কিনব্রিজে বিকেলের রোদ

Share this:

 

ক্রীতদাসের হাসি

এখন গোলাপের মৌসুম
চারদিকে এত এত গোলাপ
তবু সুগন্ধ কই?
জৌলুস আর অট্টালিকায় ঢাকা
হৃদয়ের ভার
গোলাপ ফুটেছে—এত এত গোলাপ
তবু হাসি নাই
বুদবুদে মিলিয়ে গেছে বুকের পারদ…

 

স্বৈরাচার

মানুষ মরে গেলে জমা থাকে খোলস
চমৎকার
হৃদয়শূন্য
এক স্বৈরাচার

 

তবু সমর্পিত

হয়তো থেমে যাওয়া মৃত্যুই, তবু থামতে হয়
রঙিন তারাবাতি আর দু-আঙুলে শৈশবের মার্বেল
ঘুড়ির ডানায় উধাও
কে যেন কানে কানে বলে ভাঙনের গান
দেখেছি আমি মুহূর্তে ধ্বসে যেতে
পৃথিবী গভীরতম ক্ষত
এতটুকু একটু বড় করে ফেলা এইতো
আর একখণ্ড চমৎকার মায়া
পর্দার মতো ঝুলতে থাক
আবছা বারান্দায়—

 

ফিলিস্তিন : দেশহারা মানুষের কান্না

অভিশপ্ত জাতির মিথ্যা দেশ প্রাপ্তির উদ্ভট প্রতিশ্রুতি
নিক্ষিপ্ত গোলা-বারুদে মানুষের কান্না বেমালুম চেপে
একবিংশ শতকে হয়ে যাই আরও বধির অন্ধ
একটি স্বাধীনসত্তার ক্রমশ পরাধীন আর শৃঙ্খলিত হবার ইতিহাস
মজ্জায় গেঁথে যেতে যেতে মনে হয় কখনো এই দেশ ছিল না
পাথরের ইতিহাসে চাপা ভারী দীর্ঘশ্বাস
একজন সাইদ নিক্ষিপ্ত পাথরের সাথে সাথে
ছুঁড়তে থাক একরাশ গ্লানি
হতাশার
তবু প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায়, জাতিসংঘে দাঁড়াতেই থাকবে একদল মানুষ

 

কিনব্রিজে বিকেলের রোদ

চলমান রিকশা পেডেলে রোদগুলো ধাক্কা খেতে খেতে
আত্মহত্যা করছিলো সুরমার জলে
ঢেউয়ে স্থবির নামতা গুণছিল কে যেন
ছুটে যাচ্ছিল শেষ বিকেলের ট্রেন কিনব্রিজ থেকে
মাত্র কয়েক মিনিট
আজও দেখতে পাই
কিনব্রিজের উপর থেকে
বিকেলের শেষ ট্রেন
অপেক্ষমাণ এক প্রেমিকার আর্ত-চিৎকার
উপেক্ষা করে
ছুটে চলছে
অবিরাম
অজানা গন্তব্যে…

 

ধ্বস্ত ল্যাম্পপোস্ট

বাড়তে  থাকে আঁধার সেই সাথে রাতও
পাল্লা দিয়ে বাড়ে সময়, একঝাঁক বুনো অস্বস্তি
ক্রমশ গ্রাস করে, করে দেয় নিস্তেজ স্নায়ুগুলো
এই বুঝি আরেক আপনজন
চেনাজানা ভূগোলে ইতি টানলেন জীবনের
জানালা থেকে দূরের ল্যাম্পপোস্ট বড্ড বিধ্বস্ত
প্রকৃতিও ক্রন্দনরত আড়াল দিয়ে রেখেছে কাকে যেন
আর কত মৃত্যু… আর কত যন্ত্রণা…
কতটা পালটাবে পৃথিবী নাকি মানুষ নিজেই
অপার শূন্যতা মনে মনে নামতা শেখায়

 

আদমসুরত

সুশোভন একটি চপ্পল
জানান দিচ্ছে নিজেকে
ঘুরে ঘুরে
কী কাজে লাগে চপ্পল?
নকশাদার সুন্দর
অনেকটা মানবীয়
নৈতিকও বটে!
সময়ের মানদণ্ডে গুনছেন কেউ কেউ
অতীতের এক ফিনিক্স পাখি ভাসছে দু-চোখে
আশাহত ঐতিহ্যের বেদনাদায়ক পরিসমাপ্তি
চপ্পল ঘুরে মগজের কোষে
আর প্রলম্বিত হয়
তৃতীয় গণতন্ত্র
সুপ্তি জাগরণ

 

 

প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: ফালগুনী রায়, অসমাপ্ত গল্পের অসম্পূর্ণ চরিত্র

বোনের বুকের থেকে সরে যায় আমার অস্বস্তিময় চোখ
আমি ভাইফোঁটার দিন হেঁটে বেড়াই বেশ্যাপাড়ায়
আমি মরে গেলে দেখতে পাবো জন্মান্তরের করিডোর
আমি জন্মাবার আগের মুহূর্তে আমি জানতে পারিনি আমি জন্মাচ্ছি
আমি এক পরিত্রাণহীন নিয়তিলিপ্ত মানুষ
আমি এক নিয়তিহীন সন্ত্রাসলিপ্ত মানুষ
আমি দেখেছি আমার ভেতর এক কুকুর কেঁদে চলে অবিরাম
তার কুকুরির জন্যে এক সন্ন্যাসী তার সন্ন্যাসীনির স্বেচ্ছাকৌমার্য
নষ্ট করতে হয়ে ওঠে তৎপর লম্পট আর সেই লাম্পট্যের কাছে
গুঁড়ো হয়ে যায় এমনকি স্বর্গীয় প্রেম—শেষ পর্যন্ত আমি
কবিতার ভেতর ছন্দের বদলে জীবনের আনন্দ খোঁজার পক্ষপাতি
তাই জীবনের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই—মানুষের সঙ্গে
আমার কোনো বিরোধ নেই

                                    “মানুষের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই”/ ফালগুনী রায়

অল্পবিস্তর অস্বস্তি কাজ করে ফালগুনী অধ্যয়নে। চেনা ছকে মেলানো যায় না তাঁকে। চির অচেনা, দর্পিত, স্পর্ধিত ও দ্বিধাহীন—অনায়াসে শব্দগুলো চয়ন করা চলে ফালগুনীর ক্ষেত্রে। আচ্ছা, ফালগুনী রায় যদি কবিতা না লিখতেন অথবা তার সময়ে সংঘটিত কাব্যআন্দোলনে অংশবাক না হতেন, তাহলে? তাঁর কাব্যজীবন বহুধাবিস্তৃত, ব্যাপক তা নয়, মাত্র তেরো বছরে লিখেছেন যৎসামান্য হাতেগোনা, যখন বাংলা কবিতা পৌঁছে গেছে উত্তুঙ্গে, উচ্চ শিখরে। রবীন্দ্রনাথের মতো মহীরুহ একদিকে; বিপরীতে তিরিশের অগণন মেধাবী তরুণের প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধিতা। পরবর্তীকালে বাংলা কবিতাকে শাসন করেছেন যাদের অনেকেই—সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সুনীল, জীবনানন্দ দাশের মতো কবিপ্রতিভা তো রয়েছেনই। একে একে মঞ্চে আসবেন অনেকেই, যার সূচনাবাদ্য শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। ফালগুনী রায় অথবা তাঁর সময়কে মূল্যায়ন করা হবে কোন প্রেক্ষাপটে? গোটা তিরিশের পর কাব্যজগতে দানা বাঁধে অনেকগুলো মুভমেন্ট মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক, যার একটির সঙ্গে সচেতনভাবে যুক্ত ছিলেন ফালগুনী। ফালগুনী নিয়ে আলোচনায় একটি বিপদ আছে তাহলো—আরো কতগুলো মুখ চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, শৈলেশ্বর ঘোষ। এঁদের মধ্যে মলয়ের প্রতি আমার একটা পক্ষপাত আছে, আর তাহলো তার চমৎকার গদ্যশৈলী। তো সেই সময়ের সুনীলের ‘কৃত্তিবাস’-কেও যে আলোচনায় আনতে হয়। ততোদিনে বাংলাদেশ একটা অস্থির সময় পার করছে, ক্রমশ দানা বাঁধছে স্বাধীনতা আন্দোলন। অপরদিকে, নকশাল আন্দোলন যা তারুণ্যের স্পৃহা, জুগুপ্সা, বিদ্রোহ আমূল পাল্টে দেয়। ফালগুনীর লেখায় যার আবছা—অস্পষ্ট ছবি আছে, টের পাওয়া যায়।

ফালগুনীর লেখাপাঠে তারাশংকর চোখে ভেসে আসে, ‘জলসাঘর’ গল্পের ছবি সেলুলয়েড হয়। ক্ষয়িষ্ণু জমিদার বংশের শেষ প্রতিনিধি ফালগুনী রায় বা তার পরিবার। প্রশ্নটা করাই যায়, আচ্ছা ফালগুনী যদি একটাও কবিতা না লিখতেন তাহলে বাংলা সাহিত্যের ইতরবিশেষ হতো—কিছু যায় আসত কি-না? উত্তর এককথায় দেওয়া সম্ভব—ইতরবিশেষ কিছু হতো না। বাংলা সাহিত্যের রঙ্গমঞ্চে ফালগুনীর প্রভাব যতসামান্য, বলার মতো কিছু নয়। তাহলে আমরা কেনো ফালগুনীর আলোচনা করছি? এমন কোন বিশেষত্ব ফালগুনীর কবিতা আমাদের বাধ্য করেছে তাকে আলোচনায় টেনে আনতে? আধুনিক বাংলা কবিতার অঙ্গন ততোদিনে বেশ পুষ্ট-দুর্দান্ত প্রতাপে অনেকেই ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেছেন। ফালগুনীর সময়টা মোটেই সুখকর নয়। রাজনৈতিক কারণ বাদ দিলেও, নিছক শিল্পের বিবেচনায়ও কালোত্তীর্ণ-রসোত্তীর্ণ সাহিত্য ফসল ঘরে তুলে দিয়েছেন অনেক সাহিত্যিকই। রবীন্দ্রনাথের মতো মহীরুহ তো আছেনই—আছেন নজরুল, সুধীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেবসহ অনেকেই। সাহিত্য আন্দোলনে চলছে কল্লোলীয়, নিম, কীর্তিবাসসহ অনেকগুলো ধারা। তার মাঝে সমীর-মলয়-শৈলেশ্বর-ফালগুনীরা আলাদা একটি আন্দোলন নিয়ে তখন মাঠে। আর তার কারণেই পরে ফালগুনীসহ হাংরির অনেক লেখক-কবি আমাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় বিবেচিত হন; স্বাতন্ত্র্যের দাবিতে দাঁড়িয়ে যান।

বিশ্ববীক্ষা বা আন্তর্জাতিকতার ঢেউ তখনো কি লাগেনি কবিতায়? অবশ্যই লেগেছে। পাশ্চাত্য থেকে উঠতি কলকাতায় পাচার হয়ে আসছে হামেশা নানা মতবাদ, সাহিত্যের নানান রসদ। পদে অনন্য, ব্যঞ্জনে সুস্বাদু।  জাঁ আর্তুর র‌্যাবো, স্তেফান মালার্মে,  ভের্লেন, লে কার্দোনেল, সামায়াঁ, মিখায়েল, রদেনবাখ, মাতেরলিঙ্ক, লাফোর্গ, ঘিল, দুবুস, মকেল, মাউক্লেয়ার, মেরিল, ভেরহারেন, কল, ভিলে গ্রিফিন, দুজারদাঁ, রেতে অঁরি দ্য রেনিয়ে এঁরা তখন দুর্দান্ত প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন কলকাতার তরুণমস্তিষ্ক। শেলি, কিটস, ওয়র্ডওয়র্থ, ব্রাউনিং, টেনিসনের আধিপত্য কমতির দিকে—এমন ভাবার যদিও কোনো কারণ নেই। হাংরির সাথে যুক্ত হলেন আমেরিকা থেকে সদ্যভারত ভ্রমণে আসা এ্যালেন্স গিন্সবার্গ। কলকাতা উন্মাদ, চলছে উন্মাদনা। সাহিত্যের মাতালসময়। স্বীকার-অস্বীকার, পালটা-পালটি কথাবিনিময়, শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিতর্ক। কবিতা নিয়ে মামলা হলো গড়ালো আদালতঅব্ধি, সেটা এখন ইতিহাস। নকশাল আন্দোলন দমনের নামে কলকাতায় চলছে অরাজক পরিস্থিতি, তরুণ-নিধনের মহোৎসব। ঠিক এই সময়ের ফসল ফালগুনী। তাঁর চোখের সামনে পালটে যাচ্ছে সময়—সবকিছু, চেনা কলকাতা তখন ভীষণ অচেনা। পাক-ভারত ভাগাভাগির ফলে তার পরিবার বাংলাদেশ অংশে থাকা বিশাল জমিদারি হারিয়ে ফেলল, অনিশ্চিত এক যাপিতজীবন। ব্যক্তিগত একাকিত্ব, যৌনতা, সম্ভোগ, রমণ সাধারণ মধ্যবিত্তের আটপৌঢ়ে জীবনের সংস্পর্শ বিভীষিকা ফালগুনীকে ব্যতিব্যস্ত করে দিয়েছে সন্দেহ নেই। যার ছাপ পড়েছে তাঁর ব্যক্তিগত, পারিবারিক জীবনে। নিজেকে তখন কি তাঁর ভীষণ একা মনে হয়েছে; মনে হয়েছে পৃথিবীর অসফল-অযোগ্য একজন মানুষ-হয়তো।

বলা হয়, কবিতা হলো শব্দের কারুকাজ। শব্দকে কবি নিজস্ব তাগিদে ইচ্ছামাফিক প্রয়োজনমতো পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে সময়োপযোগী করে গড়ে নেন। সময়ের বিবর্তনে মানুষের একরৈখিক চিন্তা-চেতনায়ও পরিবর্তন এসেছে। গ্রন্থিল জীবনের জটিলতাগুলো এক-আধটু নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ফর্মে এসেছে রূপান্তর। ১৮৮৬ সালে ‘লে ফিগারো’ পত্রিকা সিমবলিস্ট আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটাতে গিয়ে জঁ মোরেস বলেছিলেন, ‘শব্দসমূহ ব্যবহৃত হওয়া উচিত মানসিক স্থিতি প্রকাশ করার জন্য’। উনিশ শতকে যে আদর্শবাদিতা ও রোমান্টিসিজমের আবছা প্রবাহে নিও-প্লেটোসিজমের স্রোত শুরু হয়েছিল জগৎ সম্পর্কিত অতীন্দ্রিয়বাদী ধারণায়ও তা নিয়ে এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। বিশ্বব্যাপী মানবিক সভ্যতার বিপর্যয়তো এখন আকসার ঘটনা। কবিতা তাই ব্যক্তি-নির্ভর,আত্মকেন্দ্রিক। ‘শিল্প’ শব্দটি কিছুদিন হলো পাশ্চাত্যের কল্যাণে আমাদের মনন-চিন্তায় স্থিতু হয়েছে। তিরিশের কবিরা প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসার যে চেষ্টা করেছিলেন তাতে তারা কতটা সফল কিংবা ব্যর্থ সে আলোচনায় না গিয়েও বলা যায় তার একটা সূক্ষ্ম রেশ রয়ে গেছে এখনো, যার প্রবাহটা সামান্য নয়। ফালগুনীকে ধরতে হলে তাঁর সময়টা অগুরুত্বপূর্ণ নয় তাই কিছুতেই।

ফালগুনীতে সাধারণ আটপৌঢ়ে জীবন আছে, আছে জীবনের প্রাত্যহিকতা। ক্লেদ-জুগুপ্সা, আত্মপ্রবঞ্চনা, দুর্বিনীত বেপরোয়া খামখেয়ালিপনা, নানা সামাজিক অসংলগ্নতার বিরুদ্ধে তীক্ষ্ম শ্লেষ হয়তো নিজের প্রতিও কিছুটা। নারীর প্রতি মোহ, নারী শরীরের প্রতি আগ্রহ, ভালোবাসার প্রতি এক ধরনের অনুরাগ। পুনরুক্তি আছে প্রচুর, একই লাইন,একই শব্দ নানা জায়গায় বারবার ব্যবহৃত হতে দেখি। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার ব্যাপারটা তাঁর কবিতায় খুব একটা নেই। কবিতাকে শুধুমাত্র কবিতার সৌন্দর্যে যারা আবিষ্কার করতে চান তাদের এই কবিতা নিশ্চয়ই হতাশ করবে; কিন্তু সাধারণ আটপৌঢ়ে প্রতিবাদ ক্ষোভের কথাগুলো শব্দে প্রকাশ করার কৃতিত্ব ফালগুনীকে দিতেই হয়, এ জন্যই হয়তো এখনো তাঁর কবিতা গুরুত্বপূর্ণ, এ-নিয়ে আলোচনায় বসেন কেউ কেউ।

খালাসিটোলার কাছে কোনো এক ইতর যুবক
খিস্তি করে ফলালো দাদাগিরি
বাইশ বছরে বাইশ লাইন কথা বলিনি যার সঙ্গে অন্তত
ট্যারা চোখে দেখে গ্যালো তার রাউডি বন্ধুরা
কাল হয়তো খুলে নেবে ঠ্যাং
বা পাল্টে দেবে পুরোপুরি মুখের জিওগ্রাফি
আজ তাই লিখে রেখে দিতে হবে সবকিছু
সব আশা সোনালি সুদূরতা আর ছেনালি ইচ্ছের কথা
জীবনের প্রথম জংশন মাতৃজঠর হতে বেরিয়ে হাঁটলুম
গত বাইশ বছর-কালই বুঝি শেষদিন
পৌঁছে যাবো শেষ জংশন শ্মশান চিতায়।
অথচ অনেক কাজ বাকি
থিভস জর্নাল পড়া বাকি
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চশমার ফাঁক দিয়ে পৃথিবী দেখা বাকি
জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুকারী রঙ পাল্টানো ট্রামে বসা বাকি
মসৃণ জংঘা রমণীর সাথে সংগম বাকি
মাইকেল হেনরিআটার নীরব কবরে ঘাসফুল
ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাঁটুমুড়ে কিছুক্ষণ বসে থাকা বাকি
এখনো অনেক কাজ বাকি
অথবা
আর কত সত্যিকারের সতী মেয়ে বিপ্লবের কারণে
যৌনাঙ্গে বহন করে পুলিশের চুরুটের ছ্যাঁকা
তাদের প্রেমিক ক্যারিয়ারিস্ট হতে না পারায় সমাজের চোখে
বনে যায় বোকা
আর চালাক পাঁঠাকবিদের ভিড়ে ভরে ওঠে কফিহাউস
বঙ্গসংস্কৃতির প্যান্ডেল উঠিয়ে নিলে পর
ময়দানে সে জায়গায় চরে বেড়ায় ভেড়া…
কবিদের যোগ্যতা আমি চাই বিচার্য হোক কেবলি কবিতায়
রোজগেরে ছেলেদের ভিড় যাক বরং বিবাহসভায় অথবা
বেশ্যাখানায়
রক্তমাংসের শরীর আমার মরে যাবে একদিন নিশ্চিত
তবু শব্দের শরীরে থাকবে বেঁচে আমার চেতনা
ভবিষ্যতের পাঠক আমি জানি কবি কত মাইনে পেতেন
সে খবর নিশ্চিত রাখবে না

শ্লেষ বিদ্রুপ-সংক্ষোভ শুধু প্রচলিত নিয়মনীতি, সমাজ-সংসার-সময়ের বিরুদ্ধে নয় অনেকটা নিজের বিরুদ্ধেও ফালগুনীর। উৎপলকুমার বসুর কথা দিয়ে শেষ করি: ‘খোলা চিতায় তার অবহেলিত দাহ হয়। বৈশাখের তপ্ত বাতাসে, আজ যেমন তার কবিতার বইয়ের পাতাগুলি, প্রায় তেমনই অবহেলায়, উল্টে যাচ্ছে নিজে নিজেই।’

ইট ইজ ক্রিকেট

জীবনের প্রথম ইনিংস শূন্য রান করবার পর
দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করবার জন্যে আমি এখন তৈরি হয়ে নিচ্ছি
জীবনের প্রথম জংশন মাতৃজঠর হতে বেরিয়ে আমি এখন
হেঁটে যাচ্ছি শেষ জংশন শ্মশানের দিকে
(কি আশ্চর্য আমি জন্মাবার আগের মুহূর্তেও আমি জানতুম না আমি জন্মাচ্ছি)
আমায় পরমেশ চাটুজ্জে বলেছে : তুমি বড়োজোর কফি হাউজের
ইণ্টালেকচুআল হতে পারবে—
আমায় বুলু ভট্টচার্য বলেছে : তুমি রবীন্দ্রনাথও হতে পারবে না
রঘু ডাকাতও হতে পারবে না।
আমি তাদের বলেছি : মহম্মদ আলি পার্কে একটি মেয়ের সংগে
একনিষ্ঠতার পোষা কুকুর হবার পরেই আর একটি মেয়েকে ‘নির্জন
স্বাক্ষর’ উপহার দেবার থেকে কফিহাউজিয় ইণ্টালেকচুআলিজম
অ নে ক অ নে ক ভা ল
আমি তাদের বলেছি : আমি রবীন্দ্রনাথও হতে চাই না
রঘু ডাকাতও হতে চাই না—আমি ফালগুনী রায় হতে চাই—
শুধু-ফালগুনী রায়।
আসলে আমি জেনে গেছি এখন
ইডেনের গ্যালারি পুড়ে যাবার পরেও
পিচের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না
আসলে আমি জেনে গেছি এখন
গিলক্রিস্টের রুদ্ররোষই পৃথিবীর সব নয়
জীবনে ওরেলের শান্তচোখও আছে
[কবিতা মানুষকে বেঁচে থাকতে প্রো ভো ক্ করে
—মলয় রায় চৌধুরী] [লোভ ধর্ম পাপ উদারতা ঈর্ষা প্রেম
প্রজানীতি সবই জীবনে সহাবস্থান করছে
—সুবিমল বসাক] [অতিশয় জাগ্রত যে তার মাথা আগে ঢলে পড়ে-
—শৈলেশ্বর ঘোষ]

আমি এক সৌন্দর্য রাক্ষস

প্রজাপতির চিত্রল ডানা দেখে বিরহ হতে বিবাহের দিকে
চলে যায় মানবসম্প্রদায়—আমি এক সৌন্দর্য রাক্ষস
ভেঙে দিয়েছি প্রজাপতির গন্ধসন্ধানি শূঁড়
আমার নিজের কোনো বিশ্বাস নেই কাউর ওপর
অলস বদমাস আমি মাঝে মাঝে বেশ্যার নাঙ হয়ে
জীবন যাপনের কথা ভাবি যখন মদের নেশা কেটে আসে
আর বন্ধুদের উল্লাস ইয়ার্কির ভেতর বসে টের পাই ব্যর্থ প্রেম
চেয়ে দেখি পূর্ণিমা চাঁদের ভেতর জ্বলন্ত চিন্তা
এখন আমি মর্গের ড্রয়ারে শুয়ে আছি—এক মৃতদেহ
আমার জ্যান্ত শরীর নিয়ে চলে গ্যাছে তার
শাঁখাভাঙা বিধবার ঋতুরক্ত ন্যাকড়ার কাছে
মর্গের ড্রয়ারে শুয়ে আছি-চিতাকাঠ শুয়ে আছে বৃক্ষের ভেতর
প্রেম নেই প্রসূতিসদনে নেই আসন্ন প্রসবা স্ত্রী
মর্গের ড্রয়ারে শুয়ে আছি—
এভাবেই রয়ে গেছি কেটে যায় দিনরাত বজ্রপাত অনাবৃষ্টি
কত বালিকার মসৃণ বুকে গজিয়ে উঠল মাংস ঢিবি
কত কুমারির গর্ভসঞ্চার গর্ভপাত—সত্যজিতের দেশ থেকে
লাভ ইন টোকিও চলে গ্যাল পূর্ব আফ্রিকায়-মার্কস স্কোয়ারে
বঙ্গসংস্কৃতি ভারত সার্কাস-রবীন্দ্রসদনে কবিসম্মেলন আর
বৈজয়ন্তিমালার নাচ হ’ল-আমার ত হ’ল না কিছু
কোনো উত্তরণ-অবনতি কোনো—
গণিকার বাথরুম থেকে প্রেমিকার বিছানার দিকে
আমার অনায়াস গতায়াত শেষ হয় নাই—আকাশগর্ভ
থেকে তাই আজো ঝরে পড়ে নক্ষত্রের ছাই পৃথিবীর বুকের ওপর
তবু মর্গের ড্রয়ারে শুয়ে আছি এক মৃতদেহ আমার জ্যান্ত শরীর নিয়ে
চলে গ্যাছে তার শাঁখাভাঙা বিধবার ঋতুরক্ত ন্যাকড়ার কাছে
প্রজাপতির চিত্রল ডানা দেখে বিরহ থেকে বিবাহের দিকে চলে যায় মানুষেরা
আমি এক সৌন্দর্য রাক্ষস ভেঙে দিয়েছি প্রজাপতির গন্ধসন্ধানী শূঁড়

কবিতা হঠাও

বিবাহসভায় বিধবার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি
আমি এক বেকার মাত্র ডালহৌসি পাড়ায়
পয়সার অভাবে বেড়ে গেল চুলদাড়ি
লোকে বলে নকল করছি রবিঠাকুরকে কিন্তু
আমরা রবীন্দ্রসদন বা কোনো ভবনের বদলে
এ বছর রকে বসে পালন করেছি রাত বারোটার রবীন্দ্রজয়ন্তী
আমাদের পেটে ছিল মদ হেড়ে গলায় আমাদের
সম্মিলিত গানের চিৎকার শুনে যেসব
বিবাহিতা মহিলারা স্বামীর উরুর তলায় শুয়েছিল
এবং যেসব কুকুরি সংগম শেষে ঘুমোচ্ছিল কুণ্ডলি পাকিয়ে
তারা সব জেগে উঠে আমাদের রকেতে রবীন্দ্রনাথকে
নিয়ে ছেলেখেলার প্রতিবাদে চিৎকার করেছিল যথাক্রমে
মানুষ ও কুকুরের ভাষায়
গ্লোব নার্সারির কাছে আমিও দেখেছি
একটা কুকুরের গলায় কেউ পরিয়ে দিয়েছে বেলফুলের মালা
আমরা শালা কোনো মেয়ের চুলের খোঁপায়
গুঁজতে পারিনি এখনো ফুল অথচ বরাহনগর বাজারে
দেখেছিলুম রজনীগন্ধা চিবিয়ে খাচ্ছে
বিশালাণ্ড ষাঁড়
এই সব দেখে শুনে ভাবি
নর্দমা যেমন হঠাৎ চওড়া হয় নদীর নিকট
অথচ কামনার সঙ্গে প্রেম মিশে গেলে যেমন
ব্যভিচার আর ব্যভিচার থাকে না হয়ে যায়
রাধাকৃষ্ণের ধর্মীয় যৌন উপাসনা
তেমনি যদি আমি একটু প্রসারিত হতে পারতুম
অভাবপিড়িত জৈবিক তাড়নার কাছে এসে
তবে হয়তো নিরন্নকে অন্ন দেবার সঙ্গে সঙ্গে
তাকে বোঝাতে পারতুম অরণ্য পর্বত সমুদ্র
ইত্যাদির বিশালতার অনুভবে ঠিক কী ধরনের শান্তি রয়েছে

আমি যেন আমার মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকি
নারীর যৌনতা থেকে উৎসারিত সন্তানের মধ্যে নয়
কিন্তু শব্দের শরীরে থাকুক বেঁচে
আমার চেতনা
আমার মাংসের শরীর খুব ভালো করে জানে
জীবনের মানে বেশিদিন থাকবে না
নিভন্ত চিতায় শুয়ে থাকে রজনীগন্ধার মালা
যে যায় সে যায় যারা বেঁচে থাকে তারা দ্যাখে
পোড়া চিতাকাঠ থেকে কিভাবে খাদ্য খোঁজে উড়ন্ত চড়াই
বাড়ন্ত পুরুষ্ট দেহ একটি মেয়ে বা ছেলে যদি সঙ্গ দিত
জ্বলন্ত চিতার দিকে চেয়ে-মৃত্যু নয় যৌনতা মনে আসে
মদের টেবিলে কেউ বলে মদ খাবার সময় যদি কেবলি
হিসাব করো দলের ভেতর তবে তুমি বিক্ষিপ্ত নির্দল হয়ে যাবে
একটি নারীকে না পেয়ে একশোটি দেবদাস তৈরি হয়
শরৎ চাটুজ্যের লেখনি ছাড়াই এক হাজার
উপন্যাস দুহাজার ছোটোগল্প বাসে ঝুলে
সেকেণ্ড-ক্লাস ট্রামে বিনা পাখায় গরমে সেদ্ধ হয়

কিছু লিখতে পারছি না আর

         আমি লিখতে পারছি না লিখতে পারছি না কিছু
লিখতে পারছি না আর চারপাশের কুকুর ও বেশ্যার
চিৎকার হাসাহাসি হিজড়ের উপহাস আমি
পারছি না কিছু লিখতে পারছি না আর
বিশ্ব হতে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নলোকের চাবি দিয়ে
আস্তিক রবীন্দ্রনাথ আমায় ঠেঙিয়েছেন ভীষণ
তন্দ্রাচ্ছন্ন দুঃস্বপ্নে ঘুমের ভেতর একজন কালো খ্রিস্ট
সারা গায়ে অসংখ্য বিষাক্ত সাপ জড়িয়ে
আমায় আলিঙ্গন করতে চেয়েছিলেন ও একজন
মুর্খ ফাউস্ট মেফিস্টোফিলিসের হাত ধরে চলে
গেছিলেন স্ট্রেট গ্যায়েটের কবরের দিকে
মাথায় প্রখর যন্ত্রণা হলে আমি আজকাল
পিকাসোর কিউবিক ছবি দেখি সারিডনের বদলে
এবং সৎসঙ্গের ধ্যান ও বাণী আমার প্রতিভাহীন শান্তির
অনুকূল নয় জেনে গিয়ে গীতা পড়তে পড়তে
হঠাৎ হস্তমৈথুন শুরু করে এক ধরনের স্বস্তি পাই
সকলের আনুগত্য অস্বীকার করেও আমি শেষ পর্যন্ত
নিজের আত্মার কাছে ক্রীতদাস থেকে যাচ্ছি
অথচ আমি মুক্তিপ্রার্থী মুক্তির উপায় বোধ হয়
কিছু লিখে যাওয়া কিন্তু কিছুই লিখতে পারছি না
লিখতে পারছি না লিখতে পারছি না আর
কুকুর ও বেশ্যার চিৎকার হাসাহাসি হিজড়ের উপহাস।

প্রহসন

মৃতের ইতিহাস লিখি পরীক্ষার খাতায়—জীবনের ইতিহাস নয়
জীবনের ইতিহাস খুঁজে ফিরি সাহিত্যের পাতায় পাতায়
দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্যের ভিতর আছে যার বিকাশ ব্যাপ্তি ও ক্ষয়
কেন তুমি চেয়েছিল নির্বাণ গৌতম বুদ্ধ হে বোকা কোথাকার।
কামনা উধাও হলে কাম্যের প্রতি আসে নিঃশর্ত অনীহা
এই তত্ত্ব নিয়ে জন্মান্তর বন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার ধ্যান
কৃশতনু উজ্জ্বল চোখ চুলে জটা পরনে গেরুয়া চলেছ কোথায়
তোমরা কোন অনির্দেশ নিয়তির টানে নিয়েছ সন্ন্যাস—কেন
পেয়েছ কি অনল প্রভাবে কেন বাষ্প হয় সলিল তার
বৈজ্ঞানিক উত্তর
ভগবানের নামগান করে
কী করে তরল বীর্য রূপান্তরিত হয় শব্দ ও স্বাদময় জিহ্বায়
জেনেছ কি এসব যোগাভ্যাসে
অণ্ডভাণ্ড ভেঙে ফেলে উড়ে গ্যালো পাখি নিলো জীবনের দিকে
যে জীবনে আছে শীত বৃষ্টি ঝড় নীড় ভাঙা পিতৃত্ব ও সন্তানধারণ
মানুষের জীবন সে রকম
দেহভাণ্ড ভেঙে ফেলে উড়ে যাবে না কি ফের
আরো এক অনাগত আগামীর দিকে
সেখানেও পৃথিবীর পাখিদের মতো
সে জীবনে আছে শীত খিদে বৃষ্টি পিতৃত্ব
আছে দুঃখ আছে মৃত্যু তবুও
শান্তি আছে বলে দিয়ে
পরাধীন ভারতের শহিদ-বেদির চেয়ে স্বাধীন ভারতে
যদি আরো ঢের বেশি শহিদের সংখ্যা
বাড়ানো যায় তবে বিশ্বকবি ও সুন্দরীদের দেশ
ভারতবর্ষে আর কে চায় নির্বাণ
লর্ডবুদ্ধ-অহিংসার বদলে আমরা চাই
রাইফেল শান্তির উৎস হয়ে থাক—

কবিতা বুলেট

কোথায় শহিদবেদি ভেঙে তৈরি হয়েছে শনির মন্দির
চলো চলো চলো রে মন্দির ভেঙে ফের
তুলি গড়ে সর্বহারা বাহিনির কেন্দ্র-সামরিক
মৃত সব শহিদ বন্ধুর শেষ যৌনেচ্ছার উদ্দেশ্যে
আমি একদিন করেছিলুম শোকপালন বন্ধ করে মাস্টারবেশন
বেশ্যার ঘরে থাকে টেলিভিশন তাদের কুকুরের জন্যও বরাদ্দ
থাকে মাংস
দেওয়ালে ঝুলেন সেখানেও সস্ত্রীক পরমহংস
আর কত সত্যিকারের সতী মেয়ে বিপ্লবের কারণে
যৌনাঙ্গে বহন করে পুলিশের চুরুটের ছ্যাঁকা
তাদের প্রেমিক ক্যারিয়ারিস্ট হতে না পারায় সমাজের চোখে
বনে যায় বোকা
আর চালাক পাঁঠাকবিদের ভিড়ে ভরে ওঠে কফিহাউস
বঙ্গসংস্কৃতির প্যাণ্ডেল উঠিয়ে নিলে পর
ময়দানে সে জায়গায় চরে বেড়ায় ভেড়া…
কবিদের যোগ্যতা আমি চাই বিচার্য হোক কেবলি কবিতায়
রোজগেরে ছেলেদের ভিড় যাক বরং বিবাহসভায় অথবা
বেশ্যাখানায়
রক্তমাংসের শরীর আমার মরে যাবে একদিন নিশ্চিত
তবু শব্দের শরীরে থাকবে বেঁচে আমার চেতনা
ভবিষ্যতের পাঠক আমি জানি কবি কত মাইনে পেতেন
সে খবর নিশ্চিত রাখবে না

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!