জলদাসের মৎস্যঘ্রাণ

Share this:

জলদাসের মৎস্যঘ্রাণ

 

বাঁশঝাড়ের শিখরে এক টুকরো কাস্তে অথবা কুমড়ো ফালির মতো উজ্জ্বল ব্যাকুল শুক্লপক্ষের চাঁদ ঝুলে আছে। বাঁশঝাড় নিশির হাওয়ালেগে একটু উতলা, প্রতিটি বেতস পাতা চোখের নরম পাপড়ির মতো নাজুক, আধবোজা প্রকৃতিতে কাঁপে। একঝাঁক টিয়ে আচমকাবাঁশবনের জ্যোছনায় ট্যা ট্যা করে ওঠে। বাদাবনে হয়তো এখন নিশাচর জিব নাচিয়ে থাবা মেলছে। রাত তাই কেমন শরীর কাঁটা দেওয়ানির্জনতায় গা ছমছম…। পাশেই গাবগাছের ঝোপে বসে ভুতুম প্যাঁচা ডাকছে, কি রকম আত্মা কাঁপানো গুমগুম ধ্বনি; এ ডাকের একভৌতিক তন্দ্রা আছে! বাঁশবন, গাছপাতা, বাড়িঘর, খালবিল, পুকুরের জল এই তন্দ্রায় নিঝুম ঘুম যায়।

ঘুম নেই একজনের, সে উঠোনে দাঁড়িয়ে আলুথালু কেশ, বিস্রস্ত শাড়ি, শিথিল দেহ; তার চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। তার শরীর অবসাদেন্যুব্জ, তবু চোখের পাপড়ি বুজে আসে না। অনন্তকাল যেন রাত্রিকে পান করেও তার আশ মেটে না; এতই পিপাসা তার। এতক্ষণ কোনোকারণ ছাড়াই, অদ্ভুত উদাসীন একলা চাঁদকে নিরীক্ষণ করছিল; বাঁশবাগান তখন প্রাকৃত অবয়বে ঢুলুঢুলু। চাঁদকে তখন বাঁশবাগানেরমাথায় মনে হচ্ছিল সদ্যফোটা বাঁশফুল।

কাজরির বুকজুড়ে অসংখ্য টিয়ে যেন একসাথে ট্যা ট্যা করে, অবিরাম রক্তক্ষরণে উতল পাখিগুলো ডেকেই চলছে। একসময় টিয়ের ডাকেতার কৈশোর ছিল কলকাকলিমুখর, আনন্দে, হর্ষে চঞ্চল। ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়ে এসে তার কৈশোরের বাঁশবন কাঁপিয়ে নামত। গাছে গাছেপাতার মতো নেচে উঠত তাদের পালক; মাটিতে, শস্যখেতে মনে হতো টুকরো টুকরো সবুজাভ স্বচ্ছলতা উড়ছে। এখন টিয়ে তো দূরেরপাখি; পড়শি যে শালিক-ঘুঘু, তারাও যে মুখ ফিরিয়ে অতীত, কদাচিৎ চোখে পড়ে। কোথায় মগ্ন দুপুর, রাত-দুপুরে ঘুঘুর ডাক; যে ডাকশুনলে বক্ষব্যাপী হু হু বাতাসের টান, আনচান করে মন, ঘুমন্ত হাহাকার পাখা পেয়ে যায় ‘সখি গো প্রাণের বন্ধু কেন রইল বৈদেশে…।‘

কাজরি মনে মনে চমকায়, এই গান কেন আজ তাকে তাড়া করছে! তার সমস্ত শিরা-উপশিরা ধরে প্রবহমান রক্তস্রোতে তারই তরঙ্গ,ছলছল ঢেউ। তার জলদাস তো ঘরে ফিরছে না। কোথায় আছে, কেমন আছে; কোনো সঠিক খোঁজ নেই। কেউ বলে এখানে, কেউ বলেসেখানে। সে তো জানে; তার জলদাস এখন আর কোনোখানেই নেই। কেবল ফেটে যাওয়া চৈত্রের বাতাসে সে শিমুল তুলো, উড়ছে কেবল,উড়ছেই।… পথহারা, বিভ্রান্ত, উড়– উড়– পথ খুঁজছে।

সে আনমনে সেই বাঁশবনের দিকে দুর্নিরীক্ষ্য তাকিয়ে আছে, আশ্বিনের গভীর রাতÑ তাই বাতাসে শীতল ছোঁয়া। কাজরি কেমন উদাসীন,বিষণ্ন, আহত ঘোরের ভেতর। তার চোখের বৃত্তে কখনও আঁকা হয়ে যাচ্ছে একেকটি মুখোশ ঢাকা মুখ, পরক্ষণে ভিন্ন তুলির আঁচড় তামুছে ঝলসে তুলছে নতুন চিত্র। সে অবিকল দেখতে পায় তাদের লোভের জিবে উঠে যাচ্ছে একেকটি জনপদ, মানুষজন। চুরমার হয়েযাচ্ছে স্বপ্ন, প্রেম, সাধ-আহ্লাদ। কাজরি সেই লোভের ভেতর চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গলে যেতে থাকে, ডুবে যেতে থাকে অতল নিঃস্বতার ভেতর।

সে তার দুই হাত বাড়িয়ে প্রবল শূন্যতাই কেবল পায়। কোনো আশ্রয় কোথাও নেই, নিঃস্ব পাঁজরভাঙা শূন্যতার কবলে হঠাৎ সে শীত টেরপায়। সে ধানের কুড়া লাগা ময়লা শাড়ির আঁচলখানি কেমন এক নিশিঘোরের ভেতর নৈর্ব্যক্তিক আঙুলে টেনেটুনে পিঠে বুকে জড়িয়েনেয়। বুকের উপর আড়াআড়ি হাত রাখে, পিষ্ঠ স্তনের চূড়ায় একা নিঃসঙ্গ একটা কোকিল পিপাসাকাতর আর্তনাদ করে। কাজরি হাতসরিয়ে ফেলে। একটা লোনা জলাশয়ে তার ঠাঁই; কাটাছেঁড়া ঘায়ে সেই জলের ছোঁয়ায় অসম্ভব জ্বলুনি।…

গাবগাছে ভুতুম প্যাঁচার ডানা ঝাপটানোর সাথে সেও ছটফট করে; তার চোখের ঘুম পলাতক, অনিদ্রা এখন তার সারা গতরে উইয়েরপালক পেয়ে ফরফর করে। তবু সে উড়তে পারছে কই; নড়াচড়া করতেও যেন অদ্ভুত শিকড় চারিয়ে থাকে মাটির অভ্যন্তর।

উঠানের কাছেই গাবগাছে ঝুলানো একটি টানা জাল; সেই ভেজা জাল ফুঁড়ে ভেসে আসছে স্যাঁতসেতে মাছের আঁশটে ঘ্রাণ; কাঁচা, মগজআঁতলানো গন্ধ। কাজরির মনে হয়, এখন পুরো উঠানই এক বিস্তৃত জলাশয়। থিকথিক করছে অজস্র মাছ, কিলবিল করা মাছের শরীরগুলে উঠে আসছে আঁচলা গন্ধ। সে সেই ঘ্রাণের ভেতর দলছুট মাছ, একা বুঁদবুঁদ তুলে, সাঁতরায়। অথবা সে যেন রূপকথার সেইমৎস্যকন্যা, ক্ষুদ্র পালক নাচিয়ে অনবরত সাঁতরে সে তার জলদাসকে খুঁজছে। মাছের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যে রাত-দুপুরে তার কোল ছেড়েরূপালি শস্যের আশায় জলের বুকে ঝাঁপ দেয়। অগণিত মাছের সাথে যেন তার সখাসখি ভাব; এমনি মাছখোর এক জলদাস…! সেইজলদাসের বিরহকাতর মৎস্যকন্যা, এখন একলাটি দাওয়ায়, উঠানে নিদ্রাহীন অনন্তলোকে দৃষ্টি ফেলে, বসে, দাঁড়িয়ে রাত পার করে দেয়।কখন ঘরে ফেরে তার মরদ; সমস্ত গতরে যার মাখামাখি হয়ে আছে মাছের কোরা, আঁশটে ঘ্রাণ, পিছলা তেজ। দুই বাহুর বেড়ে ধরাবোয়াল, রুইয়ের মতো কোলপাঁজা করে যে ছটফট করে, নরম আনন্দে জাল টেনে তোলার ভান করে ফিসফাস জুড়ে… ‘তুই আমার রুইকাতলা। এত মাছ ধরেও সুখ নাই বউ। তর বুকে যে এত সুখ এই জলদাস আগে কেমনে বুঝে ক..।‘

কাজরি মাছের আঁচলায় গতর গলিয়ে নির্লোম টান টান বুকে ঠোঁট গেঁথে ফেলেÑ ‘ইশ! মরদের কথা শোন। রাইতবিরেতে বউরে একলাথুইয়া যখন জলে ঘুরেন, তখন কই থাকে মাইনষের এত ছটফট!‘

‘নারে বউ। রাইতে যখন ডিঙিতে শুয়ে আসমানের দিকে মুখ করে থাকি। তখন মনটা খালি হয়ে যায়। কেমনে যে তরে এ কথা বোঝাই।‘বুক ফেটে যাওয়ার মতো কষ্ট কাজরির। সে তখন আরও গভীর জলে ডুব দেয়, যেন পাতালেই তার ঠাঁই! সে মর্মরিত আকুলতায় বাধাদেয়Ñ ‘অইছে এসব কথা থোন।‘

জামি বুকভরা উথলানো সাধকে তখন বৈশাখের নবীন জলে ছেড়ে দেয়; এরা যেন আকাঙ্ক্ষার ডিম, জলের ঘর্ষণে ডিম ফেটে বাচ্চাবেরুবে, কিলবিল করবে অসংখ্য পোনামাছ। সে বলতে থাকে ’বউরে কার সাধ কও তো এমন ঘর ছেড়ে নিশিকাল জলে কাটায়। উপায়যে নাই, পেটে যে রাক্ষুসের ক্ষুধা। কামড় দেয়, আচড় কাটে।’

কাজরি যেন দিক নির্দেশ করে- ’হালচাষ করেন।’

’জমি কই! ’

’ভাগ চাষ করেন।’

এবার জামি না হেসে পারে না- ’তাও যে টাকা লাগে। হাল কিনো, লাঙল কিনো, জোয়াল কিনো! কে দেবে ডাঙার হদিস! বাপ-দাদা জলেরপোকা। জনমভর তো জল জাল মাছ ছাড়া আর কিছুই চিনি নাই। এখন যে মাছও মুখ ফেরাচ্ছে, কই পারছি ছাড়তে! এ যে রক্তের টান,নেশারে বউ, নেশা।’…

কাজরি তল পায় না অথৈ জলে। সেও তো বেড়েছে এমন মাছের গন্ধ শুঁকে শুঁকে। কেবল মাঝরাতে যখন একা বিছানাটি অন্তহীন শূন্যতানিয়ে ভয় দেখায়, তখনই তার ভেতর এক দ্রোহী নারী জামির পেশা বদলের প্ররোচণা দেয়। এত কষ্ট করেও তো ঘরভরা সুখ নামেনি, তবেআগুনে পুড়ে কী লাভ! সে অনির্দিষ্ট চিন্তায় বুঁদবুঁদ হয়ে ফুটতে থাকে, আবার ভিন্ন তরঙ্গ এসে সেই বুঁদবুঁদ মুছে ফেলে। তারা তখন আরনির্দিষ্ট কোনো মানব-মানবী থাকে না, একটি তরঙ্গিত উচ্ছ্বসিত নদী অথবা সমুদ্রের অবাধ সফেন ঢেউ, মাছের ঘ্রাণ নিয়ে ডুব দেয় তারা;দিন অথবা রাত্রির প্রভেদ মুছে গিয়ে একটি জলাশয় যেন। তাদের নরম পালকের ঘাইয়ে জল ছিটকে ওঠে, লাফায়। মৎস্যকন্যা জামিকেজড়িয়ে ফেলে আনন্দের পুকুর হয়ে যায়। পুরো শূন্যতা তখন রুপালি মাছে ভরে ওঠে। অনন্তকাল সেই সুখ, মাছের ঘ্রাণ মুঠো মুঠোকুড়োচ্ছে, এমনই তৃপ্তির জলধারা…। মৎস্যকন্যা তখন গতরের সকল খোলস ছেড়ে দেয় জলে, নগ্ন গতরকে মুখর করে তুলে ঢেউয়েঢেউয়ে। জামি জলের সংসারেই ডানা মেলে সাঁতার কাটে।

এখন সেই মৎস্যঘ্রাণ কাজরিকে আলুথালু করে। সেই যে টিয়ে, কষ্টের ঘুঘুপাখি এখন তার বুকের কাছে শুয়ে ডাকে নিশিদিন। তারজলদাস, তার আনন্দ এখন কোথায়, সে জানে না। কেবল সে উতলা হয়, কষ্ট পায়, জলদাসের সন্ধান জানে না।

এখন এমন সময়; কাজরি লক্ষ করেছে, কেউ আর গোঁয়ারের মতো পুরোনো পেশায় লেপ্টে থাকছে না। অনেকেই পুরোনো পেশাবদলাচ্ছে, পাড়া ছাড়ছে। এখন কেবল তার মানুষটি পেশায়ও নেই, কাছেও নেই। তার খুব ক্ষোভ হয়, রাগে রিরি করে অস্থি-লও। কেন,এত মানুষ থাকতে তোমারই শুধু কষ্ট, বুকের ভেতর জ্বালা! স্বার্থপরের মতো একলা উধাও হয়ে গেলে!

কাজরির চোখের সামনে ঝলসে ওঠে একটি বিল, তলপেট ভরে মাছের ঘাঁই। মহাজন দাঁড়িয়ে তীরে; সেই মাছ জলদাসদের চোখের সামনেলক্ষ মুদ্রা হয়ে চলে যাচ্ছে মহাজনের থলিতে। জলদাসদের হাতে কেবল মাছের আঁশটে স্যাঁতলা ঘ্রাণ, আর বাতাসে সুনসান শূন্যতা।

কাজরির হুঁশ নেই কখন যে চাঁদ হেলে পড়েছে। ছায়া নামছে আঁধার হয়ে গাছপালায়, বাড়িঘরে, খালে জলে। জেলেপাড়ার বাড়িগুলোএমনিতে ছাড়া ছাড়া, প্রতিটি বাড়ির মাঝখানে ছোটখাটো খাল জালের মতো ছড়ানো, পুরো বর্ষাই জলভরা থাকে। তখন কলার ভেলা এ-বাড়ি ও-বাড়ির সংযোগ সেতু। নৌকা তো আর ঘরে ঘরে থাকে না, তাই ছোট ছোট খালে আছে বাঁশের সাঁকো।

কাজরি একটি সাঁকোতে উঠে এসে দাঁড়ায়। জলের ভেতর চাঁদের ফালি ক্ষীণ দাঁতের রেখার মতো, মাছের ঘাঁইয়ে তা চূর্ণ হলে মাথার উপরদিয়ে কি একটা পাখি যেন ’রাত বেশি নেই’ বলে উড়ে গেলে সে কেঁপে ওঠে।

বিভিন্ন বাড়িগুলো আঁধারগুচ্ছ, অজ্ঞতা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার পেটে ঠেসে কেমন নিঝুম। সেইসব বাড়ি থেকে দুএকটি কুকুর ডাকে;ডাকুক। এতে ধূর্ত শেয়াল জেনে ফেলে কুকুরের উপস্থিতি। কাজরি সাঁকোর বাহু ধরে দূরে চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে। কোথায়, কতদূর তারচোখ, হয়তো সেও তা জানে না। যদিও আকাশকে এখন খুব কাছের মনে হয়; যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেওয়া যাবে এমন। আকাশেরতলজুড়ে মেঘের তুমুল আড্ডা, থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকায়। এই আশ্বিনের ভোরে হয়তো একপশলা বৃষ্টি নামতে পারে এই জনপদে!কাজরি অবচেতন, উদাস, নির্লিপ্ত এক মৎসকন্যা, জলের বুকে ভেসে আছে সে; প্রত্যক্ষ করছে একলাটি মানুষের লোভ, লালসা,হিংসা-দ্বেষ। সে জানে না যদিও এই পর্যবেক্ষণের শেষ কোথায়! ঘরে তার কচি শিশু কাঁদে। বুড়ি শাশুড়ি ফোকলা মুখে বিড়বিড় করে,’কইরে বউ; গেলি কই, অ খোদা…।’

নৈঃশব্দের ভেতর তখন শুধু হাহাকার থাকে, আর্তনাদ কোথাও থাকে না।

সে একটা ধান কলে ধান কুড়ো ঝাড়ার কাজ নিয়েছে। কোলের শিশুটিকে কাঁখে ঝুলিয়ে দুই গ্রাম পাড়ি দেয় সেই সকাল সকাল, ফেরে সাঁঝনামলে। …সেখানেও, এখানেও কোনো না কোনো দুর্বৃত্ত মরদ তার দিকে হাত বাড়ায়। আছে মহাজনের জিব চুকচুক করা নাচন। কীভাবেযে নিজেকে আগলায়, সে হিম হয়ে যায় নিঃস্বতার তুষারপাতে। অবশ্য, দুএকজন এখনও আছে যাদের চাওয়ার কিছু নেই, পাখিটির বাসাপাহারা দেওয়া, বাঁচানো ব্যতীত। এরাই এখন তার বাঁচার প্রেরণা, পুঁজি।

কাজরি বুঝতেও পারেনি, মানুষটির হঠাৎ করে কী যে হলো, কেমন এলোমেলো, ছন্নছাড়া। না তার প্রতি, না সংসার কোনো কিছুতেই তারমন ছিল না। একদিন তার পাঁজর থেকে আলগা হয়ে হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। কাজরি মুঠোতে যতই ধরতে যায়, তার বাঁধন ততইফসকা গেঁরোর মতো খুলে যেতে থাকে। জামি হঠাৎ যেন পালক পেয়ে গেছে, সে উড়বেই। একটানা তার তড়পানি কেবল, ‘বউরে জল কই,মাছ কই। খালি লও, লওরে…।’

কাজরি ধমক দেয়, ’তোমার কি মাথা খারাপ অইছে, খালি আজেবাজে কথা কও।‘

জামি তখন আরও বেশি বাঁধনহারা হয়ে পড়ে। কাজরির কোমল বাহুডোর তাকে ধরে রাখতে অক্ষম। কোথায় যেন তার খেই টুটে গেছে,এখন তার নাগাল পাচ্ছে না। কাজরি যতই বোঝায়, ‘ঠান্ডা হও, ঠান্ডা হও’ …ততই জামির পানসে সিঁদুর ফোঁটা চোখ আরও গভীর কিছুরঅন্বেষায় মত্ত, টলমল করে। সে এক অতল গহ্বরে ছটফট করে, ঠোঁট নাড়ে, জিব কচলায় ‘খালি লও, মাছ নাই, জল নাই। তুই কইরেবউ…।’

বউ দিশেহারা হয়ে যায়, সে জামির বাহুতে মুখ ঘষে, ‘এইত, এইত মাছের গন্ধ। তুমি এমন করো না গো। দোহাই তোমার। সব ঠিকআছে।’ কিন্তু জামি এসব শুনবে কেন! সে এখন বহু দূরের, স্পর্শ দিয়ে এখন আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সাঁকোর নিচে আধবোজা কলমি ঠাসা খালে জল থির। একপাশে বুকভরা আঁধার নিয়ে একখানি খালি ডিঙি ঘুমে। দুই তীরেজারুল-হিজল-করচের ডালে ডালে স্তুপ স্তুপ অন্ধকার কাতর, মৌন: আকস্মিক গা ছমছম করবেই। অন্য কোনো সময় হলে একা এখানেআসতে সে একটুও সাহস পেত না। কিন্তু এখন রাতজাগা চোখে তার কোনো কিছুই ভীতিকর মনে হয় না। সে রাতকেই আলিঙ্গন করেবেঁচে আছে; রাতই উজ্জ্বল, স্মৃতিখোঁড়া!

সেবার একটি বিল নিয়ে দুই মহাজন প্রতিপক্ষ টানাহেঁচড়া শুরু করলে, একদিন তা সংগ্রামে-সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিলের তীরে শত শতমানুষ, জলদাস; এরা এসেছে একই স্বার্থের দুই উত্তরাধিকারের পক্ষ ধরে। জান বাজি রেখে মহাজনের গোলায় তুলে দিতে মৎস্য, মুদ্রারাশিরাশি। …এরা জানে না ভেতরের কূটচাল; নানা কৌশলে হুজুগ তুলে এদের রণক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিয়ে মজা লুটে সামন্ত শাসক। জামিরচোখের সামনেই দলছুট হাঁসের মতো গুলিবিদ্ধ চার চারটি অমৃতের পুত্র ঢলে পড়ে পলকে। রক্তাক্ত ঘাস, মাটি, জল। ক্রমশ উজ্জ্বলতরভোর, বিধবারা কাঁদতে কাঁদতে মর্গের দিকে ছুটে। কাটাছেঁড়া গলিত শবদেহ কোন সম্ভাবনার সূচনা করে, তারা জানে না! শিশুরামাতৃক্রোড়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে।

সেই রক্তের ছিটা জামির চোখে গেঁথে গেল, কিছুতেই সে তা মুছে ফেলতে পারে না। সেই যে এলোমেলো হওয়া দলছুট জামি; মানুষেরনির্মমতা, নৃশংসতা তাকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। তার চোখে তখন রক্তের দাগ, যেখানেই তার চোখ পড়ে, সেখানেই রক্তের গাঢ় ছোপ।এমনকি তার যে পরম আদর, মমতার আশ্রয়-যে রমণীর সারা গতরময় জলের শ্যাওলা, ভাঁজে ভাঁজে মাছের গোপন কোলাহল, সেইরমণীর নগ্ন বুকে মুখ রেখেও সে স্বস্তি পায় না, হড়হড় করে বমি করে ফেলে। সে নিশ্চিত হতে পারে না মানুষের লোভ কতটুকু প্রসারিত,নির্দয়, নিষ্ঠুর…।

জামির স্নায়ুর সকল গিঁট একদা আলগা হয়ে গেলে সমস্ত বাঁধন ছিন্ন করে সে উধাও হয়ে গেল: কাজরি সকল মমতা ঢেলেও তাকে আরদৈনন্দিনতায় ফিরিয়ে আনতে পারল না। এখন যে সে কোথায়, কোন সুদূরে-সে তার বিন্দুকণাও জানে না।

কাজরি সাঁকোর বাহু ধরে তেমনি দাঁড়িয়ে। চাঁদ ডুবে গেছে বহুক্ষণ…রাত ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। পূর্ব দিগন্তে ফুটছে ধলপ্রহরের আভাস। সেএকবার নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে, বহুকাল অব্যবহৃত দুটি ডোলা ঝুলে আছে আবছা অন্ধকারে। কতদিন হলো তাতে মাছেরস্পর্শ লাগেনি। বুড়ি শাশুড়ি কাজরির কষ্ট বুঝে, তবু সে নিরুপায়; সে শিশুটিকে কোলে ধরে ডাকে ’অ বউ, বউ, কই গেলি…।’

তার ডাকেই যেন পাখির গলা ফুটে গাছে গাছে; দূরের মিনার থেকে ভেসে আসে ’আসসালাতু খাইরুম মিনাননাউম…’। কাজরি তেমনিথির, তার আছে কষ্টঘ্রাণ, অন্যজগত। তখন সূর্যোদয়ে মহাজন বাড়ির টিনের চালে ভোর ঝকঝক করে হাসে; আর তার নিচে লোভ,হিংসা-দ্বেষ, রিরংসা নিশ্চিত ঘুমায়।… কাজরি অনুভব করে ডোবানালা, হাওর এবং প্রতিটি বাড়িতে ঝুলানো ভেজা স্যাঁতলা জাল থেকেমাছের কাঁচা আঁচলা ঘ্রাণ হাওয়া লুফে নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে আনমনা হয়ে ওঠে, আকুল হয়। এ তো জামিরই গতরের গন্ধ! কাজরি এইঘ্রাণের ভেতর ফের এক মৎস্যকন্যা; তখন বুকজুড়ে তার কেবল জামিই ঘ্রাণসম্পদ।

 

প্রশ্নোত্তর

শুদ্ধস্বর: গল্প লেখার ব্যাপারে আপনার তাড়নার জায়গাটা কোথায়? অর্থাৎ কোন বিষয় এবং ঘটনাগুলো আপনাকে গল্প লেখারজগতে পৌঁছে দিলো?

আকমল হোসেন নিপু: গল্প লিখব এরকম করে কোনোদিন কিছু ভাবিনি। বইপোকা ধরনের পাঠক ছিলাম। যে বয়সে যে বই পড়ার কথানা, হাতের নাগালে সেরকম যা পেয়েছি, তাও পড়েছি। কবিতার মতো কিছু লেখার তাগিদ তৈরি হয়েছে একসময়। লিখি, আর ছিঁড়েফেলি। অতটা বুঝি না (এখনও যে বুঝি, তা না)। আমার বয়সের যারা আছে, তারা তো সেই শিশু থেকেই যুদ্ধ, আন্দোলন-সংগ্রাম, মৃত্যুএসব দেখে দেখেই বেড়ে উঠেছি। আশির দশকের অবরুদ্ধ একটা সময়ে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো যখন পরিবেশ ছিল না। প্রকাশ্যেরাজনীতি ছিল না। এখানে-ওখানে সাহিত্য নিয়ে আড্ডা হতো। এরকম এক আড্ডার এক কোণে আমিও বসেছিলাম। গল্প নিয়ে কথাচলছিল। অনেকের কথাবার্তা শুনে মনে হলো, এত কথা না বলে গল্পই লেখা যায়। কথা বলার মতো এটাও তো একটা বড় মাধ্যম হতেপারে। আমারও তো অল্পকিছু কথা আছে। কত মানুষের সাথে ততদিনে দেখা হয়েছে, কত রকমের মানুষ। মানুষের আনন্দ-বেদনা,অভাব-অনটন, অভিযোগ, প্রকৃতি, মেঘ-বৃষ্টি, ঝড়, দারিদ্র্য, বৈষম্য, শোষণ বঞ্চনার রকমফের- কতকিছুই তো দেখছি। সেই শুরু।তারপর এই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা, ভাঙাচোরা জগতটাকে আঁকড়ে ধরে এই অতটুকু পর্যন্ত আসা।

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার গল্পকে আকার দেয়?

আকমল হোসেন নিপু: খুব বেশি পরিকল্পনা করে, গুছিয়ে আমার লেখাজোকা হয় না। কোনো একটি ঘটনা হয়তো আমাকে নাড়া দিল,সেটি ব্যক্তির, সেটি সমাজের ভেতরের কোনো বিষয়, সেটি ছোটও হতে পারে। বড়ও হতে পারে। তাৎক্ষণিক সেটা নিয়ে লিখতে বসলেকখনও কখনও কিছু একটা দাঁড়িয়ে যায়। আবার অনেকদিন সেটা মনের কোন অতলে যে শীতল ঘুমে থাকে, আমি নিজেও জানি না।হয়তো নতুন, অন্যকিছু ভেবে লিখতে বসেছি। দেখা গেল, পুরোনো সেই নাড়া দেওয়া বিষয়টি তরতর করে সামনে চলে আসছে। সাথেতার চারপাশ, রক্ত-মাংসের জীবনযাপন, আকাশ-প্রকৃতি সবকিছুই আছে। তার মতো করে যে জীবন, সে জীবনের চেনা-অচেনা গন্ধ,মোহ, কাম, ক্রোধ, ভালোবাসা, ঘৃণা সমস্ত কিছুই গল্পের মতো করে একটা বয়ানে তৈরি হতে থাকে। সেই গল্পের শরীরে কোনো নাকোনোভাবে সময়ের ধুলোমাখা মুহূর্তের কিছু ধরা পড়ে, অনেককিছু হয়তো ভুল বসন্তে হারিয়ে যায়। তবে তার সবকিছুই যে ব্যক্তিগতঅর্জন থেকে পাওয়া, সেটাও না। অনেক মানুষের নানা অর্জন, ব্যর্থতা, আনন্দ-উচ্ছ্বাস থেকে কুড়ানো।

শুদ্ধস্বর: আপনি কি মনে করেন সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব কথাসাহিত্যের উপর রয়েছে বা থাকা উচিত? আপনারঅভিজ্ঞতা এবং পঠনপাঠনের আলোকে বলুন।

আকমল হোসেন নিপু: কথাসাহিত্য, সে তো জীবনেরই প্রকাশ। কল্পনা তার উন্মুক্ত প্রান্তর হলেও কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তি, সমাজ,রাষ্ট্র তার শরীরজুড়েই থাকে। যে যেভাবেই বলি, সে তো মানুষ ও তার আচার-আচরণ, স্বভাব-প্রকৃতি, এসব কিছুই তো গল্পের জমিজমা।মানুষ নিজেই তো রাজনৈতিক বলয়ের প্রাণী, ইচ্ছে করলেও রাজনীতির বাইরে তার থাকার সুযোগ আছে বলে তো মনে হয় না। তাকেবাজারে যেতে হয়, অফিস-আদালতে যেতে হয়, তার চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ করতে হয়। এ-সবকিছুই তো রাজনীতির নিরিখে তৈরি। কেউহয়তো সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয়, কেউ একটা ভোট প্রদানের মাধ্যমে সক্রিয়, কেউ কোথাও না থেকেই রাজনীতিতে আছে। এরকমজীবনকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ, সাধ্য কোথায় কথাসাহিত্যের। সমসাময়িকতাকে এড়ানো অনেকের পক্ষেই মুশকিল। সেটা হয়তোসরাসরি অনেকেই আঁকেন না, তাই সেটা ধরার জন্যও আলাদা চোখের দরকার পড়ে।

শুদ্ধস্বর: এমন একটি ছোটোগল্প সম্পর্কে বলুন যা আপনাকে কাঁদিয়েছে বা আপনার চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

আকমল হোসেন নিপু: এমন করে একটি মাত্র ছোটোগল্প নিয়ে বলা মুশকিল। একেকটি সময়ে একেকটি গল্প ভীষণ তাড়িয়েছে,নাড়িয়েছে। ঘুম ভাঙিয়েছে। জাগিয়েছে। প্রতিটির বিষয়, বিবরণ একেক রকম। জীবনের কত রকমের অর্থ তৈরি হয়, অর্থ তৈরি করেছে।ভাবনাকে ওলটপালট করেছে। এমন কিছু গল্পও আছে, হুট করে নাম মনে আসে না। কিন্তু তার বিষয়বস্তুর রেশটা মনের মধ্যে তাজাইরয়ে গেছে।

শুদ্ধস্বর: আপনার গল্প লিখতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকরণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তেএবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

আকমল হোসেন নিপু: আগে থেকে ভেবেচিন্তে কিছু করি না। খুব পরিকল্পিত কিছু হয়ও না। কোনো পূর্ব-পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যে যতইরং-মশলার জোগান দিই, কেন জানি মনে হয় ওখানে কাঁচা প্রাণের নাড়ি পোঁতা যায় না। ঘামের গন্ধ নেই। বিষয়, চরিত্র যা দাবি করেসেভাবেই, সেই ভাষাই লেখার অবলম্বন। কখনও কিছু হয়, কখনও হয়তো ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। তবু চেষ্টাটা বিষয়-চরিত্র যখন যাদাবি করে, অনেকটা সেভাবেই। যে বিষয় যেরকম রসদের জোগান দেয়, গল্পটা সেরকমই গড়ে ওঠে, বলা যেতে পারে নির্মিত হয়।প্রকরণটাও সেরকমই।

শুদ্ধস্বর: আপনার কাছে একটি সার্থক ছোটোগল্পের মূল উপাদান কী?

আকমল হোসেন নিপু: মানুষ। মানুষের বৈচিত্র্যময়তা, বৈচিত্র্যের যাপন।

শুদ্ধস্বর: লেখকের রাজনৈতিক বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লেখকের কোন ধরনের ভূমিকাথাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

আকমল হোসেন নিপু: লেখক তো সমাজের ভেতরেই বাস করেন। তাকেও দিনের কোনো একটা সময় বাজারের থলি হাতে বাড়ি ফিরতেহয়। জীবনের, সংসারের অনেকগুলো চাহিদা থাকে। তা পূরণ করতে হয়, পূরণের চেষ্টা করতে হয়। আমরা চাই বা না চাই, এসবেরসবকিছুই তো রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত। মানুষের জীবন আঁকতে গেলে, সেই মানুষের রাজনীতিটা জানা-বোঝা দরকার মনে করি।

শুধু অন্যসকল মানুষ কেন, লেখক নিজেও তো সামাজিক, রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয় অনেক অন্যায্যতার শিকার হন। এক্ষেত্রে একজন লেখকহয়তো রাজনৈতিক কর্মীর মতো সড়কে সোচ্চার নাও থাকতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে লেখক তো অস্ত্রও হাতে তুলেনেন। সময়ই আসলে বলে দেয় কী তার ভূমিকা হওয়া দরকার। তবে তার হাতে তো কথা বলার, মত প্রকাশের একটা মাধ্যম আছে। যাঅন্য অনেকের থাকে না। রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্যায্যতার চিত্র, সময়ের শিল্পীত দলিল হতে পারে তার সেই মাধ্যমটি।এভাবে দেখলে তার সার্বক্ষণিক একটা ভূমিকা তো আছেই।

শুদ্ধস্বর: আপনি এখন কী লিখছেন? আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে পাঠকদের জন্য কিছু বলুন!

আকমল হোসেন নিপু: আমি বেশ কিছু বছর ধরেই নানা কারণে লেখালেখিতে নিয়মিত নেই। ঠিক গুছিয়ে সময় বের করতে পারি না।লেখালেখি অনেকখানি শ্রম দাবি করে। সেই ধারাবাহিক শ্রম, মনসংযোগ দেওয়ার মতো সময় বের করা কঠিন হচ্ছে। বিক্ষিপ্তভাবে কিছুগল্প, কবিতা লিখছি (সেগুলো কিছু হয় কিনা, জানি না)। তবে চিন্তা-ভাবনার মধ্যে লেখার অনেক বিষয় আছে, সময়-সুযোগ হলেইহয়তো খাতা-কলমে তার যোগাযোগ তৈরি হবে। বিক্ষিপ্তভাবে পড়ছি, লিখছিÑএই চলছে এখন।#

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!