পাঠকের নোট: গৌতম বুদ্ধের জন্ম আফগানিস্তান; ছিলেন পারস্যেরও রাজা

Share this:

গৌতম বুদ্ধ মূলত আছিলেন আফগানিস্তানের কাবুলের মানুষ; কাবুলই হইল বুদ্ধের জন্মস্থান কপিলাবস্তু। নেপালের লুম্বিনিতে বুদ্ধের জন্মস্থান দাবি পুরা একটা জালিয়াতি বইলা নিশ্চিত করেন গবেষক ড. রণজিৎ পাল। উনিশ শতকের শেষ দিকে উপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে পুরাতত্ত্ব ও প্রাচীন প্রমাণ জালিয়াতি কইরা বুদ্ধের লুম্বিনি-জন্মের ভুয়া কাহিনীটা তৈরি করছেন জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ড. ফুরার (১৮৫৩-১৯৩০)…

ব্রিটিশরা অ্যালিয়স ফুরাররে (Alois Anton Führer) দিয়া সজ্ঞানেই এই জালিয়াতিটা করাইছে তাগো ভারততত্ত্ববিদ স্যার উইলিয়াম জোনসের (১৭৪৬—১৭৯৪) অজ্ঞতা ও ঘাউড়ামি জায়েজ করতে। জোনস আছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তার তৈরি ভারততত্ত্ব বা ইন্ডোলজি বহুকাল ধইরাই পশ্চিমে; এমনকি ভারতেও পণ্ডিত সমাজে ইন্ডিয়া-পাঠের মূল মানদণ্ড বইলা বিবেচিত। ব্রিটিশরা চায় নাই সেই মানদণ্ডে ফাটল ধরুক…

জোনস একবার বিহারের পাটনারে বৌদ্ধকাহিনীর ‘পলিবোত্রা’ (Palibothra) হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই ভুয়া আবিষ্কার পয়লা থাইকাই প্রশ্নের মুখে পড়ে; তাই পলিবোত্রার অবস্থান বিহারে জায়েজ করতে ফুরাররে দিয়া তারা বুদ্ধের জন্মস্থানটাই সরায়া নিয়া আসে নেপালে…

ফুরার পুরাতত্ত্বের প্রমাণ জালিয়াতি কইরা দেখান; লুম্বিনিটাই মূলত আছিল আদি কপিলাবস্তু; শক জাতির আবাস; বুদ্ধের জন্মস্থান…

রণজিৎ পালের পয়লা কথা হইল ইতিহাস বলতে গিয়া উইলিয়াম জোনস একটা মূল বিষয় খেয়াল করেন নাই; অথবা এড়ায়া গেছেন। সেইটা হইল- ইন্ডিয়া নামটাই আসছে হিন্দু নদী বা সিন্ধু নদী থাইকা; যেইটা কোনোভাবেই বর্তমান ভারত না। সিন্ধু উপত্যকা বা প্রাচীন হিন্দুস্তানের মূল কেন্দ্র আছিল উত্তর-পশ্চিম দিকে; যার ভিতরে আছিল আফগানিস্তান আর দক্ষিণপূর্ব ইরানও…

বর্তমান ভারত কিংবা নেপালে শক বা সিথিয়ান জাতিগোষ্ঠীর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় নাই। বৌদ্ধসাহিত্য বর্ণিত শক জাতির বাস ছিল ইরান ও সিন্ধু উপত্যকায়; যাগো বংশধররা বর্তমানে ছড়ায়া আছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান-ওয়াজিরিস্তান এলাকায়…

রণজিৎ পালের দ্বিতীয় যুক্তি হইল জোনস ইন্ডিয়ার ইতিহাস লিখতে গিয়া হিন্দুস্তানে মেসিডোনিয়ার রাজা আলেকজান্ডারের অভিযানের কথা এড়ায়া গেছেন। প্রাচীন হিন্দুস্তানের অবস্থান নির্ণয়ে ভুল আর আলেকজান্ডার ছাড়া জোনসের ভারততত্ত্ব দিয়া হিন্দুস্তানের ইতিহাস বলতে গেলে ভজঘট ছাড়া হয় না কিছুই…

উইলিয়াম জোনসের ইন্ডোলজির ফাঁক ধরায়া হিন্দুস্তানের যুক্তিসঙ্গত ইতিহাস খুঁইজা বাইর করতে ড. রণজিৎ পাল (Ranajit Pal) ২০০২ সালে দিল্লি থাইকা প্রকাশ করেন ইংরেজিতে লেখা গবেষণা পুস্তক Non-Jonesian Indology and Alexander বা অ-জোন্সীয় ভারততত্ত্ব ও আলেকজান্ডার। বইয়ের বিষয় ভারততত্ত্ব ও আলেকজান্ডার হইলেও এর বিশাল অংশ জুইড়া আছে গৌতম জীবনীর উৎস সন্ধান ও বিশ্লেষণ…

গৌতম বুদ্ধের পারস্য ও ব্যাবিলন সংযোগের উপর ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক থাইকা Harvey Kraft প্রকাশ করেন The Buddha from Bbabylon বা ব্যাবিলনের বুদ্ধ। হার্ভি ক্রাফটের বইটাতে একটা বড়ো তথ্যভাণ্ডার হিসাবে ব্যবহার হইছে রণজিৎ পালের অ-জোন্সীয় ভারততত্ত্ব বইয়ের তথ্য ও বিবরণ…

রণজিৎ পালের মতে বৌদ্ধগো পলিবোত্রা কোনোভাবেই বর্তমান বিহারের পাটনা না। ২০০২ সালে প্রকাশিত এই বইটাতে তিনি পলিবোত্রার অবস্থান চিহ্নিত করছিলেন প্রাচীন আকামেনিড সাম্রাজ্যের রাজধানী পার্সেপোলিসের বাত্রাকান্দা বা বাত্রাকান্ত (Batrakanda /Batrakanta) এলাকায়; যেইটারে গ্রিকরা কইত Batrapolis বা বেট্রপলিস। পার্সেপোলিস জায়গাটা বর্তমানে ইরানের ফারস প্রদেশের তাখতই জমশিদ নামে পরিচিত…

কয়েকদিন আগে তার বইটা নিয়া কথা বলার ফাঁকে রণজিৎ পাল এক নোট দিয়া জানাইলেন; বইটা প্রকাশনা পরবর্তী সময়ের গবেষণা থাইকা তার ধারণা পলিবোত্রা জায়গাটা সিন্ধু অঞ্চলেই আছিল….

রণজিৎ পালের মতামত সংক্ষেপ করলে যা দাঁড়ায় তা হইল- পারস্য ব্যাবিলন সিস্তান আফগানিস্তান বেদ ব্রাহ্মণ জরথুস্ত বৌদ্ধ দারিউস আলেকজান্ডার আর অশোকের লগেই সম্পর্কিত হিন্দুস্তানের সঠিক পুরানা ইতিহাস…

আফগানিস্তান আছিল সেই যুগের একমাত্র বড়ো সাম্রাজ্য পারস্যের অংশ। আফগানিস্তানেই রচিত হইছে ঋগ্বেদের প্রথম ভার্সন…

হিন্দুস্তান কথাটা দিয়া বুঝাইত অঞ্চল; ইন্ডিয়া নামে প্রথম প্রশাসনিক কাঠামোটা গইড়া উঠে ব্রিটিশগো হাতে; আর দেশ হিসাবে ভারতের জন্ম ১৯৪৭ সালে। তাই নামধামগুলা আলাদা রাখতে এই নোটে পুরানা সিন্ধু উপত্যকারে ‘হিন্দুস্তান’; ব্রিটিশ ইন্ডিয়ারে ‘ইন্ডিয়া’ আর বর্তমান ভারতরে ‘ভারত’ বইলা উল্লেখ করছি আমি…

পাটনায় পলিবোত্রা আবিষ্কার জোন্সের ভয়াবহ ভুল আছিল বইলা মনে করেন রণজিৎ পাল। কারণ বৌদ্ধবাদ বিবর্তনের লগে সম্পর্কিত নন্দ কিংবা মৌর্যগো কোনো রাজাই পাটনা থাইকা আসে নাই। আইজ পর্যন্ত যত পুরানা বৌদ্ধ পুঁথিপত্র বা নিদর্শন আবিষ্কার হইছে; সবই পাওয়া গেছে আফগানিস্তান-পাঞ্জাব আর হিন্দুস্তানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চল থাইকা; দক্ষিণপূর্বাঞ্চলের নেপাল থাইকা না। বৌদ্ধধর্ম প্রচারে প্রাচীনকালের যে সিল্ক রোডটা সবচে বড়ো ভূমিকা রাখছিল; সেইটা গেছে আফগানিস্তানের মেস আইনাক (Mes Aynak) এলাকা দিয়া; নেপাল ছুঁইয়া না…

বেশিরভাগ প্রাচীন বুদ্ধ প্রতিকৃতি ও বৌদ্ধস্মারক পাওয়া গেছে গান্ধার-বামিয়ান এলাকাতেই। অথচ লুম্বিনি কিংবা পাটনাবাদীগো বিবরণমতে সেইগুলা আবিষ্কার হইবার কথা ছিল নেপাল কিংবা পশ্চিম ভারতে…

গান্ধারে আবিষ্কৃত খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের বৌদ্ধ পুঁথিগুলা পূর্ব আফগান খারোস্তি লিপিতে লেখা। রণজিৎ পালের সোজা কথা; মেস আইনাক- বামিয়ান আর হাদার নিদর্শনগুলা এইটাই নিশ্চিত করে যে বৌদ্ধধর্ম আফগানিস্তান আর উত্তর-পশ্চিম ইন্ডিয়া থাইকাই প্রচারিত হইছে; নেপাল থাইকা না। বৌদ্ধ শাস্ত্রের প্রধান ভাষা পালিও যে কোনোভাবেই নেপালের ভাষা না; তাও মনে করায়া দেন রণজিৎ পাল…

বর্তমান ভূগোল বিন্যাসে গান্ধার পড়ছে পাকিস্তানের পেশওয়ার আর আফগানিস্তানের সোয়াত ও কাবুল নদীর উপত্যকায়। মেস আইনাকের অবস্থান কাবুলের ৪০ কিমি দক্ষিণপূর্ব; বামিয়ান কাবুলের ২৪০কিমি উত্তর-পশ্চিম আর হাদা আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর জালালাবাদের কিলো দশেক দক্ষিণে…

মেস আইনাক বিহারে সম্ভবত স্বয়ং গৌতম বুদ্ধ সফর করছিলেন বইলা রণজিৎ পালের ধারণা…

 

ভেঙে ফেলার আগে ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সের তোলা ১৮০ ফুট উঁচু বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ও ২০১০ সালের অক্টোবরে এপি’র তোলা মেস আইনাকের ভাঙা বুদ্ধমূর্তি

 

 

মেস আইনাক; ত্রাপুসা বিহার

পারস্যের প্রাচীন দলিলগুলায় বুদ্ধের নামের লগে মাগুস/মাজুস (Magus/Majus) বিশেষণ যুক্ত; যার সাধারণ অর্থ জ্ঞানীগুণী মানুষ। এই শব্দটা থাইকাই বাইবেলের মেজাই (Magi) কথাটা আসছে। নক্ষত্র গণনায় যিশুজন্মের ইঙ্গিত পাইয়া ‘পশ্চিমাঞ্চল’ থাইকা যে তিন মেজাই নবজাত যিশুরে অভিবাদন জানাইতে বেথলেহেম গেছিলেন বইলা মথি তার সুসমাচারে লিখেন; রণজিৎ পাল কন- সেই পশ্চিমাঞ্চলটা আছিল সিস্তান…

সিস্তান মানে হইল শকিস্তান বা শক্যস্তান বা শকদের বসতি। পার্সিয়ান ভাষায় ‘স্তান/ইস্তান’ মানে অঞ্চল-বসতি বা দেশ। দেশ হিসাবে পাকিস্তান আর জায়গা হিসাবে ঢাকার গুলিস্তান বাদ্দিয়া দুনিয়ার ‘ইস্তান’যুক্ত সব প্রাচীন স্থানই ইরানিগো দেয়া নাম। পশ্চিম ও উত্তর ইরানের মধ্যবর্তী মিডিয়ান বা মদ্র এলাকার শাক্যবতী নগরই গৌতম বুদ্ধের ‘শাক্য’ উপাধির গোড়া বইলা দাবি রণজিৎ পালের…

পারস্যের রাজা প্রথম দারিউস (Darius the Great) তার শিলালিপির দলিলে ‘মগ’ ‘গোমাতা’রে একজন নক্ষত্র বিশারদ বা জ্যোতির্বিদ (Stargazer) বইলা উল্লেখ করছেন। ইরানের কেরমানশাহ প্রদেশের বেহিস্তুনে (Bisutun) দারিউসের ওই দলিল ফলকগুলা প্রাচীন ফার্সি- এলমাইট ও ব্যাবিলনীয় বা আকাডিয়ান; তিন ভাষায় লেখা বইলা জানান হার্ভি ক্রাফট…

পার্সিয়ান ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা জরথুস্ত (Zoroaster) আর গৌতম বুদ্ধ দুইজনেই সিস্তানি। অন্যদের গবেষণার বরাত দিয়া রণজিৎ পাল জানান ইহুদি-খ্রিস্টান-মুসলমানগো ঐক্যনবি ইব্রাহিম বা আব্রাহামও আছিলেন সিস্তানি…

রণজিৎ পালের মতে; মহাযান বৌদ্ধও তৈরি হইছে সিস্তানে; ইন্ডিয়ায় না। বর্তানের চীনের শিনচিয়াং প্রদেশের অন্তর্গত খোটানের প্রাচীন সাহিত্য পুরাটাই বৌদ্ধসাহিত্য; যেই সময়কালে নেপাল-ভারতে বৌদ্ধসাহিত্যের কিছুই পাওয়া যায় না। সেই হিসাবে এক কালের শক-বৌদ্ধ এলাকা খোটান গয়ার চাইতে বৌদ্ধ কেন্দ্রের অতি নিকটে আছিল তা নিশ্চিত…

অন্যদিকে ভারতের মধ্য প্রদেশের সাঁচী; মহারাষ্ট্রের অজন্তা; উত্তরপ্রদেশের মথুরা কিংবা অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতী ও ঠোটলাকোন্ডা থাইকা আবিষ্কার হওয়া বৌদ্ধ স্মারকগুলার কিছুই খিপূ চতুর্থ শতকের আগের না। সোজা কথায় এইসব জায়গার কোনো নিদর্শনই মৌর্যপূর্ব (খিপূ ৩২১-১৮৫ খি) বা অশোকপূর্ব (খিপূ ৩০৪-২৩২) না। অথচ বৌদ্ধধর্মের সূচনাকাল আরো দুইশ’ বছর আগে…

মেস আইনাকে পাওয়া নিদর্শনগুলা গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক; এইগুলাই বৌদ্ধধর্মের আদি নিদর্শন। সমুদ্রপিঠ থাইকা আড়াই হাজার মিটার উঁচায় এক হাজার হেক্টর জমি জুইড়া বিন্যস্ত এই মেস আইনাকই পৃথিবীর প্রাচীনতম বৌদ্ধবিহার ‘ত্রাপুসা’ বইলা মনে করেন রণজিৎ পাল…

মেস আইনাক বা ত্রাপুসায় শুধু বৌদ্ধ না; আরো পুরানা ব্রোঞ্জ যুগের বসতি-সভ্যতার নিদর্শনও পাওয়া গেছে। প্রাচীন যুগেও তামার লাইগা বিখ্যাত আছিল মেস আইনাক। তামার লগে সম্পর্কযুক্ত ব্রোঞ্জ তৈরির উপকরণ থাইকাই এই ‘আইনাক’ নামটা আসছে বইলা ধারণা রণজিৎ পালের…

তিনি বিশ্লেষণ কইরা কন সংস্কৃতে ‘ত্রাপু’ মানে হইল টিন বা নিকেল; যেইটা ব্রোঞ্জ তৈরির অনিবার্য এক উপাদান। প্রাচীন আকাডিয়ান ভাষায় টিন কথাটাও আইনাক শব্দের কাছাকাছি। আবার পুরানা হিব্রুতে ‘নাগ’ কথাটার মানেও টিন; যদিও পালি ভাষায় এর মানে সাপ…

রণজিৎ পালের যুক্তিমতে; হইলে হইতে পারে বৌদ্ধসাহিত্যের ‘মহানাগ বিহার’ কিংবা ‘নাগ মহাবিহার’ জায়গাটা হইল এই মেস আইনাক বা ত্রাপুসা বিহার। শ্রীলঙ্কায় নাগ মহাবিহারের অবস্থিতির দাবি বাতিল কইরা দেন তিনি। তার মতে; বৌদ্ধসাহিত্যে যেই লঙ্কায় গৌতম বুদ্ধের উপস্থিতির কথা বলা হইছে; সেই লঙ্কা সিলোন বা সিংহল বা শ্রীলঙ্কা না; সেই লঙ্কা আছিল আফগানিস্তানে…

চীনা প্রাচীন পর্যটক হিউয়েন সাংয়ের বরাত দিয়া তিনি কন- বৌদ্ধসাহিত্যের সেই লঙ্কা আছিল পারস্যরাজের অধীন; সেইখানে আছিল একশোটার বেশি বিহার। ছয় হাজারের বেশি হীনযান ও মহাযান বৌদ্ধ ভিক্ষুর বাস আছিল সেই লঙ্কায়…

হিউয়েন সাংয়ের বিবরণমতে- ব্যাকট্রা বা বর্তমান বলখ এলাকায় বৌদ্ধধর্ম আসছে দুই বণিক ভাই ত্রাপুসা আর বহ্লিকের মাধ্যমে। রণজিৎ পাল কন- বহ্লিক বলখের মানুষ সেইটা পরিষ্কার আর ত্রাপুসা মানে টিন। সুতরাং ওই দুই বণিক আদতে আছিল টিনমানব বা ব্রোঞ্জমানব অথবা টিন-তামা-ব্রোঞ্জের কারবারি…

রণজিৎ পালের হিসাবে ‘জম্বুদ্বীপ’ জায়গাটা কোনো পানির চর বা দ্বীপ আছিল না। জিনিসটা আছিল ঢিবি বা ‘স্থলজ চর’। বর্তমান বাংলায় আমরা ‘সড়কদ্বীপ’ বলতে যেমন রাস্তার উপরে গোলচক্কর বুঝাই; রণজিৎ পালের হিসাবে জম্বুদ্বীপও আছিল সেইরকম একটা কিছু…

মোল্লা ওমরের তালেবানরা ২০০১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র কয়েকমাস আগে বামিয়ানে পাথুরে পাহাড় খুদে তৈরি করা ১৮০ ফুট উচ্চতার দানবীয় বুদ্ধমূর্তি ভাইঙা ফালায়। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের প্রাচীনতম নিদর্শন ছাড়াও আরো আগের ব্রোঞ্জ যুগের চিহ্ন ধইরা রাখা মেস আইনাক একই সাথে মাটির তলায় বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে বড়ো তামার খনিগুলার ভিতর একটা। তালেবান ভাগলের পর আফগানিস্তানে হামিদ কারজাই সরকার মেস আইনাকের তামা তুলতে ২০০৭ সালে ত্রিশ বছরের লাইগা ঠিকা দিয়া দেয় চাইনিজগো…

খনির তামা তুইলা আফগানরা হয়ত পয়সাপাতি কামাবে; কিন্তু হারায়া যাবে মানবসভ্যতার প্রাচীন বহুত দলিল। মেস আইনাক এলাকাটা সংরক্ষণের আবেদন জানান রণজিৎ পাল আর হার্ভি ক্রাফট। দাবিটা আমিও রাইখা গেলাম…

 

বেহিস্তুন রিলিফ ভাস্কর্য: ওপরে জরথুস্ত ধর্মের প্রতীক, নিচে দখলদার গোমাতার বুকে পা চেপে, গলায় দড়ি ও পেছনে হাত বাঁধা তার সহযোগীদের শাসাচ্ছেন পারস্য সম্রাট দারিউস। সর্বশেষ বন্দির মাথায় রয়েছে সিস্তানি টুপি

 

 

ব্যাবিলনের রাজা; পলাতক মধ্যপন্থা

পারস্য সম্রাট প্রথম দারিউস বা দারভুস (খিপূ ৫৫০-৪৮৬) এর লগে ‘গোমাতা মগ’ এর সংঘাত গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে বহুত ইতিহাস ধরায়া দেয় বইলা মনে করেন রণজিৎ পাল আর হার্ভি ক্রাফট দুইজনেই। গৌতম বুদ্ধ আর মগ গোমাতার সময়কাল একই; খিপূ ষষ্ঠ থাইকা পঞ্চম শতক…

ব্যাখ্যা দিয়া রণজিৎ পাল কন- পারস্য দলিলে বুদ্ধের ‘গোমাতা’ নামের সংস্কৃত ‘গরুমা’; সুমেরিয়ান ভাষায় আবার সেইটা ‘গৌত-আমা’। গৌত-আমা আর গৌতম বা গৌতমা স্থানভেদে নিছক উচ্চারণ ফারাক…

পারস্য সম্রাট কুরুশের (Cyrus the Great) পোলা সম্রাট কম্বোজা বা দ্বিতীয় কামবেসেস (Cambyses II) পারস্যের অন্তর্গত মিশরে যাবার পথে রহস্যজনকভাবে মারা যান খিপূ ৫২২ সালে। এই ফাঁকে আট মাস পারস্যে রাজত্ব করেন মগ গোমাতা। দারিউসের ভাষ্যমতে গোমাতা আছিলেন সিংহাসনের imposter বা অবৈধ দখলদার…

হার্ভি ক্রাফটের মতে; রাজার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে গৌতম বা গোমাতারে রাজা বানায়া ব্যাবিলনে একটা শান্তিবাদী সরকার চালু করছিল মগরা। এই ঘটনার মাত্র কয়েক বছর আগে ব্যাবিলনের দখল নিছিলেন পারস্যের প্রয়াত সম্রাট কুরুশ বা সাইরাস…

দারিউস কম্বোজার চাচতো ভাই। ব্যাবিলনে ক্ষমতা দখলের লাইগা দারিউস গৌতমরে ভিলেন বানায়া কাহিনী ছড়ান। তার অভিযোগ গোমাতা হইলেন কম্বোজার খুনি; অভিজাত ইরানিগো সহায়তায় সে সেই দখলদার ভণ্ড মগ গোমাতারে ‘হত্যা কইরা’ পারস্যরে উদ্ধার করছেন তিনি…

দারিউস আছিলেন জরথুস্তবাদের (Zoroastrianism) সমর্থক; যেইটার বিরুদ্ধ দর্শন বৌদ্ধবাদ; এর লগে আছিল দারিউসের ক্ষমতা দখল জায়েজ করার বিষয়। তাই রণজিৎ পালের মতে; দারিউস গৌতম সম্পর্কে মিছা কথা কইছেন। গৌতম দখলদার আছিলেন না; মারাও যান নাই। বরং দারিউসের অভ্যুত্থানের পর পূর্ব দিকে পলায়া চইলা আসছেন জন্মস্থানে…

এই বিষয়ে গ্রিক ইতিহাসবিদ হিরোডটাসের (খিপূ ৪৮৪-৪২৫) বিবরণগুলা দারিউসের দলিল নির্ভর কইরা লেখা বইলা জানান রণজিৎ পাল। হিরোডটাসের বিবরণমতে পারস্যে গোমাতা আছিলেন বহুত জনপ্রিয়…

তবে একই উৎস থাইকা জন্মানো জরথুস্তবাদ আর বৌদ্ধবাদরে গ্রিকরা গুলায়া ফেলছে বইলা মনে করেন রণজিৎ পাল। গ্রিক বিবরণে দারিউসরে বলা হইছে ‘জেরেক্সাস’। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট সম্রাট সাইরাসরে (খিপূ ৬০০-৫৩০) দারিউসের লগে গুলায়া ফেলছে বইলা তার ধারণা…

হইতে পারে। কারণ বাইবেলের পশ্চিমা গুরু বয়ানকার মথি বা মেথিউ যেইখানে এশিয়ার শর্ষে গাছের সাইজ প্রায় বট গাছের সমান বানায়া বিবরণ দিছেন সেইখানে দূরদেশের প্রাচীন রাজা কুরুশ আর দারভুসের মাঝে গুলানো তো সামান্য বিষয়…

হার্ভি ক্রাফটের মতে বৌদ্ধসাহিত্যে ‘দেবদত্ত’ নামে যে ভণ্ড তান্ত্রিকের উপস্থিতি; যে বুদ্ধরে হত্যা করতে চায়; সেই দেবদত্ত মূলত জরথুস্ত আর দারিউসের চরিত্র মিশায়া তৈরি…

রণজিৎ পালের মতে; পার্সেপোলিসে আবিষ্কৃত প্রশাসনিক দলিলে গৌতম বুদ্ধের পিতার বিবরণও আছে। ওইসব দলিলে বর্ণিত প্রাদেশিক প্রশাসক ‘শুদ্দ-যুদ্দ শরমন’ আদতে গৌতম বুদ্ধের বাবা শুদ্ধধন…

বোধিপ্রাপ্ত হইবার আগে রাজকুমার গৌতমের একটা মূর্তি আর প্রশাসনিক সিলও মেস আইনাকে আবিষ্কার হইছে বইলা জানান রণজিৎ পাল…

হার্ভি ক্রাফটের মতে বৌদ্ধসাহিত্যে বলিত খিপূ ৫৬৩ সালে বুদ্ধের জন্ম ও খিপূ ৪৮৩ সালে মৃত্যুর তারিখগুলা পার্সিয়ান ও ব্যাবিলনীয় ঐতিহাসিক উপাদানগুলার লগে খাপ খাপ মিলে। নিজের কালে বিশ্বের সবচে বড়ো সামরিক প্রশাসন বিস্তরণের যুগে বুদ্ধের জীবিত থাকাই তার অহিংস নীতির মূল ভিত্তি। বুদ্ধের শিক্ষা খালি অলৌকিক স্বর্গীয় বার্তা না; বরং তার সময়কালের ঘটনার প্রতিক্রিয়া…

বিচ্ছিন্ন হইয়া বনে বইসা করা ধ্যান থাইকা বুদ্ধের অহিংসা নীতি আসে নাই; বরং সেইটা আসছে তার সময়কালে সিন্ধু উপত্যকার পশ্চিমাঞ্চলে আকামেনিড পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের সমরাভিযানের প্রভাবেই…

এক দিকে বৈদিক তপস্বী ধারা সম্পর্কে বুদ্ধের জ্ঞান; অন্য দিকে মিশর থাইকা সিন্ধু উপত্যকা পর্যন্ত শাসন কায়েম করা আকামেনিড পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বুদ্ধের সজ্ঞানতা এইটাই প্রমাণ করে যে তার অহিংস নীতি পুরাণে বর্ণিত ধ্যানপ্রাপ্ত অলৌকিক জ্ঞান না; বরং পরিপার্শ্ব বাস্তবতার প্রতিফলন…

বুদ্ধের কালে সকল চিন্তা চেতনার বহুজাতিক মিলন কেন্দ্র ব্যাবিলনের দূরত্ব তার জন্মস্থান কাবুল থাইকা আছিল তিন হাজার কিলোমিটার; যেই পথে সেই কালে নিত্যই যাতায়াত করত বাণিজ্য বহর। ক্রাফটের ধারণা গৌতম ব্যাবিলন গেছিলেন এবং সেইখানে তিনি আধ্যাত্মগুরু বা মাগুস বা মেজাইগো প্রধান হিসাবেও নিয়োগ পাইছিলেন…

ক্রাফটের মতে; রত্নখচিত বৃক্ষের তলায় সিংহাসনে বসা গৌতম বুদ্ধের দৃশ্যকল্পটা মূলত সুমেরিয়ান রাজা ও পৌরাণিক নায়ক গিলগামেশ কাহিনী থাইকা আসা। ২৬০০ খিপূর সুমেরিয়ান রাজা গিলগামেশের অমরত্বের সন্ধান ও ব্যর্থতার কাহিনী নিয়াই গিলগামেশ মহাকাব্যটা রচিত। গিলগামেশ কাহিনীর এনকিদু চরিত্রটা হিন্দুস্তানি হরপ্পা সভ্যতার (খিপূ ৪০০০-২০০০) মানুষ বইলা অনুমান করেন তিনি…

বুদ্ধ পারস্য ছাইড়া পলায়া আসলেও ৫২২ খিপূতে ক্ষমতা নিবার পর তার পিছু ছাড়েন না দারিউস; দাবড়ানি দিয়া সিন্ধু উপত্যকায় গৌতমের বাবার শক রাজ্য দখল কইরা নেন। নিজের রাজ্য ও জাতির উপর দারিউসের এই আক্রমণই শাক্যমুনিরে অহিংসার মধ্যপন্থায় নিয়া ‘গৌতম বুদ্ধ’ কইরা তোলে বইলা ধারণা হার্ভি ক্রাফটের। তার মতে বৌদ্ধবাদ শুধু কোনো আধ্যাত্মবাদী দর্শন না; বরং বাস্তবিক অর্থে যুদ্ধ ও শান্তির ভিতর একটা বাইছা নিবার দর্শন…

পারস্যে জরথুস্তদের মাইর খাইয়া বৌদ্ধরা হিন্দুস্তানে আইসা পড়ে বৈদিক আর ব্রাহ্মণ সমাজের প্রবল বাধার মুখে। ব্রাহ্মণগো হাতে মাইর খাইয়াই বৌদ্ধরা হিন্দুস্তান ছাইড়া এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তির অহিংস বাণী নিয়া ছড়ায়া পড়ে বলে ধারণা হার্ভি ক্রাফটের…

হার্ভি ক্রাফটের মতে বুদ্ধের মধ্যপন্থা নিবার আরেকটা কারণ হিন্দুস্তানি বৈদিকগো লগে পার্সিয়ান জরথুস্তবাদীগো ‘আর্যত্ব’র মালিকানা নিয়া টানাটানি। কালে জরাথুস্ট্রবাদ- বৈদিক সমাজ আর ব্রাহ্মণ্যবাদ গুটায়া গেলেও তাগো উত্তরাধিকার পার্সিয়ান আর ভারতীয়গো ভিতর আর্যত্ব নিয়া টানাটানি থামে নাই। ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে আর্য বিষয়ক বহুত উল্টাসিধা থিউরিও পয়দা হইছিল। এর মাঝে ১৯৩৫ সালে পারস্য নিজের দেশের নামটাই কইরা বসে ‘ইরান’। ইরান মানে এরিয়ান বা আর্য। ভারতীয় পুরাণগুলায় কোথাও কোথাও ইরানরে কম্বোজ দেশ নামেও উল্লেখ করা হইছে; কোথাও বলা হইছে আর্যভূমি; কোথাও পশুরজন…

জরথুস্তগো লগে বৈদিকগো আর্যত্বের মালিকানা নিয়া টানাটানি ছাড়াও দেব আর অসুর কেডা কার থাইকা বড়ো সেইটা নিয়া আছিল বহুত ঠেলাঠেলি কিংবা স্বর্গ দখল নিয়া মারামারি। জরথুস্তগো কাছে ভালো দেবতা হইল বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের প্রাচীন আসিরিয়ান সংস্কৃতি থাইকা আসা ‘অসুর’ বা ‘আহুর; যেই অসুর আবার বৈদিকগো ‘দেব’ এর বিরুদ্ধপক্ষ…

ভারতীয় পুরাণে অবশ্য দেব আর অসুর; দুই বইন দিতি-অদিতির পুত্রদল বইলা একই উৎস ধইরা সম্পর্ক স্থাপনের একটা চেষ্টা আছে। পুরাণমতে দিতি-অদিতি দুইজনেই এক বাপের মাইয়া; বিবাহও করছিলেন কশ্যপ মুনি নামে এক ব্যক্তিরে। কশ্যপ মুনি নাকি কাস্পিয়ান মুনি?

বৌদ্ধরা হিন্দুস্তানে আইসা দেব-অসুর মারামারি থাইকাও নিজেগো সরায়া রাখে। বৈদিকগো প্রথম দিককার তাত্ত্বিক গুরু আছিলেন ঋষি অঙ্গিরা। দেব সেনাপতি ইন্দ্র; যে জরথুস্তের জাতি পার্সিয়ান বা পশুরজন আর গৌতম বুদ্ধের জাতি মিডিয়ান বা মদ্রগো জনবসতি একাধিকবার জ্বালাও পোড়াও উচ্ছেদ কইরা ‘দেবরাজ’ এ পরিণত হইছে; অঙ্গিরা আছিলেন সেইসব ‘দেব’ দলের তাত্ত্বিক গুরু…

জরথুস্তগো আবেস্তা পুস্তকে খারাপ পথের নাম ‘অঙ্গরা মৈনু’ মানে অঙ্গিরার দেখানো পন্থা; আর ভালো পথের নাম ‘স্পেন্ত মৈনু’ বা স্পিতামার বিধান। স্পিতামা হইল জরথুস্তের গোত্রের নাম। বৈদিক ঘরানায় আইসাও এই স্পিতামা গোত্রের ঋষি ভৃগু কিংবা তার পুত অসুরগুরু শুক্রাচার্যের লগে দেবতা আর অঙ্গিরা ঘরানার মারামারি ঠেলাঠেলির ঘটনায় পুরাণ ভরপুর…

পার্সিয়ান আর বৈদিক সকল গুণীপুরুষ চুলুয়া-মুচুয়া-দাড়িওল হইলেও বৌদ্ধরা ব্যতিক্রম। বৌদ্ধ ভিক্ষুগো মাথায় না থাকে চুল; না থাকে মুখে কোনো গোঁফদাড়ি…

বেহিস্তুন লিপির সাথে যুক্ত রিলিফ ভাস্কর্যে গবেষকদের দাবি করা গৌতম বুদ্ধ বা ‘গোমাতা’ নামের যে ‘দখলদারের’ বুকের উপর পা তুইলা দারিউস চাইপা আছেন তার মুখে কিন্তু গোঁফ-দাড়ি আছে; মাথায়ও আছে চুল। আবার পিছনে হাতবান্ধা অবস্থায় গলায় দড়ি লাগানো গোমাতার সকল সহযোগীও চুলুয়া-মুচুয়া-দাড়িওল; এর লগে সর্বশেষ লোকের মাথায় আছে মার্কামারা সিস্তানি টুপি…

বৈদিক ঋষিরা বনে বইসা ধ্যান করলে চুলদাড়িগোঁফ; এমনকি বগলের লোমও হাঁটু পর্যন্ত চইলা আসত বইলা পুরাণপুঁথি জানায়। অথচ দীর্ঘদিন বনে বইসা ধ্যান করা বুদ্ধের মাথায় খোঁপা বান্ধা চুল থাকলেও এক্কেবারে ক্লিনশেভ মুখ। নিশ্চয়ই ডেলি বনে গিয়া কোনো নাপিত তার গাল কামাইত না; বুদ্ধের এই মাকুন্দাকরণের কামটা শিল্পীরাই করছেন। কিন্তু ক্যান? পার্সিয়ান আর বৈদিক গুরুদের থাইকা বুদ্ধরে আলাদা রাখতে?

শক বা সিথিয়ানগো আলাদা বিশেষ টুপি আছিল। বলা হয় বৌদ্ধ মঠের ডিজাইনটা সেই সিথিয়ান টুপির আদলে তৈরি। এক জাতের ইউনিফর্মের মতো পোশাক পইরা থাকা বর্তমান বৌদ্ধ ভিক্ষুরা খালি চুল-দাড়ি-গোঁফ থাইকাই দূরে না; রীতিমতো টুপি বিরোধী। মঠে টুপি পইরা ঢোকা নিষেধ এমন নির্দেশনা বাংলাদেশের বৌদ্ধ বিহারগুলাতেই দেখছি আমি। বৌদ্ধগো দাড়ি-মোচ-চুল-টুপি বর্জনও কি নিজেগো আলাদা দেখায়া শান্তিবাদী ‘মধ্যপন্থার’ কোনো কৌশল?

ব্রাহ্মণগো ন্যাড়া ও মাকুন্দাকরণ শুরু হয় কিন্তু হিন্দুস্তান থাইকা বৌদ্ধ বিতাড়নের পর। হয়তো নিজেদের বিকল্প শান্তিবাদী প্রমাণ করতে। যদিও নিজেগো পরিচয় আলাদা করতে তারা মাথার পিছনে একটা ল্যাঞ্জা ঝুলায়া রাখে…

 

বেলজিয়ান শিল্পী জেন ব্যাপটিস্ট ডি শ্যাম্পেন এর ১৬৭২ সালে আঁকা ছবি: বৃদ্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরার চেয়ে সম্রাট আলেকজান্ডারকে চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর পরামর্শ দিচ্ছেন হিন্দুস্তানি শাস্ত্রকার কালানোস বা কবি অশ্বঘোষ

 

 

অশ্বঘোষের অলৌকিক বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধের প্রচলিত অলৌকিক জীবনীর মূল উৎস ধর্মান্তরিত বৌদ্ধ কবি ও নাট্যকার অশ্বঘোষের (৮০-১৫০ খি) লেখা ‘বুদ্ধচরিত’গ্রন্থখান। অশ্বঘোষ বুদ্ধরে এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন স্বর্গীয় অবতার হিসাবে উপস্থাপন করেন…

অশ্বঘোষের জীবনীমতে কপিলাবস্তুর শক রাজপুত্র গৌতম জন্মানোর পরে তরুণকাল পর্যন্ত রাজবাড়ির বাইরে যান নাই। সেই অবস্থাতেই বিয়াশাদি কইরা এক পোলার বাপ হন। তারপর হঠাৎ একদিন বাইরে গিয়া আবিষ্কার করেন জন্ম থাইকা মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ খালি যন্ত্রণাতেই ভোগে। এর পরেই তিনি মানুষের যন্ত্রণার কারণ নির্মূলের উপায় খুঁজতে বৌবাচ্চা ফালায়া বনে যান…

হার্ভি ক্রাফটের মতে অশ্বঘোষ হয়ত বুদ্ধের সঠিক জীবনী জানতেন। কিন্তু সেই সময়ের বৌদ্ধ নেতারা পিছনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংঘাত ভুলতে চাইছেন বইলাই সেইগুলা বুদ্ধের জীবনীতে যুক্ত করেন নাই। এই কারণেই অতীত সংঘাতের ইতিহাস এড়াইতে গৌতম বুদ্ধরে আগাগোড়া লোকালয়ের বাইরে রাখছেন অশ্বঘোষ…

অশ্বঘোষ গৌতমরে রাজবাড়ির নির্জনতায় বড়ো কইরা বনের নির্জনতায় ধ্যানে বসায়া তৈরি করেন ‘পৃথিবীর সবচে জ্ঞানী মানুষ’ বুদ্ধ। হার্ভি ক্রাফটের মতে বুদ্ধের তিতা অতীত ভুলায়া দিতে এর চাইতে ভালো আর কোনো উপায় হইতে পারে না…

অশ্বঘোষের বিবরণমতে; যা কিছু জানার বুদ্ধ তা ধ্যান কইরাই জানছেন। হার্ভি ক্রাফট জিগান- এইটা কি হইতে পারে যে ‘দুনিয়ার সবচে জ্ঞানী’ মানুষটা তার সময়ে তার আশপাশে কী ঘটতেছে তা জানত না?

তিনি কন- বৌদ্ধপুঁথিমতে বৈদিক ও ব্রাহ্মণ শাস্ত্র সম্পর্কে বুদ্ধ পুরাই জ্ঞাত আছিলেন। এইটাও তিনি জানতেন যে বৈদিকরা পশ্চিমের ধর্মীয় ঘটনার ইতিহাসের রেশ টাইনা কথা কয়। ঋগ্বেদে মেসোপটেমিয়ার পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ আছে; এইসব কেমনে জানতেন বুদ্ধ? সরাসরি অভিজ্ঞতা ছাড়া খালি বনে বইসা চক্ষু মুদিয়া ধ্যান কইরা কি এইসব জ্ঞান অর্জন সম্ভব?

রণজিৎ পালের দাবি; অশ্বঘোষই হইলেন সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গী ও পরিষদের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রকার কালানোস (Kalanos/Calanus)। গান্ধার এলাকায় আলেকজান্ডারের অবস্থানের সময় সেইখানকার বৌদ্ধগো লগে তার ঘনিষ্ঠতা হইছিল বইলা জানান রণজিৎ পাল। সিস্তান এলাকায় দুই মাস অবস্থানের কালে বৌদ্ধধর্মের প্রতি আগ্রহী হইয়া আলেকজান্ডার নাকি স্থানীয় পোশাকও পরতে শুরু করেন…

রণজিৎ পাল কন- যেইসব ব্রাহ্মণ বৌদ্ধগো বিরোধিতা করত; তারাই মূলত লড়াই করছিল আলেকজান্ডারের বিপক্ষে। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই সূত্রে আলেকজান্ডারের লগে বৌদ্ধগো খাতির জইমা উঠা স্বাভাবিক। আলেকজান্ডার একদিকে বৌদ্ধগো পুরানা শত্রু পারস্য সাম্রাজ্য হুতায়া আসছে; অন্যদিকে সিন্ধু উপত্যকায় আইসা হুতাইতেছে স্থানীয় শত্রু বৈদিক ও ব্রাহ্মণি দলগুলারে…

আলেকজান্ডার বৌদ্ধধর্মের প্রথম পৃষ্ঠপোষক আছিলেন বইলা দাবি রণজিৎ পালের। আলেকজান্ডারের আশীর্বাদের ধারাবাহিকতায়ই অশোক হিন্দুস্তানের একমাত্র বৌদ্ধ সাম্রাজ্য তৈরি করেন। রণজিৎ পাল কন- পয়লা সরাসরি চন্দ্রগুপ্ত; তারপর তার পুত বিন্দুসার; এবং তারপর অপ্রত্যক্ষভাবে অশোক; তিন প্রজন্মের মৌর্যগো আলেকজান্ডার দেখায়া গেছেন ছোট ছোট রাজ্যগুলারে এক কইরা কেমনে সাম্রাজ্য তৈরি করা যায়…

আলেকজান্ডারের মৃত্যু নিয়া ইতিহাসে ঝাঁপসায়ন থাকলেও রণজিৎ পাল নিশ্চিত করেন চন্দ্রগুপ্তই খুন করছিলেন সিকান্দার বা আলিকসুন্দর বা জুলকারনাইন বা আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটরে। আর খুব সম্ভবত সেই খুনটা হইছিল বিষ দিয়া…

আলেকজান্ডারের জয় করা ভারত দিয়াই জৈন ধর্মের চন্দ্রগুপ্ত মহারাজা বা সম্রাট হন; মনে করায়া দেন রণজিৎ পাল। তার ধারণা- আলেকজান্ডারের ডায়েরির রহস্যময় সম্পাদকও চন্দ্রগুপ্ত; চন্দ্রগুপ্তই আছিলেন ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রাচীন পার্থিয়ার রাজা আন্দ্রাগোরাস। তার প্রধান রাজধানী আছিল দক্ষিণপূর্ব ইরানে কেরমানশাহ অঞ্চলে আর দ্বিতীয় রাজধানীটা আছিল বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের পাতালায়…

 

মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের বিজয়সিংহ, আলেকজান্ডারের সিংহমুকুট ও অশোকের সিংহস্তম্ভ

 

 

অর্ধযবন অশোক দিওদতাস

বৌদ্ধধর্ম নিয়া কথা উঠলেই তিন কাইকের মাথায় চইলা আসে খিপূ তিন শতকের হিন্দুস্তানি সম্রাট অশোকের নাম। সূত্র ঘাঁইটা রণজিৎ পাল কন- অশোকের শইলে আছিল গ্রিক বা যবন রক্ত। ধর্ম বদলায়া বৌদ্ধ হইবার আগে অশোকের নাম আছিল প্রথম দিওদতাস (Diodotus I); যিনি রাজ্য শাসন চালাইতেন আফগানিস্তানের বহ্লিক বা ব্যাকট্রিয়া বা বলখ থাইকা; যার রাজ্যের ভিতরেই আছিল গান্ধার। ইরানিগো মাঝে ‘মগধাম’ অতি প্রচলিত নাম; সেই থাইকা রণজিৎ পালের অনুমান অশোকের আদি মগধ আছিল পশ্চিম বেলুচিস্তানের কোথাও…

সম্রাট অশোকের নামে কোনো মুদ্রা পাওয়া যায় নাই; আবার দিওদতাসের নামে পাওয়া যায় নাই কোনো শিলালিপি-দলিল। একই অঞ্চলের; একই কালের রাজা দিওদতাসের নামে পাওয়া গেছে মুদ্রা আর দলিল দস্তাবেজে পাওয়া গেছে ‘দেবনামপিয়’ অশোকের নামে…

অশোকের দলিলগুলাতে আশপাশের সব যবন রাজাগো বিবরণ থাকলেও দিওদতাসের রাজ্যের কোনো বিবরণ নাই। এর কারণ অশোক নিজেই দিওদতাস…

একইভাবে ২৪৫ খিপূতে দিওদতাসের মৃত্যুর পর আর অশোকের কোনো শিলালিপি বা দলিল পাওয়া যায় না। ইতিহাসমতে অন্য এলাকাগুলার লগে লগে অশোক আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আরাকশিয়া (Arachosia) অঞ্চলেরও রাজা আছিলেন। একই সময়ে আবার সেই আরাকশিয়ার রাজা দিওদতাস আছিলেন বইলা ইতিহাস জানায়। দুইটা নামই একই ব্যক্তির না হইলে তো আর এক জায়গার দুই রাজা হইবার কথা না…

অশোক সম্পর্কে রণজিৎ পালের উপসংহার হইল- গ্রিক ভাষায় ‘দিওদতাস’ মানে ‘ঈশ্বরের বর’ যার সংস্কৃত হইল ‘দেবদত্ত’ যেইটা আবার অর্থের দিক দিয়া অশোকের ব্যবহার করা নাম করা ‘দেবনামপিয়ম’র একবারে কাছাকাছি। মানে অশোক টেকাপয়সায় লিখতেন গ্রিক নাম আর জমিজমার দলিলপত্রে লিখতেন যবন নামের অনুবাদ…

বৌদ্ধ হইবার পর অশোক আলেকজান্ডারের জন্মভূমি মেসিডোনিয়া আর আলেকজান্ডারের জয় করা মিশরেও বৌদ্ধ ভিক্ষু পাঠাইছিলেন বইলা মনে করায়া দেন রণজিৎ পাল…

বৌদ্ধসাহিত্যে মগধের রাজধানী হিসাবে রাজগৃহ বলিত আছে; যেইখানে স্বয়ং গৌতম বুদ্ধও বহুবার আসছিলেন বইলা বিবরণ জানায়। সেই রাজগৃহর বর্তমান অবস্থান পাটনার কাছাকাছি রাজগীর বইলা বিশ্বাস করা হইলেও এইখান থাইকা উদ্ধার হওয়া কোনো প্রত্নসামগ্রীই খিপূ দ্বিতীয় শতকের আগের না বইলা জানান রণজিৎ পাল…

অশোক নিজেরে মগধের রাজা হিসাবে ঘোষণা করেন রাজস্থানের এক লিপিতে। বিহারের পাটলিপুত্র মগধের রাজধানী হয় আরো বহু পরে। অশোকের শিলালিপি সারা ভাতের ছড়ায়া থাকলেও তার তথাকথিত রাজধানী পাটনায় কিছু পাওয়া যায় নাই মনে করায়া রণজিৎ পাল কন- অশোকের শিলালিপি এইটাই প্রমাণ করে যে খিপূ তৃতীয় শতকে মগধের রাজধানী ছিল হিন্দুস্তানের উত্তরে; বিহারে না। প্রাচীন রাজগৃহ আছিল সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রে…

গৌতম বুদ্ধ কয়েকবার নালন্দায় আসছিলেন বইলা বৌদ্ধসাহিত্যে যে নালন্দার কথা বলা হইছে; সেই নালন্দাও বর্তমান ‘বিহারের নালন্দা’ হইবার কোনো সুযোগ নাই বইলা মনে করেন রণজিৎ পাল। অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধটাও উৎকল বা উক্কল বা বর্তমানের ওড়িশায় হয় নাই জানায়া তিনি কন; প্রাচীনকালে পশ্চিম বেলুচিস্তানের যেই এলাকায় পুরি-কটক আর কোনারাক নামের শহর আছিল; সেই এলাকাটাই হয়ত পরিচিত আছিল উক্কল নামে। অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ সেইখানেই ঘটছে…

রণজিৎ পাল জানান- বাঘের এলাকা হিন্দুস্তানে সিংহ প্রতীকের কোনো বেইল আছিল না। সিংহটা মূলত আছিল আলেকজান্ডারের বাপ মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের (খিপূ ৩৮২-৩২৬) বিজয়ের প্রতীক। ফিলিপ যতবার যুদ্ধে জিততেন ততবার সিংহের স্তম্ভ বানাইতেন। বাপের সেই ঐতিহ্য হিন্দুস্তানে নিয়া আসেন আলেকজান্ডার আর সেইটারেই নিজের ত্রয়ীসিংহ বিজয়প্রতীক বানাইছেন অশোক। বর্তমানে এইটা ভারতের জাতীয় প্রতীক…

রণজিৎ পালের মতে অশোকস্তম্ভ বইলা পরিচিত পিলারগুলা মূলত আলেকজান্ডারেরই পিলার। পিতামহ চন্দ্রগুপ্ত আলেকজান্ডারের খুনি আছিলেন বইলা অশোক কোথাও তার পূর্বপুরুষগো নাম লিখেন নাই…

 

প্রাচীন সিন্ধু উপত্যকা ও খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের সিস্তান

 

 

বাংলায় বঙ্গ নাই; লঙ্কা নাই শ্রীলঙ্কায়

রণজিৎ পালের অ-জোন্সীয় ভারততত্ত্ব ও আলেকজান্ডার বইটা গবেষকের ভাষায় লিখিত। তার কোনো কোনো বাক্যের মানে বুঝতে এদিক সেদিক হাতড়ায়া কয়েক পাতা নোট করা লাগে। প্রায় পোনে তিন’শ পৃষ্ঠার এই বইটাতে প্রচুর বিষয় তিনি তুইলা আনছেন; কোথাও সমীকরণ টানছেন কোথাও করছেন ইঙ্গিত; আর একই সাথে জানাইছেন বিষয়গুলা সম্পর্কে আরো বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন…

যিশু খ্রিস্টের কথিত ডাইরেক্ট ১২ শিষ্যের অন্যতম সাধু টমাস সিস্তান- গান্ধার- পাঞ্জাব ও দক্ষিণ ভারত এলাকায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করার ঘটনা সকলের জানা। রণজিৎ পাল কন- খুব সম্ভবত যিশু খ্রিস্ট নিজেও গান্ধার ও মেস আইনাক এলাকা সফর করছিলেন…

বাইবেল বলিত যিশুর ৩২-৩৩ বছর জীবনী থাইকা লাপাত্তা ১৮ বছর তিনি হিন্দুস্তানে আছিলেন বইলা দাবি করা হয় তিব্বতি বৌদ্ধপুঁথি ও কাশ্মীরের ইতিহাসে। সেইসব বিবরণমতে ক্রুশবিদ্ধ হইয়া যিশু মরেন নাই; বরং বাড়িতে নিজের ভুয়া শেষকৃত্য সাজায়া ভাইগা কাশ্মীর আইসা আরো বহুদিন বাঁচেন; বিয়াশাদি করেন; তার কবরও আছে কাশ্মীরে। সেইসব বিষয়ে বইপুস্তক নিয়া ‘বাইবেলের শূন্যস্থানে তিব্বতি ঈসা কাশ্মীরী যিশু’ নামে আমার একটা নোট আছে। আগ্রহীরা পড়তে পারেন…

তবে যিশু বিষয়ে রণজিৎ পালের প্রস্তাবনা ওইসব পুঁথিপুস্তক থাইকা ভিন্ন। ২০১৯ সালে প্রকাশিত তার Amen the Forgotten Name of Jesus: History of Christianity from Archaeology বইতে তিনার দাবি; বর্তমান তুরস্ক অঞ্চলের প্রাচীন রাজ্য গালাতিয়া বা গলের ইন্দো-গ্রিক রাজা আমিনটাস নিকেটর হইলেন যিশু; যার ছবি ও নামযুক্ত মুদ্রা পাওয়া গেছে। আর প্রার্থনার শেষে খ্রিস্টানগো বলা ‘আমেন’ কথাটা মূলত যিশুর নাম…

গৌতম বুদ্ধ নিয়া রণজিৎ পালের Gotama Buddha in the West জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হইছে ১৯৯৫ সালে…

গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে ১৯৭৩ সালে পিএইচডি করা রণজিৎ পাল গত কয়েক দশক ধইরা কাজ করতেছেন প্রাচীন ইতিহাস নিয়া। ভারতের ভাণ্ডারকর ওরিয়েন্টাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাথে যুক্ত তিনি; জন্ম ঢাকায়…

হিন্দুস্তানের প্রাচীন ইতিহাস বিষয়ে রণজিৎ পালের প্রচুর গবেষণা থাকলেও আমি খুঁইজা বাংলায় তার কোনো লেখা তো দূরের কথা তার নামের সঠিক বানানটাও উদ্ধার করতে পারি নাই। শেষমেশ তিনারেই জিগাইলাম। তিনি নামের বানান দিবার লগে লগে ‘বৌদ্ধ ইতিহাসের নবদিগন্ত- পালি, বাংলাভাষা ও চর্যাপদ’ নামে বাংলায় লেখা একটা গবেষণাপত্র পাঠায়া দিলেন। সেই গবেষণাপত্র থাইকাও এই নোটে কিছু তথ্য নিছি আমি। প্রাসঙ্গিক বাকি তথ্য যোগ করছি ব্যক্তিগত অন্য পড়াশোনা থাইকা…

রণজিৎ পালের মতে মহাভারতসহ পুরাণগুলাতে যে ‘বঙ্গ’র কথা বলা হইছে সেইটা বর্তমান বাংলা অঞ্চল না। সেই ‘বঙ্গ’ আছিল ইন্ডিয়ার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের কোথাও। লঙ্কাজয়ী বিজয়সিংহের বাংলাও বর্তমান বাংলা আছিল না; প্রাচীন সেই ‘ভঙ্গল’ আছিল করাচির কাছাকাছি কোথাও…

বর্তমান বাংলা ভাষায় মিশ্রিত প্রায় আড়াই হাজার ফার্সি শব্দ ইসলামি যুগের অনুপ্রবেশ বইলা প্রচলিত ধারণা বাতিল কইরা দেন রণজিৎ পাল। তার মতে প্রাচীন পারস্য ভাষা আর সংস্কৃত আছিল একে অন্যের দোসর বা যমজ। বাংলা ভাষার ফার্সি শব্দগুলা প্রাচীন সংস্কৃতরই উত্তরাধিকার…

 

হাঙ্গেরিয়ান শিল্পী জোসেফ মলনার এর ১৮৫০ সালে আঁকা ছবি: ঈশ্বরের নির্দেশে অনুসারীদের নিয়ে নবি ইব্রাহিমের স্বর্গভূমি ফিলিস্তিন যাত্রা

 

 

স্বর্গদ্বার ব্যাবিলন; ইব্রাহিমের ঈশ্বর নির্মাণ

চার দশকের বেশি সময় ধইরা বৌদ্ধবাদ সম্পর্কে পড়াশোনা করা আমেরিকান লেখক হার্ভি ক্রাফট নিজের পরিচয় দেন ‘আধ্যাত্মিক পুরাতত্ত্ববিদ’ হিসাবে। বৌদ্ধবাদে ব্যবহৃত পৌরাণিক ভাষা বিষয়ে গবেষণার লাইগা ১৯৯৮ সালে Everlife Foundation and Buddhist Education

Center নামে একটা প্রতিষ্ঠানও চালু করেন তিনি…

সোয়া পাঁচশো পৃষ্ঠার বেশি তার ব্যাবিলনের বুদ্ধ বইটা সাধারণ পাঠকের উপযোগী কইরা লেখা। ধাপে ধাপে ভাগে ভাগে তিনি একেবারে দুনিয়াতে ধর্মের উৎপত্তি থাইকা আলোচনা আগায়া নিছেন। সমান্তরাল দৃশ্য আঁইকা দেখাইছেন ধর্ম ও রাজনীতির সংযুক্ত বিবর্তন…

ব্যাবিলন ও আসিরিয়া কেন্দ্রিক পৃথিবীর প্রাচীন নগর-সভ্যতা; সুমের-ব্যাবিলন অঞ্চলে কেমনে পৃথিবীর পয়লা একেশ্বরবাদ ও বহু ঈশ্বরবাদের উৎপত্তি; প্রাচীন ধর্ম কিংবা অলৌকিক অস্তিত্বে বিশ্বাসের ধরন; অমরতার সন্ধানে পৃথিবীতে প্রথম গিলগামেশের চেষ্টা; কেমনে বর্তমান পৃথিবীর সবগুলা বড়ো ধর্ম আদি ব্যাবিলনীয় ধর্ম ও পুরাণ থাইকা বিবর্তিত হইছে। বৌদ্ধ হিন্দু জরথুস্ত ইহুদি খ্রিস্টান ইসলাম ধর্মে গিলগামেশ পুরাণ আর ব্যাবিলনীয় সংস্কৃতির প্রভাব; খুবই চমৎকার বিন্যাসে ব্যাখ্যা করছেন হার্ভি ক্রাফট…

হার্ভি ক্রাফট মনে করায়া দেন যে- আদিকালে রাজারা যুদ্ধ করত নিজেদের দেবতা বা ঈশ্বরের পক্ষে। যে হারত; ধইরা নেয়া হইত তার ভগবানও হারছে। তাই লোকজন বিজয়ী রাজার লগে বিজয়ী ঈশ্বরেরও আনুগত্য নিত। কিন্তু রাজার লগে ভগবান হারার পদ্ধতিটা বদলায়া দেন ব্যাবিলনে আইসা হাজির হওয়া মেসোপটেমিয়ার মঙ্গাতাড়িত বৃদ্ধ শমন আব্রাহাম বা নবি ইব্রাহিম। রণজিৎ পালের লগে সুর মিলায়া তিনি কন- আদিতে হয়ত আব্রাহাম মধ্য এশিয়া থাইকাই মেসোপটেমিয়া বা ইরাক অঞ্চলে গেছিলেন…

আগিলা দিনে শত ঈশ্বর আসা যাওয়া করলেও ঈশ্বরের ভুলশুদ্ধ যাচাই করে নাই কেউ। ইব্রাহিম শুরু করলেন ঈশ্বরের বিচার। তিনি কইলেন- সব দুর্গতির কারণ ‘ভুল ঈশ্বরের আরাধনা’। ‘সঠিক ঈশ্বর’ জানাইছেন যারা তার অনুগত হবে তাগোরে দুনিয়াতেই তার নির্দেশনায় ইব্রাহিম স্বর্গভূমির পথ দেখায়া নিয়া যাবেন। দুনিয়াতে ইব্রাহিমের সেই উর্বর স্বর্গভূমিটা আছিল কেনান বা বর্তমানের ফিলিস্তিন-ইজরাইল…

আগিলা রাজা-পুরোহিতরা যেইখানে নিজেগো ঈশ্বরত্বপ্রাপ্ত মানুষ বা ঈশ্বরের প্রতিনিধি বইলা জাহির করত; ইব্রাহিম সেইখানেও ব্যতিক্রমী হইলেন। কইলেন আমি ঈশ্বরত্বপ্রাপ্ত না; ঈশ্বরের প্রতিনিধিও না; আমি ঈশ্বরের নির্দেশে মানুষের পথপ্রদর্শক বা নবি। আমার কাছে ঈশ্বর নির্দেশনা পাঠান; আমি সেইগুলা মাইনসেরে বলি। নতুন এই কৌশলে ইব্রাহিম তার নিজের ঈশ্বররে নিয়া গেলেন মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে…

হার্ভি ক্রাফটের ভাষায় একদিকে ইহুদি খ্রিস্টান ইসলাম অন্যদিকে জরথুস্ত বৌদ্ধ বৈদিক-ব্রাহ্মণ কিংবা এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ হিন্দু ধর্ম; সব কিছুরই আদি উৎসস্থান ব্যাবিলন। ব্যাবিলন কথাটার মানে হইল ‘ঈশ্বরের দুয়ার’ বাংলা বাইবেলে যারে কয় ঈশ্বরদ্বার…

উক্কলের ঋষির কপিল মুনির নামে প্রচলিত আছে ‘কপিল সংহিতা’ উপপুরাণ; এই পুস্তকে অন্যগো লগে আফগান ঋষি ভরদ্বাজের আলোচনায় উইঠা আসা বেশকিছু পুণ্যস্থানের বিবরণ আছে; যার মাঝে একটা হইল ‘স্বর্গদ্বার’। যদিও জায়গাটারে বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের তীরে উড়িষ্যায় চিহ্নিত করা হয়; হইলে কি হইতে পারে এইটা সেই ব্যাবিলন?

রঞ্জিত পাল জানান; সরস্বতী আর সিন্ধুর তীরবর্তী অঞ্চলে আর্যভাষী জাতিগোষ্ঠীগুলার আগমনের বিবরণ বইলা গেছেন ঋগ্বেদের আদি ঋষিগো অন্যতম ভরদ্বাজ; তার বিবরণে বঙ্গোপসাগরের তীর থাকার কথা না। ভরদ্বাজ বর্ণিত স্বর্গদ্বারটাও খুব সম্ভবত ব্যাবিলন। কারণ অষ্টম শতকের আগে ভারতের দক্ষিণ দিকে আর্যরা যায় নাই; জানাইছেন ইতিহাসকার রোমিলা থাপার…

 

বাম থেকে রণজিৎ পাল, হার্ভি ক্রাফট ও রাজেশ কচার

 

 

রামের ঘর; রাবণের চর

অশ্বঘোষ জানাইছিলেন রামায়ণের আদি বাল্মিকী হইলেন চ্যাবন মুনি। তিনি আফগানিস্তানের বলখের মানুষ বইলা বাল্মিকী…

পৌরাণিক কাহিনীগুলার ‘স্থানান্তরিত মানচিত্রে’ যেইখানে ‘বর্ণিতের ভূগোল ও সংস্কৃতির চাইতে বর্ণনাকারীর ভূগোল ও সংস্কৃতি মুখ্য’হইয়া উঠে; সেইখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক রাজেশ কচার (Rajesh Kochhar) তার Vedic People History & Geogrpahy বইতে নিশ্চিত করছিলেন রামায়ণের রাম ও রাবণ দুইজনেই মূলত আছিলেন ইন্দো-ইরানি বংশের আফগান মানুষ। তিনি নিশ্চিত করেন- রাবণের লঙ্কা আছিল মধ্য আফগানিস্তানের হররুদ নদীর একটা চর। রণজিৎ পালের গবেষণাও আফগানিস্তানে লঙ্কার অবস্থান চিহ্নিত করে…

রামায়ণে আমরা দেখি মুনি জাবালিরে বৌদ্ধ-নাস্তিক বইলা গালাগালি করতে আছে রাম। রামায়ণের বৌদ্ধ ভার্সনে রাবণ একজন বৌদ্ধ। সেই সূত্রেই বুদ্ধের পিছনে ব্যাবিলন পর্যন্ত গিয়া দেখি রণজিৎ পাল কইতে আছেন সুমের রাজা ‘রিম-সিন’র চরিত্র অনুসারেই হয়ত রামায়ণের রাম চরিত্রটা তৈরি…

‘রিম সিন’ আর ‘ওয়ারাদ সিনে’র বাবা কুদুর মাবুক এক রাজার মাইয়ারে বিয়া কইরা ছোটমোটো রাজা হন; কিন্তু রাজ্য শাসনে তার ক্ষমতা আছিল অতি অল্প; পর্দার আড়াল থাইকা রাজ্য শাসন করত অন্য কেউ…

কুদুর মাবুকের বড়ো পোলা ওয়ারাদ সিন নিজে রাজ্য চালায় বারো বছর তারপর ছোটপোলা রিম-সিন বহু বাহাদুরি ও বীরত্বের লগে রাজ্য শাসন করে ষাইট বছর; তার মাইয়া ‘এন-আনে দু’ চন্দ্র দেবতার পুরোহিত…

কুদুর মাবুকের চরিত্রের লগে রাজা দশরথের চরিত্র মিলে; রাজ কইন্যা বিয়া কইরা দুর্বল রাজা হইবার ঘটনাও মিলে। ‘ওয়ারাদ’ আর ‘রিম’ নামগুলার লগে ‘ভরত-রাম’ নামগুলা যেমন মিল মিল লাগে তেমনি ওয়ারাদ সিনের বারো বছর আর রিম-সিনের ষাইট বছর শাসনের লাগে ভরত-রামের শাসনকালও মিলে। রামায়ণের বৌদ্ধ ভার্সনগুলা মতে; সীতা কিন্তু দশরথের মাইয়া…

হইলে হইতে পারে সুমের কুদুর মাবুকের পারিবারিক কাহিনী আইনা আফগান নিবাসী আদি বাল্মিকী চ্যাবন মুনির ‘পুলস্ত্যবধ’ বা রাবণমারা কাব্যের লগে জোড়া দিয়া তৈরি হইছে আজকের রামায়ণ…

পুলস্ত্যবধ কাব্যে পুলস্ত্যপুত্ররে মাইরা পুলমারে পুতে তারে উদ্ধার করার পর স্বামী আর তারে ঘরে নিতে চায় না। পুলমার সেই দুঃখের কান্দনে এতই চোখের পানি ঝরে যে শেষ পর্যন্ত ‘বধূসরা’ নামে একখান পৌরাণিক নদী বানায়া সেই পানি সামাল দেন আদি বাল্মিকী চ্যাবন। আর সীতার একই রকম দুঃখ লুকাইতে কাব্যিক ক্ষমতায় পৃথিবীর মাটিরে দুই ভাগ করেন রত্মাকর বাল্মিকী…

পুলস্ত্যবধ কাব্যের কাহিনী মানুষ শোনে পুলমাপুত্র চ্যাবনের মুখ দিয়া আর রামায়ণের কাহিনী শোনে সীতাপুত্র লব-কুশের মুখে…

 

আলোচনার মূল ভিত্তি যে তিনটা বই

 

 

ব্যক্তিগত সাফাই

আমার চলতি হাতের কাজ; রামায়ণের লৌকিক আখ্যান ‘অভাজনের রামায়ণ’ লেখার অংশ হিসাবে আফগানিস্তানে রাবণের চর কিংবা রামের বাড়িঘর সন্ধান করতে করতেই ব্যাবিলন পর্যন্ত গিয়া এই আফগানি গৌতম বুদ্ধরে জানা। বইপুস্তক পড়ার সময় নিজের লাইগা টুইকা রাখা নোটগুলা কারো কামে লাগলে লাগতে পারে ভাইবা সাজায়া নিলাম…

নোটের নামজাতীয় জিনিসগুলার বেশিরভাগ ইংরেজি থাইকা বাংলায় উঠানো। সবগুলার উচ্চারণ উদ্ধার করতে পারি নাই বইলা নামগুলার বাংলা বানান কতটা সঠিক নিশ্চিত না; এই কারণে চিপা দিয়া ইংরেজিও রাইখা দিছি যাতে আগ্রহীদের গুগলাইতে সুবিধা হয়…

রণজিৎ পাল আর হার্ভি ক্রাফট দুইজনেই ভৌগলিক বর্ণনায় পাঠকের উপর কিছু নির্যাতন করছেন। তারা উত্তর পাড়ায় খাড়ায়া উত্তর বলতেছেন নাকি দক্ষিণ পাড়ায় খাড়ায়া উত্তর বলতেছেন তা পরিষ্কার করেন নাই বহুত জাগায়। ভারত-পাকিস্তান-ব্রিটিশ ইন্ডিয়া আর হিন্দুস্তান তিন ভূগোলেই তারা অবলীলায় ‘ইন্ডিয়া’ কথাটা ব্যবহার করছেন। রণজিৎ পাল আবার জানাইছেন এক কালে আর্মেনিয়াও ইন্ডিয়ার অংশ বইলা গণ্য হইত; মানে সেইটাও ‘ইন্ডিয়া’…

প্রথাগত আম্রিকান কায়দায় হার্ভি ক্রাফট রাজধানী আর রাজ্যসীমারে অনেক ক্ষেত্রেই সমার্থক হিসাবে ব্যবহার করছেন। ফলে তিনি ‘ব্যাবিলন’ বইলা ইরাকের ব্যাবিলন থাইকা নিয়ন্ত্রিত পারস্য সাম্রাজ্য বুঝাইতেছেন নাকি পারস্যের রাজধানী ইরাকের ব্যাবিলন বুঝাইতেছেন তা বুঝতে অনেক জায়গায় মানচিত্র খাবলানো লাগে। আমার হিসাবে তার ‘ব্যাবিলনের বুদ্ধ’ অর্থের দিক থাইকা হওয়া উচিত আছিল ‘পারস্যের বুদ্ধ’ বা ‘ইরানের বুদ্ধ’…

বর্তমানে তুরস্ক অঞ্চলে পড়া ‘এশিয়া মাইনর’ বা আনাতোলিয়া বা আনাদলুর মাত্র একমুঠা অংশ ইউরোপে পড়লেও আনাতোলিয়া বুঝাইতে ‘ইউরোপ’ কথাটা ব্যবহার কইরা হার্ভি ক্রাফট ভূগোলও ঢিলা কইরা দিছেন বহুত জাগায়…

মধ্যপ্রাচ্য বা মিডল ইস্টের সংজ্ঞাসীমা কোনোকালেও নির্দিষ্ট আছিল না; এখনো নাই। কোনো বয়ানকার ইউরোপের পর তুরস্ক আর আফগানিস্তানের মধ্যকার পুরা অঞ্চলরে মধ্যপ্রাচ্য বলছেন; কেউ এদিকে ইরানের সীমায় থাইমা এশিয়ার হিব্রু-আরবিভাষী এলাকাগুলারে মধ্যপ্রাচ্য বলছেন তো কেউ আবার মিশর-লিবিয়া পর্যন্ত ঢোকায়া মধ্যপ্রাচ্যের সীমা নিয়া গেছেন আফ্রিকায়। দুইটা বইয়েই ‘মিডল ইস্ট’ কথাটার ব্যবহারে ঝাঁপসায়ন আছে প্রচুর…

আসিরিয়ান সুমেরিয়ান আকামেনিড ব্যাবিলনিয়ান পার্সিয়ান সিথিয়ান অ্যারিয়ান মিডিয়ান হরপ্পান ব্যাকট্রিয়ান ইন্ডিয়ান; এই কথাগুলারে একই ধরনের শব্দগুচ্ছ বইলা মনে হইলেও এইগুলা দিয়া কোনো সময় অঞ্চল বুঝায় তো কোনো সময় বুঝায় সংস্কৃতি- জাতিগোষ্ঠী বা প্রশাসনিক সীমা। আবার সরস্বতী নদী শুকায়া গেছে চাইর হাজার বছর আগে; ফলে সরস্বতী উপত্যকা জাতীয় কথা বইলা কোন অঞ্চলের কথা বলা হইতেছে তাও বর্তমানে কল্পনা করা কিঞ্চিত কঠিন; একইভাবে সিন্ধু উপত্যকা খুঁজতে গিয়া এখন মাঝে মাঝে আধাডজনের বেশি দেশের মানচিত্র খামচাইতে হয়…

বৈদিক আর ব্রাহ্মণ বলতে আদিতে জাতি-ধর্ম-ভাষা-বংশ কিছুই বুঝাইত না; দুইটাই আছিল মূলত আছিল দুইটা ‘গ্রন্থ-সম্প্রদায়’ বা কিতাবি গোষ্ঠী বা ঘরানা। বেদ বলতে এখনো এক সেট পুস্তক বুঝাইলেও ব্রাহ্মণ বলতে আর এক সেট পুস্তক না বুঝায়া বুঝায় নির্দিষ্ট বংশধারায় জন্মানো কিছু পরিবার। একইভাবে দেবতা বলতে বর্তমানে ঈশ্বরজাতীয় আর অসুর বলতে শয়তান জাতীয় কিছু বুঝাইলেও আদিতে এই শব্দগুলায় বুঝাইত একেকটা গোত্র বা কোনো নির্দিষ্ট ঘরানার অনুসারী দল। আব্রাহামিক ধর্মধারায় নাস্তিক মানে ঈশ্বর অবিশ্বাসী বুঝাইলেও বৈদিক ধারায় বুঝাইত বেদ অমান্যকারী; সেই সূত্রেই গৌতম বুদ্ধসহ বহু বৈদিক ঋষিও আছিলেন নাস্তিক…

ঈশ্বর দেবতা আল্লা ভগবান জাতীয় কথাগুলারে ইংরেজিতে ‘গড’ দিয়া সংক্ষেপে বুঝাইলেও এদের প্রত্যেকের চরিত্র ও কার্যকলাপ কিন্তু আলাদা…

আগিলা দিনে রাজ্যের সীমা; রাজধানীর নাম; জাতিগোষ্ঠী-ভাষাগোষ্ঠী কিংবা রাজার নাম অবলীলায় একটা আরেকটার ভিতর দিয়া যাতায়াত করত। হিন্দুস্তানে গ্রিক বা যবন অভিযানের নায়ক আলেকজান্ডার গ্রিসের রাজা না; আছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা। একইভাবে রাজা কম্বোজার নাম ধইরা ভারতীয় পুরাণের বহু জায়গায় ইরানরেও বলা হইছে কম্বোজ দেশ…

বই পড়ার সময় সিধা লাইনে নিজে বুঝার লাইগা বিষয়গুলার ভিতরে নামধাম সীমানার কিছু ঠ্যাকনা ঢুকাইছিলাম। তবে আইজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে যেহেতু কোনো দেশের মানচিত্রই টানা একশো বছর ধইরা স্থির থাকে নাই; সেইখানে আমার ঝাণ্ডায়নে ভজঘটও থাকতে পারে। যারা ভূগোলকুস্তি পছন্দ করেন; যাচাই কইরা নিয়েন…

 

 

প্রচ্ছদের ছবি: আফগানিস্তানের বামিয়ানে ভেঙে ফেলা ১৮০ ফুট উঁচু বুদ্ধ মূর্তির স্থানে ২০১৫ সালের ৭ জুন চীনা দম্পতি জ্যাং জিনু ও লিয়াং হং এর তৈরি আলোক প্রতিলিপি। (এএফপি)

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

1 thought on “পাঠকের নোট: গৌতম বুদ্ধের জন্ম আফগানিস্তান; ছিলেন পারস্যেরও রাজা”

  1. গোলাম কিবরিয়া (Golam Kibria)

    এ তো এক অন্যরকম গবেষণা।বিষ্ময়কর! পুরোটা লিখা পড়লাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top