করোনা: মহামারীর রাজনীতি | সহুল আহমদ

0

ইকনোমিস্ট এই সপ্তাহে করোনা ভাইরাসকে নিয়ে সংখ্যা করেছে; সেখানে প্রচ্ছদ প্রবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে ‘কভিড-১৯: মহামারীর রাজনীতি’ছোট এই প্রবন্ধে এখন পর্যন্ত দুনিয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত বা পরামর্শের অবতারনা করা হয়েছে। আমরা যারা বাংলাদেশে বসে ক্রমাগত করোনা নিয়ে আতঙ্কে ভুগছি তারাও এই ছোট প্রবন্ধে বেশ কিছু চিন্তার ও দুশ্চিন্তার খোরাক পাবো। প্রবন্ধ অনুযায়ী, করোনা মহামারী মোকাবেলায় তিনটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে, প্রথমত, অনিশ্চয়তার প্রতি সরকারের মনোভাব, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো ও সক্ষমতা এবং তৃতীয়ত, নেতাদের বিশ্বস্ততা। বিশেষ করে, এই তিন ফ্যাক্টরের দূর্দান্ত সম্মিলনের কারণে সিঙ্গাপুর করোনার ধকল ভালোভাবে সামলে উঠেছে। এই প্রবন্ধ নেতাদের প্রতি জনগণের আস্থা ও ভরসা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রতি বারেবারে ইঙ্গিত করেছে। সরকারের পক্ষে যেকোনো পলিসি নেয়া সহজতর হয়ে যায় যদি জনগণ তাদের উপর ভরসা করতে পারে, বা বিশ্বাস করতে পারে। আর নেতারা যদি ক্রমাগত অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে যান এবং মিথ্যে বলেন, তাহলে গুজব মহামারীর চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। আমরা জানি চরম নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া এবং অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে বিদ্যমান এবং অধিকাংশ নেতাদের উপর যেখানে জনগণ আস্থাহীন, সেখানেই গুজব রটায় সহজে। সাথে যদি ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যুক্ত হয় তাহলে করোনা নিজে যতটা না আতঙ্ক, তার চেয়ে বেশি আতঙ্কিত পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের ভয় এখানেই। এই তাগিদ থেকেই ইকনোমিস্ট পত্রিকার প্রচ্ছদ প্রবন্ধের ভাবানুবাদ নিচে তুলে ধরা হলো। যেহেতু ভাবানুবাদ, মূল প্রবন্ধের সাথে উনিশ-বিশ হতে পারে।         

 

সামনে কি আসছে তা আন্দাজ করার জন্য ইউরোপে করোনা মহামারীর কেন্দ্রস্থল ইতালির সমৃদ্ধ শহর লম্বার্ডির দিকে তাকান। এর হাসপাতালগুলি বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ করে। গত সপ্তাহ পর্যন্ত তারা ভেবেছিলেন যে, তারা এই রোগটি মোকাবেলা করে ফেলতে পারবেন — তারপরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের ঢেউ আসতেই থাকে। ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ায়, কিছু কিছু হাসপাতালের ক্লান্ত কর্মীরা রোগীদের মৃত্যুর হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আনুষ্ঠানিকভবে এই সপ্তাহেই করোনাকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করে; এটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে: চীনের ছাড়া অন্যান্য ১১২টি দেশে এখন পর্যন্ত ৪৫০০০ আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১৫০০ জন মারা গিয়েছেন।  এপিডেমিওলজিস্টরা অনুমান করছেন যে, স্পেন, ফ্রান্স, আমেরিকা এবং ব্রিটেনের তুলনায় ইতালি এক বা দুই সপ্তাহ এগিয়ে আছে। মিসর এবং ভারতের মতো কম-সংযুক্ত দেশগুলো আরো পিছনে রয়েছে, কিন্তু খুব বেশি নয়। (বিস্তারিত: দেখুন)

বর্তমানকালের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে খুব কম নেতাই মহামারী এবং এর অর্থনৈতিক পরিণতির মতো কোনও কিছুর মুখোমুখি হয়েছেন – যদিও কেউ কেউ ২০০৭-০৯ এর আর্থিক সঙ্কটকে স্মরণ করছেন (দেখুন)। যেহেতু দেরিতে হলেও তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে এবং মৃত্যুর পরিমাণ বাড়বে, নেতারা শেষ পর্যন্ত এই সত্য কবুল করে নিয়েছেন যে তাদেরকে এই ঝড় মোকাবেলা করতেই হবে। তাঁরা কীভাবে এটি মোকাবেলা করবেন তা তিনটি ফ্যাক্টর নির্ধারণ করে দিবে: অনিশ্চয়তার প্রতি তাদের মনোভাব; তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো ও সক্ষমতা; এবং সর্বোপরি তাঁরা বিশ্বস্ত কি না।

অনিশ্চয়তার অনেকগুলো উত্স রয়েছে। একটি হচ্ছে SARS-CoV-2 এবং এটি যে রোগের সৃষ্টি করে, covid-19, তাকে সম্পূর্ণরূপে বোঝা যাচ্ছে না (দেখুন)। অন্যটি হচ্ছে মহামারীটির অবস্থার ওপরে। প্রতিটি অঞ্চলে বা দেশে সনাক্তহীন অবস্থাতেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। একস্থানে পরীক্ষানিরীক্ষা করে সনাক্ত করতে না করতেই অন্যান্য স্থানে এটি ছড়িয়ে পড়ছে, যেমনটি ঘটেছে ইতালি, ইরান এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে। সরকার যখন স্কুল কলেজ বন্ধ এবং ভিড় নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা আসলে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল।

চীনের সমাধান, যেটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারাও সমর্থিত হয়েছিল, তা ছিল গণ-পরীক্ষা এবং সংস্পর্শের পথানুসরণের মাধ্যমে একটি নির্মম কোয়ারেন্টিন চাপিয়ে দেয়া। এটি প্রচুর মানব ও অর্থনৈতিক ব্যয়ের (human and economic cost) বিনিময়ে এসেছিল, কিন্তু, নতুন সংক্রমণ হ্রাস পেয়েছিল। এই সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিজয়ের বেশে উহান সফর করেন, যে শহরে মহামারীটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল (দেখুন)। তবুও চীনে অনিশ্চয়তা রয়ে গিয়েছে, কারণ কেউ জানে না কোয়ারেন্টিন সীমিত হওয়ার পর সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ আসে কি না।

গণতন্ত্রী দেশগুলোতে নেতাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে জনগণ আইসোলেশন ও নজরদারির মতো চীনা কঠোর পদ্ধতি মেনে নিবে কি না। ইতালির লকডাউন মূলত স্ব-শাসিত, এবং জনগণের অধিকার খুব একটা লঙ্ঘিত হয় নি। কিন্তু, যদি এটি চীনের চেয়ে বেশি ছিদ্রময় বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি যেমন ব্যায়বহুল হতে পারে তেমনি অনেক কম কার্যকর হতে পারে। (দেখুন)

ফলপ্রসূতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামো ও সক্ষমতা উপরও নির্ভর করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং কখন বাড়িতে বিচ্ছিন্ন থাকতে থাকতে হবে এই বিষয়ে পরষ্পরবিরোধী সংবাদ ও অসঙ্গতিপূর্ন নির্দেশনার প্রচুর সুযোগ থাকে। প্রতিটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভারাবনত হয়ে উঠবে। শরণার্থী শিবির এবং বস্তিদের মতো যে সকল স্থানে স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল, সেগুলো সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ হবে। এমনকি ধনী দেশগুলোর উন্নতমানের হাসপাতালগুলোকেও ঝাক্কি পোহাতে হবে।

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার মতো সার্বজনীন ব্যবস্থাগুলোর জন্য খণ্ডিত, বেসরকারী সংস্থাগুলোর তুলনায় সম্পদ ব্যবহার করা এবং নিয়ম ও রীতিগুলি গ্রহণ করা আরও সহজ হওয়া উচিত (দেখুন)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সম্পদ এবং চিকিত্সা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। এর ব্যক্তিগত ব্যবস্থা ফি-পেয়িং ট্রিটমেন্টের জন্য কার্যকরী। আমেরিকার ২৮ মিলিয়ন বীমাবিহীন ব্যক্তি, ১১ মিলিয়ন অবৈধ অভিবাসী এবং সিক-পে ব্যতীত বিরাট সংখ্যক মানুষ – তাদের সকলেরই পরীক্ষানিরীক্ষা ও আইসোলেশন এড়ানোর অনেক কারণ রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পর্যাপ্ত পরীক্ষা নিরীক্ষাকে মারাত্মকভাবে বিলম্বিত করছে। (দেখুন)

অনিশ্চয়তার তৃতীয় ফ্যাক্টর হবে— বিশ্বাস। বিশ্বস্ততা নেতাদেরকে কোয়ারেন্টাইন এবং স্কুল-কলেজ বন্ধের মতো সামাজিক দূরত্ব তৈরি করা বিষয়ক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার লাইসেন্স প্রদান করে। ইরান সরকার দীর্ঘকাল ধরে জনগণের কাছে অজনপ্রিয় হওয়াতে, মৃত্যু এবং আক্রান্তের ঘটনাকে আড়াল করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। বিদ্রোহী আলেমরা এই কারণে মসজিদ-মাদ্রাসা বন্ধ করতে অস্বীকার করতে পারেন, এমনকি যদিও তাঁরা সংক্রমণ ছড়িয়ে দেন। (দেখুন)

রাজনীতিবিদরা সত্য গোপন করছেন এই সন্দেহের চেয়ে বেশি আর কোনো কিছুই গুজব ও ভয়ে ইন্ধন জোগায় না। তারা যখন আতঙ্ক এড়ানোর জন্য হুমকিটাক ভুলভাবে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেন, তখন আরো বিভ্রান্তির জন্ম দেন, আরো কিছু জীবনের ক্ষতি হয়। তবুও, মহামারী সম্পর্কে কীভাবে কথা বলতে হবে তা বুঝতে নেতাদের ভালো লড়াই করতে হচ্ছে। বিশেষত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শত্রুদের আক্রমণের মাধ্যমে ভিত্তিহীন আশার বাণী শোনানো থেকে বিরত রয়েছেন। এই সপ্তাহে তিনি ৩০ দিনের জন্য ইউরোপে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিলেন; কিন্তু যে রোগ ইতোমধ্যে আমেরিকার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে সে রোগের গতি কমাতে এই নিষেধাজ্ঞা খুব অল্পই কার্যকর হবে। মানুষ যখন বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনদের মৃত্যু দেখবে তখন সে দেখবে যে এই মহামারীকে বিদেশী, ডেমোক্রেট বা সিএনএন কারো ষড়যন্ত্র বলে দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না।

রাজনীতিবিদদের তাহলে কি করা উচিৎ? প্রতিটি দেশকেই রোগ মোকাবিলার সুবিধাগুলো এবং গোপনীয়তার আক্রমণের মধ্যে নিজস্ব গুরুত্ব অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন বিগ-ডাটা ও গণ-পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত ও সংক্রমণ রোধে সক্ষমতা দেখিয়েছে। সরকারের উচিৎ মহামারী নিয়ে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা, কারণ সংক্রমণের গতি কমানোর কাজ, যেমন ভিড় নিষিদ্ধ করা, যত তাড়াতাড়ি নেয়া হবে ততই কার্যকরী হবে।

কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে সিঙ্গাপুর, যেখানে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক কম আক্রান্ত পাওয়া গিয়েছে। একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে দক্ষ আমলাতন্ত্র, বিশ্বমানের সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং ২০০৩ সালের SARS মহামারী থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা – এইসব কারণে সিঙ্গাপুর খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু করতে পেরেছে। জনগণের সম্মতি আদায়ের কঠিন কাজটাও করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে কারণ তাদের বার্তা ছিল সঙ্গতিপূর্ণ, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং বিশ্বস্ত।

পশ্চিমে কভিড-১৯ সেই প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য হুমকিস্বরূপ যারা আর্থিক মন্দার পর ক্ষমতায় আরোহন করেছেন। অনেকেই বিশ্বায়ন ও বিশেষজ্ঞদের উচ্চস্বরে নিন্দা করেছেন। তারা বিভাজন ও সংঘাতের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই মহামারী তাদের এজেন্ডাকেই ব্যবহার করবে। দেশগুলো আমেরিকাকে অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ দিকে ফিরে যেতে পারে এবং সীমান্ত বন্ধ করে দিতে পারে। এখন পর্যন্ত এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে সঙ্কুচিত করার ফলে শিল্পগুলো বিশ্বায়ন থেকে পিছিয়ে আসতে পারে, যদিও সাপ্লাই চেইনকে বিচিত্র করার মাধ্যমে তারা বেশি সুরক্ষা লাভ করতে পারেন।

তবু, এই মহামারী ডাক্তার, বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞদের আবারো সরকার পরিচালনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। মহামারী মূলত বৈশ্বিক বিষয়। দেশগুলো চিকিৎসা প্রটোকল, চিকিৎসাবিদ্যা এবং ভ্যাকসিন বিষয়ে একত্রে কাজ করা দরকার। দুশ্চিন্তিত ভোটারদের পার্টিকেন্দ্রিক রাজনীতির নাটুকে কুস্তি ম্যাচ দেখার আগ্রহ কম। তারা বরঞ্চ বাস্তবিক যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেসবের মোকাবেলা করার জন্যই সরকারগুলোকে দরকার – সবসময় এটাই আসলে রাজনীতির বিষয় হওয়া উচিৎ ছিল।

 

Sohul Ahmed, activist and author. Topics of interest are politics, history, liberation war and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

More Posts From this Author:

Share.

Leave A Reply

Translate »