ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী: ইতিহাস বিচারের আগে যা ভাবতে হবে

Share this:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শত বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পটভূমি-ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনাকে ছাপিয়ে উঠেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা! বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক চিত্র উপহার দেয় না। গত কয়েক দশক ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের অধোগতি বিষয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষকদের রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে ‘রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা’ বলতে যা বোঝানো হয় তা হচ্ছে নগ্নভাবে দলীয় সংশ্লিষ্টতা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে ক্ষমতাসীন দল এবং সরকারের প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রাধীন হয়ে পড়েছে এটা এখন আর কারও কাছেই অস্পষ্ট নয়। এটি ক্রমাগতভাবে এমন এক রূপ নিয়েছে যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় যে আইনীভাবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তা আর মনে হয় না।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে ভয়াবহ অবস্থার মাঝে আছে তার প্রমাণ এই খবরে যে এগুলোর অনেকগুলোতে উপাচার্য নেই, মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘গত দুই বছরে ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে। পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আর পাঁচটির এখনও তদন্ত চলছে’ (ডয়েচে ভেলে,  ১৪ মে ২০২১)। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক কর্মচারীরা ৭৫৩ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছেন। কয়েক বছর আগে আরেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনকে চাঁদা দেওয়া ও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এই ধরনের অভিযোগ এখন নিয়মিত বিষয়। এইসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক-আন্দোলন যাই হোক না কেন কারও কিছু হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থাকে এই পটভূমিকায় বিচার করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে সব আলোচনা হচ্ছে তার কেন্দ্রেই আছে এই অভিযোগ যে, শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে, শিক্ষার্থীদের জীবন-স্বাস্থ্য বিষয়ে উৎসাহের চেয়ে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ থাকার চেষ্টাই প্রধান; এই বিবেচনায়ই চলছে শিক্ষক নিয়োগ থেকে প্রশাসন পরিচালনা। সর্বত্রই দলবাজিই এখনকার বৈশিষ্ট্য।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকিয়ে এটাই মনে হয় যারা এগুলোর নেতৃত্বে আছেন, এইসব বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন, এইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেন তাঁরা এবং শিক্ষকদের এক বড় অংশ বিস্মৃত হয়েছেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা কিভাবে এসেছিল, কেন ও কীভাবে তৈরি করা হয়েছিল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান, তা তাঁদের স্মরণে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে মর্মান্তিক যে, এই প্রতিষ্ঠানের শত বর্ষপূর্তির মাথায় এসে এই প্রশ্ন করতে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ’ বছরের ইতিহাস নিয়ে গর্বের আগে, তার উদযাপনের আগে, স্মরণ করা দরকার আসলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস প্রসঙ্গে কমবেশি সকলেই এটা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন যে, এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্ততি এবং মুক্তিযুদ্ধে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেউ কেউ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার বলে চিহ্নিত করেন; কেউ কেউ একে বাংলাদেশের সব ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুও বলেন। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সিকি শতাব্দীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন ভূমিকা রেখেছে এমন দাবি কেউ করেছেন বলে চোখে পড়েনি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালে যে ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় যার ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের যে ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালে যে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালে যে গণঅভ্যুত্থান তাঁকে বিবেচনায় নিয়ে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সুচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাকে স্মরণ করেই এই কথাগুলো বলা হয়।

কোনও সমাজে কোন বিশ্ববিদ্যালয় কোন সময়ে কী ভূমিকা পালন করবে সেটা ঐ সমাজের তাগিদ দিয়ে নির্ধারিত হবে এটা ঠিক। কিন্ত এর চেয়েও বেশি জরুরি এই প্রশ্ন তোলা যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আদৌ এইসব আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে কিনা? এইসব আন্দোলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে খাটো না করেও এই প্রশ্ন করা জরুরি যে, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আদৌ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এটি কাজ কী না। তদুপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি এই ভূমিকাকে তার গৌরবের বিষয় বলে মনে করে, তার সাফল্য বলে বিবেচনা করে, তবে আমাদের প্রশ্ন করা দরকার যে, এইসব অধ্যায়ে যারা অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন তাঁরা কেন বিশ্ববিদ্যালয়েরর ইতিহাসে আলাদাভাবে উল্লিখিত নন, বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা সম্মানিত হননি। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সালের ইতিহাসের পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সব শিক্ষার্থী দেশের শিক্ষা ও স্বাধিকার আন্দোলনের নেতা হিসেবে কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছেন তাঁদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কি কেবল ইতিহাসবেত্তাদের হাতে অর্পিত হয়েছে? তদুপরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের ভূমিকা কি এক? একই ভাবে কি তা বিবেচিত হওয়া দরকার?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস এবং তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার জন্যে আমাদের স্মরণ করা দরকার পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা কীভাবে আসলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমাজের অন্যান্য শক্তি—ধর্ম এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী; এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ। এই তিনটি দিককে বিবেচনায় রেখেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ’ বছরের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় কী ভাবে তৈরি হল 

ইংরেজিতে ইউনিভার্সিটি শব্দের উৎস হচ্ছে লাতিন শব্দ ‘ইউনিভারসিটাস’, কিন্ত লাতিন শব্দটির অর্থের সঙ্গে গোড়াতে শিক্ষার আদৌ কোনও যোগাযোগ ছিল না—কোনও একটি সংগঠন, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি, গিল্ড, কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সমন্বিতভাবে উল্লেখ করা অর্থে এই শব্দের ব্যবহার হতো। ইউরোপে নগর-ভিত্তিক জীবন প্রসার এবং মধ্যযুগে গিল্ড (অর্থাৎ কারিগর এবং ব্যবসায়ীদের সংগঠন) গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে এই শব্দের সঙ্গে শিক্ষার বিষয় যুক্ত হয়। গিল্ডগুলো স্বশাসিত হতো এবং সেগুলো তাঁদের সদস্যদের যোগ্যতা বিষয়ে স্বীকৃতি দিতে পারতো, যা এই শব্দের বিশেষ অর্থের সূচনা করে। ইউরোপের ইতিহাসে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলতে ইটালির ইউনিভার্সিটি অব বোলোনা’কেই বোঝানো হয়। ১০৮৮ সালে প্রতিষ্ঠার সময়ই একে ইউনিভার্সিটি বলে বর্ণনা করা হয়েছিলো এবং উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। আইন শাস্ত্র শিক্ষার জন্যে এটি গড়ে তোলা হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাকে আমরা ইউনিভার্সিটি বলি তার সূচনা ইউরোপে কিনা সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। মরক্কোর ফেজ শহরে ৮৫৯ সালে ফাতিমা আল-ফিহরি যে মসজিদ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন, যা আল কুয়ারাউইইন বিশ্ববিদ্যালয় বলে এখন পরিচিত, তাকেও অনেকে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় বলে মনে করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত এটি মাদ্রাসা হিসেবে পরিচালিত হতো বলে দাবি করেন ইসলামী শিক্ষার ইতিহাসের গবেষক জর্জ মাকদিসি। আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় বলে এখন যে প্রতিষ্ঠান পরিচিত তার প্রতিষ্ঠা  হয়েছিলো ৯৭০ সালে (মতান্তরে ৯৭৫ সালে) ফাতিমীয় সাম্রাজ্যের সময়ে। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, খৃষ্টান ধর্মের সঙ্গেও শিক্ষার বিস্তার এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার যোগাযোগ আছে। ষষ্ঠ শতক থেকেই ইউরোপে ক্যাথিড্রাল স্কুল ছিলো, সেগুলোর সবই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠেনি; ব্যতিক্রম হচ্ছে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, যার প্রতিষ্ঠাকাল ধরা হয়  ১১৫০ থেকে ১১৭০ সালের মধ্যে। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে, দশম শতক থেকে পূর্ব আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রাসা, যেগুলো ধর্মীয় জ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করতো, সেগুলো বিস্তার লাভ করেছে।

প্রাচীন ভারত, যে ভৌগলিক এলাকাকে এখন আমরা দক্ষিণ এশিয়া বলে চিহ্নিত করি, যেখানে উচ্চ শিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে  ইউরোপের আগে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল ধরা হয় ৪১৩ খৃস্টাব্দে। বিক্রমশিলা ৭৮৩ থেকে ৮২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। তক্ষশিলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় বলে বিবেচিত হতে পারে কিনা সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্ত সেখানে উচ্চমানের জ্ঞানচর্চা হতো এই বিষয় সন্দেহাতীত। রবীন্দ্রনাথ এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভবের কারণ বর্ণনা করে বলেছিলেন “তাদের উদ্ভব ভারতীয় চিত্তের আন্তরিক প্রেরণায়, স্বভাবের অনিবার্য আবেগে। তার পূববর্তীকালে বিদ্যার সাধনা ও শিক্ষা বিচিত্র আকারে ও বিবিধ প্রণালিতে দেশে নানা স্থানে ব্যাপ্ত হয়েছিল, এ কথা সুনিশ্চিত। সমাজের সেই সর্বত্রপরিকীর্ণ সাধনাই পুঞ্জীভূত কেন্দ্রীভূত রূপে এক সময়ে স্থানে স্থানে দেখা দিল” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’)। ভারতে উচ্চ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক এই ধারা পরে আর বহাল থাকেনি।

দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসার বিকাশ ও বিস্তারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১১৯১ সালে আজমিরে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসা। ত্রয়োদশ  এবং চতুর্দশ শতকে দিল্লিতে মুসলিম শাসকরা যেমন ইলতুৎমিশ (শাসনকাল ১২১১-১২৩৬) এবং মুহাম্মদ বিন তুঘলক (শাসনকাল ১৩২৫-১৩৫১) অনেকগুলো মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বিভিন্ন মুসলিম শাসকের আমলে প্রতিষ্ঠিত এই সব মাদ্রাসা উচ্চমানের জ্ঞানচর্চার স্থানে পরিণত হয়েছিলো। এগুলোর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো সরকারি কাজে নিয়োগের জন্যে মানুষদের শিক্ষিত করা। এই সব প্রতিষ্ঠানে সাহিত্য এবং যুক্তিবিদ্যা পড়ানো হলেও ইসলামী জ্ঞান সংরক্ষণ এবং তার বিকাশ ছিল এগুলো প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণ। বাংলা অঞ্চলে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটে ত্রয়োদশ শতকে বখতিয়ার খিলজি’র বাংলা বিজয়ের পরে।

ধর্মের সঙ্গে জ্ঞান চর্চা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার বা মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য নয়; ইউরোপেও আমরা তাই দেখি। উত্তর ইউরোপে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়; প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১১৫০ থেকে ১১৭০-এর মধ্যে। সেখানে ধর্মশাস্ত্র পড়ানো হতো। কিংবা পোপ একাদশ জর্জ-এর অনুমতি নিয়ে ১২২৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব টুলুজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো এই শর্তে যে, সেখানে এথিজম এবং হেরেসি অর্থাৎ নাস্তিকতা বা প্রচলিত ধর্ম-বিরোধিতা শেখানো যাবে না। ধর্মের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বোঝা যায় যখন ষোড়শ শতাব্দীতে প্রটেস্টান্ট সংস্কার এবং তাঁর বিরোধিতার প্রভাব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয় ক্যাথলিক মতবাদকে জোরেসোরে সমর্থন করলো কিংবা প্রোটেস্টান্টদের পক্ষ নিলো। কিন্ত এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সঙ্গে রেনেসাঁ’র প্রভাবের কারণে মানবিক বিদ্যা পাঠের সূচনা হয়। ১৪৯২ সালে নতুন পৃথিবী আবিষ্কার বা উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সূচনা আন্তর্জাতিক বিষয় পাঠের সূচনা হয়, যদিও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ। ধর্মের প্রভাবের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও এসেছে ধর্মানুসারীদের কাছ থেকে। ১৬৯৪ সালে জার্মানির হাল বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্ষেত্রে অগ্রনী, সেটা প্রতিষ্ঠা করে লুথেরানরা। এনলাইটমেন্ট-এর কাল বলে ধরা হয় অষ্টাদশ শতাব্দীকে। তখন একটা বড় পরিবর্তন ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে। এতদিন যেখানে প্রচলিত জ্ঞান সংরক্ষণ এবং তার প্রচার ছিলো প্রধান উদ্দেশ্য সেখানে তাঁর বদলে আসে নতুন জ্ঞান আবিষ্কার এবং তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

আজকের দিনে আমরা যাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলে জানি সেগুলোর সূচনা হচ্ছে কার্যত সপ্তদশ শতকে। এগুলোর ঐতিহ্য হচ্ছে ইউরোপিয়ান। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে, “য়ুরোপীয় ভাষায় যাকে য়ুনিভার্সিটি বলে প্রধানত তার উদ্ভব য়ুরোপে। অর্থাৎ য়ুনিভর্সিটির যে চেহারার সঙ্গে আমাদের আধুনিক পরিচয় এবং যার সঙ্গে আধুনিক শিক্ষিতসমাজের ব্যবহার সেটা সমূলে ও শাখা-প্রশাখায় বিলিতি। আমাদের দেশের অনেক ফলের গাছকে আমরা বিলিতি বিশেষণ দিয়ে থাকি, কিন্তু দিশি গাছের সঙ্গে তাদের কুলগত প্রভেদ থাকলেও প্রকৃতিগত ভেদ নেই। আজ পর্যন্ত আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্বন্ধে সে কথা সম্পূর্ণ বলা চলবে না। তার নামকরণ, তার রূপকরণ, এ দেশের সঙ্গে সংগত নয়; এ দেশের আবহাওয়ায় তার স্বভাবীকরণও ঘটে নি”(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’)।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক এই ধারাবাহিকতায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না থাকার যে ধারা বিংশ শতাব্দীর আগেই গড়ে উঠেছিল তার উত্তরাধিকারী হিসেবেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে  বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব ঘটে, কিন্ত রবীন্দ্রনাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় যে অসম্পূর্ণতা দেখতে পান সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর ব্যতিক্রম ছিলো না।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্র কী ভাবে যুক্ত হল

প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনায় ধর্ম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আমাদের দেখায় যে, কালক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বিযুক্ত হয়েছে। কেবলমাত্র ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও প্রচার তার কাজ থাকেনি। এর একটি কারণ হচ্ছে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অগ্রগতি, আরেকটি হচ্ছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংযুক্তি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইটালি, স্পেন এবং ফ্রান্সে রাষ্ট্র সরাসরি যুক্ত হয় যথাক্রমে ১৮৭০, ১৮৭৬ এবং ১৮৯৬ সালে। রাশিয়ায় মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৭৫৫ সালে, যা ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য লাভ করেছে—১৯১৭ সালের আগেও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠতা সুবিদিত। যুক্তরাষ্ট্রে তার সূচনা হয় ১৭৮৫ সালে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাশের মধ্য দিয়ে এবং ১৭৯৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনায় পাঠদানের মধ্য দিয়ে। এর আগে রাষ্ট্র একেবারে যুক্ত ছিল না তা বলা যাবে না, অতীতে রাষ্ট্রের আনূকুল্যের বিষয় আমরা দেখতে পাই এমনকি আল কুয়ারাউইইন বা আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা থেকেই। কিন্ত রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায়িত্ব নিচ্ছে সেটা অষ্টাদশ শতাব্দীর বিষয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা ও বাস্তবতার সূচনা এইখানেই।

দেশে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর কারণ এবং উদ্দেশ্য হয়েছে ভিন্ন। উপনিবেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরির একটা বড় উদ্দেশ্য ছিল, সেখানে প্রশাসনে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের নেওয়া। উপনিবেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত আছে ১৯০৫ সালের ‘বঙ্গভঙ্গ’। ১৯১১ সালে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়, তারপরে এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যেই ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছিল। যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, কিন্ত যেহেতু রাজনৈতিক বিবেচনাই এর প্রথম দিক ছিল, সেহেতু শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেসব জায়গায় ঔপনিবেশিক শাসনের পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানেও তার মডেল ছিল পশ্চিমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা। কিন্ত লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এক ধরনের রাজনীতির ফসল এবং এর প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের উদ্যোগেই।

যুক্তরাষ্ট্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় অংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কৃষি এবং যন্ত্রকৌশল—এ অ্যান্ড এম—বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। এদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল এমন এক কর্মশক্তি তৈরি করা যারা দেশের অর্থনীতির ভিত্তিগুলোকে সাহায্য করতে পারে। এই সব ক্ষেত্রে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি দরকার তা সরবরাহ করতে পারে। কিন্ত এইসব বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কৃষি এবং যন্ত্রকৌশলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, লিবারেল আর্টসের বিষয়ে সম্প্রসারিত হয়েছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিষয়ে পাঠদান করতে অগ্রনী হয়েছে। সাধারণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বিভিন্ন বিষয়ের সংযুক্তি ঊনবিংশ শতাব্দীর বিষয়; নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সূচনাও সেই সময়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে লিবারেল আর্টস প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি হয়েছে তার কারণ এই মডেল নেয়া হয়েছে বৃটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে —মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা থেকে নয়।

যখন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রাষ্ট্র যুক্ত হলো অর্থাৎ যখন অর্থের যোগান দেবার সিদ্ধান্ত নিলো তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে সে প্রশ্ন উঠলো। কেননা আগে যখন রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রশাসনিক স্বাধীনতা দিয়েছে তখন সে অর্থ যোগান দেয়নি। টুলুস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা তাঁদের রেক্টর বা প্রধান নির্বাচন করতে পারতেন কেননা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র বা চার্চের অর্থ নিত না। কিন্ত এই আলোচনা বেশি দূর অগ্রসর হয়নি কেননা এই বিষয়ের এক ধরনের মীমাংসা আগেই হয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে হামবোল্ডট মডেল। জার্মানির হামবোল্ডট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১০ সালে। সেই সময়েই এই নীতি গৃহীত হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করবে। এটাই হচ্ছে একাডেমিক ফ্রিডমের ভিত্তি। অর্থাৎ রাষ্ট্র অর্থের যোগান দিলেও রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় চালাবে না।

 

একাডেমিক ফ্রিডমের ধারণা এবং তার বিস্তার 

বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ব্যাপারে হামবোল্ডট বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহীত ধারণা, অর্থাৎ এর শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা কোনও রকমের বাধাবিঘ্ন ছাড়া জ্ঞান চর্চা করবে সেটা একেবারে অকস্মাৎ হাজির হয়েছে তা নয়, ১৫৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত নেদারল্যন্ডের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই তার শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ধর্মীয়  এবং রাজনৈতিক বাধা থেকে যথেষ্ট পরিমাণে সুরক্ষা করেছে এবং স্বাধীনতা দিয়ে এসেছে। কিন্ত একটা নীতি হিসেবে এর সূচনা হামবোল্ডট মডেলের পরে। এই মডেল যখন আবির্ভূত হয় তখন সেটাই একমাত্র মডেল ছিল না। এর একটি বিকল্পও ছিল; সেটা হচ্ছে ফরাসি মডেল। ফরাসি মডেল—গ্রান্ড একোল-এর ধারণা তৈরি হয় ফরাসি বিপ্লবের পরে, ১৭৯৪ সালে। এই ধারণার উৎপত্তি হয় সামরিক বাহিনীর জন্যে তৈরি একাডেমি থেকে। এই মডেলের প্রধান দিক ছিল এই যে, পাঠ্যক্রম সরকার নির্ধারণ করবে বা তাতে সরকারের ভূমিকা থাকবে। এই মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূ দিক ছিলো যে তাতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বাধীনতা ছিল না। ফরাসি মডেল অনেক জায়গায় অনুসৃত হলেও ক্রমেই তার আবেদন সীমিত হয়ে আসে।

হামবোল্ডট মডেল হচ্ছে ভিলহেম ভন হাম বোল্ডটের উদ্ভাবন। এই ধারণার উপাদান দুটি—শিক্ষা দেবার স্বাধীনতা (Lehrfreiheit) এবং জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতা (Lernfreiheit)। এই দু’টিকে একত্রে জার্মান ভাষায় বলা হয় Akademische Freiheit  বা একাডেমিক স্বাধীনতা। ১৮১১ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে এর সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন দেখা যায়। ১৯১৫ সালের মধ্যে এই নীতি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গৃহীত হয় এবং চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়। একাডেমিক ফ্রিডমের বিষয়টি খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য বিষয়ে পরিণত হয়নি। অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের অনেক নতুন রাষ্ট্র চেষ্টা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। যে আইনের আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বিষয় ছিল।

আমাদের স্মরণ করা দরকার যে, একাডেমিক ফ্রিডমের দু’টি দিক আছে; একটি হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা; অন্যটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন। প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ছাড়া শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আলাদা করে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। ফলে বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা একাডেমিক ফ্রিডম-এর আলোচনার কেন্দ্রে সব সময় থেকেছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং বিবর্তনের ইতিহাস বলে যে, গত কয়েক শতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার বদল ঘটেছে এবং এই বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক কাজগুলো শনাক্ত হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল প্রচলিত জ্ঞান রক্ষা এবং তার প্রচার করবে না, বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান উৎপাদনের জায়গা। যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং প্রধান কাজ বলে যদি কিছুকে বিবেচনা করতে হয় তবে বলতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষা দেবে এবং সেইসব বিষয়ে গবেষণা করবে। আর এই দুই দিকের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক থাকতে হবে; অর্থাৎ এইগুলো কেবল আত্মতৃপ্তির জন্যে পরিচালনা করলে হবে না। একটি আরেকটি দিকের জন্যে নতুন প্রশ্ন এবং চিন্তার পথ উন্মুক্ত করবে। অর্থাৎ ক্লাসরুমের শিক্ষা এবং গবেষণার কাজ যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়ে। শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে যেন তারা কেবলমাত্র প্রচলিত জ্ঞানই আহরণ না করে, প্রচলিত জ্ঞানের বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, নতুন জ্ঞান উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

নতুন জ্ঞান উৎপাদনের লক্ষ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এমন পরিস্থিতিতে করা সম্ভব নয় যেখানে ঝুঁকি গ্রহণ নিয়ে ভয় আছে, যেখানে প্রচলিত চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব নয়, যেখানে মানুষের মন বদলে দেওয়ার বিষয়কে দেখা হয় এক ধরনের অপরাধ হিসেবে। একাডেমিক ফ্রিডম বা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা ছাড়া এই চর্চা সম্ভব নয়। আর বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার ভিত্তি হচ্ছে—স্বাধীনভাবে শিক্ষা দেওয়া, স্বাধীনভাবে জ্ঞান অর্জন করা। এটা কেবল ক্লাসরুম বা গবেষণাগারের বিষয় নয়। একাডেমিক স্বাধীনতা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ এবং পরিস্থিতি যেন কাউকেই কোনও অবস্থায়ই তাঁর মতপ্রকাশে বাধা না দেয় তার নিশ্চয়তা বিধান করা। সে কোনও ধরনের বাধা—তা রাষ্ট্র কিংবা অন্য শক্তি—যেখান থেকেই আসুক না কেন তার মোকাবেলা করা। এই স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব হচ্ছে তাঁদের যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত। এর ব্যত্যয়ের কোন সুযোগ নেই।

এটা মনে রাখতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেবল চাকুরিপ্রাপ্তির উপায় বা কোনও পেশার জন্যে প্রস্তুতি নয়, এমনকি যেসব বিষয়ের জন্যে পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তার পাশাপাশিও বিশ্ববিদ্যালয় সামগ্রিক বিশ্ববীক্ষা এবং ক্রিটিক্যাল চিন্তার উপায় শিক্ষা দেওয়া একটি অন্যতম কাজ। এই চিন্তাই একজন শিক্ষার্থীকে সমাজের প্রতি সংবেদনশীল করে, সমাজে তাঁর ভূমিকা কী হবে সেই বিষয়ে সচেতন ও সক্রিয় করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ভূমিকা পালনের এটাই হচ্ছে প্রধান পথ। আর সেটা সম্ভব একাডেমিক ফ্রিডম বা বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের এই মাপকাঠিকে বাদ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার কথা আলোচনা করা যাবে না। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে ৫০ বছর পার হয়েছে, ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে; সেই অধ্যাদেশের আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে, কিন্ত এই অধ্যাদেশে যে স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো ছিলো তা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করেছে?

 

শেষ কথা নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন এবং সাফল্যের কথা আলোচনার আগে এটা নিশ্চিত করা দরকার যে আমরা সঠিক মাপকাঠি দিয়েই এর ইতিহাস বিবেচনা করছি। সেই মাপকাঠির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে বৈশ্বিকভাবে কয়েক শতক ধরে। এইসব মাপকাঠিকে ধর্তব্যে না নিয়ে যে উদযাপন তা আত্মতৃপ্তির কিন্ত আত্মসমীক্ষার নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী হোক আত্মসমীক্ষার সময়। কোনও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত পূর্বনির্ধারিত নয়; ভবিষ্যৎ হচ্ছে সচেতন সক্রিয়তার ফসল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপরে দায়িত্ব বর্তেছে সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের।

 

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top