দেহের চেয়ে বড় কলিজার মিডিয়া মোগল বনাম সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব 

শুধু ভিকটিমের কেন? অপরাধীর ছবি প্রকাশ করাও খুব একটা আইনসিদ্ধ বিষয় নয়। যতক্ষণ না সেই আসামী পুলিশের দৃষ্টিতে পলাতক কিংবা আইনের দৃষ্টিতে ফেরারী। এমনকি রায়-এ চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত হলেও অনেক দেশে নিয়ম আছে অপরাধীর ছবি প্রকাশ না করার বিষয়ে। এটা একটা স্ট্যান্ডার্ড । তবে কংক্রিট কোনো স্ট্যান্ডার্ড না। একেক দেশে এই বিষয়ে একেক আইন। যে দেশে আইন নাই, সেসব দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর নানান মতবিরোধ আছে এই বিষয়ে।

অভিযুক্ত বা অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের ছবি প্রকাশ না করার বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী বা অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবি প্রকাশের বিষয়ে তেমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। তবে সাংবাদিকতার নৈতিকতা অনুযায়ি ছবি প্রকাশ অনুচিতের পর্যায়ে পড়ে।

দক্ষিণ আফ্রিকার একটা আইন বলি, ১৯৯৫ সালের পুলিশ সার্ভিস অ্যাক্ট- “জাতীয় বা প্রাদেশিক কমিশনারের লিখিত অনুমতি ছাড়া, অভিযুক্ত বা অপরাধী হিসেবে সন্দেহভাজন কারো ছবি বা স্কেপ প্রকাশ করা যাবে না।” এই আইন অমান্য করলে ১২ মাসের সাজা কিংবা জরিমানার বিধান আছে।

কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা তো অন্য মহাদেশে। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে বের হয়ে নিজেদের মতো অনেক আইন প্রনয়ণ করে নিয়েছে তারা। তো তাদের কথা এখানে বলছি কেন? আমি কী ইনিয়ে-বিনিয়ে বসুন্ধরার ‘শরীরের চেয়ে কলিজা বড়’ মার্কা এমডি’র ছবি প্রকাশ করার বিরোধীতা করতে এসেছি? না। তা আসিনি। এসেছি বরং উলটো কথা বলতে।

একবার যদি বিশ্ব গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার দিকে তাকান, আপনি কষ্ট পাবেন। আমরা যারা এই পেশার লোক, তারাও কষ্ট পাই। প্রেস ফ্রিডম সূচকে ১৮০ টা দেশের ভেতর বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১ তম। আফ্রিকার অনেক অনুন্নত দেশও প্রেস ফ্রিডম সূচকে অনেক এগিয়ে আছে বাংলাদেশের তুলনায়।

সূচককে উল্টিয়ে দিলেই বাজে সাংবাদিকতায় শীর্ষ ৩০-এ অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশের।

হাউএভার দ্যা পয়েন্ট ইজ- এইদেশে কোনো ভাইরাল অপরাধ (!) সংঘটিত হলে মিডিয়া মোটামুটি একটা ডকুমেন্টারি টিম নিয়ে হাজির হয়ে যায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বাসায়; এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তির বাবা-মার ‘এইচডি’ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়; জাতির সামনে তাদের ডিহিউম্যানাইজ করে, পরিবারের সবচেয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিকেও ফেলে দেওয়া হয় মোরাল পুলিশিং এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে।

তো এই একই মিডিয়া যখন টিআরপি সমৃদ্ধ কোনো ভাইরাল হবার মতো কাভারেজে ভিক্টিমের চোদ্দগুষ্টির ছবি প্রকাশ করে আর অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবি ব্লার করে দেয় জাপানি পর্নোগ্রাফির যৌনাঙ্গের মতো, তখন দুঃখ পাওয়া ছাড়া আসলে আর কোনো উপায় থাকে না লজ্জা ঢাকার।

কিন্তু এই লজ্জার পিছনে যে একটা রাজনীতি রয়েছে, সেই রাজনীতিটাও একইরকম লজ্জার, আতঙ্কের ও অসহায়ত্বের।

ধরেন সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আপনি সরকারের  বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। আইনিভাবে বড়জোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হবে আপনার নামে, এবং এই আইনটার বিলুপ্তির দাবীও মোটামুটি বহুকাল ধরে চলছে।

এবার ধরেন আপনি কোনো বড় কর্পোরেট গ্রুপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন তথ্যসমৃদ্ধভাবে, এতে কি হবে পরবর্তীতে? তারাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করবে আপনার নামে, বা আপনার প্রতিষ্ঠানের নামে? না। এমনটা করবে না। কর্পোরেট গ্রুপগুলো যা করে তা শুনলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ব্লাসফেমি আইনকেও রীতিমতো মামুলি বিষয় বলে মনে হবে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ বড় প্রচার-মাধ্যমই কোনো না কোনো কর্পোরেট মাফিয়ার মালিকানাধীন। কারো কারো ক্ষেত্রে ‘ব্লাকমানি’ হোয়াইট করার রাস্তা। এই কর্পোরেট মাফিয়াদের মিডিয়া উইংয়ে মোটামুটি একটা সাম্রাজ্য আছে বসুন্ধরা গ্রুপের। এক ডজন প্রথম-সারির গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমের মালিক তারা।

এমন না যে তাদের বিরুদ্ধে কেউ সংবাদ করতে চায় না। কারাইবা চাইবে না নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে হেয় করতে? কিন্তু চাইলেও উপায় আসলে খুব বেশি নেই। সাংবাদিকতা এখানে বিঁধে আছে কর্পোরেট শেকলে।

কেউ এমন কোনো গ্রুপের মালিকশ্রেনীর কারো বিরুদ্ধে যখন বড় কোনো অভিযোগ আনে, তখন তাকে এবং তার প্রতিষ্ঠানকে ধূলিসাৎ করার মোটামুটি একটা পায়তারা শুরু হয়ে যায়।

তবে আইনি মাধ্যমে নয়, জনমত উৎপাদনের মাধম্যে। যে গ্রুপের হাতে জনমত উৎপাদন করার এক ডজন মাধ্যম আছে, তারা মামলা করার মতো মামুলি কাজ করে না। করে প্রতিশোধ পরায়ণ হলুদ সাংবাদিকতা।

যারা শক্তভাবে অভিযুক্ত মালিকশ্রেনীর অপরাধীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বা নিতে চায়, পরেরদিন থেকেই তাদের বিরুদ্ধে লিপিবদ্ধ করা হয় অপপ্রচারের আখ্যান। প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক, রিপোর্টার থেকে শুরু করে ড্রাইভার পর্যন্ত সকলের বিরুদ্ধ নানান কায়দায় শুরু করা হয় নানান রঙচঙ মিলানো অসত্য, আধাসত্য ও গোপন সত্যের প্রচার।

একই সাথে অনেকগুলো মিডিয়া উইংয়ে মানুষ যখন একই তথ্য বারবার পেতে থাকে, তখন হেজেমনিতে ভোগা ছাড়া আসলে তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। ধীরে ধীরে মানুষ সেসব বিশ্বাস করা শুরু করে, একপর্যায়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করে৷ যা ভুক্তভোগী একটা মানুষের, একটা প্রতিষ্ঠানের, শতশত জীবনের বাস্তুসংস্থানের জন্য হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি হুমকি। যেহেতু সবগুলোই কর্পোরেট হাউজ, দিনশেষে কম বেশি পাপ প্রত্যেকেরেই থাকে।

দিনশেষে এই রিস্ক কেউ নিতে চায় না। বাংলাদেশে মুক্তধারার কোনো গণমাধ্যম নেই, ছিলনা কোনোদিন। বাংলাদেশে কোনো ‘গার্ডিয়ান’ নাই- যা চলে মূলত জনগণের অর্থায়নে। যাদের জবাবদিহিতা কেবল মাত্র জনগণের কাছে, সাংবাদিকতার নৈতিকতার কাছে। যার প্রত্যেকটা সংবাদের নিচে লেখা থাকে-

“আমাদের কোনো শেয়ারহোল্ডার নেই, কোনো বিলিয়নিয়ার মালিকও আমাদের নেই। এর অর্থ হলো- পক্ষপাতদুষ্ট এবং কায়েমী স্বার্থ পূরণ করতে হয়, এমন কাজ থেকে আমাদের সাংবাদিকতা মুক্ত।”

বাংলাদেশের চিত্র তেমনটি নয়৷ তেমনটি নয় বলেই ‘দেহের চেয়ে বড় কলিজাওয়ালা’ অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম পরিচয় প্রকাশ করতে না পারা যতটা এদেশের সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা, তারচেয়েও বেশি কর্পোরেট স্বার্থে বন্দী কলমের অসহায়ত্ব। যে অসহায়ত্ব থেকে মুক্ত নয় দেশের সবচেয়ে নিরপেক্ষ সাংবাদিকটিও।

চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা আইজিআই গ্লোবালের গবেষণায় উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র। “হ্যান্ডবুক অব রিসার্চ ইন ডিসক্রিমিনেশন, জেন্ডার ডিসপ্যারিটি অ্যান্ড সেইফটি রিস্ক ইন জার্নালিজম” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখায় যায়, বাংলাদেশের ৭১.৭% সাংবাদিক তাদের পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। গবেষণায় বলা হয়, পেশাগত অনিশ্চয়তাই সাংবাদিকতা বিমুখতার প্রধান কারণ। প্রায় ৮৫% সাংবাদিকই চাকরির অনিশ্চয়তায় ভোগেন। গবেষণায় আরো বলা হয়, সাব-এডিটর বা কপি এডিটরদের তুলনায় বেশি বিষণ্ণতায় ভুগছেন রিপোর্টাররা। বিষণ্নতার হার রিপোর্টার ৪৪.৩২%, কপি এডিটরের ৩৪% এবং নিউজ এডিটরের বিষণ্নতার হার ২৮.৫৭%।

রিপোর্টার, মানে সংবাদেরর তথ্য সংগ্রহ যিনি করেন, তাঁর বিষণ্ণতাই সবচাইতে বেশি। যেহেতু প্রতিদিন এমন অনেক তথ্যই তার হাতে আসে- যা গুরুত্বপূর্ণ তবে কর্পোরেট ফাঁদে বন্দী এডিটরিয়াল পলিসির কারণে প্রকাশ যোগ্য নয়। এছাড়া ঘাড়ের উপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দঁড়ি তো আছেই। সাংবাদিকদের বিষণ্নতার আরো একটি কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে- কাজের চাপকে। কিন্তু আসলে এমন আহামরি কোনো সাংবাদিকতা বাংলাদেশে হয় না, যা নিয়ে চাপে থাকবেন দেশের সিংহভাগ (৮৫%) সাংবাদিক।

এ চাপ মূলত নিজেকে চেপে যাওয়ার চাপ, এ চাপ নিজেকে প্রকাশ করতে না পারার মতো অস্তিত্ব সংকটের চাপ।

এ বিষণ্ণতা আদতে জন্মেছে জাতির বিবেক হয়েও ব্যক্তিত্বহীনতা নিয়ে নির্বিকার বসে থাকার অসহায়ত্ব থেকে। এ বিষণ্ণতা লাফিয়ে বাড়ে সাংবাদিক কাজলের মতো গুম হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে। কাজের চাপ এখানে মূলত কাজ করতে না পারার চাপ।

 

 

Shoikot Amin is an anti-authoritarian poet and activist from Bangladesh. He believes in equal rights for all human beings on this planet and the right of every other living being to live free.

 

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top