করোনাভাইরাস: নজিরবিহীন সঙ্কটে বাংলাদেশের গণমাধ্যম | ঈয়ন

0

বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত করোনাভাইরাসের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে ঢাকার মূলধারার চারটি দৈনিকের মুদ্রণ, তিন মাসের বেতন বকেয়া রেখে পুরোপুরি গুটিয়ে গেছে আরেকটি পত্রিকা, কমেছে শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর কলেবর। ইতিমধ্যে বেসরকারি এক টেলিভিশন চ্যানেলের এক সাংবাদিক আক্রান্ত এবং আরো ৪৭ জন কোয়ারেন্টাইনে, বিজ্ঞাপন বিলও পাচ্ছে না কেউ। এরই মধ্যে গুজব ঠেকানোর কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত  অলাভজনক গণমাধ্যম রেডিও ফ্রি এশিয়ার (আরএফএ) সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেনারনিউজসহ বেশকিছু ওয়েবসাইটের প্রচার বন্ধ করার কথা জানিয়েছে সরকার।

 

সামগ্রিকভাবে চলমান বৈশ্বিক মহামারীটি দেশের গণমাধ্যমকে যে সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, পেশাগতভাবে সাংবাদিক হওয়ার কারণে শুরু থেকেই তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম। আলাপে সাংবাদিক নেতারা এ পরিস্থিতিকে নজিরবিহীন দাবি করেছেন। আর এর জন্য গনমাধ্যমের গণবিচ্ছিন্নতাকে দায়ি করেছেন বিশ্লেষকরা।

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খন্দকার আলী আর রাজি বলেন, “বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্য এই পরিণতি এড়ানো কঠিন ছিল। কারণ মানুষের সংবাদ কেনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ-এগুলো গড়ে ওঠেনি। আবার যে ধরনের সংবাদের জন্য মানুষ মূল্য দিতে রাজি, সে ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে না তারা।”

 

তাঁর মতে, “ভোক্তার চাহিদার সাথে সম্পর্কহীন সংবাদমাধ্যম যে টিকে থাকার কথা না তা এ মুহূর্তে কিছুটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। করোনা না এলেও এগুলো এই পরিণতির দিকেই আগানোর কথা।”

 

“এই পরিস্থিতিতে বাজারে যে ত্রুটিগুলো আছে সেসব সংশোধিত হতে পারে,” উল্লেখ করে এই শিক্ষক আরো বলেন, “তবে ইতিহাস বলে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম সরকারকে বিবিধ সেবা দেওয়ার মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব একভাবে রক্ষা করে চলবে।”

 

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)-এর পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ও দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি শেখ মামুন-অর-রশীদের দাবি, “বর্তমানে ডাক্তার, নার্স আর আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে গণমাধ্যমকর্মীরা। এই অবস্থায় মালিকদের উচিত ছিল অনেক বেশি মানবিক এবং সুবিবেচনা প্রসূত আচরণ করা।”

 

“বেতন পরিশোধের উদ্যোগ কোনো নেই, অথচ পত্রিকার মুদ্রণ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়িদের পাশাপাশি বড় ব্যবসায়িদের পত্রিকাও রয়েছে এই তালিকায়। এই অবস্থা সংবাদমাধ্যমকে বিপন্ন করে তুলবে বলে আমি মনে করি,” যোগ করেন তিনি।

 

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাহী সদস্য শেখ মামুন আরো বলেন, “যদি কোনও গণমাধ্যম মালিক মনে করেন, করোনা পরিস্থিতেকে পুঁজি করে কর্মীদের বেতন আটকে রেখে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন, শত শত মানুষকে বেকার করবেন, তবে সাংবাদিক ইউনিয়ন বসে থাকবে না, অবশ্যই দাঁত ভাঙা জবাব দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আমরা রাজপথে নামবো।”

 

ইংরেজী দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ৮ এপ্রিল থেকে মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে সোমবার থেকে দৈনিক বাংলাদেশের খবর এবং গত ২৭ মার্চ থেকে দেশের একমাত্র ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিনের ছাপানো হচ্ছে না। তবে পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন চালু রয়েছে।  সংকট পুনরায় মুদ্রণ শুরুর কথাও জানিয়েছে তারা। তবে ৪ এপ্রিল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকাটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়, কর্মীদের বেতনভাতা বকেয়া রেখে। এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা ও ইংরেজী দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ আরো কিছু পত্রিকা তাদের প্রাত্যাহিক আয়োজন কমিয়ে এনেছে।

 

ইতিমধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই সংবাদপত্র বিক্রি ৫০ শতাংশ কমে গেছে বলে ঢাকা ভিত্তিক সংবাদপত্র হকারদের সংগঠন সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির বরাত দিয়ে জানিয়েছে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)। এই পরিস্থিতিতে করোনার কারণে উদ্ভুত গণমাধ্যমকর্মীদের সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২০ কোটি টাকার প্যাকেজ প্রণোদনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।

 

গত পহেলা এপ্রিল বিকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিক নেতারা একটি লিখিত প্রস্তাব তার হাতে তুলে দেন। মন্ত্রী সেটি গ্রহণ করে বর্তমান প্রতিকূল পরিবেশে সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, ‘মানুষকে সচেতন করতে এবং কেউ যাতে জনমনে গুজব-বিভ্রান্তি-আতঙ্ক ছড়াতে না পারে, সেজন্য গণমাধ্যম ও সরকার আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।’

 

শেখ মামুন বলেন, “এই ক্রান্তিকালে সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বিভিন্ন শ্রেণীপেশার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি গণমাধ্যম-বান্ধব, গণমাধ্যম কর্মীদের দুরাবস্থা সম্পর্কে জানেন। তিনি এ ব্যাপারে অবশ্যই পদক্ষেপ নেবেন।

 

এর আগে করোনাভাইরাস সঙ্কটের কারণে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছে এডিটরস গিল্ড বাংলাদেশ। সংগঠনের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু সাক্ষরিত এক বিবৃতিতে গণমাধ্যমের জন্যও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়।

 

মোজাম্মেল বাবু বলেন, “বাংলাদেশের গণমাধ্যম অতীতে অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে। তবে এবারের মতো বৈরী পরিস্থিতি সাম্প্রতিককালে আর আসেনি। গণমাধ্যম উদ্যোক্তাদের ভাবতে হচ্ছে, চলমান সংকট দীর্ঘ হলে তারা তাদের সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বেতন দেবেন কোত্থেকে? সংকটের সময় নিজস্ব সঞ্চয় থেকে সাংবাদিক, কর্মচারীদের মজুরি প্রদানসহ তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

 

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, করোনাভাইরাসের প্রভাবে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি গণমাধ্যম। টানা ১০ দিনের ছুটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় পত্রিকার বিলি ও বিতরণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অনলাইন ও সম্প্রচার মাধ্যম ঝুঁকি নিয়ে অফিস খোলা রেখে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞাপন কমছে দ্রুতগতিতে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন বিলে কালেকশন একদম বন্ধ হয়ে গেছে। কোনও কোনও সংবাদপত্র পৃষ্ঠা সংখ্যা কমিয়ে, কেউ বা প্রকাশনা বন্ধ করে অনলাইনে সংবাদ প্রকাশ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।”

 

ফেসবুকে আমাদের ‘আমাদের গণমাধ্যম-আমাদের অধিকার’ নামে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি গোষ্ঠী রয়েছে। সেখানে চ্যানেল আইয়ের সাংবাদিক মোহাম্মদ ইফতেখার লিখেছেন, “গণমাধ্যমকর্মীদের অবস্থা পোশাক শ্রমিকদের চেয়েও খারাপ! অনেকগুলো লোক ছাটাই হলো। করোনার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, ওভারটাইম বাদ দিলাম, বেতন খুব সামান্য, ঠিকমতো পাচ্ছে না, বকেয়া বেতন রেখেই চাকরি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। তাদের অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলার কেউ নেই।”

 

বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকা আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিবেদক সাজ্জাদ মাহমুদ খান লিখেছেন, “সংবাদকর্মীরা অস‌ুস্থ হ‌লে অ‌ধিকাংশ ক্ষে‌ত্রে অ‌র্জিত ছু‌টি কাটা হ‌বে,তারপর বেতন কাটা হ‌বে, এরপর রিজাইন লেটার ধ‌রিয়ে দেওয়া হ‌বে। কিছু মি‌ডিয়া মন্দার গল্প ‘মাইরা’ ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু ক‌রে‌ছে। বসরা বোগল বাজা‌বে আর নেতারা টুপাইস কামা‌বে। য‌দিও স্বাস্থ‌্যকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বা‌হিনীর প্রায় সমান ঝুঁ‌কি নি‌য়ে সংবাদকর্মীরা কাজ ক‌রেন।”

 

রংপুর, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকার আঞ্চলিক গণমাধ্যমগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর মিলেছে। যদিও সমস্যাটা বৈশ্বিক। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে অস্ট্রেলিয়ায় আঞ্চলিক ৬০টি সংবাদপত্রের ছাপা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।  এই খাত নতুন সংকটের মুখে পড়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে পহেলা এপ্রিলই  জানায় রুপার্ট মারডকের অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া গ্রুপ নিউজ কর্পোরেশন।

 

এমন সময়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার-সমালোচকদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু গুজব ঠেকানোর কথা বলে যে অভিযান চলছে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার কঠোরতা প্রদর্শন করছে বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সরকার বাক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করছে বলে বিবৃতি প্রকাশ করেছে তারা।

 

“গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের দায়ে” কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেবার কথা জানিয়েছেন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জহুরুল হক।  এর আগে পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা জানিয়েছিলেন, ফেসবুকের ৮২টি অ্যাকাউন্ট, পেইজ এবং ওয়েবসাইট সম্পর্কে পুলিশ খোঁজখবর নিচ্ছে।  গুজব ছড়ানোর অভিযোগে চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং কিশোরগঞ্জ থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  আরো ৫০টি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিটিআরসিকে অবহিত করেছে পুলিশ।

 

এর আগে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকারের অদক্ষতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তোলা দুই সরকারি কলেজের দুইজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুলের এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক বিদেশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথে মিলে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে দেখানো হয়, সরকার যদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না করে তাহলে মে মাসের মধ্যে পাঁচ লাখ লোক মারা যেতে পারে। যার জেরে ওই দুই গবেষকও চাপে পড়তে হয়েছে।

 

সামগ্রিক এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আলী আর রাজি বলেন, “আমি এই সবগুলো ঘটনাকে একইভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা প্রচলিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে না। রাষ্ট্রজনরা সরকারকে জবাবদিহিতায় আনতে সর্বার্থে ব্যর্থ হয়েছে। এই অবস্থায় মানবাধিকার বা অন্য যে কোনো নাগরিক অধিকার চাওয়ার অধিকারটি স্থগিত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রজন ও সরকারের পারস্পরিক দায়বদ্ধতার সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর রাষ্ট্রে যেসব অরাজকতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হয়, এই সবই তার অন্তর্গত।”

 

Sharif Khiam Ahmed Eon, a youth in his thirties, is adept in using the pen and camera. With his knack for multimedia journalism, he is a popular face in his arena, fondly known by his nickname Eon. He works in poetry, screenplay, photography, and filmmaking, and he is well-known in the industries of film, advertisement, and literature.

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »