খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক বহিষ্কার প্রসঙ্গে

গত বছরের শুরুতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবর তাদের মৌলিক কিছু দাবী জানায়। অস্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধির হার কমানো, আবাসন সংকট নিরসন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষার্থী বিষয়ক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তকরণ ও অবহিতকরণ এই পাঁচটি মৌলিক দাবি কতৃপক্ষ বরাবর জানানোর পর আশানুরূপ কোন ফল না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা শেষমেশ আন্দোলনে নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ থেকে বারো জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। একসময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক, এটা মেনে নিয়ে তা দ্রুত পূরণের আশ্বাস দেয়। যদিও পরবর্তীতে সেসব দাবি পূরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোন অগ্রগতি দেখা যায় না। ঘটনার দেড় মাস পর তিনজন শিক্ষার্থীর কাছে তাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা বলে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কি? মুখে না বলে তাদেরকে লিখিত জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ তাদের সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। একইভাবে ঘটনার নয় মাস পর একমত পোষণকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে বেছে বেছে চারজন শিক্ষকের নামে ‘উসকানি’ দেবার অভিযোগ এনে শোকজ করে কতৃপক্ষ। তারপর তাদের মধ্যে দুইজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার ও তিনজন শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ। বহিষ্কার হওয়া দু’জন ছাত্র তাদের বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য বর্তমানে অনশনরত অবস্থায় আছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানানোর অপরাধে শিক্ষক আবুল ফজলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং অন্য দুইজন শিক্ষক শাকিলা আলম ও হৈমন্তী শুক্লা কাবেরীকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ কতৃক তিনজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনিত সবগুলো অভিযোগ প্রায় অভিন্ন। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের বিবেচনায় বরখাস্তকৃত শিক্ষক আবুল ফজল মূল ‘অপরাধী’, তাই তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলোর সত্য-মিথ্যা জানা গেলে খুব সহজেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পুরো প্রক্রিয়াটির সত্য-মিথ্যাসম্পর্কে জানা পারা যাবে। তাই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ ও সেই অভিযোগগুলোর  সত্যতার বিষয়টির আলোচনা আমি শিক্ষক আবুল ফজলের উপর আরোপিত অভিযোগের ভিত্তিতে করছি ।

      

অভিযোগপত্রের শুরুতেই বলা হয়েছে– 

উপর্যুক্ত বিষয় ও সূত্র মোতাবেক যেহেতু আপনি জনাব মোঃ আবুল ফজল, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কে জানানো যাচ্ছে যে, গত ০১-০১-২০২০ ও ০২-০১-২০২০ খ্রি. তারিখে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্ট বিশৃংখল ও নৈরাজ্যকর ঘটনায় আপনার সম্পৃক্ততার বিষয়ে আপনাকে ১৩-১০-২০২০ খ্রি. তারিখে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়।……    

এখানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যকর বলে আখ্যায়িত করেছে। তার মানে এ কথার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দাবিদদাওয়া ও আন্দোলনকে নৈতিকভাবে অস্বীকার করেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ স্বীকার করেছিলো শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তাদের আন্দোলনকেও বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ যে ন্যায্য বলেছে তা ইতোমধ্যে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে থাকবেন। অর্থাৎ খুবি প্রশাসনের বক্তব্য স্ববিরোধী, একই মুখে তারা দ্বিচারিতা করছেন। বাধ্য হয়ে বলতেই হচ্ছে, প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যে অবস্থাকে বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যকর বলছে সে অবস্থার বিভিন্ন ভিডিও লোকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছেন এবং সেখানে কোন বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্যকর অবস্থার নজির পাওয়া যায়নি। একইভাবে শিক্ষক আবুল ফজলের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের ছয় ও আট নং প্যারায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নৈরাজ্যকর বলে চিহ্নিত করেছে  বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে   

যেহেতু, গত ০১-০১-২০২০ খ্রি. তারিখে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে আপনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলেছে যে, হলে পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে’ যা ধারণকৃত ভিডিও তে দেখা যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত আবাসনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আইনে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। এ প্রেক্ষিতে আপনার এই মিথ্যাচার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ করার প্রয়াস বলে প্রতীয়মান হয়।

শিক্ষক আবুল ফজল বলেছেন, ‘হলে পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদেরকে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।’ যে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বলছে আবাসনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আইনে এ ধরণের কোন ‘বাধ্যবাধকতা  নেই’। অথচ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯০ (৪৫) এ বলা হয়েছে ‘প্রত্যেক ছাত্র’ সংবিধি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ দ্বারা নির্ধারিত স্থানে বাস করবে। তার মানে ‘বাধ্যবাধকতা  নেই’ এ কথাটির মাধ্যমে বর্তমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটির আইনকে অস্বীকার, অমান্য ও অবমাননা-ই শুধু করেছে তা নয়; সেই সাথে শিক্ষক আবুল ফজলকে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর অধিকার বিষয়ে মিথ্যাচার করেছে।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে–  

যেহেতু, ‘শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সম্পর্কে জানার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের লজ্জা পাওয়া উচিত এবং লজ্জায় তাদের আবাসিক সমস্যা সমাধান করা উচিত’ বলে ধারণকৃত ভিডিওতে আপনাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, একটি বা দুইটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাংলাদেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই সকল শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নেই। এছাড়া বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল নির্মাণ সরকার কতৃক অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে হয়ে থাকে। কাজেই আপনার বক্তব্য শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অবমাননাকরই নয়, বরং তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই দেয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। 

দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার অজুহাত দিয়ে এখানেও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনকে অস্বীকার ও অবমাননা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল নির্মাণ সরকার কতৃক অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে হয়ে থাকে কথাটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল ব্যবস্থার বিষয়টি অগ্রাহ্য করে ও বিবেচনায় না নিয়ে কতৃপক্ষ পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনকেই অবজ্ঞা ও অবমাননা করেছে।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে–  

যেহেতু, বিভিন্ন দাবীদাওয়াসহ শিক্ষার্থীদের সকল বিষয় ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনির্দিষ্ট একটি প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। ঘটনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট কোন দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও, অযাচিতভাবে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে আপনি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো প্রশাসনিক কাঠোমোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। একই সাথে শিক্ষার্থীদের দাবীসংশ্লিষ্ট বিষয়টি সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছেন।  

তার মানে শিক্ষার্থী সংশ্লিষ্ট কোন দায়িত্বে না থাকলে কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো যাবে না, শিক্ষার্থীদের কোন দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান বলছে প্রত্যেক ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। আর যখন সমস্যাটা শিক্ষার্থীদের, তখন একজন শিক্ষকই-তো সর্বপ্রথম তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। প্রশাসনের দায়িত্বে না থাকলে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ানো যাবে না, এ ধরণের বক্তব্য প্রশাসনের হীনমন্যতা ও অন্তঃসারশূন্য মানসিকতাকেই প্রকাশই শুধু করে না, তা ‘শিক্ষক’ নামের মর্মার্থকেই চরিতার্থ করে। একই সাথে প্রশাসন অভিযোগ তুলছেন তিনি নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করেছেন। এই ‘নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’টাই কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিবারের ‘স্বেচ্ছাচার’? উপাচার্যের মামাতো, ফুপাতো, খালাতো এক কুড়ি ভাই বোন নিয়োগ পাওয়া, নতুন বিল্ডিং ফেটে যাওয়া, পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা বাদ দিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেয়া, শিক্ষকদের যৌন কেলেঙ্কারির চাষাবাদে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা শোকজ দিয়ে চাপা দেয়া, সময়ক্ষেপণ করে একজন ধর্ষককে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া, যখন ইচ্ছেখুশি শিক্ষার্থী বহিষ্কার হওয়া এগুলো ‘নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া’য় কিভাবে সম্ভব?

চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে–    

যেহেতু, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমানে প্রযোজ্য ফি ও বেতন কাঠামো অনুমোদিত হয় ২০১৪ সালে (১৭৪তম সিন্ডিকেট, ২৩/০৯/২০১৪ খ্রি.)পরবর্তীতে দীর্ঘদিন (২২/১২/২০১৬ খ্রি. হতে ১৬/০৭/২০১৮ খ্রি. পর্যন্ত) আপনি সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। আপনি সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধা বর্তমান সময়ের চেয়ে অপ্রতুল ছিলো। আপনি, জনাব মোঃ আবুল ফজল, শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও ঐ সময়ের শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যা সমাধানকল্পে আপনার কোন ভূমিকা পালনের তথ্য প্রশাসনিক রেকর্ডে নেই। কাজেই, কোন দায়িত্বে না থাকা সত্ত্বেও এসকল বিষয় নিয়ে ঘটনাকালীন আপনার সোচ্চার ভূমিকা অস্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।     

সে সময় শিক্ষক আবুল ফজল ছিলেন একজন সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের দায়িত্বে। বলা প্রয়োজন এরকম ১০ জন সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের তিনি একজন ছিলেন। সেখানে কোন বিষয়ে আসলেই তার কতোটুকু ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রয়েছে? তাছাড়া, মূল দায়িত্বটা ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের। সহকারীগণ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে সহায়তা করেন মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার এ প্রশ্নটা একজন ছাত্র বিষয়ক পরিচালককে করতে পারেন।  একজন সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের (১০ জনের ১ জন) কাছে এমন প্রশ্ন রাখা যথেষ্ঠ অসমীচীন। বলা জরুরী, শিক্ষক আবুল ফজল সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের দায়িত্ব থেকে তার মেয়াদ শেষ হবার পূর্বের পদত্যাগ করেছিলেন। হতে পারে শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারছিলেন না বলে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন কিংবা অন্যান্য সহকারী ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের সাথে তার মতের অমিল হচ্ছিল, কিংবা এ বিষয়ের  প্রধানতম ব্যক্তি অর্থাৎ ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের কাছে তার মতামত প্রাধান্য পাচ্ছিল না কিংবা মতামত বা চিন্তাভাবনায় অমিল ছিল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অন্য যেকোনো অধিকারের সুরক্ষা হচ্ছিলনা বলে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। যাইহোক, প্রশাসনকতৃক এমন লঘুতর একটি প্রশ্নকে সামনে রেখে একজন শিক্ষককে চাকরি থেকে বহিস্কারের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত কিছুতেই সমীচীন হতে পারে না।

পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে–    

যেহেতু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত ডিনবৃন্দ শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে গেলে আপনি আইন স্কুলের সম্মানিত ডিনকে শিক্ষার্থীদের দাবীর প্রতি সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান, যা আপনার ঔদ্ধত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ।     

          

একজন ডিনকে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানানোর আহ্বান ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয় কি করে? উল্টো সেটা  শিক্ষক আবুল ফজলের নৈতিক অবস্থানের সত্যটা ও শুদ্ধতা প্রকাশ করে। তার প্রকাশ্য এমন উচ্চারণ প্রমাণ করে তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবী যৌক্তিক। বিষয়টির মধ্যে ঔদ্ধত্যতার কোনও কিছু খোঁজে পাওয়া যায় না।

সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে(ষষ্ঠ ও অষ্টম অভিযোগে শিক্ষার্থীদের কার্যক্রমকে ‘নৈরাজ্যকর’ বলে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে)     

যেহেতু, আপনাকে তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষাতকারের মাধ্যমে, অথবা লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে, অথবা কমিটি আপনার সুবিধামত স্থানে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে আহ্বান করে এবং কোন মাধ্যমে আপনি ব্যাখ্যা দিতে চান, তা আপনাকে ১০-০১-২০২১ খ্রি. তারিখে একটি পত্র দেয়া হয়। আপনি কোন মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা প্রদান করতে চান, সে সম্পর্কে কমিটিকে কোন কিছুই জানাননি; বরং ১০-০১-২০২১ খ্রি. তারিখে দেয়া একটি পত্রে কমিটির প্রাপ্ত তথ্যসূত্রের কাগজপত্রাদি আপনি কমিটির কাছে চান এবং যে ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে কমিটি সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে, তাদেরকে জেরা করার সুযোগ চান। এছাড়াও আপনি আপনার পত্রে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ১২ (বারো) জন শিক্ষকেরই সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য কমিটিকে অনুরোধ জানান। উপরন্তু, আপনি নিজে শিক্ষার্থী না হওয়া সত্ত্বেও, সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে জনৈক শিক্ষার্থী কতৃক দায়েরকৃত রিট পিটিশনের পেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের আচরণ শৃঙ্খলা অধ্যাদেশ সম্পর্কিত মহামান্য হাইকোর্টের রুলনিশির বিষয় অবতারণা করেন, এবং এই রুলনিশির প্রেক্ষিতে আপনাকে মৌখিক বা লিখিত বক্তব্য প্রদান করতে হবে কি না সে বিষয়ে কমিটির কাছে ব্যাখ্যা চান। যা কতৃপক্ষের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন ও অবমাননার সামিল।    

প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে শিক্ষক আবুল ফজল কোন মাধ্যমে ব্যাখ্যা দিতে চায় সে বিষয়ে নাকি কমিটিকে কিছু জানাননি। কিন্তু বাস্তবতা হল শিক্ষক আবুল ফজল (অভিযুক্ত অন্য দুইজনও) মেইলে ও লিখিত উভয়ভাবেই তিনি  যে লিখিত পত্রের মাধ্যমে জবাব দিতে চান সেটা জানান। তার সত্যটা জানতে নিচের সংযুক্তি দুইটা দেখুন।

যে জেরা করার কথা বলা হয়েছে তার মূল বিষয়টা হল শিক্ষক আবুল ফজলের অজ্ঞাতে অসাক্ষাতে সাক্ষীগুলো নেওয়া হয়েছে। তাই তিনি তদন্ত কমিটিকে বলেছেন সেসব ব্যক্তিদের থেকে তার অজ্ঞাতে সাক্ষী নেওয়া হয়েছে তাদের জেরা করার সুযোগ দেয়া হোক। কিন্তু কতৃপক্ষের কাছে বিষয়টি ঔদ্ধত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। তার মানে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য নেওয়া হবে, সে সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত  করা হবে, অথচ তিনি তা জানতে, শুনতে, বুঝতে-কিছুই করতে পারবেন না। একইভাবে, শিক্ষক আবুল ফজল তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর ডকুমেন্টগুলো কতৃপক্ষের নিকট চান, সেটাও তাকে সরবরাহ করা হয়নি।

মহামান্য হাইকোর্টের রুলনিশি, যে বিষয়টি সম্পর্কে অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সকলে অবগত, তার আলোকে মৌখিক বা লিখিত বক্তব্য প্রদানের বিষয়ে জানতে চাওয়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের নিকট চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন ও অবাধ্যতার বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বলা হচ্ছে ‘আপনি নিজে শিক্ষার্থী না হওয়া সত্ত্বেও’, মহামান্য হাইকোর্টের রুলনিশির বিষয় সম্পর্কে কেন জানতে চাইলেন? প্রশ্ন হল যার উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদেরকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, যার এক পর্যায়ে শিক্ষকদের সহমত পোষণ করার ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ ও অন্যায় বলে গণ্য হয়ে বরখাস্তের সিদ্ধান্তে গড়ায়, তখন সারাদেশ জানে এমন একটি বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করতে হবে কিনা সেটা জানতে চাওয়া অন্যায় হয় কি করে? নাকি উল্টো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের কর্মকাণ্ড মহামান্য হাইকোর্টকে অবজ্ঞা ও অবমাননা করার সামিল?

উপরোক্ত বিষয়গুলো থেকেই এটাই প্রতীয়মান হয় যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ কতৃক শিক্ষক আবুল ফজলের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা। শুধু তাই নয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার বিরুদ্ধে উক্ত অভিযোগগুলো আনতে মিথ্যা, অন্যায় ও হঠকারীতার আশ্রয় নিয়েছে, যা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

Rahul Biswas, student,  Khulna University

More Posts From this Author:

    None Found

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top