করোনায় আড্ডা নেই, নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পৃথিবী | মাসুদুল হাসান রনি 

0

সময়টা খুব খারাপ পৃথিবীর জন্য। অদৃশ্য জীবানুর আক্রমনে গোটা পৃথিবী আজ থরো থরো কম্পমান। মহাশক্তিধর রাস্ট্রগুলোকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে করোনা। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা শুনতে শুনতে হাঁপিয়ে উঠেছি। শুধু কি হাঁপানো?  আতংকিত হচ্ছি যতোটা নিজের জন্য তারচেয়ে বেশী স্বজনদের জন্য। প্রতিনিয়ত  শুভ কামনা চাইছি গোটা মানবকুলের জন্য।

হোম কোয়ারান্টাইনের দিনগুলো বড্ডবেশী একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। আজ তেইশ দিন গৃহবন্দী ব্যাচেলর জীবন। এ কদিনে প্রতিদিনের রুটিন এলোমেলো হয়ে গেছে। ঘুম থেকে দেরিতে ওঠা। গরম চায়ের মগে চুমুক দিতে দিতে অনলাইনে চোখ বুলানো। সিগারেটে আয়েশী টান দিয়ে ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রলিং করতে করতে সময় গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায়। হোম কোয়ারান্টাইনের দিনগুলোতে ফেসবুক না থাকলে কি যে হতো!

প্রিয় মানুষটি কাছে  থাকলে বিরক্ত হত। ঠিক বলে ফেলতো ‘এই অনেক  হয়েছে, ফেসবুক।’

অথচ সে নিজেই প্রতিদিন ফেসবুক খুলে এটা ওটা ‘লাইক’ দেয়। আর আমি সারাদিন মুভি দেখি, গান শুনি, রান্নাবান্না করি। ফেসবুকে নিজ হাতের রান্নার  ছবি পোস্ট করি আর হাবিজাবি লিখি। ফেসবুক বন্ধুও বিস্তর। খেয়াল করেছি, তাঁরা ছবিতে বেশি ‘লাইক’ দেন, লেখায় কম। লেখা পড়তে তাদের প্রচন্ড অনীহা কেন বুঝি না। অনেকেই লেখা না পড়ে  ‘অনবদ্য’, ‘অসাধারণ’ ইত্যাদি বিশেষণ বা ‘আপনার মতো অমুক হয় না’ গোছের বাক্য লেখেন। সত্যি বলছি, বেশ লাগে। প্রশংসা শুনতে কে না চায়?

অনেকে অনেক বিষয় নিয়ে ট্রল করেন। আমার আবার বদভ্যাস হল বেশিক্ষণ ‘ট্রল’ সহ্য করতে না পারা। এটা কেন যেন বদজম হয়। অনেকে  স্ট্যাটাসে গালিগালাজ  করেন। কিন্তু যখন দেখি তা মাত্রা ছাড়াচ্ছে বা কিছুই নয়, অহেতুক এটেনশান সিকার ঝোঁক কারও মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তাই চট করে আনফ্রেন্ড করে দিই। এর একটা কারণ খুব বেশি ঝগড়াঝাঁটি আমার দ্বারা হয় না, সুস্থ বিতর্ক ভাল লাগে কিন্তু কারও নিজস্ব পরিসরে নাক গলানোকে অপছন্দ করি। কারো কোনও  রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে আমার হাজারটা ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু ফেসবুকে তার সাথে অহেতুক তর্কে জড়াই না। আমার নানাবিধ দুর্বলতার মধ্যে এটাও আছে যে যাকে একবার বন্ধুর তালিকা থেকে সরিয়ে দিলাম মানে তার প্রতি রাগ পুষে না রাখা।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর সূত্রে আজকাল যা খুশি চলছে। রাজনৈতিক গালিগালাজ তো একপ্রকার ধরাছোঁয়ার মধ্যে রাখা যায়। এই মাধ্যমগুলিতে নীচতা অতিক্রম করেও কিছু চমৎকার বিতর্কের পরিসর তৈরি করা সম্ভব। আত্মপ্রকাশের উন্মুক্ত ময়দানে স্ব-আরোপিত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব নিজস্ব তর্কশীলতার ক্ষমতা। বিতর্কে অংশ না নিয়েও ‘একা একা’ কেউ চমৎকার কবিতা বা গল্পও লিখতে পারেন। জোকস লিখে মজাও করতে পারেন।আমি কিন্তু মনেপ্রানে চাই ইউজাররা সৃজনশীলতা নিয়ে কথা বলুক। সিনেমা নিয়ে কথা বলুক। তর্ক করুক শিল্প সাহিত্য নিয়ে, তর্ক করুক মুক্ত অর্থনীতি নিয়ে। ভাল লাগে এ সব। বস্তুত এই পরিসরে এ সবের সুযোগ এতটাই বেশি এবং প্রযুক্তির কল্যাণে এত অভিনব যে মাঝে মধ্যে তাক লেগে যায়।

সব কিছু কেমন টেকনিকাল ভাষা। অভিভাবক আর বন্ধুদের ভাষার মধ্যে প্রযুক্তির স্বচ্ছন্দ অনুপ্রবেশ। এত প্রযুক্তির ধাপ পেরিয়ে, ঠাট বজায় রেখে প্রকৃত বন্ধুত্ব হয় কি? অভিভাবকও কি পারেন তাঁর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে? মোবাইল বা প্রোফাইল লক করে দিলেই তো হল।

আমাদের ফেলা আসা নিকট অতীতের মতন এখন নেই মা, বাবার আগের সেই  বকুনি, ‘আজ ফিরতে এত দেরি হল কেন? যাও দ্রুত ফ্রেশ হয়ে পড়তে বসো।

এ যুগে এসব বড্ড অচল। আমার তো মনে হয় ছেলেমেয়েরা  বাড়ি ফিরে নিজ রুমে ঢুকেই ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে ডুবে যায়। গ্লোবাল ভিলেজে ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের সাথে সময় কাটে তাদের। শুধু কি তাদের, আমরাই বা বাদ যাচ্ছি কেন!

 

২.

আসলে বন্ধুত্বের ধারণাটাই ক্রমে পাল্টে যাচ্ছে। আগে মনে করা হত, তোমার অসময়ে যে তোমার পাশে আছে সে-ই বন্ধু। সে উৎসবেও থাকবে। ফেসবুকের কমেন্ট আর লাইক কখনও সেই জায়গা নিতে পারে না। যদিও সেখানে বন্ধুর সংখ্যা বাস্তবের তুলনায় বেশি। এক এক জনের এতটাই বেশি যে, তাঁরা গর্ব করে বলেন, ‘আমার এত বেশি বন্ধু যে একটা প্রোফাইলে হচ্ছে না, আর একটা খুলেছি।’ শুনলে হাসি পেয়ে যায় বটে, কিন্তু এটা দম্ভোক্তি নয়, অসহায়ত্ব। বাস্তবের হাসি-কান্না, ঝগড়া আবার গলাগলি থেকে এই ব্যক্তি সরে গেছেন অনেকটা। স্মৃতি এঁকে জ্বালায় না। প্রাক-ফেসবুক দুনিয়ায় ইনি কিছু খুঁজে পান না। প্রযুক্তি নির্ভর কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়িয়ে অলীক বন্ধুত্বকে নিয়তই সাদরে বরণ করে নেন।

বন্ধুত্বের বন্ধন অবশ্যই বয়স নিরপেক্ষ। সমবয়সীদের সখ্য যেমন থাকে, প্রতিযোগিতাও  থাকে। একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার একটা ব্যাপার থাকে। ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সেই প্রবণতা ধরা পড়ে। শুধু নিজেকে দেখানো নয়, অন্য সমবয়সী বন্ধুদের তুলনায় আমি কতটা এগিয়েছি তা জাহির করার চেষ্টাও থাকে। তা দোষের কিছু নয়। কারও ক্ষতি তো হচ্ছে না তাতে!

ক্ষতি শুধু নিজের। কত পড়ার ছিল, কত কিছু দেখার জন্য পড়ে আছে , এখনো দেখা হয়নি বিশ্বের অপর্যাপ্ত সৌন্দর্য, অশ্রুত রয়ে গেল কত না সংগীত। এখন আর ‘বাদল রাতে’ কেউ ‘আমিও একাকী, তুমিও একাকী’ থাকে না। ফেসবুক নড়াচড়া করে। অথচ ওই অনাবিল সঙ্গহীনতাই পরম সৃষ্টির পাথেয়। বাস্তবের যন্ত্রণা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডকে ছাপিয়ে যায়। ‘প্রকৃত সত্য সর্বদাই কল্পলোকের চাইতে অধিকতর আশ্চর্যজনক।’

সমবয়সী বন্ধুরা আমার পাশে সর্বদাই দাঁড়িয়েছে। কঠোর দুঃখের দিনে, আনন্দে আবার ফেসবুকেও। হোম কোয়ারান্টাইনের দিনগুলোতে আমার একাকীত্বের সময়গুলো ওরাই গ্রুপকল, ভিডিও কলে মন ভরিয়ে দিয়েছে। আমার এই বন্ধুদের  প্রত্যেককে আমি অত্যন্ত ভালবাসি।

কিন্তু অসমবয়সি বন্ধুত্ব ? তাঁরা যদি নিকটাত্মীয় হন তবুও আত্মীয়তা নয়, ‘বন্ধুত্ব’। যেমন ছিল আমার বেশ ক’জন নিকটাত্মীয়। যাঁদের সঙ্গে জগতের সব কিছু নিয়ে প্রাণ খুলে আড্ডা দেওয়া ছিল আমাদের বিশেষ আনন্দের কাজ।আমার এক ফুপাতো বোন আছে ,যার সাথে দেখা হয় কালেভদ্রে।কিন্তু ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সে আমার মন খারাপ সময়ে অসংখ্য  জোকস পাঠিয়ে মন ভাল করে দিয়েছে। আরেক ভাই ,অনেক ছোট কিন্তু তার সাথে সুচিত্রা-উত্তম , ববিতা-রাজ্জাক, হালের পরী মনি-শাকিব ,  মান্না-হেমন্ত , রুনা- বন্যা , সাকিব-তামিম-মাশরাফি , ক্রিকেট-ফুটবল— কী ছিল না আমাদের আড্ডার বিষয়! আরেক পাড়াতো বড়ভাই আমাকে প্রথম চিনিয়েছিলেন রবীন্দ্রসাহিত্যের ভুবন।  যে কোনও ভাল বই পেলেই হাতে করে উপহার দিতেন । এঁদের সঙ্গে কোনও দিন কোনও প্রতিযোগিতা ছিল না। আজও নেই। ফেসবুকহীন জগতে এঁরা আমাদের শৈশব-কৈশোর-যৌবনকে ঋদ্ধ করেছিলেন। বেশির ভাগই চলে গেছেন। তবু স্মৃতিতে অমলিন।

আজকের প্রজন্ম দেখে যে কেউ আড্ডা মারে না, খেলে না। এমনকী প্রাণ খুলে হাসি ঠাট্টাও করে না। তাই কেবল ট্রল, ট্রল এবং ট্রল।

অথচ আজও ‘সব পাখি ঘরে ফেরে’। ক্লান্ত শরীর ‘জীবনের লেনদেন’-এর হিসেব চায়।সংগীহীন রাতে সোনালীজল চুমুক দেই, ফেসবুক নড়াচড়া করি। আচমকা ফোন বেঁজে ওঠে।

: ‘কেমন আছ রনি? ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’

রাত গভীরে আমার এক  পরিচিতার ফোন।  আমার এই পরিচিতার  পড়াশোনার ব্যাপ্তি আমাকে স্তম্ভিত করে দেয়।  মাঝেমধ্যে বিভিন্ন কবিতার লাইন তুলে আমার পরীক্ষা নেন। বেশির ভাগ সময়েই ফেল করি। আমিও পাল্টা চেনা কবিতার লাইন আওড়াই । তিনি মুহুর্তেই উত্তর দেন ।কি অদ্ভুত তার স্মৃতিশক্তি ।

রাত গভীর হয়। আমি ফেসবুক লগ আউট করে  ফোনে  অনেক কথা বলি। তিনি চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করেন। আমাদের অসমবয়সী বন্ধুত্ব ,দুজনের  কথা আর কবিতা থামে না।

রাত গড়িয়ে যায় ,পূবের আকাশ যখন লালাভ বর্ণ ধারন করে তখনও কবিতা থামে না।

আহা কি চমৎকার হোম কোয়ারান্টাইনে আমাদের রাতগুলি !

 

 

Masudol Hassan Rony worked as a program producer at a popular TV channel in Bangladesh, where he was also a media professional and progressive political activist. He was involved with the Bangladesh Federation of Film Societies, Short Film Forum, and Television Producers Association in Bangladesh. He has six published books. Now he is living in Canada.

 

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »