দ্যা একিউজড: নারী বিদ্বেষ, ট্রমা, দোষারোপের বিপরীতে নারীর ক্ষমতায়নের চলচ্চিত্র

দ্যা একিউজড, (জনরে ড্রামা, ট্রায়াল ড্রামা) সিনেমাটি প্রিমিয়ার শো হয় বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে। তারপর ১৯৮৮’র অক্টোবরে সিনেমাটি অল্প কিছু হলে বিতর্কের মধ্যে দিয়ে প্রদর্শন শুরু হয়। সিনেমাটি বিতর্কিত হলেও পজিটিভ রিভিউ পেয়েছিল বেশি। বিশেষ করে জডি ফস্টার (Jodie Foster) এর অভিনয় ছিল উল্লেখযোগ্য। সিনেমাটি প্রশংসিত হয়েছিল দর্শক সমালোচক দুই পক্ষের কাছেই। আর বিতর্কের কারণ ছিল, তিন মিনিট দৈর্ঘের একটি গণধর্ষণের চিত্রায়ণ।সিনেমাটিতে নারীকে অবমানননার অনেকগুলো কনসেপ্ট এক্সপ্লোর করা হয়েছে। যেমন, Misogyny, PTSD, Slut Shaming, Victim Blaming. এবং লড়াইয়ে বিজয়ী হিসাবে Women´s Empowerment. ধর্ষণের ভয়াবহতা এবং ধর্ষণ পরবর্তী বিচার ও ভিক্টিমের জীবনের পরিণতি নিয়ে এটি প্রথম কোনো হলিউড চলচ্চিত্র, দ্যা একিউজডকে অভিযুক্তর কণ্ঠস্বর বলা হয়।

সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার মাত্র পাঁচ বছর আগে, ১৯৮৩ সালে এমন একটি কদর্য ঘটনা ম্যাসাচুসেটস  শহরের বারে একজন নারীর সঙ্গে ঘটেছিল যা সে সময় জাতীয় পত্রিকার খবর হয়েছিল। স্ক্রিন-রাইটার টম টপর (Tom Topor) সেই সময় খুব কাছ থেকে এই ধর্ষণের বিচার কাজ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি স্ক্রিপ্ট লেখার আগে ধর্ষণের শিকার, কয়েকজন ধর্ষক, প্রসিকিউটর, ডিফেন্স অ্যাটর্নি এবং নার্সদের সাক্ষাৎকার নিয়ে তার স্ক্রিপ্ট সাজিয়েছিলেন। সিনেমাটির প্রযোজক শেরি লেন্সিং (Sherry Lansing) এই ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে ১৯৬৪তে কুইন্সে ঘটে যাওয়া আর একটি বর্বর ঘটনার সম্পৃক্ততা পান,যেখানে ৩৬ জন মানুষ একজন নারীকে ধর্ষিত হতে দেখছিলো, আবার ৮৩ সালে বারের পুল টেবিলে একজন নারীকে তিনজন পুরুষ যখন ধর্ষণ করছিলো তখন পাবের অন্যান্য অনেক পুরুষ হাততালি এবং উল্লাস প্রকাশ করে সে ধর্ষণকে উৎসাহিত করছিল।শেরি লেন্সিং (Sherry Lansing) ক্ষুব্ধ হয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলো, How could people do that? তার কাছে ধর্ষক এবং উৎসাহদাতারা সবাই সমান দোষে দোষী। এই সিনেমার আর একজন অভিনেত্রী,  কেলি মেকগিলিস (Kelly McGillis) (সিনেমার চরিত্র ক্যাথরিন মারফি Kathryn Murphy), যিনি নিজেও এক সময় ছুরির সামনে দুজন পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন।

চিত্রনাট্যকারের চলমান বিচার কাজকে পর্যবেক্ষণ করে লেখা চিত্রনাট্য, সংবেদনশীল প্রযোজক এবং মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত অভিনেত্রীর যৌথ কাজে দ্য একিউজড সিনেমাটি একটি ইতিহাস তৈরী করেছিল। সিনেমাটিকে একটি নির্মম ধর্ষণের মৌখিক ইতিহাস বলা চলে।

১৯৮৮ সালে সিনেমাটি মুক্তি পায়, যদিও এই সিনেমায় ধর্ষণ পরবর্তীতে ভিক্টিমের পরিণতির দিকে আলোকপাত করা হয়েছে, তারপরও পরিস্থিতি বর্তমানেও একই আছে। এতো বছর বাদেও আমেরিকায়  প্রতি ছয় মিনিটে একটি ধর্ষণের কেইস ফাইল হয়, যার মধ্যে চারটি ধর্ষণ থাকে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি দ্বারা গ্যাং রেপ।

এই সিনেমার শুরুতে দেখানো হয়, ভিক্টিম   সারা টোবিয়াস (Sarah Tobias) , ভীত সন্ত্রস্ত ,বার থেকে দৌঁড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসে একটি গাড়িতে লিফট নিয়ে চলে যায়। তারপর তাকে দর্শক হাসপাতালে দেখে বুঝতে পারে সে ধর্ষিত হয়েছে। দর্শক তখনও জানে না, তার ধর্ষণের ভয়াবহতা, নির্মমতা। ওকে সাহায্য করতে আসে, ডেপুটি ডিস্ট্রিক  অ্যাটর্নি ক্যাথরিন মারফি,  সেও একজন নারী। যদিও সে সারাকে সাপোর্ট দেবার জন্য আন্তরিক ছিলো তারপরও সে তিন ধর্ষককে কম অপরাধের জন্য দর কষাকষির মাধ্যমে কম শাস্তি দিয়ে কেইসটি নিষ্পত্তি করতে চাইলে সারা মনে করে, মারফি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।  সারা মনে করে, ধর্ষণের সময় যারা হাততালি এবং উল্লাস প্রকাশ করে ধর্ষকদের উৎসাহ দেয়িছিলো তারাও ধর্ষকদের মতো সমান পরিমান দোষী, সারা টোবিয়াসের ভাষ্য মতে, Criminal solicitation.

সারা পরবর্তীতে একটি রেকর্ড বিক্রির স্টোরে গিয়ে সে রাতে বারে উল্লাসিত দর্শকের একজন দ্বারা দ্বিতীয় বার জন সমক্ষে যৌন হয়রানির শিকার হয় ।  এক পর্যায়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে না পারে লোকটিকে আক্রমন করে বসে এবং নিজেও আঘাত প্রাপ্ত হয়ে আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়। তখন ক্যাথরিন মারফি সারার কেসটা আবার ওপেন করার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও তার এই সিদ্ধান্তকে কেউ সমর্থন দেয়নি, সবাইর ভাষ্য ছিল, সারার একার সাক্ষী যথেষ্ট নয় এবং এটি একটি সময় নষ্ট করার মতো কেইস।  সারাও প্রথমে  ক্যাথরিন মারফির ওপর আবার আস্থা রাখার ব্যপারে অনীহা প্রকাশ করে। তারপর দুজন নারী যাদের সাহায্য করতে আসবে এমন কেউ নেই জেনেও সব প্রতিকূলতার বিপরীতে গিয়ে পুনরায় কেইস ওপেন করে।

ধর্ষণ সংক্রান্ত প্রমাণ খুঁজতে গিয়ে ক্যাথরিন মারফি বারের অন্য এক ওয়েট্রেস, সারার বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারে সে রাতে সারা ডোপ নেয়, মদ্যপ ছিলো, সে ফ্লার্ট করছিলো, সে একজন বাইকারের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ট  হয়ে নেচেও ছিল। সারার প্ররোচনাই যেন ধর্ষকদের উদ্বুদ্ধ করেছিল । এই সব পার্শ্ব ঘটনার পরও বিবেচনার বিষয় ছিল, তারপরও কি সারা টোবিসকে বা কোনো নারীকে ধর্ষণ করার অধিকার ধর্ষকদের ছিল বা কারো আছে কি না? দ্যা একিউজড সিনেমায় ধর্ষণ এবং ধর্ষিতার সাথে কোর্টরুম, মিডিয়া বা সমাজ কী রকম ব্যবহার করে তা দেখার সুযোগ দেয় সাধারণ দর্শকদের। সারাকে সাক্ষ্য দেবার জন্য অনুপযুক্ত ও অবিশ্বস্ত মনে করে কোর্ট, নৃশংস ধর্ষণের পরও কোর্ট একজন ভুক্তভোগী নারীর সাক্ষ্যকে যথেষ্ট মনে করে না, এইটা নারীর জন্য অপমানকর এবং বৈষম্যমূলক বিচারও বটে।  সিনেমার শেষ প্রান্তে গিয়ে দর্শক অপর এক পুরুষ সাক্ষীর মাধ্যমে সে রাতে বারে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের নৃশংস বর্ণনা ফ্ল্যাশ ব্যাকে দেখতে পায়। যা ছিল  আতঙ্কিত বোধ করার মতো নিষ্ঠুর। সারা টোবিসকে তিনজন ধর্ষক পালাক্রমে ধর্ষণ করে এবং তাদের হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করছিল একদল উচ্ছ্বসিত পুরুষ। মলেস্ট হতে হতে সারা টোবিয়াস বার বার বলেছিল, “No”.

কোর্টে জেরার সময় আসামী পক্ষের আইনজীবী জানতে চেয়েছিল সারার কাছে, “No” শব্দটিতে তেমন কিছু বোঝা যায় না। তুমি Help বলতে পারতে। Police বলতে পারতে। তা না বলে “No” বলেছো। তাতে করে অন্যরা কী বুঝবে?

সারা টোবিয়াস জানায়, সে সময় তার ব্রেনে একটি শব্দই এসেছিল। সেটি ছিল, “No”…

কেউ যখন সেক্সুয়াল ইন্টিমেটের সময় “No” বলে তার মানে না’ই হবে। No means no. এই বিশেষ অর্থটি কোর্টরুমে দাড়িয়েঁ ক্যাথরিন মারফিকে আর একবার সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে হয়।

কোর্টে সারা টোবিয়াসের প্রতিটি বাক্য শেষ হয়েছিল, was inside of me. যা দর্শকদের  মানসিক সুস্থ্যতাকে বিধ্বস্ত করবার জন্য এক একটি বিশাল আঘাত ছিল।

সারা টোবিয়াসের চরিত্রে Jodie Foster দুর্দান্ত অভিনয় করেছে নিঃসন্দেহে। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অভিনয়ের সুক্ষ্ণতার পাশাপাশি তাকে মানসিক দৃঢ়তার প্রতিও মনোযোগী হতে হয়েছিল নিশ্চয়। পিনবল মেশিনের ওপর ধর্ষণ চিত্রে অভিনয়ে তিনি যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছেন। ফলস্বরূপ, সেরা অভিনেত্রীর অস্কার তিনিই জিতেছিলেন সে বছর।

ক্যাথরিন মারফির ভূমিকায় Kelly McGillis ভালো অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে কোর্টে তার ডায়লগ থ্রো করার সময় দৃঢ় উচ্চারণ এবং অবিচলিত অভিনয় চরিত্রের সাথে সামন্জস্যপূর্ণ হয়েছে। সব কিছু মিলে দ্যা একিউজড সিনেমাটিকে দুই নারীর দক্ষ এবং বাস্তব অভিনয় প্রানবন্ত করে তুলেছে যেমন তেমনি পরিচালক Jonathan Kaplan পরিচালনার  সীমিত বোধ এবং মুন্সিয়ানা সিনেমাটিকে মাইল ফলক বানিয়েছে। সিনেমার মিউজিক ভালো ছিল, যথাযথ। সব কিছু মিলে দ্যা একিউজড সিনেমাটি সকলের যৌথ প্রচেষ্টার একটি দুর্দান্ত ভালো সিনেমা, যেখানে সমাজের একটি অন্ধকার গহ্বরকে দর্শকদের সামনে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী পরিচালিত, অমিতাভ বচ্চন, তাপসী পান্নু, কৃর্তি কুলহারি অভিনীত হিন্দী সিনেমা পিংক মুক্তি পায় ২০১৬তে। এই সিনেমাটির সঙ্গে দ্যা একিউজডের সাদৃশ্য রয়েছে ( বলা চলে কাহিণী এ্যাডাপ্ট করা), পিংক সিনেমাটি বেশ আলোচিত হয় নারীবাদী সিনেমা হিসাবে। নারীদের ভয়েস হিসাবে। এই সিনেমাটিতে পশ্চাত্য অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতি রাখার জন্য প্লট অন্য রকম সাজানো হয়েছে, তবে কোর্টরুমের জেরা, পাল্টা জেরা প্রায় একই রকম ছিল। পিংক সিনেমাতে প্রটাগনিস্ট মিনালকে পাওয়ারফুল রাজনৈতিক নেতার ভাতিজা রাজভীর  সিঙকে এ্যাটেম্পট টু মার্ডার, এ্যাটেম্পট টু এক্সট্রট এন্ড প্রসটিটিউসনের মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়। আদপে মিনাল সেল্ফ ডিফেন্সের কারণে রাজভীরকে বোতল দিয়ে আঘাত করেছিল। মিনাল এবং তার অপর দুই বন্ধুকে নানান রকম হয়রানির পর যখন বিচার শুরু হয় তখন আসামী পক্ষের আইনজীবী জানায়, এই তিন নারীর চরিত্র ভালো নয়। তারা পুরুষদের সঙ্গে ডিনারের উদ্দেশ্যে বাইরে চলে যায়, মদ্য পান করে এবং শোয়ার বিনিময়ে টাকা দাবী করে, যা ছিল কিছুটা বানানো গল্প। মিনালের আইনজীবী দীপক সেগাল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কটাক্ষ করে আরও যোগ করে বলেন, এরা একা বসবাস করা উদ্যত নারী, দেরী করে ঘরে ফেরা নারী, স্বাধীন হতে চায়, মদ্যপান করে, পুরুষের সঙ্গে হেসে কথা বলে যা নারীদের করা উচিত নয়। এই সব করা নারীদের জন্য নিষেধ হলেও পুরুষদের জন্য নয়। এই সিনেমাতেও আমরা মিনালের আইনজীবীকে কোর্টরুমে আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে শুনি, My client said NO. No means no, and does not require further explanation.

আলোচনা হচ্ছিল দ্যা একিউজড নিয়ে। একই জনরের সিনেমা হওয়ায় সামান্য আলোচনা পিংক নিয়েও করা হয়ে গেল। এখনও সিনেমা দুটি যদি না দেখা থাকে দেখে নিতে পারেন। সিনেমার কাহিনীর বিষয়বস্তু কঠিন আর পাশবিক হলেও এগুলো সমাজের ভেতর ঘটতে থাকা নির্মম নৃশংস ঘটনাগুলোর কিছু খন্ড চিত্র মাত্র।  এই সব নির্মমতা সাধারণের জানা প্রয়োজন, নিজেদের সচেতন হওয়ার জন্য এবং অপরকে সতর্ক করবার জন্য।

সংযুক্তি: ১৯৮৩’তে বারে ধর্ষিত হওয়া নারীর নাম ছিল, আরাজো (Araujo)। যদিও সে বিচার পেয়েছিল, কিন্তু তারপরও সে নিজের শহরে থাকতে পারেনি। নিজের শহর এবং কমিউনিটির লোকদের বিদ্রুপ থেকে নিস্তার পাবার জন্য সে মিয়ামিতে চলে যায়। তারপরও শেষ রক্ষা হয় না, ট্রমায় থাকা আরাজো মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে এক কার এক্সিডেন্টে মারা যায়।

 

Shamim Runa is a novelist, playwright, film critic, and women’s rights activist.

More Posts From this Author:

1 thought on “দ্যা একিউজড: নারী বিদ্বেষ, ট্রমা, দোষারোপের বিপরীতে নারীর ক্ষমতায়নের চলচ্চিত্র”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top