চোখবন্ধ অন্ধ সময়

চোখবন্ধ অন্ধ সময়

Share this:

ধারাবাহিক উপন্যাস | চোখবন্ধ অন্ধ সময়

পনেরো

মণিষা বসে আছে আফিফার সঙ্গে লালমাটিয়াতে দীপাবলী দীপার অফিসে। দীপা একটি অন লাইন পত্রিকার নিউজ এডিটর। তিন দিন আগে দীপা ওদের পত্রিকায় মণিষাকে নিয়ে নিউজ করেছিলো, নিউজ করার সময় ওরা, পত্রিকার সম্পাদকসহ সবাই জানতো,মণিষার খবরটি ধাক্কা দিতে যাচ্ছে বর্তমানের ঘুমন্ত সোসাইটিকে। কিন্তু খবরটি যে এমন বিস্ফোরণ তৈরী করবে, তা বুঝতে ওদের তিন দিন সময় লেগেছে। সংবাদ প্রকাশের পর থেকে সম্পাদকের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে ফোন আসা শুরু হয়েছে,সাম্প্রদায়িক উস্কানীমূলক এবং অবিবেচকের  মতো সংবাদ প্রকাশের জন্য হুমকি-ধামকিসহ নানান রকম প্রেসার। গতকাল পর্যন্ত সম্পাদক সাহেব নিজের অবস্থানের অনড় ছিলেন কিন্তু আজ  সকালে অফিসে আসার পর থেকে তার মেজাজ অন্য রকম,তিনি দিনের প্রথম কাজ শুরু করলেন মণিষা বিষয়ক সংবাদটি সাইট থেকে সরিয়ে নিয়ে এবং এমন অবিবেচকের মতো সংবাদ প্রকাশের জন্য সম্পাদকীয়তে দু:খ প্রকাশ দিয়ে। এই নিয়ে দীপার সঙ্গেও সম্পাদকের এক প্রস্থ বাদানুবাদ হয়ে গেছে। দক্ষতা আর সততার জন্য দীপার সুনামের পাশাপাশি মাথা গরম সাংবাদিক বলেও একটি অপেশাদারী পরিচয় রয়েছে, এর আগেও কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা আর নিইজ টিভি বদল করে এই অন লাইন পত্রিকায় এসেছে সে। পত্রিকার সম্পাদক দীপার মতো নির্বিক এবং কর্তব্যপরায়ণ সাংবাদিক পেয়ে কিছুটা নির্ভার হতে পেরেছিলেন এবং তার কাজে অযথা হস্তক্ষেপও করতেন না,এসব কারণে সম্পাদকের সঙ্গে ক্লেশ হয়নি কখনও।

কিন্তু আজকের প্রসঙ্গ ভিন্ন, মণিষা বিষয়ক সংবাদটি নিয়ে সম্পাদক সাহেব নিজেও প্রথমে বেশ উত্তেজিত ছিলেন কিন্তু যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে তাকে জানানো হলো, এটি একটি সাম্প্রদায়িক উস্কানী এবং দেশের স্থিতিশীল সমাজের জন্য হুমকীসূলভ এবং সাধারণ মানুষের সুক্ষ অনুভূতি আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার মতো খবর, তিনি যদি এটি বন্ধের কোনো ব্যবস্থা না নেন তবে তার বিরুদ্ধে আইসিটি এ্যাক্টে মামলা হতে পারে-তখন তিনি আর কোনো ঝুঁকি গ্রহনের সাহস করতে পারলেন না। কী লাভ এই সব অযাচিত সাহস দেখিয়ে? কত হাতি ঘোড়া গেল তল তার মতো মশক বলবে কত জল !

সম্পাদকের এমন কথার জবাবে অবশ্য দীপা হাসতে হাসতে বলেছিলো, বস; আপনি তো মশক! মশকের আবার তলিয়ে যাবার ভয় কী! হয় উড়ে উড়ে পার পাবেন না হলে শক্তিশালীদের রোমশ শরীর কামড়ে চলে যাবেন।

দীপা, আমি জানি, তোমরা লেখার মাধ্যমে সমাজের বিশাল পরিবর্তন আনতে চাও। অনিয়মগুলো রুখতে চাও। যখন আমি এই প্রফেশনে আসি আমিও তোমাদের মতো অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। এখন বুঝি, ওসব পরের কথা। আগে টিকত হবে, আমি তুমি যদি নাই টিকলাম তবে যুদ্ধটা করবো কী করে? এই যে হুমকী ধামকীর ভয়ে একটি অনিয়ম, দুর্নীতির সংবাদ তুলে নিলাম এতে করে আমার ভেতর কোনো গ্লানি হচ্ছে না? আত্মশ্লাঘা যে কত বড় তিরস্কার নিজের জন্য!

তাই বলে বস্ এভাবে আমরা ক্ষমা চেয়ে বার বার পিছিয়ে যাবেন? আর কতকাল?

অপেক্ষা করো। কৌশল বদলাও। একটা সুসময় নিশ্চয় আসবে।

কবে বস?

ওই যে বললাম, অপেক্ষা করো, যুদ্ধের কৌশল বদলাও। সে সুসময় হয়ত আমি দেখবো না, হয়ত তুমিও না কিন্তু এই সব অনিয়ম-দুর্নীতি একদিন অবশ্যই বদলাবে,দেখব।

অফিস পিয়ন রাসেল এসে জানায়, আফিফা আর সেই মেয়েটি এসেছে অফিসে, দীপার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে।

সম্পাদক বলেন, ওদের এখানে নিয়ে এসো। একটু পর আফিফা আর মণিষা সম্পাদকের রুমে আসে। দীপা মণিষার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময়, তারপর সম্পাদকের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, বস্, ওর মুখটা দেখুন…

কেন? কী হয়েছে? সম্পাদক মণিষার দিকে তাকিয়ে জানতে চান।

একটি আগুনের স্ফুলিঙ্গ!জ্বলে উঠার অপেক্ষায়।

সম্পাদক মণিষার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে হাসে, তোমরা সবাই তো এক একটা স্ফুলিঙ্গ। জ্বলে ওঠার অপেক্ষা শুধু।

না স্যার আমরা না। আমাদের সাহস নাই, তেজ নাই। খালি ধোঁয়া তুলে চারিদিক আরও অন্ধকার করে তুলি। মণিষাকে দেখেন বস্, ওকে দেখেন। এমন নিয়ম ভাঙা দাবানলের মতো আগুন সবাই’র ভেতর থাকে না। বস্, আপনার রাহাফ মোহাম্মদের কথা মনে পরছে না ওকে দেখে?

কোন রাহাফ মোহাম্মদের কথা?

সেই সৌদি তরুণী? যে বাড়ী থেকে, দেশ থেকে পালালো? আফিফা বলে।

হুম সেই রাহাফ!কী দুর্দমনীয় সাহস! যখন সে কানাডার এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসছিল, সারা বিশ্বের ক্যামেরা মেয়েটির দিকে তকি করা। সে কী রকম দীপ্ত! আমি মুগ্ধ হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর চোখের দ্যুতির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমি ওর চোখে বস্ মুক্তির আলো দেখেছিলাম। ওর মতো এমন সাহস নিয়ে কতজন মেয়ে মুক্তির কথা ভাবতে পারে? এমন মুক্তির জন্য যে সাহস দরকার তা কত জন নিজের ভেতর খুজেঁ নিতে পারে? কতটা মরিয়া হলে একটি মেয়ে জীবন বাজী ধরে মুক্তির সন্ধানে বেরিয়ে পরতে পারে বস?

হুম আমি তোমার পয়েন্টটা আমি বুঝতে পারি দীপা।

বস্, আফিফা সেদিন প্রথম মণিষাকে আমার কাছে নিয়ে আসে, আমি ওর গল্প শোনার আগেই ওর চোখের দিকে তাকিয়ে একটি ধারালো চকচকে আলো দেখতে পাই। ঠিক আলো নয়, আগুন দেখতে পাই। আমার মনে হয়, এই আগুন আগেও দেখেছি। তারপর ও যখন নিজের কথা বলতে শুরু করে, আমি তখন বুঝতে পারি, এই আগুন আমি রাহাফের দৃষ্টিতে দেখেছিলাম,এমন মুক্তির আলো আমি রাহাফের চোখে দেখেছি। আবার দু’দিন আগে দেখলাম মণিষার চোখে, এই যে আমাদের সামনে বসে থাকা মেয়েটির চোখে। অদ্ভূত এক আলো, নিজের স্বাধীনতার আলো। বস্, আমি তো এমন আগুন-মেয়েদের পক্ষে কাজ করতে চাই। ওদের হাত আকড়ে বলতে চাই, আমাকেও তোমাদের সাথী করো। ওরা তো পথ প্রর্দশক আমাদের মতো সব কিছু মেনে নেয়া সাহসহীন নারীদের, আমাদের মতো প্রতিবাদ করতে না পারা মানুষদের জন্য। এদের মতো মেয়েদের  পক্ষে কথা বলার পরিবর্তে আমরা ওদের হাত ছেঁড়ে দিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচানোতে ব্যস্ত হয়ে পরেছি।

পিঠ বাঁচানো নয়, কৌশল বদলানোর কথা বলেছি আমি।

কী কৌশল?

সেটা তো আমি বলতে পারবো না। নতুন কৌশল তো তোমাদের মতো স্ফুলিঙ্গদের কাছ থেকে আসবে। আমার মতো ওল্ডম্যানদের কাছ থেকে নিশ্চয় নয়। যারা জুজু’র ভয়ে কাঁপে। সম্পাদক নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে ওঠে।

সম্পাদক হাসি থামালে দীপা আফিফার কাছে জানতে চায়, হঠাৎ তুই এলি যে?

মণিষাকে নিয়ে আসতে হলো। আমি একা কিছু বুঝে উঠতে পারছি না।

কোনো সমস্যা?

আমার হোস্টেল থেকে আজ  সকালে ম্যানেজার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ওরা মণিষাকে হোস্টেলে রাখতে পারবে না।

মণিষাকে রাখতে ওদের সমস্যা কী? ওটা তো লেডিস হোস্টেল নাকি? আমরা তো মণিষার জন্য পে করছি, তাই না?

তোমার কথা সবই ঠিক আছে। তবে কথা হলো, ওদের কারা যেন হুমকী দিয়েছে তাই ওরা মণিষাকে বোর্ডার হিসাবে রাখতে পারবে না। আমি তর্কাতর্কি করায় বললো, আপনার না পোষালে আপনিও কেটে পরেন। একজনের কারণে অন্যদের বিপদ হয় ওরা এমন কোনো রকম ঝামেলায় পরতে চায় না। আসলে ওরা নিজেদের ব্যবসার ক্ষতি হয় এমন কিছু করতে চায় না।

এটাকে ওদের দোষ বলতে পারো না আফিফা। এটা ওদের অপারগতা। ঠিক আমাদের মতোই। আমরা আসলে দিন দিন হটটিটি জাতিতে পরিণত হচ্ছি। বিপদ দেখলে হাত-পা ছেড়ে মরার আগেই মরে যাই।

মণিষা যে এই হোস্টেলে আছে কারো তো জানার কথা নয়, সম্পাদকের কথাকে পাত্তা না দিয়ে দীপা চিন্তিত হয়ে ওঠে।

কোনো না কোনো ভাবে জানা হয়ে গেছে যখন তখন ওই হোস্টেলে ওর থাকা আর নিরাপদ নয়। তাই ওকে ওক মুহূর্তও আর একা না রেখে সঙ্গে নিয়ে এলাম তোমার কাছে।

ওকে বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়া যায় কী?

সম্পাদকের কথা শুনে চুপ হয়ে থাকা মণিষা ভয়ানক চমকে ওঠে, না না আমি বাড়ী ফিরে যাবো না। আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, আমাকে আবার  শ্বশুরবাড়ী পাঠিয়ে দেবে। তারপর…। মণিষার চোখে সে রাতের বিবমিষার সর্পিল ঘুম থেকে জেগে ওঠতে চায়। দীপা তা লক্ষ্য করে সম্পাদকের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়, আপনি কী মনে করেন? ওকে পাঠানো উচিত?

না, সম্ভব না। ওদের গ্রামের মানুষজন জেনে গেছে। অল রেডি ওদের বাড়ীতে লোক চলে গেছে ওর খোঁজে। ওর বাবা-কাকাদের গালমন্দ করে গেছে গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়। আফিফা বলে।

হঠাৎ সম্পাদকের রুমে হুড়মুড়িয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আর অন্যান্য স্টাফরা  ঢুকে পরে, সবাই বেশ উত্তেজিত।

কী ব্যপার? আপনারা সবাই এক সাথে!

স্যার নিচে অফিসের সামনে একটা মিছিল এসেছে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মিছিল। ওরা আপনার আর দীপার ফাঁসী চায়…

কী বলছেন এসব? বলতে বলতে দীপা আর সম্পাদক বন্ধ জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে নিচের রাস্তায় তাকায়।

দারোয়ানকে বলেন গেট ক্লোজ করতেন…

তা করা হয়ে গেছে। পুলিশেও ইনফর্ম করা হয়েছে স্যার।

গুড। আমি থানার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করছি, কুইকলি ওরা যেন আসে। ফোন হাতে নিয়ে সম্পাদক আবার দীপার দিকে তাকায়, দেখছো তো দীপা কেন বলি যুদ্ধের কৌশল বদলাও। পুরনো অস্ত্র আর পুরনো যুদ্ধ কৌশল নিয়ে এদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না। এরা জানে কী করে এসব অস্ত্র মোকাবেলা করতে হয়। এখন নতুন অস্ত্র আর নতুন কৌশল দিয়ে পুরনো ধ্যান-ধারণা পাল্টানোর সময় এসেছে। নতুন কিছু ভাবো তোমরা, নতুন আগুনের ফুলকিদের নতুন কিছু ভাবার সময় এসেছে।

 

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top