‘দেশের সম্পদ দেশেই রাখুন’ : বিজ্ঞাপনে অসহযোগ আন্দোলন

Share this:

জাতীয়তাবাদ নির্মাণ ও স্মৃতি

জাতীয়তাবাদ তথা যে কোনো পরিচয় (আইডেন্টিটি) নির্মাণকে তিনটা উপায়ে দেখা যেতে পারে, বা দেখা হয়ে থাকে।[1] আমরা এগুলোকে বলতে পারি: আদিমতাবাদ (primordialism), নির্মাণবাদ (constructivism) এবং হাতিয়ারবাদ (Instrumentalism)। তিনটাকে সংক্ষেপে বলা যায় এভাবে, আদিমতাবাদ সামষ্টিক স্মৃতি ও পরিচয়কে রক্ত, আত্মীয়তা, ভাষা, সাধারণ ইতিহাস ইত্যাদির মধ্যকার আদিম বন্ধন হিসেবে দেখে। জাতির মতো পরিচয়কে সে সহজাত ও অন্তর্গত বলে ধরে নেয়। অন্যদিকে নির্মাণবাদ পরিচয়কে যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা কোনো বস্তু হিসেবে না দেখে বরঞ্চ ‘উৎপাদিত’ ও সামাজিকভাবে নির্মিত হিসেবে দেখে। বর্তমানের জরুরত মেটানোর জন্য একটা পছন্দসই অতীত নির্মিত হয়। বেনেডিক্ট এন্ডারসন যেমন করে ছাপার হরফের প্রযুক্তিকে ‘কল্পিত সম্প্রদায়ে’র অন্যতম অনুষঙ্গ মনে করেন।[2] স্মৃতি বা ইতিহাস কেবল পরিবারের সদস্য, দাদা দাদি নানা নানি মুখে এসেই পৌছায় না, বরঞ্চ স্কুল, কলেজ, পত্রিকা, গণমাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমেও এসে পৌছায়। হাতিয়ারবাদ একটু অন্যভাবে এটাকে বিবেচনা করে। সামষ্টিক স্বার্থের জন্য অতীত ‘হাতিয়ারমাত্র’, স্মৃতির ব্যবহার হাতিয়ারসুলভ। অভিজাতরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ও জনসমর্থন আদায়ে ইতিহাস, অতীত, স্মৃতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। আধুনিক জমানার গণমাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে ও গণতন্ত্রের গণ-স্ফুরণের কারণে যে কোনো পরিচয় কীভাবে নির্মিত হচ্ছে সেটার হদিস পেতে উপরোক্ত দুই নাম্বার উপায়কে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বলে ধরে নিতে পারি। তিন নাম্বারের কথা অনেকেই বলতে পারেন, কিন্তু যে জটিল ক্ষমতা-সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে পরিচয়কেন্দ্রিক চিন্তার প্রচার ও প্রসার ঘটে সেটাকে তা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। অন্যদিকে নির্মাণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সেই জটিল সম্পর্ককে বুঝতে সাহায্য করে।

পরিচয়ের পাশাপাশি এটা দিয়ে স্মৃতির রাজনীতিকেও খোলাসা করা যায়। যে কোনো পরিচয় নির্মাণে যুদ্ধ ও সহিংসতার স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সামাজিক পরিচয় যেমন কোনো সহিংস ঘটনার ফসল হতে পারে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ পরিচয় সহিংস ঘটনার জন্ম হতে পারে। যে সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী/জাতির মধ্যে যতবেশি সংঘাতের স্মৃতি ও ইতিহাস বিদ্যমান সেই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যক্তিকে ব্যক্তির চাইতে গোষ্ঠীর পরিচয়ে বিচার করার প্রবণতা বেশি থাকে।[3] তো, আমাদের চারপাশে যে আধিপত্যশীল স্মৃতি বা ইতিহাসের বয়ান পাওয়া যায় তাতে যতটা না জনস্মৃতি (পপুলার মেমরি) থাকে তার চাইতে বেশি থাকে একধরনের সামাজিক ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’; অর্থাৎ, বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানাদির মাধ্যমে সেগুলো লিখিত, রচিত ও পুনরুৎপদিত হয়ে থাকে। এই উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের একটা মাধ্যম হচ্ছে ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে, যা প্রচারিত হয় পত্রিকায়, বিলবোর্ডে, টিভিতে, এবং বর্তমানে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিসরে।

 

বিজ্ঞাপন, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদ 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনে একদিকে ‘বিজয়ের মহিমা’, অন্যদিকে ত্রিশ লক্ষ শহিদের ‘আত্মদান’। একদিকে গৌরবের, অন্যদিকে বেদনার। যে কোনো সহিংস ও সশস্ত্র যুদ্ধের যে ধরনের স্মৃতিচারণ ‘নির্মিত’ হয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণও খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমসমূহে হাজির থাকা সেই সহিংস ঘটনার স্মৃতিচারণের সাথে যেমন একটা নির্দিষ্ট ধরনের জাতি (বা কখনো রাষ্ট্র) নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা পষ্ট থাকে, তেমনি থাকে জাতীয়তাবাদকে হাজির করার নানা কলাকৌশল। কাজলী শেহরিন ইসলাম এই দিকটি তুলে ধরেছিলেন গত পাঁচ দশকে প্রচারিত বিজ্ঞাপন দিয়ে।[4] গত পাঁচ দশকের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবসে (স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস) প্রচারিত বিজ্ঞাপনে জাতীয়তাবাদের ব্যবহার ও রাজনৈতিক বন্দোবোস্ত পরিবর্তনের সাথে সাথে বিজ্ঞাপনের ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন।

কাজলী ডিসকোর্স বিশ্লেষণ- সহজভাবে বললে, ভাষার সাথে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে ছবি বা টেক্সট এর ভাষার পরীক্ষণ- এর মাধ্যমে এই পাঁচ দশকের (১৯৭২, ১৯৭৮, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৮, ২০১৮) বিজ্ঞাপনকে কাটাছেড়া করেছেন। বাহাত্তরে তো একাত্তরের স্মৃতি সতেজ, টাটকা। সবেমাত্র নতুন রাষ্ট্র/দেশ প্রাপ্তির উদযাপন ও নতুন যুগের পত্তন- এইটাই বিজ্ঞাপনের মূল ভাষা। এমতাবস্থায় নিঃসন্দেহে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তাও ছিল তুঙ্গে; বিজ্ঞাপনে তাঁর ছবি, বিখ্যাত ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাক্যের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানপ্রদর্শন, যুদ্ধ, বিজয় এবং দেশ গঠন এইসবই ছিল বাহাত্তরের বিজ্ঞাপনের প্রধান বিষয়বস্তু। বিজ্ঞাপনে কোম্পানির নাম থাকলেও কে কোন ধরনের পণ্য বেচনেওয়ালা সে বিষয়ে ইশারা-ইঙ্গিত কম ছিল। অন্যদিকে আটাত্তর আসতে আসতে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিরাট পটপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। শেখ মুজিবের সপরিবারে নিহত হওয়া এবং সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতারোহন বাহাত্তর থেকে বেশ ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈয়ার করে। ফলে বাহাত্তরের বিজ্ঞাপনে যেখানে শেখ মুজিবের প্রবল উপস্থিতি ছিল আটাত্তরে এসে সেখানে বিভিন্নভাবে সেনাবাহিনীর ভূমিকার দিকে আলো ফেলা হয়। যুদ্ধের শহিদদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতি গঠন ইত্যাদির দিকে মনযোগ দেয়া হয়। যুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু লড়াই চলছে, কাজলীর মতে, এটাই ছিল সে জমানার বিজ্ঞাপনের প্রধান ভাষা। ১৯৮৮ সালেও সেনাবাহিনী ক্ষমতায় ছিল; হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায়। ‘জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া’ এইটা ছিল তৎকালের বিজ্ঞাপনের প্রধান প্রবণতা। দুটো সামরিক আমলেই বিজ্ঞাপনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পোন্নয়ন প্রধান অগ্রাধিকার পেয়েছিল। শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার আদলে বলা হয়েছিল ‘স্বাধীনতা তুমি শিল্পায়নের সুদৃঢ় অঙ্গীকার’। কাজলী এই সময়ের আরেকটা পর্যবেক্ষণ দিচ্ছেন যে, পূর্বে যেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ দিবসে কোম্পানির ব্রাণ্ডিং করার চল ছিল, এই সময়ে সেটা পণ্যের প্রচারণার দিকে সরে যায়।

এরপরের দশকে আরো বড়ো পটপরিবর্তন ঘটে। একদিকে, গনঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সেনাশাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের দশক শুরু হয়। ১৯৯৮ আসতে আসতে গণতন্ত্রের সেই পথচলাতেও ক্ষমতাবদল হয়ে গিয়েছে দুবার। অন্যদিকে, এই সময়ে মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী: যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলন ও গণআদালত। এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মাথায় রাখলে বোঝা যাবে কেন এই সময়ের বিজ্ঞাপনের প্রধান বিষয়বস্তু, কাজলীর মতে, ‘চেতনার জন্ম’। আগে বিজ্ঞাপনে যেখানে স্মৃতিচারণ, শহিদদের স্মরণ এবং মুক্তিযুদ্ধ বা আত্মত্যাগের সাথে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নের সম্পর্ক হাজির থাকত, সেখানে এইবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যুদ্ধের গৌরব ও স্বাধীনতার মূল্যবোধ হাজির হওয়া শুরু করলো। এই ‘চেতনা’র সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। ফলে সে সময়ে ‘যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে তাদের বদলা নেব’ ইত্যাদি ধরনের পোস্টারও নির্মিত হতে থাকে। আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় আসার সাথে বিজ্ঞাপনে এই ‘চেতনা’র জন্ম জড়িত তা তো অনুমেয়। ২০০৮ এ যখন আওয়ামীলীগ আসে তখন একইভাবে এই ‘চেতনা’র আরো প্রকটরূপ খেয়াল করা যায়; ১৯৯৮ সালের দিকে তখনো ‘চেতনা’র বিদ্যমান প্রবল রাজনীতিকরণ দেখা যায়নি।

২০০৮ সালে এসে, কাজলীর মতে, দেখা দেয় ‘কর্পোরেট জাতীয়তাবাদ’। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে পণ্যের সাথে ‘চেতনা’ ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন উপাদানকে মিশিয়ে প্রদর্শন ও বিক্রিবাট্টা শুরু করলো সেটা আগের দশকে লক্ষ করা যায়নি। যেমন গ্রামীনফোন সিম বের করলো, নাম দিলো ‘অমর সিম’; তার শ্লোগান: ‘স্বাধীনতা অমর-প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে’। আরেকটি প্রবণতা দেখা যায়; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিরাও (মানে, আওয়ামীলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা) স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। ভোগকে দেশপ্রেমীয় ও রাজনৈতিক চর্চাতে রূপান্তর করাটা এই সময়ের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ালো। পণ্যের প্রচারণার সাথে মিশে গেলো দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, শহিদ ও বিজয় নিয়ে আবেগী বক্তব্য। এই সময়ে কেবল পণ্য বিক্রিবাট্টাতে সীমাবদ্ধ না থেকে টেলিকম কোম্পানি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রকল্পকেও মাঠে নামানো শুরু করে। ফলে বিষয়টা কেবল দেশপ্রেম বা স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে পণ্য বেচাতেই সীমাবদ্ধ রইলো না, বরঞ্চ খোদ কোম্পানিটাই যে দেশপ্রেমিক (এখানে ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি’ পড়ুন) সেটাও বোঝানো গেলো। ২০১৮ সালেও ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ। এর মধ্যেও আসলে শাহবাগ আন্দোলনের মতন বিরাট ঘটনা ঘটে গিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। তন্মধ্যে দুটো হচ্ছে, এই ঘটনা একদিকে এখানকার সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে যে বিভাজন ছিল সেটাকে একেবারে ঠেলে দুই মেরুতে নিয়ে যায়, বা কারো মতে, অস্পষ্ট বিভাজনকে স্পষ্ট করে তুলে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধকে একেবারে আওয়ামীবয়ানের পদতলে সমর্পণ করে দেয়। ফলস্বরূপ এই সময়ের বিজ্ঞাপনে, কাজলীর মতে, ‘স্মৃতির রাজনীতির ব্যক্তিকরণ’ ঘটে’। অর্থাৎ, এখানে স্মৃতিসৌধ, পতাকা, গান কবিতার পাশাপাশি শেখ মুজিবের উপস্থিতি ছিল প্রবল; তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, শেখ মুজিবের পাশাপাশি এইবার বিদ্যমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও হাজির হন বিজয় ও স্বাধীনতার দিবসের বিজ্ঞাপনে। মূল বয়ান হচ্ছে- যে দেশ শেখ মুজিব এনে দিয়েছেন, সেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা।

 

বিজ্ঞাপনে অসহযোগ আন্দোলন ও জাতীয়তাবোধ 

সংক্ষেপে কাজলীর এই প্রবন্ধ থেকে যা বোঝা গেলো, এখানকার বিজ্ঞাপনে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রধান উপাদানকে নিয়মিত ব্যবহার করলেও ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেইসব উপাদানের বয়ান ও হাজিরার ধরনে পরিবর্তন ঘটে। জাতীয়তাবাদী কিছু উপাদান নির্দিষ্ট থাকলে জাতীয়তাবাদী বয়ানে বেশ বড়সড়ো পরিবর্তন ঘটছে। স্রেফ কোম্পানির ব্রাণ্ডিং বা পণ্যের প্রচার থেকে শুরু করে খোদ প্রতিষ্ঠানকেই ‘দেশপ্রেমিক’ হিসেবে হাজির করার প্রচেষ্টাও এতে আছে। কাজলী কাজ শুরু করেছেন বাহাত্তর থেকে। তিনি যে ঘটনার উপস্থিতি, মানে একাত্তরকে, পাঁচ দশকের বিজ্ঞাপনে কাটাছেড়া করেছেন, আমি সেই সময়ের বিজ্ঞাপনকে দেখতে আগ্রহী। মানে উপর্যুক্ত আলাপ হচ্ছে একাত্তর-পরবর্তী কাল নিয়, কিন্তু কেন্দ্রে হচ্ছে একাত্তরের উপস্থাপন। আমি বরঞ্চ কাল হিসেবে একাত্তরকেই নেব। বিশেষ করে, একাত্তরের যে সময়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভূতপূর্ব এক অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আমি সেই মার্চে প্রকাশিত কিছু বিজ্ঞাপনের দিকে তাকাব; উদ্দেশ্য হচ্ছে কীভাবে সেই আন্দোলনের মূহূর্তে ‘বাঙালি’ পরিচয় ও জাতিবোধ পণ্য প্রচারণা বা কোম্পানির ব্রাণ্ডিং এর অংশ হচ্ছে সেটা তুলে ধরা। পাশাপাশি কোন ‘বাঙালি’ পরিচয়টা মূলধারা হয়েছিল, মানে তৎকালীর ধনিক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী লুফে নিয়েছিল, সেটাও তুলে ধরব। যে কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলাপ শুরু করার আগে সেই ঘটনা সম্পর্কে দুয়েক কথা হাজির করাটাই রেওয়াজ; মার্চের সেই অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে চর্বিতচর্বন দুটো কথা বলে নেই।

একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন যে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় তা মোটামুটি দেশ বা বিদেশের সবাই মেনে নেন। পাকিস্তান আমলের পঁচিশ বছরের জমানো ক্ষোভ এই ভূখণ্ডের মানুষ নানান সময়ে নানা তরিকায় প্রকাশ করে থাকলেও একাত্তরের মার্চ মাসের এক তারিখ থেকে যা ঘটেছিল তাকে সেই ক্ষোভের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। কার্যত, সেদিনের পর থেকে, অন্তত এই ভূখণ্ডে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের কবর সূচনা হয়েছিল। যদিও তখনো নামে পাকিস্তান-রাষ্ট্র ছিল, কিন্তু একটা রাষ্ট্র যে ধরনের প্রতীকী ব্যবস্থা কায়েম করে, যেমন পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ইত্যাদি, সেগুলোর বিরুদ্ধে যাবতীয় ক্ষোভ-প্রদর্শন ও বিকল্প প্রতীকী ব্যবস্থা কায়েম তা সেই পঁচিশ দিনের মধ্যেই ঘটে গিয়েছিল। এবং সেটা হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্ত গণ আন্দোলনের মাধ্যমে, প্রধানত অহিংস-পন্থায়, অর্থাৎ যাকে ইংরেজি বলা হয় নন-ভায়োলেন্ট সিভিল রেসিস্টেন্স। আইয়ুবের স্বৈরশাসন, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, ইয়াহিয়ার আগমন, সত্তরের ঘূর্ণিঝড়, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিশাল বিজয়, ক্ষমতা হস্তান্তরের টানাপোড়ন- এই ধারাবাহিকতায় আলোচ্য মার্চের আগমন ঘটে। ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। ঘোষণার পরপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তরফ থেকে প্রশাসনিক উঁচু পদসমূহে নানা প্রকার রদবদল শুরু করা হয়। অন্যদিকে ঘোষণার পরপর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অন্য ঘটনার শুরু হয়: ‘পরিষদ অধিবেশনের বাতিলের কথা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর সকল মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে, বস্তুত ঢাকা শহর একটি মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়… এ সময়ে সংগ্রামী জনতার কাফেলা চারদিক হতে বায়তুল মোকাররম ও জিন্নাহ এভিনিউর দিকে আসতে শুরু করে।… বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁধভাঙ্গা জলরাশির ন্যায় চারিদিক থেকে শ্লোগান দিতে দিতে শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করতে করতে থাকে।…’ [5]

১৯৭২ সালের লিখিত একটি প্রবন্ধে জিল্লুর আর খান এই প্রতিক্রিয়াকে বলেছিলেন ‘তাৎক্ষণিক’, ‘তীব্র’ এবং ‘স্বতঃস্ফূর্ত’;[6] মার্চের দুই তারিখ দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত সংবাদই এই তিনটা বিশেষণের উপস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছে। মার্চের ১ তারিখ সংগ্রামী জনতার যে ‘কাফেলা’ রাস্তায় নেমে এসেছিল সেই কাফেলায় ডানপন্থী, বামপন্থীসহ সবাই যোগ দিয়েছিল। এমনকি জামায়াতে ইসলামী, যে দল কিনা আরো কিছু দিন পরেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার সহযোগী হয়ে উঠবে, তারাও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছিল। রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, সবাই যে যার মতো করে সামষ্টিকভাবে আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন। সে সময়ের রাস্তার শ্লোগান এবং রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের লিফলেট ইত্যাদি সাক্ষ্য দিচ্ছে, দাবি আর ‘স্বায়ত্তশাসনে’ আটকে নেই, বরঞ্চ ‘স্বাধীনতা’ই একমাত্র দাবি। নেতৃত্ব-স্থানীয়দের বক্তৃতা-বিবৃতিতে অধিবেশন স্থগিতকরণ এবং, পরবর্তীকালে, বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া বৈঠকের দিকে আলো থাকলেও রাস্তার আন্দোলন বরঞ্চ আরো সরাসরি [ডিরেক্ট], আরো স্বতঃস্ফূর্ত। দুই মার্চেই ছাত্ররা ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠন করে’ ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চালু এবং গণতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলে।[7] জিল্লুর আর খান মার্চের ৩-৬ তারিখের মধ্যে কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, অধিকাংশই তখন সরাসরি স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মত ছিল, ছয়-দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েও এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যাবেনা, দরকার পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা। এটাও উল্লেখ করে রাখি, যারা অহিংস ধারার আন্দোলন নিয়ে কাজ করেন তারা মার্চের এই ঘটনাপ্রবাহকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। সন্দেহ নেই, পৃথিবীর যে কোনো মুক্তির সংগ্রামে সাধারণত সশস্ত্র বা সহিংস আন্দোলন আলাপের কেন্দ্রে যে কেবল অবস্থান করে তা-ই নয়, বরঞ্চ আধুনিক রাষ্ট্রীয় জীবনের স্মৃতিতে ও সৌধে সহিংস আন্দোলনের মহাত্মকেই প্রকাশ করা হয়ে থাকে। সহিংস আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা রাষ্ট্রে নায়ক হিসাবে আবির্ভূত হন। নাগরিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের জীবনাচারে সেই নায়ক ও সহিংস ঘটনার স্মৃতি বারেবারে জীবিত হয়ে ফিরে আসে। রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার পর সামরিক শৌর্য-বীর্য জাতীয়তাবাদের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠে। কিন্তু যারা আন্দোলনে জনসাধারণের অহিংস ধারার সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করেন তারা পরিচয় নির্মাণে ও জাতিগঠনে অহিংস ধারার আন্দোলন ও পদ্ধতিকে আমলে নেয়ার কথা বলেন। অহিংস-পন্থার প্রতিরোধ ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করে, ফলে এটা জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। একইভাবে ইশতিয়াক হোসেন বাংলাদেশের ইতিহাসে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনকে আলোচনা করেন।[8] তার মতে, ভাষা আন্দোলন ছিল অহিংস-ধারার নাগরিক আন্দোলন। আন্দোলনের পদ্ধতি, মিছিল, সমাবেশ, লিফলেট, দশ জন দশজন করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ এইসবই অহিংস পদ্ধতিরই স্মারক। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে সামগ্রিক পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তান আমল জুড়ে বিভিন্ন আন্দোলনে বারেবারে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন ফিরে ফিরে এসেছে। তখন এই ঘটনাই পরবর্তী আন্দোলনের পদ্ধতি নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এমনকি, ১৯৭১ সালের মার্চে যে অসহযোগ আন্দোলনে যে অহিংস-ধারার পদ্ধতিগুলো নেয়া হয়েছিল সেখানেও এই সামগ্রিক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা লক্ষণীয়।

অসহযোগ আন্দোলনের ২৫ দিনে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের জন্য আমি দৈনিক ইত্তেফাক, মর্নিং নিউজ, আজাদ পাকিস্তান অবজার্ভার দেখেছি। প্রায় ৫৭টি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত/প্রচারিত হয়েছে। বিজ্ঞাপন আরো বেশি প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু আমরা কেবল সেগুলো নিয়েছি যেগুলোতে আসলে তৎকালীন আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপস্থিতি ছিল। বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে ৫৬ শতাংশ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (যেমন ব্যাঙ্ক বা বীমা), ১৯ শতাংশ হচ্ছে বিভিন্ন শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রির এবং বাকিগুলো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কর্পোরেশনের। আন্দোলন মার্চের এক তারিখ থেকে শুরু হলেও বিজ্ঞাপনে আন্দোলোনের প্রভাব পাওয়া যায় মাসের প্রথম দশদিনের পর। ১১ তারিখে যুগান্তরে দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক লিমিটেড এর বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। সেখানে কোনো ধরনের নকশা বা চিত্রের ব্যবহার ছিল না। ছোট করে প্রকাশিত সেই বিজ্ঞাপনে মোটা হরফে স্পষ্ট করে লেখা ছিল: ‘দেশের সম্পদ দেশেই রাখুন।’ এর ঠিক নিচের লাইনে তুলনামূলভাবে ছোট হরফে লেখা: বাংলার স্বাধিকার অর্জনের পথে সাহায্যকারী একমাত্র ব্যাঙ্ক-’। এরপর যত দিন গড়িয়েছে বিজ্ঞাপনের ভাষায় পরিবর্তন এসেছে। মার্চের মাঝামাঝির পর প্রায় সকল বিজ্ঞাপনেই বিভিন্নভাবে ঘুরেফিরে আন্দোলন ও সম্ভাব্য স্বায়ত্তশাসন অথবা স্বাধিকারপ্রাপ্তি ঘুরেফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনের লেখা দেশাত্মবোধক গান/কবিতা বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে। আর্থিক বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিজ্ঞাপনের চেয়ে কেবল ব্রাণ্ডিংটাই ছিল প্রধান প্রবনতা। কোনো ধরনের পণ্যের নাম ব্যবহার না করে পোস্টারে কেবল কবিতা/গান/শ্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে, নিচে কোম্পানি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপনের ভাষাতে কিছু সাধারণ বিষয়বস্তুর উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। প্রধান যে বিষয়বস্তু, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে, প্রায় সকল বিজ্ঞাপনে ছিল সেটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে মুসলিম ইনসিওরেন্স কোং লিঃ এর বিজ্ঞাপনে: ‘বাঙলার ধন বাঙলায়…’। বিজ্ঞাপনের বক্তব্য হচ্ছে: ‘মুসলিম বাঙলাদেশের আদি বীমাপ্রতিষ্ঠান। বাঙলার সেবাই মুসলিমের মূল লক্ষ্য। বাঙলার মূলধন ও লভ্যাংশই মুসলিমের পবিত্র পুঁজি। বাঙলার ধন বাঙলায়: এই মুসলিমের মূল বক্তব্য’। এই বক্তব্য আরো স্পষ্টভাবে হাজির হয়েছিল রোক্সানা ইন্ডাস্ট্রিজ এবং সানসাইন সোপ এন্ড কেমিক্যাল কোম্পানির বিজ্ঞাপন-দ্বয়ে; তাদের বক্তব্য প্রায় একই ছিল। যথাক্রমে ‘বাংলা দেশের সম্পদ বাংলা দেশেই রাখুন’ ও ‘বাঙলা দেশের অর্থ বাংলা দেশেই রাখুন’। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থ দেশে রাখার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ‘দেশীয় পণ্য ব্যবহার’ করার আর্তিও জানিয়েছে। বাঙলার ধন বাঙলায় রাখার খায়েশটাও তৎকালের রাজনীতির প্রধানতম অর্থনৈতিক দাবি হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলামসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অর্থনীতিবিদরা ‘দুই অর্থনীতি’ নামে যে অর্থনৈতিক তত্ত্ব হাজির করেছিলেন, সেটাই রচনা করেছিল ছয়দফার অর্থনৈতিক ভিত্তি। সে তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা নুরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ‘দুই অর্থনীতির তত্ত্বের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চিন্তার সূত্রপাত হয়, কীভাবে সে অঞ্চলের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা করা যায় এবং অর্থনীতির শ্লথ প্রবৃদ্ধির চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।’[9] পাকিস্তানি যে আদতে দুই অর্থনীতি চলছে এই ধারণার সূত্রপাত ১৯৫৬ সালের দিকে। একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে আসার পূর্বে এই তত্ত্ব বেশকতক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক যাত্রা সম্পন্ন করে ফেলেছে। সে পথচলার একেবারে চূড়ার বিন্দুতে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়িক বা ধনিক বা বুর্জোয়া গোষ্ঠী তাঁদের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দারুণ সংক্ষেপিত ভাবে বাঙলার ধন বাঙলায় রাখার ঘোষণা করছেন। এই ধরনের ভাষা মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপনেও দেখা যায়। ‘একটি পবিত্র আমানত’ শিরোনামের বিজ্ঞাপনের ভেতরের টেক্সট হচ্ছে: ‘…এর পূর্বাঞ্চলের যাবতীয় সম্পদ বাঙলাদেশের মধ্যেই সুনিয়ন্ত্রিত।’ ইস্টার্ণ ফেডারেল ইউনিয়ন ইনসিওরেন্স কোম্পানি তাদের বিজ্ঞাপনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়াকে একসূত্রে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছে। মূল টেক্সট বলছে, ‘বাঙলা দেশের মানুষের নিরাপত্তাশীল ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে বাঙলার সম্পদ বাঙলা দেশের সেবায় আমরা নিয়োগ করে আসছি’। শিরোনামে বোল্ড করে খোদাই করা হয়েছে শেখ মুজিবের উক্তি: ‘বাঙলাকে অবশ্যই বাঙলার ভাগ্য নিয়ন্তা হতে হবে’। মূলভাব এমন যে, বাংলাকে যদি নিজেদের ভাগ্য নিয়ন্তা হতে হয় তাহলে দেশের সম্পদ বা পুঁজি দেশেই রাখতে হবে।

 

এই বিষয়বস্তুর প্রায় সমান্তরালে এসেছে স্বাধীকারের ঘোষণা। স্বাধীকারের প্রসঙ্গ এসেছে জনগণের ‘চেতনা’র হাজিরা হিসেবে। অর্থাৎ, অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ যে প্রতিবাদী চেতনা দেখিয়ে যাচ্ছেন সেটা ‘নতুন চেতনা’ এবং ‘স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার চেতনা’। ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক স্পষ্টভাবে বলেছে, ‘বাঙলাদেশ আজ এক নতুন চেতনায় উদ্বেলিত। এ চেতনা নিজেকে নতুন করে জানার চেতনা। স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার চেতনা।’ তাদের বিজ্ঞাপনে দুটো ছবি পাশাপাশি, একদিকে একজন কৃষকের উর্ধ্বে তুলে ধরা মুষ্টিবদ্ধ হাত, অন্যদিকে মিছিলরত জনতার ছবি। পাশে বড়ো করে লেখা ‘একটি চেতনা একটি প্রত্যয়’। ইস্টার্ণ ব্যাংকিং কর্পোরেশন তাদের বিজ্ঞাপনের বড়ো করে লিখেছে শেখ মুজিবের উদ্ধৃতি, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। মূল টেক্সটে লেখা আছে: ‘বাংলা দেশের মানুষ আজ নতুন করে আবিষ্কার করেছে নিজের দেশকে। আবিষ্কার করেছে নিজেকে। পরিচয়ের প্রথম প্রহরেই তাই বাংলার মানুষের কণ্ঠে রক্ত নিনাদ ঘোষণা – স্বাধীকার’। এখানে যে পরিচয়ের কথা বলা হচ্ছে সেই পরিচয় হচ্ছে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নিজের দেশকে ‘আবিষ্কার’ করার মাধ্যমে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকাঠামোর মতাদর্শিক জগত থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় খোঁজার যে তাড়না ছিল তৎকালে, তার খোল্লামখোলা বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই বিজ্ঞাপনের ভাষায়। নিজেদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতার মাধ্যমেই যেন এই দেশ ও দশের বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠা। এশিয়াটিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবিওয়ালা বিজ্ঞাপনে এই পরিচয়কে অধিকারের সাথে জড়িয়ে তুলে ধরেছে: ‘আত্মপরিচয় আমাদের জন্মগত অধিকার’। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের বিজ্ঞাপনের কথা। বক্তব্যমূলক সে বিজ্ঞাপনে সরাসরি দেশের সম্পদ দেশের রাখার কথা বলার পাশাপাশি নিজেদেরকে ‘বাংলার স্বাধিকার অর্জনের পথে’ সাহায্যকারী ব্যাংক হিসেবে ঘোষণা করেছে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সমবায় ব্যাঙ্ক লিমিটেড বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছে: ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বাধিকার দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করি’।

 

অধিকার আদায়ের এই সংগ্রাম যেন বিষ্ময় তৈরি করছে। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাঙ্ক লিমিটেড একটি মিছিলরত জনতার ছবির নিচে উদ্ধৃত করেছে সুকান্তের কবিতা: সাবাশ বাংলাদেশ/ এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার। তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ফার্মাপাক একইভাবে উচ্চকিত বিস্ময় প্রকাশ করেছে; অভিনন্দন জানিয়েছে ‘সাড়ে সাত কোটী বাঙালীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে’। হাবিব ব্যাঙ্ক জনগণের এই জেগে ওঠাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে: ‘যে জাতি অধিকার আদায়ের সংগ্রামে রক্ত পিচ্ছিল পথে এগিয়ে চলেছে আমরা তাদেরই সেবায় উৎসর্গীকৃত’। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড স্বাধিকার আন্দলনের ‘সাফল্য কামনা’র পাশাপাশি এই ‘স্বাধিকার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন’ তাদের ‘আত্মার কল্যাণ কামনা’ করেছে। পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানি লিমিটেড মিছিলরত জনতার কয়েকটি ছবির নিচে লিখেছে: ‘সব প্রেরণার মাঝেই নিহিত রয়েছে এক একটি বিরাট সম্ভাবনা’। নাভানা মিলনার্স এক দীর্ঘ বিজ্ঞাপনের শেষে এই জাগ্রত জনগণের মাঝে প্রেরণা খুঁজে পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে: ‘জাগ্রত জনতার শক্তি আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে নতুন প্রেরণায়। জয় জনতার জয়। জয় বাংলার জয়।’ জনগণের জোয়ারকে কোনো বিজ্ঞাপন ‘নতুন সূর্য’ বলে প্রচার করেছে, কোনো বিজ্ঞাপন বলেছে ‘নব প্রভাত ছটা…’। যেমন জুট মিল কেবল একটি সূর্যদোয়ের ছবি দিয়ে মোটা হরফে লিখেছে: ‘ঐ পোহাইল তিমির রাত্রি পূর্ব গগণে দেখা দিল নব প্রভাতে ছটা…’। হাবিব ব্যাঙ্ক বাংলাদেশের মানচিত্র ওপর সূর্যোদয়ের ছবির পাশে লিখেছে: ‘কোটী প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে/নূতন সূর্য ওঠার এই তো সময়’। এলিট কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ বিজ্ঞাপনে লিখেছে: ‘রক্তে আনো লাল/রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে ছিড়ে আনো ফুটন্ত সকাল/উদ্ধত প্রাণের বেগে উন্মুখর আমার এ দেশ/ আমার বিধ্বস্ত প্রাণে দৃঢ়তার এসেছে নির্দেশ’। উল্লেখ্য, বিজ্ঞাপনে ‘স্বাধীকার’ থাকলেও ‘স্বাধীনতা’র উপস্থিতি নাই বললেই চলে।

 

যে কারণে এতো সংগ্রাম, জনগণের ‘জেগে ওঠা’ সেই লাঞ্চনা-বঞ্চনা-বৈষম্য-না পাওয়ার বেদনা এগুলো ক্ষণে ক্ষণে এসেছে বিজ্ঞাপনে। কখনো বিখ্যাত কোনো কবির জবানে, কখনোবা সহজ-সরল বক্তব্যে। বাংলা মায়ের চেহারা যে মলিন হয়েছে, দীর্ঘদিন শোষিত হয়েছে, লাঞ্চনার শিকার হয়েছে এবার সময় এসেছে সবকিছুর জবাব ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। উপরোক্ত দুই অর্থনীতি, ছয় দফাসহ তৎকালের যাবতীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার পটভূমি হিসেবে সক্রিয় ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের ছবি। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তো ঘোষণা দিয়েছেই, এমনকি এই বৈষম্যকে খোদ পাকিস্তানের অনেক বিশ্লেষক ‘ঔপনিবেশিক’ বলে রায় দিয়েছেন।[10] ষাটের দশকে বাঙালির যে জাতীয়তাবোধ তৈরি হয়েছিল তার পিছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন যেমন ভূমিকা পালন করেছে তেমনি এই বঞ্চনাবোধও সমানভাবে কার্যকর ছিল।[11] বৈষম্য-বোধ বা বঞ্চনাবোধ কতটা প্রবল ছিল তার একটা আন্দাজ পাওয়া যেতে পারে ‘সোনার বাংলা শশ্মান কেন’ পোস্টারে। এই পোস্টারে বিভিন্ন খাতে পাকিস্তানের দুই অংশের বিবরণ উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ, বাঙালি যে নিপীড়ন, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, তা ছিল সে সময়ের শক্তিশালী ভাবনা। বিজ্ঞাপনেও এই ভাবনার হাজিরা তাই স্বাভাবিক। নাভানা মিলনার্স একেবারে সরাসরিই সেই বক্তব্য পেশ করছে তাদের বিজ্ঞাপনে: ‘আঘাতে আঘাতে জর্জরিত আমার সোনার বাংলা দেশ। আঘাত এসেছে বাংলা ভাষার উপর। এসেছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ আর শিল্পের উপর। কিন্তু, রক্তাক্ত দেহে বাংলার বীর জনতা প্রতিহত করেছে সব আঘাত…’। জুট ট্রেডিং কর্পোরেশন বিজ্ঞাপনে সেই ‘হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি’কে তুলে ধরেছে: ‘সোনার বাংলা, সবুজ ক্ষেত, সোনালী আশ, কিষাণের হাসি… সব যেন হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি’। পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন তাদের বিজ্ঞাপনে মোটা হরফে ‘সোনার বাংলা’ লিখে মূল টেক্সটে সেই বঞ্চনার কথা বলেছে: ‘গোলাভরা ধান পুকুর মাছ আজ কল্পকথা মাত্র। দারিদ্র্য ও ক্ষুধার গ্লানি ও কালিমায় বাংলা আজ বিবর্ণ, মলিন’। ইউনাইটেড ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে সেই প্রশ্ন ছিল: ‘কেন গো মা তোর ধুলায় আসন, কেন গো মা তোর মলিন বেশ?’ পাকিস্তান ন্যাশনাল অয়েলস বিজ্ঞাপনে ‘বাঙলার সোনালী দিনগুলো ফিরিয়ে’ আনার কথা বলেছে। শোষণ ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতার সাথে এই ‘সোনার বাংলা’ ধারণার সম্পর্ক ওতপ্রোত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যাতাকলে নিষ্পেষিত বাঙালির চিন্তায় এই ‘সোনার বাংলা’ ধারণা চাউর হয়েছিল। এটা হারিয়ে যাওয়া এক উর্বরকালকে ইঙ্গিত প্রদান করে। ১৮৬২ সালে প্রকাশিত হুতোম প্যাঁচার নকশায় বলা হয়েছে, ‘হ্যানো সোনার বাংলা খান, পুড়ালো নীল হনুমান’। নীল বিদ্রোহের লোকগীতির একটি চরণেও পাওয়া যায়, ‘নীল বাঁদরে সোনার বাংলা করলে ছারখার’। রবীঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ও লেখা হয়েছিল এক বিদ্রোহের কালে।[12] পাকিস্তান জমানায় ঔপনিবেশিক কায়দায় শোষিত হওয়ার অভিজ্ঞতা ও বঞ্চনাবোধ ‘সোনার বাংলা’কে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক রেটরিকে রূপান্তরিত করেছিল। কিন্তু মার্চের এই জাগরণ যেন আবারো সোনালী দিন নিয়ে আসার অঙ্গীকার। যে স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছিল, ‘বাংলা দেশের জনতার জাগরণ দেখলে মনে হয় আমরা ফিরে পেয়েছি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সত্তা’। এই ‘পচা অতীত’কে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রিমিয়ার ইন্সুরেন্স কোম্পানি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা উদ্ধৃত করছে : ‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত/ গিরি-গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত।’ যে বিবর্ণ, শুষ্ক ও মলিন চেহারা হয়েছে বাঙালির, সেখানে হাসি ফুটানোই যেন এই আন্দোলনের ব্রত, অঙ্গীকার। মুনলাইট সিলক মিলস রীতিমতো হুঙ্কার ছাড়ছে শত্রুর প্রতি, ‘বন্ধু, তোমার ছাড় উদ্বেগ, সুতীক্ষ্ণ কর চিত্ত/ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি, বুঝে নিক দুবৃত্ত’। এই দুর্বৃত্ত কে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা না হলেও তৎকালে পরিস্থিতিতে দুর্বৃত্তের পরিচয় পাওয়া আমাদের জন্য দুষ্কর নয়।

 

অনেকগুলো বিজ্ঞাপনে এমন কোনো বক্তব্য হাজির না করে বরঞ্চ দেশাত্ববোধক গান বা কবিতা তুলে ধরেছে। এখানে ‘দেশ’ আর পাকিস্তান নয়, যদিও রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান বহাল আছে তখনও। এই দেশ, এই সৌন্দর্যবোধ, ‘সকল দেশের সেরা’ বলে ঘোষণা সব আসলে এমন এক দেশকে কল্পনা করে রাষ্ট্র হিসেবে যার আবির্ভাব হবে কিনা তা তখনও কেউ নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক গতিপথ কোনদিকে যাবে তা নিয়ে খোদ রাজনৈতিক মহলই ছিলেন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। কিন্তু কবিতার ভাষা দিয়ে বিজ্ঞাপনে মোটামুটি সেই আসন্ন দেশ কল্পনাতে (ইমাজিনেরি অর্থে) হাজির করেছে। সেখানে বাংলাদেশের মানচিত্র এবং বাংলাকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন গান-কবিতা এটার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। যেমন, ইস্টার্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাঙ্ক তাদের বিজ্ঞাপনে কখনো দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’, কখনো কাজী নজরুল ইসলামের ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’, ‘খাটি সোনার চেয়ে খাঁটি’ কবিতা প্রকাশ করেছে। পূবালী জুট মিলস, হোমল্যান্ড ইনসিওরেন্স কোঃ লিঃ, ফার্মাপাক, দাউদ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ, মুসলিম ইনসিওরেন্স কোং লি:, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক লিমিটেড, হাবিব ব্যাঙ্ক, মুনলাইট সিলক মিলস, বাটা তাদের বিজ্ঞাপনে মানচিত্র ব্যবহার করেছে। বাটা তাদের বিজ্ঞাপনে মানচিত্রের ওপর এক লম্বা কবিতা ছেপেছিল। কবিতায় উপরোক্ত সবগুলো বক্তব্যই ছিল, নতুন ‘সূর্য উঠেছে’, ‘বর্গী’দের তাড়াতে হবে’, ‘দস্যুগুলো পালিয়ে গেছে আধার হয়েছে ক্ষয়’। পাশাপাশি, ‘পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’ হয়ে ওঠেছে ‘মুক্তিধারা সীমানা’। উল্লেখ্য, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’ তৎকালের এক জনপ্রিয় শ্লোগান। ঠিকানা বা সীমানা যে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ ছেড়ে পূবের অংশেই থিতু হচ্ছে তার নিশানা যেন ধরা পড়ছিল শ্লোগান ও বিজ্ঞাপনে। পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন তাদের বিজ্ঞাপনে উপস্থিত দেশের কল্পনা তৈরি করেছে: ‘গ্রাম বাংলার স্বপ্ন, মাঠ ভরা ফসল, পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু’। কিন্তু যেহেতু তাদের কেবল গ্রামে হবে না, আধুনিক উন্নয়ন দরকার, সেহেতু বিজ্ঞাপনের দ্বিতীয়াংশে বলেছে, ‘সাত কোটির কল্পনা কারখানার সাইরেন, চিমনীর ধোয়া আর কলকব্জার শব্দ।’ এই স্বপ্ন ও কল্পনাকে রূপ দিতে চান তারা। ইস্টার্ণ ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড বিজ্ঞাপনে ছেপেছে: ‘এ দেশ আমার গর্ব, এ মাটি আমার চোখের সোনা/ আমি করি তারই জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা’। ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক লিমিটেড বিজ্ঞাপনে লিখেছে: ‘বাঙলার মাটি, বাঙলার জল/ বাঙলার বায়ু, বাঙলার ফল ধন্য হোক, ধন্য হোক…’।

 

একদিকে মার্চের জাগরণ বিভিন্ন ‘বিস্ময়’রূপে হাজির হচ্ছিল বিজ্ঞাপনে, অন্যদিকে কিছু কিছু বিজ্ঞাপন এই সময়ে স্মরণ করছিল প্রাক্তন সংগ্রামের শহিদদের। সে সময়ে বাঙালি চেতনার সবচেয়ে প্রভাবশালী ঘটনা ছিল বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন। একাত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিভিন্ন কোম্পানি বায়ান্নকে স্মরণ করে বিজ্ঞাপন ছেপেছিল। মার্চে এসে বায়ান্নের সংগ্রামের সাথে চলতি সংগ্রামের যোগসূত্র টানা হচ্ছে। ব্যতিক্রমী এমন বিজ্ঞাপন ছাপায় বাটা। শহিদ মিনারের ছবি সম্বলিত বিজ্ঞাপনে মোটা হরফে লেখা ছিল ‘মুক্তির শহীদ’। মূল টেক্সট হচ্ছে: ‘বাংলা দেশের যে সব নাম না জানা বীর বুকের রক্ত দিয়ে আমাদের মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে ন্যে গেছে, আজ নতুন সূর্যোদয়ের প্রথম প্রহরে তাদের আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি’। ছবিটাও তাৎপর্যপূর্ণ: শেকলে বাধা শহিদ মিনার, কিন্তু শিকল ছিড়ে যাচ্ছে। ছবিতে শহিদ মিনার ব্যবহার করলেও স্মরণ করা হয়েছে পাকিস্তান জমানার বিভিন্ন সংগ্রামে প্রাণ হারানো লড়াকুদের। তবে ভাষার সাথে বাঙালি জাতীয়তাবোধের এমন সম্পর্ক ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক লিমিটেডের বিজ্ঞাপনে ফুটে উঠেছে। মোটা হরফে বাংলা অক্ষর, নিচে লেখা: ‘একটি বাঙলা অক্ষর: একটি বাঙালীর জীবন’।

 

মার্চের এই জাগরণ যে ‘ঐতিহাসিক’, এই জাগরণে ‘হাতে হাতে ফেরে দেনা পাওনার খাতা’, এই জাগরণ যে ‘রোমাঞ্চকর’, ‘প্রেরণাদায়ক’ ও ‘সম্ভাবনাময়’ এমন বক্তব্য প্রায় অধিকাংশ বিজ্ঞাপনে ছিল। আদমজী ইন্সুরেনশ কোম্পানি বিজ্ঞাপনে বলছে, ‘বাংলা দেশ জুড়ে আজ যে সংগ্রাম, তার চরম লক্ষ্য নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তা।’ কিছু কিছু বিজ্ঞাপনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ছিল। যেমন পূবালী জুট মিল শেখ মুজিবের ছবি ব্যবহার করে মোটা হরফে লিখেছে: ‘আমরা তোমার পিছনে’। কিছু কিছু বিজ্ঞাপনে শেখ মুজিবের বক্তৃতা উদ্ধৃত করেছে। মুজিবের জনপ্রিয়তা তখন প্রায় সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এমনকি সত্তরের বিজয়ের পরও তাঁকে নিয়ে বেশ কিছু বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বেশ কিছু বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে ইত্তেফাকে। সেখানে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘বাংলার মুক্তিকামী মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক’, ‘স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রণীসেনা’, ‘গণতন্ত্রের অতন্দ্র-প্রহরী’, ‘নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দূত’ ইত্যাদিতে ভূষিত করা হতো। তবে বিজ্ঞাপনের ভাষায় স্বাধীকার আন্দোলন নিয়ে এতো স্পষ্ট অভিব্যক্তি মার্চের পূর্বে দেখা যায় না।

 

মার্চের বিজ্ঞাপনগুলোতে দেখা যায়, কোনো কোম্পানি তাদের পণ্য প্রচার করছে না। অর্থাৎ, কে কী পণ্য বিক্রি করেন সেটার উল্লেখ নাই, বরঞ্চ আছে ব্রাণ্ডিং কেবল। দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞাপনে কেবল একটা কবিতা আছে, সাথে রয়েছে কোম্পানির নাম। আর কিছুই নেই। কোম্পানির ধরনের সাথে মিলিয়ে জাগরণ ও স্বাধীকারের চেতনাকে হাজির করা হতো। দেশের সম্পদ দেশে রাখা, বা দেশীয় পণ্য ব্যবহার করার অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি আরেকটি প্রবণতা চোখে পড়ার মতো; কোম্পানি যে ‘খাটি বাঙ্গালী প্রতিষ্ঠান’, ‘বাংলার সব মানুষের সঙ্গে এক হয় কাজ করছে’, ‘বাংলা দেশের সেবায়’ নিয়োজিত, ‘বাঙলাদেশের প্রতিষ্ঠান/ব্যাঙ্ক’, ‘জনতার সাথে এগিয়ে চলছে’ এসব প্রায় সকল বিজ্ঞাপনেই উল্লেখ থাকতো। মার্চ মাসে যত সময় গড়িয়েছে ততই বিজ্ঞাপন প্রকাশের হার বেড়ে গিয়েছে। বিজ্ঞাপনের ভাষাতেও তৎকালের জাতীয়তাবোধের সবচেয়ে আধিপত্যশীল বয়ানের উপস্থিতি। যে বাংলাদেশের কল্পনা নির্মিত হচ্ছিল সেটা বাঙালিদের নিয়েই। এই বাঙালির পরিচয়ের অন্যতম উপাদান ছিল বাংলা ভাষা। অন্য কোনো জাতিসত্তার উপস্থিতি এই বৃহৎ-বয়ানে থাকার কথাও নয়, ছিলও না। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাবসায়িক গোষ্ঠী (বা বামপন্থী রেটরিকে বলা যায় বুর্জোয়ারা) এই বয়ানে খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই এটে গিয়েছিল। আওয়ামীলীগ ও শেখ মুজিবের প্রতি তাদের যে পূর্ণ সমর্থন ছিল সেটাও পরিষ্কার। তদপুরি দুটো বিষয় নজর এড়ায় না। এক, বিজ্ঞাপনের ভাষাতে আন্দোলনের উপস্থিতি আসলে মার্চের প্রথম দশদিনের পর। এরমধ্যে ৭-ই মার্চে শেখ মুজিবের ভাষণ হয়ে গিয়েছে, ৯-ই মার্চে ভাসানীও ভাষণ দিয়ে দিয়েছেন। শেখ মুজিবের নির্দেশেই তখন আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল। অর্থাৎ, ব্যবসায়িক/ধনিক গোষ্ঠী এতো খোল্লামখোলা ভাবে স্বাধীকার ও জনগণের জাগরণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন তুঙ্গে ওঠার পর। দুই, স্বাধীকার ও বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক মহলের দাবিদাওয়াতে স্পষ্ট উচ্চারণ থাকলেও মার্চের এই সময়ে আসন্ন পরিস্থিতি নিয়ে মূলধারার নেতাদের মধ্যে প্রচুর ধোঁয়াশা ছিল। কিন্তু ব্যাবসায়িক গোষ্ঠী অন্তত এটা নিশ্চিত হয় যায় যে, পরিস্থিতি যেখানে গিয়েছে সেখান থেকে আর পিছনে ফিরে আসা যাবে না। স্বাধীকার বা এমন কোনো একটা গন্তব্য যে অনিবার্য সেটা তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষার দ্ব্যর্থহীনতা থেকে স্পষ্ট।

 

টীকানির্দেশ:

[1] দেখুন, Zheng Wang, Memory Politics, Identity and Conflict: Historical Memory as a Variable, Palgrave Macmillan, 2018; Philip Spencer and Howard Wollman, Nationalism: A Critical Introduction, Sage Publications, 2002

[2] Benedict Anderson, Imagined Community, Verso, 1991

[3] স্মৃতির জন্য দেখা যেতে পারে Zheng Wang, 2018; দেশভাগ ও সহিংসতার স্মৃতি কীভাবে ভারতে পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা পালন করেছে তার দূর্দান্ত বিবরণ রয়েছে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডের বইতে। Gyanendra Pandey, Remembering Partition: Violence, Nationalism and History in India, Cambridge: Cambridge University Press, 2001. আরো দেখা যেতে পারে, Dan Stone, ‘Genocide and Memory’, The Oxford Handbook of Genocide Studies, Edited by Donald Bloxham and A. Dirk Moses, Oxford University Press, 2010

[4] Shehreen Islam K. Advertising nationalism: Commemorating the liberation war in Bangladeshi print advertisements. Media, War & Conflict. September 2020. doi:10.1177/1750635220950365

[5] উদ্ধৃতি: আবুল কাসেম ফজলুল হক, মুক্তিসংগ্রাম, আগামী প্রকাশনী, ১৯৭২, পৃ. ১৯৪

[6] Zillur R. Khan, ‘March Movement Of Bangladesh : Bengali Struggle For Political Power’, The Indian Journal of Political Science, Vol. 33, No. 3, July-Sept., 1972, pp. 291-322

[7] ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতিদিনের বিবরণ নিয়ে বিস্তর গ্রন্থাদি প্রকাশিত হয়েছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, রবীন্দ্রনাথ থ্রিবেদী, ৭১-এর দশমাস, কাকলী প্রকাশনী, ২০১৮; বিভাগভিত্তিক বিবরণীর জন্য দেখতে পারেন, হোসনে আরা খানম, ১৯৭১: অসহযোগ আন্দোলনের কালপঞ্জি , গণহত্যা জাদুঘর, ২০২০; হোসনে আরা খানম, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, সময় প্রকাশনী, ২০২১।

[8] Ishtiaq Hossain, “Bangladesh: civil resistance in the struggle for independence, 1948-1971”, Maciej Bartkowski (ed.),Recovering Nonviolent History: Civil Resistance in Liberation Struggles, Viva Books, 2013, p. 199-216

[9] নুরুল ইসলাম, ‘ছয় দফা ও দুই অর্থনীতি’, প্রতিচিন্তা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭। নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের লেখাপত্রে দুই অর্থনীতি নিয়ে বিস্তর আলাপ আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কোনো বইতেই এই সংক্রান্ত আলাপ থাকে। দুটো উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে: Nurul Islam, Making of a Nation Bangladesh: An Economist’s Tale, The University Press Limited(UPL), 2013; রেহমান সোবহান, বাংলাদেশের অভ্যুদয়: একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৮

[10] তারিক আলী, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ: জান্তা না জনতা, (অনুবাদ মাহফুজ উল্লাহ), বাংলা একাডেমি, ১৯৯৭, মূল গ্রন্থ: ১৯৭০

[11] রেহমান সোবহানের বই দ্রষ্টব্য।

[12] এই উদ্ধৃতিগুলো নিয়েছি আকবর আলি খানের বই থেকে। দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, প্রথমা, ২০২০

 

কৃতজ্ঞতা: যুগান্তর পত্রিকার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ ট্রাস্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা। বাকি পত্রিকা ব্যবহার করতে দেয়ার জন্য গণহত্যা জাদুঘর ও আর্কাইভের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top