কৃষক, মওলানা ভাসানী ও ‘কৃষক সমিতি’

Share this:

মওলানা ভাসানীকে নিয়ে যারা আলাপ করেছেন তারা প্রায় সকলেই বলেছেন, বা সরাসরি না বললেও তাদের কথাবার্তা থেকে বোঝা যায় যে, ভাসানীর রাজনীতিকে কোনো একটা খোপে ধরতে পারা কঠিন। প্রায় সকলেই চেষ্টা করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই, কোনো দলীয় বা কোনো একটি মতাদর্শিক খোপে ফেলে তাঁর রাজনীতিকে বিচার-বিশ্লেষণ করার। তাঁর ব্যর্থতাকে কেউ কেউ সরাসরি কমিউনিস্টদের ব্যর্থতারই একটা আলামত হিসেবে পাঠ করেছেন[1], কেউবা তাঁর মধ্যে ‘এনার্কিস্ট হওয়া’র[2] আলামত পেয়েছিলেন; আর তাঁর ধর্মীয় অরিয়েন্টেশন তো এখনো বহুল আলোচিত বিষয়। বর্তমানে অনেক বিশ্লেষক ও তাত্ত্বিক ভাসানীর রাজনীতি ও ধর্মের ভেতর একটা যোগসূত্র হিসেবে মুক্তিমুখিন ধর্মতত্ত্বের কথা বলছেন।[3] এই আলাপ চলমান, দৃঢ় তত্ত্বীয় পাটাতনে এখনো দাড়ায়নি। অন্যদিকে ধর্মের সাথে এমন নিবিড় যোগসূত্র থাকার কারণে তাতে সামন্তবাদ-প্রতিক্রিয়াশীলতার ছায়া দেখনেওয়ালা লোকের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাঁর সম্পর্কে এতসব অস্পষ্ট আলাপচারিতা আরেকটা বিষয় হাজির করে: দক্ষিণ এশিয়াতে এতো বৈচিত্র্যময় নেতা বোধহয় খুব কম এসেছিলেন।

তাঁর বহু সহকর্মী তাঁর অধৈর্যের কথাও বলেছেন, ক্রমাগত ভাঙাগড়ার কথা বলেছেন। কোনো নতুন সরকারকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই সমালোচনা শুরু করাটাকে ‘অধৈর্য’ এর নজির হিসাবে পেশ করা হয় সাধারণত। আবার কেউ কেউ তাঁর এই ফেনোমেননকে ‘এভার অপোজিশনাল’[4] স্পিরিট হিসাবে মূল্যায়ন করেছেন। এই মূল্যায়নটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় আমার কাছে, এবং এটার সাথে আমি বহুদূর অব্দি একমতও। এর কারণ কেবল এইটা না যে, তিনি আজীবন সামন্তবাদ-সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ‘না’ বলে গিয়েছেন, বরঞ্চ ভাসানী বোধহয় হাতে গোনা কয়েকজন দক্ষিণ এশীয় নেতা যারা রাজনৈতিক ময়দানে পপুলিস্ট কলা-কৌশল ব্যবহার করেছেন, কিন্তু ক্রমাগত ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। এটা বিরল দৃশ্যও বটে: একদিকে বিভিন্ন পপুলিস্ট কলা-কৌশল ব্যবহার, অন্যদিকে ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ। বিরল এই কারণে যে, সাধারণত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই পপুলিস্ট কলা-কৌশলের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ভাসানীর নিজের দল যখন ক্ষমতায় গেছে, (সেই চুয়ান্ন সালে) তখনও নিজের দলের সমালোচনা করে দল থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। কখনো কখনো তাঁর কোনো কাজ ক্ষমতা-পক্ষীয় হিসাবে হাজির হইলেও সেইটা তিনি নিজেই চুরমার করে দিয়েছেন কয়দিন পর। আইয়ুব আমলে তার অবস্থান এবং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদান এটার ভালো নজির।

জাতীয়তাবাদী শিবির থেকে [এবং বর্তমানে রাষ্ট্রীয় শিবির থেকে] ভাসানীর কিছু সমালোচনা বাজারে তোলা হয়। কেবল ভাসানীই নয়, বামপন্থীদের একাংশের বিরুদ্ধেও এমন কিছু অভিযোগ/সমালোচনা খুব চাউর আছে। যেমন, তারা ছয়-দফার বিরোধিতা করেছিলেন কিনা, অথবা মওলানা ভাসানী নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন কিনা। কিন্তু এই ধরনের সমালোচনা মোটেও কাজের নয়, এবং সেটা কিছুটা অভিজাতপন্থী [বা সাফল্যের ওপর নির্ভরশীল]। অর্থাৎ, এই ধরনের সমালোচনার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: কোনো একটা নির্দিষ্ট কালে কোনো নির্দিষ্ট দলের নির্দিষ্ট দাবি দাওয়ার পক্ষে/বিপক্ষে ভাসানী/বামপন্থীরা ছিলেন কিনা, যে দাবি-দাওয়াগুলো পরবর্তী সময় রাজনৈতিক ময়দানে সফল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এই তরিকার সমালোচনা বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায় খুব প্রভাবশালী। এটাকে আমি অভিজাতপন্থী বলছি এই কারণে যে, এটা কেবল যারা সফল হয়েছেন বা যে দাবি-দাওয়া সফল হয়েছে সেটার নিক্তিতে ও নিরিখে বিরোধী দলের সমালোচনা করে। এই ধরনের সমালোচনা আসলে আওয়ামীলীগকে কেন্দ্রে রেখে, এবং আওয়ামীলীগের অবস্থান থেকে করা হয়, যেহেতু তৎকালে আওয়ামীলীগ সফল ও ডমিন্যান্ট হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আওয়ামীলীগের রাজনীতি কেন সফল হয়েছিল এর হেতু সন্ধান করা তো ঐতিহাসিক কাজ, এটা তো কেউ অস্বীকার করছে না; কিন্তু লীগকে কেন্দ্রে রেখে তাদের নিরিখে বাকিদের সমালোচনা করার ফলে প্রায়শই লীগ-বিরোধিতা এখানে দেশবিরোধীতা ও স্বাধীনতাবিরোধীতা হিসেবে হাজির হয়ে থাকে; এমন নেতিবাচক উপস্থাপন আসলে মুক্তিযুদ্ধের বহুরৈখিক স্বর ও সুরকে আড়াল করে দেয়, এবং দিয়েছেও।

তবে, এই যে ভাসানী যাকে তাঁর কাছের মানুষও ‘অস্থির’ বলে চিহ্নিত করছেন, সেই ভাসানী একটা বিষয়ে ছিলেন ‘স্থির’। আজীবন। সেটা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও কৃষক প্রশ্নে। তার কাছে যদি মনে হয়েছে কাউকে দিয়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা হবে এবং কৃষকদের সুফল হবে, তিনি কোন দ্বিধা ছাড়াই তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, সে যে-ই হোক না কেন। আবার তার কাছে যখন মনে হয়েছে এই দুইটাতে ঘাটতি আছে তিনি বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৭০ সালে লিখিত একটা প্রবন্ধে আলমগীর কবির যা বলেছিলেন তা অনেকটা এরকম, ‘ভাসানীর দাবি-দাওয়া পরিষ্কার ছিল। সস্তায় বীজ, আমূল ভূমি সংস্কার, কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, গরীব চাষাদের সুবিধা প্রদান, বিনা-মূল্যে শিক্ষা ইত্যাদি ছিল তাঁর দাবি-দাওয়া। আজীবন। এগুলো অর্জন করার জন্য তিনি যে কোনো দল, দর্শন বা মতের সাথে দোস্তি করতে আপত্তি করতেন না। তাঁর কাছে এই মুক্তি, এই দাবি-দাওয়াগুলো একেবারে মুখ্য বিষয়, বাকিসব গৌণ। ‘উদ্দেশ্য’ই তাঁর চাওয়া-পাওয়া, ‘উপায়’ যাই হোক না কেন’।[5] যে দর্শন/মতবাদকে আপাত স্ব-বিরোধী বলে দেখার রেওয়াজ ছিল তাঁর কালে, সেগুলো ভাসানীর রাজনীতিতে মিশে যাওয়ার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তাঁর এই অবস্থানের মধ্যে পাওয়া যাবে। ফলে, ভাসানীর ক্ষমতা বিরোধিতার সাথে কৃষক ও সাম্রাজ্যবাদিতার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাথে পুঁজিবাদও।

কৃষক প্রশ্নে ভাসানীর এই অবস্থানের এক দারুণ সাক্ষ্য বহন করে নিয়ে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত সৈয়দ ইরফানুল বারী সম্পাদিত ‘মওলানা ভাসানীর কৃষক সমিতি’।[6] বইটি আদতে কৃষক সমিতির বিভিন্ন লিফলেট, ভাসানীর বক্তৃতা, ভাসানীকে লিখিত প্রান্তিক পর্যায় থেকে বিভিন্ন কৃষক সমিতির নেতৃবর্গের চিঠিপত্র, সমিতির অনুষ্ঠানাদির সংবাদের সঙ্কলন। যদিও সম্পাদক ভূমিকায় বলেছেন এখানে ভাসানী ঘোষিত ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের ফরমুলা’ পাওয়া যাবে, কিন্তু যেহেতু যে কোনো ধরনের ফর্মুলাতে আমার খানিকটা অস্বস্তি রয়েছে, সেহেতু আমি এমন কোনো ফরমুলা খুঁজতে যাইনি বইটিতে। বরঞ্চ কৃষকদের সাথে কৃষক সমিতি ও ভাসানীর কর্মকাণ্ড, এবং সম্পর্কটাকে দেখার চেষ্টা করেছি, বোঝার চেষ্টা করেছি, একাত্তরে যে এই দেশের কৃষকরাও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপ দিয়েছিলেন সেই প্রস্তুতি কীভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। ভাসানীকে বহুজন স্মৃতিচারণ, বিশ্লেষণ করলেও ভাসানীর প্রতি একেবারে প্রান্তিক নেতৃত্ব, বা কৃষকদের অনুভূতি সেভাবে তুলে আনা সম্ভব হয়নি। হলেও আমার চোখে পড়েনি। এই বইতে সঙ্কলিত চিঠিপত্রে তাঁর কিছু আলামত মিলতে পারে। আরেকটা কথা, এই গ্রন্থে ‘ভাসানী ও বাংলাদেশকে একাকার করে দেখার’ কথা সম্পাদক ভূমিকায় ঘোষণা দিলেও, এই ধরনের কোনো কিছু আদতে বিপদজনক। ফলে এরকম চূড়ান্ত আবেগকে পাশ কাটিয়ে গ্রন্থে প্রবেশ করা উচিৎ।

কৃষক সমিতির জন্ম হয় ১৯৫৮ সালে, রংপুর জেলার ফুলছড়ি ঘাটে এক বিরাট কৃষক সম্মেলনের মাধ্যমে। ইরফানুল বারী অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলনের একটি তালিকা দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই বারো বছরে প্রায় ১৭টি সম্মেলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটা তাদের সক্রিয়তা পরিচয়ও বহন করে। বিভিন্ন সাক্ষ্য-বিবরণী থেকে এই সম্মেলনগুলোতে ব্যাপক উপস্থিতির কথা জানা যায়। কৃষক সমিতির জন্ম, এবং সেখানে মওলানার নেতৃত্বের পটভূমিকা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে ব্রিটিশ আমল থেকে ক্রমাগত কৃষক বিদ্রোহের উপস্থিতি এবং বহু কৃষক আন্দোলনে মওলানার অংশগ্রহণকে সম্পাদক ভূমিকাতে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এটাও অবাক করার বিষয়, যে পাকিস্তান আন্দোলনে পূর্ব বাংলার কৃষকদের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল বলে নিয়মিত বলা হয়, জমিদার বনাম কৃষকের দ্বন্দ্বের একটা ফসল হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাবকে দেখা হয়, ইতিহাসবিদরা যেখানে ‘পাকিস্তান এজ পেজেন্ট ইউটোপিয়া’[7] বলে রায় দিয়েছেন, সেই পাকিস্তানে কৃষকদের জন্য কোনো সংগঠন তৈরি হতে এতোটা দেরি হলো! তাও যখন হচ্ছে সেখানেও বাধা ছিল প্রচুর। বাহাত্তরে লিখিত এক স্মৃতি-ভাষ্যে মওলানা নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি যখন প্রথম কৃষক সমিতির গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁর আওয়ামীলীগের বন্ধুরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। যুক্তি ছিল যে, এই মুহূর্তে শ্রেণি-সংগঠন গড়ে তুললে মধ্যবিত্তরা দলে থাকবে না। ভাসানী তখন কিছুটা পিছিয়ে গেলেও লীগ থেকে বের হওয়ার পর তিনি সমিতি গড়ে তুললেন। শুরু হওয়ার পর কাজে একটা বিরতি আসে, বোঝা যায় সেটা ছিল আইয়ুব খানের আমল। রাজনীতির ওপর চলছিল নিষেধাজ্ঞা। ১৯৬৩ সালে তিনি জেল থেকে বের হলে আবার তিনি সমিতি পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এবার তার বহু কমিউনিস্ট বন্ধুরা [যাদেরকে তিনি মস্কো-পন্থি বলে চিহ্নিত করছেন বাহাত্তরে] এতে আপত্তি তুলেন। তবু তিনি যখন কাজ শুরু করছেন, তাঁর মতে, ‘অতিবাম’ বন্ধুরাও সমিতির কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। ভাসানী লিখেন, ‘এই দুই বন্ধুরা তাহাদের আদর্শগত লড়াইয়ে পরস্পর চরম বিরোধী হইলেও কৃষক সমিতি না করার ব্যাপারে ভিন্নভাবে একমত ছিলেন’। ভাসানীর লেখা থেকে জানা যাচ্ছে, দেশ স্বাধীনের পর আবার যখন কৃষক সমিতি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছেন তখনো মস্কো-পন্থিরা বামরা তাতে আপত্তি জানান। কৃষক সমিতি সংক্রান্ত লেখালেখি/স্মৃতিচারণে মওলানা ভাসানী বামপন্থী, বিশেষত মস্কো-পন্থিদের, কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এই অভিযোগও তুলেছেন, এই বামেরা কখনো তাঁর নামে কুৎসা রটাচ্ছেন, কখনো তাঁর সমিতির নাম ব্যবহারও করছেন।

বইটা আসলে একটা সঙ্কলন। অধ্যায়গুলো ভাগ হয়েছে বিভিন্ন দলিলের ধরনের ওপর ভিত্তি করে। যেমন প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে কৃষক সমিতির ম্যানিফেস্টো, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে বিভিন্ন লিফলেট, হ্যান্ডবিল। তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে কৃষক সমিতির চিঠিপত্র। এই অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। কেন, তা একটু পর সংক্ষেপে আলাপ করবো। চতুর্থ অধ্যায়ে রয়েছে কৃষক সমিতি সংক্রান্ত সংবাদ। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধ্যায়ে রয়েছে বিবৃতি এবং বুকলেট। অধিকাংশ দলিলের প্রকাশের তারিখ উল্লেখ থাকলেও কিছু দলিলের প্রকাশের তারিখ উল্লেখ নেই। কোনো সন্দেহ নেই এগুলো গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ! এটাও উল্লেখ্য, সংকলনে কেবল কৃষক সমিতিরই নয়, কৃষক- মজুর, তাতি, জেলে, হরিজন সহ সমাজের সকল সর্বহারাদের পক্ষেও বিভিন্ন আয়োজনের দলিল/স্মারক এখানে সঙ্কলিত হয়েছে।

এই দলিলগুলো কীভাবে ইতিহাসের একটা নির্দিষ্ট কালের সংগ্রামকে তুলে ধরে সেটা দীর্ঘ ও নিবিড় পর্যালোচনার বিষয়। এই সংক্ষিপ্ত রিভিউতে আমি কেবল ভাসানীর কাজ সম্পর্কে দুয়েকটা মন্তব্য করবো, যেগুলো দলিল থেকে ফুটে উঠেছে। পূর্ব বাংলায় (পাকিস্তানে) যে ধরনের ভূমি সংস্কার হয়েছে, সেগুলো যে কৃষককে আদতে কোনো ফায়দা এনে দিতে পারেনি সেটা কৃষক সমিতি স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছে। প্রতিটি বিবৃতিতেই কৃষকের সার্বিক উন্নতির জন্য দীর্ঘ প্রস্তাবনা ও দাবি-দাওয়া থাকতো। কৃষক সমিতি কাজ করার পূর্ব পাকিস্তান কৃষক স্বেচ্ছাসেবক ও স্বেচ্ছাসেবিকা বাহিনী গঠন করা হয়। তাদের কাজ হচ্ছে কৃষকের মধ্যে কাজ করা। তো, এই কাজ কীভাবে করবে? কর্মীদের কাছে মওলানা ভাসানীর কিছু পরামর্শ আছে। যেমন,

‘মনে রাখিতে হইবে, জনসাধারণ তাহাদের সমস্যার কথা কর্মীদের চাইতে ভালোভাবে বোঝেন, কারণ তাঁহারাই এই সমস্যায় জর্জরিত। কর্মীরা যেন সবজান্তার ভাব লইয়া জনসাধারণের সঙ্গে কথাবার্তা না বলে, তাহা হইলে কর্মীরা জনসাধারণের বিরক্তি উৎপাদন করিবে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অপূরণীয় ক্ষতি করিবে’।

সমিতির বিভিন্ন দলিলে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবে’র কথা পাওয়া যায়। এই বিপ্লব কী জিনিস? এখানে দুইটা কাজকে পাশাপাশি করার কথা বলা হয়েছে: ‘শোষণ প্রতিরোধ ও শোষণ-ব্যবস্থা ভাঙ্গিয়া ফেলা এবং সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে গঠন ও উন্নয়নমূলক কাজ’। সাবধান করে দেয়া হয়েছে, কেবল বিপ্লব বিপ্লব চিৎকার করলেই বিপ্লব হয়ে যাবে না। এর জন্য দরকার পড়বে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও মাঠ-প্রস্তুতি। ভাসানী তাঁর শত্রুদেরও চিহ্নিত করছেন। মোটা-দাগে চার ধরনের শত্রুকে তিনি চিহ্নিত করছেন: পুঁজিপতি সামন্ত শোষক, ইসলামের আলখেল্লা পরনেওয়ালা, ‘উগ্র জাতীয়তাবাদের মুখরোচক’ বুলি কপচানেওয়ালা এবং ‘বিপ্লবের টুপি’ পরনেওয়োয়ালা। এরা সবাই, ভাসানীর মতে, কৃষকের শত্রু। তারা সবাই মিলে কী করছেন? ভাসানীর উত্তর হচ্ছে: ‘আমাদের দেশের সরল সহজ ইমানদার কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি সর্বহারা জনগণকে বিভ্রান্ত করিয়া, বিপথগামী করিয়া সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে, শোষণ-মুক্তির সংগ্রামকে ব্যাহত করিতে বিশেষ তৎপর’। মওলানার রাজনীতির প্যারাডক্সটা এই শেষ বাক্যের দিকে নজর দিলেই ঠাহর করা যাবে।

মওলানার মাঠের রাজনীতিকে আরো ভালো করে বোঝা যাবে ১৯৬৪ সালে কৃষক সমিতি কর্তৃক আহূত সম্মেলনে ভাসানীর বক্তৃতায়। এটা পরে কৃষকের সমস্যা নামে প্রকাশিত হয়। কৃষকদের সামনে প্রদত্ত সেই বক্তৃতায় ভাসানী কৃষকের সমস্যাতে যাওয়ার আগে রীতিমতো এক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। তাঁর ইতিহাস শুরু হয়েছে খোদ আদম থেকে। পুঁজিপতি-সামন্ত-শোষক-জালিমরা বলেন, ধনি গরিব আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু আদম সৃষ্টির কালে কে ছিল ধনি, আর কেবা ছিল গরিব? নবী মুসার বিদ্রোহের কাহিনীও আসে আদমের ধারাবাহিকতায়। ফেরাউনরা দাস বানিয়ে রাখতো মানুষদের। হযরত মুসার নেতৃত্বে বনি ইসরায়েলরা বিদ্রোহ করে তৎকালীন জালিমকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। হযরত সালেহ এর যুগেও তাঁর নেতৃত্বে মজলুমরা ধনিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। রোম সাম্রাজ্যেও ক্রীতদাসরা মালিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। এভাবে একে একে ইতিহাসের বয়ান শেষে মওলানা দৃষ্টি ফেরান নিজ-ভূমে। একে একে বর্ণনা করেছেন এই দেশের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাসের কথা। তারপর তুলে ধরেন নিজেদের কৃষকদের সমস্যাগুলো। তিনি জোরশে প্রশ্ন তুলেন, এখনকার শোষকদের তৈরি কারা করেছে? আল্লা তায়ালা নাকি উপনিবেশিক ইংরেজরা? এই পুরো ইতিহাস বর্ণনা থেকে তিনি দুইটা শিক্ষার কথা কৃষকের উদ্দেশ্যে বলেন। এক, ‘আপনারা নিজেরা যতটা দুর্বল মনে করুন না কেন, আসলে আপনারা ততটা মোটেও দুর্বল নন। আপনাদের মিলিত শক্তির কাছে যেকোন গভর্নমেন্ট, তাহা যত শক্তিশালীই হউক না কেন, মাথা নত করিতে বাধ্য’। দুই, ‘আপনাদের নিজেদের দাবী ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই আপনাদেরকেই করিতে হইবে’। এই দুই নাম্বার শিক্ষার বৈধতা আবার দিয়েছেন কোরানের একটা আয়াতকে উদ্ধৃত করে। কৃষকের সাথে যে ময়দানে ভাসানীর সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে এবং বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে সেটার পরিচয় এতে পাওয়া যায়। এখানে ধর্ম, সমাজতন্ত্র, জালিম, জুলুম সবকিছুর সরব উপস্থিতি রয়েছে। যারা ধর্মকে বাদ দিয়ে ভাসানীর সমাজতন্ত্রকে নিতে চান, তারা এটাকে তার দক্ষিণ-পন্থি প্রবণতা বা সামন্ত-মানসিকতার পরিচয় বলে চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু ভাসানীকে, এবং তিনি যাদের জন্য রাজনীতি করতে চান, তাদেরকে বোঝার জন্য এই দুইটাকে আলাদা করে বোঝা আদৌ সম্ভব না। কৃষক চেতনায় ধর্মভাবের প্রবল উপস্থিতির কথা ইতোমধ্যে বহু গবেষক আমাদের গোচরে এনেছেন।[8] ফলে এখন ভাসানীকে নতুন ভাবে পর্যালোচনা করাও দরকার। ভাসানীর হুকুমতে রাব্বানীয়া, খোদায়ে খেদমতগার, রবুবিয়াত সংক্রান্ত লেখাপত্র এতে সহযোগিতা করতে পারে! হুজুরদের চাপে বা তাদের গালি খেয়ে মওলানা ভাসানীর মধ্যে এমন দক্ষিণ-পন্থী প্রবণতা দেখে দিয়েছে- এই ধরনের বিশ্লেষণের[9] ফাঁদ এড়িয়ে ভাসানীর নিজের লেখাগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে পাঠ করতে হবে।

কিন্তু কৃষক সমিতির যাবতীয় উদ্যোগ লড়াই বিবৃতি থেকে স্পষ্ট যে এটা একটা রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সমিতির দলিলাদি এবং ভাসানীর বক্তৃতাতেও এইটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এটা কোনো রাজনৈতিক দল নয় (এও বলা হয়েছে, এটি ‘অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’) বরঞ্চ এটি ‘কৃষক সমাজের সংগঠন’। এই কৃষকদের মধ্যে নানা রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক থাকতে পারে, কিন্তু কৃষক সমিতির কাছে তাদের পরিচয় কেবল তারা কৃষক। কৃষক সমাজের সাধারণ স্বার্থের দেখভাল করবে এই সংগঠন। কৃষক প্রশ্নে মওলানার যে অবস্থানের বিষয়ে আমরা উল্লেখ করেছিলাম একেবারে শুরুতে তাঁর অনেকটা স্পষ্ট প্রমাণ এই দলিলগুলোও দিচ্ছে। এখানে দুটো বিষয় নজরে আনা দরকার। এক, এমন একটা প্রতিষ্ঠানকে ‘অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান’ বলার মধ্যে কী ‘সবকিছুই রাজনৈতিক’ ভাবনার প্রতি কোনো ধরনের প্রশ্ন ছোড়া হচ্ছে? দুই, আলমগীর কবির ‘উদ্দেশ্য’ ও ‘উপায়’ নিয়ে যে পয়েন্ট সামনে এনেছিলেন, এখানে তার প্রমাণ মিলে। ভাসানীর বহু লেখাপত্র আছে যেখানে তিনি অহিংস রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করছেন। অন্যদিকে, কৃষক সমিতিতে বলছেন, ‘বৈধ, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পন্থায়’ উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চালানো হবে। অর্থাৎ, কৃষক প্রশ্নে স্থির থেকে ভাসানীর রাজনৈতিক কলা-কৌশল পরিবর্তনও হয়েছে।

উল্লেখ করতে হয়, এই বইয়ে সঙ্কলিত দলিলাদির ভেতর মুক্তিযুদ্ধের আগের ও পরের দুই পর্বেরই আছে। খটকা লাগতে পারে যে, মাঝখানে এতো বড়ো যুদ্ধ ঘটে গেলো তবু দাবি-দাওয়ার মধ্যে তার বিশেষ কোনো আলামত নেই কেন? হ্যা পরিবর্তন আছে। আগে ছিল পাকিস্তান সরকারের প্রতি, এখন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি। কিন্তু মোটা-দাগে কৃষকদের দাবি-দাওয়ার মধ্যে এমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। এই বিশেষ প্রপঞ্চ কৃষকদের অপরিবর্তনীয় অবস্থার দিকেই ইশারা ফেলে। মওলানা যে কৃষকের জন্য ‘স্থির’ ছিলেন, সেই কৃষকের কী কোনো মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে? উত্তরটা না দেই।

যাক, ছোট এই বুক-রিভিউকে দীর্ঘায়ত করার সুযোগ নেই। এই সঙ্কলনের আরেকটি দিকের কথা উল্লেখ করেই আলাপের ইতি টানবো। আমরা এতক্ষণ ভাসানীর রাজনীতিকেই দেখেছি। প্রবাহের উলটা দিকটাও এখানে আছে। ভাসানীর কাছে বহুজন চিঠি লিখেছেন, তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। এই চিঠিগুলো প্রান্তিকের চোখে মওলানা কেমন ছিলেন তারও একটা নমুনা দেয়, যদিও সেটা আকারে খুব অল্প। এই চিঠিপত্রে কেউ কেউ কৃষক সমিতি সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন, কখনো কখনো তাদের ঘরের দুঃখ দুর্দশার নিরাময় চেয়েছেন, কখনোবা চেয়েছেন পরামর্শ। যেমন একজন কৃষক সমিতি তার এলাকায় খুলতে চান। তিনি ভাসানীকে চিঠিতে লিখছেন,

‘আমি গ্রামে গ্রামে কৃষক সমিতি করতে ইচ্ছুক। কিন্তু কৃষক সমিতির রশিদ বই এবং গঠনতন্ত্র এর বই আমার কাছে নাই। … কৃষক সমিতি করার নিয়মটাও জানাইব। … আমাদের ইচ্ছা ছিল আপনাকে সরাইলে আনার এবং ন্যাপ অফিস উদ্বোধন করার ও কৃষকের একটা মিছিল বাহির করার। কিন্তু টাকার অভাবে কিছুই হচ্ছে না।’

আরেকজন চিঠিতে পরামর্শ দিচ্ছেন: ‘আরজ এই যে, আপনার কৃষক সমিতির নাম সর্বহারা কৃষক শ্রমিক সমিতি রাখা হইলে ভালো হইত বলিয়া আমাদের ধারণা।’ আবার কেউ কেউ দুর্দশায় পড়ে আশ্রয় চেয়ে ভাসানীর কাছে চিঠি লিখেছেন:

‘আমাদের এলাকায় কৃষকেরা ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দরুন অনাহারে দিন কাটাইতেছে। খোরাকের ধান নাই। চাউলের দাম অগ্নিমূল্য। চাষের জন্য সার পাওয়া যাইতেছে না। এমতাবস্থায় আমাদের এলাকায় কৃষকেরা সাহায্য না পাইলে অল্পদিনেই মারা যাইবে…। অতএব প্রার্থনা যে আমাদের এলাকায় কৃষকগণ কর্জ্জ টাকা, হালের বলদ ও সার মঞ্জুর করাইয়া প্রাণে রক্ষা করার আদেশ হয়।’

দুঃখ দুর্দশা লাঘবের এমন বহু চিঠি ভাসানীর কাছে আসতো বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু এই ভাসানী তো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেউ না। বরঞ্চ বিরোধী-পক্ষের লোক। সেটা একাত্তরের পরে হোক, বা আগে হোক। তিনি কীভাবে এই ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিলেন?

অনেকে আবার দুঃখ প্রকাশ করে চিঠি পাঠাতেন, কৃষক সমিতির কাজ করতে পারছেন না বলে: ‘অর্থনৈতিক অবস্থা চরমে পৌঁছেছে। বহুকষ্টে জীবিত অবস্থায় একবার আপনাকে দেখতে যেতে পারায় জীবনে সার্থক করতে পেরেছি কিন্তু আর্থিক সংকট চরমাকার ধারণ করেছে…। শারীরিক ও আর্থিক দুরবস্থার জন্য আপনার ইচ্ছানুরূপ কাজে শরিক হতে আপাততঃ পারছি ন।’ কেউ কেউ নিখাদ ভালোবাসা পাঠাতেন: ‘একটি কালিবাউশ মাছ আপনার জন্য পাঠালাম। আমার গরীব সংঘটন থেকে কৃষকদের সালামসহ মাছটি গ্রহণ করুন।’

কোনো সন্দেহ নেই মওলানা ভাসানীর কৃষক সমিতির এই সঙ্কলন গবেষকদের খোরাক হবে। এমনকি যারা ভাসানীকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে চান তাদের জন্যও। এই দারুণ সঙ্কলনকে সামনে নিয়ে আসার জন্য সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারীকে ধন্যবাদ। এই সঙ্কলনে ভাসানীর রাজনীতিকে যেমন পেয়েছি, তেমনি ভাসানীর সাথে কৃষকের সম্পর্ক কোন জমিনে দাঁড়িয়ে তৈরি হচ্ছে, এবং কীভাবে কৃষকরা তাকে গ্রহণ করছে তার কিছু নজির এখানে পেয়েছি। কিয়দংশ তুলে ধরেছি নিজের মতো করে। শুরু থেকেই বলছি, এবং দেখানোর চেষ্টাও করেছি যে, মওলানা ভাসানীর কাছে কৃষক প্রশ্ন, সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন, পুঁজিবাদের প্রশ্ন একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি যখন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলেন, (নাম শুনেই বহুজন সাম্প্রদায়িক বলতে আগ্রহী হবেন) বা পালনবাদের কথা বলেন, তখনও কৃষক, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ প্রশ্নে তিনি দৃঢ় থাকেন। পালনবাদের মধ্যে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সকলের জমিনের ওপর অধিকারের কথা বলেন। তিনি যখন ইনসাফ, ইনসানিয়াত, হকুমতে রাব্বানিয়ার কথা বলেন তখনো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, পুঁজিবাদ বিরোধিতা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। সাম্রাজ্য ও পুঁজির বিরুদ্ধে এবং কৃষকের জমিনের অধিকারের পক্ষে না দাঁড়িয়ে ভাসানীর ইনসাফ ও ইনসানিয়াত ভিত্তিক বিপ্লব কামিয়াব হয় না। বর্তমানে তো সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ শব্দগুলো তার তৎকালীন জোশ ও আভা হারিয়ে ফেলেছে। এককালের প্রবল মার্কিন-সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধীরাও মার্কিনী নিওলিবারেল পুঁজির ওপর ভর করে লিবারেল পরিসর তৈরির নাম করে নিও-লিবারেল পরিসর তৈরির চেষ্টায় মত্ত আছেন। কৃষকও আত্মহত্যা করছেন নিয়মিত। এই আপাত রাজনীতি-শূন্য অবস্থায়, যখন কিনা পুরনো সকল কিছু মরে যাচ্ছে, অথচ নতুন কিছুর জন্ম হচ্ছেনা, এমন অবস্থায় মওলানা ভাসানী আমাদের কী-বা দিতে পারেন? হয়তোবা অনেক কিছুই পারেন? সেটা নির্ভর করবে আমাদের ওপর, আমরা কোন রাজনীতি নির্মাণ করতে চাই তার ওপর।

 

 

[1] মওলানা ভাসানীকে নিয়ে এমনতর নানা বিশ্লেষণের জন্য দেখুন: মহসিন শস্ত্রপাণি, (সম্পা.), মজলুম জননেতা: মওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ, ২০১৪।

[2] আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ডায়রির এক ছোট মন্তব্যে এটা বলেছিলেন। বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা এতে দেন নি। হয়তোবা মতাদর্শিক খোপে আটকে না থাকার কারণেই এটা বলেছিলেন। তিনি এই মন্তব্য কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও বলেছিলেন। মন্তব্যের কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি: “একদিকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ও শোষনের তীব্র প্রতিবাদ, এবং অন্যদিকে সামন্ত একটি সঙ্গীত প্রথার মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া – এই ধরনের স্ববিরোধিতা নজরুল ইসলামের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা চলে। মওলানা ভাসানীর ক্ষেত্রেও কি তাই হয়নি? সাম্রাজব্যবাদ বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা প্রত্যেকেরই স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আবার জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধেও তার সংগ্রাম। পক্ষান্তরে পীর প্রথা, ধর্মীয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রচেষ্টা প্রভৃতি কি তাঁর সামন্ত মনোভাবের পরিচয় বহন করে না?…নজরুল ইসলাম ও মওলানা ভাসানী দুজনের মধ্যেই এনার্কিস্ট হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশেষ ধরনের চরিত্র বৈশিষ্ট্যের ফলে সেই ধরণের বিশেষণ কারো সম্বন্ধে প্রযোজ্য নয়।” বিস্তারিত দেখুন: শাহাদুজ্জামান, (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা), আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ডায়েরি, আগামী প্রকাশনী, ২০১৩

[3] ভাসানীকে নিয়ে ফরহাদ মজহারের ‘মওলানা ভাসানী ও নতুন বিপ্লবী রাজনীতি’, “‘সবুজ’ ভাসানি, লাল ‘ভাসানি’?” এবং ‘পানি ও রবুবিয়াতের রাজনীতি’ শীর্ষক লেখাগুলো দেখা যেতে পারে। পারভেজ আলমের ‘মওলানা ভাসানী ও মজলুমের ঐতিহ্য’ লেখাতে এই সংক্রান্ত ইশারা রয়েছে।

[4] Nurul Kabir, The Red Moulana, Samhati Prakashon, 2012

[5] Alamgir Kabir, “Maulana and His Creed” (1970), Anisuzzaman Chowdhury (Ed.), Moulana Bhashani: His Creed and Politics, Adorn Publication, 2014

[6] সৈয়দ ইরফানুল বারী, মওলানা ভাসানীর কৃষক সমিতি, সংহতি প্রকাশন, ২০২১

[7]Taj Ul-islam Hashmi, Pakistan As A Peasant Utopia:The Communalization Of Class Politics In East Bengal, 1920-1947, Routledge, 2021 (1992)

[8] উদাহরণরস্বরূপ: গৌতম ভদ্র, ইমান ও নিশান, সুবর্ণরেখা, ১৯৯৪

[9] এমনত একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন বদরুদ্দীন উমর: ‘একদিকে কমিউনিস্টদের থেকে যথোপযুক্ত সাহায্য না পাওয়া এবং অন্যদিকে জামায়াতের দ্বারা এভাবে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রথমেই সমাজতন্ত্রের ধ্বনিকে বিসর্জন দিয়ে আওয়াজ তোলেন ইসলামী সমাজতন্ত্রের’। বিস্তারিত:  বদরুদ্দীন উমর, “মওলানা ভাসানী ও কমিউনিস্ট আন্দোলন”, মহসিন শস্ত্রপাণি, (সম্পা.), মজলুম জননেতা: মওলানা ভাসানী স্মারক-সংকলন, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদ, ২০১৪।

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top