পাঠকের নোট: বাইবেলের শূন্যস্থানে তিব্বতি ঈসা কাশ্মীরি যিশু

খ্রিস্টানধর্মীয় যিশুর মোট ৩২-৩৩ বছর আয়ুর ভিতর দেড় যুগের কোনো সন্ধান বাইবেলে নাই। যিশুর নিখোঁজ সেই জীবনী লাসা-লাদাখের তিব্বতি বৌদ্ধগো পুঁথিতে ১৮৮৭ সালে আবিষ্কার করেন রাশান রাজনৈতিক সাংবাদিক নিকোলাস নটোভিচ। পুঁথিগুলার বিবরণমতে ১৩ বছর বয়সে যিশু বাড়ি পলাইয়া চইলা আসেন ভারতবর্ষে আর ফিরেন ২৯ বছর বয়সে; যেইখান থাইকা আবার বাইবেলের সুসমাচারগুলা তার জীবনী বুইঝা নেয়…

তিব্বতি পুঁথিমতে ক্রুশবিদ্ধ হইলেও যিশু আসলে মরেন নাই; মরোমরো অবস্থায় পলায়া কাশ্মীরে আইসা স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন আরো বহুত বছর পরে। হিমিসের মঠগুলা তিব্বতি বৌদ্ধদের গুম্ফা। জায়গাটা বর্তমানে ভারত-কাশ্মীরের লাদাখের অন্তর্গত…

ক্রুশ-পলাতক যিশুর কাশ্মীরবাসের দাবি অবশ্য অন্তত একটা ভারতীয় পুরাণ; কাশ্মীরের পুরানা ইতিহাস এবং কাদিয়ানী মুসলমানগো ঈসা কাহিনীতেও বর্ণিত। যিশুর দাবিকৃত কবরও আছে শ্রীনগরে…

ভিন্নমতের লোকজন কয় শ্রীনগরের ওই ‘রোজাবাল’ মাজার মূলত ইয়ুজ আসাফ নামে এক পিরের কবর। তবে দাবিদারগো মতে ইয়ুজ আসাফ হইল কাশ্মীরি যিশুর ছদ্মনাম। এই নামেই তিনি বাইচা ছিলেন মোটমাট একশো বছরের বেশি…

অন্যদিকে নাথযোগী সম্প্রদায়ের দাবি তাগো গোত্রের প্রতিষ্ঠাতা হইলেন ‘ইশাই নাথ’। ইশাই নাথের জীবনটা বাইবেলী দেড় যুগের শূন্যস্থান পূরণসহ যিশুর লগে মোটামুটি খাপেখাপ। কাশ্মীরি ইতিহাসের যিশু; তিব্বতি লামাগো ‘অবতার ঈসা’ এবং কাদিয়ানী মুসলমানগো ঈসা কাহিনীর বহু উপাদানও নাথযোগী কাহিনীতে বর্তমান…

লাসার হিমিস মঠে পাওয়া তিব্বতি ভাষায় লিখিত পুঁথিগুলার অনুবাদ নিয়া ১৮৯৪ সালে ‘যিশুখ্রিস্টের অজানা জীবন’ নামে ফরাসি ভাষায় বই প্রকাশ করেন নিকোলাস নটোভিচ (১৮৫৮-১৯১৬)। তবে এই বই প্রকাশ না করার লাইগা রোমের এক কার্ডিনাল নাকি তারে ঘুষ দিতে চাইছিলেন। বইটা পরে ইংরেজিতে প্রকাশিত হইবার পর হৈ হৈ রৈ রৈ কইরা নটোভিচের দিকে তাড়ায়া আসে চার্চের পাশাপাশি ইউরোপের সকল প্রাচ্যবিদ…

ব্রিটিশ খ্রিস্টান পুরোহিতরা নটোভিচের দাবিগুলা ‘তদন্ত’ কইরা দেখার দায়িত্ব দেন জার্মান প্রাচ্যবিদ ও অক্সফোর্ডের অধ্যাপক ফ্রেডরিখ ম্যাক্সমুলাররে। ম্যাক্সমুলার আবার এই তদন্তের দায়িত্ব বুঝায়া দেন ভারতে ইংরেজ উপনিবেশের সরকারি কর্মকর্তাগো। দায়িত্ব পাইয়া তারা সরকারি লোকলস্করসমেত লাসায় গিয়া শুরু করে তদন্ত কার্যক্রম…

নটোভিচ লিখছিলেন যে একবার ঘোড়া থাইকা পইড়া ঠ্যাং ভাইঙা এক বৌদ্ধমঠে আশ্রয় নিছিলেন তিনি। তো ব্রিটিশ তদন্তকারীরা গিয়া লামাগো জিগায়- কোনো ঠ্যাং ভাঙা রাশান কি এইখানে আসছিল? লামারা কয়- নাতো এমন কাউরে আমরা জীবনেও দেখি নাই…

লামারা ডরায়। তারা ভাবে বইপুস্তকের সন্ধান পাইলে ইংরেজরা ছিনতাই করবে। ফলে তারা সোজা বইলা দেয় ঈসা কাহিনী সম্পর্কে তারা কিছু জানে না। এমন কোনো পুঁথিপুস্তক তাগো লাইব্রেরিতে নাই…

আমলাগো এই তদন্ত প্রতিবেদন ম্যাক্সমুলারের হাতে পৌঁছানোর পর তিনি সেইটারে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে রূপান্তর কইরা বইলা দেন- নটোভিচের কথাবার্তা ভুয়া ও বানোয়াট। নটোভিচ কোনোদিন তিব্বত যানই নাই; এমনকি হিমিস মঠ নামে কোনো মঠের অস্তিত্ব আছে কি না সেই বিষয়েও বিশেষজ্ঞীয় সন্দেহ জানায়া দেন ম্যাক্সমুলার। ফলে নটোভিচের পুস্তক ব্যান মাইরা দেয় ব্রিটিশ সরকার…

নিকোলাস নটোভিচ (১৮৫৮-১৯১৬) এবং ফরাসি ও ইংরেজিতে প্রকশিত ‘যিশুখ্রিস্টের অজানা জীবন’ বইয়ের প্রচ্ছদ

কিন্তু পরে অন্তত চাইরজন গ্রহণযোগ্য মানুষ লাসার লামাগো কাছে গিয়া ঘটনার সত্যতা পাইছেন। এরা পুলিশি তদন্ত করতে আসেন নাই বুইঝা লামারা তাগোরে ঈসা কাহিনী শোনায়; পুঁথিগুলা খুইলা দেখায়; অনুবাদে সাহায্য করে; ছবি তুলতে দেয়। এর মাঝে একজন বাঙালি; বেদান্ত বিশারদ স্বামী অভেদানন্দ…

প্রায় বাতিল হইয়া যাওয়া নটোভিচের দাবির সত্যতা পয়লা অভেদানন্দই (১৮৬৬-১৯৩৯) প্রমাণ করেন। পুঁথিগুলার সন্ধানে ১৯২২ সালে তিনি গিয়া পৌঁছান তিব্বতে। তখন তিনি আছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট…

অভেদানন্দের পর তিব্বতে গিয়া পুথিগুলা দেইখা অনুবাদ সংগ্রহ করেন রাশান দার্শনিক ও চিত্রশিল্পী প্রফেসর নিকোলাস রোরিচ (১৮৭৪-১৯৪৭)। এরপর ১৯৩৯ সালে এক লগে তিব্বতে গিয়া লামাগো কাছে পুঁথিগুলা দেখেন আম্রিকার ওয়ার্ল্ড ফেলোশিপ অফ ফেইথ এর সভাপতি গ্লোরিয়া গ্লাস্ক আর আম্রিকার শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি মনটেসরি স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষাবিদ ড. এলিজাবেথ কাসপারি। গ্লাস্ক আর কাসপারি মূলত তিব্বতে গেছিলেন আধ্যাত্ম শিক্ষার উদ্দেশ্যে তীর্থ ভ্রমণে…

স্বামী অভেদানন্দ ((১৮৬৬-১৯৩৯) এবং ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ’ বইয়ের প্রচ্ছদ

অভেদানন্দ তিব্বত যাত্রা করেন ১৯২২ সালের জুলাই। যিশু সম্পর্কে নটোভিচের দাবি পরীক্ষাই আছিল তার হিমিস মঠে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য। তিব্বত থাইকা ফিরেন ওই বছরর ডিসেম্বরে। তার সফরসঙ্গী ব্রহ্মচারী ভৈরবচৈতন্য ভ্রমণবিত্তান্তের খসড়া করেন। খসড়াটা অভেদানন্দের সম্পাদনা ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে ১৯২৭ এর মাঝামাঝি পত্রিকায় প্রকাশ হইতে থাকে। পরে অভেদানন্দের সম্পাদনাসহ ১৯৩৬ সালে ‘কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ’ নামে বই আকারে প্রকাশ হয়। তারপরে ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত হয় বইটার। বইটা আগাগোড়াই ভৈরবচৈতন্যের বয়ানে লিখিত…

 

তিব্বতি বৌদ্ধ ঈসা

হিমিসের লামারা অভেদানন্দরে জানাইলেন যিশু বিষয়ক পালিতে লেখা আদি পুঁথিগুলা আছে পাশ্বর্বর্তী মারবুর মঠে। তিব্বতি পুথিগুলা পালি পুঁথির অনুবাদ। এর মধ্যে আছে ১৪টা পরিচ্ছেদ; মোট ২২৪টি শ্লোক…

জগৎপিতা ‘জীবকে ঈশ্বরের সহিত মিলিত হইবার ও অনন্ত সুখ লাভ করিবার উপায় দেখাইবার জন্য অবতীর্ণ হইলেন,’ অভেদানন্দের অনুবাদমতে এইভাবেই ঈসার বর্ণনা আছে লামাগো পুস্তকে। সেই হিসাবে ঈসার লগে ‘অবতার’ কথাটা বেশি মানানসই যদিও ইংরেজি ভাষ্যগুলায় আগাগোড়া ‘প্রফেট’ এবং অভেদানন্দ নিজেও বহুক্ষেত্রে বাংলায় ‘পয়গম্বর’ কথাটা ব্যবহার করছেন…

ঈসা ইজরাইলের মানুষ। তিনি কুমারীর সন্তান নন বরং গরিব ঘরে জন্মানো ঈসার ‘মাতাপিতা’ দুইজনেই আছেন। বৌদ্ধপুঁথিমতে ঈসা ঈশ্বরের সন্তানও না। অবতার….

দাবিমতে পুঁথিগুলার তথ্যের উৎস স্বয়ং পয়গম্বর ঈসা; ইজরায়েল-ফিলিস্তিনে যাতায়াতকারী ভারতীয় বণিক; যাগো ভিতর যিশুরে ক্রুশবিদ্ধ হইতে দেখা লোকও আছে এবং আরেকদল বণিক যারা ক্রুশপলাতক যিশুরে কাশ্মীরে বাণী প্রচার করতে দেখছে। বৌদ্ধ পুরোহিতগো মতে ঈসা আছিলেন এক মহান লামা বা শিক্ষক…

নিকোলাস রোরিচ (১৮৭৪-১৯৪৭) এবং তার আঁকা তিব্বত

জন্ম ও শৈশব বিবরণের পর নিউ টেস্টামেন্টের সুসমাচারগুলাতে দেখা যায় ১২ বছরের যিশু জেরুজালেমের এক মন্দিরে ইহুদি পুরোহিতগো লগে ঈশ্বর ও ধর্ম বিষয়ে বিতর্ক করতেছেন। এবং তারপর যিশু মানুষ ও ঈশ্বর সম্পর্কে নিজের জ্ঞান বৃদ্ধি করতে থাকেন জাতীয় একটা সংযোগ লাইন জুইড়া দিয়া সন্ত লুক চইলা গেছেন ৩০ বছর বয়স্ক যিশুর বিবরণীতে। কিন্তু বাইবেলের আর কোথাও ১৩ থাইকা ২৯ পর্যন্ত যিশু বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত নাই…

হিমিস মঠের পুঁথিগুলা জানায়; প্রথামতে ইজরায়েলি বালকেরা ১৩ বছর বয়সে বিবাহের উপযুক্ত বইলা গণ্য হইত। ঈসার ১৩ হইলে তার মেধার সম্মানে বহু গণ্যমান্য পরিবার থাইকা তারে জামাই বানাইবার প্রস্তাব আসতে থাকে। এমনসব প্রস্তাবে তার মা-বাপেও খুশি হন। কিন্তু বিবাহে কোনো ইচ্ছা আছিল না ঈসার। ফলে এক রাত্তিরে নেজারতের বাড়ি থাইকা পলাইয়া ঈসা ভিড়া যান পূর্বমুখী একদল বণিকের দলে…

এরপর বিভিন্ন বণিকদলের লগে প্রাচীন সিল্করোড ধইরা চলতে থাকে ঈসার ভারতযাত্রা। নেজারত থাইকা দামেস্ক তারপর বাগদাদ তারপর পারস্য তারপর কাবুল এবং তারপর ঈসা যখন ভারতের পাঞ্জাবে আইসা পৌঁছান তখন তার বয়স ১৪ বছর…

পাঞ্জাব থাইকা দক্ষিণে গিয়া ঈসা কয়দিন গুজরাটের ভবনগরে জৈন সম্প্রদায়ের লগে কাটান; বাণী প্রচার করেন; জনপ্রিয় হইয়া উঠেন। মুগ্ধ জৈনরা তারে থাইকা যাবার লাইগা পিড়াপিড়ি শুরু করলে তিনি পূর্ব দিকে গিয়া পৌঁছান উড়িষ্যার পুরি বা জগন্নাথে…

জগন্নাথের বামুনেরা পয়লা তারে সমাদর করে। সেইখানে ছয় বছর ঈসা বৈদিক পুঁথিপুস্তক পড়ার পর নগর চক্কর দিয়া নমশূদ গরিবগুর্বাদের বলতে থাকেন- সকলেই ঈশ্বরের সন্তান। বর্ণপ্রথা বইলা কিছু নাই। বামুনরা কেন পূজা পাবে? মূর্তি পূজা কইরো না…

এইবার ক্ষেইপা বামুনরা লোক পাঠায় ঈসার কল্লা ফালায়া দিতে। সংবাদ পাইয়া আন্ধার রাত্তিরে ঈসা ভাগল দেন উত্তরে। যাইতে যাইতে গিয়া পৌঁছান দক্ষিণ নেপালের লুম্বিনির কপিলাবস্তুতে; যেইটা ধর্মবিশ্বাসমতে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। যদিও নৃতত্ত্বমতে গৌতম আছিলেন আফগানের কাবুলি…

কপিলাবস্তু থাইকা ঈসা যান তিব্বতের লাসায়। সেইখানে আরো ছয় বছর থাইকা বৌদ্ধ পুরোহিতগো কাছে পালি পুস্তক পড়েনও আবার অন্যদের পড়াইতেও থাকেন ভগবানের বাণী…

তারপর পশ্চিমে শুরু হয় ফিরাযাত্রা; লাসা থাইকা কাশ্মীরের লাদাখের লেহ। সেইখান থাইকা দক্ষিণ-পশ্চিমের রাজপুতানা; যেইটা বর্তমানে রাজস্থান- মধ্যপ্রদেশ আর গুজরাতে বিস্তৃত…

রাজপুতানায় গিয়া ঈসা আবার শুরু করেন নিজের বাণী প্রচার- ঈশ্বর এক। সব মানুষ সমান। মূর্তিপূজা বাদ্দেও…

তার কথায় লোকজন শুরু করে মূর্তি ভাঙা। ফলে রাজপুতেরা দেয় দাবড়ানি; ঈসা ভাগল দিয়া উত্তরের কাবুল ছুঁইয়া গিয়া পৌঁছান দক্ষিণ-পশ্চিমের পারস্যে…

ততদিনে বণিকগো মারফত ঈসার খ্যাতি পারস্য পর্যন্ত পৌঁছাইয়া গেছে। ঈসা পারস্যে নাজেল হইছেন শুইনা জরথ্রুস্ট পুরোহিতরা লোকজনরে পরিষ্কার বইলা দেন- এর কথায় কান দিবা না। কিন্তু তারপরেও লোকজন মুগ্ধ হইয়া শুনতে থাকে ঈসার বক্তৃতা। পুরোহিতরা তারে আদালতে হাজির কইরা কন- সূর্যপূজা করো। ঈসা কন- সূর্য যে বানাইছে আমি সেই ঈশ্বরের পূজারি। সূর্যপূজা করব না। ফলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ঈসারে পারস্য থাইকা বহিষ্কার করা হয়…

তারপর সেইখান থাইকা পশ্চিমে বাগদাদ- দামেস্ক ছুইয়া দক্ষিণমুখী ফিলিস্তিনের নাজারতে দেড় যুগ পরে নিজের ঘরে গিয়া পৌঁছান ২৯ বছর বয়সের অবতার ঈসা…

বৌদ্ধ পুঁথিতে ঈসার পরের তিন বছরের বিবরণ বাইবেলের মতোই। দাবিমতে এই অংশটা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার তিন চাইর বছর পরের রচনা। এইগুলার সূত্র জেরুজালেমে যাওয়াআসা করা ভারতীয় বণিক সম্প্রদায়…

বাড়ি ফিরার পর ঈসা শুরু করেন তার বাণী প্রচার। হু হু কইরা বাড়তে থাকে তার ভক্ত অনুসারীর সংখ্যা। সেইটা দেইখা জেরুজালেমে রোমান সাম্রাজ্যের গভর্নর পন্টিয়াস পিলেট যায় ডরায়া- কোন সময় না লোকজন ঈসারে রাজা ঘোষণা কইরা বসে। ফলে দুইটা চোরের লগে বাইন্ধা ঈসারে আদালতে হাজির করে পিলেট…

বাইবেল মতে পিলেট আছিল যিশুরে ছাইড়া দিবার পক্ষে কিন্তু ইহুদি পুরোহিতগো চাপে মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হয়। বৌদ্ধ পুঁথিমতে উল্টা। পুরোহিতরা যিশুর মুক্তি দাবি করেন আর পিলেট মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন…

হইতে পারে ফিলিস্তিনের ঘটনা বণিকগো মুখে মুখে ঘুইরা তিব্বত আসতে আসতে পক্ষবিপক্ষ গুলায়া গেছে। আবার এমনও হইতে পারে যে বণিকবুদ্ধিতে তারা বুঝছে যে পুরোহিতগো কাছে এক পুরোহিত হত্যার লাইগা অন্য পুরোহিতগো বদনাম ঠিক না। তাই বইলা দিছে পুরোহিতেরা যিশুর মুক্তি দাবি করছিলেন। দাবিমতে এই বণিকেরা যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা স্বচক্ষে দেখছে…

পুঁথিগুলার পরের অংশের উৎস কাশ্মীর থাইকা আসা বণিক যারা ক্রুশপলাতক ঈসারে কাশ্মীরে বাণী প্রচার করতে দেখছে। পুঁথিমতে ক্রুশবিদ্ধ করার পর পিলেট ঈসার লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। পরিবার তারে স্থানীয় কবরে দাফন করে। কিন্তু এরপর ঈসার ভক্তরা সেই কবর পূজা শুরু কইরা দেয়; পাশাপাশি পিলেটের বিরুদ্ধে শুরু হয় বিক্ষোভ। তখন পিলেট তার লোকজনরে হুকুম দেয় ঈসার লাশ তুইলা দূরে কোনো গোপন স্থানে দাফন কইরা আসতে। হুকুমমতো তারা কবর খুইড়া দেখে সেইখানে কোনো লাশ নাই। লগে লগে গুজব রইটা যায় যে ঈশ্বর ঈসারে উঠায়া নিছেন…

কিন্তু আসল ঘটনা হইল পিলেট যখন ঈসার দেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে তখনো তিনি জীবিত। পরিবার একটা ভুয়া দাফন আয়োজন কইরা ঈসারে নিয়া ছদ্মবেশে পলায়া আসে কাশ্মীরে…

নটোভিচ- অভেদানন্দ আর রোরিচের তিব্বতি শ্লোক সংকলনে কিছু ভিন্নতা আছে তাই নিশ্চিত না যে তারা তিনজনে একই পুস্তকের অনুলিপি দেখছিলেন নাকি আলাদা আলাদা। গ্লাস্ক আর কাসপারি বইগুলা দেখছেন; ছবি তুলছেন কিন্তু কোনো অনুবাদ করান নাই…

 

কাশ্মীরি যিশু

শিক্ষার লাইগা যিশুর ভারত অঞ্চলে দেড় যুগ কাটানোর কাহিনী লামার বৌদ্ধ পুথি ছাড়া অন্য কোথাও না থাকলেও ক্রুশবিদ্ধ হইবার পর যিশুর কাশ্মীরে আইসা শেষ জীবন কাটানোর দাবি আরো বহুবার বহুভাবে উত্থাপিত হইছে। দাবিমতে শ্রীনগরে তার কবর এখনো আছে…

খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে উজ্জয়ন বা মধ্য প্রদেশের রাজা শালিবাহন হিমালয়ে যাবার কালে কাশ্মীর এলাকায় পুরোহিতের সাদা পোশাক পরা কুমারী মাতার পুত্র ‘ঈসা’র লগে দেখা হইবার কথা ভবিষ্যপুরাণে আছে। তবে ভবিষ্যপুরাণের ঐতিহাসিক সততা নিয়া প্রশ্ন আছে। কারণ এইটাতে পুরানা বিষয় যেমন আছে তেমনি ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার কথাও ঢুইকা বসছে অনায়াসে। ফলে ভবিষ্যপুরাণের শালিবাহন-ঈসা বিবরণ দিয়া ইতিহাস বিতর্কের সুযোগ নাই…

কিন্তু কাশ্মীরে যিশুর আসার কথা নিরেট ইতিহাস পুস্তকেও আছে। পঞ্চদশ শতকের ইতিহাসবিদ মোল্লা নাদরি বা মোল্লা নাসিরির ফার্সিতে লেখা কাশ্মীরের ইতিহাসে বলা হইছে ক্রুশ থাইকা পলায়া আসার পর ফিলিস্তিন বা বাইতুল মুকাদ্দসের ঈসার দেখা হইছে কাশ্মীরের রাজা গোপাদিত্যের (খি: ৫০-১১০ সাল) লগে। পরে এইখানে বহু বছর বসবাস কইরা স্বাভাবিক মৃত্যু হইছে তার…

নাদরির পুস্তক ইতিহাস হইলেও সেইটা ঘটনার প্রায় দেড় হাজার বছর পরে লেখা। ফলে পুস্তকের দাবির ঐতিহাসিক সূত্র নিয়া প্রশ্নের জায়গা আছে। অষ্টাদশ শতকের কাশ্মীরি ইতিহাসবিদ খাজা আজম আর আহমদিয়া বা কাদিয়ানী মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা উনিশ শতকের মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর কাশ্মীরি যিশুর দাবি মূলত নাদরির পুস্তকরে ভিত্তি ধইরা…

কাদিয়ানীর দাবিমতে কাশ্মীর আসার পথে রাওয়ালপিন্ডি আর শ্রীনগরের মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঈসার মা মেরির মৃত্যু ঘটে…

কাদিয়ানী অবশ্য আরেকটু আগায়া গিয়া কন- তাওরাত কিংবা ওল্ড টেস্টামেন্টে ইজরাইলিগো লাইগা যে প্রতিশ্রুত ভূমির কথা বলা হইছে সেইটা আসলে ইজরায়েল না বরং কাশ্মীর। …মাফ চাই। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়া ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-চীন যে কাড়াকাড়ি করতেছে সেইখানে প্রতিশ্রুত ভূমির দাবি নিয়া চতুর্থপক্ষ আইসা হাজির হইলে কামড়াকামড়ির আর কোনো সীমাপরিসীমা পাওয়া যাবে না…

তবে কাকতাল হইল যে যিশুর লীলাভূমি হিসাবে দাবিকৃত তিব্বত-কাশ্মীর-জেরুজালেম তিনটা জায়গাই বর্তমানে মালিকানা সংকটে জর্জর…

 

অবশিষ্ট প্রশ্ন

স্বামী অভেদানন্দ মিশনারি মানুষ। ‘কাশ্মীর ও তিব্বতে’ পুস্তকেও রামকৃষ্ণ মিশন আর বেদান্ত মঠের উদ্দেশ্য প্রচার করতে ভোলেন নাই অভেদানন্দ। এর মাঝে একটা হইল ভারতরে খ্রিস্টান ধর্মের উৎস হিসাবে প্রমাণের চেষ্টা…

তিব্বতে লামাগো লাইব্রেরিতে যিশু বিষয়ক পুঁথির অস্তিত্ব নিয়া সন্দেহের কিছু নাই। লামারাই জানাইছেন এইগুলা মূল পালি ভাষায় লেখা পুঁথির তিব্বতি অনুবাদ। কিন্তু মূল পালি শ্লোকগুলা যেমন এখন পর্যন্ত খুইজা পাওয়া যায় নাই তেমনি সেইগুলা কবে রচিত হইছিল সেইটাও নিশ্চিত না…

এমনও হইতে পারে যে খ্রিস্টানগো কাছে যিশু কাহিনী শোনার পর বাইবেলী যিশুর দেড়যুগের শূন্যস্থান পূরণ কইরা বানানো হইছে ‘অবতার ঈসা’ কাহিনী…

উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক কিংবা পৌরাণিক চরিত্রর উপর বৈদিক কিংবা নারায়ণী কিংবা শৈব চরিত্র আরোপণ যেমন হিন্দু পুরাণগুলার সাধারণ প্রবণতা; তেমনি বৌদ্ধ পুরাণগুলারও সাধারণ বৈশিষ্ট্য হইল উল্লেখযোগ্য সব চরিত্রের বৌদ্ধায়ন। বাইবেলের যিশুরে বৌদ্ধায়ন কইরা যে এইসব কাহিনী তৈরি হয় নাই সেই প্রশ্ন ফালায়া দেওয়া যায় না…

তবে এই কাহিনীগুলাতে মুসলমানগো ঈসা নবীর ছাপ নাই; মিলও নাই। এমনকি কাশ্মীরিগো ঈসার লগেও কোরানিক ঈসা নবীর মিল নাই…

তিব্বতি পুঁথির কাহিনীগুলা যিশুর কাছাকাছি কালে লিখিত না হইয়া পরেও লিখিত হইতে পারে। কারণ ভারত অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম পৌছাইয়া গেছে একেবারে প্রথম শতকের মাঝামাঝি কালেই…

খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের ৫২ সালেই যিশুর কথিত ডাইরেক্ট শিষ্য সাধু টমাস এই অঞ্চলের ইহুদিগো মাঝে বাণী প্রচার করতে উত্তর ভারতে পৌঁছাইয়া গেছিলেন। পরে দক্ষিণ ভারতীয় অঞ্চলে ইহুদি সমাজে যিশুবাণী প্রচার করতে করতে ৭২ সালে সেইখানেই খুন হন টমাস…

কিন্তু খুন হইবার আগের বিশ বছরে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে বেশ কিছু গির্জা আর অনেক অনুসারী তৈরি কইরা ফালান তিনি। যিশুর জীবনী আর বাণী ছড়ায়া দেন ব্যাপক হারে…

টমাস খুন হইবার মাত্র কয়েক দশক পরেই গৌতম বুদ্ধের শক বা সিথিয়ান বা কুশান বংশের রাজা কণিষ্কের আয়োজনে বৌদ্ধ ধর্ম আনুষ্ঠানিকভাবে হীনযান ও মহাযান নামে দুই ভাগ হয়। হীনযানীরা হইল প্রাচীন বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। শ্রীলংকা- বার্মা আর থাইল্যান্ডের বৌদ্ধরা এই পথ নেয়…

অন্যদিকে মহাযানীরা অন্যান্য দেশি-বিদেশি জাতিগোষ্ঠীর দেবদেবী- ধর্মবিশ্বাস থাইকা কুসংস্কার পর্যন্ত গ্রহণ কইরা হাইব্রিড বৌদ্ধধর্মের পথ বাইছা নেয়। এর উদ্দেশ্য আছিল লোকজনের মাঝে সহজে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। ভারত অঞ্চলের বৌদ্ধরা নেয় মহাযানীরা পন্থা। ভারত থাইকা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত তিব্বতিরাও মহাযানী…

মহাযানীরা সাধু টমাস কিংবা অন্যদের প্রচারিত যিশুর গল্পের ভিতর বাইবেলে নিখোঁজ দেড় যুগের শূন্যস্থান পূরণ কইরা অবতার ঈসার জীবনী বানায়া তারে বৌদ্ধ লামা ঘোষণা করাও বিচিত্র না। কারণ যিশু আর বৌদ্ধের ভিতর ঐক্য তৈরির প্রচেষ্টা আস্তা ভারত অঞ্চল জুইড়া প্রবল। পরবর্তীতে হয়তো এর ভিতর জোড়া দেওয়া হইছে কাশ্মীরি যিশুর কাহিনী…

দেখার বিষয় হইল হইল তিব্বতিগো অবতার ঈসা জৈন আর বৌদ্ধগো কাছে সমাদৃত হইলেও বামুন-বর্ণপ্রথার সমর্থক আর জরথ্রুস্টবাদীগো কাছে দৌড়ানি খাইছেন। এই তিনটাই কিন্তু বৌদ্ধবিরোধী পুরানা উপাদান…

বর্ণপ্রথা আর ব্রাহ্মণ্যবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ এইটা সবাই জানলেও বৌদ্ধ ধর্মের আদিশত্রু পারস্যের জরথ্রুস্টবাদ নিয়া তেমন আলোচনা হয় না। নৃতাত্ত্বিকগো এক দলের দাবি বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তিটা ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধিতা না; বরং জরথ্রুস্টবাদ বিরোধিতা। জরথ্রুস্ট খুনও হইছিলেন গৌতম বুদ্ধের জাতি শকদের হাতে…

এই ধারার বিবরণমতে আফগানিস্তানের কাবুলে জন্মানো গৌতম বুদ্ধ (খিপূ ৫৬৩-৪৮০) মূলত আছিলেন জরথ্রুস্টভক্ত পারস্য সম্রাট সাইরাসের (খিপূ ৬০০-৫৩০) আদালতের এক বিচারক। সাইরাস মারা যাবার পর তার পুতের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটায়া স্বল্পকালের লাইগা গৌতম পারস্যের রাজাও হইয়া বসেন। পরে দাইরাসের (খিপূ ৫৫০-৪৮৬) পাল্টা অভ্যুত্থানে পারস্য ছাইড়া আফগান অঞ্চলে জরথ্রুস্ট বিরোধী দর্শন প্রচার কইরা পরিচিত হন ‘কাবুল মুনি’ নামে আর চীনা অঞ্চলে পারস্যের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দর্শন প্রচার কইরা তৈরি করেন তাও বাদ। এই হিসাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম আর তাওবাদের প্রতিষ্ঠাতা লাওতাং একই ব্যক্তি…

যদিও ধর্মবিশ্বাসীগো মতে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের কপিলাবস্তু; তিনি আছিলেন রাজপুত্র। কিন্তু নৃতত্ত্ব মতে গৌতম ত্যাগী রাজপুত্র না বরং আছিলেন এক পলাতক রাজনীতিবিদ। তারে অন্তত নয়বার হত্যাচেষ্টা চালাইছে পারস্য সম্রাটের লোক। ফলে তিনারে সারা জীবন ছদ্মবেশে দৌড়াইতে হইছে আফগান-চীন-নেপাল বরাবর…

তিব্বতি পুথিগুলাতে কিন্তু সূত্র মাইনাই গৌতম বুদ্ধের আদিশত্রু জরথ্রুস্টবাদীগো কঠোরতা দেখানো হইছে। ঈসারে তারা মারে নাই; কিন্তু নগর থাইকা বহিষ্কার কইরা দিছে। মজার বিষয় হইল গৌতম বুদ্ধও কিন্তু তার সমর্থকগো নিয়া দাইরাসের হাতে বন্দি হইছিলেন। দাইরাস তার সব সহযোগীরে মৃত্যুদণ্ড দিলেও গৌতমের জ্ঞানবুদ্ধিরে সম্মান কইরা তারে না মাইরা নির্বাসন দেয়। জরথ্রুস্টবাদীগো দ্বারা আটকের পরও বৌদ্ধ আর ঈসারে না মাইরা নির্বাসন দিবার বিবরণের ভিতর পুরাই একটা মিলমিল…

কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ’ বইটা একই সাথে একটা দুর্দান্ত ভ্রমণ বিত্তান্ত। একশো বছর আগের কাশ্মীর-তিব্বত আর আশপাশের এলাকার একেবারে জীবন্ত বর্ণনা আছে বইটাতে। বইটার শেষ দিকে নিকোলাস নটোভিচের বইয়ের একটা সার সংক্ষেপও আছে…

এলিজাবেথ কাসপারি ও গ্লোরিয়া গ্লাস্ক। কাসপারির তোলা ছবিতে যিশুকাহিনীর পুঁথি হাতে হিমিস মঠের লাইব্রেরিয়ান

এই আলোচনা মূলত দুইটা বই কেন্দ্রিক। দ্বিতীয় বইটা হইল এলিজাবেথ ক্লেয়ার প্রফেটের ‘দি লস্ট ইয়ার্স অব জেসাস’। এই বইটাতে নটোভিচের পুরা বই; নিকোলাস রোরিচের রচনা এবং এলিজাবেথ কাসপারির একটা দীর্ঘ জবানবন্দি সংযুক্ত আছে…

মূলত গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে পড়ার অংশ হিসাবে সম্প্রতি এই বইগুলা ঘাটাঘাটি করার সময় এই নোটগুলা তৈরি। এইটাতে প্রাসঙ্গিক অন্যান্য তথ্যগুলা ব্যক্তিগত জানাশোনা থাইকা সন্নিবেশিত। নটোভিচের বই প্রকাশের পর পশ্চিমের সমালোচনাগুলা পাওয়া যাবে এইখানে। সবগুলা ফ্রি সোর্স ডকুমেন্ট। পড়েন। যোগ করেন…

 

More Posts From this Author:

    None Found

1 thought on “পাঠকের নোট: বাইবেলের শূন্যস্থানে তিব্বতি ঈসা কাশ্মীরি যিশু”

  1. জফির সেতু

    তথ্যবহুল রচনা। ধন্যবাদ মাহবুব লীলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top