নাগরিক আন্দোলন: কিছু সমসাময়িক পর্যালোচনা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্বপরায়ন সরকারব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে। বাংলাদেশেও। ফলে একদিকে সামগ্রিকভাবে সময়টাকে ‘থার্ড ওয়েব অফ অটোক্রেটাইজেশন’ বলা হচ্ছে, অন্যদিকে বিশেষভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বলে সময়/জমানাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। সোজাসাপ্টাভাবে বললে, যেই রেজিমে গণতন্ত্র ‘নিখোঁজ’ হয়ে গিয়েছে, মানে যে সব লক্ষণ/চিহ্ন দেখে আমরা কোনো ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলি, বা গণতন্ত্রের উপস্থিতির নিশ্চয়তা পাই সেই লক্ষণ/চিহ্ন হারিয়ে গিয়েছে। বলা হচ্ছে যে, উপরোক্ত তৃতীয় ঢেউ বর্তমানে ২৫টি দেশের ওপর প্রভাব ফেলছে যা কিনা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৪ ভাগ। ফলে, দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের পশ্চাৎমুখীনতা এবং বিভিন্ন মুখোশে স্বৈরশাসনের আবির্ভাব- এসবই যেন বর্তমান জমানার শাসনব্যবস্থার যুগলক্ষণ। ২০১৯ সালে দুনিয়াব্যাপী যে আন্দোলনের মাধ্যমে যে মুক্তিমুখীন যাত্রা শুরু হয়েছিল তা যেন ২০২০ সালে মহামারিজনিত লকডাউনে এসে মুখথুবড়ে পড়েছে। ২০১৯ কে যেখানে প্রতিরোধের বছর বলা হয়েছিল সেখানে ২০২০কে বলা হচ্ছে লকডাউনের বছর। বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা মহামারিকে উপলক্ষ করে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক পথ-পদ্ধতি থেকে সরে এসে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দা-কানুনকে বেশি করেই রপ্ত ও ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেও। তবে এমন নয় যে, বাংলাদেশ লকডাউনের পরপরই এমন স্বৈরতান্ত্রিক হয়েছে, বরঞ্চ ২০০৮ এর পর থেকে ধাপে ধাপে সে স্বৈরাচারী [আরো স্পষ্টভাবে বললে ফ্যাসিবাদী] হয়ে উঠেছে। লকডাউন কেবল তাকে আরো বেশি স্বৈরাচারী কায়দাকানুন রপ্ত ও প্রয়োগ করতে সাহায্য করেছে।

এর থেকে উত্তরণ কীভাবে হবে? এমন ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী রেজিম থেকে গণতন্ত্রের দিকে আমরা কীভাবে যেতে পারি? আলী রীয়াজ বলেছিলেন যে, নাগরিকের ক্রমাগত সক্রিয়তাই পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সেখানে তিনি নন-ভায়োলেন্ট সিভিল রেসিস্ট্যান্স বা অহিংসধারার গণআন্দোলন বিষয়ে ইশারা-ইঙ্গিত দিয়েছেন। আমাদের আলাপ সেখান থেকেই শুরু করবো। অহিংস প্রতিরোধ/আন্দোলন হচ্ছে লড়াইয়ের একটা পদ্ধতি যেখানে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যে নিরস্ত্র জনসাধারণ/নাগরিক সামষ্টিক কৌশল (যেমন মিছিল, ধর্মঘট, অসহযোগ আন্দোলন, গণ-অবাধ্যতা, আইন-অমান্য আন্দোলন, ডিরেক্ট একশন ইত্যাদি) ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এটাকে সিভিল রেসিসট্যান্স বলেও অভিহিত করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য থাকে যথাসম্ভব প্রাণহানি এড়িয়ে আন্দোলন করা। গণ-অবাধ্যতা বা সিভিল ডিসঅভিডিয়েন্স বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও আলোচিত কৌশল। এই ধরণের অহিংস আন্দোলনকে কেউ কেউ নীতিগত জায়গা থেকে দেখেন, কেউ কেউ কৌশলগত জায়গা থেকে দেখেন। হাওয়ার্ড জিন মনে করেন সহিংস আন্দোলন আসলে দুনিয়াতে ভালো কিছু উপহার দেয় নাই। তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন উপায় ও উদ্দেশ্যে মিল না থাকলে কি উদ্দেশ্য সফল হবে? যুদ্ধের মাধ্যমে কি শান্তিতে পৌছানো সম্ভব? নাগরিক আন্দোলন কীভাব গড়ে তোলা যায়? বা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে? কোনো সন্দেহ নেই এসবই প্রাথমিক পর্যায়ের আলাপ।

 

‘ফ্রম ডিক্টেটরশিপ টু ডেমোক্রেসি’: একটি রোডম্যাপ   

জিন শার্প (১৯২৮-২০১৮) ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, আলবার্ট আইনস্টাইন ফাউন্ডেশন নামক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন ধরণের অহিংস আন্দোলন নিয়েই অধ্যয়ন করাই এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য। জিন শার্প অহিংসবাদী ছিলেন, অহিংস ধারার আন্দোলন নিয়ে তিনি বিস্তৃত কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী, হেনরি ডেভিড থরো, মার্টিন লুথার কিং প্রমুখ চরিত্রদের প্রশংসা করতেন। তার ‘Gandhi Wields the Weapon of Modern Power: Three Case Histories’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় ৩ খন্ডের The Politics of Nonviolent Action। তার কাজ পৃথিবীর বিভিন্ন স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে জ্বালানি সরবরাহ করেছে। ১৯৯৩ সালে ‘ফ্রম ডিক্টোটেরশিপ টু ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে তার একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। কীভাবে একজন স্বৈরশাসক ও স্বৈরতন্ত্রকে অহিংস কায়দায় সরিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় তার ম্যানুয়ালই হচ্ছে এই গ্রন্থ। বলা হয়ে থাকে যে, জিন শার্প ও তাঁর এই গ্রন্থ আরব-বসন্তসহ পৃথিবী ব্যাপী নানা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে পথ দেখিয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁর মৃত্যুর পর গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘Gene Sharp, US scholar whose writing helped inspire Arab Spring, dies at 90’। ২০১২ সালে সিএনএন তাকে ‘A dictator’s worst nightmare’ এবং তাঁর উক্ত পুস্তিকাটিকে ‘ভাইরাল প্যামফ্লেট’ বলে উল্লেখ করেছিল। তাঁর ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কতক রাষ্ট্র ও ব্যক্তি অভিযোগ এনেছিলেন যে, তাদেরকে বুশ প্রশাসন তথা মার্কিন রাষ্ট্র মদত দিচ্ছে, বা তিনি তাদের মদতে কাজ করছেন। তখন হাওয়ার্ড জিন, নোম চমস্কি সহ প্রায় শতাধিক বুদ্ধিজীবী তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

মিয়ানমারের প্রাক্তন নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতা উ টিন মোং উইনের অনুরোধে জিন শার্প এই পুস্তিকাটি রচনা করেছিলেন। গণতন্ত্রকামী এই নেতা ছিলেন Khit Pyaing এর সম্পাদক। কেবল মিয়ানমারের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা জিনের পক্ষে সম্ভব না হওয়াতে তিনি একটি সাধারণ বিশ্লেষণের দিকে যান। অহিংসপন্থা, স্বৈরশাসন, সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রতিরোধ সংগ্রাম, রাজনৈতিক তত্ত্ব, আন্দোলনের সামাজিক বিশ্লেষণ ইত্যাদি নিয়ে তাঁর বিগত চল্লিশ বছরের গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি এই রচনায় হাত দেন। ১৯৯৩ সালে তাঁর প্রবন্ধটি বার্মিজ ও ইংরেজি ভাষায় থাইল্যান্ডে প্রকাশিত হয়। এই দুইভাষায় পরবর্তীতে পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। গোপনে মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, নির্বাসিত নেতাকর্মীদের হাতে হাতে এটা পৌঁছে যায়। মিয়ানমারের সামরিক সরকার এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল, নাগরিকদের গ্রেফতারও করেছিল এই নিষিদ্ধ বই সাথে রাখার জন্য। এই বিশ্লেষণ বিশেষত মিয়ানমারের জন্য করা হলেও এটা সাধারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটা অনুধাবন করা যায় অনুবাদের সংখ্যা দেখেই। ১৯৯৩-২০০২ সালের মধ্যে ছয়টা ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হলেও ২০০৩-২০০৮ সালের মধ্যে প্রায় ২২টি ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়ে যায়। [শীঘ্রই পুস্তিকাটি মোহাম্মদ আরিফ খানের অনুবাদে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হচ্ছে।]           

‘ফ্রম ডিক্টেটরশিপ টু ডেমোক্রেসি’ বইটা ইশতেহার টাইপ, আকারে চটি বই। রাষ্ট্রের বুকের ওপর চেপে থাকা স্বৈরতন্ত্রকে কীভাবে ঝেটিয়ে বিদায় করা যায়, এবং বিদায় করে গণতন্ত্রকে কায়েম করা যায় তার একটা সাধারণ রূপরেখা এখানে রয়েছে। জিন সহিংস আন্দোলনের ঘোরতর বিরোধী, তিনি সহিংস আন্দোলনকে কৌশল হিসাবে মন্দ বলে বিবেচনা করেন। আবার অহিংস আন্দোলনকে তিনি প্যাসিফিজম বা শান্তিবাদীদের সাথে গুলিয়ে না ফেলতেও ফুটনোটে অনুরোধ জানান।

জিন শার্পের এই পুস্তিকায় মোট ১০টি অধ্যায় রয়েছে। অধ্যায়গুলোতে ধাপে ধাপে স্বৈরতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দেয়ার কৌশল বাতলে দেন। তিনি শুরুতেই সহিংস ধারায় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন। একেবারে সহজ সরল যুক্তিতেই। আধুনিক রাষ্ট্রের হাতে সহিংসতার যাবতীয় [আধুনিক] সরঞ্জাম রয়েছে, এবং একচেটিয়াভাবে। এমন প্রতিপক্ষের সাথে কীভাবে লড়াই করে জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? দ্বিতীয়ত, সহিংস আন্দোলন যখন বেঘোরে প্রাণহানি ঘটাতে শুরু করে তখন সাধারণ নাগরিক ধীরে ধীরে আন্দোলন থেকে সরে যেতে বাধ্য হোন, হতাশ হয়ে পড়েন আরো বেশি। এতে ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি হয়, বরঞ্চ সহিংসতার ফলে যদি স্বৈরশাসনের পতনও ঘটে, তবু নতুন যিনি আসবেন তার স্বৈরশাসক হয়ে উঠার সম্ভাবনাও থাকে। কেননা সহিংস আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট হওয়া ধ্বংসস্তূপ তাকে স্বৈরশাসনের বৈধতা হাসিলের উপায় করে দিতে পারে।  ফলে তিনি একেবারে শুরুতে এটা নাকচ করে দেন। ক্যু, নির্বাচন, বিদেশী সাহায্যকারী কোনোটাকেই তিনি গণতন্ত্রের যাত্রার জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। খোদ নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। তাদের নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী/দলকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করে গড়ে তুলতে হবে। কেবল অভ্যন্তরেই শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে তখন বিদেশী সাহায্য কাজে লাগতে পারে, অন্যথায় সেটা বেহাতই হবে। মুক্তির জন্য দক্ষতার সাথে একটি মহা-পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে, এবং সেটাকে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে এটার জন্য দরকার দীর্ঘ কর্মপ্রচেষ্টা, সক্রিয়তা।

এই জায়গা থেকে তিনি স্বৈরশাসকের সাথে মুলামুলি বা নেগোশিয়েশনের বিপদগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন। মানে, নেগোসিয়েশনের মাধ্যমেই কি স্বৈরশাসনকে প্রতিহত করা সম্ভব? তাঁর সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে, না। যেহেতু উত্তর না, তিনি নজর দেন খোদ ক্ষমতার দিকে। অর্থাৎ, স্বৈরশাসনের ক্ষমতার মূল গুটিগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকেও বর্ণনা করেন। তাঁর মতে গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাষ্ট্র [ও সরকার] নিরপেক্ষ বিভিন্ন স্বাধীন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের বহুল উপস্থিতি। এরপরই নজর দেন স্বৈরশাসকদের দুর্বলতাগুলো খোজার দিকে। তিনি কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন, কিন্তু বারেবারে মনে করিয়ে দেন, তাঁর কোনো কিছুই স্থান-কাল নিরপেক্ষ নয়। এইসবই কিছুই একেক দেশে একেক চেহারায় থাকতে পারে। সুরত ভিন্ন হতে পারে।

সেই ক্ষমতাকে কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব, সেই মোকাবিলাতে কীভাবে জনগণের অধিকাংশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় সেটা উল্লেখ করেন। তিনি অহিংস আন্দোলনের প্রায় ১৯৮টি পদ্ধতি বাতলে দেন। মোটাদাগে তিনটা ক্যাটাগরিতে এই পদ্ধতিগুলোকে ভাগ করেন : Protest and persuasion, noncooperation, and intervention. তিনি যখন অহিংস পদ্ধতিগুলোর কথা বলেন, তখনও মনে করিয়ে দেন, সহিংস পদ্ধতি কাউন্টারপ্রডাক্টিভ হতে পারে। তিনি জানেন, কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠতে পারে। কখনো কখনো রেজিমের প্রতি হতাশা ও ঘৃণা সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তবু তিনি প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতাকে এসব থেকে আলাদা করেন। তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, অহিংস পন্থা থেকে যতদূর সম্ভব সহিংস পন্থাকে দূরে রাখতে হবে। তিনি সেখান থেকে আন্দোলনের ক্ষেত্রে, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে খোলামেলা হওয়ার কথা বলেন। গোপনীয়তা ভয় উৎপাদন করেন, আন্দোলনের চেতনাকে নষ্ট করে। রেজিমের প্রতি জনগণের ভয়কে সরানোর ব্যাপারে জিন শার্প গুরুত্ব দেন।

এই পদ্ধতিগুলোর প্রয়োগের জন্য, এমনকি পুরো আন্দোলনকে চালিত করার জন্য চারটি প্রক্রিয়ার কথা বলেন: Grand Strategy- Strategy- Tactics- Methods. এরপর তিনি ধাপে ধাপে আলোচনা করেন, কীভাবে গ্র্যান্ড স্ট্রাটেজি, স্ট্রাটেজি, ট্যাকটিস ও মেথডস [উপরোক্ত ১৯৮টি মেথড] প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে। কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জিন শার্প আমলে নিতে বলেন। যেমন, গ্র্যান্ড স্ট্রাটেজি কীভাবে প্রণয়ন করা হবে সেটা নির্ভর করবে আসলে যার যার দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিস্থিতির ওপর। এমনভাবে এই নীলনকশা প্রণয়ন করতে হবে যেন নতুন করে আবারো স্বৈরতন্ত্রের সম্ভাবনা দেখা না দিতে পারে। আবার, আন্দোলনের স্বার্থে বহুকিছু বিকল্প বিষয়ও ভাবতে হবে। যেমন, আন্দোলনে সহযোদ্ধা মারা গেলে বা আহত হলে কীভাবে আমরা তার সশ্রুষা করবো? আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠবে, বা কোনো অবরোধকালে যে শ্রেণির লোকদের টানাপোড়নে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদেরকে সমস্যাকে তখন কীভাবে মোকাবিলা করব। এমন আরো বহু বিষয়, যেগুলোকে সাধারণত আমলে নেয়া হয় না, সেগুলোকে আমলে নেয়ার জন্য জিন শার্প বলেন।

কেবল স্বৈরতন্ত্রকে সরিয়ে দিলেই হবে না। যে গণতন্ত্রকে আনা হবে তাকে টেকসই হতে হবে। এটা আন্দোলনের ভেতর থেকেই গড়ে তুলতে হবে। ফলে আন্দোলনের পূর্বে, আন্দোলনের সময় এবং আন্দোলনের পরে যে ধরণের পলিসি গ্রহণ করা হবে তাতে যেন গণতন্ত্রের সুস্পষ্ট উপস্থিতি ধরা পড়ে। ফলে জিন শার্পের মতে, স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির জন্য দরকার খুব সতর্কভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সৃজনশীল মাধ্যমে সেটা প্রয়োগ করা। তবে তিনিও জানেন, এবং বলেনও, এই যাত্রা বা এই আন্দোলন নিখরচা নয়, এতেও বহু কষ্ট-ত্যাগ-তিতিক্ষা করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতি হবে, জান ও মালের ক্ষতি হবে; কিন্তু হ্যাঁ, তা অবশই সহিংস আন্দোলনের চাইতে বহুলাংশে কম হতে বাধ্য।

 

অহিংস আন্দোলনের হালচাল 

জিন শার্প আন্দোলন গড়ে তোলার একটা তরিকা বাতলে দিলেও আমাদেরকে অহিংস আন্দোলনের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতাকেও আমলে নিতে হবে। এরিকা চেনোওয়েথ পরিসংখ্যান দিয়ে আমাদেরকে দুটো বিষয় দেখানোর চেষ্টা করেন। প্রথমত, গত একশ বিছর বছরে যেকয়টা আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সহিংস (৩০২) ও অহিংস (৩২৫) আন্দোলনের সংখ্যা প্রায় সমান। এখানে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, দখলদারিত্ব বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ধরণের আন্দোলনকে আমলে নেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায় যে, সত্তর দশক পর্যন্ত সহিংস আন্দোলনের হারই বেশি। কিন্তু আশির দশক থেকে ক্রমাগত অহিংস আন্দোলনের সংখ্যা বাড়ছে। একবিংশ শতকে অহিংস আন্দোলন ও সহিংস আন্দোলনের তুলনামূলক হার পূর্বের সবগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৩০-২০১৯  পর্যন্ত প্রতি দশক ধরে ধরে হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে, অহিংস আন্দোলনের সফলতার হার তুলনামূলভাবে একসময় কম থাকলেও ধীরে ধীরে সেই হার বেড়েছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের পর অহিংস আন্দোলনের সফলতার হার প্রচুর বেড়েছে, যেমন বেড়েছে অহিংস আন্দোলনের হার। কিন্তু গত দশবছর যাবত অহিংস আন্দোলনের সফলতার হার আবার আগের দশকগুলো থেকে তুলনামূলকভাবে কমছে। পাশাপাশি, সহিংস আন্দোলনের সংঘটন ও সফলতার হার দুটোই কমেছে, তবু সহিংস আন্দোলনের সফলতার চাইতে অহিংস আন্দোলনের সফলতার হার বেশি। এখন প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, কেনো অহিংস আন্দোলন ও এর সফলতার হার বেশি হচ্ছে? বা কেন জনগণ অহিংস আন্দোলনের দিকে ঝুকছেন? এবং দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, কেন গত দশ বছর যাবত সফলতার হার কমছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা এরিকা চেনোওয়েথের কাছ থেকে শুনব।

প্রথম প্রশ্নের উত্তর এরিকার বরাত দিয়ে আলী রীয়াজও তার বইয়ের উপসংহারে উল্লেখ করেছেন। এরিকা তার সাম্প্রতিক প্রবন্ধেও অহিংস আন্দোলনের দিকে নাগরিকদের ঝুঁকে পড়ার কিছু কারণ বলেছেন। সবমিলিয়ে মূল কথাগুলো হচ্ছে এমন: প্রথমত, অধিকাংশের কাছে এই ধরণের আন্দোলন ‘বৈধ ও সফল’ পদ্ধতি হিসাবে গৃহিত হচ্ছে। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের ফলে স্বাভাবিকতার ব্যাঘাত ঘটায় অনেকসময় ক্ষমতাসীনদের সমর্থকরাই তাদের স্বার্থকে পুনর্বিবেচনা করে সমর্থন পরিবর্তন করে ফেলে। দ্বিতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের কারণে তথ্য পূর্বের তুলনায় বেশি সহজলভ্য হয়েছে। যে কোনো অঞ্চলে সংগঠিত আন্দোলন খুব তাড়াতাড়ি অন্যান্য অঞ্চলে প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, সহিংসতার বাজারও তুলনামূলকভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থত, বড়ো ধরণের অহিংস আন্দোলন বিভিন্ন বিদেশী শক্তির সমর্থন পেতে সহিংস আন্দোলনের চেয়ে বেশি কার্যকর। এতে ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রধান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থকদের কাছ থেকেও সমর্থন হারায়। পঞ্চমত, অহিংস আন্দোলনের চাইতে সহিংস আন্দোলনকে কাবু করে ফেলা বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর জন্য বেশি সুবিধাজনক। উল্টো এখন রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীনরা চেষ্টা করে অহিংস আন্দোলনকে সহিংস কার্যক্রমে প্ররোচিত করে, যেন আন্দোলন বৈধতা হারায়, আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে শক্তির সাহায্যে দমন করা যায়। মনে রাখা দরকার, জিন শার্পও অনেকটা একইরকম যুক্ত দেখিয়েছিলেন। ষষ্ঠত, এই ধরণের আন্দোলন নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে সক্ষম। সপ্তমত, সময়ের সাথে সাথে মানবাধিকার ন্যায়বিচার ইত্যাদি ধারণাগুলোর বিকাশ ও বিস্তার সহিংস আন্দোলনের চাইতে অহিংস ধারার আন্দোলনকে বেশি পুষ্টি যুগিয়েছে। সর্বশেষে রয়েছে এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এই জমানাতে নাগরিকদের বিদ্রোহ, আন্দোলন, লড়াইয়ের নতুন নতুন মোটিভেশন যুক্ত হচ্ছে। যেমন, শিক্ষা, চাকরির বাজার, বেকারত্ব, জলবায়ু, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি। সাথে যুক্ত হয়েছে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা। এই সময়ের বিভিন্ন পপুলিস্ট আন্দোলনেও এই ফ্যাক্টরগুলোর উপস্থিতি লক্ষণীয়। এখন এই ধরণের আন্দোলনের ক্রমাগত বৃদ্ধিকে এরিকা সফলতা ও ব্যর্থতার নিশানা হিসেবে নিতে বলেন। ব্যর্থতা হচ্ছে যে, বিদ্যমান ব্যবস্থা সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত বা সমাধা করতে পারছে না, এবং সফলতা হচ্ছে জনগণ বিশ্বাস করছে যে, তারা বদলাতে পারবে, পরিবর্তনে সক্ষম।

জিন শার্পের মত করে এরিকাও বলেন, অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন হলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর, সংঘর্ষ পরবর্তী স্থিতিশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

তাহলে গত দশবছরে আন্দোলনের সফলতার হার কমে যাচ্ছে কেন? কারণ হিসাবে পরিবেশের পরিবর্তনকে বলা হয়। যেমন, রেজিমগুলো আরো সুরক্ষিত হয়েছে। আন্দোলন বা ক্ষোভ-বিক্ষোভের সাথে কীভাবে মানিয়ে নেয়া যায়, রাষ্ট্রগুলো তাতে আরো ভালোমত অভ্যস্ত হতে পারছে। ভাগ করো এবং শাসন করো নীতিকে কাজে লাগিয়ে অহিংস আন্দোলনকে সহিংস কৌশল নিতে বাধ্য করা হচ্ছে ইত্যাদি। এরিকা এগুলোর সাথে পুরোপুরি একমত না। তার মতে, খোদ আন্দোলনের চরিত্রই বদলে যাওয়াটা এর কারণ। প্রথমত, নব্বই ও আশি দশকের তুলনায় আন্দোলনে/সমাবেশে মানুষের অংশগ্রহণ গড়ে কমে যাচ্ছে। আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে আশি-নব্বই দশকে গড়ে ২-২.৭% জনগণের অংশগ্রহণ থাকতো সেখানে এখন ১.৩%। অহিংস আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ যত বাড়ে সফলতার হারও তত বাড়ে। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের অন্যান্য পদ্ধতি ও কৌশল বাদ দিয়ে কেবল জনসমাবেশেই মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। তৃতীয়ত, আন্দোলনগুলো খুব বেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ভিত্তিক। সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর আন্দোলন পরিকল্পনা গ্রহণে, আন্দোলনে যুক্ত বিভিন্ন গোষ্ঠীর আলাপ-আলোচনা, এবং লক্ষ্যে কম কার্যকর। এবং সবচাইতে বড়ো বিষয় হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক আন্দোলন সহজেই রাষ্ট্রের নজরদারির আওতায় চলে আসছে। চতুর্থত, আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠছে। রাষ্ট্র আন্দোলনকে সহিংস করে তুলতে ক্রমাগত প্ররোচিত করে, বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে।

আন্দোলনের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে আলাপ-আলোচনার জরুরত রয়েছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি সিভা ভৈধ্যনাথানের বরাত দিয়ে পপুলিজম বা জনবাদী রাজনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ফেসবুক আমাদেরকে যোগাযোগ সহজ করে দিয়েছে। আমরা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাথে সহজেই যুক্ত হতে পারছি। আমাদের জীবনে বন্ধুদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে। এবং দেখাই যাচ্ছে যে, আলাপ আলোচনা কেবল বন্ধুত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, লেখা, মতামত আদান প্রদানও সহজ করে তুলেছে। পৃথিবীর যে কোনো ইস্যুতেই আমরা সহজেই মতামত প্রদান করতে পারছি। যে কোনো ধরণের রাজনৈতিক তৎপরতায়, প্রচারণায় ফেসবুক বড়োসড় ধরণের ভূমিকা পালন করছে। সাম্প্রতিককালের বিভিন্ন নির্বাচন এর জ্বলজ্বলে উদাহরণ। কিন্তু সিভা ভৈধ্যনাথান ‘anti-social media’তে এইসব স্বীকার করেও দেখানোর চেষ্টা করেছেন ফেসবুক আমাদেরকে উল্টো আরো বিচ্ছিন্ন করছে, আমাদের আলাপ-আলোচনার গণতান্ত্রিক পরিসর আরো বেশি সংকুচিত করছে। ফেসবুক উল্টো উগ্র জাতীয়তাবাদী ও কর্তৃত্বপরায়ন রেজিমের উত্থানে সাহায্য করেছে। তিনি তিনটা ভয়াবহ দিকের কথা উল্লেখ করেন। এক, ফেক নিউজের ছড়াছড়ি। পূর্বে যে তথ্যটা কিছুটা হলেও সম্পাদনা বা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে আসতো এখন সেটা হচ্ছে না। ফলে কোন নিউজ সত্য আর কোনটা মিথ্যা সেটা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এবং ফেসবুক-গুগল এসবের কাঠামোর কারণেই সংবাদের ভ্যালিডেশন জানা কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত ফেসবুক বিষয়বস্তু ও ঘটনাকে বড়ো করে ফেলে, মানে এপ্লিফাই বা ম্যাগনিফায় করে ফেলে, এবং প্রচণ্ড আবেগী ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়। যেসব জিনিস ফেসবুকে সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায় সেগুলো হচ্ছে: cute puppies, cute babies, clever listicles, lifestyle quizzes, and hate speech। তৃতীয়ত, একটা ফিল্টার বাবল তৈর হয়। মানে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার কর্মকাণ্ডকে ফিল্টারিং করে একটা সংকীর্ণ চেম্বার তৈরি করা হয়, যেখানে কেবল আপনি আপনার মতের বা আপনার মতই মানুষজনদেরকে শুনতে পান। ফলে আলাপ-আলোচনার পরিসর বাড়ছে বলে মনে হলেও, আদতে সেটা কমে যায়, সংকীর্ণ হয়ে উঠে। সিভার মতে, এটা ফেসবুকের ডিজাইন ও ফরম্যাটের কারণেই হয়ে থাকে। প্রপাগান্ডার সাথে যখন এই ফিল্টার বাবলগুলো যুক্ত হয় তখন পরিস্থিতি/পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠে: Facebook users are incapable of engaging with each other upon a shared body of accepted truths… In these ways Facebook makes it harder for diverse groups of people to gather to conduct calm, informed, productive conversations’ সিভার মতে আমরা সফিস্ট্রি বা কূটতর্কের যুগে প্রবেশ করেছি। এখন আমি জানি মিথ্যা বলছি, কিন্তু কূটতর্কের মাধ্যমে ফ্যাকচুয়াল ট্রুথকেও গ্রহণ করতে রাজি নই, বরঞ্চ নন-ফ্যাকচুয়ালকে   কূটতর্ক ব্যবহার করে ‘অলটারনেটিভ ফ্যাক্টস’ হিসাবে হাজির করতে চাই। তিনি বলেন, ‘Sophistry is the dominant cultural practice of the moment. We can’t agree. We can’t agree to disagree. We can’t agree on what distinguishes a coherent argument from a rhetorical stunt.’ সিভা ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করতে বলছেন না। ফেসবুক আমাদের জীবনে এতোই ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়েছে যে, ফেসবুকবিহীণ জীবন আদৌ সম্ভব কিনা সেটাও ভাবছেন। তবে তিনি এর ব্যবহার ও ফেসবুকের কাঠামো নিয়ে আলাপ করছেন। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়া এই আলাপটা আমাদের জন্য জরুরি বলে মনে করি এই কারণে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে নাগরিক আন্দোলনের একটা বড়ো অংশ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নির্ভর। এর অনেকগুলো ইতিবাচক দিক যেমন আছে, এর বিপদের দিকগুলোও আমলে নেয়া দরকার বলে মনে করি। সিভাও রাষ্ট্রের নজরদারির কথা বলেন।

এরিকা আন্দোলনের সফলতার হার কমে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করার পাশাপাশি তিনি আশাও ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে, তার মতে, মহামারি-লকডাউন আমাদেরকে স্থির মনে আমাদের পুরো রাজনৈতিক কলা-কৌশল সম্পর্কে আরো গভীরভাবে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। মহামারি যে বৈষম্য নতুন করে উন্মোচন করেছেন সেগুলোকে ব্যবহার করার জন্য বলেন। কৌশলগত জায়গা থেকেও কিছু পরামর্শ দেন। জনসমাবেশ বা মাস মোবিলাইজেশনের পূর্বেই সতর্কভাবে পরিকল্পনা, সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলো দূর করা, ট্রেনিং ইত্যাদি করতে হবে। অর্থাৎ, সামগ্রিক বোঝাপড়াটা তৈরি করতে হবে। আন্দোলনের জন্য প্রথাগত কলা-কৌশলের বাইরে বৈচিত্র্যময় কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এমনভাবে করতে হবে যেন রাষ্ট্রীয় চাপের মুখেও একতা বজায় রাখা যায়। সবচাইতে বড়ো কথা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।

 

যেখান থেকে শুরু করতে হবে

কিছুদিন পূর্বে লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ এক নিবন্ধে দুটো প্রশ্ন তুলেছিলেন, ক্ষমতার পালাবদলেও সহিংসতা ও নিপীড়ন কমে না কেন এবং সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি কীভাবে ঘটে। আমরা যখন জুলুমের শিকার হই, জুলুমবাজ কাঠামো আমাদেরকে এই শিক্ষা দেয় যে, জুলুমের প্রতিশোধ জুলুম ও সহিংসতার মাধ্যমেই নিতে হবে। যে জুলুম করে এবং জুলুমের শিকার মানুষ যে জুলুমের মাধ্যমেই বদলা নিতে চায়, উভয়ই একই ‘কাঠামো’র শিকার। জুলুমের তীব্রতা ও ভয়াবহতা কেবল এই ধরণের প্রতিশোধ ও পরিবর্তনের শ্লোগান দেয়। লেখকের মতে, এটা ‘নির্যাতনমুক্ত মানবিক সমাজ গড়ার অভিলাষ নয়।’ আলতাফ পারভেজের কথা দিয়েই অহিংস আন্দোলন সম্পর্কিত এই প্রাথমিক আলাপের ইতি টানি: ‘একমাত্র উল্টো পথে নাগরিকেরা নির্যাতনমূলক সামাজিক সম্পর্ক বদলাতে পারে। নির্যাতনের কাঠামো ধ্বংস করার প্রতিজ্ঞা ছাড়া নির্যাতিতেরা কোনোভাবেই চূড়ান্ত জুলুম থেকে নিস্তার পায় না। এটা সেই পথ, যার মাধ্যমে নির্যাতিতেরা নিজেদের এবং একই সঙ্গে জুলুমকারীকেও নির্যাতক মানসিকতা থেকে মুক্ত করে।’

 

 

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top