পুরুষ ‘হয়ে ওঠা’কে।কারণ সাইবার বুলিংয়ে যেসব লক্ষ লক্ষ ফেইক আইডি ব্যবহৃত হয় তারা কেউ অন্য গ্রহ থেকে আসা আগন্তুক না।তারা আমাদেরই মুখোশধারী বন্ধু-প্রতিবেশী-সহকর্মী!
আর শুধু যৌন নিগ্রহের কথাই বা কেন,সম্পর্কিত জীবনের বিপুল মানসিক অবদমিত গ্লানি সম্পর্কে নারী ও পুরুষ — উভয় দিক থেকেই মুক্তকণ্ঠে ট্যাবুর আড়াল ভেঙে কথা বলা হোক।হোক ভাষার উদযাপন। অর্গল খুলে ভেসে যাক সকল সম্পর্কের গায়ে গায়ে লেগে থাকা  বিষের ভাণ্ডার।
৫.
নারীবাদের তত্ত্ব এবং অ্যাকটিভিজম দ্বন্দ্ব 
যে-কোনো মতবাদেরই দুটি দিক থাকে।একটি তত্ত্বীয়,অপরটি প্রায়োগিক বা মাঠকর্ম(field work)।এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে-কোনো মতবাদ বাস্তবায়নের জন্য। অথচ নারীবাদের সঙ্গে সম্ভবত ‘নারী’ বিষয়টি যুক্ত থাকায় এই প্রসঙ্গে যে কোন অযৌক্তিক বিষয়কেও খুব সহজে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলা হয়।কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেন নি,কার্ল মার্কস কেন কৃষকের সাথে গিয়ে মাঠে চাষবাস করেন নি কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কেন দামি চুরুট খান?অথচ নারীবাদের অগ্রযাত্রার পথে এই বিতর্কটিই বারবার উসকে দেয়া হচ্ছে।বিশ্বব্যাপী নারীবাদ একটি চলমান আন্দোলন। কোন দেশই পুরোপুরি শতভাগ নারীমুক্তি অর্জন করে উঠতে পারে নি।সেজন্য তত্ত্বীয় পর্যায়েই এখনো উন্নত দেশগুলোতে প্রচুর গবেষণামূলক কাজ হয়ে চলেছে। সিমোন দ্য বোভোয়া পার হয়ে আজ সেখানে আন্দ্রিয়া ডোওরকিন,রেবেকা ওয়াকাররা নারীবাদের ইতিহাসের তৃতীয় তরঙ্গের সমাপ্তি টেনে আনছেন।আর আমরা তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে কাটাছেঁড়া শেষ হওয়ার পর নতুনভাবে রোকেয়া সাখাওয়াতকে নিয়ে বুলিং আর ট্রোলিং শুরু করেছি।বিস্ময়ের কথা হলো এর পেছনে কেবল মৌলবাদী গোষ্ঠীই দায়ী নয়।
একটা কথা সত্যি, নারীবাদের তত্ত্ব বহুধাবিভক্ত হওয়ার পেছনে দেশ-কাল-পরিবেশ-ধর্ম-আচারের ভিন্নতা এই আন্দোলনকে যৌক্তিক কারণেই বিচিত্র রূপ দেয় এবং দেশভেদে এর ইতিহাসও বদলে যায়।
পশ্চিমা দেশগুলোতে পোশাক,নর-নারীর জৈবিক সম্পর্ক,সন্তানের উত্তরাধিকার,বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদ ইত্যাদি বিষয়ে অনেকখানিই দ্বন্দ্ব – সংকট কাটিয়ে উঠেছে। আর তার পেছনে নারীবাদী আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। (তত্ত্বীয় এবং অ্যাকটিভিজম দু’দিক থেকেই)।
রেবেকা ওয়াকার(১৯৬৯-) নারীবাদের আন্দোলনে অশ্বেতাঙ্গ নারীদের গুরুত্ব প্রদান করতে গিয়ে তৃতীয় তরঙ্গ কথাটা ব্যবহার করেন।কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে নব্বই দশকের নারীরা নারীবাদের তত্ত্বে ব্যক্তিস্বাধীনতা,বৈচিত্র্যময়তা,ইন্টারসেকশনালিটি সংযুক্ত করতে শুরু করেন।কর্মক্ষেত্র ছাড়াও তাদের হার্ডকোর আলোচনার বিষয়গুলো হচ্ছে ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি, তৃতীয় লিঙ্গ,বর্ণবাদ,পিরিয়ড, সমকামিতা ইত্যাদি। মূলত দ্বিতীয় তরঙ্গের সমঝোতাকামী নারীবাদের তত্ত্বগুলো ব্যর্থ হওয়ায় তৃতীয় তরঙ্গের প্রবক্তাগণ ভিন্ন ভিন্ন মতকে নিয়ে সহাবস্থানে প্রস্তুত হয়েছেন।যেমন — পতিতাবৃত্তি বিষয়ে একদল মনে করেন,এটা নারী নির্যাতন ও শোষণের ধারাবাহিক একটি পথ পরিক্রমা। তাদের কোন ভবিষ্যৎ থাকে না। অপর গোষ্ঠী মনে করেন নারীর নিজস্ব যৌনতার ওপর কর্তৃত্বমূলক অবস্থানের জন্য এটি নারীর ক্ষমতায়নেরই অন্য রূপ। নারীর ভবিষ্যৎ নারী নিজেই।
নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পশ্চিমের সংস্কৃতির সাথে আমাদের নারীবাদী আন্দোলনের ইতিহাসের আপাত সাযুজ্য নেই।আমাদের প্রান্তিক নারীরা এখনো খাদ্যের নিয়মিত যোগান,সন্তানের স্বাভাবিক বিকাশ,স্বাস্থ্যের পরিচর্যা, বাসস্থান, পরিবারের প্রতিপালন ইত্যাকার মৌলিক সমস্যাগুলো নিয়েই ধুঁকছে। কিন্তু প্রান্তিক নারীদের সংগ্রামের ইতিহাস লেখা,তাদের জন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে দাবি আদায়ের ইশতেহার তৈরির নীতি প্রণয়ন করা,এমনকি নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তাদের নিয়ে শিল্প সাহিত্যের বিকাশ ঘটাবেন যারা তারাই আবার ‘এলিট’ শিরোনামে বিদ্রুপেরও শিকার হবেন এখানে।
মাও জে দংয়ের উদ্ধৃতি এখানে জরুরি — “বিপ্লবের আগে চীনের পুরুষদের বইতে হতো সামন্তবাদ,পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের তিনটি পর্বত,আর চীনের নারীদের বইতে হতো চারটি — চতুর্থটি পুরুষ।” নারী সর্বদাই দ্বিগুণ শোষিত।তাই শিশু পিঠে বেঁধে নেয়া মাটিকাটা নারীশ্রমিককে দেখিয়ে ‘সত্যিকার নারীমুক্তি’র ভুল ছবিটি যেন আমরা না দেখাই।ঐ নারীটি ঐ জীবনটি স্বেচ্ছায় বেছে নেয় নি।নারীমুক্তির প্রথম শর্ত,নিজ ইচ্ছাকে ইতিবাচক পথে স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপে চালিত করতে পারা।আর তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদ অনুসারে বৈচিত্র্যের সহাবস্থান ঘটাতে পারলে বাংলাদেশে ‘হিজাবি’ এবং ‘এলিট’ নারীবাদ বিষয়ক বিতর্কের আপাত সমাপনে মূল আন্দোলন এগিয়ে যেত গন্তব্যের দিকে।
৬.
নারীর শত্রু বা বন্ধু 
শতকরা নিরানব্বই ক্ষেত্রে গৃহকর্মী কিংবা পুত্রবধূ নির্যাতনে গৃহকর্ত্রী বা শাশুড়ি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।গৃহকর্তা বা শ্বশুর কি অদৃশ্য দেবতা?আসলে উপরের চারজন নারীই পরাশ্রিত, অধীনস্থ — যতই সম্পদশালী হোক না কেন।আজীবন শোষণ অবদমনের পাল্টা প্রতিশোধ নিতে তারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল স্বশ্রেণীকে বেছে নেয়। কর্তৃপক্ষ বা অথরিটির অবস্থানে থাকা পুরুষটি এসব তুচ্ছ বিষয়ে সময় নষ্ট করেন না।তাদের জন্য আছে বাইরের পৃথিবী। তাছাড়া প্রধান ভরনপোষণকারী হিসেবে পরিবারে তারা পূজনীয় দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকেন,যাকে ঘৃণা করা যায়,কিন্তু অবজ্ঞা বা অস্বীকার করা যায় না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজেদের এই কর্তৃত্ব জারি রাখতেই এইসব দ্বন্দ্বকে নারী সমাজের ক্ষুদ্র তুচ্ছ নগণ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে।নতুন সময়ের নারী ও পুরুষ কয়েদী আর কয়েদখানার পাহারাদারের ভূমিকা থেকে মুক্ত হবে,এটাই প্রত্যাশা।
বন্দীত্ব আজীবন দাগ রেখে যায়।তাই নারীবাদে বিশ্বাসী কোন নারী কোন ভুল করবে না, এমন বিশ্বাসও মৌলবাদের পর্যায়ে পড়ে।কারণ নারীর জন্য মুক্ত সমাজের অবকাঠামো নির্মাণ এখনো চলমান,এখনো গন্তব্য বহুদূর।
৭.
নারীবাদ একটি  দর্শন যার মাধ্যমে নির্মিত হবে নারী পুরুষ ট্রান্সজেন্ডার সমেত মানবতার বিশ্ব,সমতাভিত্তিক সমাজ।পথটা অবশ্যই সহজ নয়।কোন শর্টকাট উপায়ও নেই গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। এই দুরূহ পথে চলতে গিয়ে মাথায় রাখতে হবে মৌলবাদ অধ্যুষিত স্বদেশের কথা। দীর্ঘ, সুদূরপ্রসারী যে কোন আন্দোলনে অপশক্তি সর্বদাই তৎপর থাকে সন্দেহ আর বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে।নারীবাদ ঘৃণা, বিদ্বেষ, বৈষম্য থেকে পরিত্রাণ দেবে সকল জেন্ডারভুক্ত মানুষকে,এটাই প্রত্যাশা।আইনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় হয়তো, কিন্তু পারস্পরিক সমঝোতা আর সহমর্মিতা ছাড়া সার্বিক মুক্তি আর কল্যাণ অসম্ভব বৈ কি।

 

 

Rokhsana Chowdhury is a Bangladeshi literary critic, prose writer, translator, and researcher. She wrote a book about the novels of Jibonanodo Dash titled “Jibonanodo Dasher uponnash: bishoybostu o prokoron,” published in 2006. She also completed her Ph.D. research from Dhaka University, focusing on “Reflections of feminist thought in Rokeya Sakhawat Hossain, Humayun Azad and Selina Hossain’s novels.” She is currently an Associate Professor at Government College in Bangladesh.

 

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top