পাসপোর্ট

Share this:

পাসপোর্ট

 

আলিমুর গাড়িটা নিয়ে ভিড়ের ভিতর থেকে নাক উঁচু করে আসছে। গাড়িটা দেখার পরে মারুফের উত্তেজনা খানিকটা লাঘব হয়। সামনে আসার পর মারুফ হুড়ুম ধাড়ুম করে দরজাটা খুলে ভেতরে বসে। গজগজানিটা ও মুখে বলবে কিনা সেটা নিয়ে মাথায় এক ধরনের অশান্তি কাজ করছে। তবে গজগজানি শোনানোর জন্য ড্রাইভার কোনো ভালো পাত্র নয় সেটা মারুফের হিসাবে আছে। তাতে অবশ্য বিশেষ কোনো লাভ হলো না মারুফের। কারণ যতক্ষণ মারুফ পাসপোর্টের বিল্ডিংয়ে ছিল, ততক্ষণে আলিমুর মাথার মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন সাজিয়ে ফেলেছে মারুফকে করবে বলে। ইউটার্ন নিয়ে রাস্তায় আলিমুর যেই গাড়িটা বাসার দিকে মুখ ফেরাতে পারল, চেপে-রাখা প্রশ্ন করে বসল সে।

‘স্যার পাসপোর্ট ছিল না আপনার?’

মারুফ বলল, ‘ছিল তো’।

‘না মানে আবার গেলেন তো তাই জিগাই।’

‘আরে এবার তো গেছি রিনিউ করতে।’

‘ও রিনিউ করা লাগে!’ আলিমুরকে খানিক হতাশ শোনায়।

‘তো তুই ভাবছস একবার করলে আর করতে হবে না?’

‘স্যার একবার করার পর শেষ হইলে আবার করা লাগবে?’

‘পাঁচ বছর বা দশ বছরে করাতে হয়।’

‘আপনেরটা কয় বছর ছিল স্যার?’

‘আমার দশ বছরের ছিল। তর ভাবিরও তাই ছিল। মারুফের কিছু বিরক্ত হবার কথা মনে হয়। আবার ভেবেচিন্তে কিছুক্ষণ বিরক্ত না হয়েই উত্তর দেবার কথা ভাবে সে।

‘তাইলে এই চাইর বছরে তো বেশি যাইতে দেখি নাই। তাইলে আরও থাকার কথা না?’

‘এই তুই গাড়ি চালা। পাতার হিসাবে হয় না। বছরের হিসাবে শেষ হয়।’

আরেকবার জিজ্ঞাসা করবে কিনা এই দুশ্চিন্তায় আলিমুর এবার বিড়বিড় করার সিদ্ধান্ত নেয়।

 ‘বছর শেষ হবার আগে পাতা শেষ হইলে তো আরেক বিপদ!’

মারুফ লক্ষ করে যে আলিমুর এইটা প্রশ্ন আকারে করে নাই। ফলে তার জন্য বিরক্ত হবার সুযোগ কম পড়ে যাওয়াতে সেও স্বগতোক্তির মতো করে বলে।

 ‌‘আমরা কি সবাই পররাষ্ট্র সচিব না কি সাকিব আল হাসান? এত পৃষ্ঠা দিয়া কী করব? থানার রাস্তায় না ঢুইকা গলির মইধ্যে নিস।’

পররাষ্ট্র সচিব জিনিসটা বোঝার জন্য আলিমুরের কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তখন আর মনিবকে কোনো প্রশ্ন না করাই আলিমুরের ঠিক মনে হয়। বরং সে কুশল জিজ্ঞাসা করে উপসংহার টানার চেষ্টা করে।

‘আপনের কাজ হইল স্যার?’

‘না হয় নাই। আবার কাইল আসতে হবে।’

থানার আগের গলিতে ঢুকল আলিমুর। সে মোটামুটি জানে যে কোথায় মারুফ গাড়ি থামাতে বলবে। মারুফ বলার আগেই সে জননী জেনারেল স্টোরের সামনে গাড়ি থামায়। আলিমুর যখন ভাবছে মারুফ নামবে, তখন মারুফ গাড়ির কাচ নামিয়ে কী যেন দেখল আর আলিমুরকে বাসায় যেতে বলল। আলিমুর ঠিকই বুঝল যে কিছুক্ষণ পর তার আসা লাগতে পারে, কিন্তু বসের এখন নামার মুড নাই। গাড়ি পার্কিংয়ে নেমে মারুফ আলিমুরকে উপরে চাবি দিয়ে যেতে বলে।

লিফটের আয়নার মতো দেয়ালগুলো কোনোকালেই ঠিক আয়না থাকে না। খুব বড় অফিসে বড় লিফটে মারুফ কখনও কখনও একটা দেয়ালে সত্যিকারের আয়না থাকতে দেখেছে। কিন্তু ফ্ল্যাটবাড়ির লিফটে ওরকম আয়না তার তেমন চোখে পড়েনি। কিন্তু এই স্টিলের আধা-আয়না দেয়ালগুলো মারুফের কখনও কখনও খুবই ইন্টিমিডেটিং লাগে। আবার কখনও কখনও সত্যিই একে তার দর্পণ মনে হয়। যখন একাধিক লোক লিফটে থাকে, আর কেউই কারও দিকে চোখাচোখি করতে চায় না, মারুফ লক্ষ করেছে যে এই লিফটগুলো সেই ইচ্ছায় পানি ঢেলে দেয়। কোনো না কোনো দেয়ালের প্রতিবিম্বে সেই লোকের সাথেই একটা চোখাচোখি হয়ে যায়। এমনকি মাত্র ৩/৪/৫ তলার যাতায়াতেও এই দুর্দশাটা হয়। এর থেকে সকলের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে থাকতেই মারুফের বেশি সুবিধাজনক লাগে। এই বিল্ডিংয়ে কয়েক বছর থাকার কারণে এখানে সেটা করতে মারুফের অত বেগ পেতে হয় না। বা বলা চলে, ১২ ফ্ল্যাটের প্রতিবেশীদের মধ্যে এটুকু হাসিময় চাহনি এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু মারুফ এসব অচেনা বাড়িতে গিয়েও করার চেষ্টা করেছে। তাতে আপত্তি কেউ করেনি, তবে অনেক বিপত্তি হয়। প্রায়শই মারুফের এই হাসি একতরফা থাকে, অন্যপক্ষ তা বিনিময় করে না। আবার দুয়েকবার কেউ জিজ্ঞাসাও করে ফেলেছে ‘আপনাকে কি চিনি?’ মারুফ তখন তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে থাকে যে অচেনাদের মধ্যে হাসির কোনো মানা নাই। এসব ছোটখাটো দুর্ঘটনাকে মারুফ গায়ে মাখে না। তবে এসব লিফটে একা থাকার সময় এই আয়নাগুলোর সম্পূর্ণ ভিন্ন গুরুত্ব পায় তার কাছে। দুয়েকটা দিন তার মি. বিনের মুড থাকে, বা চলে আসে। অধিকাংশ সময়ে একা থাকলে এই মিনিটখানেক মারুফের জন্য আত্মদর্শনের কাল। চারদিক থেকে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখাই কেবল নয়। বরং, অনেকগুলো কোমল জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয় সে। কিংবা নম্র ফয়সালা। এই দিন যেমন লিফটের চারপাশে নিজের মূর্তি দেখতে দেখতে মারুফ ভাবল আলিমুর প্রশ্নগুলো ঠিকমতো করে সারতে পারেনি ওর মেজাজের কারণে। আসলে যত্ন করে উত্তর করা দরকার ছিল। মারুফ যদি আলিমুরের কৌতূহলগুলো না মেটায় তাহলে আলিমুরের জন্য সামাজিকভাবে জায়গা কতটুকু সেই প্রশ্নও মারুফের দেখা দিল। বস্তুত, লিফট দুটো ফ্লোর ডিঙানোর আগেই মারুফের অপরাধবোধ ও গ্লানি দেখা দেয়। সেসব থেকে মুক্তির জন্য নিজের পাঁচতলা আসতে আসতেই সে ফয়সালা করেছে যে আলিমুরকে বাসায় বসিয়ে মনোযোগ দিয়ে সে জিজ্ঞাসা করবে যে আলিমুরের পাসপোর্ট নিয়ে কী কী জানার আছে।

এরকম একটা ফয়সালা করার পর মারুফের মনে পাসপোর্ট অফিস থেকে যে চিড়বিড় লেগে ছিল তা নিমেষে পাতলা হয়ে যায়। মারুফ খুব খুশি মনে দরজার চাবি খোলে। এর আগেও মারুফ আলিমুরকে তুই-তোকারি করার বিষয়ে একদিন ফয়সালা নিতে পারে এই লিফটের মধ্যেই। শায়লা বরাবরই মারুফের কড়া নিন্দুক। ড্রাইভারকে বা কাউকেই তুই-তোকারি করার লোক শায়লা নয়। মারুফের সাথে সংসার পাতার পর প্রথম যে গাড়ি চালাতে এসেছিল মুরুব্বি হবার কারণেই হয়তো, মারুফ তাকে আপনিই বলত। ফলে শায়লার কখনও এই পরিস্থিতি দেখতে হয়নি। যখন বছরচারেক আগে এই অল্পবয়সী ছেলেটি আসে তখনই শায়লা প্রথম লক্ষ করেছে যে মারুফ ড্রাইভারকে তুই করে সম্বোধন করে। আপত্তি জানানোর পর মারুফ আগের পরিচয়, কার যেন ছেলে এসব অনেক ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু শায়লাকে বিশেষ সন্তুষ্ট মনে হয় না। ব্যাখ্যাগুলো দিয়ে মারুফ নিজেও বিশেষ স্বস্তিতে থাকে না। নিজের কাছেই যথেষ্ট দুর্বল ব্যাখ্যা মনে হচ্ছিল তার। পরে একদিন লিফটেই সে ঠিক করে যে আলিমুরকে ডেকে সে বলবে যে অন্যমনস্কভাবে আপনি না বলে তুই বলা হয়ে গেছে। অমুকের মতো দেখতে বলে এরকম হয়েছে। এখন থেকে সে আপনি বলবে আলিমুরকে। সত্যি সত্যি আলিমুরকে ডেকে এই কাজ করেছিল মারুফ। আলিমুর তাতে জিব বের করে, মাথা বুকের কাছে নামিয়ে দুই দিকে মাথা দোলাতে দোলাতে ঘোষণা দিয়েছিল যে তার নাকি এতে লজ্জায় চাকরি ছেড়ে দিতে হবে। তখন মারুফ মনে করিয়ে দিয়েছিল যে শায়লা, মানে মারুফের বউ, তাকে আপনি বলেই সম্বোধন করে; আর তাতে আলিমুরকে কখনও লজ্জা পেতে দেখা যায়নি। আলিমুরও মনে করিয়ে দিয়েছিল যে সেটা প্রথম দিন থেকেই ঘটেছে। নতুন করে তো শুরু করছে না শায়লা! আর মারুফ তো আসলেই ছোটবেলায় তাকে একবার দেখেছে। এইসব এলোমেলো পরিস্থিতির মধ্যে তুইটা থেকে গেছে। শায়লাও এটাকে আর গায়ে না-মাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়াতে এভাবেই চলছে।

পাসপোর্ট বিষয়ক আলিমুরের সকল কৌতূহল নিয়ে টিভি খুলে বসবে মারুফ, এরকম সিদ্ধান্ত নিয়ে দরজা খুলে বাসায় ঢোকে মারুফ। তারপর পোশাক বদলাতে বদলাতে অফিসে একটা ফোন করে। আলিমুর এসে কলিংবেল টেপার সময় টিভি খুলে বসেছে মারুফ। মন যতই খুশি হয়ে উঠুক পাসপোর্ট বিষয়ক প্রশ্নোত্তর সভা করার ইচ্ছাতে, আলিমুর দরজা খোলার পর বলে বসল সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

‘এই আলিম! জননী স্টোর গিয়া আধা কেজি ওট নিয়া আয়।’ টাকা দিতে-দিতে বলে মারুফ। আজকে গাড়ির জানালা দিয়ে সাদা কাগজে হাতে-লেখা বিজ্ঞাপন দেখেছে সে– ‘এখানে ওট পাওয়া যায়’। ক’দিন আগে দোকানদার তাকে বলেছিল সেকথা। ঢাকাবাসীদের স্বাস্থ্য-সচেতনতার বর্তমান দশায় সেটা মারুফের মানানসইও লেগেছিল। টাকা হাতে নেয় আলিমুর। কিন্তু মুখে বলে–

‘আধা কেজি উট দেবে না স্যার।’

‘দেবে না মানে?!’

‘পাঁচ কেজি নিলে ভালো। তবে দুই কেজি দিতে পারে।’

‘এই তুই কি পাগল হলি?’

‘স্যার, আগামী শুক্রবারের আগেও দেয়ার সম্ভাবনা নাই।’

হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে মারুফ। মারুফের মেজাজ বুঝতে না-পেরে, কিংবা হয়তো কিছুটা গাড়ির অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরে, নিশ্চিত জ্ঞান থাকার পরও, আলিমুর কথা না বাড়িয়ে কিনতে যাওয়াই ঠিক মনে করল। মারুফ হতভম্ব হয়েই দরজা লাগায়। টিভির সামনে বসবার মুহূর্তেই তার আবার মনে পড়ে যে এবার ফিরলে পাসপোর্টের আলাপের জন্য আলিমুরকে বসাতে হবে। কিন্তু তার আগে পাঁচ কেজি ওটের বিষয়ে জানতে হবে যে কী ঘটেছে।

টিভি দেখতে দেখতে মারুফ যখন প্রায় ভুলতে বসেছে, তখন কলিংবেল বাজল। দরজা খুলতে খুলতেই আলিমুর বিস্মিত হয়ে বিবরণী শুরু করেছে–

‘স্যার এ তো ডাইল ছ্যাঁচার মতো কী জানি দিছে।’

মারুফ আবারও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল ‘তুই এসে এইখানে বস। কথা বলি তোর সাথে।’ শায়লা আজ অফিস থেকে যাবে বাবার বাসা, মানে মারুফের শ্বশুরের বাসায়। মারুফ ও শায়লার ছয় বছরের মেয়ে তুলতুলকে নানা তুলে নিয়ে গেছে স্কুল থেকে। সন্ধ্যার পর মা-মেয়ে একত্রে ফিরবে। তার আগে আলিমুরকে সেখানে পাঠাতে হবে। সেই হিসাবেও কিছুক্ষণ আলিমুরের সাথে আলাপ করার সময় মারুফের আছে।

 ‘তুই পাঁচ কেজির কম দেবে না কইতেছিলি ক্যান?’ সোফায় আলিমুর আধাআধি বসার পর মারুফের প্রশ্ন।

‘স্যার উটের গোশত খুবই রেয়ার আর খুবই উপকারী।’

‘তুই উটের গোশত কিনতে গেছিলি? উটের গোশত পাওয়া যায় নাকি?’

মারুফের মাথা খারাপ হবার জোগাড়। পাসপোর্টের আলাপ তোলার কোনো উপায়ই পায় না সে।

‘স্যার জননী স্টোরে মাঝেমধ্যে উটের গোশত পাওয়া যায়। লতিফ ভাইয়ের ছোটভাই ওমান থাকে।’

‘তো ছোটভাই ওমান থাকলেই উটের গোশত কই পাবে? গোশত কি ইমেইলে করে পাঠায়?’

‘না স্যার ওদের লোক আছে। আমার তো পাসপোর্টের শখ হইছে স্যার হ্যার ভাইয়ের গল্প শুইনা।’

মারুফের আধাঘণ্টা আগের অপরাধবোধ কাটানোর সমূহ সুযোগ দেখা দেয়। কিন্তু মারুফের মাথা আবারও চঞ্চল হয়ে ওঠে। আলিমুরের থেকে চোখ সরিয়ে সে ফোন হাতে নেয়। পাড়ার দুয়েকটা দোকানের ফোন নম্বর তো থাকেই। বেশ ব্যতিব্যস্তভাবেই লতিফকে ফোন দিয়ে বসে সে–

‘আপনে উটের মাংস বিক্রি করেন লতিফ ভাই?’

‘ভাই আসলে দুম্বার গোশত। মানে করছিলাম একবার। আমার ছোটভাই তো ওমানে থাকে। হ্যায় একটা ব্যবস্থা কইরা মানে শখ হইছে আরকি ৪০ কেজি নিয়া আসছিল দুই বছর আগে।’

‘তো উটের কথা কয় ক্যান?’

‘কে কয় ভাই? এগুইলারে তো চিনেন। দ্যাখছে উট। আর গোশত দুম্বার। দুইটারে এক কইরে ফ্যালছে।’

‘দুই বছর আগের সেই গোশত এখন ক্যামনে বেচেন?’

‘ভাই লজ্জা দিয়েন না। ওই একবার বেইচা এমুন বিপদে পড়ছি। আপনেরা লেখাপড়া জানা মানুষ। আপনাদের কথা আলাদা। এইখানে তো এখন কয়দিন পরপর লোকে গোশত চায়। এই গোশতে নাকি শরীল ভালো থাকে। বলেন আপনি, এইডা কুন কথা?’

‘তাইলে তো ভালোই বিপদে পড়ছেন। কিন্তু ব্যাচেন ক্যামনে?’

‘লোকজন বেশি অত্যাচার করলে, তখন পরের শুক্রবারে আসতে বলি বিকালে।’

‘আহা আসতে না হয় বললেন। কিন্তু গোশতটা পাওয়া লাগবে না?’

‘ওই মিলায়া জুলায়া কিছু একটা দিয়া দিই। আপনে এইডা নিয়ে জিগায়েন না আর ভাই।’

মারুফ আসলেও এটা নিয়ে মাথা এত আউলে ফেলেছে যে কী জিগাবে বা কোথা থেকে শুরু করবে কিনারা পায় না। তবে কোন লোকজন উটের গোশতের জন্য লতিফকে জ্বালায় তার একটা জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ সামনে থাকাতে মারুফের বিষয়টা বুঝতেও সহজ হলো। কিন্তু মাথাও ঘোট পাকাতে থাকল। সে আলিমুরের দিকে ঘাড় কাত করে তাকায়। আর তখনই তার মনে পড়ল পাসপোর্টের আলাপ শুরু করার একটা সুতা আলিমুর দিয়েছিল। দোকানির সাথে তার কী কথা হলো তা নিয়ে আলিমুরকে কিছু না-বলার কঠিন সংকল্প নিতে নিতেই আলিমুর বলে বসল–

‘দ্যাখলেন স্যার, কইছি না যে উটের গোশত ব্যাচে।’

‘হুম হুম! তুই পাসপোর্টের শখের কথা বললি… তো এই উটের গোশত খাবি বলে?’

‘না না স্যার। গোশত খাইতে হইলে তো অর দোকানেই আছে। তার মধ্যে যে দাম! আমার স্যার উটের পিঠে চড়ার ইচ্ছা। ফোটো তোলারও ইচ্ছা।’

‘উটের পিঠে চড়ার ইচ্ছা! এই জন্য পাসপোর্টের খোঁজ জানতে চাইলি?’

‘আসলে স্যার কিছু কথাবার্তা লতিফ ভাইয়ের সাথে হইছে। দোকানে তো অনেক লোকজন থাকে। কথা বিশেষ বলার সময় পাই না। হ্যার ভাইয়ের এইরকম ছবি আছে। তো সে কইছে আমার পাসপোর্ট থাকলে একবার চেষ্টা করবে ভাইরে বইলা। চাকরি বাকরির একটা চেষ্টা করবে। পাসপোর্ট বানাইতেও সে নাকি সাহায্য করে। আমার অবশ্য বেশিদিন চাকরি করার ইচ্ছা নাই বিদেশে। মানে উটের পিঠে চইড়া মইরা, টাকাটা উঠলেই চইলা আসব।’

‘আরে তোর তো… ভাইয়ের পিঠে উটের ছবি দেইখা…’

‘না স্যার, উটের পিঠে ভাইয়ের ছবি…’

‘আরে ওই হলো… ভুলে… মাথা তো দিছস আউলায়ে… এই আজব কথা … তুই তো কইস নাই কোনোদিন।’

‘না স্যার ভাবছি রাগ করেন কিনা। তার মধ্যে অনেক টাকা লাগে পাসপোর্টে।’ মাথা নিচু করে আলিমুর বলে।

‘হ্যাঁ টাকা তো লাগে অনেক। পাসপোর্ট না হয়… প্লেনের টিকেটের দাম তো আরও বেশি…’

মারুফের হতভম্বতা কাটতেই চায় না এই দিন। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলিমুরের মুখের দিকে তাকায়। মারুফের চাহনিতে বিব্রত হয়ে আলিমুর আরও অস্বস্তিতে মেঝের দিকে তাকাতে থাকে। ততক্ষণে মারুফের মনে পড়ে যে একটা গ্লানি কাটাতে বসে আরেকটার জন্ম দেয়া নিতান্ত বোকামি হবে। এই জগতে কোনো মানুষের একটা উটের পিঠে চড়তে ইচ্ছা করা কোনো অপরাধ তো নয়ই, বরং অত্যন্ত সাধারণ একটা ইচ্ছা হিসাবে দেখাই কর্তব্য মারুফের। কিন্তু এই ইচ্ছাটাকে উৎসাহ দেয়া মারুফের কর্তব্য নাকি একে আবোলতাবোল হিসাবে সাব্যস্ত করে আলিমুরের টাকা রক্ষাকারী ভূমিকা নেয়া উচিত তা কিছুতেই মারুফের মাথায় আসলো না।

‘কিন্তু একটা উটের পিঠে চড়ার জন্য ওমান বা কাতার যাওয়ার কোনো মানে আছে? উট তো চিড়িয়াখানায়ও আছে।’

‘নাই স্যার, থাকলেও পিঠে বসতে দেবে না।’

‘হুম। তাও তো ঠিক। কিন্তু ইন্ডিয়াতেও তো উট আছে … মানে রাজস্থানে তো আছে।’

‘সেইডা অবশ্য জানতাম না স্যার। কিন্তু পাসপোর্ট লাগবে না ইন্ডিয়াতে?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ তাও তো ঠিক।’

‘তাছাড়া স্যার ইন্ডিয়াতে মনে হয় ওই ড্রেস পাওয়া যাবে না।’

‘মানে তুই… তুই উটের পিঠে ওই জোব্বা নিয়েই বসতে চাস? মানে লতিফের ভাইয়ের এরকম ছবি দেখছিস?’

‘জ্বি স্যার।’

‘কিন্তু টিকেটের দাম… মানে এরকম একটা প্ল্যানের…’

‘স্যার এইডা ঠিক প্ল্যান না। এইডা শখ। তবে গরিবের শখের আসলে কোনো দাম নাই। এইডা আপনি বইলা বললাম। পাসপোর্টে এত্তগুলা টাকা লাগে শুনছি।’

‘তুই পাসপোর্টের টাকা নিয়াই আছস, তোর টিকেটের দাম নিয়া চিন্তা নাই?’

মরিয়া হয়ে মারুফ জিজ্ঞাসা করে বসল।

‘স্যার পাসপোর্ট হইলেই তো যাব না, চাকরি পাইলেই যাব। তখন জমি বিক্রি করা লাগবে। কিন্তু স্যার বলেন কিছু মনে নিয়েন না… আপনার পাসপোর্টেরও যে দাম, আমার পাসপোর্টেরও সেই দাম। এই্ডা কি ন্যায্য লাগে আপনার?’

আলিমুরকে গভীর বেতনার্ত দেখায়। আর মারুফ হতভম্ব হয়ে যায়। কেবল মাথা নাড়ে, আলিমুরকে বোঝায় যে আসলে ন্যায্য লাগে না। কিন্তু মাথা নাড়ার সময়ে মারুফের খুব মনে হলো যে এই অন্যায্যতা নিয়ে আগে অনেক ভাবে নাই সে। আলিমুর বলে চলে–

‘দেখেন স্যার একটা পাসপোর্টের দাম যা শুনছি আমার বেতনের অর্ধেক… আপনি তো আপনার বেতনের অর্ধেক দিয়া সারা জীবনের পাসপোর্টই বানাইতে পারবেন।’

এই অঙ্কটা আলিমুরের এত নিখুঁত যে মারুফ বিশেষ মানা করতে পারল না। এই বিকালে আলিমুরকে গাড়িসমেত শায়লার জন্য পাঠানোর আগে মারুফ আস্ত বাক্যের ও সংগঠিতভাবে বিশেষ কিছু বলতে পারেনি। কেবল গাড়িতে আলিমুর যেমন বিড়বিড়ের রাস্তা নিয়েছিল, সেরকমই একটা বিড়বিড়ের রাস্তায় একবার সে মোটামুটি আস্ত একটা কথা বলতে পারে–

‘এতগুলা টাকা খরচ করবি পাসপোর্টের জন্য…’

আলিমুরের পাসপোর্টখানা হয় এই ঘটনার ঠিক মাস দুই পরে। আগেরদিন খুবই খুশি মুখে আলিমুর মারুফকে পরেরদিন দুপুরের পর থেকে ছুটি লাগবে বলে জানায়। পাশে শায়লাও ছিল সেদিন। আলিমুর পাসপোর্ট আনতে যাবে শুনে শায়লা সরু চোখে মারুফের দিকে তাকায়। সেই চোখে বেশিক্ষণ মারুফ তাকানো নিরাপদ মনে করে না। এটার মানে হলো ‘তুমি ওর পাসপোর্টের কথা জানতা না? ওর এতগুলো বেহুদা টাকা খরচে মানা করো নাই কেন?’ মারুফ শায়লাকে উটের গোশত বিষয়ে কিছুই বলে নাই। এবং সে নিশ্চিত আলিমুরের উটের পিঠে চড়া বিষয়ক আলাপও বিশেষ গুছিয়ে মারুফ বলতে পারবে না। আলিমুর যাবার পর শায়লাকে বলে ‘বোঝোই তো, ওদের একেকজন আত্মীয় বিদেশ থাকে, চেষ্টা করে যাতে কিছু বাড়তি আয় করা যায়। আমি মানা করলেই কী শুনত!’ এই ধরনের একটা জোড়াতালিতে ওদের দাম্পত্য আলাপ শেষ হলো।

সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর বাসায় কলিংবেল। সেদিন বাসায় সকলেই। দরজা খুলল শায়লা। দরজার বাইরে আলিমুর। মুখে পাসপোর্টের কোনো আনন্দ নাই।

‘স্যারের জন্য উটের গোশত আনছি ম্যাডাম।’

 ‘কীইইই?’

‘উটের মাংস।’

‘আপনার স্যার উটের মাংস খেতে চেয়েছে?’

‘না স্যার চায়নি। আমিই আনলাম।’

‘আপনি তো গেলেন পাসপোর্ট আনতে…’ এই দিন শায়লার হতভম্বতার দিন।

কানে উট শব্দ যেতেই তড়াক করে টিভি ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে মারুফ। একটা ম্লান হাসি টেনেটুনে আনার চেষ্টা করছে আলিমুর।

‘স্যার আসলে আপনি আরেকটু জোর করে বললে পাসপোর্টটা আর করতাম না। অনেকগুলান টাকা।’

‘আরে আমি তো…’ মারুফ কিছু একটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেই শায়লার কড়া চোখের দিকে তাকায়।

‘তয় স্যার আপাতত বিদেশ আর যাইতে চাই না। এই টাকাগুলানের জন্য মায়া লাগতেছে।’

‘হ্যাঁ লাগারই তো কথা, তোর বেতনের অর্ধেক… সেজন্যই তো মানা করতেছিলাম তরে।’

 ‘স্যার মানা অত করেন নাই, চিড়িয়াখানা যাইতে বলতেছিলেন, আর রাজাস্থান না কুন জায়গায়।’

 ‘আচ্ছা হলো, কিন্তু তুই আবার গোশত কিনতে গেলি কেন?’

 ‘না স্যার কিনি নাই। লতিফ ভাইরে গিয়া কইলাম। পাসপোর্টটা হাতে নিয়া টাকার জইন্য মায়া লাগতেছে। এখন গেলেও তো জমি যাবে গিয়া। উটে না হয় চড়লাম। কত লোকে বিদেশ গিয়া পথে বসছে। তখন লতিফ ভাইয়েরও বোধহয় মায়া হইল। আমারে এক কেজি উটের মাংস ফ্রি দিয়া দিছে। ভাবলাম স্যাররে দিয়া আসি। শরীলের অনেক উপকার করে স্যার।’

 

প্রশ্নোত্তর

শুদ্ধস্বর: গল্প লেখার ব্যাপারে আপনার তাড়নার জায়গাটা কোথায়? অর্থাৎ কোন বিষয় এবং ঘটনাগুলো আপনাকে গল্প লেখার জগতে পৌঁছে দিলো?

মানস চৌধুরী: কয়েকটা ছোটখাটো বাঁক নিশ্চয়ই আছে। একদম বাল্যকালের স্কুল-কলেজে “লেখক হবার শখ” ধরনের জিনিসগুলো অবশ্যই বাদ দেয়া যায়। বা বাদ দেয়া দরকার, ছোটবেলার একটা গল্পপাঠের আচমকা অনুভূতিকে বাদ দিলে। একটা তাড়না বা তাগিদ বেশ উদ্ভট ধরনের। অন্তত এত বছর পর তাই-ই মনে হয়। সম্ভবত এর আগেও এখানে-সেখানে বলা হয়েছে। পরিণত বয়সে আমার প্রথম আগ্রহ দেখা দেয় বিশ্লেষক-লেখক তথা কলামিস্ট হবার। সেটার কমবেশি চেষ্টা করেছিলাম। কিছু রচনা চাকরি জীবনের শুরুতে প্রকাশও পেয়েছিল। তবে আমার আগ্রহ ছিল সাপ্তাহিক বা পাক্ষিকভাবে নিয়মিত কলামের জায়গা পাওয়া। আপনার মনে পড়বে এগুলো ৮০ দশকের বা পরেরও বেশ একটা গুরুত্ববাহী রাজনৈতিক উপলব্ধি বা চর্চার জায়গা। যেভাবেই হোক, আমি একটা পছন্দনীয় পত্রিকায় ওই নিয়মিত জায়গাটা তৈরি করতে পারছিলাম না। ৯৬-৯৭ এর ওই সময়ে এই না-পারাটা ভুগিয়েছিল। ক’বছর এই চেষ্টাতে খুচরাখাচরা রচনাই প্রকাশ পেল। এতদিন পর বুঝি, পত্রিকার তরফে কোনো কারণ নেই, অন্তত তখন যে কয়টা পত্রিকা ‘নামিদামি’ বলে বিবেচিত ছিল তাদের পক্ষে, নবীন কোনো কর্মচারীকে ঠিক এই জায়গাটা দেবার। আবার আমি ভাবতে শুরু করলাম, আমি এত কাঠখোট্টা রাজনৈতিক সমালোচনা করি যে সেটাও পত্রিকার একটা অনাগ্রহের কারণ। এসব বোঝাবুঝির মধ্যে হঠাৎই মনে হলো গল্প/ফিকশনের দুনিয়াতে এরকম একটা প্রতিপক্ষতা সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে আসবে না। মানে কন্টেন্টের কারণে অন্তত লেখা বাদ পড়ত কিংবা জায়গা কম পেতাম বলে আমার যে ধারণা, সেই কন্টেন্টের কারণে গল্প প্রত্যাখ্যাত হবে না এরকম একটা আন্দাজ কাজ করল। যদিও আরও কিছু পরে প্রকাশনার ব্যাকরণ এতটা সহজ করে আর দেখিনি আমি। কিন্তু ২০০২-এর কোনো এক সময়ে এই রকম একটা উপলব্ধি থেকে ধুম করে গল্প লেখা শুরু করি। এটা ঠিক ‘মনের গহীনে’ কোনো তাড়না নয়, বরং ব্যবস্থাগত দিক থেকে একটা কৌশল হিসাবে তাড়না বলা যায়। পরে ‘গল্পে প্রকাশিত হতে সহজ’ এই ভাবনা একই রকম না থাকলেও গল্প লেখার আগ্রহ আর কমেনি।

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার গল্পকে আকার দেয়?

মানস চৌধুরী: খুবই মেলানো-মেশানো জগত। মানে আমার যোগাযোগ, আমার সম্পর্ক, আমার অগল্পের জগতে ভাষাপ্রবাহ, আমার অভিজ্ঞতা এগুলোর বাইরে কোনো লেখকের ফিকশন জগতকেই ছেঁকে আলাদা করা যায় না। অন্তত আমি এই মতের ঘোরতর সমর্থক। কিন্তু যদি একদম নির্যাস আকারে নাও বলি, শৈলী বা ক্র্যাফটের দিক থেকেও বলা যায়। যেমন, আমার অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন হলো যাঁদেরকে ‘সাধারণ’ মানুষ বলা হয় সেসব মানুষ দারুণ রসিক; কিংবা আরও সূক্ষ্ণভাবে বললে একটা নির্দিষ্ট পরিবেশে এঁদের বড় অংশই রং-তামাশাতে খুবই সাবলীল। এই জানা একদিকে আমার অনেক বছরের ‘সাধারণ’ মানুষকে অভিজ্ঞান করার ফলাফল, আরেকদিকে তাঁদের সাথে নতুন যোগাযোগের ‘উপায়’ বা ‘মিনস’। আমার ক্ষেত্রে এটা আরও চিত্তাকর্ষক। কারণ শিক্ষিত শ্রেণির মানুষজন, বা যাঁদের সাথে আমার পেশাগতভাবে মেলামেশা করতে হয়, এঁদের বড় অংশ বহু বছর ধরেই আমার বিরুদ্ধে (ভাষার) দুর্বোধ্যতার অভিযোগ করেছেন। তার আরেকটা মানে দাঁড়াত, ‘সাধারণ’ মানুষে ‘সহজে’ আমার কথা ‘বুঝবেন না’। বাস্তবে এসব পরিবেশে আমার অভিজ্ঞতা খুবই ভিন্ন। মোটামুটি আমার জন্য বোধগম্য একটা বাংলা ওই প্রান্তে শুনতে পেলেই আমি রং-তামাশার দুনিয়ায় ঢুকে পড়তে পারি। এই জগতটা এক বিচারে ক্র্যাফটের। আবার এটা বলার সময় এই জগতের মায়ামমতা বা বাৎসল্যকে উধাও করে দেয়া অসম্ভব। আবার অন্য বিচারে, সেগুলো আবার কোনো, হয়তো অনির্ধারিত অনাগত কোনো গল্পের কারক হয়ে উঠবে। আকার দেয়ার বিষয়টা তাই আমি যতটা ট্যানজিবল বা গ্রাহ্যরূপে পরিমাপযোগ্যভাবে দেখতে পাই, তার থেকে একটা পরিকাঠামো বা পটভূমি আকারে চলমান হিসাবে দেখতে পাই। সেটা তথাকথিত ‘সাধারণ’ মানুষদের বেলায় যেমন সত্য, তেমনি ‘অসাধারণ’ বিদ্বৎসমাজের বেলায়ও সত্য।

শুদ্ধস্বর: আপনি কি মনে করেন সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব কথাসাহিত্যের উপর রয়েছে বা থাকা উচিত? আপনার অভিজ্ঞতা এবং পঠনপাঠনের আলোকে বলুন।

মানস চৌধুরী: একদম চাকরিজীবীদের জব ডেস্ক্রিপশনের বাইরে কোনো আচরণকেই আমি ঔচিত্যবোধ থেকে তেমন দেখি না। ফলে থাকা উচিত তা না বলে আমি বলব যে থাকেই। যাঁদের রচনাকে মনে হচ্ছে যে চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে দূরে, তা দেশজ বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাতাবরণ হোক কিংবা বৈশ্বিক, তাঁদের সেসব রচনাও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাবজাত। আমি যাকে দূরে থাকা হিসেবে দেখি, তা খোদ একটা রাজনৈতিক অবস্থান-উপলব্ধি-প্রস্তাবনা। বিচিত্র নয়, যে সময়কালে ও সমাজে আপনি হয়তো স্বৈরতন্ত্রের খোঁজ পাচ্ছেন, সেই একই সময়কালে ও সমাজে আরেক লেখক উৎসবমুখরতা বা উন্নয়নের খোঁজ পাচ্ছেন। কিংবা অন্তত পাচ্ছেন হেটারোসেক্সুয়াল প্রেমপিরিতি গড়ে তোলার পরিবেশ। কারও সাহিত্যিক উৎপাদনই সময়কাল ও জনসমাজের স্রোত থেকে বিমুক্ত থাকে না। থাকে কেবল সংমিশ্রণের জায়গাগুলোর ভিন্নতা। আমি সাধারণভাবেই, যতটুকু কথাসাহিত্য পড়ি, যাঁর লেখায় যা নেই তা কেন নেই ধরনের আলাপ সহজে তুলি না। বা বলা উচিত, তুলি তখনই যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেটাকে পর্যালোচনা করতে বসি। এই আনুষ্ঠানিকতার গুরুত্ব আমার কাছে মারাত্মক রকমের বেশি। ‘এইটা তো আনলেন না’ ধরনের মান-অভিমান না করে আমি সাহিত্যের দিকে তাকাই। কখনও কখনও এমনও হয় যে, সাদাসিধা মাথায় যে লেখককে গভীরভাবে বেরাজনৈতিক/এপলিটিক্যাল সাব্যস্ত করতে পারি আমি, তিনি হয়তো আরেকটা কাজের কোনো একটা অংশে এমন চমৎকার শুকনা-রসিকতার ক্র্যাফটের প্রমাণ দিয়েছেন যে তাঁর ওই ‘আড়ালকারী’ রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনায় ওই ক্র্যাফটটাকে গুরুত্ব দিয়ে বসতে পারি। বলতে গিয়েই হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের কথা মনে পড়ল। তিনি এলেবেলে সিরিজে দুর্দান্ত কিছু শুকনা-রসিকতা করেছেন। সমকালীন বাংলাদেশে অ-কথাসাহিত্যে এই স্বরে রচনা খুবই বিরল। বলতে চাইছি, লেখকদের কাছ থেকে আমি এমন কিছু আশা করতে থাকি না যা আমার আশা-আকাঙ্ক্ষাকে স্কিমেটিক বানিয়ে ফেলতে পারে। সতর্কতটা পরিশেষে আমার নিজেকে নিয়েই।

শুদ্ধস্বর: এমন একটি ছোটোগল্প সম্পর্কে বলুন যা আপনাকে কাঁদিয়েছে বা আপনার চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

মানস চৌধুরী: এসব স্মৃতি তো নানাবিধ পরিপ্রেক্ষিত ও অনুষঙ্গের কারণে বিশেষ হয়ে থাকে। অন্তত পাঠক হিসাবে আমার বয়স বিবেচনা করলে, যে গল্পটার কথা বলতে পারি সেটা প্রকাশিত হয়েছিল একটা সিনেমা পত্রিকায়। কোলকাতাকেন্দ্রিক সিনেপত্রিকা ‘উল্টোরথ’ বা ‘প্রসাদ’-এর পূজাসংখ্যাতে গল্পটা ছিল, সম্ভবত ১৯৭২ বা ১৯৭৩ সালের। আর আমি পড়েছিলাম এর ৩/৪ বছর বাদে, অতি ছোটবেলায়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প ‘ইরফান আলি দু’নম্বর’। এই গল্পটার কথাই শুরুতে বলেছিলাম। বলাই বাহুল্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো ওজন-উচ্চতা সম্বন্ধে কোনো ধারণা আমার হয়নি তখনও। আসলে তাঁর সেই প্রচণ্ড-প্রতাপী খ্যাতিও হয়নি তখনও। এটা দৈবসংযোগ।

আবছায়া যা মনে পড়ে, ইরফান আলি লক্ষ করেছে সে জীবনে কোনোকিছুতেই অগ্রগণ্য নয়, ঊন। নানাবিধ দুর্যোগে পড়ে গরিব ইরফান আলি কাজ নেয় মাটি কাটার। সেখানে সুপারভাইজার ও নানানজনের হম্বিতম্বির মধ্যে তার এই মাটি-কেটে-উপার্জনের জীবন শুরু করে। কিন্তু এসেই আবিষ্কার করে সেখানে আরেক ইরফান আলি আছে এবং সে অনেকটাই চৌকস। গরিব মজুর, কিন্তু স্মার্ট– ‘জিভ আর দাঁতের মাঝখান দিয়ে পিচিক করে থুতু ফেলতে জানে’। এখানে থাকতে থাকতে এই ইরফান আলির নাম হয়ে যায় ইরফান আলি দু’নম্বর। তার এত বছরের জীবনে গৌণতার বোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এভাবে চলতে চলতে কোনো একদিন যখন স্মার্ট ইরফান আলি কোনো একটা হুকুম তাকে করেছে, বা সুপারভাইজারের বদলি হিসাবে কাজ করছিল, সে তখন প্রায় আচমকাই হাতের কোদালটা এক নম্বর ইরফান আলির মাথায় চালিয়ে দেয় প্রোটাগনিস্ট ইরফান। খুবই বীভৎস পরিণতির গল্প। কান্নাকে যদি ব্যাপক পরিসরে সংজ্ঞা দিই, তাহলে এটা সেই ধরনের ধাক্কা-দেয়া গল্প ছিল আমার জন্য। প্রায় ৫০ বছর পরেও গল্পটা মনে রাখতে পারার কারণ এর ধাক্কা দেবার শক্তিটাই; এবং অবশ্যই আমার ওই বয়স, নম্র সব অনুরণন দিয়ে জগতকে তখনও দেখতে থাকার অভ্যাস, ইত্যাদি। তবে এই গল্পটার কথা মনে করতে পারলাম হয়তো আপনার প্রশ্নের ওই ‘একটা গল্পে’ বেঁধে দিতে পারার কারণেই। অন্য সময় অন্য মননে বা সময়ে, দিব্যি অন্যান্য গল্প নাড়া দিয়েছে। কখনও কাঁদিয়েছেও। বিভূতি’র ‘রাণুর প্রথমভাগ’ বইয়ের গল্প হোক, শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পটি হোক কিংবা মশিউলের ‘বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ৎ’ হোক। পড়িনি এমন অজস্র সাহিত্যকর্মে তো বটেই, পড়েছি এমন সাহিত্যকর্মের ভান্ডারেও অজস্র উদাহরণ থাকার কথা।

শুদ্ধস্বর: আপনার গল্প লিখতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকরণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তে এবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

মানস চৌধুরী: সাহিত্য বা শিল্পকলার, কিংবা ললিতকলার বা সুরের, জগতে ‘নিজস্বতা’ খানিকটা ফ্যালাসির মতো বলে আমার মনে হয়। এখানে সংমিশ্রণ ঘটতে বাধ্য। আবার সেটা যদি আদৌ ‘নিজস্বতা’ বলে কিছু কারও থাকে তার প্রতিবন্ধকতা নয়। সুরের দুনিয়ায় দুর্দান্ত সব উদাহরণ দেয়া সম্ভব। কিছুক্ষণের জন্য এই প্রশ্নটার জটিলতা যে অনেক সেটা মানতে অনুরোধ করব। তবে প্রশ্নটার মধ্যে ব্যাকরণ ও ফর্মের প্রসঙ্গ থাকাতে সেখানেই মনোযোগ দিয়ে দুয়েকটা কথা বলার চেষ্টা করি। আমার জন্য, গল্প লিখতে বসার শুরুতেই, প্রধান আত্ম-মোকাবিলার জায়গা ছিল আমার শুনে-আসা ভাষার দুর্বোধ্যতার বিষয়টা। তাছাড়া, আমি তথাকথিত প্রবন্ধ যেহেতু আরও আগে থেকে লিখি, আমি সেই দুনিয়ার সিনট্যাকটিক্যাল অভ্যাসে থাকব কিনা সেটাও ভাবিয়েছিল। আমার বিবেচনায়, আমার পয়লা ভাঙনের জায়গা খোদ আমি নিজে। আমি মনে করি না যে আমি এক ধরনের ভাষাকাঠামো এবং মুডের গল্প লিখেছি। আমার প্রবন্ধের জগত সম্বন্ধেও সেটা বলা চলে সম্ভবত। তবে সেটাকে আজকে বাইরে রেখে বলতে পারি যে গল্পের দুনিয়াতেও বহুমুড ও বহু-সিনট্যাকটিক্যাল শৈলীর চর্চাকার আমি। তবে আমার একটা বড় সমস্যার কথা এখানে বলতে পারি। অনেক গল্পকারের মতো আমি সহজেই ধরে নিতে পারি না যে আমি সাবজেক্ট বা প্রোটাগনিস্টদের কথ্য ভাষাটা জানি এবং সেটাকে গল্পের মধ্যকার সংলাপে বসিয়ে দিতে পারি। আমার এই না-ধরে নিতে পারাটা কতটা আমার নানাবিধ বাংলাকে না-চেনা সেটা নিয়ে কথা উঠতে পারে। কিন্তু আমি নিশ্চিত হয়েছি, অনেক লেখকই যতটা অনায়াসে এই কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন, ততটা অনায়াস তাঁদের দক্ষতা নয়। তবে অন্যদের চর্চা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ থাকলেও নিজের চর্চাতে এটা কোনো উপকার আনেনি। হতে পারে, এই কারণেই আমার গল্পে সংলাপ হয় কম থাকে; অথবা সংলাপ নিয়ে আমার দুর্ভাবনা বেশি থাকে। এটাকে আমি এই প্রশ্নটার সাথে সম্পর্কিত করে দেখি। এখানে সমস্যাটা প্রোটাগনিস্টের সম্ভাব্য চিন্তাপ্রবাহ নিয়ে নয় আমার, বরং তিনি সেই চিন্তাপ্রবাহ প্রকাশ করতে সম্ভাব্য কী ধরনের শব্দমালা ও উচ্চারণের আশ্রয় নিচ্ছেন সেটা নির্ধারণের সমস্যা। কখনও কখনও ইচ্ছা হয় ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ ভাষা দিয়েই সকলের কথা চালাই না কেন! এটা একটা ডেসপারেশন ধরনের ইচ্ছা, ঠিক কাজের পদ্ধতি হিসাবে বাছাই করিনি কখনও।

শুদ্ধস্বর: আপনার কাছে একটি সার্থক ছোটোগল্পের মূল উপাদান কী?

মানস চৌধুরী: এরকম সংজ্ঞামূলকভাবে আমি বলতে চাইব না। পাঠক হিসাবে আমি কী আশা করি বা পড়ি (এবং বিপুল যে পরিমাণ পড়ি না নানান কারণে, মুখ্যত আলসেমি ও নিজের লেখার সময়টুকু বের করার জন্য), কিংবা কী পড়তে পছন্দ করি (এবং যে বিপুল পরিমাণ পছন্দ করি না) তার একটা রূপরেখা বলতে পারি। আমার জন্য গল্পকারের গদ্যের সপ্রতিভতা/স্মার্টনেস সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। কাছাকাছি পছন্দের হলো গল্পের প্রোটাগনিস্টসমূহের ব্যক্তিত্বের স্পষ্টতা ও বহুবিধতা। এখানে আমি বোঝাতে চাইছি, চরিত্রগুলোকে চিনবার জন্য যথেষ্ট নড়াচড়া আছে তাঁদের; এবং তাঁরা কম সাদাকালো। মানুষের জীবন ততটা সাদাকালো বলে আমি মনে করি না, যতটা কিছু লেখক বানিয়ে ফেলেন। এছাড়া ছোটোগল্পে নৈতিকতার ঘোষণাপত্র বা পাহারাদারি মারাত্মক অপছন্দ করি। কারও কারও লেখা পড়লে মনে হয় গল্পকার চরিত্র বাছাইয়ের সময়ে রুচি কিংবা মতাদর্শের সেবক হয়ে নেমেছেন। সেগুলো অপছন্দের ছোটোগল্প আমার জন্য।

শুদ্ধস্বর: লেখকের রাজনৈতিক বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লেখকের কোন ধরনের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

মানস চৌধুরী: একভাবে তিন নম্বর প্রশ্নটার পটভূমি এটারই মতো বলে মনে হয়। সেই অর্থে পুরাবৃত্তি থাকবে আমার উত্তরেও। এমনকি অরাজনৈতিক/এপোলেটিক্যাল রচনাতেও রাজনীতি মূর্ত, ঠিক যেমন ছায়াছবির সাইলেন্সও সাউন্ড ডিজাইনের অংশ। এই মুহূর্তে আপনি সাজেকের নিসর্গের ছবি যতভাবে হাজির করবেন, ততভাবেই আপনি যে সামরিক ও জাতীয়তাবাদী নিপীড়নকে আড়াল করছেন আমি সেটাই দেখব। ফলে, আমি ভাবি যে পাঠক ও লেখকের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যেই রাজনৈতিক বোধ বা পাটাতন কাজ করে কোনো রচনার (বা সাংস্কৃতিক প্রডাক্টের)। প্রশ্নটার পরের অংশটা আরও সাজেসিভ বা পরামর্শের দিকনির্দেশনা বহন করে। প্রয়োজনীয়তা বা কর্তব্যবোধ বা ঔচিত্যবোধের বিষয়টা পক্ষ-বিপক্ষ আর লেখকের মাথার আরামের সাথে সম্পর্কিত। যিনি জুলুম আর জালিমি দেখতে পান তাঁর লেখায় তার টুকরা কোনো না কোনোভাবে হাজির হতে থাকবেই; বা তিনি হাজির রাখতে চাইবেন। যিনি দেখতে পান না, দেখতে চান না, তিনি নিশ্চয়ই আরামে আছেন; তাঁর নিশ্চয়ই সেটাই রাজনীতি। তবে এসব বলার সময় আমি সতর্ক থাকার পক্ষে যে, বেশ কিছু পাঠক সাইবারস্পেসে যেভাবে হাজির হন তাতে মনে হয়, তাঁরা প্রতিটি ছোটোগল্পেই “রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা”র লক্ষণ দেখতে চান। সেভাবে, অন্তত ছোটোগল্পে, আশা করতে থাকলে ওগুলো রোগীর পথ্য হতে বাধ্য। একজন লেখকের নানান রকম উৎপাদন থেকে তাঁর রাজনৈতিক বোঝাবুঝি, অবস্থান, বাসনা ধরা পড়ার কথা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জনের একটা চাকরিবিধি লেখকদের হাতে ধরিয়ে দেবার পক্ষপাতী আমি নই। প্রথমত, লেখকের সেটা আগ্রহের না হতে পারে; দ্বিতীয়ত এভাবে করতে থাকলে একটা স্থূল প্রকল্পমাফিক রচনাশৈলীর ধারক হতে পারেন তিনি।

শুদ্ধস্বর: আপনি এখন কী লিখছেন? আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে পাঠকদের জন্য কিছু বলুন!

মানস চৌধুরী: গল্পই (উপন্যাস তো বটেই) এখন সবচেয়ে কম লেখা হচ্ছে আমার, অথচ যদি আমার সুযোগ থাকত, এই বয়সে ও প্রজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি লিখতে চাইতাম গল্পই। যদি সুযোগ থাকত – এই কথাটা ভেঙে বলার দরকার আছে। আমাদের দেশে লিখে নির্বাহ করতে পারার সুযোগ বা সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। যে দুয়েকজন ভাগ্যবান এটা পেরেছেন, তাঁদেরও বিকট পরিমাণে লেখা উৎপাদন করতে থাকতে হয়, এবং লাগাতার। তাঁদের লেখা আমার যেমনই লাগুক, এই বাস্তবতাটা তাঁদের জীবনের জন্য নির্মম। আবার যেসব দেশে ‘লিখে খেতে পারা যায়’ ভাবা হয়, সেগুলোও প্রায়শই অতিরঞ্জন। ‘বেস্টসেলার’ হয়ে না উঠলে কিংবা ভারি নামের কোনো হাউজের প্রদায়ক না হলে ‘লিখে পেট চালানো’ তামাম বিশ্বেই নানান মাত্রায় কঠিন বা অসম্ভব একটা কাজ। এখন আমি পত্রিকার সম্পাদক বা তামাক কোম্পানির ব্যবস্থাপক কিংবা ব্যাংকের ডেস্কধারী হলে কী হতো তা বলা মুশকিল আমার জন্য, কিন্তু শিক্ষকতা করি বলেই ‘লেখা’র কিছু কিছু মোডালিটি ও চর্চা প্রায় চাকরির অংশই। আবার চাকরির একটা পরিবর্ধিত এলাকা হিসাবে কিছু রচনা করতে হয় যা ঠিক ‘চাইলে বাদ দেবার মতো’ নয়। আপনি মাস্টারি করেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী আপনাকে যোগাযোগযোগ্য শিক্ষক ও লিখতে-সক্ষম মনে করেন, আর তাঁরা বছরে কয়েকবার আপনার কাছে রচনা চাইছেন– এরকম একটা বাস্তবতাতে কিছু রচনা সেসব কারণে লিখতে হয়ে থাকে। মাস্টারি করেন বলেই দুচারটা বিদ্যাজগতীয় রচনা কিংবা দুচারটা বিশ্লেষণাত্মক রচনা বা মতামত/কমেন্টারি লেখার দায়ে/অনুরোধে পড়তে পারেন। সব মিলে যতটা ‘মনের খেয়ালে’ আমরা কল্পনা করি, পেশাজীবন ততটা খেয়ালকে উৎসাহ দেয় না। সেই অর্থেই বললাম, যদি আমার পেট চালানোর চিন্তা না থাকত, তাহলে টিভিপর্দাতে থ্রিলার ছায়াছবি আর ক্রিকেট দেখার বাইরে আমি আলসেমি কাটিয়ে-ওঠা মুহূর্তগুলোতে কেবল গল্প লিখতেই চাইতাম। হয়তো, বছরে দুই বছরে একবার উপন্যাসের চেষ্টাও করতাম। কিন্তু পরিস্থিতি ওরকম নয় বলে, আমি পলেমিক বা কমেন্টারির বাইরে অনেকদিন পর আচমকা সবচেয়ে পছন্দের মাধ্যম ছোটোগল্পে বসে পড়ি। লিখেও ফেলি একটা দুটো। তবে হয়তো দীর্ঘকাল করা হচ্ছে বলেই তর্কমূলক রচনা বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণাত্মক রচনা কিংবা কথাসাহিত্যের বাইরে তথাকথিত সৃজনশীল বা সত্তাশ্রয়ী গদ্য সবই লিখতে আমার আরাম লাগে। বাসনার কথা বললে, আরও আরও ছোটোগল্পই লিখতে ইচ্ছুক আমি।

  • More From This Author:

      None Found
  • Support Shuddhashar

    Support our independent work, help us to stay pay-wall free by becoming a patron today.

    Join Patreon

Subscribe to Shuddhashar FreeVoice to receive updates

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!