এনিমেল ফার্মের ‘ভূমিকা’ ও বাক স্বাধীনতার প্রসঙ্গ | সহুল আহমদ

0

এনিমেল ফার্ম অরওয়েলের শৈল্পিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে একীভূত করার প্রথম সচেতন প্রয়াস; কথাটা আমার নয়, খোদ জর্জ অরওয়েলই বলেছেন। এই উপন্যাস লেখার চিন্তা তার মাথায় এসেছিল ১৯৩৭ সালের দিকে, এবং ৪৩ এর আগ পর্যন্ত এটা লিখতে পারেন নি। এই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের বাহিনীকে পরাস্ত করতে ব্রিটিশ শক্তি ও সোভিয়েত শক্তি হাতে হাত মিলিয়ে একত্রে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল। ব্রিটিশদের সাথে সোভিয়েতের এই ক্ষণিকের ‘প্রেম’ অরওয়েলের এই ‘সচেতন প্রয়াস’ প্রকাশে নানারূপী বাঁধা হাজির করেছিল। এনিমেল ফার্ম প্রকাশে তাকে যে ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল এবং এমন ঝুটঝামেলা আসলে কোন প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তার এক প্রস্থ বিবরণ তিনি বইয়ের ‘ভূমিকা’য় উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে এই ভূমিকা ছাড়াই এনিমেল ফার্ম প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে, এবং ১৯৭১ এর আগ পর্যন্ত এই ভূমিকার হদিস পাওয়া যায় নি। একাত্তরে মূল পাণ্ডুলিপির সাথে ‘দি ফ্রিডম অব প্রেস’ শিরোনামে এই ভূমিকা পাওয়া যায়, এবং বাহাত্তরে সেটা আলোর মুখ দেখে।

এনিমেল ফার্মের যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন এর কাহিনীর আদল রুশ বিপ্লব এবং বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত আমল (বিশেষত স্ট্যালিনের আমল)। কিন্তু, কৌতূহল জাগানিয়া প্রশ্ন হলো, পুঁজিবাদী ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কেনো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবির সম্পর্কে ‘সমালোচনামূলক’ গ্রন্থ প্রকাশে বাধা দিবে? পাশাপাশি, গ্রন্থ প্রকাশে এই কাঠখড় পোহানো কীভাবে প্রেসের স্বাধীনতা তথা বাক স্বাধীনতাকে মূল প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে? আর, দীর্ঘদিন চোখের আড়ালে পড়ে থাকা এই ‘ভূমিকা’য় আসলে কি বিষয়ে আলাপ রয়েছে? এই বিষয়াদি হালকা বাৎচিত করাটাই আপাতত উদ্দেশ্য। অরওয়েল যখন এই উপন্যাস লিখছিলেন তখন তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে উপন্যাসের স্ট্যালিন-বিরোধিতা এটা প্রকাশে ঝট পাকাতে পারে; অন্তত তার কিছু চিঠিপত্রে এমন আলামতই পাওয়া যায়। তবে, ইতিহাসের প্রহসন হচ্ছে এই, স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনামলকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্য যে গ্রন্থকে এতো বাধা দেয়া হয়েছিল, কয়েকবছর পর স্ট্যালিন বা সোভিয়েত শাসনকে আক্রমণ করার জন্য সেই গ্রন্থকেই ব্যবহার করা হয়।

এনিমেল ফার্ম প্রকাশের জন্য অরওয়েল বেশ কয়েকজন প্রকাশকের সাথে যোগাযোগ করেন, কিন্তু তারা বিভিন্ন ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেন। একজন রাজি হলেও প্রকাশ করবে কি না তা পরামর্শ করার জন্য তৎকালীন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। মোটাদাগে দুটো আপত্তির কথা জানানো হয়। এক, এনিমেল ফার্ম স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা ও স্বৈরাচারদের নিয়ে লিখিত হলেও সোভিয়েত ও স্ট্যালিনের দিকে ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট। তাই, ‘বর্তমান সময়ে’ এটা প্রকাশ করা অনুচিত। দুই, উপন্যাসে কর্তৃত্বপরায়ন গোষ্ঠী হিসেবে শুয়োরদের দেখানো হয়েছে, এতে অনেকেই আঘাতপ্রাপ্ত হবেন, বিশেষ করে সোভিয়েতের শাসক সমাজ।

এই পুরো বিষয়টাকে অরওয়েল একটা খারাপ আলামত হিসেবে দেখছেন। তিনি যুদ্ধাবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে সিকিউরিটি সেন্সরশিপ পর্যন্ত মেনে নেন, কিন্তু বইপত্র-লেখালেখির উপর সরকারের কোনো ধরণের সেন্সরশিপ থাকবে সেটা তিনি একদম সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তার কাছে এর চেয়েও বড়ো বিপদ আসলে অন্যটা। সেই সময়ে সরকারের হস্তক্ষেপ তার কাছে যতটা ভয়ের তার চেয়ে বড়ো ভয় হচ্ছে, প্রকাশক-সম্পাদকরা যেন একধরণের সম্মতিতে পৌঁছে গিয়েছেন কোনটা প্রকাশ করবেন, কোনটা প্রকাশ করবেন না। তারা কি তাহলে শাস্তির ভয়ে আছেন? অরওয়েলের জবাব হচ্ছে, না। তাদের ভয় শাস্তি নয়, তাদের ভয় জনমত। তার কাছে মনে হয়েছে, ব্রিটেনে একজন লেখক বা সাংবাদিককে যত ধরণের শত্রুকে মোকাবিলা করতে হয়, বুদ্ধিবৃত্তিক কাপুরুষতা হচ্ছে সবচাইতে খারাপ শত্রু। এই ‘শত্রু’কে নিয়ে যতটা আলাপ-আলোচনা করা দরকার সেটাও করা হয় না।

অরওয়েল যখন লিখছেন তখন তিনি সরকারী সেন্সরশিপ নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়, বরঞ্চ মিডিয়াপাড়া ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোন লেখা প্রকাশযোগ্য ও কোন লেখা প্রকাশযোগ্য না তা নিয়ে যে একধরণের নীরব সম্মতি তৈরি হয় সেটা নিয়ে বেশি চিন্তিত। অ-জনপ্রিয় চিন্তাকে দমিয়ে রাখা হয়, অস্বস্তিকর তথ্যকে লুকিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এসব করতে কোনো ধরণের সরাসরি সরকারী হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে না। উপরোক্ত ‘নীরব সম্মতি’ ঠিক করে দেয়, কোন ঘটনা লুকানো হবে আর কোন ঘটনা প্রকাশিত হবে। প্রতিটি সময়ে কিছু প্রচলিত ধ্যান-ধারণা-চিন্তা-ভাবনা বিরাজ করে, সাধারণত এর বাইরে তারা যেতে চান না।

নোম চমস্কি এই জমানায় সম্মতি উৎপাদনে মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ও বিস্তৃত আলাপ করেছেন; বিশেষ করে কীভাবে হাল জমানার রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন নিজেদের ফায়দার জন্য মিডিয়া ব্যবহার করে তা দেখিয়েছেন। অরওয়েল চল্লিশ দশকে লেখা তার ‘ভূমিকা’তে এই সংক্রান্ত ইশারা-ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তিনি সরাসরি উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ প্রেস প্রচণ্ড কেন্দ্রীভূত; অল্পকিছু সম্পদশালী ব্যক্তির হাতে সমগ্র সংবাদমাধ্যম বন্দি। সংবাদ মাধ্যমে প্রচার ও প্রসার তাদের ইচ্ছানুযায়ী ঘটে। অবশ্য, নিও-লিবারেল জমানার বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও কর্পোরেশন (বা, সম্পদশালী ব্যক্তি) নিজেদের মধ্যে প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে মিডিয়ার উপর কর্তৃত্ব বিরাজ করে- অরওয়েল এই ভয়াবহ বাস্তবতা দেখে যেতে পারেন নি, কিন্তু কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন। অবশ্য, একটা বিষয় অরওয়েলের চোখ এড়ায়নি: সংবাদ মাধ্যমে বা প্রেসের স্বাধীনতার সাথে বন্ধু/শত্রু রাষ্ট্রের সম্পর্ক। কোনো রাষ্ট্র যদি বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, তাহলে তার কোনো দোষত্রুটি প্রচার করা যাবে না, আর শত্রুরাষ্ট্রের ভালো খবরও প্রকাশিত হবে না। বর্তমান একবাল আহমেদ, চমস্কি এ বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি ও সাক্ষী-সাবুদ হাজির করেছেন আমাদের সামনে, কীভাবে রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র গড়ে উঠার সাথে সংবাদ মাধ্যমের আচার-আচরণ পালটে যায়। অরওয়েলও অনেকটা একইভাবে তার সময়ের এমন বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।

তো, অরওয়েল যখন এনিমেল ফার্ম লিখছেন তখন মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী পাড়ায় কোনটা প্রচলিত বা অর্থোডক্সি ছিল? উত্তর হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রায় সবাই এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের দিলখোলা প্রশংসা করতে হবে। কোনো ধরণের সমালোচনা-পর্যালোচনা করা যাবে না। কোনো তথ্য যদি সোভিয়েত শাসনামল চায় প্রকাশিত না হোক, তাহলে সেটা প্রকাশিত হবে না। অবস্থাটা এমন, সাময়িকী বা বই-পুস্তকে চার্চিলের সমালোচনা করা যাবে, কিন্তু স্ট্যালিনের সমালোচনা করা যাবে না। সোভিয়েত প্রসঙ্গ ছাড়া বাদবাকি সব বিষয়ে ছিল অফুরন্ত বাকস্বাধীনতা। এটা যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। এমন আরো অনেক ‘নিষিদ্ধ’ বিষয় আছে, অরওয়েল সঙ্গত কারণেই এই ভূমিকায় গুরুত্বারোপ করেছেন কেবল সোভিয়েতের প্রতি এমন দিলখোলা মনোভাবের প্রতি। তার কাছে এটা গুরুতর আলামত।

১৯৪১ সালের পর থেকে তৎকালীন বিদ্বৎসমাজ গোগ্রাসে রাশিয়ান প্রোপাগান্ডা গিলেছে। এমনকি রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কোনো কথাই বলা হয়নি। অরওয়েল অনেকগুলো উদাহরণ দিয়েছেন, যেমন বিবিসি রেড-আর্মির ২৫ বছর উদযাপনে ট্রটস্কির নাম পর্যন্ত মুখেই নেয়নি। অরওয়েল বলছেন, কখনো কখনো ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা নিজেরাই সেন্সরশিপ আরোপ করেন, কখনো কখনো বাইরের বিভিন্ন চাপের কারণে করেন। তিনি এই দুটোর মধ্যে ফারাক করেন। তার মতে, সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের প্রায় জাতীয়তাবাদী মনোভাব ছিল। অরওয়েলের লেখালেখির সাথে যাদের হালকা-পাতলা পরিচিত আছেন তারা জানেন যে, তিনি বুদ্ধিজীবীদের কর্মকাণ্ডকে প্রচণ্ড সমালোচনামূলকভাবে বা ক্রিটিক্যালি দেখতেন। একের অধিক জায়গাতে বুদ্ধিজীবীদের বিবিধ সমস্যামূলক প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছেন। ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে তিনি কোনো একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের অন্ধ-আনুগত্যকে জাতীয়তাবাদী মনোভাব বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই ছোট ভূমিকাতেও সে ধরণের ইঙ্গিত দেন। কেবল এই ভূমিকা পড়লে মনে হতে পারে, অরওয়েল বুঝি শুধু সোভিয়েত প্রেমিকদের মধ্যেই এমন প্রবণতা খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু, ‘নোটস অন ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধে এমন অনেকগুলো গোষ্ঠী/দল/ রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করেছেন যেগুলোর প্রতি বুদ্ধিজীবীদের এমন অন্ধ-আনুগত্য বিরাজ করতো।

তাহলে অরওয়েলের প্রশ্ন হচ্ছে, তার বই প্রকাশে বাধা কোথায়? কেউ হয়তো বলবেন, লেখা হয়নি, বাজে লেখা। কিন্তু অরওয়েলের কথা হচ্ছে, প্রতিবছর যেখানে হাজার হাজার পৃষ্ঠার আজে-বাজে বই প্রকাশিত হয়, সেখানে এটা কি আদৌ কোনো যুক্তি? বরং, তিনি নিশ্চিত, স্ট্যালিনকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার জন্যই তার উপর এমন খড়গ নেমে এসেছে। ইংরেজ বুদ্ধিজীবীদের মতে এটা তাদের প্রগতিতে বাধা দিবে।

তো, এই জায়গায় এসে অরওয়েল মূল যে প্রশ্নটা উত্থাপন করেন সেটা হচ্ছে, কোনো মতামত তা যতই অ-জনপ্রিয় হোক, যতই বোকামি হোক, তা কি প্রকাশের অধিকার রাখে কি না? তিনি বলছেন যে, এই প্রশ্নের উত্তরে ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা ইতিবাচক উত্তর দিলেও কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে নেতিবাচক উত্তর দিবেন। অরওয়েলের মতে, যেহেতু একটা সংগঠিত সমাজে আমরা বসবাস করি, বাক স্বাধীনতার কিছু না কিছু সাধারণ সীমানা থাকে। কিন্তু অরওয়েল যেহেতু পশ্চিমা জগতের মানুষ, তিনি উল্লেখ করতে ভুলেন না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা পশ্চিমা সভ্যতার অন্যতম উপাদান। এই স্বাধীনতা না থাকলে পশ্চিমা সংস্কৃতি আদৌ টিকত কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তিনি রোজা লুক্সেমবার্গকে স্মরণ করেন, স্বাধীনতা মানে ভিন্নমতের স্বাধীনতা। ভলতেয়ারকেও স্মরণ করেন, তোমার মতের সাথে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার সে মত প্রকাশের জন্য জান দিতে রাজি আছি। অরওয়েল বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা লিবারেল চিন্তকদের সাথে পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ (বলা যায়, আমজনতা) অস্পষ্টভাবে হলেও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে নেন। অথচ, যাদের স্বাধীনতার রক্ষক হওয়ার কথা ছিল সেই বুদ্ধিজীবীরা তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জায়গাতে সেটা তুচ্ছ ভাবা শুরু করেছেন।

এগুলো তার কাছে কর্তৃত্বপরায়নের নমুনা। যারা কিছুটা ভালোর জন্য কর্তৃত্বপরায়ন ব্যবস্থা বা পদ্ধতি ব্যবহারের কথা বলেন অরওয়েল তাদের সমালোচনা করেন। তারা বুঝেন না, যে কর্তৃত্বপরায়ন পদ্ধতির পক্ষে আজকে তারা ওকালতি করছেন কাল সেগুলো তাদের দিকেই ফিরে আসবে। তিনি মনে করেন, সহনশীলতা ও পরিমিতিবোধ ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথিত, কিন্তু তাই বলে এগুলো অবিনাশী নয়। সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে এগুলোকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কর্তৃত্বপরায়ন মতাদর্শ সেই সহজাত প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে ফেলে যেগুলোর মাধ্যমে মুক্ত মানুষ কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ সে সিদ্ধান্ত নেয়। ভূমিকার বিভিন্ন জায়গায় এই বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক বহু উদাহরণ দিয়েছেন।

বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সাথে অরওয়েল পরিচিত। বাক বা চিন্তার স্বাধীনতা সম্ভব না, বা দেয়া উচিৎ নয় – এমন দাবি তাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি, বরং তিনি মনে করেন গত কয়েকশত বছরের পশ্চিমা সভ্যতার সংগ্রাম আসলে বিপরীত ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৎকালীন যুদ্ধে সোভিয়েত রাশিয়া তাদের মিত্রপক্ষ এবং তিনিও মনে প্রাণে চান সে যুদ্ধে তারা জয়ী হোন, তবু তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বিদ্যমান সোভিয়েত শাসনব্যবস্থা একটা শয়তানি ব্যবস্থা, এবং আমি এটা বলার অধিকার রাখি।’ তার মতে, কোনো অবস্থাতেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতায় কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। স্বাধীনতা শব্দ যদি কিছু বুঝিয়ে থাকে, তাহলে সেটা হচ্ছে লোক যা শুনতে চায় না তা বলার অধিকার। তিনি বলেন, [তৎকালীন ব্রিটেনে] ইংরেজ স্বাধীনতাকামীরা বা লিবারেলরাই স্বাধীনতাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছেন, এবং বুদ্ধিজীবীরাই বুদ্ধিজীবীতায় সবচেয়ে বেশি ময়লা ফেলছেন। এই অনালোচিত প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার ‘ভূমিকা’ লেখার মূল উদ্দেশ্য, একেবারে শেষে অরওয়েল এই ঘোষণা দেন।

অরওয়েলের প্রবন্ধ বা উপন্যাসের বিষয়বস্তুর সাথে নিজেদের ডিস্টোপিয়ান পরিস্থিতিকে মেলাতে মোটেও কাঠখড় পোহাতে হয় না। এনিমেল ফার্ম যতই স্ট্যালিন-বিরোধিতায় ভরপুর থাকুক না কেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না অরওয়েল সেখানে আসলে কর্তৃত্বপরায়ন ব্যবস্থার গলদকেই তুলে ধরেছেন। কীভাবে একটা বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে, কীভাবে কর্তৃত্বপরায়নের সূচনা ঘটতে পারে তা যে কোনো অমনোযোগী পাঠকও ধরতে পারবেন। বহু দিন আগে [স্থান, কাল, পাত্র মনে পড়ছে না] একটা প্রতিবেদনে পড়েছিলাম, বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে অরওয়েল নাকি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। আমাদের এখানেও কি তাই? আমার এই অরওয়েল নিয়ে লেখাটা কি এই কারণেই? উপরওয়ালা ভালো জানেন। তবে, এটা নিশ্চিত যে, অরওয়েল বাক স্বাধীনতা নিয়ে যে আলাপ করেছেন তা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বেশ খানিকটা মিলে যায়। আমাদের বিদ্বৎসমাজে কিছু কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে যে অদ্ভুত নীরবতা লক্ষ্য করা যায় তা কে না জানে? তার কিছুটা সরাসরি রাষ্ট্র/সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে, আর কিছুটা বিষয়ের প্রতি জাতীয়তাবাদী আনুগত্যের ফলে। এই জাতীয়তাবাদী আনুগত্য বাক স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বাধীনতায় বাধা প্রদান করে। সেই ‘আনুগত্য’ ও ‘নির্বাচিত আবেগ’ দিয়ে ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’র নির্মাণ করতে চায়। কোনটা আলাপযোগ্য বা প্রকাশযোগ্য বিষয় তা নিয়ে একধরণের ঐক্যমত্য তৈরি হয়ে আছে। এই বাস্তবতার বাসিন্দারা ঠিকই এমন ‘নীরবতা’র গন্ধ পেয়ে যান।

আজকাল স্বপ্নেও অরওয়েলের অস্তিত্ব খুঁজে পাই। এগুলো কিসের আলামত?

Sohul Ahmed, activist and author. Topics of interest are politics, history, liberation war and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »