গণতন্ত্র ‘নিখোঁজ’, নাকি আদৌ ছিল না? অথবা ‘আমি জানি না’

যে কোনো ঐতিহাসিক কালপর্বের আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার হদিস আন্দোলনকারী দল/গোষ্ঠীসমূহের লিফলেট, ম্যানিফেস্টো, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদিতে পাওয়া যেতে পারে। এগুলোতে প্রায়শই আন্দোলনের অভিমুখ, মূল উদ্দেশ্য, স্বপ্ন স্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এখন বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাসচর্চার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে যে আমলকে বিবেচনা করা হয়, মানে পাকিস্তানি আমলে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলনের লিফলেট, ম্যানিফেস্টো ইত্যাদিতে সবচেয়ে সরব উপস্থিতি ছিল ‘গণতন্ত্র’, ‘বাকস্বাধীনতা’, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’, ‘সমাজতন্ত্র’। যে কেউ সে আমলের দলিলাদিতে চোখ বুলালেই এর সত্যতা টের পাবেন বলে আশা করা যায়। আবার স্বৈরাচারী শাসক ও এর সমর্থকরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিষেদগার করতেন, ‘গণতন্ত্র’ না থাকার জন্য বা নিজেদের ‘স্বৈরাচারী’ হয়ে উঠার জন্য জনগণের অশিক্ষাকে দায়ী করতেন। জনগণকে মূর্খ বলে মনে করতেন। অশিক্ষিত ও মূর্খ জনগণ আসলে ভালোমন্দের কিছুই বুঝে না, সুষ্ঠু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে তারা অপারগ, ফলে দরকার ‘শিক্ষিত’ লোকের ‘স্বৈরশাসন’। এই চর্চা আদতে উপনিবেশ আমলের চর্চা হলেও এর গোড়া খুঁজতে হবে ব্রিটিশ উদারনৈতিক দর্শনে। যেমন জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর রেপ্রেসেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট বইয়ে লিখেছেন, যদিও স্বাধীন প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা, তবু ভারত বা ঐ ধরনের দেশের ক্ষেত্রে সে-নিয়মটা খাটে না, কারণ উপনিবেশিত মানুষেরা সেই অর্থে প্রাপ্তবয়স্ক নয় (চট্টোপাধ্যায়, ২০১৩)। উপনিবেশিত জনগণ গণতন্ত্রের জন্য ‘ফিট’ না- এমন ভাবনা ব্রিটিশ জাতীয়তাবাদী লিবারেলবাদের মূল যুক্তি। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এই যে, উপনিবেশের যুগ গত হলেও আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজের প্রভাবশালী অংশ এখনও লিবারেল মতবাদের মধ্যে নিহিত হিস্টোরিসিজম তথা ইতিহাসবাদের ফাঁদ থেকে এখনও বের হতে পারেনি। ১৯৬৯ সালে আবুল মনসুর আহমদ একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন; সেখানে তিনি তার মতো করে এইধরনের আলাপকে খণ্ডানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার আলাপ থেকে বোঝা যায়, তখন ‘গণতন্ত্র’ না থাকার পিছনে জনগণের ‘মূর্খতা’কে দায়ী করার চল ছিল। একটু লম্বা হলেও আমি তাকে উদ্ধৃত করছি:

‘পাকিস্তানীদের বিপুল সংখ্যাধিক্যের নিরক্ষরতাকে তাদের গণতান্ত্রিক অযোগ্যতার প্রমাণরূপে যারা ব্যাখ্যা করেন, তাঁরাও আসলে গণতন্ত্রের তাৎপর্য ও মর্মবাণী বুঝেন। নিরক্ষরতা ও অজ্ঞানতা এক জিনিস নয়। লেখাপড়া না জানিয়াও লোকেরা বড় – বড় সংসার ও কারবার চালায়। বস্তুত সাধারণ মানুষের ভাল – মন্দ বিষয় – জ্ঞানই গণতন্ত্রের ভিত্তিভূমি। এই হিতাহিত জ্ঞান মানুষের সহজাত। লেখাপড়া এই জ্ঞানকে প্রখর করে; কিন্তু লেখাপড়া না জানিলেই রাজনীতিক চেতনা থাকিবে না, এ ধারণা ঠিক নয়। … আর যারা দেশের নিরক্ষরতা দূর না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রবর্তনের বিরোধী , তারা বলিয়া দিবেন কি, জনগণের সরকার না হইলেও ইতিমধ্যে জনগণের শিক্ষা প্রবর্তন করিবে কারা?’ 

উদ্ধৃতিটা লম্বা হলেও দিলাম, এই কারণে যে ইতিহাস কীভাবে ফিরে ফিরে আসে তার একটা নমুনাও এখানে পাওয়া যাবে। পাকিস্তান আমলে যে যুক্তি আবুল মনসুর আহমদরা [বহুবচনে বললাম এই কারণে যে, ধরে নিচ্ছি এই তরিকার যুক্তি তখন আরো অনেকেই দিয়েছিলেন] দিচ্ছিলেন, তা আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর এসে আমাদেরকেও দিতে হচ্ছে। উদ্ধৃতিতে ‘যাদের’ বিরুদ্ধে কথা বলে হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে আজও আমাদের বলা লাগছে।

যা বলছিলাম, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যত অভিমুখ পাওয়া যায়, তাতে সর্বাধিক স্পষ্ট ছিল গণতান্ত্রিক চেতনা, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা। একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশে-বিদেশে যারাই আলাপ-আলোচনা করেছেন তারাই এই গণতান্ত্রিক চেতনা বিষয়ে বাতচিত করেছেন, বা করতে বাধ্য হয়েছেন। এখানকার জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সে সত্তর সালের ‘নির্বাচন’ও খুব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে ফেলে দেয়া, এরপর নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নির্বাচনে বিশাল জয়লাভ, নির্বাচন পরবর্তী টানাপোড়ন থেকে মার্চের অহসযোগ আন্দোলন- ঘটনাপ্রবাহগুলো খুবই পরিচিত। এই যে ‘নির্বাচন’ নিয়ে এতো আগ্রহ-উদ্দীপনা, গণতন্ত্র যেখানে অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়, সেখানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের হালচালের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে আরেক বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীর স্মৃতিচারণে, ‘স্বাধীন দেশে (১৯৭৩ সালে) এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি—মনের মধ্যে প্রচণ্ড উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সে উৎসাহ দপ করে নিভে গেল। জানলাম, আমাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় সরকারদলীয় প্রার্থী জয়লাভ করেছিলেন। নিজের ভোটটা আমি তাঁকেই দিতাম। তিনি এমনিতেই জিততেন। তবে উৎসাহী রাজনৈতিক কর্মীরা যে আশার ওপর ভর করে নিশ্চেষ্ট থাকতে চায়নি। পরীক্ষা না দিয়ে পাস করতে চাওয়া আর ভোট না দিয়ে নিজেদের প্রার্থীকে পাস করাতে চাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য আমি দেখতে পাইনি।’ (আনিসুজ্জামান, পৃ. ৭০)

প্রাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা-উত্তর জমানাতে গণতন্ত্রের প্রশ্নে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কপালে আদতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছিল কিনা তার একটা ইশারা উপরোক্ত দুইজন বিখ্যাত ব্যক্তির উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়। আলী রীয়াজ যখন ‘নিখোঁজ গণতন্ত্র’ লিখেন তখন তার অনুসন্ধান শুরু হয় আরো পর থেকে, ১৯৯০। এককালে যার ‘খোঁজ’ ছিল, কিন্তু এখন আর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, বা নিরুদ্দেশ হয়েছে, তা-ই তো ‘নিখোঁজ’। বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ নব্বইয়ে একপলকের জন্য হাজির হয়েছিল তারপর থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছে। ফলে ‘নিখোঁজ’। পাকিস্তানি জমানা, আনিসুজ্জামান উদ্ধৃত জমানা, এর পরবর্তী সামরিক শাসন জমানা, এবং বিদ্যমান ‘নিখোঁজ’ জমানা, যাকে আলী রীয়াজ বলছেন হাইব্রিড রেজিম, – এই পুরো কালপর্ব যদি আমলে নেই তাহলে গণতন্ত্রের প্রশ্নে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের ভাগ্য যে খুব একটা সুপ্রসন্ন না, তা বোধহয় কিছুটা হলেও বলা যায়। বিশেষ করে এই সময়ে এসে আবুল মনসুর আহমদের উপরোক্ত উদ্ধৃতির প্রাসঙ্গিকতা আসলে এই ‘অভাবে’র ইশারাই দেয়।

 

আলী রীয়াজের ‘নিখোঁজ গণতন্ত্র : কর্তৃত্ববাদের পথরেখা ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ গ্রন্থের মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল তা কীভাবে দিশা হারিয়ে কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে গেলো! এই প্রশ্নের উত্তর খোজা হয়েছে খোদ গণতন্ত্রের বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে, দেশিয় রাষ্ট্রীয় কাঠামো, পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে। কোনো একটা নির্দিষ্ট কারণে গণতন্ত্র ‘নিখোঁজ’ হয় নি, বরঞ্চ সবগুলো উপাদানই অল্প-বিস্তর অবদান রেখেছে।

বইতে মোট তেরটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে পুরো বইয়ের প্রেক্ষাপট ও চেহারা সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশের নাগরিকেরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সক্রিয়’ থাকার পরও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর কেন গণতন্ত্রহীন অবস্থায় বসবাস করতে হচ্ছে, এই প্রশ্নই আলাপের প্রেক্ষাপট ও রাস্তা দুটো বাতলে দিয়েছে। এই রাষ্ট্রের জনগণ স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ধরণের শাসনব্যবস্থা দেখেছেন, ‘বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃত্ববাদ’ দুটোর অভিজ্ঞতা গ্রহণের পর নব্বইয়ে যখন এরশাদের পতন হলো তখন অনেকেই সেই ঘটনাকে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ‘কর্তৃত্ববাদ’ চেনার যত সূচক আছে, বা নির্ণায়ক আছে, সবগুলোই বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে খাপ খায়। ফলে এই উলটো যাত্রার কারণ কী এবং কোন প্রক্রিয়ায় সেই যাত্রা সম্ভব হয়েছে তা-ই বইয়ের উপজীব্য বিষয়। উল্লেখ্য, লেখক মনে করেন, ‘বাংলাদেশে আজকে যে শাসনব্যবস্থা চলছে তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন’। সঙ্কটের সলুক সন্ধানে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় প্রেক্ষাপটকেই আমলে নিয়েছেন।

এরপরেই গণতন্ত্রের সংজ্ঞা, গণতন্ত্রায়নের সংজ্ঞা, গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রা এবং বিদ্যমান বৈশ্বিক সঙ্কটের দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যার অবনতি, ‘মুক্ত’ রাষ্ট্রের সংখ্যা কমে যাওয়া সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বৈশ্বিক সঙ্কটকে চিহ্নিত করেছেন। তবে এই সঙ্কট অভিনব নয়, পূর্বে আরো অন্তত দুইবার গণতন্ত্র সঙ্কটে পড়েছিল বলে মনে করা হয়। যদিও একেকসময় একেক কারণ ছিল। তাহলে এবারের কারণ কী? কেউ কেউ বলেছেন, চীনের উত্থান, নতুন গণতন্ত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভাব ও পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকট। কেউ কেউ একে গণতন্ত্রের ‘আত্মবিশ্বাসের ফাঁদ’ বলে মনে করেন। মানে, প্রতিবার সঙ্কটের মুখে প্রয়োজনমাফিক পরিবর্তন ঘটিয়ে গণতন্ত্র সঙ্কট সামাল দেয়, আবারো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে, আত্মবিশ্বাস থেকে আত্মতৃপ্তি, অতঃপর আবার সঙ্কট। তবে, দুটো কারণ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এক, নিওলিবারেল দুনিয়ায় সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য। যারা গণতন্ত্রের পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন বা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু উল্টো বঞ্চনার শিকার হয়েছেন তারা এটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। দুই, পরিচয়বাদী রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত। এটাও বৈষম্যবোধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মনে রাখা উচিৎ আলী রীয়াজ যখন গণতন্ত্রের শত্রু চিহ্নিত করেন তখন কিন্তু প্রধান হিসাবে রাখেন পপুলিস্ট বা জনবাদী বা জনতুষ্টিবাদীদের। উপরোক্ত দুই কারণ আবার জনবাদী রাজনীতির উত্থানের সাথেও সম্পৃক্ত। তবে এই দুই কারণকে আলী রীয়াজ পুরোপুরি সার্বজনীন বলে মানেন না। এগুলো যতটা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক ততটা এশিয়া বা আফ্রিকার অভিজ্ঞতা ভিত্তিক নয়। এসব এশিয়া-আফ্রিকাতেও খুঁজে পাওয়া যাবে, কিন্তু তার অভিজ্ঞতায় বহু স্থানিক বা অভ্যন্তরীণ উপাদান রয়েছে। তিনি সেগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে বলেন।

আলী রীয়াজ যাকে ‘গণতন্ত্রের উল্টো যাত্রা’ বলেন, তা থেকেই পরবর্তী প্রশ্ন আসে ‘গণতন্ত্র কীভাবে মৃত্যুবরণ করে?’। গণতন্ত্রের কোন প্রতিষ্ঠানগুলো এই সঙ্কটে সবচেয়ে আক্রান্ত হচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর ছিল ‘নির্বাচন’। এরপর একটু উল্টো করে প্রশ্ন করা হয়েছে কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতন্ত্রের মৃত্যু হচ্ছে। সেই একই উত্তর: নির্বাচন। আজ আর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপ্রধানকে বন্দি বা নিহত করে গণতন্ত্রকে সচরাচর কবর দেয়া হয় না। বরঞ্চ গণতন্ত্রের মৃত্যুপথযাত্রা শুরু হয় ‘ব্যলটবাক্সে’। ষাট-সত্তরের দশকের তুলনায় বর্তমানে সামরিক ক্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে। এই ক্ষেত্রে আলী রীয়াজ মূলত লেভিতস্কি ও জিবলাটের মডেলটা ব্যবহার করেন। গণতন্ত্রের মৃত্যু প্রক্রিয়া বর্ণণায় তাদের মডেলে তিনটা ধাপ রয়েছে। ১) রেফারিকে হাত করা। মানে রাষ্ট্রের বিচারিক, আইন প্রয়োগকারী, কর ও রেগুলেটরি সংস্থাসমূহকে নিয়ন্ত্রণ করা। উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুগত্য নিশ্চিত করা, ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ করা। ২) প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা। মানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমালোচনাকারী, মিডিয়া, নেতাকর্তীদের ওপর বিভিন্ন ধরণের আক্রমণ করা; মূল উদ্দেশ্য মনোবল ভেঙ্গে দেয়া, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে দেয়া, সমালোচনাকে নিরুৎসাহিত করা, ভয় উৎপাদন করা। ৩) শাসনতান্ত্রিক আইনসমূহ, সংবিধান ও নির্বাচনীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন। অর্থাৎ, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের আইনি বৈধতা প্রদান করা এবং সেটা যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা।

আলী রীয়াজ এই মডেল ব্যবহার করলেও তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর পর্যায়ক্রমের ভিন্নতা রয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৃতীয় ধাপটা প্রথমেই এবং প্রথমটা ধাপটা তৃতীয় স্থানে। অর্থাৎ, শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মৃত্যু পথযাত্রা শুরু হচ্ছে। আলী রীয়াজ কালানুক্রমিকভাবে মডেলকে সাজান। যেমন, ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিলুপ্তি। সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরই শুরু হয় বিরোধীদলীয় নেতাদের নামে, বিশেষত বিএনপির নেতাদের নামে হয়রানিমূলক মামলা। মানে শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ। এমনকি নতুন নতুন আইন বানিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়। এরপর তৃতীয় ধাপ; যেমন ২০১৭ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বাতিলের রায় দেওয়ার পর বিচারপতির অপসারণের ঘটনা।

গণতন্ত্রের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং আজতক পর্যন্ত ‘নিখোঁজ’ পরিস্থিতি জারি থাকা কীভাবে সম্ভব হয়েছে তা উপরোক্ত ধাপ থেকে অনুমান করা যায়। কিন্তু এটা সম্ভব হয়েছে কীভাবে? এই নতুন কর্তৃত্ববাদীরা সাংবিধানিক ধারার যাবতীয় ক্ষমতাকে একব্যক্তির হাতে পুঞ্জিভূত করেন। বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করা হয়েছে। আলী রীয়াজ বলেন, ‘১৯৯১ সালে যখন রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয়, তখন নির্বাহী বিভাগের ভেতরে এবং নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়টি বিবেচিত হয় নি। রাষ্ট্রপতির হাতে যে ধরণের ক্ষমতা ছিল এবং যা সাংবিধানিকভাবে ও ১৫ বছরের চর্চার মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তার সবটাই প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করা হয়’। ফলে ‘সাংবিধানিক একনায়কত্বে’র পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। আরো বহুবিধ পদক্ষেপের ফলে যে ব্যবস্থা তৈরি হয় তাকে বলা হচ্ছে ‘প্রধানমন্ত্রীর শাসন’। অবশ্য বাহাত্তরের সংবিধানই প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাবতীয় ক্ষমতা প্রদান করে একব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামো গড়ে তোলার যাত্রাস শুরু করেছিল। আকবর আলী খান বলেছিলেন, সংবিধানের ৫৫, ৫৮ অনুচ্ছেদের উপস্থিতিতে ‘সাংবিধানিকভাবে মন্ত্রিসভাশাসিত সরকার কার্যত প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারে পরিণত হয়।’ ৭০ অনুচ্ছেদের কথা সবাই জানেন। খান আরো বলেন যে, সংবিধানের কাঠামোর সাথে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই ক্ষমতাকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। তার মতে, ভারত কিংবা পাকিস্তানেও এই ধরণের ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ ঘটেনি। পাশাপাশি দল, সরকার ও রাষ্ট্র সব একাকার হয়ে যায়।

এই ‘নতুন কর্তৃত্ববাদীরা’ পূর্বতন সামরিক স্বৈরশাসকদের মতো কেবল দমনপীড়নে বিশ্বাস করেন না। তারাও দমন-পীড়ন করেন, কিন্তু শারীরিক দমনের চাইতে তারা মগজে ভয় উৎপাদন-পুনরুৎপাদন বেশি করে থাকেন। তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে পঙ্গু করে ফেলেন। আগের সামরিক সরকাররা যেখানে সংবাদমাধ্যমকেই বন্ধ করে দিতেন, কেবল নিজেদের পছন্দমত কিছু চালু রাখতেন, সেখানে বর্তমানের ‘নতুন কর্তৃত্ববাদীরা’ উল্টো। তারা আরও বেশি মিডিয়া গড়ে তুলেন। আরো বেশি করে লাইসেন্স দেন। ফলে পত্রিকা-টিভি চ্যানেলের সংখ্যার বৃদ্ধি বা হ্রাস দিয়ে এটা মাপা যাবে না। বরঞ্চ সবাই মিলে একই সুরে গান গাইতে বাধ্য হন। বিভিন্ন ধরণের আইন বানানো হয়। সন্ত্রাসবিরোধী, গুজববিরোধী, মানহানি, সাইবারস্পেসে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অনুভূতির হেফাজত ইত্যাদি নাম দিয়ে। মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশে কেবল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কথা মাথায় রাখলেই এই পুরো  আলাপটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটা কেবল শাস্তির হুমকিই তৈরি করে না, বরঞ্চ একধরণের সেলফ-সেন্সরশিপ তৈরি করে। ফলে আপনি নিজেই বাধ্য হবেন উচিৎ কথা না বলতে। সাথে যদি যুক্ত করা হয় গুম, ক্রসফায়ার নামক শব্দ- তাহলে একেবারে নিখুঁত ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয়ে যায়। মনে রাখা দরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যাদেরকেই গ্রেফতার করা হয়েছে তার অধিকাংশকেই রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রথমে গুম করে কিছুক্ষণ, দিন বা মাসের জন্য উধাও করে দিয়েছিল। শাদা পোশাকে তুলে না নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও রাষ্ট্রীয় বাহিনী কদাচিৎ মেনেছে। আবার বাহিনীকে কখনো কখনো গুমের পক্ষে উকালতি করতে দেখা গিয়েছে। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়ে যাওয়ার এর সবচাইতে বড়ো আলামত পাওয়া যায় বইয়ের নবম অধ্যায়ে। তিনি দেখাচ্ছেন বিগত কয়েকবছরে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর উত্তরে নিশ্চুপ থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কোনো প্রশ্নের উত্তরে ‘আমি জানি না’ বলার সংখ্যা ২০১৪ এর তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। নির্বাচনে কাকে ভোট দিবেন, স্রেফ এই নিরীহ প্রশ্নের উত্তরেও ‘আমি জানি না’ বলা বেড়েছে। অর্থাৎ, নাগরিকেরা এক অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি অনুভব করেন এবং যা তার মধ্যে একধরণের নীরবতা তৈরি করে, বিরাজমান পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য করে। ‘কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র এই নীরবতা ও ভয়ের ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকে।’

এই নতুন কর্তৃত্ববাদীদের কাছে ইতিহাসকে দখল করার চিন্তা। এটা ভারতের বিজেপির মধ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশেও দেখা যায়। আইন দিয়ে ইতিহাসকে রক্ষা করতে চায়। এটা দরকার হয় এই কর্তৃত্ববাদের পক্ষে মতাদর্শ তৈরিতে। দল-সরকার-রাষ্ট্র একাকার হয়ে যাওয়াতে দলের সমালোচনা, সরকারের সমালোচনা ও রাষ্ট্রের সমালোচনাও একাকার হয়ে যায়। সমালোচকের ‘দেশপ্রেম’ হুমকির মধ্যে পড়ে। আওয়ামী রেজিমে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ সবচেয়ে বড়ো মতাদর্শিক হাতিয়ার। এটা ব্যবহার করেই বর্তমানে যাবতীয় অপকর্মকে জায়জে করার চেষ্টা চালানো হয়, দেশের মধ্যে নানান ফেরকা তৈরি করা হয়। ফলে রাজনৈতিক মতভিন্নতাকে এখানে বিদ্বেষে রূপান্তরিত করা হয়। এগুলোকে অস্তিত্বের বিষয়ে পরিণত করা হয়। যেন একটা গোষ্ঠীর টিকে থাকা আরেক গোষ্ঠীর ধ্বংসসাধন ছাড়া সম্ভব না। আলী রীয়াজ লক্ষ্য করছেন, বাংলাদেশে ‘একইভাবে একটি কৃত্রিম আমরা বনাম তারা মানসিকতা ও বয়ানকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে বিগত কয়েক দশকে’। আবার আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা গণতন্ত্রকে উন্নয়নের বিপরীতে বসিয়ে এই শ্লোগানও দিয়ে থাকেন যে, গণতন্ত্রের আগে উন্নয়নের দরকার। তারা এই অঞ্চলের মানুষের জন্য গণতন্ত্রকে উপযুক্ত বলে মনে করেন না, তারা ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের’ ধারণার আমদানি করেন। যদিওবা বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তারাও ছিলেন গণতন্ত্রের সিপাহী।

আলী রীয়াজ গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিকাশমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবস্থান আলোচনা করেছেন। যদিও ধারণা করা হতো যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটলে গণতন্ত্র শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করে। কিন্তু আলী রীয়াজ লক্ষ্য করছেন, বাংলাদেশে নব্বইর পর মধ্যবিত্তের আয়তন বৃদ্ধি পেলেও একইসাথে গণতন্ত্রের ক্ষয় হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা উপরোক্ত তাত্ত্বিক অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। বিভিন্ন গবেষককে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এক ‘নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি’র আবির্ভাব ঘটেছে যাদের কাছে গণতন্ত্রের উদারনৈতিক দিকগুলোর আবেদন কম। তিনি সেলিম জাহান প্রস্তাবিত ‘সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ ও ‘অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ নামক দুটো বর্গের দিকে আমাদের মনোযোগ দাবি করেন। বর্তমানের এই অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি ‘অর্থের দ্বারা চালিত এবং ব্যবসা ও ভোক্তাবাদ তাদের মননের অংশ’।

তবে গণতন্ত্রের ক্ষয় বা ‘পশ্চাৎ-যাত্রা’য় আলী রীয়াজ ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তন’কে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। ‘ক্ষমতাকাঠামোর বিন্যাসে পরিবর্তন কেবল অর্থনীতির পরিবর্তনের কারণেই ঘটে না, ঘটে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কারণেও।’ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হচ্ছে ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমূহের এমন এক সমন্বয়, যা পরস্পরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অর্থাৎ, ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সংগঠিত করা হবে তা নিয়ে এলিটদের মধ্যে এক ধরণের সাধারণ  বোঝাপড়া। এতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোও রয়েছে। এটা কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নয়, কুশীলবদের অনানুষ্ঠানিক আচরণও। এতে রয়েছে তিনটা গোষ্ঠী: কর্তৃত্বশালী জোট, প্রতিদ্বন্দ্বী জোট এবং ক্ষমতাবহির্ভূত জোট। এই বন্দোবস্ত বজায় রাখা হয় তিনটা উপায়ে: বল প্রয়োগ, কো-অপটেশন ও বৈধতা নির্মাণের মাধ্যমে। মানে কর্তৃত্বশালী জোট এই তিন উপায়ে বাকি গোষ্ঠীর সাথে তার বন্দোবস্তকে বজায় রাখবে। এটা তৈরি করা ও টিকে থাকার অপরিহার্য শর্ত হচ্ছে রাষ্ট্রে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও বৈধতা।  আলী রীয়াজ ১৯৭২ থেকে এই সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ৭২-৭৫, ৭৫-৮২, ৮২- ৯০, ৯০-২০০৬, ০৭-০৮, ০৯-১৩, ১৪-২০ এই কালপর্বে ভাগ করেছেন। শেষ পর্বের নাম দিয়েছেন ‘একচেটিয়া কর্তৃত্বপরায়ন বন্দোবস্ত। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত একধরণের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয়েছিল, ফলে তার মতে, কিছুটা হলেও গণতান্ত্রিক চেহারা অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু ২০১১ এর পর থেকে যে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আবির্ভাব ঘটেছে তাতে অন্তর্ভূক্তিমুলতার অভাব প্রকট হয়েছে এবং ‘শুধু কর্তৃত্বশালী জোটের মধ্যেই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলেও’ বলপ্রয়োগকারী হাতিয়ারগুলোর ভূমিকা বেড়ে গিয়েছে।

এতক্ষণ অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টরগুলো আলোচনা করলেও দ্বাদশ অধ্যায়ে আলী রীয়াজ তুলনামূলকভাবে অনালোচিত (আবার আলোচিতও) দিকে আলো ফেলেছেন। গণতন্ত্রের ‘পশ্চাৎ-যাত্রা’র অনুঘটক হিসাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং ভারতের সাথে বিদ্যমান রেজিমের সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন। এটা একইসাথে আলোচিত ও অনালোচিত বলার কারণ এই যে, বাংলাদেশে মাঠের রাজনীতিতে ভারত ইস্যু সবসময়ই হাজির থাকে, বরঞ্চ এখানে ভারত ইস্যুকে ‘পপুলিস্ট’ ইস্যু হিসাবেও দেখা হয়ে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র থাকা বা না থাকার সাথে ভারতের ভূমিকা নিয়ে পদ্ধতিগত আলাপ সে অর্থে অনুপস্থিত। আলী রীয়াজের এই অধ্যায়ের গুরুত্ব এখানে। তিনি শুরুতেই বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও প্রভাব ২০০৮ সালের পরে যেভাবে অনুভূত হয়, তা আগে কখনোই হয় নি’। তিনি গত দশ-বারো বছরের ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করেন। বহু বৈষম্যমূলক চুক্তি সম্পাদিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে নি। বরঞ্চ ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও রাষ্ট্র আপত্তি তুললেও ভারত একে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বা আওয়ামীলীগের সাথে ভারতের সম্পর্কের সুসম্পর্ক ও প্রভাবের সবচেয়ে জোরালো সমর্থন পাওয়া যায় প্রণব মুখার্জীর আত্মজীবনীতে। একজন বিশ্লেষক তো আরো কড়া মন্তব্য করেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পূর্ব ইউরোপীয় সাবে কমিউনিস্ট দেশগুলোর যে সম্পর্ক ছিল ভারতের সাথে ঢাকার সম্পর্ক যেমন তেমনই।

অর্থাৎ, বিশেষ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ‘পশ্চাৎ-যাত্রায়’ আলী রীয়াজ তিনটা নির্দিষ্ট দিকে আলো ফেলেছেন। এক, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান; দুই, রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পরিবর্তন; এবং তিন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ভূমিকা।

 

তাহলে বাংলাদেশে কী ধরণের শাসনব্যবস্থা হাজির রয়েছে? এটার উত্তরে আলী রীয়াজ জানাচ্ছেন ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা দো-আশলা শাসনব্যবস্থা। এটা যেমন স্বৈরতন্ত্রের কোনো উপধারা নয়, তেমনি গণতন্ত্রেরও কোনো উপধারা নয়। বরঞ্চ এটাই স্বতন্ত্র একটা ধারা। এখানে নির্বাচনে অনিয়ম একটি সাধারণ বিষয়। নির্বাচন কখনো অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পারে না। ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের চেয়ে মারাত্মক দুর্বলতা দেখা দেয় এর রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সরকারের কাজকর্মে ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে। দুর্নীতি সাধারণ নীতিতে পরিণত হয়। সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ ও হয়রানি বাড়তে থাকে। বিচার বিভাগ থাকে পরাধীন। এটা হচ্ছে হাইব্রিড রেজিমের সাধারণ অবস্থা। নব্বইয়ের পর যখন দেখা গেলো গণতন্ত্রের পথে অগ্রসরমান দেশগুলো অবস্থাকে গণতান্ত্রিকও বলা যাচ্ছে না, আবার প্রথাগত অর্থে স্বৈরতান্ত্রিকও বলা যাচ্ছে না। আবার ধীরে ধীরে যে গণতন্ত্রের পথে যাবে তারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তখন একে ‘অনুদার গণতন্ত্র’ থেকে শুরু করে ‘মেকি গণতন্ত্র’ পর্যন্ত অনেক কিছুই বলা হয়। আলী রীয়াজ এখানে ল্যারি ডায়মন্ড কর্তৃক ব্যবহৃত ‘দো-আশলা শাসনব্যবস্থা’কেই এখানে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হাইব্রিড রেজিম এভাবেই বিরাজনীতিকরণের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়’। তিনি একে ‘নতুন কর্তৃত্ববাদ’ বলেন, যার অনিবার্য উপাদান হচ্ছে নির্বাচন। ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদও এর অন্তর্গত বিষয়। আবার নির্বাচনকে কেন্দ্রে রাখাতে একে ‘আধিপত্যশীল নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ’ বা হেজেমনিক ইলেকটোরাল অথরিটানিয়াজম বলছেন। তবে, দো-আশলা শাসনব্যবস্থা থেকে কঠোর কর্তৃত্ববাদের দিকে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে কি না এই প্রশ্ন আলী রীয়াজ এখনো রেখে দিয়েছেন। যদিও বলেছেন, ‘ক্ষমতার ক্রমাগত এককেন্দ্রীকরণ এবং ক্ষমতাকাঠামোতে রাষ্ট্রের নিপীড়ক শক্তিগুলোর আধিপত্যই একটি দেশকে কর্তৃত্ববাদের দিকে অগ্রসর করে দেয়’। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। তা যে কোনো ইস্যুতে ‘প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা’, বা ‘প্রধানমন্ত্রীর একান্ত নির্দেশে এটা/ওটা হচ্ছে’ ধরণের আলাপচারিতা থেকে স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়। তবে হাইব্রিড রেজিমেও অন্তত গণতন্ত্রের একটা মুখোশ থাকে, কিন্তু বিগত কয়েক বছরে জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত নির্বাচনব্যবস্থাকে তিরোহিত করার মাধ্যমে; ক্রসফায়ার-ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-গুমকে দমন-পীড়নের দৈনন্দিন হাতিয়ারে পরিণত করার মাধ্যমে, মত-প্রকাশের অধিকারকে ভয়ংকরভাবে খর্ব করার মাধ্যমে যে একব্যক্তির করতলগত একচেটিয়া শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে-তাকে অনেকেই সোজাসাপ্টাভাবে ‘মাফিয়াতন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।

তবে, আওয়ামীবলয় থেকে যেটা বারেবারে উচ্চারিত হয় তা হচ্ছে, ‘বিকল্প’ কী? মানে, আওয়ামীলীগ যে ক্ষমতাচ্যুত হবে, তারপর বিকল্প কী হবে? আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মহল একে এতই ‘সার্বজনীন’ প্রশ্ন বানিয়ে ফেলেছেন যে, যে/যারা কদাচিৎ আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন তারাও দিনশেষে আফসোস করেন, আহারে, কোনো বিকল্প নেই। মানে, বিকল্প না আসা পর্যন্ত এই রেজিমই থাকবে- এমনই মনোভাব। এই যুক্তিতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ‘বিকল্প নাই’ বলার মাধ্যমে আদতে বর্তমান শাসনের ব্যর্থতাকে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যর্থতা ও নির্যাতন আছে এটা বর্তমান শাসনের পক্ষে যুক্তি দেয়া লোকেরাও মানতে বাধ্য হন। স্রেফ ‘বিকল্প নেই’ বলেই যেন এসব নজিরবিহীন অত্যাচার, নিপীড়ন মেনে নিতে হবে। উল্লেখ করা জরুরি যে, বিভিন্ন সময়ের স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিস্টদের মধ্যে একই মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এটা দিয়ে আবার আওয়ামী রেজিমের বৈধতাও উৎপাদন করা হয়। যেহেতু বিকল্প অনুপস্থিত সেহেতু যা আছে তা-ই যুতসই। আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা বরঞ্চ একধরণের ‘বিকল্পে’র ভয় দেখিয়ে থাকেন। তারা আদতে যা করেন তা হচ্ছে, আওয়ামীলীগ যে যাবতীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধুলিস্যাৎ করে দিচ্ছে বা দিয়েছে সেই বাস্তবতাকে আড়াল করেন। ‘বিকল্পে’র প্রশ্নে আলী রীয়াজের মন্তব্য হচ্ছে এই ধারণা অন্তঃসারশূন্য। কারণ, লম্বা হলেও, উদ্ধৃত করছি:

‘… গণতন্ত্রের জন্য আলাদা কোনো বিকল্প শক্তির আবির্ভাব ঘটে না, প্রতিদিনের গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই আরও ভালো গণতন্ত্রের শক্তি তৈরি হতে পারে। অগণতান্ত্রিক শাসক যে কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক বিকল্পের সম্ভাবনাকেই দুর্বল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিরোহিত করে। প্রলম্বিত কর্তৃত্ববাদী শাসনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতান্ত্রিক শক্তিই। উদার গণতন্ত্র, এমনকি নির্বাচনী গণতন্ত্রের একটি দিক এই যে গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে যাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ, তারাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ করতে পারে। কিন্তু যেখানে অগণতান্ত্রিক শাসন বিরাজমান, সেখানে গণতান্ত্রিক শক্তি বা যারা গণতন্ত্রের আন্দোলনে ও চর্চায় ভূমিকা রাখতে পারেন তারাই আগে অধিকারবঞ্চিত হন, ফলে ‘বিকল্প’ হিসেবে এমন শক্তির বিকাশের সম্ভাবনাই বেশি, যারা গণতন্ত্রের ওপরে ভিত্তি করে বিকশিত হচ্ছে না; শুধু তাই নয়, তারা আদর্শিকভাবে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি নন’।     

 

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সংবিধানে মূলনীতি হিসাবে ‘গণতন্ত্র’কে গ্রহণ করা হলেও এই গণতন্ত্র হয়েছিল একটা ‘ঘটনাস্বরূপ’; অর্থাৎ পাঁচ বছর পরপর আমি ভোট দিতে পারবো সেই ব্যবস্থা। গণতন্ত্রের এই প্রাথমিক বা সাধারণ বিষয়টাও যে পথচলার শুরুতেই কলুষিত হয়েছে, তা আনিসুজ্জামানের উদ্ধৃতির কথা মনে রাখলেই চলবে। বাকশাল, পরবর্তীতে জিয়ার আমল, এরশাদের আমল সবকিছুর পর মনে হলো নব্বই থেকেই বুঝি গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। সেই গণতন্ত্রও কেবল ‘পাঁচ বছর পর পর ভোট দেয়া’র অধিকারের মধ্যে সীমিত থাকলেও তবু এর উপস্থিতি ছিল। এখানে যে গণতন্ত্রের কথা বলছি সেটা সর্বক্ষেত্রে চর্চার বিষয় হিসাবে না, বরঞ্চ কেবল পাঁচবছর পর পর ‘উদযাপন’মূলক গণতন্ত্রের কথা বলছি। এই পাঁচবছর পরপর ‘ভোটদান’ও গুরুত্বপূর্ণ। খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দার্শনিক হানা আরেন্ট বলেছিলেন, নাগরিকত্ব মূলত অধিকার অর্জনের অধিকার (right to have rights)। কিন্তু নাগরিকত্বের চিহ্ন কী? কিসে আম-জনতা’র নাগরিকত্ব মূর্ত হয়ে ওঠে? ভোটাধিকার! ভোটাধিকারের মাধ্যমে ‘নাগরিক’ রাষ্ট্র-পরিচালনায় পরোক্ষভাবে হলেও অংশ নিয়ে থাকে। এ ব্যবস্থার যে অনেক ত্রুটি ও সীমাবদ্ধ আছে তাতে কোন সন্দেহ নাই, কিন্তু আধুনিক লিবারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্নিহিত গণতন্ত্রায়নের এ হচ্ছে ন্যূনতম স্মারক। সুতরাং ভোটাধিকারকে নাগরিকত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবেই বিবেচনা করছি। সেক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় একটু আমলে নেই। এক, এখন তো গণতন্ত্র ‘আনুষ্ঠানিকভাবে’ নিখোঁজ, কিন্তু যখন পাঁচ-বছর-নির্বাচনের অজুহাতে এর উপস্থিতি ছিল, যখন আমরা প্রতিনিধি নির্বাচন করেও ছিলাম, তখনও ব্যবস্থাটি ছিল ‘উইনার্স টেক অল’ ব্যবস্থা। নব্বই পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বিজয়ী ও পরাজিত দলের প্রাপ্ত ভোট ও আসনের তারতম্যকে বিবেচনায় নিলে এটা পরিষ্কার হবে। যিনি আসন বেশি পেয়ে জিতে যাচ্ছেন, তিনি সব কিছু নিয়ে নিচ্ছেন, বাকি ভোটগুলোর [বা বলা যায় মতামতের] আর কোনো মূল্যই থাকে না। এমনকি তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ৫০ ভাগ না হলেও। দুই, এই প্রক্রিয়াতে যারা সংসদে গেলেন, তারা কি সেখানে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারেন? আলী রীয়াজও উল্লেখ করছেন, সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে সংসদে আসলে স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়ে আছে, গণতন্ত্রের কোনো স্থানই সেখানে নেই। এটা মূলত পুরো সংসদকে একব্যক্তির শাসনাধীন করেছে। তিন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নির্বাচিত সরকারের অধীনে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবগুলোতেই বিরাজমান দলই পুনরায় নির্বাচিত হয়েছে, আবার অ-নির্বাচিত/অন্তর্বর্তীকালীন সরকার/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অন্য বিরোধী দল বিজয়ী হয়েছে। এটা আসলে বিদ্যমান ব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ অবস্থার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই তিনটা বিষয়ে আমলে নিলে এই প্রশ্ন জাগাটা খুব স্বাভাবিক যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা হিসাবে বাংলাদেশে কী গণতন্ত্র ‘নিখোঁজ’ হয়েছে, নাকি এটা কোনো কালেই ছিল না? বা আদৌ কী গণতন্ত্র ছিল? আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো কী গণতান্ত্রিক ছিল? যদিও বিভিন্ন আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মুহূর্তে এর একপলক দেখা মিলেছে, জনগণ আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোতে এটা বেশিদিন টিকে নি। এটাও মনে রাখা জরুরি, গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের জনগণ টানা দুইবার সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন এখনো দিতে পারেনি।

অন্যদিকে, পূর্বেই বলা হয়েছে, আলী রীয়াজ বাংলাদেশে বিদ্যমান গণতন্ত্রহীনতাকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করছেন, অর্থাৎ গণতন্ত্রের যে বৈশ্বিক সঙ্কট সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিদ্যমান সঙ্কটকে মিলিয়ে দেখেছেন। কিন্তু তিনি এই সতর্কবাণীও দিয়েছেন, স্থানিক এই সঙ্কটের পূর্বশর্ত হিসাবে বৈশ্বিক সঙ্কটকে বিবেচনা করা যাবে না, বা বৈশ্বিক সঙ্কট দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্কটকে বৈধতা দেয়া যাবে না। এটা যে কারো নজরেই পড়বে যে, বর্তমানে বিভিন্ন রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, গণতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করে না এমন দলগুলোর নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে ফ্যাসিবাদী ও পরিচয়বাদী রাজনীতির দাপট- এই বিষয়গুলোকে গ্রন্থে ‘গণতন্ত্রের সঙ্কট’ হিসাবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে। অর্থাৎ, গণতন্ত্র একটা ভালো শাসনব্যবস্থা অথবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও এটা বা এর কার্যকারিতা সঙ্কটে পড়েছে। আবার একই সময়ে এও দেখা যাচ্ছে, সারা দুনিয়াতে ‘গণতন্ত্রে’র জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠছে। আমাদের পাশের দেশে মিয়ানমারে স্মরণকালের বৃহৎ আন্দোলন চলছে। আবার ২০১৮-২০ সালে চিলি থেকে শুরু করে হংকং পৃথিবীর বহু দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি মানুষের দুর্বার আকাঙ্ক্ষা খুবই স্পষ্ট। লেখকও তা বলেছেন। আন্দোলনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রশ্নেও গণতান্ত্রিক চর্চাও বাড়ছে বলেই প্রতীয়মান হয়, অন্তত দেশে-বিদেশের সাম্প্রতিক আন্দোলন তা-ই জানান দিচ্ছে। এই দিকে জোরারোপ করে নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেইবার বোধহয় বলেন, এটা গণতন্ত্রের সঙ্কট নয়, বরঞ্চ আধুনিক রাষ্ট্রেরই সঙ্কট। যদিও গ্রেইবারের কাছে গণতন্ত্রে সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার দিকটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নির্বাচন’ প্রশ্নটা এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক বা বেসামরিক স্বৈরাচার- উভয়কেই নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছে। তিনি যে গণতান্ত্রিক এটা প্রমাণ করতে তাদেরকে বেশ কসরত করতে হয়েছে। আইয়ূবকেও নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছে। জিয়াকেও করতে হয়েছে, এরশাদকেও করতে হয়েছে। সে নির্বাচন-ব্যবস্থা এমন ছিল যে, তারা জয়ীও হয়েছিলেন। নির্বাচন আয়োজন আদতে নির্বাচন-ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচন থাকলেই গণতন্ত্র হয়ে যাবে তা না, বরঞ্চ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র নিশ্চিত হচ্ছে, তেমন একটা নির্বাচনী-ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। আলী রীয়াজ বারেবারে বলছেন, বর্তমানে যে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বাড়বাড়ন্ত চলছে সেখানে নির্বাচনই প্রবেশদ্বার হিসাবে ভূমিকা পালন করছে। জমানাও পাল্টেছে। সামরিক ক্যু এর চাইতে ব্যালট বাক্সের দিকে আগ্রহ বেশি। এমনকি যে দল/গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক কোনো চেতনা ধারণ করেন না, বা করতে চান না তারাও নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আরোহণ করতে চান। বর্তমানে পপুলিস্ট রাজনীতিতে এটা স্পষ্ট। অর্জুন আপ্পুদারাইও বলছিলেন, আগে রাজনৈতিক দেনদরবারের ক্ষেত্রে নির্বাচন ছিল একটা এক্সিট; আজকের দিনেও এটা একটা ‘এক্সিট’, তবে সেটা গণতন্ত্রকেই বিদায় জানানো অর্থে ‘এক্সিট’। অর্থাৎ ডানপন্থী শাসক ও তাদের অনুসারীদের অবলম্বন হচ্ছে ‘নির্বাচন’। এমনকি যে বা যারা ক্ষমতায় গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে তিলে তিলে ধ্বংস করেছেন তারাও বিরোধীপক্ষ থাকা অবস্থায় গণতন্ত্রের বাণী জপেছেন। ক্ষমতাসীন পক্ষও নিজেদের জুলুমকে বৈধতা দিতে নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে বা নির্বাচনের মাধ্যমে জিতে আসাটাকে বারেবারে আলোকপাত করেছে। অর্থাৎ, সহজ কথা হচ্ছে নির্বাচন নিয়ে আমাদের জরুরি আলাপ তোলা উচিৎ। বাংলাদেশে বিদ্যমান নির্বাচন ব্যবস্থা যে ত্রুটিপূর্ণ তা বিদ্যমান কর্তৃত্ববাদী (আলী রীয়াজের ভাষায় হাইব্রিড রেজিম) শাসনের উত্থানই প্রমাণ করছে। নির্বাচন নিয়ে আকবর আলী খানের দুটো মতামতকে একটু আমলে নেই। তার মতে, প্রথমত এখানে নির্বাচন শাসকদলের পাতানো খেলায় পর্যবসিত হয়। সেটা কীভাবে তা আমরা আলী রীয়াজের বিশ্লেষণ থেকে বিস্তর ব্যাখ্যা পেয়েছি। দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত নয় এমন সরকার কর্তৃক রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়। আনুপাতিক ভিত্তিতে নির্বাচন না হওয়ার ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভোটে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশগ্রহণ হয় না। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটের হার ও আসনসংখ্যার অনুপাত খেয়াল করলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। ফলে তার মতে, ‘এ ধরণের নির্বাচনে আসনসংখ্যায় জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটে না’। পূর্বেই বলেছি, এটা আসলে একধরণের উইনার টেক অল ব্যবস্থা। সুতরাং আকবর আলী খানসহ অনেকেই আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্বের কথা বলেন। অর্থাৎ যে যত শতাংশ ভোট পাবেন তিনি তত শতাংশ আসন পাবেন। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান যে, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে আনুপাতিক হারে নির্বাচন কাজ করছে, এবং সংখ্যাগুরু ফর্মুলা বাদ দিয়ে অনেক দেশই এখন আনুপাতিক হারের দিকে ঝুঁকছে।’ গবেষক আলতাফ পারভেজ একইভাবে আনুপাতিক নির্বাচনের পক্ষে কথা বলেছেন। তার মতে, এতে নির্বাচনে সবার ‘বিজয়’ সম্ভব। অর্থাৎ, আমরা যখন গণতন্ত্রহীন অবস্থায় বসবাস করছি, এবং গনতন্ত্রের দিকে যাওয়ার জন্য লড়াই করছি তখন নির্বাচন নিয়েও জোর আলাপ তুলতে হবে। এই গণতন্ত্রহীন অবস্থাতেও কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে নাগরিকগণ ভোট দিতে পারুক আর না-ই পারুক। কিন্তু আমরা যখন গণতন্ত্রের জন্য কথা বলছি, যে গণতন্ত্রে যাওয়ার কথা বলছি সেখানে নির্বাচন কেমন হবে, বা কেমন হওয়া দরকার, কোন নির্বাচন ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে মজবুত করবে সেটা নিয়েও জোরদার আলাপ তোলা উচিৎ। কেবল নির্বাচনের খাতিরে নির্বাচন আদতে আর ফায়দা দিবে না। কারণ নতুন কর্তৃত্ববাদী ও পপুলিস্টদের কাছেও ‘নির্বাচন’ একটা যুতসই মাধ্যম। ফলে, নির্বাচন ব্যবস্থার রূপ ও কাঠামো নিয়ে আলোচনা তোলা জরুরি।

 

উপসংহারে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের কিছু পথ লেখক বাতলে দিয়েছেন। তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন নাগরিকদের সক্রিয়তার ওপর। ‘নাগরিকদের সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তাই হচ্ছে পথরেখা নির্ধারণের মূল চালিকা’। তিনি অহিংস আন্দোলনের কথাও বলেন। এরিখ চেনোওয়েথের বরাত দিয়ে  অহিংস আন্দোলনের জরুরতের দিকে হালকা ইঙ্গিত দেন। এরিখ দেখান যে, সহিংস আন্দোলনের চাইতে অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের হার বেশি। আবার জনগণের অংশগ্রহণও এতে বেশি হয়। যদিও বর্তমানে অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের হার কিছুটা কমেছে, তবু সঙ্কটগুলোকে মোকাবিলা করার বিষয়েও তিনি আশাবাদী। তিনি মনে করেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি যেমন সামাজিক মিডিয়া, রাষ্ট্রীয় নজরদারি ইত্যাদিকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে আন্দোলনে নামা উচিৎ। প্রকৃতপক্ষে, গণ-অনানুগত্য তথা সিভিল ডিজঅবিডিয়েন্সই বর্তমান জমানার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম কার্যকর নীতি ও কৌশল। নীতির দিক থেকে গণ-অনানুগত্য অহিংস, তবে কৌশল বিচারে তা কখনও কখনও সহিংস হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত স্বৈরাচারী শাসকের দমন-পীড়নের প্রতিক্রিয়ায়। বার্মায় চলমান জান্তাবিরোধী আন্দোলন এর নিকটতম নজির।

তবে এই কর্তৃত্ববাদী অবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য যে আন্দোলন তাতে দুটো বিষয় আমাদেরকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এক, আমাদেরকে কেবল বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী সরকারকে হটিয়ে দিলেই হবে না, কেননা আমরা দেখেছি, ‘এরশাদ তুই কবে যাবি’ শ্লোগানে এরশাদকে বিদায় করলেও কর্তৃত্ববাদী কাঠামো আরো বেশি করে নতুন নতুন এরশাদ তৈরি করেছে। এখন ‘হাসিনা তুই কবে যাবি’ শ্লোগান শুনতে চমকপ্রিয় হলেও এটা মাথায় রাখতে হবে, যে কাঠামোকে ব্যবহার করে ‘হাসিনা’ তৈরি হয়েছেন, যে কাঠামোর মাধ্যমে হাসিনা ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন সেই কাঠামোর পরিবর্তন না হলে কেবল চেহারাতেই পরিবর্তন ঘটবে। ফলে, আজকে যখন আন্দোলন করবো তখন এমনভাবে করতে হবে যেন ভবিষ্যতে এটা ফিরে না আসে। আজকের দুনিয়ার একটা প্রবণতার প্রতি গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক কর্মীদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আজকের যুগ মূলত রাগ/ক্ষোভ/হতাশার প্রদর্শনীর যুগ। বিরোধিতার যুগ। নিজেদের রাগ/ক্ষোভ/হতাশার পাবলিক প্রদর্শনী করার যুগ। কি চাই, কেন চাই, কোথায় আছি, কোথায় যেতে চাই এ সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও বোঝাপড়া তৈরি ছাড়াই কেবলমাত্র বিরোধিতা করে অনেক সংগঠন/গোষ্ঠী/মতবাদ একদিকে যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি বিলীনও হয়ে গেছে। আলাঁ বাদিয়্যুর মতো চিন্তক এ’কে বলছেন, ‘আন্দোলনবাদ’ (movementism); যার ‘ঐক্যের ধরন একেবারে নেতিবাচক’ (হুসেন ২০২০)। বাদিয়্যুর ভাষ্যে: সংক্ষেপে বললে, অস্বীকৃতির মধ্যে দিয়ে একত্রিত হলে তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণের কোন সুনিশ্চিত স্বীকৃতি দিতে পারে না। এমন একত্রিত হওয়াতে কোন সৃজনশীল প্রত্যয়, কোন সক্রিয় ধারণা থাকতে পারে না। সে না পারে নতুন ধরনের রাজনীতি কেমন হবে বা হতে পারে তা ধারণা করতে। এমন ধারণা না থাকলে সেই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে কিছু ঐক্যে। যথা, পুলিশী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে রুখে দাঁড়ানো।

এহেন ‘আন্দোলনবাদ’ সাময়িক উত্তেজনা ও আশা তৈরি করতে পারে সত্য, কিন্তু বিলীন হয়ে যাওয়া তার অমোঘ নিয়তি। কারণ যেসব ক্ষোভ, হতাশা এ ধরনের জমায়েত তৈরি করে, তা যখন পূরণ হয় না কিংবা প্রতিষ্ঠিত সরকার কর্তৃক অনেক দাবি-দাওয়াই মেনে নেয়া হয়, তখন এই ধরনের জমায়েত আর অস্তিত্বশীল থাকার শর্ত হারিয়ে ফেলে। ফলে স্বৈরাচার পরিবর্তন নয়; স্বৈরতন্ত্রের অবসান এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা সক্রিয় থাকবেন, তাদেরকে বাদিয়্যু কথিত “আন্দোলনবাদ” এর ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

জিন শার্প স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যখন পথ বাতলে দেন তখন তিনিও একই উপদেশ দেন। লড়াইটা কেবল স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে নয়, বরঞ্চ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। লড়াইয়ের ধরণটা এমন হতে হবে যেন স্বৈরশাসন আবার ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত হয়। আলী রীয়াজও উল্লেখ করেছেন, এখানে যে ধাপে ধাপে গণতন্ত্রের অবসান হয়েছে তার প্রথম ধাপই ছিল সাংবিধানিক পরিবর্তন, পরিমার্জন। মানে, যে ‘অগণতান্ত্রিক’ কাজ করা হবে তার সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা হাসিল করতে হয়েছে। ফলে এটা পরিষ্কার যে, এখানে গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াইটা হবে সেখানে সংবিধানকে মোকাবিলা না করে উপায় নেই। তাহলে কী কেবল ধারা-উপধারা সংশোধন করে দিলেই হয়ে যাবে, যেমন করে প্রতিবার করা হয়? তাহলে তো আজকে সংশোধন করলে কাল আরেকজন এসে পরিবর্তন করে দিতে পারেন, জনগণের কোনো ম্যাণ্ডেট ছাড়াই। তার মানে এভাবে সংবিধানকে মোকাবিলা করা যাবে না। এই স্বৈরতন্ত্র বা ফ্যাসিবাদের যে অন্তর্নিহিত উপাদানগুলো রয়েছে, তাকে এই লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারীকেই চিহ্নিত করতে হবে। যেন এই স্বৈরতন্ত্র ফিরে না আসে, আবার একইভাবে যেন খেয়ালখুশি মত জনগণের ম্যাণ্ডেট ছাড়াই সংবিধান সংশোধন না করা যায়।

দ্বিতীয় বিষয়টা হচ্ছে, যারা বা যে গোষ্ঠী বা দল গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন তাদের নিজেদের মধ্যকার গণতান্ত্রিক চর্চার দিকে একইভাবে মনোযোগ দিতে হবে। এমন অনেক দলই গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে তৎপর, যারা নিজেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন না, বরঞ্চ নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড একনায়কত্বের চর্চা করে থাকেন। এটা আদতে গণতন্ত্রের জন্য কোনো ভালো বিষয় নয়, যদিও এই দিকটা বারেবারে এখানে উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রের প্রশ্নে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম বহুমুখী হতে বাধ্য।

পরিশেষে এটা বলা জরুরি যে, বাংলাদেশে যারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছেন এবং বিভিন্ন ধরণের এক্টিভিজম চর্চায় নিয়োজিত আছেন তাদের জন্য ‘নিখোঁজ গণতন্ত্র’ জরুরি-পাঠ্য। সঙ্কটকে মোকাবিলা করার জন্য সঙ্কটের উপাদানগুলোকে চিনতে পারতে হবে। এখানেই এই গ্রন্থের আসল জরুরত।

 

দোহাই:

১) আকবর আলী খান, অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, প্রথমা, ২০১৭

২) আবুল মনসুর আহমদ, শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু, আহমদ পাবলিশিং হাউজ

৩) আনিসুজ্জামান, বিপুলা পৃথিবী, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৫

৪) আলতাফ পারভেজ, “নির্বাচনে সবার ‘বিজয়’ সম্ভব”, প্রথম আলো, ২০১৮

৫) Erica Chenoweth, ‘The Future of Nonviolent Resistance’, Journal of Democracy, July 2020

৬) সারোয়ার তুষার, ‘ডানপন্থার বৈশ্বিক উত্থান : অর্জুন আপ্পাদুরাই এর তত্ত্ব তালাশ ও পর্যালোচনা’ শুদ্ধস্বর, ২০২০

৭) পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ‘জনপ্রতিনিধি’, অনুষ্টুপ, কলকাতা, ২০১৩

৮) আলাঁ বাদিয়্যু, বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে, ২০২০; অনুবাদ: জাভেদ হুসেন, বোধিচিত্ত

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top