নিৎসের রাজনৈতিক দর্শন: উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় দায়

ফ্রেডরিখ নিৎসে এমন এক চিন্তক যিনি প্রচলিত সামাজিক, দার্শনিক বা মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাচর্চায় বিশ্বাসী ছিলেন না।তার বিভিন্ন লেখায় মেটাফোর, মেটানমির বৈচিত্র ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন দার্শনিক তার একই লেখাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিৎসের চিন্তাভাবনার তাৎপর্য হচ্ছে তার নৈতিকতা  ও মানব ক্ষমতা সম্পর্কিত পর্যালোচনা। রাজনৈতিক সীমানায় নৈতিকতা যখন প্রবেশ করে তখন তা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে।যার ফলে এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ডিসকোর্সগুলোকে নিষ্ক্রিয় ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ করে তুলে। নিৎসের দর্শন আধুনিক নৈতিকতার সমস্যার শেকড় সন্ধান করে, পাশাপাশি বর্তমানতার অবক্ষয়কে নিয়ে আত্মমুগ্ধতার ব্যাপারে সচেতন  করে তুলে।

নিৎসের রাজনৈতিক দর্শনের অধিপাঠ ও ব্যাখ্যা বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক চিন্তকরা বিভিন্নভাবে হাজির করে তার চিন্তাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছেন।যে কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে নিৎসে নিজেও উৎসাহি ছিলেন না। নিৎসকে নিয়ে যেমন অন্তর্দৃষ্টিমূলক রাজনৈতিক বোঝাপড়া রয়েছে যেগুলো সত্যিকারের চিন্তাভাবনা প্রসূত, তেমনি রয়েছে তার চিন্তাকে গভীরভাবে মোকাবিলা না করে চূড়ান্তভাবে বাতিল করে দেওয়ার প্রবণতা।আর এই প্রবণতার সূত্রপাত হয়েছে নাৎসি কতৃক নিৎসের চিন্তাকে অত্যন্ত স্থুল ও সরলভাবে ব্যবহার করার কারণে।এজন্য হানা আরেন্ট ইউরোপের রাজনীতিতে সর্বাত্মকবাদের উদ্ভদের পিছনে নিৎসের ক্ষমতার ইচ্ছা সম্পর্কিত ধারণাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

আবার নিৎসের দর্শনকে ব্যবহার করে অনেক প্রভাবশালী চিন্তকরা আধুনিক সমাজব্যবস্থার ক্ষমতা সম্পর্ককে বৈশিষ্ট্যসূচকভাবে উন্মোচন করেছেন।নিৎসের উত্তরাধিকারি হিসেবে ফুকো বা দেল্যুজের মতো চিন্তকরা গণআন্দোলন বা গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে মুক্তি না খুঁজে ক্ষমতার বিভিন্ন দিককে উন্মোচন ও তার নিয়মকে অনবরত  লঙ্ঘনের মধ্য দিয়েই মানব মুক্তিকে খুঁজে পান।নিৎসের “ধ্বংসাত্মক উত্তরাধিকারী” হিসেবে বিপ্লব বা সংস্কারের সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলার জন্য বিভিন্ন উত্তরাধুনিক দার্শনিক বিশেষত মিশেল ফুকোর দর্শনকেও একইভাবে সমালোচনা করা হয়।এজন্য ফুকো তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তার চিন্তার সাথে অনেক সমাজতন্ত্রীরা হিটলার এবং তার লেখা বই Mein Kampf এর সাথে মিল খুঁজে পান।আবার অনেকে তাকে বামপন্থী নৈরাজ্যবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। তবে ফুকো নিৎসের চিন্তার একজন উত্তরসূরি হিসেবে রাজনৈতিক নীতিগুলোর সমস্যাকে অনবরত চ্যালেঞ্জ করে গেছেন।

 

নিৎসের দর্শনের বিরাজনীতিকরণ

নিৎসের রাজনৈতিক চিন্তা বা দর্শন অনেকে অভিজাত ধারা হিসেবে চিহ্নিত করলেও এটি তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক দর্শন থেকে একধরণের রেডিক্যাল বিচ্যুত ঘটিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় যেসব সামাজিক রাজনৈতিক ধারণাগুলো সত্য ও প্রামাণিক হিসেবে পুঞ্জিভূত হয়ে ওঠে,এসব বদ্ধমূল ধারণাকে পালটে দেওয়াই ছিলো নিৎসের  লক্ষ্য।তার চিন্তাধারার মধ্যে নিজস্বতা এতো বেশি যে এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিক চিন্তাধারার একজন হয়েও যেনো তিনি এগুলো থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন। নিৎসে রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধীতা ও বিরাজনীতিকরণের স্বেচ্ছচারিতা প্রধানত রাজনৈতিক দর্শনের দুটি ধারা থেকে এসেছে ;লিবারেল ও মার্কসবাদী ধারা।অনেক সময় নিৎসকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তার সাথে বিশ্লেষণাত্মক সংযোগ খুবই ক্ষীণভাবে উপস্থিত থাকে।নিৎসের পর্যালোচনার মধ্যে যে রাজনৈতিক রূপান্তরের চিন্তাসমূহ রয়েছে তার তাৎপর্যকে পূর্ণঙ্গভাবে আলোচনা না করে তাকে শুধুমাত্র নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা লিবারেল ও মার্কসিবাদী বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তকদের মধ্যেই রয়েছে।এর কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক বর্তমানতার যথাবিধি বৈধতা সম্পর্কে নিৎসে গভীর সংশয়বাদী ছিলেন।নিৎসে রাজনৈতিক দর্শনকে কোন সুনির্দিষ্ট বা বিরাজমান ফ্রেইমওয়ার্কের ভিতর দিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ করেননি।তার দর্শন অনবরত ক্ষমতাসম্পর্ক ও জ্ঞানের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে প্রনোদিত করে।সমসাময়িকতার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও কাঠামো সম্পর্কে তার উপলব্ধি ছিলো; এগুলোর সীমানাকে লঙ্ঘন করা।কেননা মানুষের নৈতিকতার মূল্যবোধ তার রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে একক ও বিকল্পহীন ব্যবস্থাপনা হিসেবে উপস্থাপন করে যা অলঙ্ঘনীয় ও শাশ্বত।এ নৈতিক ও যৌক্তিক কাঠামোর একক আদর্শকে নিৎসে মোকাবিলা করেছেন। নিৎসেকে বিভিন্নভাবে জার্মান নাৎসিবাদের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও তিনি জার্মান জাতীয়তাবাদকে একধরণের ‘উন্মত্ততা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। লিবারেল রাজনৈতিক নীতিতত্ত্বের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে ক্রিটিক করাই ছিলো তার লক্ষ্য।লক বা রুশোর মাধ্যমে যে লিবারেল রাজনৈতিক নীতিতত্ত্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নিৎসে সেটিকে তার জিনিওলজি পদ্ধতির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।নিৎসে  ক্ষমতাকে সামাজিক চুক্তির মতবাদের মতো কোন ধরণের বৈধ প্রক্রিয়ার উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন না বরং ক্ষমতাকে তিনি প্রভু শ্রেণীর আধিপত্য ও নৈতিকতার প্রসারিত রূপ হিসেবে দেখতেন।সামাজিক চুক্তির মতবাদের মধ্যে দিয়ে সমাজ ও রাজনৈতিক পরিসরে ক্ষমতা খুবই প্রভাবশালী সম্ভাব্যতা তৈরি করে যার বিপরীতে নিৎসে ক্ষমতার প্রকৃত উৎসকে সন্ধান করে তাকে দমন করতে চেয়েছেন।ক্ষমতাকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্ন রাজনৈতিক দর্শনে উত্থাপন করা হয়নি নিৎসের কাজ ছিলো সেগুলোকে উত্থাপন করা৷ তাই তার চিন্তা পূর্ব নির্ধারিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ধারা ও উদ্দেশ্য থেকে ভিন্ন হয়ে ওঠে।যার ফলে নিৎসের রাজনৈতিক চিন্তা লিবারেল চিন্তাভাবনার চলমান ধারার কাছে জটিল ও অস্বস্তিকর হিসেবে হাজির হয়।নিৎসে গণতন্ত্রকে খ্রিস্টান ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করেছেন।লিবারেল রাজনৈতিক দর্শনের যে বিষয়গুলো রয়েছে তার সত্তাতাত্ত্বিক (ontological) অবস্থামূহকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে তিনি মূলত নতুন এক দর্শনের কথা বলেন।

একইসাথে তিনি পশ্চিমা ইতিহাসবাদের ঐতিহ্যের মোড় ঘুরিয়েছেন তার জিনিওলজির মাধ্যম,  যা প্রথাগত মার্কসবাদীদের জন্য অস্বস্তিকর।নিৎসের দর্শন হচ্ছে সমাজ, ইতিহাস ও বিপ্লবের সাধারণ সূত্রের বিরুদ্ধে একধরণের সতর্কবার্তা। মিশেল ফুকো নিৎসের জিনিওলজি বা উৎপত্তিসন্ধানকে ”পরিপক্ক,সুবিবেচনাপূর্ব ও সহিঞ্চু প্রামাণিক” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি নৈতিকতার ইতিহাসকে ‘রৈখিক বিকাশ’ হিসেবে বিবেচনা করেনা। অর্থাৎ নিৎসের উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতি প্রথাগত মার্কসবাদের ইতিহাসের দর্শনের মধ্যে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্লেষণের ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারণার সত্তাগত তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে আমরা জ্ঞাত হই যে স্বাধীনতার মতো ধারণা ‘শাসক শ্রেণীর আবিষ্কার।’ অর্থাৎ এটি মানব প্রকৃতির কোন সহজাত বিষয় নয়। কারণ শ্রেণী আধিপত্যের ঔরস থেকেই স্বাধীনতার ধারণা উঠে এসেছে। এ স্বাধীনতার মূলে রয়েছে সহিংসতা ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা।এই ধরণের স্বাধীনতাকে মানবমুক্তির বিষয় হিসেবে চর্চা করার ফলে মানবমুক্তির সম্ভাবনাকে রৈখিক, প্রগতিশীল  সম্ভাবনার মধ্যে কাঠামোবদ্ধ করে রাখে। নিৎসের দর্শন খুবই সরলভাবে কোন ধারণাকে মুক্তির বার্তাবহ বা নির্যাতনের উৎস হিসেবে মেনে নেয়না।নিৎসের দর্শনকে রাজনৈতিক বা সামাজিক মুক্তির সম্ভাবনার পথে বাধা হিসেবে যেসব মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা মনে করেন হাবারমাস তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। নিৎসকে তিনি হবস, ম্যাকিয়াভেলি এবং মারকুয়েজ দ্য সাদের মতো বুর্জোয়া সমাজের একজন ‘ডার্ক’ লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেন। যাদের চিন্তার সাথে মার্কসের সমাজিক তত্ত্বের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে।

 

নিৎসের রাজনৈতিক দর্শন

নিৎসে রাজনৈতিক দর্শন হচ্ছে লিবারেলিজমের তাৎপর্যপূর্ণ পর্যালোচনা যা প্রথাগত রাজনৈতিক দর্শন ও নীতিসমূহকে চ্যালেঞ্জ করে।তবে তা ভবিষ্যতে চূড়ান্ত কোন রাজনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন করেনা।এটি নিৎসের অন্যতম প্রভাবশালী ভূমিকা যে তিনি আলাদাভাবে কোন রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠা না করলেও উদারবাদ, জাতীয়বাদ ও সমাজতন্ত্রকে রাজনৈতিক চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্যসূচক সীমাবদ্ধতাকে গভীরভাবে উন্মোচন করেছেন।পাশ্চাত্যের দর্শনের চলমান চিন্তাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচন করাই ছিলো তার দর্শনের লক্ষ্য। এরিস্টটল থেকে শুরু করে দেকার্ত, স্পিনোজা বা হেগেল সবাই নিৎসের পর্যালোচনামূলক চিন্তার আওতায় ছিলেন।নিৎসের রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে Will to power বা ক্ষমতার ইচ্ছা।ক্ষমতার ইচ্ছাকে নিৎসে দেখেছেন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। ক্ষমতা বাসনার দুটি দিক রয়েছে ;ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক। রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক যে কোন ধরনের শাসনপ্রণালীতে ক্ষমতার ইচ্ছাকে চর্চা করা হয়।

আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষমতার বাসনাকে প্রয়োগ ও চর্চা করে।ক্ষমতার ইচ্ছা বা বাসনাকে যখন ব্যক্তি হারিয়ে ফেলে তখন তার মধ্যে অবক্ষয় শুরু হয়।এই অবক্ষয়ের বৈশিষ্ট্য দাস শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান।নিৎসের রাজনৈতিক বা ক্ষমতা দর্শনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ‘দাস’ ও ‘মনিবের’ মধ্যমার দ্বন্দ্ব।নিৎসে দাস ও মনিব এই দুই শ্রেণির লোকের কথা বলেছেন।দাস হচ্ছে এমন এক শ্রেণী যারা তাদের ক্ষমতার ইচ্ছা (Will to power) হারিয়ে নিজেদের  অবক্ষয় ঘটিয়েছে। আর এই অবক্ষয় ঘটানোর ক্ষেত্রে অন্যতম কৌশল হচ্ছে মনিব শ্রেণির নৈতিকতার ধারণা।যে নৈতিকতার মধ্য দিয়ে দাসের সাথে যোগাযোগ ও ক্ষমতার সম্পর্ক গড়ে তুলে। নিৎসের মতে পূর্বাকার দার্শনিকরা নৈতিকতাকে ক্ষমতার ইচ্ছার আলোকে না দেখায় নৈতিকতার সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক কেন্দ্রিয় বিষয়কে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হননি।তারা নৈতিকতাকে শুধুমাত্র ভালো এবং মন্দের বাইনারি ভিত্তিতে দেখেছেন।বাইনারিভিত্তিক মানদণ্ডের বাইরে এসে নিৎসে নৈতিকতাকে পর্যালোচনা করেছেন।এজন্য নিৎসে শোপেনহাওয়ারের যে অনুভূতিশীল নৈতিকতার ধারণা রয়েছে তাকে ক্রিটিক করেছেন।কারণ এটি নিলাবেরল নৈতিকতার প্রকৃত উৎসকে ধারণ করেনা।প্রকৃত উৎসের মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার ইচ্ছা আর সহিংসতা।নিৎসের মতে ‘ভালো’ শব্দের ব্যুৎপত্তি-অনুযায়ী এটি ‘মহৎ’ এবং ‘অভিজাত’ সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পর্কিত।অন্যদিকে ‘নীচ’ ‘অভিজাতহীন’ ‘সাধারণ’ ধারণাগুলোর সাথে ‘মন্দ’ শব্দটি সম্পর্কিত। গণতান্ত্রিক এবং আধুনিক বিশ্বের এসব ভালো বা মন্দ ধারণা সাথে পক্ষপাত ও কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।এসব কৌশলগত ও পক্ষপাতমূলক ভালোর ধারণাকে যারা সমর্থন ও চর্চা করেন তারাই নিজেদের অভিজাত ও মহত্ত্বের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।এখান থেকে অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ববোধের ধারণা তৈরি হয়।অভিজাত শ্রেণী তাদের নৈতিকতা ও আধিপত্য চর্চার মধ্য দিয়ে তাদের অধীনস্থ লোকদের মধ্যে যে ক্ষমতার ইচ্ছা রয়েছে তা থেকে তাদের বিচ্যুত করেন।দাসরা প্রভুদের বিভিন্ন সময় প্রতিরোধের প্রচেষ্টা করলেও দাস ও মনিবের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বারবার ফিরে আসে,নিৎসের ভাষায় যাকে বলা হয় (Eternal recurrence) নিরন্তর ফিরে আসা।

মানুষের মধ্যে আইনগত ও নৈতিক সম্পর্ক ক্ষমতার শ্রেষ্ঠত্ববোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও শ্রেণীবিন্যাসকৃত। গণতান্ত্রিক সমাজে যেসব অভিজাত ও মুক্ত স্বাধীন  লোকেরা ইচ্ছার স্বাধীনতার কথা বলেন তাদের ইচ্ছার স্বাধীনতার ধারণার মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ ধরণের ক্ষমতা। এ ক্ষমতাবলে মানুষ তার নিজের,তার জাগতিক অবস্থান,প্রকৃতি ও অন্যানী প্রাণীর উপর ক্ষমতা চর্চা করে। প্রকৃতি ও প্রজাতির উপর মানুষ ক্ষমতা চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিক গুণাবলিকে সক্রিয় রাখে।ইচ্ছার স্বাধীনতার মতো আধুনিক শাস্তি ব্যবস্থাপনার উৎপত্তি ও বিকাশকে নিৎসে ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পাঠ করেন।আধুনিক শাস্তি ব্যবস্থাপনা হচ্ছে নতুন ধরণের ক্ষমতার রূপান্তর।আধুনিক শাস্তির মাধ্যমে মূলত শাসক বা প্রভু শ্রেণীর ক্ষমতার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়। শাস্তি হচ্ছে প্রকৃতির রাজ্য থেকে উদ্ভুত প্রতিশোধের স্পৃহার সাথে সমঝোতা।১০ আধুনিক শাস্তির ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের উপর ক্ষমতা চর্চা করা।মিশেল ফুকো পরবর্তীতে যে ক্ষমতা চর্চাকে জৈব ক্ষমতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।মানুষকে শাস্তির আওতায় নিয়ে এসে আধুনিক শাসনব্যবস্থা তার  ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠিত করে। এ ন্যায়বিচারের সারসত্তাকে নিৎসে ভ্রান্ত হিসেবে প্রতিপ্রন্ন করেন। ন্যায়বিচারের ধারণা সাথে যে ভালোত্বের বৈশিষ্ট্য জুড়ে দেওয়া হয় নিৎসে সেগুলোকে অন্তঃসারশূণ্য হিসেবে মনে করেন,কেননা আধুনিক ন্যায়বিচার সম্পর্কিত ধারণা বিকাশ ঘটেছে আলোকায়িত  ‘আত্মরক্ষার’ চিন্তা থেকে।১১ ন্যায়বিচার যে ভারসাম্যের কথা বলে সে ভারসাম্যের কারণই হচ্ছে শাস্তির মাধ্যমে সামাজিক ক্ষমতা সম্পর্ককে বন্টন করা। এই ক্ষমতার বন্ঠনকে নিৎসে রাষ্ট্রের কঠোরতার অপরিহার্য অবস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেন।১২ নিৎসের রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা লক বা রুশো মতো চিন্তকদের চেয়ে ভিন্ন ছিলো। তিনি রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কিত সামাজিক চুক্তি মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার মতে রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছে ‘সামরিক কৌশলের’ মাধ্যমে।১৩ নিৎসে রাজনৈতিক জীবনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা না করে একে মহামানব তৈরি ও অভিজাত সংস্কৃতির পুনর্গঠনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করতেন। নিৎসের মতে তিনি সুপ্যারমান বা অতিমানব শব্দটি ব্যবহার করেছেন ”আধুনিক ব্যক্তির ” নৈতিকতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করার জন্য।১৪ তবে নিৎসে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের ক্ষেত্রে জাতিয়তাবাদ বা উগ্রজাতীয়তাবাদের অধীন কোন গণ আন্দোলনের কথা বলেল নি। উগ্র জাতিয়তাবাদ,বর্ণবাদকে নিৎসে তার বিভিন্ন রচনায়  ব্যঙ্গ,বিদ্রুপ করেছেন।

 

নৈতিকতার উৎপত্তিসন্ধান সম্পর্কে নিৎসে

নিৎসের রাজনৈতিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে আর্থার শোপেনহাওয়ার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন যা তিনি বিভিন্ন সময় তার বিভিন্ন লেখায় স্বীকার করেছেন।নিৎসেই সর্বপ্রথম শোপেনহাওয়ারকে গুরুত্বের সাথে চর্চা শুরু  করেন।শোপেনহাওয়ার ছিলেন প্রথমদিককার একজন ইউরোপীয় বৌদ্ধ দার্শনিক। শোপেনহাওয়ার দর্শন এরিস্টটল, কান্ট এবং হেগেলের দর্শনকে গতানুগতিক ধারা থেকে ভিন্নভাবে পর্যালোচনা করে,এজন্য নিৎসে শোপেনহাওয়ারকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন।

নিৎসে পশ্চিমা সেক্যুলারাইজড সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে উৎপত্তিসন্ধান (genealogical) পদ্ধতির মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে এর বিভিন্ন ডিসকোর্সসমূহ উৎপত্তির ক্ষেত্রে সামাজিক অনুশাসনসমূহ কিভাবে ভূমিকা রেখেছে। যে পদ্ধতিকে পরবর্তী মিশেল ফুকো বা এডওয়ার্ড সাইদ ব্যবহার করেছেন। নিৎসে দর্শন উত্তরাধুনিক চিন্তা বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। নিৎসে তার নৈতিকতার উৎপত্তি অনুসন্ধান পদ্ধতির মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে খ্রিস্টান নৈতিকতার মাধ্যমে মানব সভ্যতার অবক্ষয় ঘটেছে।যে অবস্থান ও শর্তগুলোর মধ্য দিয়ে নৈতিকতার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে এগুলোকে নিৎসে ক্রটিযুক্ত মনে করতেন।তাই তিনি তিনি ঈশ্বরের মৃত্যু ও খ্রিস্টান নৈতিকতার প্রস্থানের মধ্য দিয়ে এক নতুন সম্ভাবনাময় সমাজের কথা বলেছেন। নিৎসের উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতির লক্ষ্য হচ্ছে নৈতিকতার ক্রিটিক সম্পর্কে ‘তীক্ষ্ণ’ ও ‘নিরপেক্ষ’ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটানো।১৫ নিৎসের নৈতিকতার উৎপত্তিসন্ধান নৈতিকতাকে ভ্রান্তি পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করে, যেই ভ্রান্তি পদ্ধতিকেই মানুষ তার জীবন যাপনের অংশ করে নিয়েছে।যার ফলে মানুষের ইচ্ছা তার নিজের জীবনের বিরুদ্ধে কাজ করে। আর এটি হচ্ছে মানুষের নিজ সম্পর্কে গভীর অজ্ঞতার ফলাফল।নিৎসের মতে মানুষ নিজেই তার নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে অপরিচিত।১৬ কারণ সে নিজের ব্যাপারে এতোটা মনযোগী বা আগ্রহী নয়।

তিনি তার ‘The Gay Science’ বইয়ে মানুষের চারটি ভ্রান্ত বিষয় দ্বারা  পরিচালিত হওয়ার কথা বলেছেন। যেগুলো হচ্ছে : মানুষ তার নিজেকে অর্ধ বা অপূর্ণাঙ্গভাবে দেখে ; মানুষ তার নিজেকে কল্পিত গুণাবলি দ্বারা অলঙ্কৃত করে; মিথ্যা মর্যাদাক্রমের মাধ্যমে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রাণীর সাথে তার সম্পর্ক স্থাপন করে, যার ফলে সে প্রকৃতি ও অন্যান্য প্রজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে এগুলোর উর্ধ্বে স্থাপন করে। সর্বশেষ বিষয় হচ্ছে ভালোত্বের বিভিন্ন গুণাবলি বা বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার বা নির্মাণ করা যা শাশ্বত এবং শর্তহীন।১৭ নিৎসে এভাবে আধুনিক নৈতিকতার চেতনা ও নৈতিকতার বর্গসমূহের প্রতি ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটিয়েছেন।

নৈতিকতার মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে ভালো এবং মন্দের ধারণা।ভালো এবং মন্দের ধারণা সামাজিক প্রথার সাথে সম্পর্কৃত। ভালো বিষয়টি সামাজিক প্রথার কোন কল্যানের সাথে জড়িত।এবং কোনকিছুর কল্যাণ থেকে বিচ্যুত বিষয় হচ্ছে খারাপ বা মন্দ।অর্থাৎ ভালো এবং মন্দ সামাজিক বলপ্রয়োগের মধ্যে তৈরি হয়েছে এবং টিকে আছে। নিৎসের মতে ভালোর বিষয়টির সারসত্তা আমাদের সামনে যেভাবে হাজির হয়, বাস্তবিক ভালো বিষয়টি এতো ভালোত্ব থেকে উৎপত্তি হয়নি। এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে সর্ব শক্তিমত্তার,উচ্চস্থানীক ও উচ্চ মানসিকতার।১৮ নৈতিকতার উৎপত্তিসন্ধান সম্পর্কে নিৎসে চূড়ান্ত মন্তব্য হচ্ছে ‘ভালো’ এবং ‘মন্দ’, ‘ভালো’ এবং ‘নিকৃষ্ট’ এগুলো হাজার হাজার ধরে পরস্পরের বিরুদ্ধে ভয়াবহে যুদ্ধে লিপ্ত।১৯

 

নিৎসের রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব

নিৎসের চিন্তাসমূহ নতুন এক দর্শনে উত্তরণে পথ দেখিয়েছে, যাকে উত্তর-আধুনিক দর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।নিৎসের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা যারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মিশেল ফুকো,জ্যাক দেরিদা ও জিল দেল্যুজ।এরা সবাই নিৎসেকে ব্যবহার করেছেন তাদের নিজেদের মতো করে।তাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে নিৎসের দর্শন হচ্ছে অন্যতম সূত্র।নিৎসের দার্শনিক চিন্তাভাবনা বিভিন্ন সময় তাদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে। তাই সব ধরণের নির্ধারিত রূপ বা বর্গকে ক্রিটিক করা, কোন ধরণের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নিকট সমর্পন না করাই তাদের চিন্তার অন্যতম লক্ষ্য। নিৎসের আধিবিদ্যা সম্পর্কিত যুক্তিতর্কের অন্যতম লক্ষ্য প্লেটোনিক চিন্তাভাবনা থেকে বিচ্ছেদ ঘটানো।ফুকো,দেরিদা ও দেল্যুজ রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত দিক থেকে প্লেটোনিক অভিজাতবাদ থেকে বিচ্যুত ছিলেন।

ফুকো তার Discipline and Punish গ্রন্থে যেভাবে লিবারেল সমাজের ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে অনুশাসতান্ত্রিকতার স্বরূপকে উন্মোচন করেন তা যেনো নিৎসের Genealogy of Morality গ্রন্থেরই বর্ধিত চিন্তার প্রতিফলন।যে রচনার মধ্যে দিয়ে নিৎসে লিবারেল সমাজের বৈধ ক্ষমতা চর্চার গুরুতর দিকটির প্রতি আলোকপাত করেছেন।ফুকো নিৎসের মতোই মানবমুক্তির জন্য কোন ধরণের সুসংগঠিত রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রধান করেননি,যে তত্ত্বগুলো আবার হয়ে ওঠবে বাস্তবতা ও ক্ষমতা চর্চার নতুন এক কৌশল।ফুকোর রাজনৈতিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে যে রাজনৈতিক সম্পর্কগুলোকে সন্দেহ বা সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা হতোনা সেগুলোকে তিনি সবার সামনে নিয়ে এসেছেন।

ফুকোর ক্রিটিকের কেন্দ্র ছিলো সব প্রকারের প্রাতিষ্ঠানিক সার্বভৌমত্বকে অনবরত প্রশ্নবিদ্ধ করা। তার ক্রিটিকের মাধ্যমে সব ধরণের রাজনৈতিক ‘লিবারেল’ তত্ত্বচিন্তার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা প্রকটভাবে বাস্তবিক রূপ নেয়। ফুকোর ক্রিটিকের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার যে লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো তা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফুকো ক্ষমতাকে শুধুমাত্র শাসক এবং শাসিত সম্পর্কিত বাইনারির মধ্য দিয়ে দেখার লিবারেল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত করে ক্ষমতাকে জটিল সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করেন।তার ক্ষমতা সম্পর্কিত অন্তর্দৃষ্টি হচ্ছে বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্ক বহুরকম ও বহুরৈখিক।

নিৎসে দ্বারা প্রভাবিত ফুকোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা পাগলামির ইতিহাস এ পাগলামি সম্পর্কিত অন্তর্দৃষ্টি যেনো নিৎসের জীবন ও দর্শনকেই প্রতিফলিত করে। নৈতিকতার ইতিহাসে পাগলামিকে নিৎসে গুরুত্ব ও অন্তর্দৃষ্টির সাথে বিবেচনা করার কথা বলেন।২০কেননা সামাজিক প্রথা দ্বারা আরোপিত নৈতিক সত্যের সীমানাকে লঙ্ঘন করা হচ্ছে একধরণের পাগলামি।ফুকো তার পাগলামির ইতিহাসে পাগলামিকে যুক্তির পরিপূরক এক প্রপঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।এর মাধ্যমে তিনি মানবিক বিজ্ঞান ও মানবিক যুক্তির ইতিহাসকে পর্যালোচনা করেছেন।হাবারমাসের মতে ফুকো যখন মানবিক বিজ্ঞান ও যুক্তি সম্পর্কে পর্যালোচনা করছিলেন তখন নিৎসের প্রভাবে তিনিও ছিলেন একধরনের ‘মানবিক বিজ্ঞান বিরোধী।’২১

নিৎসের দর্শন  দ্বারা প্রভাবিত আরেক চিন্তক জিল দেল্যুজ, যিনি নিৎসে ও দর্শন নিয়ে বই লিখেছেন। দেল্যুজ নিৎসে বা ফুকোর মতো লিবারেল ও গণতান্ত্রিক ক্ষমতা সম্পর্ককে নতুন দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।দেল্যুজ শাসন ও শোষণের প্রতিরোধের বাইরে ক্ষমতাকে আরো বিস্তৃত আকারে দেখেছেন।লিবারেল গণতন্ত্রে ক্ষমতাকে বন্ঠনের মাত্রার বিস্তৃতি অনেক।ক্ষমতা বৈচিত্রভাবে তার বৈচিত্র কেন্দ্রকে নির্মাণ করে।ক্ষমতা বিভিন্ন খন্ডিত রূপের ফলে একজন ব্যক্তি একক ও নির্ধারিত কোন পরিচয় বহন করেনা।ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্তে ব্যক্তির ভিন্ন পরিচয়গত রূপ লাভ করে। রাষ্ট্র থেকে শুরু করে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের মধ্যে ভিন্ন ধরণের ক্ষমতা চর্চা ক্রিয়াশীল।প্রত্যেক ব্যক্তিই বিভিন্নরূপে এসব খন্ডিত ক্ষমতা চর্চার সাথে সম্পৃক্ত হয়। দেল্যুজ এ ধরণের ক্ষমতাকে মাইক্রোপলিটিক্স হিসেবে অভিহিত করেন যা ‘খন্ডিত’ এবং একইসাথে ‘কেন্দ্রিভূত।’২২

জ্যাক দেরিদার উপর নিৎসের প্রভাব হচ্ছে তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক দর্শন।বিশেষত নিৎসের লেখা On Truth and Lie in an Extra-moral Sense প্রবন্ধটি।যে প্রবন্ধে নিৎসে ভাষার সৃষ্টি ও অভিব্যক্তির মধ্যে সত্যের বিচ্যুতি ও শ্রেণিবিন্যাসের কাঠামোবদ্ধ দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন।নিৎসের মতে আমাদের ভাষার মধ্যে থাকা কতগুলো “বাধ্যতামূলক” রীতিনীতির মধ্য দিয়েই সত্য নির্মিত হয়।২৩ দেরিদা তার দর্শনের মধ্য দিয়ে এই লগোসেন্ট্রিজম বা বাক-কেন্দ্রিকতার সীমানাকে প্রলম্বিত বা লঙ্ঘিত করেছেন।অর্থের যে নিয়ম দ্বারা আমাদের সমাজ শাসিত সে নিয়মকে অতিক্রম করাই ছিলো তাঁর লক্ষ্য।জ্যাক দেরিদা, নিৎসের পাশাপাশি সস্যুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর ভাষাদর্শনের ক্ষেত্রে নতুন এক বাঁক নেন।সস্যুর মানব উচ্চারিত ভাষাকে লিখিত ভাষার উপর গুরুত্বারোপ করেন।লিখিত ভাষা হচ্ছে তুলনামূলক অপবিত্র ও অশুদ্ধ। দেরিদা এই জায়গায় সস্যুরের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন।দেরিদা তাঁর ‘Of Grammatology’ বইতে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন লিখিত ভাষার প্রতি সস্যুরের এই দৃষ্টিভঙ্গি অধিবিদ্যক ঐতিহ্যের ফল।ঐতিহাসিকভাবে পাশ্চাত্য অধিবিদ্যার জনক প্লেটো এ ধারণার বিকাশ ঘটনা যে মুখনিঃসৃত বাণী হচ্ছে সবচেয়ে পবিত্র।এরিস্টটলের মতে ‘মুখের ভাষা হচ্ছে মানসিক অভিজ্ঞতার প্রতীক, আর লিখিত ভাষা হচ্ছে মুখের ভাষার প্রতীক’২৪ এই ধারণা রুশোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।উচ্চারিত ভাষা যেহেতু প্রাকৃতিক তাই তা পবিত্র, লিখিত ভাষা মানব সৃষ্ট তাই তা অপবিত্র এবং বিপদজনক। কিন্তু এই ধারণাটি স্বয়ং রাজনৈতিকভাবে বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে।এটি লিখিত স্ফুরণকে দমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। জ্যাক দেরিদা উচ্চারিত ও লিখিত ভাষার মধ্যে প্রভেদ তৈরিতে অনাগ্রহী ছিলেন।রুশোর মতে ‘লেখা বিষয়টি কথা বলার উপস্থাপিত রূপ ব্যতীত কিছুনা।’২৫ দেরিদা রুশোর এই ধারণাকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। প্রত্যেকটি শিশু জন্মের পর যে তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে শুরু করে এর সাথে লেখারও সম্পর্ক রয়েছে।সে একটি অর্থবোধক শব্দ উচ্চারণ করতে পারে কারণ এই শব্দ সম্পর্কে মানসিকভাবে তার একটি লিখিত ইমেজ তৈরি হয়।দেরিদা মতে মুখের ভাষা ইতিমধ্যেই লিখিত ভাষার অধীন হয়ে আছে।২৬আমাদের সমস্ত পৃথিবীই হচ্ছে ভাষা কেন্দ্রিক।প্রত্যেকের জন্ম হয় ভাষার একটি নিয়মের মধ্যে যা পূর্বনির্ধারিত৷ যখন একজন ব্যক্তি তার নিজের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে তখন ভাষাও তার নিজের কথা বলতে শুরু করে। কারণ প্রত্যেকটি ভাষারই রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। সে ইতিহাসের মধ্য দিয়েই ভাষার বিভিন্ন শব্দের অবস্থান তৈরি হয়।ভাষার মধ্যে একই শব্দ একেক সময় একেক অর্থের বিচ্ছুরণ ঘটায়।ভাষার বিভিন্ন অর্থকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার পরও কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে যায় যাকে দেরিদা ‘এপোরিয়া’ বলে অভিহিত করেন।এজন্য ভাষার মধ্যে সত্যকে বিশেষভাবে খোঁজতে হয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেরিদার নির্মিত সত্য সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার একটি গুরুত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও কর্মপদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই বিভিন্ন নির্মিত সত্যের আওতায় আসেন।তারা নিজেদেরকে সবসময় দেখানোর প্রচেষ্টা করেন যে তারাই সত্য। দেরিদা মতে সত্য বিষয়টি প্রলম্বিত এবং বিস্তৃতি। এজন্য এসব সত্য ও জ্ঞানভাষ্যকে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করাই হচ্ছে দেরিদার ডিকন্সট্রাকশন।ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে দেরিদার ডিকন্সট্রাশন নতুন সম্ভাবনাকে তৈরি করে। সত্যকে নিরন্তরভাবে খোঁজার জন্যই বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার বিষয়টির প্রয়োজন।

 

পরিশেষ

উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিভিন্নভাবে অন্যান্য চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে।এম্বেমবে বা আগামবেনের মতো দার্শনিকদের রাজনৈতিক তত্ত্বচিন্তা সমূহ উত্তরাধুনিক চিন্তাসমূহকে ক্রিটিক করেই বিকশিত হয়েছে।আবার অনেক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে উত্তরাধুনিকতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।নোয়াম চমস্কি বা রিচার্ড রর্টির মতো চিন্তকদের উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাধারার ব্যাপারে একধরণের উদ্বেগ রয়েছে।উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাবে “সত্যোত্তর রাজনীতি” (post-truth politics)সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিকে রিচার্ড রর্টি ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে মনে করেন।রর্টি মনে করেন সত্যিকারের সামাজিক সংস্কার এবং বৈষম্যকে প্রতিরোধ করা সত্যোত্তর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সম্ভব নয় বরং তা সমাজিক পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিকর।২৭ এর মধ্য দিয়ে চলমান রাজনীতি সামগ্রিকতাকে উপলব্ধি করা যায়না।এজন্য উত্তারাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে পর্যবেক্ষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ ও চর্চা করার প্রয়োজন। নতুবা গঠনমূলক ও উৎপাদনমূলক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার বিস্তৃতি তার নিজের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। যার ফলে কোন ধরণের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবেনা।

 

 

তথ্যসূত্রঃ

১)মিশেল ফুকোর সাথে সাক্ষাৎকার, রাজনীতি ও নীতিতত্ত্ব,অনুবাদ: রূপা স্যানাল। www.academia.edu/44160238/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF_%E0%A6%93_%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%A4_%E0%A6%A4_%E0%A6%AC%E0%A6%83_%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B2_%E0%A6%AB%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%B0_%E0%A6%B8%E0%A6%99_%E0%A6%97%E0%A7%87_%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF_%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%95_%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A7%8E%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0?email_work_card=thumbnai

২)ফজলুল আলম, এ যুগের তিন দিকপাল: ফ্রিডরিখ নীৎসে মিশেল ফুকো নোয়াম চমস্কি, প্রথমা প্রকাশনী,২০১৪, পৃ.১৩

৩)Michel Foucault, “Nietzsche, Genealogy, History.” In Language, Counter-Memory Practice: Selected Essays and Interviews, Edited by D.F. Bouchard. Ithaca, Cornell University Press 1977, p.139

৪)Ibid, p.142

৫)Ibid, p.150

৬)Jurgen Habermas, The Philosophical Discourse of Modernity, Translated by Frederick Lawrence, 1998, Cambridge, UK .p.106

৭)Friedrich Nietzsche,On the Genealogy of Morality,Edited by Keith Ansell-Pearson,Translated By Carol Diethe, Cambridge University Press,UK. 2006,p.13

৮)Ibid,p.37

৯)Ibid,p.51

১০)Ibid,p.53

১১)Ibid,p.124

১২)Ibid,p.129

১৩)Ibid,p.172

১৪)ফ্রিডরিখ নিৎসে,আমি কিভাবে এতো উন্নতমানের গ্রন্থ লিখি,অনুবাদ ফজলুল আলম,প্রাগুক্ত পৃ.২১

১৫)Friedrich Nietzsche,Ibid,p.xvii

১৬)Ibid,p.3

১৭)Ibid,p.xvi

১৮)Ibid,p.12

১৯)Ibid,p.31

২০)Ibid,p.135

২১)Jurgen Habermas,Ibid,p.241

২২)Gilles Deleuze  and Felix Guattari, A Thousand  Plateaus: Capitalism and Schizophrenia, Translation and Foreword by Brian Massumi, University of Minnesota Press, London (2005), p. 210

২৩)Friedrich Nietzsche,On Truth and Lie in an Extra moral Sense,Translated by A.K.M. Adam, Derived from

www.academia.edu/39824687/On_Truth_and_Lie_in_an_Extra-Moral_Sense_Friedrich_Nietszsche

২৪)Jacques Derrida, Of Grammatology, Translated by Gayatri Chakravorty Spivak, The Johns Hopkins University Press,1997, P. 11

২৫)Ibid, Page 36

২৬)Ibid

২৭)Rupert Read, Richard Rorty and How Postmodernism Helped Elect Trump,22 November 2016 www.philosophersmag.com/opinion/147-richard-rorty-and-how-postmodernism-helped-elect-trump?fbclid=IwAR02qAiCSluv7uqQ0ZSW6JrA7zx1aD9hrMz5GIrnADkapFXehjMdy2yQHOU

 

 

 

 

 

 

 

More Posts From this Author:

1 thought on “নিৎসের রাজনৈতিক দর্শন: উত্তরাধুনিক রাজনৈতিক চিন্তায় দায়”

  1. Khalilur Rahman

    তাত্ত্বিক এই লেখাটি তৃতীয়বারের মতো পড়তে গিয়ে শেষ করতে পেরে নিজের আত্মতৃপ্তি তুঙ্গে। এমন লেখা এর আগে কখনো পড়িনি। কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top