চোখবন্ধ অন্ধ সময় | শামীম রুনা

0

চৌদ্দ

স্বামী-শ্বশুর সম্পর্কধারী দু’জন মানুষ ওরা,লোক দু’জনকে মণিষা এক বিন্দুও চেনে না, এমন কী ওদের চেহারা কেমন সে সম্পর্কেও ভালো  ধারণা নেই। মাত্র আজ   দুপুরের মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে ওর সব কিছুর মালিকানা এই লোকগুলোর হয়ে গেছে! যদিও নিশুতি রাত নয় তারপরও নিশি রাতের মতোই রাত,স্বামী শ্বশুরে পেছন পেছন জমির আইলের কাঁদা মাটির পথ ধরে অচেনা গন্তব্যের দিকে যেতে গিয়ে এবার সত্যিই মণিষা ভৌতিক একটা ভয় অনুভব করে। মণিষার দখলদার শুধু ওর বর মৃনাল দাস নয় তা সে এর মাঝে ভালো ভাবে বুঝত পেরেছে, বরং শ্বশুর, দাদা-শ্বশুর আর শাশুড়ীর ওর ওপর দখল অনেক বেশি।

তুলসীর দেয়া ভাত-তরকারী খেয়ে নেয়ার পর তুলসীই ওকে কলঘরে মুখ-হাত ধোবার জন্য নিয়ে যায়। সারা দিন জরির শাড়ীতে নাজেহাল মণিষা শাড়ী বদলাতে চাইলে,বাড়ির অন্ধকার কোণ থেকে শাশুড়ী আবার খেকিয়ে ওঠে, আবার হুকুম আসে;চুল আঁচড়ে ঘোমটা টেনে বসে থাকার। শাশুড়ীর কথা শুনে উঠানের ওপর কোণা থেকে শ্লেষ্মা জড়ানো কণ্ঠে দাদা-শ্বশুর জানতে চায়, ও মৃনালের মা, তুমি মাইয়াডারে সব জিগাইছ তো? অশূচি শরীর না তো আবার?

এবার শাশুড়ী অস্পষ্ট কণ্ঠে গজগজিয়ে ওঠে, ঠিক বোঝা যায় না; তারপর উঁচু গলায় তুলসীকে ডাকে। তুলসী মায়ের কাছে চলে গেলে কলের শীতল পানিতে মুখ-হাত ধুয়ে মণিষা অন্ধকারে হাতড়িয়ে মাথার চুল-খোপা পরিপাটি করে নেয়, শাড়ীর কুঁচি আর মাথার ঘোমটা ঠিক করে আবার তুলসী তলায় মোড়াতে এসে বসে। তুলসী তলার কুপির আলো দপ্ দপ্ করে বার কয়েক নেচে ওঠে, দাদা-শ্বশুর অন্ধকারে একবার কেশে নিয়ে শব্দ করে গলা ঝাড়ে; তাকে এখন আর দেখা যাচ্চে না। মণিষার ইচ্ছে করে, এখানে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে যেতে, চোখ দু’টিকে আর কিছুতেই যেন খুলে রাখতে পারছে না,কিন্তু সাহস হয় না।

শাশুড়ী এসে ওর পাশে পিঁড়িতে বসে, একটু সময় বসে যেন বলার মতো কথা খুঁজে। তারপর তুলসী তলা থেকে কুপিটা হাতে নিয়ে মণিষার মুখের কাছে ধরে; নিজের ক্লান্ত আর ধূর্ত চোখ দু’টি বড় করে মণিষার মুখের প্রতিটি ভাঁজ পড়তে চায় সে।মণিষা ভয়ে আর লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলে, আজ  পর্যন্ত ওকে এমনি করে কেউ দেখে নাই। শাশুড়ী কুপিটা তুলসীর বেদীতে রাখতে গিয়ে ফুঁ দিয়ে তা নিভিয়ে ফেলে, মণিষা চোখ মেলে তাকায়; চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা দমকা বাতাস বয়ে যাওয়ার সময় হয়ত কোনো গাছের ডাল বা পাতা হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল তার আওয়াজ, বাড়ির পাশের ঝোপ-ঝাড়ে ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক সব কিছু আচমকা তীব্র হয়ে মণিষার কানে বাজে। সে অনুভব করে, শাশুড়ীর হাতে ওর হাত, বলে;মায়া মাইনষ্যের জন্ম হইলো সেবার জন্য। উৎসর্গের লাইগা। মায়া মানুষ হয়ে জন্মাইলে জীবনে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। বাপের বাড়ি থন শ্বশুর বাড়ি আসতে হয়,শ্বশুর বাড়িরে আপন বানাইতে হয়। আমরাও তাই করছি,বুঝ হওনের আগেই স্বামী-শ্বশুরের ভিটারে নিজের ভিটা ভাবতে শিখছি,কই নিজের বাপের বাড়ি ভুইলাই গেছি।আজ  থাইকা এই বাড়ির সুখ-দুঃখরে নিজের সুখ-দুঃখ জানবি। মৃনাল ছোটকালে একবার  অসুখে মরতে বসছিল,জগন্নাত ঠাকুরের মন্দিরের ঠাকুরের প্রার্থনায় সে সাইরা ওঠে। এরপর বড় হয়াও সে সঙ্গদোষে খারাপ পথে চইলা যাইতে নুইছিল জগন্নাত ঠাকুরের কল্যানে সে খারাপ পথ থাইকা ফিরায়া আসছে। এখন মৃনাল ভালো হয়া গেছে,বাজারে দোকান হইছে, মন দিয়া ব্যবসাপাতি করে। এই সব নিয়ে জগন্নাথ ঠাকুর দেবতার কাছে আমারা বত্ রাখছিলাম, মৃনালের বউরে গৃহ প্রবেশের আগেই,প্রথম রাত্রিরে তাঁর মন্দির দর্শন করায়া আনবো। মৃনালের ভাগ্য তো এখন তোর ভাগ্য,ওর ভালার জন্য তোর জীবন উৎসর্গ করার হইলেও করবি। কি করবি না?

মণিষা স্বামীর জন্য নিজের জীবন আদৌ উৎসর্গ করবে কিনা বুঝতে পারে না তারপরও শাশুড়ীর সন্তুষ্টির জন্য মাথা নাড়ে।

শাশুড়ী গলাটা এবার খাদে নামিয়ে চাপা কণ্ঠে জানতে চায়, গা গতরে তো সেয়ানাই লাগে। তোর মাসিক শুরু হইছে?

হঠাৎ শাশুড়ীর এমন প্রশ্নে মণিষা অস্বস্তিতে পরে। বিয়ের কথা বার্তা পাকা হওয়ার পর ছোট কাকীমা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে ওকে একটি ঝাপসা ধারণা দিয়েছে। শাশুড়ীও কি তেমন কোনো উপদেশ দিবে কিনা তেমনটা ভাবতে ভাবতে পিঠে শাশুড়ীর কঠিন হাতের ধাক্কা অনুভব করে, কী রে ছেমড়ী, উত্তর দেস না ক্যারে?

মণিষা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে শাশুড়ী আবার জানতে চায়, শেষবার কবে হইছিল?

এক সপ্তাহ আগে শেষ হইছে। মণিষার উত্তর শোনার পর শাশুড়ী কিছু সময় অন্ধকারে চুপ করে বসে থাকে। হয়ত নিজের সঙ্গে কিছু বুঝাপড়া করে, তারপর আবার বলতে শুরু করে, একটু পর তোর শ্বশুর আর মৃনাল তোরে নিয়া জগন্নাতের মন্দিরে যাবে, ঠাকুরের আশীর্বাদ নিতে। মৃনালের উপ্রে ঠাকুর, পুরহিতের আশীর্বাদ থাকলে সে জীবনে সুখী হবে, তার কোনো অমঙ্গল হবে না। তুই ভাতে-কাপড়ে ভালা থাকবি।তুই ঠিকঠাক ভাবে ঠাকুররে প্রণাম করিস,পুরহিতরেও। খুব সাবধানে থাকিস,তাদের যেন কোনো অসম্মান না হয় খেয়ালে রাখিস।

এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার যথার্থ দুরাবস্থা, আলোর তেজ জোরালো নয়,এখানকার বাসিন্দারা অন্ধকারেই চলা-ফেরা করে অভ্যস্ত, স্বামী-শ্বশুরের পেছন পেছন অন্ধকার পথ-ঘাট দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে মণিষার তাই ধারণা হয়েছে। মাঝে মধ্যে দূরে দূরে পল্ল বিদ্যুতের দুই একটা আলো দেখা গেলেও হুট করেই তা আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। ওরা মন্দির চত্বরে এসে পৌঁছালে মৃনাল হাতের মোবাইল ফোনের আলো জ্বাললে মণিষা দেখতে পায় মূল মন্দিরের সদর দরজাটি বন্ধ। চত্বরের এক পাশে পরে আছে চাকা ছাড়া বাঁশের একটি ভাঙা রথ। চত্বরের অপর পাশে বসত বাড়ির দুইটি কাঠের বন্ধ দরজা;তার একটির লোহার কড়া যত্নের সঙ্গে মৃনাল নাড়ে। বার কয়েক কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে কারো সাড়া পাওয়া যায়,হারিকেন হাতে একজন মধ্য বয়স্ক লোক দরজা খুলে। খালি গায়ের পৈতা-ধুতি পরা লোকটিকে দেখে ভক্তি ভরে মৃনাল প্রণাম করে, সঙ্গে সঙ্গে মৃনালের বাবাও। ওরা মৃদুস্বরে কথা বলে হাত নেড়ে শ্বশুড় মণিষাকে ডাকলে সে এগিয়ে গেলে মৃনাল চাপা কণ্ঠে বলে, পেন্নাম কর। পেন্নাম কর।

মণিষা প্রনাম করে দাঁড়ালে পুরহিত বলে, তোমরা এইখানে খাড়াও। আমি চাবিটা নিয়া আসি।

পুরহিত চাবি নিয়ে এসে মন্দিরের দরজা খুলে ওদের নিয়ে ভেতরে ঢুকে হারিকেনের আগুন বাড়িয়ে দিলে মণিষার গা কাটা দিয়ে ওঠে। মন্দির খুব বড় নয়, ধূপ-ধুনের গন্ধে ভরা মন্দিরটি কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ড আর আঁধারে ঢাকা।পূজা-পার্বনে মন্দির চত্বরে বার কয়েক জীবনে যাওয়া হলেও কখনও মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করেনি। মন্দিরের জানালা দিয়ে বা পূজা মণ্ডপে দেবতা আর দেবীদের দেখেছে, নানান আকৃতির, নানান রকম সাজ-সজ্জার রঙিণ দেবতারা সারিবদ্ধ হয়ে শক্রু মিত্রতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকে ভক্তদের ভোগ নেয়। কিন্তু কখনও মণিষা এই দেবতাদের কোথাও দেখেনি। কী নাম এই দেবতাদের-অল্প আলোতে গোল আর বড় চোখের চ্যাপটা তিন দেবতার দিকে তাকিয়ে সে ভাবে। কাঠের তৈরী এই দেবতাদের অন্য রকম গঠণ, যেন মেলার টেপা পুতুলের আদলে গড়া! দেবতরা টেপা পুতুলের মতো হলেও তাদেঁর শরীরের  সিঁদুরের লাল আর ধূপের গন্ধে মন্দিরের ভেতরটা কেমন অপার্থিব পরিবেশ তৈরী করেছে। মণিষার ইচ্ছে করে ছুটে মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে যেতে।

ওর পাশে এসে স্বামী মৃনাল দাঁড়ালে দেবতার আসনের সামনে থেকে পূজার ফুলের কিছু পাপড়ী নিয়ে পুরহিত ওদের ওপর ছিটিয়ে দিয়ে বলে, আইজকার রাত ও মন্দিরে থাকুক।

জ্বি আইচ্ছা। শ্বশুড় সায় জানায়।

কাল খুব প্রভাতে পূজার মধ্য দিয়া ওর শুদ্ধি হবে।

মেয়েটা কি মন্দিরে থাকপে?

হ। দেবতার কাছাকাছি থাকলে মনে ভক্তি-শ্রদ্ধা বাড়বে।

আমি এ ঘরে থাকতে পারবো না। সবাই চলে যেতে উদ্যত হলে হড়বড়িয়ে বলে উঠে মণিষা। ওর কথা শুনে স্বামী চোখ রাঙিয়ে হাত পাকিয়েঁ তেড়ে আসতে চাইলে পুরহিত হাত তুলে বাঁধা দিয়ে বলে, অল্প বয়সী মেয়ে ভয় পাইতেই পারে, এতে রাগের কী আছে? ও কি আগে কখনও মন্দিরে ছিল না কি! শোন ছেমড়ী, ডরাইস না। জগন্নাত ঠাকুর দয়ার ঠাকুর, তাঁর গৃহে ভয়ের কিছু নাই। চুপচাপ ঠাকুরের মুখপানে রাতভর তাকায়া থাক, দেকপি; খানিক পর তোর মনের ডর ভয় সব তিনি দূর করায়া দিছেন।ডর ভয়ের বদলে ভক্তি আর শ্রদ্ধাতে মনটা ভইরা উঠছে।

একা একা মন্দিরে রাত কাটানোর ভয়ে মণিষার ভেতরটা কাঁপতে থাকে,কিন্তু একটু আগের স্বামীর ক্রুদ্ধ মূর্তির কথা মাথায় থাকায় মনে হয়,কাঠের দেবতা আর মানুষের তুলনায় কতটাই বা ভয়ঙ্কর হতে পারবে! ওকে ভেতরে রেখে বাহির থেকে তালা লাগিয়ে ওরা চলে গেলে মণিষার খুব কান্না পায়,কাঁদতে গিয়ে বুঝতে পারে জলের বদলে চোখ ভরে আছে ঘুমে।

মন্দিরে শীতল মেঝেতে বসে সে ভয়ে ভয়ে দেবতাদের দিকে তাকালে দেখে, তাঁরাও ওর দিকে ভাবলেশ হিন চোখে তাকিয়ে রয়েছে, সে চোখে কোনো মায়া-ঘৃনা-রাগ-অনুরাগ-ক্রোধ-অনুকম্পা কিছুই নাই, অথচ কিছু সময় আগেও সে দেবতাদের ভয়ে আর  ধূপের গন্ধে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলো। মণিষা তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় দেখে, দেবতাদের গোল গোল চোখগুলো ধীরে ধীরে লাটিমের মতো ঘুরতে থাকে,ক্রমশ ঘুরতে থাকে…মণিষার চোখেও ধীরে ধীরে ঘুমে বন্ধ হয়ে আসে।

বুকের উপর সজোর চাপে মণিষার কাঁচাঘুম ভেঙে যায়। এই আগ্রাসী চাপে ওর কিশোরী শরীর ব্যথায় টনটন করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নারী শরীরের বাড়তি সতর্কতা দরুণ ওর ভেতরে কেউ বলে দেয়, ভয়ঙ্কর অঘটন ঘটতে যাচ্ছে ওর সঙ্গে। ঘুম ভেঙে গেলেও প্রথমে তাকিয়ে সে কিছুই দেখতে পায় না,চোখের ওপর কিছু একটা পরে রয়েছে, ঠিক ঠাহর করতে পারে না সে কী? বুঝে উঠতে পারে না কোথায় সে? আত্মরক্ষার সহজাত প্রকৃতি থেকে দু’হাতে সজোরে বুকে চেপে থাকা বস্তুটা সরাতে চাইলে বুঝতে পারে ওর শরীর কেউ চেপে ধরে আছে, তবে কি দেবতারা? দেবতাদের আসনের দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে দেখে নিবু নিবু হারিকেনের আলোয় তাঁরা গোল চোখ মেলে ড্যাবড্যাবিয়ে ওর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে! মণিষাকে চেপে ধরে রাখা মানুষটা নিজের মুখ ওর বুকে গুঁজে শুয়োরের মতো গোঁত গোঁত শব্দ করছে। মণিষা এবার গায়ের সব শক্তি এক করে বুকের ওপর চেপে থাকা জানোয়ারটাকে ধাক্কা দিলে সে ওর শরীরের উপর থেকে পাশে গড়িয়ে পরে চোখ রাঙিয়ে হিসহিসিয়ে ওঠে,চুপ ছেমড়ী…

পুরহিতের ঘামে আর কামে সিক্ত মুখ দেখে মণিষা ভড়কে যায়, আহ্ ঠাকুর! পুরহিত নিজের দু’হাতের মুষ্ঠিতে মণিষার দু’হাত চেপে ধরে আবার ওর শরীরের উপর ওঠে আসে, চিল্লাস ক্যা? চুপ থাক…

মণিষা কিছু বলতে গিয়ে বলতে পারে না, পুরহিতের মুখের আঠালো লালায় ওর মুখ ভরে যায়, মুখ থেকে তা উগরে দিতে চাইলে হড়হড়িয়ে বমি আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বেরিয়ে আসে, ছিটকে গিয়ে পরে পুরহিতের মুখে; মুহূর্তের জন্য ভটকে গিয়ে পুরহিত মনিষার গায়ের উপর থেকে গড়িয়ে একপাশে নেমে যায়।

ছিনাল ছেমড়ী রঙ্গ করস?

মণিষা শোয়া থেকে উঠে পেট চেপে মেঝে ভাসিয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে।

মন্দিরটারে নোংরা কইরা ছাড়লি দেখি! পাশে বসে হাঁফাত হাঁফাতে পুরহিত বলে। মণিষা পুরহিতের দিকে তাকালে দেখে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে উবু হয়ে মেঝেতে বসে আছে, ধস্তাধস্তি আর উত্তেজনার কারণে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে, চোয়াল বেয়ে লাল গড়িয়ে পরছে। হারিকেনের মরা আলোতেও লোকটির শরীরের বড় বড় লোমগুলো দেখা যায়, চার পায়ের বিকট এক বিষধর জন্তু যেন। বমির ধারা কমে এলে মণিষা চোখ তুলে পুরহিতের চোখের দিকে তাকায়, সে চোখে ওকে গ্রাস করার বুভুক্ষু লিপ্সা। মণিষা সহজাত নারীর বোধ থেকে বুঝতে পারে পুরহিত কী করতে চায়; সে বাঁধা না দিয়ে নীরব থাকলে এরপর কী ঘটবে ওর সঙ্গে। ওর সারা শরীর ঘৃনা,ভয় আর রাগে অবস হতে হতে হঠাৎ সতর্ক হয়ে ওঠে। কিছু দূরে ওর কাপড়ের বাটুয়াটা মেঝেতে পরে রয়েছে অবহেলায়,পূজার আসনের নিচে হলদেটে আলোর হারিকেন জ্বলছে, ওর দিকে তাকিয়ে এক পশু লালসার লালা ঝরাচ্ছে আর কয়জন দেবতা পাপড়ীহিন চোখ মেলে নির্বিকার দৃষ্টিতে সব দেখছে। মণিষার নিজেকে পশুর খাদ্য বানাতে ইচ্ছে করে না, সে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে বাটুয়াটি হাতে তুলে দরজার দিকে দৌঁড়ে গেলে পুরহিত ওকে ধরবার জন্য ছুটে আসে। মণিষা পুরহিত নামক পশুর সে থাবা থেকে বাঁচার তাগিদে দেবতাদের আসনের দিকে এগিয়ে যায় আর  হঠাৎই হাতে তুলে নেয় হারিকেন, ছুঁড়ে দেয় পুরহিতের নগ্ন শরীর লক্ষ্য করে। রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে হারিকেনের চিমনি ভাঙার শব্দের সঙ্গে পুরহিতের চিৎকার, তার পৈতা আর গায়ের এখানে সেখানে গরম কেরসিন ছিটকে  আগুন ধরে গিয়েছে। পুরহিত নিজের শরীরের আগুন নেভানোতে ব্যস্ত হয়ে উঠলে মণিষা দৌঁড়ে মন্দিরের দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে আসে। বাইরে তখন নিঝুম রাত, কোথাও কেউ নেই, কোনো শব্দও না। মণিষা অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় না,অনুমানে দিক নির্ণয় করে অন্ধকারে সে দিকদ্বিক হয়ে ছুটতে থাকে।

ও দিদি!…এ্যাই দিদি…উঠেন এইবার। গাড়ী তো ঢাকা শহর আইসা পরছে…। বাস কন্ট্রাক্টরের অনবরত ডাকে মণিষার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে সে ফ্যালফ্যালিয়ে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে নিজেকে ধাতস্ত করে, বাসের সব যাত্রীরা নেমে গেছে, শুধু ও একা আর ওর পাশে অল্প বয়সী কন্ট্রাক্টর দাঁড়িয়ে ওকে ডাকছিলো।

ও উঠছেন আপনে তাইলে! আমি তো ভাবছিলাম, মইরা টইরা না গেছেন আবার,তাইলে আর এক ঝামেলা হইতো আর কি! দিদি ঢাকা শহর কি নতুন আসছেন? যদি নতুন হন একটা ফ্রি উপদেশ দেই,এইটা ঢাকা শহর আর আপনে মাইয়া মানুষ। যেখানে সেখানে এমন কইরা ঘুমায়া যাইয়েন না। বিপদ হইতে পারে। সবাই আপনেরে আমার মতোন নাও ডাকতে পারে, কথাটা স্মরণ রাইখেন। এখন তাড়াতাড়ি নামেন তো…আমারে আবার পরের ট্রিপের জন্য গাড়ী কিলিন করতে হবে।

বাস থেকে নেমে আসে মণিষা। ওর সামনে এক নতুন জনপদ, উন্মুখ ঢাকা শহর, হাজার হাজার মানুষ বিপুল ব্যস্ততা নিয়ে ছুটছে। কোটি মানুষের শহর,কোটি ভাবনার মানুষ বাস করে এই শহরে। কোটি রকম বিপদ যেমন ওঁৎ পেতে রয়েছে তেমনি কোটি সম্ভাবনাও নিশ্চয় লুকিয়ে রয়েছে এই জনপদে। মণিষা কোটি সম্ভাবনার মধ্য থেকে একটি সম্ভাবনা নিজের জন্য ধরতে পারবে তো?

 

Shamim Runa is a novelist, playwright, film critic and women rights activists.

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »