কয়েকজন নারী ও একটি গন্ধরাজ ফুলের গাছ

Share this:

কয়েকজন নারী ও একটি গন্ধরাজ ফুলের গাছ

 

নারীজন্মে ক্ষয় ছাড়া কোনো জয় নাই। উত্তরের বাড়ির বুড়ির এই মুনিবাক্য মনে পড়তেই সে হাতের তজবি রেখে সেজদায় পড়ে যায়। খেজুঁরপাতার নতুন পাটি থেকে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের মতো মধুর সুবাস উঠতে থাকে। গন্ধটা তার উপাসী আত্মার কান্নাকে উসকে দেয়। রসের আলাপের সময় ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানের রস গামছায় মুছতে মুছতে বুড়ি বলত, ব্যাডামানুষ হইল পাগলা ষাঁড়। তাগরে খোঁচাইতে নাই। পক্ষীর বাচ্চার লাহান ওম দিতে অয়। মায়ের মতন ক্ষমা করতে অয়। রক্তের ত্যাজ কমতে শুরু করলে পুরুষ মানুষ বউয়ের আঁচল খোঁজে। তখন হইলগা আসল মিলন। খালি বউ হইলে অয় না রে মাগি, মায়ের গুণও থাকতে অয়।

নিঃশব্দ রোদনের মাঝে এইসব ভাবতে ভাবতে রাহেদা নামাজের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়ে। দুঃখ, অপমানে তার ভেতরটা থেঁতলে গেছে। এখন আছে শুধু একটা অন্ধ একিন। তাই তার বিধ্বস্ত আত্মার মাঝে জেগে থাকে বিশ্বাসের সবুজ সুতাটা : নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে বঞ্চিত করবে না। আদালতের রায় অবশ্যই তার পক্ষে আসবে।

পাশ থেকে তাইজুর মা যেন বিদ্রুপের গলায় জিজ্ঞেস করে, আর যদি বিপক্ষে যায়? এই প্রশ্নে ঘুমন্ত রাহেদার মোটামোটা বেমানান ঠোঁট দুইটা কেঁপে ওঠে। বোঁচা নাকের পাশে চোখের এক ফোঁটা পানি অটল ভঙ্গিতে বলে, তাইলে আমি তালিমের খাতায় নাম লেখায়াম। জীবন চিল্লায় চইলা যায়াম।

 রাহেদার মা ঘরে এসে দেখে অভাগীর বেটি নামাজের পাটিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে, আল্লা রে, এই নিষ্পাপ মাসুমরে একটু রূপ দিলে তর কী এমন ক্ষতি হইত?

রাহেদা সরল, সৎ আর ধর্মপ্রাণ। তার অনুভূতিগুলো তীব্র আর গভীর। সে জীবনকে সুন্দর আর ন্যায়ের পাল্লায় রেখে বাঁচতে চায়।

পুরুষ মানুষের কাছে গুণের চেয়ে রূপের কদর বেশি। এই কথা মনে হলে রাহেদার মায়ের জরায়ুতে চিনচিন করে ব্যথা ওঠে। সে ফিরে যাবার জন্য ঘুরে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়। হালছাড়া ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে। তারপর একটা বালিশ এনে মেয়ের মাথার নিচে গুঁজে দেয়। আর দরজা পেরিয়ে যাবার সময় আক্ষেপের সুরে বলে, হায় রে মেয়েলোকের নসিব!

 একটু পরে কলার ছড়ি নিতে আসে রাহেদার বাপ। সে কলা ব্যবসায়ী। গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাঁচাকলা কিনে। তার হাত-পা, লুঙ্গিতে কলার কষের ছোপ ছোপ দাগ। সে কলা কিনে এনে রাহেদার রুমের কোনায় জাগ দিয়ে রাখে। তারপর ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ধূপের ধোঁয়া দেয়। রাতারাতি কাঁচাকে পাকা করে। সকাল-বিকাল চৌরাস্তার বাজারে কলা নিয়ে বসে থাকে। লোকটার কাঁচাপাকা দাড়িতে বাজারের ধুলা, কপালের ঘাম। সে ঘরের উত্তরের কোনার দিকে ছড়ি নিয়ে যাবার সময় ঘুমন্ত মেয়েকে এক নজর দেখে। বুকটা ভারি ভারি লাগে। মেয়ের দিকে তাকাতে ভয় হয়। তারপর বাইরে এসে ফ্যাসফ্যাসে গলায় নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দেয়, নসিবের কিল বাপে কিলায়।

 রাহেদার মগজের সবুজ সুতাটা ঘুমের মাঝেও ভাবে, কাল তার বিচারের রায়। স্বামী তাকে কিল-লাত্থি দিয়ে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল, তর বাপের কাছতে টাকা আনবে, না আনতে পারলে আর আইছ না।

টাকা না পেয়ে সে রাহেদার নামে উকিল নোটিশ পাঠায়। রাহেদার হিসাবি বাপ আদালতে মামলা করেছিল। তিন বছর ধরে বাপ-বেটি আদালতের বারান্দা দিয়ে খুব ছোটাছুটি করেছে। আগামীকাল তার রায়।

ঘুমের মাঝেই রাহেদা বাঁ হাত দিয়ে তার উঁচু কপালটা একটু ঘষাঘষি করে। শ্বশুর বাড়িতে উনিশ-বিশ হলেই তার শাশুড়ি মুখ মুচড়ে বলত, গোঁজকপাইল্যা হস্তিনী নারী, থপথপায়া হাঁটে আর স্বামীর আয়ু খায়। মাগি আমার পুতটারে অকালে খাইব।

স্বামী আর সংসার ছাড়া মেয়েলোকের কী আছে লো মাগি! এক জীবনে কয়জন পুরুষের সামনে তলের কাপড় তুলবার ইচ্ছা? এই জিজ্ঞাসায় বুড়ির ঘোলা ঘোলা চোখ ঝলক মারে। রাহেদা ঘুমের মাঝেও কেঁপে ওঠে। তলের কাপড় তো কারও সামনেই উঠাবার ইচ্ছা ছিল না। এসএসসি পাশ করে সংসারের কাজে মায়ের সাথে লেগে গেছিল। দিনটা কাটত হাড়ি-পাতিল ঠেলে। রাত হলে সে কত জাতের নামাজ পড়ত!

 বুড়ির কাছে পুরুষ অবুঝ, অসহায় পক্ষীর ছানা। কিন্তু গভীর আর চিন্তাশীলা রাহেদার কাছে পুরুষ মানে নষ্ট চরিত্রের মানুষ। খালি মেয়েলোকের বুকের দিকে তাকায়।

 রাহেদার জীবন নামক লেখার খাতায় এইসব গুরুত্বপূর্ণ সঞ্চয়। তিনটা বছর মানে ব্রহ্মাণ্ডজুড়ে একটা সুই খোঁজা। তার অভিজ্ঞতা বলে, সেখানে পরত পরত অন্ধকার আর শূন্যতা ছাড়া কিচ্ছু নাই। নামাজের সময় সেজদায় পড়ে সে খোদার আরশে কুরসি কল্পনায় দেখতে চাইত। কিন্তু তার মোটা, বদখত চেহারাটাই শুধু চোখের সামনে ভাসত। রূপ নাই বলে সে অবহেলায় বড় হয়েছে। তার ভালোবাসার কোনো স্মৃতি নাই। ছেলেরা কোনোদিন তার দিকে একবারের বেশি দুইবার তাকায়নি। যৌবনের শুরুতেই এইসব আবিষ্কার তাকে ঠেলে দেয় ধর্মের দিকে। তার ধীরস্থির শান্ত মনটা পরম বিশ্বাসে মহাশূন্যের অন্ধকারে চোখ বুজে পড়ে থাকত।

 মা মনে মনে চাইতেন, রাহেদা তার মেজো ভাইয়ের সাথে চাকরি করুক। বাবা তো ভাত খেতে বসে প্রায়ই বলতেন, লেখা-পড়াত লাভ নাই। এই ডিজিটাল যুগে কলাবেইচ্যা বাঁচুন যায়?

রাহেদা ঘুমের মাঝে বাঁ থেকে ডান দিকে পাশ ফিরে। তার ভারি ভারি বুক উঁচু থেকে সামনের দিকে ঢলে পড়েছে। লাউয়ের মতো বড় বড় হাত-পা সারা পাটি দখল করে রেখেছে। একটু দূর থেকে দেখলে, পাটির ওপর মাংসের একটা স্তুপ মনে হবে। তবু তার ঘুমন্ত আত্মার মাঝে একটা সংসারী মন প্রাথর্নার ভঙ্গিতে জেগে থাকে। সে ভালোবাসে ঘর আর কাজ। ভীতু, লাজুক আর চাপা স্বভাবের রাহেদা স্বামীর ভালোবাসাটা সব সময় নীরবে উপভোগ করত। স্বামী তাকে বারবার আদর করুক, বুকের ওপরে উঠে যতক্ষণ ইচ্ছা মরদামি করুক।

রাহেদা চাইত স্বামীর প্রেম। স্বামী চাইত টাকা। রাগে গড়…ড় গড় করে বলত, টাকা দ্যা মুটকি-চুতমারানি, আমি তরে টাকার লাইগ্যা বিয়া করছি।

স্বামীর বাড়িতে তার শোবার ঘরটা ঝকঝক করত। অবসরে সে প্রাচীন বুড়িদের মতো যতœ করে খেজুঁর পাতার পাটি বুনত, সুতার কাজ করা সুন্দর সুন্দর খেতা সেলাই করত। লাউ-শিমের বীজ রোয়া, মাচা ঠিক করা, গাইয়ের দানা-পানি, মাছকোটা সবখানে রাহেদার লক্ষ্মী হাত নীরবে চলছে। আর কাজের সাথে মনে মনে সে পড়তে থাকে সুরা-কালাম। এইটা তার মনের আগুন ঠান্ডা রাখে। বিবেককে রাখে উঁচুতে। সে জানে, তার রূপ নাই। ধন নাই। সম্বল মাত্র চরিত্র আর বিশ্বাস। এইসব ভাবার সময় তার মন চলে যেত আলমারির মাথার ওপর। সেখানে তার কোরআন। জানলা দিয়ে নজর চলে যেত আকাশের দিকে। যেন সে তার বিশ্বাসের কথা আল্লাহকে শোনাতে চায়, সে যদি সত্যিকারের বান্দা হয়ে থাকে তবে একদিন না একদিন তার দুঃখ ফুরাবে।

 মানুষটা যতই বেখাছিলতের হউক, হাকিম হুকুম দিলে সে টাইট হতে বাধ্য। রাহেদাও হাসিমুখে তার ঘরে গিয়ে উঠবে। যত ইচ্ছা মদ-গাঞ্জা খাওক, তার দেহটাকে যতভাবে পারে ভোগ করুক। কিল-থাপ্পর দিলে সে হজম করবে। পর-নারীর সাথে যত ইচ্ছা শুয়ে থাকুক, রাহেদার কোনো অভিযোগ থাকবে না। বুড়ি বলে, এরা অবুঝ। বারবার ভুল করলেও ক্ষমা করতে অইব। তার আল্লাহ আছে না? একদিন সে সবকিছু দিবে। দুঃখ আসে ইমান পরীক্ষার জন্য। সেই পরীক্ষায় রাহেদা ফেল করতে চায় না।

 অ রে মাগি, খালি চৌখ্যের পানি ফাললে অয় না। এই দ্যাখ, আমার পিঠটা দ্যাখ। বুড়ি পিঠের ওপর থেকে দামি, ফিনফিনে সাদা শাড়িটা সরায়। ঢিলাঢিলা লাল-হলুদ চামড়ার ওপর কালো কালো তিনটা দাগ। বাঁশের জিংলার তিনটা কালো রেখা সমান্তরালে বসে আছে। বুঝলে, গাডু ছেরা রাখত। গানবাজনা কৈরা আইয়া, গাডু লইয়া বাংলা ঘরে ঘুমাইত। আমার এইসব দ্যাখবার টাইম আছে? রাইত পাইতেই দশ-বারোটা কামলা জমিনে খাটে। ঘরে দুইটা কামের বেটি। বড়ো ছেলেটা কাপড়ের আঁচল ছাড়ে না। ছোটোটা কোল থাইকা নামে না। বারিন্দাত বইয়া মাইজমটা কান্দে। কাছে বইয়া বুড়ি শাশুড়ি কাউয়ার মতন খালি কা কা করে। আমি নাকের শ্বাস ফালছি? আমার ঘর ভরা ধান, মাঠ ভরা জমিন। কথার উত্তরে কথা কইলে আগুন আরও বড়ো হইত না?

রাহেদা শরীরের ওড়নাটা আরেকটু টেনেটুনে বসে। তার ভারি মাথাটা বড়ো বড়ো বুকের দিকে নেমে আসে। সে বুড়ির আলাপের মাঝে আত্ম-গৌরবের গন্ধ পায়। তৃপ্ত জীবনের সুবাস পায়। তার এই দালান-বাড়ি গ্রামের সেরা। তার কীর্তিমান ছেলে-মেয়েরা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশাল বাড়িতে একা থাকে বলে তার দেখভাল করার জন্য মোটা বেতনে একজন আধাবুড়ি মেয়েলোক রেখেছে। নব্বই বছর পেরিয়ে আজ সে মৃত্যুর অপেক্ষায় জীবনটা ভোগ করছে। আর রাহেদার কী আছে, কী ছিল অতীত আর কীইবা থাকতে পারে ভবিষ্যতে?

বুড়ির জন্য ছেচা পানসুপারি নিয়ে ঘরে আসে তাইজুর মা। কালো আর শক্ত শক্ত গতর-গড়নের মাঝবয়েসি নারী। তাইজুর মায়ের নাম উঠলেই পাড়ার মানুষ কয়, খরদজ্জাল মাগি। কয়দিন পরে পরে লাং বদলায়।

তাইজুর মায়ের চওড়া কপালের দিকে কয়েকটা সাদা চুল ছাড়া সব বুঝি ঠিকঠাক? দাহাবাজ মেয়েলোক। থপথপ করে হাঁটে। হাঁসের মতো বাকবাক করে কথা কয়। যৌবনে চার চারটা পুরুষের ঘাড় মটকে চলে গেছিল ঢাকায়। অনেক বছর মেসে মেসে রান্নার বুয়াগিরি করছে। জীবনটাকে স্বাধীনভাবে উপভোগ করছে। বয়স পড়তে শুরু করলে গ্রামে ফিরে আসে। বন্ধ্যা মেয়েলোকটাকে কেন যে মানুষ তাইজুর মা ডাকে?

রাহেদার দিকে চোখ পড়তেই তাইজুর মা ফুঁসে ওঠে, এইরহম জামাইয়ের মুখে পেশাব কর রে মা। মাওনা-জৈনা কত কত ফ্যাক্টরি! ভাতের কী অভাব আছে? কী দরকার পুরুষ দ্যায়া, কয় ফোঁটা ল্যাড় ছাড়া ব্যাডা-মাইনষের কী আছে?

তাইজুর মায়ের ভাষণে রাহেদার মনটা খানখান হয়ে যায়। তার জন্য দুনিয়ার কোথাও শ্বাস নেবার বাতাস নাই। মনটা যখন আর মানে না, কষ্টে বুকটা যখন ফেটে যেতে চায় তখন রাহেদা আসে বুড়ির কাছে। বুড়ি একটা আশা। ধনে-জনে, দীর্ঘ আয়ু, চিকন বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতায় এই পাড়াতে বুড়ি একটা বটগাছ। রাত পোহাতেই বুড়ির বাড়ির গাছে গাছে গান গায় পাখপাখালি, খাওয়ার লোভে বিলাই-কুত্তা আসে আর রাহেদার মতো দুঃক্কীরা আসে মনের ঘায়ে সান্ত্বনার মলম লাগাতে। মনের দুইটা কথা বলতে না বলতেই তাইজুর মা চিকার মতো চিকচিক করে ওঠে। শহরে-বাজারে চড়ে বেড়িয়ে আসে এই মেয়েলোকটাকে দেখলেই রাহেদা কোঁকড়ামোকড়া হয়ে তার বড়ো শরীরটা ছোটো করে ফেলতে চায়। যতটা সম্ভব বুকটুক আড়াল করে ফেলে। এই ব্যাবিচারিণী প্রথমেই তার বুকের দিকে তাকায়। রাহেদার হাদিস-কোরআন কয়, তাইজুর মায়ের মতো মেয়েলোকরা কামুক পুরুষের চেয়ে অধিক খারাপ। তাদের সামনেও পর্দা করা ফরজ।

তাইজুর মায়ের কুকথা রাহেদার ইমানে লাগে। তার কষ্ট হয়। মনে মনে ভাবে, নামাজের পাটিতে বসে বসে সারাজীবন যারে ডাকল সে-ও বুঝি তার প্রতি বিমুখ! তা না হলে একটু দরদ কুড়াতে এসে তাউজুর মায়ের মতো মেয়েলোকের মুখ দেখতে হয়?

রাহেদা বসা থেকে উঠে পড়ে, যাইগ্যা গো দাদি।

বুড়ি মুখ তুলে : লম্বা-চিকন আর সুন্দর নাকটা নব্বই বছরের স্বাদে-বিস্বাদে একটুখানি ঝুলে পড়েছে। ঘোলা ঘোলা উদাস চোখ, কপালের বলি রেখাগুলো শেষ বিকালের মিষ্টি রোদে আভিজাত্য ছড়ায়।

 রাহেদা সারি সারি ঘর গলির পর গলি পেরিয়ে ফয়সলদের গেটের কাছে এসে দাঁড়ায়। গেটের ওপরে বাগান বিলাসের ঝাড়টা ফুলে ফুলে জ্বলছে। এল সাইজ হাফবিল্ডিং। গ্রিল দেওয়া টানা বারান্দা। ঘরের ভিতর থেকে টিভির শব্দ আসছে। উত্তরের রুমে থাকে ফয়সলের মা। চোখে কম দেখে, কানেও শুনে না। তাই বুড়ি দিনের বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরে বসে তজবি টিপে। তবু রাহেদা বুড়িকে অপছন্দ করে। মানুষের গিবত গাওয়া তার নেশা। প্রতিবেশীর ক্ষতিতে বুড়ির সুখ।

ফয়সল দুবাই থাকে। পাশের ঘরের জাবেদ থাকে মালদ্বীপে। তাদের দুইজনের বউ-ই সুন্দরী, আধা-শিক্ষিত আর ডাটফাটের। ফয়সল-জাবেদ যেমন গলায় গলায় বন্ধু, দুই বউও তাই। একজনের স্বামী দেশে এসেছিল তিন বছর আগে। আরেক জনেরটা দেশে আসছে না আড়াই বছর। বলতে গেলে দুইজনই সুখে-দুঃখে প্রায় সমান সমান। তাই তারা সুখ-দুঃখের বন্ধু। দরকার মতো দুইজন একসাথে মিশুক রিকশায় চড়ে হাটে-বাজারে যায়। কেনাকাটা করে। বিকাল হলে দুই সখী একসাথে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মারে। মাঝে মাঝে দুইজনই হতাশায় চুপচাপ বসে থাকে। মাথা ব্যাথার জন্য নাপা বড়ি খায়। বাচ্চারা বিরক্ত করলে দুম দুম কিল মারে। নসিবকে গালি দেয়। আবার আলাপ জমে উঠলে বন্য হাসির তোড়ে ফয়সলের মায়ের কাঁচা ঘুম মচকে যায়। তখন উত্তরের কোঠা থেকে ফয়সলের অচল মা চেঁচায়, কী হইছে বউ, অ বউ…?

রাহেদা মনে মনে ভাবে, রতনে রতন চিনে, শুয়রে চিনে কচু। দুইটাই এক রকম চতুর আর শয়তাননি। দুইটারই ছেলেমেয়ে আছে। তবু চান্স পেলেই দুই সখী এক হয়ে তাগড়া ছেলেদের ঘাড় মটকায়। মেয়েলি স্বভাব থেকে রাহেদা একবার মুখ মোচড়ায়। একদলা থুতু ফেলে। তারপর মনে মনে গালি দিয়ে বলে, লুচ্চুনী! খাঁটি লুচ্চা না হইলে সংসার, স্বামী সব ঠিক রাইখ্যা ভিত্তে ভিত্তে অত?

একটু রূপের জন্য তার বুকটা পোড়ে। হিংসা হয়। বাড়িটা চুম্বকের মতো টানে। রাহেদা খোলা গেইট দিয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। ঢালাই পথের ওপর থরেথরে পড়ে আছে বাগান বিলাসের ফুল। লাল লাল পাঁপড়িগুলো মাড়িয়ে যেতে রাহেদার খারাপ লাগে।

বাড়িটাতে পড়ন্ত বিকালের মিষ্টি মিষ্টি ওম। উঠানজুড়ে গাছগাছালির ছায়া। ঘরের ভিতরে দুই প্রবাসীর বউয়ের রহস্যময় গলা। চিটকিবিটকি হাসি। রাহেদা ঘরের বারান্দাতে দাঁড়িয়ে পড়ে। জাবেদের বউ ফিসফিস করে বলছে, বিবাহিত, একটু বয়স্ক পুরুষই ভালা। চেংড়া ছেরাইন চড়–ই পক্ষীর মতন উঠে আর নামে!

বুনো হাসির উল্লাসে রাহেদার কান গরম হয়ে ওঠে। ঘেন্না-শরমে গতরটা ঘিনঘিন করে। বুকের ভিত্তে কী এক আগুন খালি দাউদাউ জ্বলে। সে একমতো দৌড়ে বাড়ি আসে। টিনের গেইট ঠেলে উঠানে পা দিতেই মায়ের সামনে পড়ে যায়। মা ফুঁসফাঁস করে, অতকিছু হইয়া যায়, ত্যাও পাড়া বেড়ানির শখ কমে না?

রাহেদার ভারি শরীরটা কেঁপে ওঠে। মায়ের সাথে কলহ করতে ইচ্ছা করে। তখনই বুড়ির কথা মনে পড়ে। বুড়ি বলে, মাটি হ। দ্যাহছ না মাটিরে মানুষ কাটে, জ্বালায়-পোড়ায়, ত্যাও মাটি আমগরে ফল-ফসল দেয়, খাওনের পানি দ্যায়। মাটি না হইতে পারলে মা হইবে ক্যামনে?

শরীরের ওড়নাটা ফেলে দিয়ে রাহেদা বিছানায় ঢলে পড়ে। বুকের ভিতর বিশ্বাসের ঘর ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ার শব্দ : সব ভেলকি! সব মিথ্যা! রাতের পরে দিন, শীতের পরে আসে বসন্ত। গাছেরা পাতা বদলায়। সাপেরা নতুন চামড়া-গায়ে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে। পাখিরা দল বেঁধে দেশ-মহাদেশ পেরিয়ে যায়। আর রাহেদা তুমি?

পরদিন দুপুর। জেলা জজকোর্টের পাশে, টিনের ছাপড়ার একটা রেস্টুরেন্টে বাপের সাথে রাহেদাকে বেহাল দশায় বসে থাকতে দেখা যায়। ছিন্নভিন্ন হৃদয়ের মেয়েটা বাপের দিকে তাকিয়ে নড়েচড়ে বসে। বাপকে বুঝি একটু খুশি খুশি লাগে ? মহরানার সাথে খোরপোষ বাবদ স্বামীর কাছ থেকে সে মোটা টাকা পাবে। অনেকদিন ধরেই তার বাপ একটা ফিকিরে ছিল। কিছু টাকা মজুদ আছে আর কিছু জোগাড় হলেই তার বড়ো ভাইকে বিদেশে পাঠাবে। এতদিনে খোদা তার বাপের আশা পূরণ করছে?

 রাহেদার বাপ হাতমুখ ধোয়ার জন্য বেসিনের দিকে চলে গেলে সে বোরকার নিচ থেকে মোবাইলটা বার করে। নাম্বার টিপেটিপে মেজো ভাইকে কল দেয়। ভাইটা তার মন বোঝে। হ্যালো, ভাইজান?

হ্যালো, বুইন তুমি ক্যামুন আছ?

ভালা না।

বুঝচ্ছি।

ভাইজান…

কও বুইন।

রাহেদা তার নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে। হুঁ হুঁ করে কান্না আসছে দেখে দাঁত চেপে বসে থাকে। মোবাইলের ওপাশ থেকে একটা দরদি গলা ভেসে আসে,

বুইন তুমি কান্দ ক্যায়া, আমি আছি না?

ভাইজান, এইডা আমার নসিব।

নসিবটসিব কিচ্ছু না। সব কর্মফল।

হ ভাইজান, কর্মফল।

বুইন তুমি মাওনা আইবা?

হ।

ভাই তার মাওনা শহরে একটা পটেটু-চিপসের ফ্যাক্টরিতে কাম করে। কত কষ্টের পর ঘরে এসে রান্ধে-বাড়ে-খায়। রাহেদা নাক ঝাড়ে। চোখের পানি মুছে ফেলে। কী এক আশায় তার গোল গোল চোখ দুইটা নরম আর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তার ক্ষুধিত আত্মা চায়, একটা সংসার!

রাহেদার সামনের টেবিলে একটা তরুণ এসে বসে। ডাল-ভাতের ওয়ার্ডার করে। ময়লা জিন্স আর লাল গেঞ্জিতে তাকে শ্রমিকের মতো লাগে। এক ধরনের বুনো তারুণ্য আছে ছেলেটার মাঝে। তার কামুক চোখ দুইটা রাহেদার বুকের দিকে । নিজের অজান্তে মেয়েটার নজরও ছেলেটার দিকে চলে যায়। ছেলেটার চওড়া কপাল, ভাসা ভাসা চোখ। ভালো লাগে। বুক শিরশির করে। খাঁচায় বন্দি পাখিটা পাখা ঝাপটায়। শূন্য থেকে ভাবতে ইচ্ছা করে। জীবনের সব পথ যখন শেষ হয়ে যায়, বিশ্বাস ভেঙে পড়ে তখন নতুন রাস্তা ছাড়া মানুষের সামনে আর কী থাকে?

ব্যাগ থেকে গামছা বের করে দাড়ি-মুখ মুছতে মুছতে বাপ মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, মা, ভাতের লগে কী খাইবা, মাছ না গোশত?

রাহেদার কাছে বাপের গলা মিষ্টি মিষ্টি লাগে! ভারি শরীরটা আরেকবার নড়েচড়ে। পাশের জানালা দিয়ে নজর চলে যায় দুই হোটেলের মাঝে। সেখানে নোংরা আর্বজনার স্তুপ। তার মাঝে ঝকঝকে তরুণ একটা গন্ধরাজ গাছ। সাদা ফুলে ফুলে স্বর্গের হাসি, মাতাল করা গন্ধ!

রাহেদার বাপ আবার জিজ্ঞেস করে, কী খাইবা মা?

সে বোরকার নেকাবটা মুখের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলে। সামনে বসা ছেলেটার চোখে চোখ রেখে দ্বিধাহীন পষ্ট গলায় বাপকে জানায়, ভাতটাত কিচ্ছু লাগত না, খালি এক গেলাস ঠান্ডা পানি আর বেশি কইরা জর্দা দ্যায়া একটা পান।

 

প্রশ্নোত্তর

শুদ্ধস্বর: গল্প লেখার ব্যাপারে আপনার তাড়নার জায়গাটা কোথায়? অর্থাৎ কোন বিষয় এবং ঘটনাগুলো আপনাকে গল্প লেখার জগতে পৌঁছে দিল?

শেখ লুৎফর: চমৎকার। ভুনা-মাংস চিবাতে গিয়ে হাড্ডিতে কামড়! ছোটোগল্পও তো তাই। আপনার প্রশ্নের মাঝে তাড়না এবং কেন এই দুইটা শব্দ আছে। আমার বিবেচনায় শব্দ দুইটা মানবজাতির ভবিতব্য। তার উৎসে আছে আবেগ। যা আসে মানুষের আত্মা থেকে। মানব আত্মা দুই প্রকার। জীবাত্মা ও পরমাত্মা। জীবাত্মাধারীরা ভোগী। টাকা ও নারীর জন্য তারা সবকিছু করতে পারে।

চিন্তকের হৃদয়ে থাকে পরমাত্মা। ন্যায়, সত্য ও সুন্দর তার আরাধ্য। কিন্তু চোখ খুললে সে দেখতে পায় শুধু কুৎসিত, কান পাতলে শুনতে পায় মিথ্যা ও ভুল। তখন তার যুক্তিগুলো বলতে চায়, জীবন একটা অর্থহীন শাস্তি। এখানে কেউ নিরঙ্কুশ সুখী না, তৃপ্ত না। চারপাশের এই উজ্জ্বল পৃথিবীর প্রতিটা ঘরে ঘরে অশান্তি, মনে মনে কষ্ট, কান্না। নসিব চাপড়ে বহু মানুষকে বলতে শুনেছি, বালের জীবন! চোদার জীবন!

ওয়াহিদুল্লাহ নামে আমাদের গ্রামে একজন কৃষক ছিল। হঠাৎ বৃষ্টিতে ধান-পাট-খড় ভিজে গেলে সে আল্লাহকে গালিগালাজ করত। রাগে আকাশের দিকে দা ছুড়ে মারত। একেবারে পাথর হয়ে গেছিলাম একটা ঘটনায়। তখন আমি কলেজে পড়ি। রাতের শোতে ইংলিশ মুভি দেখে ফুটপাত ধরে ফুড়ফুড়া মনে হাঁটছিলাম। ডান দিকে মেহগনিগাছ তলার আবছা অন্ধকারে নারী-পুরুষের তর্কাতর্কি শুনে হাঁটার গতি কমিয়ে দিলাম। নিচু গলায় বিষাদের সুরে পুরুষটা বলছে, চুতমারানি আমি তরে তালাক দিলাম, ক্যান তুই তিনটা রুটি দিয়া বক্কররে চোদা দিলে?

নারী : তিনদিন উপাস থাইকা দ্যাখছি, চোদা দেওয়া ছাড়া আমার কোনো গতি নাই।

রাতে ভাত খেতে বসে বমি করে ফেলি। আকাশে চাঁদ ছিল। মেস থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সিগারেট টানতে টানতে চলে এলাম ব্রহ্মপুত্র নদীর চরে। আমার বুকের মাঝে তারা দুইজন তখনও বাজে ভাষায় কথা বলছে। আর চোখে ভাসছে, নোংরা শাড়ি পরা পেতনি-টাইপ একটা মেয়ের ঘৃণাভরা চোখ। অসহায় আক্রোশে কোটর থেকে জ্বলছে।

সেই রাতে ঘরে এসে কাঁপাকাঁপা অস্থির বুকে ’অলম্বুশ ভূত’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটা এইরকম :

অতপর রেলস্টেশানের পাশের রেন্ট্রিতলায়

মেথরদের আড্ডাটা বাংলা মদে জমে ওঠে।

অপেক্ষাকৃত তরুণ মেথর রগুদাস কহে,

দ্যাখ দ্যাখ মাইয়াডা কী ছুন্দর!

পাকা ভুরু কুঁচকে, যিশুর মতো নিরাসক্ত

গলায় রামেশ্বর কহে, ওছব দ্যাখতে লাই,

ওহাতে পাপ আছে।

ওহারা ছাহেব মানুছ,

ঘি-গু খায়,

ল্যাপ-তুছকে ঘুমায়,

পরি ধরে ফুল হয়।

হামারা ছোটো জাত আছি,

শাক-শুটকি খাই,

পেতনি লইয়া মাটিতে ঘুমাই,

ভ‚ত হয়, কাইলল্যা অলম্বুশ ভ‚ত।

কী দেখেছিলাম, কী লিখলাম? অনেক পরে বুঝেছি : কবিতা বিধাতার ধন। মুহূর্তে নেমে আসে। আর গল্প হলো জীবন। চরিত্রের সাথে অনেক দিন বসত করতে হয়। দেখতে হয় তার দীর্ঘশ্বাসের মুহূর্তগুলো, কপাল থেকে ঘাম মোছার সময়টুকু, ঘৃণায় তার চোখ কতটা ঝলসে ওঠে, কীভাবে থুতু ফেলে, গালি দেয়। একটু আলো আর প্রেম পেলে এই মানুষগুলাই কতটা মানুষ হতে পারে। এইসব শুধু দেখার বিষয় না হৃদয়ে কান পেতে কিছুটা শুনতেও হয়। আমি বিশ্বাস করি, মহৎ হৃদয় আর সুন্দর মন না থাকলে কেউ মহান চিন্তক হতে পারেন না।

মেহগনিতলার সেই দুইজন আমার বুক থেকে নামে না। ছাত্র পড়াই, কখনও ঠান্ডা কখনও উথাল-পাথাল হাওরের জীবন দেখি, বাউলদের গান শুনি, মাঝে মাঝে কবিতা লিখি। একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে যখন বই পড়ি হঠাৎ হঠাৎ সে আসে। আমার সিথানে দাঁড়ায়। তার দুচোখে ঘৃণার আগুন। আমি লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে হালছাড়া ভঙ্গিতে বসে থাকি। সম্বল বলতে ’সতীর পতি বরুণের বিলাপ’ নামে একটা গল্প লিখেছি। মোস্তাক আহমাদ দীন ভাই তাঁর ’বিকাশ’ নামের ছোটোকাগজে ছেপেছেন।

ছুটিতে বাড়ি গেলাম। ব্যাগে এক দিস্তা সাদা কাগজ। রাতে ভাতটাত খেয়ে বালিশে মাথা ফেলতেই মেয়েটা আমার মগজে দাঁড়িয়ে পড়ে, বুকফাটা গলায় বলতে থাকে, চোদা দেওয়া ছাড়া আমার কোনো গতি নাই!

ঝট করে উঠে টেবিলের সামনে বসি। কাটাকাটি করতে করতে রাত তিনটার সময় কাগজ শেষ, গল্পও শেষ। নাম দিলাম ’ভাতবউ’।

আসলে আমি মুখোশধারী প্রেতাত্মা হতে পারিনি বলে লিখি। চারপাশ ও জীবন-বাস্তবতায় লেখাটা আমার বর্ম, মানুষ হওয়ার চেষ্টা। লেখা মানে আত্ম-অনুন্ধান। নরকের মাঝে শিব হয়ে বসে থাকার উপায়। খুব বাজে শুনালেও বলছি, জীবনকে নিজের মতো যাপন করার জন্য আমি লিখি।

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার গল্পকে আকার দেয়।

শেখ লুৎফর: দুধদাঁত পড়তে না পড়তেই বাবা মরে গেলেন। মাকে হাসতে দেখি না। কিছু ভালো লাগে না। বাইরে বাইরে ঘুরি। তিন বাড়ি উত্তরে নূরুর বাপের বাড়ি। একটা বুড়া মানুষ বাড়ির কর্তা ও কর্তীর ভ‚তিকায় দিনমান কাজ করেন। বাড়িতে কোনো নারী নাই। তার পাকঘরের ঢেঁকিতে, পিড়িতে সবসময় দুই-চারজন বসে বিড়ি টানে আর গপ্পো মারে। কী গল্প? পরনিন্দা-পরচর্চা ও আদি রসাত্মক আলাপ। সময়ে সময়ে আসরে বদল ঘটে। বুড়োরা বেড়িয়ে গেলে আসে আধা-বুড়ার দল। তারা গেলে আসে বুড়ির দল। বিকালে আসে পাড়ার মেয়েরা। তখন ভ্রমরের মতো গুনগুন করে আসে তরুণরা। এশার আজানের পরে বসে তাসের আসর। শিশু বয়স থেকে কলেজে আসার আগ পর্যন্ত নূরুর বাপের ঢেঁকি ঘরটা ছিল আমার আসল ইশকুল, বাংলাদেশ বেতার ও বিবিসি।

 আমাদের গ্রামটা ছিল আমার কলেজ। আমি বড়ো হতে হতে আমাদের গ্রামের মাঝে গোটা বাংলাদেশের মানুষকে দেখেছি। কী বিচিত্র এদের কামনা-বাসনা, জীবনযাপন!

ইচ্ছা করলেই বাড়ি থেকে পালিয়ে ঘাটুগান, যাত্রাগান আর কীর্তনের আসরে বসে যেতে পারতাম। একটা মাঠের পরে খালপারে ছিল কলুপাড়া। সেদিক থেকে তেলের ঘানির কেড়…ড়  কেড় শব্দ, অশ্লীল গালিগালাজ আর চেঁচামেচি আসত দিনরাত। তিন ঘর মুচি থাকত নদীর পাড়ে। গোপনে ভাত-পচানো মদ বেচত। নদীর ঘাটে একটা বেদে বহর ছিল। সুন্দরী সুন্দরী বেদেনি। সে এক রঙ্গমঞ্চ! ডাকাত দল ছিল একটা। দিনের বেলায় গামছার আড়ালে পাইপগান লুকিয়ে ডাকাতদের চলাফেরা করতে দেখেছি। পাশের দুই গ্রামে ছিল দুইটা ঘাটুদল। এইসব সমকামী মানুষদের মাঝে ঘাটুছেরা নিয়ে মারামারি-রক্তারক্তি লেগেই থাকত। নদীর ওপারেই ছিল একটা অলিখিত বেশ্যাবাড়ি। চোর-বদমাশ, লুচ্চা, সুদখোরসহ নানা কিসিমের মানুষের অভাব ছিল না। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়াও ছিল অনেক, ছিল শিক্ষিত চাকরিজীবী। তাই দূর্গাপুজায় শখের নাটক মঞ্চায়ন হত দুই-তিনটা। ঘাটুগান, যাত্রাগান আর ছিল কীর্তনের মিঠা সুর। একটু চোখ মেললেই সব স্তর ও স্বভাবের মানুষ দেখতে পেতাম।

প্রেম ও পরকিয়ার ঘটনা-গল্পগুলো অশ্লীল ও কামুক ভাষায় আমাদের গ্রামের মাঠেঘাটে আলোচনা হত। সন্ধ্যা হলে পাড়ায় পাড়ায় বসত ডশচ্ছার আসর। আবার ঝগড়ার সময় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করবার জন্য শত্রু পরিবারের গোপন দোষগুলো অশ্লীল ভাষায়, চিৎকার করে করে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হত। গোপন বলতে কোনো ঘটনা ছিল না। এইসব বুঝি তাদের জীবনযাপন ও চিত্ত-বিনোদনের অংশ! কয়েক বছর পর পর শুনতে পেতাম মানুষ কানাকানি করছে, ওমুকের মেয়ের পেট হইছে! ওমুক বেটি পেট ফালাইছে। দ্যাখছৎ না, শরীলডা এক্কেরে ফ্যাসকা-কাঠ হইয়া গেছে!

হিংসা, কলহ, বিকৃত যৌনতা, অশ্লীল ভাষা আর প্রকৃতির চোখ জুড়ানো ঐশ্বর্যের আড়ালে কিছু কিছু মানুষের মাঝে মানবিক প্রেম ছিল বলার মতো। তাদের চোখের চাউনি, মুখ-ঠোঁটের ঢং, মর্দামির আলাপের সময় মুখে উথলে ওঠা লালা কোৎ করে গিলে ফেলার ভঙ্গিসহ সব নজর করে দেখতে আমার ভালো লাগত। রবীন্দ্রনাথ, তলস্তয় অর্থাৎ বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিকগুলো পড়ার সময় তাদের গল্পের চরিত্রগুলোকে আমরা এক-দুই বাক্যেই পষ্ট চিনতে পারি। যেমন হারুকি মুরাকামির ’অন্ধ উইলো আর ঘুমিয়ে পড়া মেয়ে’ নামক  গল্পে প্রধান চরিত্র তার স্কুল-পড়–য়া ভাগনেকে কানের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ সে কানে কম শুনতে পায়। তো সেই গল্প থেকে একটু শুনাই, ’ভাগনে আমার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ডান কানটা আমার দিকে একটু উঁচু করে ধরে বসে। সুন্দর শেপের একটা কান আছে ওর।’

আমাদের বাড়ির তিন বাড়ি পরে কুতুব চাচার ঘর। কুতুব চাচার মাকে আমরা ডাকতাম লাল দাদি। প্রায় হাড্ডিসার এবং খুব ফরসা মানুষ। লাঠি হাতে সারাদিন বারান্দায় বসে থাকত। একটা নোংরা কাপড়ের পুটলির ভেতর থেকে গলা বাড়িয়ে প্রাণহীন সিসি ক্যামেরার মতো সব নিরীক্ষণ করে চলেছে। থুবড়ানো মুখটা সেলাই কলের মতো অবিরত চলছে। বুড়ির বুড়া তখনও জীবিত। বুড়া পশ্চিমের ঘরে একা থাকে। বুড়ি তার স্কুল-পড়–য়া নাতনিদের নিয়ে পুবের ঘরে থাকে। সেই বয়সেও কোনো কোনো রাতে বুড়া উঠে এসে বুড়ির দরজায় নাকি চোরের মতো ডাকেন, কুতুবের মা?

বুড়ি উঠতে চায় না। নাতনিদের হাসাহাসিতে বুড়ি খালি রাগ করে। তবু নাতনিরা ঠেলেঠুলে বুড়িকে দাদার ঘরে পাঠায়। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিরাবরণ, নির্লজ্জ-সুন্দর এক আমুদে আমাদের গ্রামটা কত রকমেই না হেসেছিল! তখন না বুঝলেও আজ ভাবতে গিয়ে বুঝি, মানুষের যৌনতা কোনোদিন ফুরায় না।

হাড়-মাস-রক্ত, চুল-চোখ-চামড়াসহ সব থাকবে এইসব মানুষের। আত্মা আমার। মায়ের গর্ভ থেকে আসার সময় আমার হাত দুইটা ছিল মুষ্ঠিবদ্ধ। ’আমি ও আমার’ এই দুইটা পৃথিবী দুই হাতের মুঠিতে ধরে নিয়ে এসেছিলাম। মায়ের আঁচলের তল থেকে বেরিয়ে দেখি সব ফোক্কা! সব ভেজাল এবং বেদখল! তাই আমি আমার নিজেকে লিখি। আমার মনের মতো একটা জীবন খুঁজি।

শুদ্ধস্বর: আপনি কি মনে করেন সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব রয়েছে বা থাকা উচিত ? আপনার অভিজ্ঞতা এবং পঠনপাঠনের আলোকে বলুন।

শেখ লুৎফর: আমি রাজনীতির সাথে অর্থনীতিকে মিলিয়ে দেখি। আমাদের মাথাপিছু আয় টেনেটুনে মাত্র তিন হাজারের ঘরে উঠতে চাইছে। মানুষ সতেরো কোটি। কোটিপতি মিলিয়ন মিলিয়ন! তার মানে স্পষ্ট দুইটা শ্রেণি :

১. লুটেরা ও ভোগী।

২. ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী।

কয়েক দশক পর এই রাক্ষসের দেশে মধ্যবিত্ত বলতে কিচ্ছু থাকবে না। একটা রাষ্ট্রকাঠামোর ভারসাম্য হচ্ছে মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে বলেই শুধু আমাদের না বিশ্বরাজনীতিও বদলে যাচ্ছে। এখন জীবাত্মাধারীদের দৌরাত্ম্য মরবার সময়ও আপনাকে ভাবতে হবে, এই কোন দেশ, পৃথিবী! কোথায় রেখে যাব আমার সন্তানকে?

’ওয়ার অ্যান্ড পিস’ শুরুই হয়েছে রাজনীতির আলাপ দিয়ে। সারাটা উপন্যাসে রাজনীতির পাশা খেলা। পড়তে পড়তে কামানের শব্দ, বারুদের গন্ধ আর পোড়া-পচা-মাংসের দুগন্ধ নাকে লাগে। কোন ক্লাসিকটাতে রাজনীতি নাই?

শুদ্ধস্বর: এমন একটি ছোটোগল্প সম্পর্কে বলুন যা আপনাকে কাঁদিয়েছে বা আপনার চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

শেখ লুৎফর: সময় চেতনা ও বাস্তবতা গল্পের হাড়-মাংস। চোখ-নাক-মুখের মতো জীবন্ত ভেসে থাকতে হবে ভাব-ভাষার কাজ। গল্পের হৃদয়টা হবে লেখকের। মাঝে মাঝে পাঠককে জাগিয়ে দেবার জন্য, চরিত্রের সুখ-দুঃখের মাঝে টেনে নেবার জন্য কামানের গোলার মতো দুই-একটা ডায়ালগ চাই। গল্পের চরিত্র, বিষয়, ভাব, আঙ্গিক কিংবা কোনো চরিত্রের চোখের চাউনিটা পর্যন্ত হবে যুক্তিসঙ্গত এবং স্কেল-কাঁটা-কম্পাস দিয়ে মাপা। উদাহরণ : তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পটা আমাদের পাঠ্য। রাতে টেবিলে বসে জোরে জোরে পড়ছি। পাশের বিছানায় মা শুয়ে শুয়ে তছবি জপছেন। পড়তে পড়তে এক সময় নিজের মাঝে পিতৃহীন ফটিককে দেখে কেঁদে ফেলি। আর শুনি বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন আমার মা।

শুদ্ধস্বর: আপনার গল্প লিখতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকরণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তে এবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

শেখ লুৎফর: লেখায় যারা নিজেকে ভাঙতে পারেন না তারা টাইপ হয়ে যান। পাঠককে আনন্দ দিতে ব্যর্থ হন। এই যে কাঠামো ভাব-ভাষা ইত্যাদির কথা বললেন আর বললেন ফর্মের কথা, আমি চেখভকে যতটুকু পড়েছি তা থেকে বলতে পারি, তাঁর গল্পের প্রত্যেকটা চরিত্র স্থান-কাল, স্বভাব ও পেশামাফিক নিজের অবস্থান থেকে জীবন্ত উঠে দাঁড়ায়। কথা বলে। সেই কথা পৃথিবীর সব মানুষের কথা হয়ে যায়। পাঠের সাথে সাথে লেখার মাঝে পাঠক তার নিজের মুখটাও দেখতে পায়।

চেখভের ’৬ নং ওয়ার্ড’ এর কথাই ধরুন : ছোট্ট একটা ওয়ার্ডের সবগুলো মানুষের নিয়তি এক হলেও তাদের চিন্তা, আচরণ ও ভাব-ভাষা আলাদা ও বৈচিত্রে ভরা। নিয়তিতাড়িত এই মানুষগুলোর দুর্ভোগের জীবন চেখভকে গল্পের কাঠামো ভাব-ভাষা দিয়েছে কিংবা লেখক তাদের কাছ থেকে নিয়েছেন। আর লেখকের অন্তরের কথাটা বলে দেবার জন্য আয়োজনটা তিনি করেছেন নিজের মতো করে। জীবনের কঠিনতম সত্য বলতে গিয়ে পাঠককে স্তম্ভিত করে বলির কাষ্ঠে ঠেলে দিয়েছেন আন্দ্রেই ইয়েফিমিচকে। এই ছিল তার নিয়তি।

কোনো লেখাই আমি দুম করে শুরু করি না। পারি না। বিষয়টা পাওয়ার পর চরিত্রের তালাশে থাকি। লোকেশন ও সময় বাস্তবতা খুঁজি। পাত্র-পাত্রীদের রঙ্গভূমিটা ঘটনার সাথে সাজাই। প্রধান চরিত্রটা পেয়ে গেলে শুরু হয় বাকিদের সাথে চেনাজানা। জারণ-বিজারণ। তাদেরকে মাথায় নিয়ে ঘুমাই। তারা আমার বন্ধ চোখে উঁকিঝুঁকি মারে। স্বপ্নে ঘুরাফেরা করে। এইভাবে তাদের চলাচল, কথাবার্তা, দেহ-মনের গড়ন-গাড়ন ও চিন্তার ধরন অনেকটা ধরে ফেলি। খাতায় নোট নিতে থাকি। তারা আমাকে ভাব দেয়, ভাষা দেয়। আমি আমার প্রাণের অংশ দিয়ে বানাতে বানাতে তারা হয়ে ওঠেন আমার নিজের মানুষ, আমাদের চারপাশের পরিচিত মানুষ মক্কে, নিশি কিংবা ’লুকা টি স্টল’ এর লুকা ।

আমার কাছে সব চেয়ে কঠিন নতুন লেখা শুরু করা। বাউলের ভাষায় আঠারো মোকাম মারতে হয়। ভাবতে হয়। আগে যা লিখেছি, যে সুরে কথা বলেছি তার একটা কণাও আর চাই না। নতুন বউ কিংবা নতুন চাকরির মতো নতুন গল্পের আয়োজন-উপকরণ একদম ইনটেক চাই। আরবিতে একটা প্রবাদ আছে, ’মান যাদ্দা ফাওয়া যাদা’ যে চায় সে পায়। একদম আনকোরা চাইলে কিছুটা হলেও তো তরতাজা মিলবে? আর তা হলে তো ফর্ম ভাঙবেই। এবং লিখতে লিখতে গড়ে উঠবে আরেকটা নতুন ফর্ম।

শুদ্ধস্বর: আপনার কাছে একটি সার্থক ছোটোগল্পের মূল উপাদান কী?

শেখ লুৎফর: মুহূর্ত। জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বা বিশেষ একটি মুহূর্ত। এবং চিরকালীন। তাই কবিতার মতো ছোটোগল্পের শুরু কিংবা শেষ নাই। শুধু কয়েকটা মুহূর্তের ঝলক। ছোটো ছোটো রেখার টান। ছোটোগল্পের আত্মা, স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন ঠিক কবিতার মতো।

শুদ্ধস্বর: লেখকের রাজনৈতিক বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লেখকের কোন ধরনের ভ‚মিকা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

শেখ লুৎফর: এই জিজ্ঞাসার জবাব আগেই কিছুটা দেওয়া হয়ে গেছে। বাকিটুকু হলো : লেখকের রাজনৈতিক চেতনা ও স্বচেতনতার অভাব থাকলে লেখা সময় চেতনা ও গন্তব্য হারাতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চরিত্র বিকলাঙ্গ মানুষের মতো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। লেখকের হয়ে ন্যায়-সত্য ও সুন্দরের পক্ষে, সাধারণের পক্ষে কথা বলবে কে? গল্পের চরিত্ররাই তো? এখন মানুষের হাঁচি-কাশি, হাগা-মুতা সব নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। সুষম খাদ্যের অভাবে লেখকের সন্তানরা যদি অপুষ্ট হয় তবে এই অজ্ঞানতার দায় নিবে কে?

শুদ্ধস্বর: আপনি এখন কি লিখছেন? আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে পাঠকদের কিছু বলুন।

শেখ লুৎফর: লেখালেখি আমার আত্মচর্চা। গোপনে চলে। এখন বলে ফেললে পরে তো ওটা আর্বজনাও হতে পারে?

বাউলদের সাক্ষাৎকার নেবার জন্য বর্তমানে আমি খুব ঘোরাঘুরি করছি। এক সময় আমি ভারত-বাংলা সীমান্তের কাছে মাস্টারি করতাম। চোরাকারবারিদের সাথে খাতির-মহব্বত হয়ে গেছিল। ছুটির দিনে চোরাকারবারিদের সাথে চলে যেতাম মেঘালয়ের খাসিয়া বাজারগুলোতে। রেঙ্গা-মডং-চেলা আরও কত নাম! লংত্রাই, লাউবা, মুশরাম ইত্যাদি ইত্যাদি নামের তিন হাজার ফুট উঁচু উঁচু পাহাড়! যেতাম শুধু পাহাড়, ঝরনা আর বিশাল বিশাল বৃক্ষ দেখার লোভে। দিনের পর দিন হাঁটতাম। মিশতাম খাসিয়া মেয়েদের সাথে। ওরাই পরিবারের হর্তাকর্তা। মাঝে মাঝে রাত হয়ে গেলে থেকে যেতাম ওদের টং ঘরে। ওরা আমাকে বলত, বাঙাল বন্ডু। দেখলেই কোকিলের মতো সুর করে দূর থেকে ডেকে উঠত, ও… ও…লাভিয়াং।

ওদের প্রেম-প্রণয়, আহার-বিহার খুব কাছে থেকে দেখেছি। খাসিয়া বাংলা ভাষাও একটু একটু শিখেছিলাম। দেখেছি বাঙালি চোরাকারবারিদের ধূর্ততা, নিষ্ঠুরতা আর নির্লজ্জ যৌনতা। কী এপারের বাঙালি, কী ওপারের খাসিয়া, সীমান্তের অধিকাংশ মানুষ ভয়াবহ একটা রোগে ভোগে। তার নাম হঠাৎ বড়োলোক হওয়ার স্বপ্ন। প্রচুর টাকার স্বপ্ন। সেই নিয়ে একটা উপন্যাস শুরু করেছি। নাম তার ’কামিনী ও কাঁটাতার’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!