ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ও সময়ের রাজনীতি

Share this:

সামাজিক অবস্থানকে বিশ্লেষণ, অগ্রগতি ও সঙ্কটসমূহের সাথে বোঝাপড়া ও দিকনির্দেশনার জন্য সামাজিক বিজ্ঞানে সময় বিষয়টির খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। একে বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এমিল ডুর্খেইম সময়কে স্থান, কারণ এবং সংখ্যার মতো মানব চিন্তার একটি মৌলিক ক্যাটাগরি হিসেবে বিবেচনা করতেন। তিনি সময় সম্পর্কিত সচেতনতা সমাজ থেকে উৎসারিত হিসেবে চিহ্নিত করেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সময়ের মধ্যে একটি অবস্থান রয়েছে। সময়ের বাইরে এগুলোর অস্তিত্ব নেই। সামাজিক অবস্থানের বিভিন্ন পরিবর্তন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা সময়কে অনুভব করে থাকি। আবার সময়ের মাধ্যমে এসব পরিবর্তনকে নির্ধারণ করা হয়।

ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ইতিহাস ও মার্কসবাদের পর্যালোচনায় সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বেনেডিক্ট এন্ডারসন, ইয়ুর্গেন হাবারমাস সহ অনেকেই বেঞ্জামিনের সময় সম্পর্কিত চিন্তাভাবনাকে বৈচিত্রভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নিজেদের তত্ত্বচিন্তায় ব্যবহার করেছেন। সময় বিষয়টির রাজনৈতিক হয়ে ওঠার একটি পর্যালোচনা হাজির করা হয়েছে এ প্রবন্ধে। আধুনিকতার জ্ঞানভাষ্যের বিকাশের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে শুরু করে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের চেতনার মধ্যে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাটাগরি হিসেবে অবস্থান করছে।

 

সময়ের রাজনীতি

মানুষ সবসময় তার ব্যক্তিক বা সামাজিক  ঘটনাসমূহের মধ্যে স্থানকালকে নির্দেশ করে থাকে। যেহেতু ভূ-রাজনীতি অর্থাৎ স্থানের রাজনীতি রয়েছে এবং তার একটি অন্তর্নিহিত গুরুত্ব রয়েছে তাই সময়ের রাজনীতিও গুরুত্ব বহন করে। সময়ের রাজনীতির মধ্যে এমন এক সময় উপস্থিত থাকে  যাকে ‘রাজনীতি দ্বারা পূর্বানুমান করা হয়।’ রাজনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম উৎস হচ্ছে সময়। রাজনীতি, সময়ের প্রবাহমানতার মধ্যে পরিবর্তন এবং তার স্থবিরতার চালচলন নিয়ে কাজ করে। কোন স্থানের কার্যাবলীর জন্য নতুন দিকনির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে বর্তমান সময় দ্বারা পরিপূর্ণ হয়। এই বর্তমান সময় হচ্ছে অতীত বা ভবিষ্যতের প্রতি পর্যালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনের সূচনা বিন্দু।

এক্ষেত্রে বেঞ্জামিনের সময়ের রাজনীতি সম্পর্কিত ধারণা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইতিহাসবাদ থেকে বিযুক্ত হয়ে রাজনৈতিক সংহতি ও গতিশীলতার কথা বলে। এটি অপেক্ষমাণ সময় ও তাৎক্ষণিক সময়ের ব্যাপারে সচেতনতা গ্রহণ করে। অপেক্ষমাণ সময় ঘটনাসমূহের  ধারাবাহিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা প্রদান করেনা। এটি আমাদেরকে কখনো কখনো অচিন্তিনীয় সময়ের দিকে নিয়ে যায়৷  অর্থাৎ অতীত এবং বর্তমান দ্বারা সব সময় ভবিষ্যত নির্ধারিত হয়না। কোভিড-১৯-এর মতো একটি মহামারী সম্পর্কে  ভবিষ্যদ্বাণী করা হলেও কেউ কল্পনা করেনি যে একটি ভাইরাস অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে হাজির হবে। এটি উচ্চ প্রযুক্তি, ভ্রমণ,  শারীরিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম মতো কাঙ্ক্ষিত চলমানতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। এটি হচ্ছে একটি সময়ের মধ্যে আরেকটি সময় বিরতি। আর এভাবে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের ঘটনার মধ্যে বেঞ্জামিনের ‘নাউ-টাইম’ উপস্থিত হয়। নাউ-টাইমের ভিতর দিয়েই অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোকে পর্যবেক্ষণ বা নির্মাণ করা হয়।  সময় নির্ভর ক্ষমতা গঠনের মাধ্যমে প্রত্যেক সময়ের রাজনীতি  তার আকার প্রদান করে।

সময়ের রাজনীতি ক্ষেত্রে সময়ের সমাপ্তি বা শেষ সময় সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা একটি সর্বাত্মকবাদী অবস্থান দখল করে আছে। ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধারার সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনায় এর উপস্থিতি প্রকট এবং প্রভাবশালী। ধ্রুপদী মার্কসবাদের পাশাপাশি ফ্রান্সিস ফুকোয়ামার মতো তথাকথিত উদারবাদী রাজনৈতিক চিন্তকদের অর্ন্তদৃষ্টিও এর অন্তর্ভুক্ত।

 

সময়ের সচেতনতা ও আধুনিকতা

ইয়ুর্গেন হাবারমাস তার আধুনিকতা সম্পর্কিত দার্শনিক ডিসকোর্সের মধ্যে আধুনিকতাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যা সার্বিক সময় ও যুগকে ধারণ করে। যেখানে উত্তরাধুনিক সময় বা কালের কোন অবস্থান নেই। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে প্রথমত ‘আধুনিকতা’ শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। হাবারমাসের মতে এটি ব্যবহারের লক্ষ্য ছিলো প্যাগান এবং রোমান অতীত থেকে বর্তমান খ্রিস্টান ইউরোপের অবস্থানের মধ্যে ফারাক তৈরি করা।হাবারমাস রেনেসাঁস, আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্ট এই তিনটি বিষয়কে ভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেন। আধুনিকতা বর্তমানের এমন এক সচেতনতা যা তার ধ্রুপদী অতীত থেকে স্থানচ্যুত হয়ে নতুন এক রূপ লাভ করে। এই অর্থে আধুনিকতা রেনেসাঁস থেকে ভিন্ন, কেননা আধুনিকতা হচ্ছে পুরাতন থেকে নতুনে উত্তরণ, অন্যদিকে রেনেসাঁস হচ্ছে অতীতে ফিরে যাওয়া। আধুনিকতার এই উত্তরণের মধ্য দিয়ে এটি অতীতের সাথে ‘ধ্বংসাত্মক’ ও ‘গঠনমূলক’ এই দুই ধরণের সম্পর্ক তৈরি করে। আধুনিকতা নিজেকে ‘ভবিষ্যতের দিকে উন্মুক্ত’ করার মধ্য দিয়ে অতীত থেকে নিজেকে পৃথক করে। এটি একটি নতুনের সূচনা।

আধুনিকতাকে হেগেল আত্ম-উপলব্ধি ও আত্ম-সম্পর্কের  কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন যাকে তিনি ‘সাবজেক্টিভিটি’ হিসেবে অভিহিত করেন। হাবারমাসের মতে এ ‘সাবজেক্টিভিটির’ প্রধানত চারটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে ; ক)ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য; খ)সমালোচনার অধিকার; গ)কার্যকলাপের স্বায়ত্তশাসন; ঘ)আদর্শবাদী দর্শন।এই সাবজেক্টিভিটির নীতিগুলো রিফর্মেশন ও এনলাইটেনমেন্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। আধুনিকতা হচ্ছে সময় সচেতনতার সম্পর্কিত মনোভাব। যে মনোভাব তার সমসাময়িক বাস্তবতার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। বোদলেয়ারের বরাত দিয়ে মিশেল ফুকো আধুনিকতার মনোভাবকে বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিকতার মনোভাব হচ্ছে ‘সময়ের সাথে ক্ষান্তি, ঐতিহ্যের সাথে বিচ্ছেদ, নতুনত্বের অনুভূতি।’ আধুনিকতার মনোভাব নিজেকে চিরস্থায়ী করে রাখতে পারেনা। বোদলেয়ারের ভাষায় ‘এটি তুচ্ছ,ক্ষণস্থায়ী ও আকস্মিক বিষয়।’

হাবারমাসের মতে আধুনিকতা বিষয়টি সময় সম্পর্কিত সচেতনতা যা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের “Theses on the Philosophy of History” লেখায় হাজির রয়েছে। যে লেখার মধ্যে বেঞ্জামিন ‘উদ্ভাবনী বর্তমানের খাঁটি মুহূর্তকে’ উপস্থাপন করেছেন। আমাদের সচেতনতা সময়ের মধ্যে অবস্থান করে, আবার সময় বা সাময়িকতাকে চেতনার মধ্যে দিয়ে বহিঃপ্রকাশ করা হয়। এই সচেতনতা নতুন এক মুহূর্ত যা তার সময়ের সঙ্কসটসমূহের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে। এই সম্পর্কেই মধ্য দিয়েই আধুনিকতা তার জায়গা তৈরি করে নেয় এবং সমাজের মধ্যে মূর্তরূপে হাজির হয়। আধুনিকতার যে অভিজ্ঞতা ও সচেতনা রয়েছে এগুলো তার পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন। এই পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীকালের যে বিচ্ছিন্নতা তা সময়ের মধ্য দিয়ে বহন করে।  অর্থাৎ সময় নিজেই সচেতনতা ও পরিবর্তনকে অনুমোদন করে যার মাধ্যমে তার সময়ের প্রবাহমানতা বজায় থাকে। আধুনিকতার সাথে ইতিহাস ও অতীতের যে বিযুক্তি তা ইতিহাস বিরোধী নয়।  হাবারমাসের মতে বেঞ্জামিন তার ইতিহাসের দর্শনের মাধ্যমে মূলত ইতিহাসের সাথে আধুনিকতার ‘ইতিহাসোত্তর’ দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করতে চেয়েছেন। কেননা ইতিহাস আমাদের নিকট পূর্ণাঙ্গভাবে হাজির হয়না বলে ঐতিহাসিক বিরতি ও অনৈক্য হচ্ছে বেঞ্জামিনের ক্রিটিকের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

 

আমাদের ও তাদের সময়ের আধুনিকতার রাজনৈতিক  দ্যোতনা

উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সময়ের বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে কাজ করেছে। স্থানকালের বিবেচনায় প্রাচ্য, পাশ্চাত্য থেকে পিছিয়ে রয়েছে, এটি ছিলো পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপন। অপর এবং অপরায়ণের বিষয়টি ঔপনিবেশিক সময়, ইতিহাস এবং পরিচয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিলো। এটি যেনো সময়ের সাথে এগিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে থাকা দাস মনিবের দ্বান্দ্বিকতার সম্পর্ক। ‘সভ্যতার ইতিহাস একই সময় বর্বতার ইতিহাস,’ বেঞ্জামিনের এই উক্তিটির তাৎপর্য এর মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসনামলে উপনিবেশিতরা শুধুমাত্র জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে নয় বরং সত্তাগতভাবেও হয়ে ওঠতে সক্ষম ছিলোনা বলে বিবেচনা করা হতো। আধুনিক হওয়া ক্ষেত্রে প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের নিকট স্থানকালের বিবেচনা খুবই সঙ্গতভাবে উপস্থিত ছিলো। ঔপনিবেশিক শাসনামলে স্থানের মতো সময়ও ক্ষমতাসম্পর্ক নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। এটি গড়ে ওঠে সার্বজনীন ইতিহাস ও সময়ের ধারণাকে কেন্দ্র করে। বেঞ্জামিনের মতে ইতিহাসবাদ এই সার্বজনীন ইতিহাসকে যথার্থভাবে ‘সর্বোচ্চ চূড়ায়’ নিয়ে পৌঁছিয়েছে। দিপেশ চক্রবর্তী তার Provincializing Europe বইতে এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখা বিশ্লেষণ করেছেন।

ইতিহাসবাদের মাধ্যমে প্রগতি বা অগ্রগতির বিষয়টিকে পাশ্চাত্যের একক ঐতিহাসিক মূল্যবোধে পরিণত করা হয়। দীপেশ চক্রবর্তী ইতিহাসবাদকে  “ইতিহাস সম্পর্কে চিন্তা করার একটি পদ্ধতি” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে “কেউ ধরে নেয় যে তদন্তাধীন কোনো বস্তু তার অস্তিত্ব জুড়ে ধারণার একতা বজায় রাখে এবং ধর্মনিরপেক্ষ, ঐতিহাসিক সময়ের বিকাশের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ অভিব্যক্তি অর্জন করে।”১০ ইতিহাসবাদ বিশ্বাস করে যে কোনকিছু আসলে সময়ের সাথে বিকাশ ঘটে।  একইভাবে মার্কসের উন্নয়ন ও প্রগতির ধারণার মধ্যে  ইতিহাসের সরলরৈখিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মার্কস পুঁজির বিকাশকে ইতিহাসবাদের আলোকে দেখেছিলেন যা ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অংশ। মার্ক্সের মতে, “যে দেশ শিল্পগতভাবে বেশি উন্নত, সে দেশই কেবল স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে তার ভবিষ্যতের উন্নয়নের পথ দেখায়।”১১ভারত সম্পর্কে মার্ক্সের ধারণায় ইউরোপীয় ইতিহাস বিশ্লেষণ পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ছিল তাঁর দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি মন্তব্য করেছিলেন “আমাদের পদ্ধতিটি সেই মূহুর্তকে নির্দেশ করে যেখানে ঐতিহাসিক অনুসন্ধান পদ্ধতিকে অবশ্যই প্রবেশ করতে হবে।”১২ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার মতে, পশ্চিমের ‘সর্বজনীন ইতিহাস’ সম্পর্কিত ধারণাটি এসেছে খ্রিস্টান ঐতিহ্য থেকে। এবং এটি অবশ্যই গ্রীক ঐতিহ্য থেকে ভিন্ন। পশ্চিমের ‘সেক্যুলার’ ধারণার বিপরীতে গ্রীক দার্শনিকদের কাছে ইতিহাস ছিল একটি ‘চক্রাকার’ ধারণা। পাশ্চাত্য ইতিহাসবাদের মধ্যে রয়েছে ‘সসীম সময়’ ‘শুরুর মুহূর্ত’ এবং ‘পরিত্রাণের মাধ্যমে সমাপ্তি।’১৩ যেমন কান্ট মনে করতেন ”বিশ্বের ইতিহাস স্বাধীনতার চেতনার অগ্রগতি ছাড়া আর কিছুই নয়।”

ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা তার ‘ইতিহাসে সমাপ্তির’ ডিসকোর্সটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য রৈখিক  ঐতিহাসিক সময়ের ধারণাটি ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে ফুকুয়ামা হেগেলের চিন্তাধারাকে তার প্রস্তাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। হেগেলের অন্তর্দৃষ্টি ছিল যে ইতিহাস শেষ হবে একটি ‘মুক্ত সমাজের অর্জনের মাধ্যমে।’১৪ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ফুকুয়ামা পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজকে মানব সমাজের চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফুকুয়ামার ইতিহাসের সমাপ্তি মানে লিবারেল পুঁজিবাদকেন্দ্রিক সমাজের বাইরে কোন বিকল্প নেই।

ইতিহাসবাদ যে প্রগতির কথা বলে তা ক্রমিক স্থর বা পর্যায়ে বিন্যস্ত। উপনিবেশ বিকাশের সবোর্চ্চ স্থরে পাশ্চাত্য যে সময়ের মধ্যে বাস করত তাকে প্রাচ্যের জন্য সেই সময়কে তখন উপযুক্ত মনে করা হতো না। জেমস মিল যেমন মনে করতেন স্ব-শাসনের ব্যাপারে আফ্রিকা অথবা এশিয়ার লোকেরা সময়োপযোগী হয়ে ওঠেনি। তারা তখন পর্যন্ত নিজেদের স্ব-শাসন করার  মতো ‘পর্যাপ্ত সভ্য’ হয়ে ওঠেনি।১৫

ইতিহাসবাদ ইতিহাসের বিকাশের ধারণাকে এমনভাবে তৈরি করে যেখানে ইউরোপ হচ্ছে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে এবং তারপরে অন্যরা। পশ্চিমের ইতিহাসের এই দর্শন নিজেকে সমাজের বিবর্তনের নির্দিষ্ট একক পথে সীমাবদ্ধ করে। এবং উপনিবেশায়ন কাঠামবদ্ধভাবে উপনিবেশিতদের জন্য এই চিন্তা উপস্থাপন করে। সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন সমগ্র পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্ব, উপনিবেশের মাধ্যমে, প্রাচ্যের জন্য তার মূল্যবোধ হিসেবে  প্রশ্নাতীতভাবে প্রয়োগ করে। ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বের ধারাবাহিকতা আমাদেরকে তাদের মত হওয়ার জন্য একটি ”ইতিহাসের বিশ্রামাগারের” কথা বলে দেয়। যেখানে বসে আমরা আমাদের উন্নয়নের জন্য অপেক্ষা করছি, যা অবশ্যই পুঁজিকেন্দ্রিক উন্নয়ন। ক্রমাগত সময়ের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে অনুকরণের মাধ্যমে এই উন্নয়ন ঘটবে। তবে উপনিবেশ বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহ এই ধরনের ইতিহাসবাদকে উপেক্ষা করেই বিকশিত হয়।

 

বেঞ্জামিনের  নাউ-টাইম

ওয়াল্টার বেঞ্জামিন এমন একজন মার্কসবাদী চিন্তক যাকে হানা আরেন্ট মার্কসবাদী চিন্তকদের মধ্যে সবচেয়ে ‘অদ্ভুত’ চিন্তক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।১৬  বেঞ্জামিন মার্কসবাদের পাশাপাশি ইহুদি মিস্টিক ঐতিহ্যকেও তার তত্ত্বচিন্তার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তিনি এমন একজন মার্কসবাদী যিনি মাসিয়াহ-এর জন্য অপেক্ষা করছেন। একইসাথে  তার চিন্তায় ব্রেখটের বস্তুবাদ এবং তার বন্ধু সোলেমের গুপ্ত ইহুদিবাদের টানাপোড়ন রয়েছে। তবে তিনি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রেখেছেন।  এজন্য তার বন্ধু সোলেম ফিলিস্তিনে বসবাসের আমন্ত্রণ জানালেও তিনি কখনো তা গ্রহণ করেননি। তিনি খ্রিস্টান ঐতিহ্যের মানবমুক্তি সম্পর্কিত নবুওয়তী (prophetic)  ধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন যেটিকে বিভিন্ন সমাজতত্ত্বের মাধ্যমে পরবর্তীতে সেক্যুলার রূপ দেওয়া হয়েছে। নাৎসিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক গণনন্ত্রের মধ্যে যে প্রগতির ধারণা ছিলো এর সাথে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের যে সম্পর্ক রয়েছে তাকে বেঞ্জামিন পুননির্মাণ করতে চেয়েছেন। এজন্য ইহুদি ধর্মতত্ত্বের চিন্তাভাবনাকে তিনি সামনে নিয়ে এসেছেন। কেননা ইহুদি ধর্মতত্ত্বে মানবমুক্তি ও সময়ের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ওয়াল্টার বেঞ্জামিন মার্কসবাদী ইতিহাসবাদকে বুঝতে চেয়েছেন  নাউ-টাইম এর পরিপ্রেক্ষিতে। এটি নতুনত্ব ও সৃজনশীল মূহুর্তের উপর জোর দেয়। সামাজিক প্রপঞ্চসমূহের মধ্যে সময়কে রৈখিক অথবা চক্রাকারে উপস্থাপনের যে অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে বেঞ্জামিন তার চিন্তার মাধ্যমে একে অতিক্রম করেছেন। বেঞ্জামিন তার নাউ-টাইমকে দার্শনিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্যাটাগরি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বেঞ্জামিন ইতিহাসকে নাউ-টাইম দ্বারা পরিপূর্ণ এক সময় হিসেবে বিবেচনা করতেন যা ‘সমজাতীয়’ অথবা ‘শূন্য সময়’ নয়।১৭ বেঞ্জামিনের নাউ-টাইম উপরই তার ইতিহাসের দর্শন নির্ভরশীল।

বিষয় এবং কর্তার সচেতনতার নির্মাতা হচ্ছে বর্তমান। সময়ের বাস্তব উপস্থিতি থাকে বর্তমানের মধ্যে এবং অতীত বা ভবিষ্যতকে আমরা বর্তমানের একটি গঠন আকারে দেখি। বর্তমানই হচ্ছে প্রধানতম বাস্তবতা। এখানে বর্তমানতা কতগুলো সামাজিক ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রবাহমান। ঘটনা, চিত্র, চিন্তা এবং স্মৃতি এসব নিয়েই সমসাময়িক সময় গঠিত। সব সময় বা কালের বাস্তবতা রৈখিকভাবে সামাজিক ঘটনাসমূহকে প্রভাবিত বা নির্ধারিত করেনা। রৈখিক সময়ের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে অনাগত ভবিষ্যতের মধ্যে প্রতিস্থাপন করা হয়। যার ফলে এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষা একটি আধ্যাত্মিক মানবমুক্তির কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়। এজন্য ইতিহাসবাদ দ্বারা প্রভাবিত ধ্রুপদী মার্কসবাদের ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে বেঞ্জামিন  ‘ধর্মতাত্ত্বিক’ আদর্শের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।১৮ ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মধ্যে যে ইতিহাসের সময় রয়েছে তা অবদমিত শ্রেণীর মধ্যে রৈখিক প্রগতির মিথ্যা প্রভাব তৈরি করে।

বিপ্লব বা বিবর্তন কোনকিছুই রৈখিকভাবে অতীত বা ভবিষ্যতের হাত ধরে আসেনা বরং তা নাউ-টাইমের প্রেক্ষিতেই সব কালে ঘটে থাকে। কালিক দ্রষ্টার মতো বিপ্লবের ক্ষেত্রে বেঞ্জামিন ভবিষ্যত বা বর্তমান কোন কালের কথা বলেননি৷ বরং তিনি ইতিহাসকে নাউ-টাইমের মধ্য দিয়ে মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিবর্তনে মূহুর্তকে উপলব্ধি করতে চেয়েছেন। তার দৃষ্টিতে বিপ্লব কোন বিরামহীন ঘটনা নয় বরং তা জরুরি বিরতিতে  আবির্ভূত হওয়ার ঘটনা। তাই আধিপত্যকে প্রতিরোধ করতে হয় প্রত্যেক  কালের জরুরি অবতরণের নিরিখেই। রৈখিক সময়ের ধারণার মাধ্যমে ধ্রুপদী মার্কসবাদী যে প্রগতিশীলতাকে কাঠামোবদ্ধ করেন তা আধিপত্যকে যথাযথভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম নয়। ইতিহাসের একক প্রবাহমানতাকে এড়িয়ে; বেঞ্জামিনের প্রগতি সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার মধ্যে সময়ের কোন ধারাবাহিকতা নেই বরং  তিনি একে ভিন্নভাবে হাজির করেন। তার মতে প্রগতি বিষয়টি ‘অতিবাহিত সময়ের ধারাবাহিকতার উপর ভিত্তি করে নয় বরং তার উপর হস্তক্ষেপের ভিত্তিতে’ পরিচালিত হয়।১৯ অর্থাৎ সামাজিক অগ্রগতি  মূহুর্তসমূহের ধারাবাহিকতা মেনে পরিচালিত হয়না। এই ধারাবাহিকতা উপস্থিতকে বেঞ্জামিন ‘সমজাতীয় শূন্য সময়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। হাবারমাসের মতে এই সময়টি বেঞ্জামিন কথিত ‘একগুঁয়ে প্রগতির বিশ্বাস’ দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে।২০ঐতিহাসিক সময়কে যখন শুধুমাত্র একটি প্রক্রিয়া হিসেবে আবিষ্কার করা হয় তখন এটি তার গতিশীলতা লাভ করে। এই গতিশীলতা একটি সমজাতীয় সময়ের রূপ লাভ করে। এজন্য বেঞ্জামিন ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াকে সাংস্কৃতিক, সভ্য এবং একইসাথে বর্বরতার রূপ হিসেবে দেখেছেন।

ধ্রুপদী মার্কসবাদে যে প্রগতির ধারণা রয়েছে তা মানব মুক্তির জটিলতাকে বর্তমান স্থানকালের আলোকে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হয়না। এটি রাজনৈতিক সংকটকসমূহকে অসীম সময়ের ভিতর থাকা জটিল প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করে। অর্থাৎ এর অন্তর্দৃষ্টি মাধ্যমে রাজনৈতিক জটিলতা ও অন্যায্যতাকে নিরন্তর ও ধারাবাহিকভাবে বহমান থাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। তাই বেঞ্জামিন তার সময়ের ধারণার মধ্য দিয়ে চলমান সব ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার সম্পর্ককে মোকাবিলা করার দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। যেটি চলমান বা সসীম সময়ের মধ্যেই একটি মুক্তিকামী সামাজিক বিন্যাস নির্মাণে সক্ষম। এটি হিস্টোরিসিজমের মতো আরোপিত বা পূর্বনির্ধারিত সময় নয়। অতীতের মধ্যে থেকে ভবিষ্যতকে পর্যালোচন,  বর্তমান সময়ের সঙ্কটসমূহকে জটিল করে তুলে। আমাদের সময় যেসব সামাজিক জটিলতা রয়েছে তা সমাধানে নাউ-টাইমের মধ্য  ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হাজির করাই বেঞ্জামিনের লক্ষ্য। এটি হচ্ছে বর্তমান সময়ের সাথে পর্যবেক্ষণমূলক বোঝাপড়া বা যোগাযোগ। অতীত বা বর্তমানের ঘটনাকে ভবিষ্যতের জন্য না জমিয়ে  বর্তমানে তা সম্ভবপর করে তোলাই হচ্ছে এর লক্ষ্য।

হিস্টোরিসিজম সর্বদা আরোপিত সময়ের মধ্য দিয়ে নিজেকে বহন করে। এ ধরণের প্রক্রিয়া একধরণের উদ্দেশ্যবাদী চিন্তার চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। বেঞ্জামিনের মূল লক্ষ্য ছিলো মার্কসের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে হিস্টোরিসিজম ও সরলরৈখিক প্রগতির আধিপত্যশীল ধারণা থেকে দূরে রাখা। বেঞ্জামিন ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নিজস্ব পাঠের প্রস্তাব করেছিলেন, যার ফলে মার্কসবাদের একটি আমূল সংশোধন হয়। বেঞ্জামিনের বিশ্লেষণে ইতিহাস বিষয়য়টি ভবিষ্যতের দিকে নির্দেশিত “সমজাতীয়, শূন্য সময়ের” প্রগতিশীল প্রবাহের উপর ভিত্তি করে নয় বরং বর্তমান এবং অতীতের একটি বিঘ্নিত মূহুর্তের উপর ভিত্তি করে। অতীত শুধু শেষ হয়ে যায় না; কারণ এটি কখনো সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক হতে পারে না। অতীত পরিপূর্ণভাবে আমাদের সামনে হাজির হয়না। বেঞ্জামিন ইতিহাসবাদকে আক্রমণ করেন কারণ এর লক্ষ্য হচ্ছে ইতিহাসের “বাস্তব চিত্রকে” লাভ করা। অতীতের চিত্র তার আকস্মিক স্মৃতির ঝলকানির মধ্য দিয়ে স্বীকৃতি পায়। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক সত্যতা বা বাস্তবতা বর্তমানে  প্রতিফলিত হয়। মানুষ যখন বর্তমানে থেকে অতীতকে দেখতে চায় তখন অতীতের সাথে বর্তমান সময়ের একটি ফারাক থেকে যায়, যে ফারাক অতীতকে বাস্তব বা যথার্থভাবে ধারণ করতে পারেনা। অতীতের ইতিহাস প্রকৃত চিত্র ঠিক যেভাবে ছিলো সেভাবে আমাদের সামনে হাজির হয়না। তাই ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের মধ্য দিয়ে সত্যকে পরিপূর্ণভাবে খোঁজে উপলব্ধি করার ব্যাপারে বেঞ্জামিনের অনীহা ছিলো। বিপরীতে, বেঞ্জামিনের থিসিসে ঐতিহাসিক সত্যের দিকে ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো, এবং কেউ এটি ধরার চেষ্টা করলেই পালিয়ে যায়। তাই পদ্ধতিগতভাবে ইতিহাসের নির্মাণ বা উপস্থাপন স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠতে পারে না। চলমান বর্তমানতার সাথে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে ইতিহাস পদ্ধতিগতভাবে উদ্ভাবনমূলক।

বেঞ্জামিন মার্কসবাদকে হেগেলীয় ইতিহাসবাদ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। সময়কে সর্বাত্মক অভিজ্ঞতা আকারে দেখার চেয়ে তিনি বরং একে এপারেটাস হিসেবে দেখেছেন। এজন্য তিনি ইতিহাসকে বর্তমান সময়ের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করতেন। বর্তমানের মধ্য থেকেই ইতিহাস বিভিন্নভাবে “নির্মিত” হচ্ছে। বেঞ্জামিনের নাউ-টাইম হচ্ছে বর্তমানের কার্যকারিতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা। নিৎসে বা ফুকোর জিনিওলজির মতোই বেঞ্জামিনের নাউ-টাইম ইতিহাসের স্বতঃস্ফূর্ত সচেতনতা। তিনি তার ক্রিটিকের মাধ্যমে আধুনিকতা, প্রগতি এবং মানব মুক্তির মধ্যে ঘনিষ্ঠ কিন্তু সমস্যাযুক্ত সংযোগকে স্থানকালের বিবেচনায় উত্তরণ পেতে চেয়েছেন। যেখানে চলমান প্রগতিশীলতার মতো বিষয়গুলো শাসক শ্রেণীর উচ্চ বিলাসী পরিকল্পনার প্রধানতম অংশ। বেঞ্জামিনের মতে অবদমনের চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য এটি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা সবসময় একটি ‘জরুরি অবস্থার’ মধ্য দিয়ে বাস করি। এই জরুরি অবস্থা আদতে ‘ব্যতিক্রম’ বলে মনে হলেও তা সাধারণ ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। বেঞ্জামিন এই জরুরি অবস্থাকে ফ্যাসিবাদ হিসেবে নামকরণ করেছেন। ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করার নিরন্তর সংগ্রামে একটি ‘সত্যিকারের জরুরি অবস্থায়’ নিয়ে আসাকেই বেঞ্জামিন প্রধান কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেন।২১ বেঞ্জামিনের রাজনীতির দর্শন  এখানে এমন একটি ডিসকোর্স আকারে হাজির হয় যা চলমান বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে  নাউ-টাইমের মধ্য দিয়ে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য। ঐতিহাসিক ও কালিক কাঠামোর সাথে সাময়িক বিরতি ঘটিয়ে এটি তার অনুসন্ধানের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে, নতুন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রূপ তৈরি করে। তার সর্বশেষ থিসিসে বর্তমান সময়ের সাথে নাউ-টাইমের সম্পর্ক স্পষ্ট। তিনি  বর্তমানকে শুধুমাত্র সময়ের একটি উত্তরণ হিসাবে অনুধাবন করেন না বরং এটিকে স্থবির চেতনার ধারণাসমূহের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেন।

 

‘সমজাতীয় শূন্য সময়ে’ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ

বেনেডিক্ট এন্ডারসন জাতি এর ধারণাকে একটি ‘কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।  এটি কল্পিত কেননা, একটি জাতি বা জাতি-রাষ্ট্রের সদস্যরা সবাই সবাইকে দেখতে বা শুনতে পায়না তারপরও কতগুলো সমজাতীয় ‘মানসিক’ নৈকট্যের কারণেই একটি জাতিতে পরিণত হয়।২২ বেনেডিক্ট এন্ডারসনের মতে মধ্যযুগীয় ধারণার বিপরীতে আধুনিক জাতীয়তাবাদ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত, যা বেঞ্জামিন কথিত ‘সমজাতীয় শূন্য সময়ের’ মধ্য দিয়ে বিকাশ ঘটে।২৩ একইসাথে এই সময়টি আবার বেঞ্জামিনের বর্ণিত ‘একগুঁয়ে প্রগতির বিশ্বাস’ দ্বারা পরিপূর্ণ। বাঙ্গালী জাতি-রাষ্ট্র বিকাশের শুরুর থেকেই এই ধরণের প্রবণতা দেখা যায়। সমজাতীয় হওয়ার সক্রিয় মানসিকতা শুরু থেকেই স্ব-আরোপিতভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। জাতীয়তার এই মানসিকতা সরলরৈখিক সময়ের মধ্য দিয়ে অনবরত প্রবাহিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের পর সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন থেকেই সমস্যার সূচনা। মানবেন্দ্র লারমা সংবিধান প্রণয়নের সময় তীব্রভাবে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করেন। তার এই বিরোধিতাকে ‘সার্বভৌমত্ব-বিরোধী’ হিসেবে  চিহ্নিত করা হয়। অধ্যাপক আলী রিয়াজের ভাষায় ‘তাকে (আদিবাসীদের)  অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে অন্য জাতির (বাঙ্গালি) পরিচয়ের ভেতর এবং তার নিজস্ব পরিচয়কে রাষ্ট্র দেখছে সার্বভৌমত্ব-বিরোধী বলে।’২৪  উত্তর-ঔপনিবেশিক অন্যান্য  রাষ্ট্রগুলোর মতো বাংলাদেশও জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও অন্যান্য বর্গের ভিত্তিতে অপারয়ণের প্রক্রিয়া এখনো বিদ্যমান। অপারয়ণের প্রক্রিয়ার তৈরি অপর বা প্রতিপক্ষের মতামত বা চিন্তাভাবনা সমানভাবে মূলধারার সংযুক্ত হতে পারেনা। আর এ প্রক্রিয়াটি ‘সমজাতীয়’ ও ‘রৈখিক’ সময়ের মধ্য দিয়ে চলমান। এর ফলাফল হচ্ছে কাঠামোগত সংহিতা যা অপর বর্গের স্বাভাবিক জীবন যাপনকে অসম্ভব করে তুলছে। কাঠামোগত সংহিতার এ প্রক্রিয়া ‘ব্যতিক্রমকে’ ‘নিয়মে’ পরিণত করেছে।

প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে কমবেশি অপরায়ণের সমস্যা রয়েছে।  তবে আমরা এখনো আমাদের জাতি-রাষ্ট্রের অপরায়ণের সমস্যা নিয়ে আন্তরিকতার সাথে মোকাবিলা করতস ইচ্ছুক নই। এর কারণ হচ্ছে সমস্যার উৎপত্তিসন্ধান নিয়ে সত্যিকারে ক্রিটিকাল পর্যালোচনার সাথে সংযুক্ত হতে আমাদের অনীহা রয়েছে।  কাঠামোগত সহিংসতার ক্ষেত্রে ক্ষমতার বৈচিত্র উৎস রয়েছে। শুধুমাত্র রাষ্ট্রিয় ক্ষমতার উৎসই এককভাবে অন্তর্ভুক্ত নয়, যদিও এটি চূড়ান্ত একটি ক্ষমতার উৎস।

জাতিগত আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে ভাবাদর্শিকভাবে এখনো অপারয়ণের কাজটি সক্রিয়। বাঙ্গালী মুসলমানদের জাতি সম্পর্কিত ভাবনায় যে ‘কল্পিত’ ক্যাটাগরি রয়েছে তাকে পর্যালোচনার ব্যতীত সত্যিকারের জাতি-সম্পর্কের বিনির্মাণ অসম্ভব। সাধারণত  বাঙ্গালি মুসলমানরা উম্মাহ বা জাতি বলতে শুধুমাত্র নিজেদের ধর্মের লোকদের মধ্যকার সম্পর্ককে বুঝে থাকে। জিয়াউদ্দিন সরদারের মতে এই ধরনের জাতি সম্পর্কিত সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে একধরনের ‘সীমাবদ্ধতা’ রয়েছে। “উম্মাহ বলতে ‘যে সম্প্রদায়  কেবলমাত্র নিজেদের মুসলিম বলে স্বীকার করে’ তারা নয়, বরং উম্মাহ হচ্ছে ‘কিভাবে মুসলমানরা অন্যান্য সম্প্রদায়,  প্রকৃতির রাজ্যের এবং নিজেদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হবে তার নৈতিক ধারণশক্তি।’ অর্থাৎ উম্মাহ বিষয়টি শুধুমাত্র মুসলমানদের সাথে সম্পর্কিত নয় অধিকন্তু এটি ন্যায্যতার অনুসন্ধানকারী ও নিপীড়িতদের সাথে সম্পর্কিত।”২৫ জাতিগত সম্পর্ক বিনির্মাণে বাঙ্গালি মুসলিম সমাজের ভাবাদর্শিক চিন্তা-তৎপরতাকে সংস্কারের প্রয়োজন যা অন্যান্য বর্গের লোকদেরকে অপরায়ণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

 

পরিশেষ

বাংলাদেশ নামক একটি জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে আমাদের এখনো জাতি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া চলমান। জাতির মানসিকতাকে সুসংহত করার জন্য আমাদের সর্বাত্মক ইতিহাসের ঘটনাসমূহের পুঞ্জিভূত চিত্রের প্রয়োজন নেই। একক কোন বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত ঘটনাও বর্তমানকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম। জাতীয়তার মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগভাবে উদ্ভাবনমূলক ইতিহাসকে নির্মাণ  করতে হবে, যার অন্তর্দৃষ্টি আমাদের সঙ্কটসমূহকে মোকাবিলা করা। উদ্ভাবনমূলক ইতিহাস নাউ-টাইমকে তার অভিজ্ঞতা দ্বারা পরিপূর্ণ করবে। পাশাপাশি এটি বাংলার অনাগত সমাজের জন্য একটি ভবিষ্যত নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।

 

তথ্যসূত্রঃ

১) Yvan Schulz, Time representations in social science, Dialogues in Clinical Neuroscience – Vol 14 . No. 4 . 2012,

www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3553568/?fbclid=IwAR0ReYE7R_L8DWKNybdZvaOXs_UgyTix31szlf-750JEJ4YBIiBOj0DZDvQ

২)Edited by Maurizio Passerin d’Entrèves, Seyla Benhabib, Habermas and the Unfinished Project of Modernity: Critical Essays on The Philosophical Discourse of Modernity,1997,Page 39

৩)Jurgen Habermas, The Philosophical Discourse of Modernity, Translated by Frederick Lawrence, 1998, Cambridge, Uk. p.6

৪)Ibid,  p.17

৫)Michael Foucault, What is Enlightenment?Translated by Catherine Porter in [ The Foucault Reader, Edited by Paul Rainbow, New York,Pantheon Books,1984, p.39 ]

৬)Jurgen Habermas, Ibid, p.11

৭)Habermas and the Unfinished Project of Modernity, Ibid, p.41

৮)Walter Benjamin, ‘Theses on the Philosophy of History’ in [ Illumination, translated by Harry Zohn, Schocken Books, New York, 2007, p.256 ]

৯)Ibid, p.262

১০)Dipesh Chakrabarty, Provincializing Europe: Postcolonial Thought and Historical Difference, Princeton University Press, Princeton, New Jersey, 2008, p.xiv

১১)Ibid, p.7

১২)Ibid, p.62

১৩)Francis Fukuyama, The End of the History and the Last Man, USA, Penguin Books, 1992, p.56

১৪)Ibid, p.64

১৫)Ibid, p.8

১৬)Walter Benjamin, Illumination, translated by Harry Zohn, Schocken Books, New York, 2007, p.11

১৭)Ibid, p.261

১৮)Ibid, p.253

১৯)Humberto Beck, The Moment of Rupture: Historical consciousness in Interwar german Thought, University of PennsylvanIa Press,  Philadelphia, 2019, p.150

২০)Jurgen Habermas, Ibid, p.13

২১)Walter Benjamin, Ibid, p.257

২২)Benedict Anderson,Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Verso, New York, 2006, p.6

২৩)Ibid,p. 24

২৪)আলী রীয়াজ, ভয়ের সংস্কৃতি: বাংলাদেশে আতঙ্ক ও সন্ত্রাসের রাজনৈতিক অর্থনীতি, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৪, পৃ. ৭৮

২৫)Edited by Sohail Inayatullah and Gail Boxwell, Islam, Postmodernism and Other Futures: A Ziauddin Sardar Reader, Pluto Press, 2003, p.33

 

 

 

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top