নারীর প্রতি সহিংসতা – রুপালী পর্দায়

Share this:

পুরুষতান্ত্রিক এই পৃথিবীতে “নারীর প্রতি সহিংসতা” একটি বৈশ্বিক বিষয়। আর এই সহিংসতার সিংহভাগ ঘটে পরিবারে, যার গাল ভরা ইংরেজি টার্ম হলো “ডমেস্টিক ভায়োলেন্স”। পৃথিবীর খুব কম জায়গা হয়তো আছে যেখানে নারীরা নিজ পরিবারেই সহিংসতার শিকার হন না। প্রায় সারা বিশ্ব জুড়েই “ডমেস্টিক ভায়োলেন্স” থেকে

নারীদের রক্ষার্থে কিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে পশ্চিমে সহিংসতা কিছুটা কমেছে বটে, পুরোপুরি মুছে কিন্তু যায়নি। ভারতবর্ষ, আরববিশ্ব কিংবা প্রাচ্যের কথাতো বলাই বাহুল্য। নারী নির্যাতনকে সেখানে সামাজিক, পারিবারিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। বেশীরভাগ সময় প্রাচ্যের সামাজিক পরিবেশও কাজ করে নারীর বিপক্ষে। গুগল করলে বিশ্বের যেকোন দেশের পরিসংখ্যান বলে দেবে এই হার কি মারাত্বক। করোনার সময় লকডাউনে বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছে “পারিবারিক সহিংসতার উর্ধ্বগতি”। খবরের কাগজের পাতা থেকে বইয়ের মলাট বেয়ে রূপালী পর্দায় সেসবের কিছু ঝলক কখনো উঠে আসে বইকি। এই লেখায় উল্লেখ করা প্রায় সবগুলো সিরিজ ও সিনেমা সত্য ঘটনার ওপরে ভিত্তি করে নির্মিত।

এপল টিভির তৈরী করা সিরিজ “তেহরান” বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কাহিনী মূলতঃ ইস্রায়েল আর ইরানের ভেতরের দ্বন্দ্ব। দু দেশই দু দেশের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায় আর তার জন্যে শক্তিশালী গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ও যন্ত্রপাতি কিংবা প্রযুক্তি দু দেশেরই আছে। কোন দেশের গোয়েন্দা কতটা দক্ষতার সাথে অন্যের নেটওয়ার্কে ঢুকে যেতে পারে তার ওপর ভিত্তি করে এই গল্প। পেশাগত জীবনের জন্যে তাদের পারিবারিক জীবনে কি মূল্য দিতে হয় সেটিও দেখানো হয়েছে। গল্প আর মেকিং যাকে বলে দূর্দান্ত। রাজনৈতিক আর সামাজিকতা বাদেও দুই দেশের নাগরিকরা কীভাবে নিজেদের মূল্যায়ন করে সেই ব্যাপারেও খানিকটা আলোকপাত করা হয়েছে এই সিরিজে। মজার বিষয় হচ্ছে, “তেহরান” নাম হলেও এই সিরিজের শ্যুটিং ইরানে করা হয়নি। শ্যুটিং করা হয়েছে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে। যদিও “তেহরান” সিরিজটা ইসরায়েলিদের নির্মিত, তবুও তারা নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে পুরো সিরিজ জুড়েই। অবশ্য নিজেদের বানানো গল্পে কতটুকুই বা নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব! পুরো সিরিজ জুড়ে ছিলো টান টান উত্তেজনা। ইস্রায়েলি অভিনেত্রী নিভ সুলতান যিনি সিরিজে “তামর” চরিত্রটি করেছেন তিনি “ত্রুটিবিহীন” কাজের জন্য বিশ্বব্যাপি  পরিচিত। সিরিজটি মূলত পার্সিয়ান এবং হিব্রু ভাষায় নির্মিত তবে এপল কিনে নিয়ে এতে ইংলিশ সাবটাইটেল যোগ করেছে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ি দ্বিতীয় সিজনের কাজ চলছে।

 

 

তবে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার ওপর কিংবা বলা চলে চলমান সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মূল কারণ অনুসন্ধানে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ভাল সিরিজ, নেটফ্লিক্সের তৈরী “খেলাফত”। এটি সত্যি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বানানো, বেথনাল গ্রীন ট্রিও, লন্ডনের হাই স্কুলে পড়া তিন উঠতি বয়সী কিশোরীদের গল্প, দুই হাজার পনেরোর ফেব্রুয়ারীতে যারা ইসলামিক স্টেট তৈরী করার পরিকল্পনাকারী জিহাদীদের খপ্পরে পরে। স্কুল বালিকা সুলেইকা আর লিসাকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গীরা হামলা করতে চায়। সুইডিশ গোয়েন্দা ফাতিমা, সিরিয়ান বংশোদ্ভূত সুইডিশ নারী পারভিন যে ইসলামিক স্টেটে জঙ্গী স্বামীর ঘরে অনেকটা বন্দী হয়ে আছে তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের রক্ষা করা সহ, হামলা আটকাতে চায়, যার বিনিময়ে পারভিনকে সুইডেনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সওদা হয়। পারভিন কি ফিরতে পেরেছিলো সুইডেন? উইলিয়াম বেরমানের তৈরী সুইডিশ টিভির প্রযোজনায় এই সিরিজটিতে উঠে এসেছে, ইসলামী উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা, নারীর অধিকার এবং মানবাধিকার। এসটিভিত প্লে লিস্টে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি দেখা অনুষ্ঠান। ইসলামিক স্টেট দেখাতে এটির শ্যুটিং করা হয়েছে জর্ডানে। মুসলিম বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি প্রামান্য দলিল হিসেবেও এই সিরিজটির ভূমিকা অসীম।

নারীর ওপর সহিংসতায় মুসলিম তথা এশিয়ানদের কেউ বেট করতে পারবে না। সত্য ঘটনা অবলম্বনে ফরাসী-ইরানিয়ান সাংবাদিক ফ্রিদো সাহেবজামের লেখা উপন্যাস “লা ফেমে লাপিডে” প্রকাশিত হয়েছে উনিশো নব্বই সালে যা ইরানে আজও নিষিদ্ধ। এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে দুইহাজার আট সালে পার্সিয়ান ভাষায় বানানো সিনেমা, “দ্য স্টোনিং অফ সুরাইয়া এম” পরিচালনা করেছেন ইরানিয়ান বংশোদ্ভুত আমেরিকান সাইরাস নৌরাস্তা। টরেন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটি “ডিরেক্টরস চয়েস” এওয়ার্ড জেতে।  জীবনে দাগ কেটে যাবে এমন এক সিনেমার নাম “দ্য স্টোনিং অফ সুরাইয়া এম”। নামেই সিনেমার ঘটনা কিছুটা আন্দাজ করা যায়। সুরাইয়ার অত্যাচারী স্বামী আলী, গ্রামের চৌদ্দ বছর বয়সী এক মেয়েকে বিয়ে করতে মনস্থ করে। সুরাইয়াকে তালাক দিয়ে নিজের পথ থেকে সরাতে সে গ্রামের মৌলভীদের সাহায্য নিয়ে একটি ষড়যন্ত্রের নাটক রচনা করে। সুরাইয়া মারা গেলে, দুই পুত্রের খরচ দেয়ার হাত থেকে আলী বেঁচে যাবে তাই সুরাইয়াকে অপবাদ দিয়ে গ্রাম্য সালিশে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করা হয়। ইরানী বংশোদ্ভূত এমেরিকান অভিনেত্রী মোজহান মার্নো সুরাইয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছে। শেষ দৃশ্যে মাটিতে অর্ধেক পোতা সুরাইয়াকে পাথর মারার সেই রক্তাক্ত দৃশ্য সত্যিই কঠিন এবং মর্মস্পর্ষি।

 

 

 

 

“তেহরান”র হাইটেক চমকধামক আর লীডিং নারী চরিত্র দেখে “দ্য স্টোনিং অফ সুরাইয়া এম” এর সময় থেকে ইরানের বাস্তবতা পরিবর্তন হয়েছে মনে করা হবে বিরাট ভুল। সাতচল্লিশ বছর বয়সী ইরানী চলচ্চিত্র পরিচালক বাবাক খোরামদিন, লন্ডনে থাকতেন তিনি, পশ্চিম তেহরানের একবাতান নামে একটি এলাকায় তার টুকরো করা দেহ পাওয়া গিয়েছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তার বাবা-মা জানিয়েছে তারা তাকে হত্যার পর মৃতদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক এবং ইরান ইন্টারন্যাশনাল টিভির সম্পাদক জ্যাসন ব্রডস্কি দ্য ডেইলি মেইলকে বলেন, ‘ইরানে পারিবারিক সহিংসতার যে সুদীর্ঘ প্যাটার্ন আমরা দেখে আসছি, আমার ধারণা, বাবাক খোরামদিনের ভয়ঙ্কর মৃত্যু সেটির স্রেফ একটি সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।’ তিনি বলেন, ‘সমকামিতার দায়ে পরিবারের হাতে খুন হওয়া আলি ফাজেলি মনফারেদের মর্মান্তিক মৃত্যুসংবাদের রেশ ধরেই আমরা বাবাকের মৃত্যুর কথা জানলাম। গত বছর অনার কিলিংয়ের নামে বাবার হাতে শিরশ্ছেদেরমাধ্যমে খুন হওয়া ১৪ বছর বয়সী কিশোরী রোমিনা আশরাফির ঘটনাও মনে আছে আমাদের। ব্রডস্কি বলেন, দুই হাজার বিশ সালে ইরানে একটি শিশু সুরক্ষা আইন পাস হওয়া সত্ত্বেও অনার কিলিং ও পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ হয়নি। ইরানের এই বিষয়ের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর দেওয়া উচিত।‘

 

মনে দাগ কাটার মত আরও একটি সিনেমা “নট উইথআউট মাই ডটার”। বেটি মাহমুদি’র নিজের জীবনের ভয়ংকর সব অভিজ্ঞতা, ইরান থেকে পালিয়ে আসার ওপর ভিত্তি করে লেখা বই “নট উইথআউট মাই ডটার” এর চিত্ররূপ এই সিনেমা। উনিশো একানব্বই সালে তৈরী এই সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে আমেরিকা, তুরস্ক আর ইস্রায়েলে। মেয়েদের জীবন একটা অদ্ভূত চক্রের মধ্যে ঘোরে। আমেরিকা হোক আর তুরস্ক কিংবা বাংলাদেশ, কত শিক্ষিত, কত বড় চাকুরী করে, পেশাগত জীবনে কত সফল, কিন্তু কোনো কিছুই যায় আসে না, ধোঁকা তারা খাবেই। ধোঁকাবাজ প্রেমিকের হাতে পরা নারীদের যেনো অনেকটা নিয়তি। তারওপর হলো এশিয়ান আবার মুসলমান, ধোঁকাবাজিতো কোই ইন লোগো সে শিখে। কোরানে হাত রেখে মিথ্যে শপথ করে আমেরিকান বউকে ইরানে এনে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্যে অত্যাচার করাকে মাহমুদির পরিবারের কেউ অন্যায় ভাবছেই না! এমনকি ইরানী সমাজের সবাইও সেটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে! পুরো সিনেমায় ইরানে অবস্থিত আমেরিকান কনস্যুলেটের ভূমিকাটাই স্পষ্ট হলো না। হাজার হাজার আমেরিকান নারী সেখানে অত্যাচারিত হচ্ছে জেনেও তারা ইরানী আইন মেনে মুখে আঙুল চুষছে। তাহলে ইরানে কনস্যুলেট রাখার দরকার কি! ভিসা দিয়ে ইরানী পুরুষদের আমেরিকায় পাঠিয়ে আমেরিকান নারীদের বিপদে ফেলাই এই কনস্যুলেটের উদ্দেশ্যে! বন্দীদশা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায় বেটিকে দিনের পর দিন মাহমুদি পরিবারের সাথে অভিনয় করতে হয়েছে। তাদের বিশ্বাস জয়ের কি প্রাণান্ত চেষ্টা। মেয়ের জন্মদিনে কেক কাটার সময় বেটি “বিসমিল্লাহ” বলেছে, তাতে শাশুড়ি খুবই আনন্দিত দৃষ্টিতে পুত্রের দিকে তাকিয়েছে, আর পুত্র গর্বিত চোখের নীরব ভাষায় মা’কে নিশ্চিত করেছে, আমি পেরেছি মা, কাফির বউকে মুসলমান করতে পেরেছি।  ব্রায়ান গিলবার্টের পরিচালনায় ইংলিশ ও পার্সি ভাষায় বানানো এই সিনেমায় স্যালি ফ্রিল্ড ও স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত বৃটিশ-আমেরিকান অভিনেতা আলফ্রেড মলিনা অসাধারণ অভিনয় করেছে।

কৃষ্ণা ভামসির পরিচালনায় কারিশমা কাপুর আর নানা পাটেকার অভিনীত “শক্তিঃ দ্যা পাওয়ার”কে অনেকে “নট উইথআউট মাই ডটার” এর হিন্দি রিমেক বলে কিন্তু দুটো সিনেমার মধ্যে মিল খুব সামান্যই। “শক্তি” মোটা দাগের হিন্দী সিনেমাই যেখানে সবকিছু বড্ড “লার্জার দ্যান লাইফ”।

“নট উইথআউট মাই ডটার” দেখতে দেখতে বহুদিন আগে দেখা বাঙালি লেখক সুস্মিতা ব্যানার্জীর “কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ” বইটির কথা মনে পড়ে গেলো। প্রায় একই কাহিনী তবে এবার ইরানে নয় আফগানিস্তানে, মেয়ে আমেরিকান নয় বাঙালি কিন্তু তার শেষ রক্ষা হয়নি, তিনি খুন হন। দুই হাজার তিন সালে উজ্জল চক্রবর্তী পরিচালনায় “এস্কেপ ফ্রম তালিবান”, সুস্মিতা ব্যানার্জীর চরিত্রটি করেন মনীষা কৈরালা। সুস্মিতা স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে ভারতে এসে আবার সোশ্যাল ওয়ার্ক করার জন্যে আফগানিস্তানে গিয়ে স্বামীর সাথেই বসবাস করতে থাকেন। মাঝ রাতে তাকে তুলে নিয়ে বিশটি বুলেট দিয়ে তার শরীর ঝাঝরা করে দেয়া হয়, যদিও তালিবান এই হত্যার দায় অস্বীকার করেছে। সুস্মিতার বাড়ি থেকে খুনীরা শুধু সুস্মিতাকেই ধরে নিয়ে যায় বাড়ির আর কারো গায়ে আঁচরটি পর্যন্ত লাগেনি।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রসারে, মেয়েরা শিক্ষিত, স্বাবলম্বী হচ্ছে, এসময়ে মানসিকভাবে মেয়েরা যতটা পরিনত, অগ্রগামী, পুরুষেরা ঠিক ততোটা এখনো হয়ে ওঠেনি, তাই সংঘাত হয়ে উঠেছে অনিবার্য। হাজার ট্যাবু ভেঙে অনেক মেয়েই বায়োগ্রাফি লিখছেন, সেগুলো নিয়ে সিনেমা হচ্ছে, সারা পৃথিবী দেখছে, শিউরে উঠছে, আইন তৈরী হচ্ছে কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। তনু, নুসরাত থেকে মুনিয়া কিংবা হালের পরীমনি জীবিত কিংবা মৃত সবাই এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার শিকার। সুরাইয়া থেকে বেটি কিংবা সুস্মিতা খুন কিংবা খুনের হাত থেকে নিতান্ত ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া, এখানে নাম না উল্লেখ করা অসংখ্য নারীরা প্রমাণ করে দুই হাজার একুশেও বাস্তবতা বদলায়নি।

 

Cover Illustration: Amani Haydar, ABC News

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top