‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’ প্রসঙ্গে দীপেশ চক্রবর্তীর সাথে আলাপচারিতা

অনুবাদকের ভুমিকা: নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাত দীপেশ চক্রবর্তী আমাদের কাছে খুবই পরিচিত এক নাম। বিশেষত তাঁর ‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’ দুনিয়াজুড়ে বহুল পঠিত ও আলোচিত গ্রন্থ। সম্প্রতি এই বইয়ের দুই-দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে বইটি নিয়ে নানাবিধ পর্যালোচনা চলেছে, যাতে অংশ নিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাদেশেও বুদ্ধিবৃত্তিক ও পরিবর্তনকামী ক্রিটিকাল রাজনৈতিক পরিসরে এই বইটি নিয়ে আলাপ-পর্যালোচনা বিদ্যমান।

অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটিতে মূলত দীপেশ চক্রবর্তী ‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’ বইয়ের প্রকল্প প্রসঙ্গে নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এছাড়াও সাবলটার্ন স্টাডিজের শুরু দিককার অনুসন্ধানের অভিমুখ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন। পাশাপাশি নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার কিছু নির্দিষ্ট সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন। দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর আরেক গুরুত্বপূর্ণ বই The Calling of History : Sir Jadunath Sarkar and His Empire of Truth প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভারতবর্ষের গণতন্ত্র, ইতিহাস, ইতিহাস-রচনার নানা খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন, যা আগ্রহী পাঠকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে আমাদের বিশ্বাস। (উল্লেখ্য, ‘দ্য কলিং অফ হিস্ট্রি’ নিয়ে শুদ্ধস্বরে প্রকাশিত দীপেশের আরেকটি অনূদিত সাক্ষাৎকার দেখা যেতে পারে।) অনুবাদের ক্ষেত্রে সাবলটার্ন স্টাডিজ এবং নিম্নবর্গের অধ্যয়ন দুই-ই নির্বিচারে ব্যবহার করা হয়েছে।

দীপেশ চক্রবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে লরেন্স এ কিম্পটন ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর। প্ল্যানেটারি তথা গ্রহীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ু সংকট ও অতিমারির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সংক্রান্ত তাঁর লেখালেখিকে সমগ্র বিশ্বেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর The Climate of History in a Planetary Age গ্রন্থ।

অনুবাদটি ২০১৬ সালে Critical Theory Workshop ওয়েবসাইটে ‘Provincializing Europe: In Conversation With Dipesh Chakrabarty’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

অনুবাদক: সহুল আহমদ

 

 

প্রশ্ন: বিদ্যায়তনিক ইতিহাসের দিকে আপনার যাত্রাটা বেশ অস্বাভাবিক: পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক করেছেন, ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা, এবং ডক্টরাল পর্যায়ে গিয়ে ইতিহাসে আসলেন। এটা কী ব্যাখ্যা করে? আপনার এই যাত্রা কী কোনো বিশেষ ভাবে আপনার কাজের ওপর প্রভাব ফেলেছে?

দীপেশ চক্রবর্তী: এটা দুইভাবে প্রভাব ফেলছে। প্রথমত আপনি যদি কিছুটা বিজ্ঞান পড়ে থাকেন তাহলে বিজ্ঞানের লেখাপত্রের এক-দুই পৃষ্ঠা আপনাকে দূরে ঠেলে দিবে না। মানবিকবিদ্যার আমার প্রচুর বন্ধু আছেন যারা বিজ্ঞানের গদ্য পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং তারা আর এটাকে মোকাবিলা করতে চাননি। সুতরাং এখন যেহেতু আমি আসলে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছি, এটা আমাকে প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞান পড়তে ভীত না হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে। কলেজে ভূতত্ত্ব ছিল আমার একটা অ-প্রধান বিষয় (minor subject), এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আলাপের ভূতাত্ত্বিক দিক আমাকে মুগ্ধ করে। আমি বলবো যে, যদি আপনার যুক্তিবিদ্যা, অর্থনীতি, আইন অথবা এমন যে কোনো বিষয় যা আপনাকে ন্যায় (সিলোজিজম) প্রসঙ্গে, অথবা ‘if A, then B’ এর জটিল সংস্করণ বিষয়ে ভাবতে বাধ্য করে, তবে সেটা আপনাকে যৌক্তিকভাবে চিন্তা করতে সহায়তা করবে। কখনো কখনো আমি ভাবি, আমার যে বন্ধুরা অন্যদিকে খুবই প্রতিভাধর কিন্তু সাহিত্য অথবা ইতিহাসের প্রশিক্ষণ থেকে তারা উঠে এসেছেন, তাদের ন্যায়রূপ চিন্তার প্রশিক্ষণে ঘাটতি রয়েছে।

 

প্রশ্ন: মার্ক্সবাদী ইতিহাস-রচনার দিকে সাবলটার্ন স্টাডিজ তথা নিম্নবর্গের অধ্যয়ন যে-সকল নিশানা তাক করেছিল তার মধ্যে একটা ছিল মার্ক্সবাদীদের সেই প্রশ্নাতীত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে, স্থানিক পার্থক্যগুলো পুঁজি দ্বারাই গঠিত [স্ট্রাকচার্ড] হয়; পুঁজির একটা সর্বজনীন যুক্তি আছে, ফলস্বরূপ আমরা স্থানিক পার্থক্যগুলোকে উপেক্ষা করতে পারি; এগুলো উপরি-ভাগের বিষয়। ব্লগের পাঠকদের সুবিধার জন্য আপনি কি এই পার্থক্যের বিষয়ে একটু খোলাসা করে বলবেন?

দী:চ: আমি একধাপ পিছনে গিয়ে একটা সাধারণ প্রস্তাব করি, যা মার্ক্সবাদের বিষয়টাকে অন্তর্ভুক্ত করে। উনিশ শতকের দিকে সমাজবিজ্ঞান গড়ে ওঠার সাথে সাথেই একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, সমাজের আসল ‘সত্য’ (তা মনোবিজ্ঞানমূলকই হোক বা সামাজিকই হোক) এমন কিছু যা কিনা জনগণের দৈনন্দিন চেতনা থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখে। অন্যভাবে বললে, সমাজকে আসলে কী টিকিয়ে রাখছে তার কেন্দ্রস্থলের দিকে প্রাত্যহিক কাণ্ডজ্ঞান আপনাকে নিয়ে যাবে না। এখন সেই কেন্দ্র হতে পারে মনোবিজ্ঞান, যদি আপনি ফ্রয়েডিয়ান হোন। এটাই পরিবার ত্রয়ী, মানে পিতা, মাতা ও সন্তানের গোপন বিষয়। অথবা আপনি ভাবতে পারেন যে, এটা পণ্যপূজা (commodity fetishism), পণ্য উৎপাদনের গোপন বিষয় যা প্রাত্যহিক কাণ্ডজ্ঞানে ঠাহর করা যায় না। আপনি এই সবকিছুকে ফ্রেডরিক জেমসন যাকে ‘দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতা’ বলে আখ্যায়িত করেন তার অংশ বলতে পারেন; অন্য কথায়, এই ধারণা যে, সবকিছুই সর্বদা ত্রিমাত্রিক এবং এমনকি সমাজ, যা কিনা একটি বিমূর্তন বা এবস্ট্রাকশন, সেটাও ত্রিমাত্রিক গড়নের। আপনি কেবল সেই কাঠামো বা গড়নের গভীরতায় অনুসন্ধান চালালেই বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন। সেই কাঠামোর গভীরে নিহিত সত্যই আপনার জন্য পথনির্দেশক নীতিতে পরিণত হয়েছিল, তা আপনি মানবদেহকে ব্যবচ্ছেদ করেন বা বিশ্লেষণাত্মকভাবে সামাজিক দেহকে ব্যবচ্ছেদ করেন। বিষয়গুলোর তথাকথিত উপরিভাগ নিয়ে একধরণের অবিশ্বাস ছিল।

পরবর্তীতে যে ধারণা উত্থাপিত হয়েছিল সেটা ছিল, সমাজবিজ্ঞানীর কাজ হচ্ছে এই ধারণার রহস্যমোচন [ডিমিস্টিফাই] করা যে, প্রতিদিনকার জীবন রহস্যময় বা বিভ্রান্তিকর [মিস্টিফিকেশন] হওয়ার ফলে আমরা পুঁজিবাদের সমালোচনা করি না। আমরা পুঁজিবাদকে মেনে নিই, বা আমরা একটি অসম সমাজকে মেনে নিই। হয়তোবা এই কারণে যে, আমরা জানি না আমাদের জীবনের বৈষম্যগুলো কোথা থেকে আসে। যদি আপনি জানতে সক্ষম হন কোথা থেকে এটি আসে, যদি আপনি এই সমস্যার চাবিকাঠি পেয়ে যেতেন তাহলে তো আপনি সেই কাঠামোগুলোর বিকল্প ভাবতে পারতেন। এটাই মূলত এমন অনেক কাঠামোর সাধারণ ধারণা যা কিনা সমাজচিন্তার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা গ্রহণ করেছিল। আমি মনে করি মার্ক্সবাদও এদের একটা। আপনি যদি এই পদ্ধতিতে [মোড] ভাবেন, তাহলে আপনি এমন একটা চাবিকাঠির সন্ধান করবেন যা আপাতদৃষ্টিতে বিচিত্র সামাজিক সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। আপনি ভাববেন যে, যদি আমি এই চাবি ব্যবহার করে সমাজকে ঠিকঠাক করে ফেলতে পারি, তাহলে সেটাই করবো। এটা এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যায় যা ‘কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন’ এই প্রশ্নের চাইতে ‘এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো?’ এই প্রশ্নকে সর্বদা বেশি গুরুত্ব দেয়। অনেকটা এভাবেই সামাজিক বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছিল। এবং আমি মনে করি ভাবনাটা এমন ছিল যে, সমাজের মধ্যে আপনি যে পার্থক্যগুলো দেখেন বিশ্লেষণাত্মক গুরুত্বের ক্ষেত্রে পুঁজির যুক্তির প্রাথমিক বাস্তবতার চেয়ে সেগুলো গৌণ। আপনি যদি পুঁজির যুক্তি উন্মোচন করেন তাহলে আপনার কাছে এই পার্থক্যগুলোকে কেবল পার্থক্য হিসাবে দেখা হবে না, বরঞ্চ পুঁজির জমানায় উৎপাদিত পার্থক্য হিসাবে দেখা হবে। পুরো যুক্তিটা এমন হয়ে যায় যে, যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে বাজারের অভিরুচি বা পছন্দ-অপছন্দ। ধরুন, সর্বজনীন প্রস্তাবনা হচ্ছে সকল মানুষের গান শোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। অতঃপর এটা পুঁজিবাদী বাজারের প্রশ্ন আমি লোকসঙ্গীতের ওপর সিডি করবো নাকি দেশজ সঙ্গীত, নাকি জ্যাজ, নাকি ধ্রুপদী ভারতীয় সঙ্গীত ইত্যাদি। পার্থক্যটা আসলে সম্পূর্ণই একটা অভিরুচি; এবং মার্কেটিং যুক্তি দিয়ে সেটা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। আমরা এই ধরনের অবস্থানের বিরুদ্ধে যুক্তি-তর্ক করেছি।

 

প্রশ্ন: মার্ক্সবাদীরা অভিযোগ করেন যে, নিম্নবর্গের ইতিহাস-রচনায় (হিস্টোরিওগ্রাফি) ভগ্নাংশের [ফ্র্যাগমেন্টস] উত্থান ঐক্যের হেতুকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তারা বিশ্বাস করেন যে, নিপীড়নের বৈশ্বিক কারণ অনুসন্ধান চর্চার মাধ্যমে ঐক্যের হেতুটা জ্বালানি পায়। এতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

দী:চ: নিম্নবর্গের অধ্যয়নে যা ঘটছিল তা হচ্ছে, তারা যুক্তি দিচ্ছিলেন এমনকি আপনি যখন জাতীয় বা আঞ্চলিক পরিচয়ের মত একটি সমগ্র নির্মাণ করেন তখন সেই পরিচয় নির্মাণও ক্ষমতাচর্চাকারী কর্তার (এজেন্সি) একটি ক্রিয়াকলাপ। অন্য কথায়, আপনি ওড়িয়া, বাঙালি বা মারাঠি হতে পারেন কেবল অন্যান্য পরিচয়ের ওপর আধিপত্য কায়েম করে, যা আপনি এসব [সামগ্রিক পরিচয়ের] মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করে নেন। উদাহরণস্বরূপ হিন্দির ইতিহাসের কথাই ধরুন। পৃথক ভাষা হিসাবে রাজস্থানের বিভিন্ন ভাষার স্বীকৃতির জন্য একটা দীর্ঘ আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু সকল রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে, তারা হিন্দির সাথে মিশে যাবেন। যারা ভগ্নাংশ ধারণার সমর্থক ছিলেন তারা এই ধারণাকে ব্যবহার করে আত্মীকরণের সমালোচনা করছিলেন। এটি সংহতি বা ঐক্য সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল না। তবে আমি মনে করি, যুক্তিটা এই ছিল যে, সংহতি/ঐক্য সৃষ্টির যে কোনো প্রকল্পকে তাঁর নিজের অগণতান্ত্রিক প্রবণতার বিরুদ্ধে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। সুতরাং আদর্শবাদী ও ইউটোপিয়ান আদলে যুক্তিটি হবে যে, একটি সংহতি বা সংহতির মুহূর্তের প্রতিটি গড়ন এমন হতে হবে যে, ভগ্নাংশগুলো সমগ্রের মধ্যে থেকে যে আবশ্যিকভাবে শুরু হয় না সে বাস্তবতাকে অগুরুত্বপূর্ণ যেন মনে না করা হয়। ফলে ভগ্নাংশের ধারণার আহ্বানটা ছিল পার্থক্যের প্রতি একটি নৈতিক সতর্কতা। অন্য কথায়, বিষয়টি হচ্ছে জাতির ভেতর ‘বিভেদের মাঝে ঐক্য’[1] স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ছিল/আছে এটা ধরে নেয়া নয়, বরঞ্চ এই ঐক্য যেন আসে তা নিয়ে নিরন্তর চেষ্টা চালানো। ঐক্যকে ধরে রাখার এই কাজটা নিরন্তর ও বিরামহীন। ‘বিভেদের মাঝে ঐক্য’ কোনো সহজাত বিষয় নয়; এটাকে সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় পরিণত করতে হবে; এর জন্য প্রয়োজন দৈনন্দিন রাজনৈতিক কাজ।

 

প্রশ্ন: এখানে সংশয়ের হার্মেনিউটিক ব্যবহার করে এই ধারণাটাকে আরো একটু সামনে এগিয়ে নিয়ে যাই। সাবলটার্ন ইতিহাসবিদদের প্রাথমিক দিককার লেখাগুলোতে, কৃষকবিদ্রোহ নিয়ে লিখতে গিয়ে কৃষক চৈতন্যকে ধাতবাদী করে তোলার (essentialize) একটি প্রবণতা ছিল। বা, সম্প্রদায়গত বন্ধন থেকে একটি স্বতন্ত্র চৈতন্যের আবির্ভাব বিষয়ে অন্তত অনুমান ছিল। পূর্বে অরি মেইনের লেখাতেও কি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়নি? যদি সাবলটার্ন স্টাডিজের উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে পার্থক্যের ব্যাপারে সতর্কতা, তাহলে একটি কৃষক কর্তাসত্তা (subject) তৈরিতে এটা কীভাবে অংশীদার হলো? এই ধাতবাদী করার প্রক্রিয়ার [এসেনশিয়ালাইজেশন] সমালোচনাকে আপনি কীভাবে খণ্ডাবেন?

দী:চ: এটা উল্লেখ করে শুরু করি যে, ধাতবাদী করার প্রক্রিয়ার সমালোচনাকে খারিজ করতে গিয়ে আমি সকল সমালোচনাকে খারিজ করছি না। এখনও ন্যায্য সমালোচনা হতে পারে, এবং আপনি কিছু বিষয়ে ইশারাও দিয়েছেন। কিন্তু যারা বলছেন যে আমরা ধাতবাদকে পুনরুৎপাদন করছি, বা কেউ কেউ আরো আগ বাড়িয়ে বলছেন যে আমরা প্রাচ্যকরণ করছি, আমি মনে করি তারা আসলে দুটো জিনিস বুঝতে পারেননি। প্রথমত, যে কারণে প্রথম দিকে সাবলটার্ন স্টাডিজের কাজগুলো, বিশেষত রণজিৎ গুহের কাজ এতো বেশি কাঠামোতে অর্পিত ছিল তা হচ্ছে যে, আমাদের ভাবনায় ফরাসি ও অ-ফরাসি উভয় প্রকারের [লেভি স্ট্রস, রোলা বার্থ, রোমান জেকবসন] কাঠামোবাদী চিন্তা খুবই প্রভাবশালী ছিল। এবং ভারতীয় ইতিহাসে কাঠামোর সন্ধানকে (অর্থাৎ লেভি স্ট্রস ও রোলা বার্থের অর্থে কাঠামো) ধাতবাদী এবং প্রাচ্যবাদী গৎবাঁধা ধারণার পুনরুৎপাদন হিসাবে ভুলভাবে পাঠ করা হয়েছে। আমরা প্রাচ্যবাদ সম্পর্কে জানতাম, গৎবাঁধা ধারণার সমস্যা সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল ছিলাম – জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে লিখেছেনও এটা নিয়ে। ফলে আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং সে নিয়তে এগুলো পুনরুৎপাদন করছিলাম না। সুতরাং আপনি যদি এই সমস্যাগুলোর বিষয়ে আমাদের নিজস্ব সময়সাময়িক সচেতনতাকে গ্রাহ্য করেন, এবং জিজ্ঞেস করেন যে আমরা ধাতবাদী না করে আসলে কী করার চেষ্টা করছিলাম, তাহলে আমি বলবো যে, আমরা কাঠামোবাদের সরঞ্জামগুলোকে ব্যবহারের চেষ্টা করছিলাম; একটা খুবই আকর্ষণীয় এবং আমার মতে যৌক্তিক কারণেই।

এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের কাঠামোবাদী উত্তর সঠিক ছিল। কিন্তু কাঠামোবাদের প্রয়োগের পিছনে একটা প্রশ্ন ছিল। ভারতের ইতিহাসজুড়ে আমরা আধুনিকতার মধ্যে আপাত সেকালের (archaic) ফিরে আসাকে প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যাটা ছিল যে আমরা কীভাবে এই অতীতকে বুঝবো যা কিনা একটা জমিনের কিছু নির্দিষ্ট মুহূর্তে উপস্থিত হয়। এবং রণজিৎ গুহ দেখলেন যে লেভি স্ট্রসের কাছে ফিরে যাওয়া, কাঠামোবাদের কাছে ফিরে যাওয়াটা এই বিষয়কে আক্রমণ করার একটা উপায়। গুহ যখন Elementary Aspects of Peasant Consciousness লেখেন, তিনি দুটো জিনিস করার চেষ্টা করছিলেন: প্রথমত, তিনি চেতনার ব্যাকরণকে পরিমার্জন করার চেষ্টা করছিলেন যেন তা কৃষক বিদ্রোহগুলো সম্পর্কে অবগত করে। এবং সেটা ছিল কাঠামোবাদী উদ্যোগ। একইভাবে যেমন সস্যুরের ভাষাতত্ত্বেও ছিল, ব্যাকরণই ছিল সকল বাক্যের কাঠামো। বাক্য যেকোনো বিষয়ের ক্রমিক বিবরণী তৈরি করে, কিন্তু যা এই ক্রমিকতাকে (serialization) বজায় রাখে তা একটি তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তনীয় কাঠামো যাকে আপনি ব্যাকরণ বলতে পারেন। এবং দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে যে, ভারতীয় ইতিহাসকে চেতনার সমস্যা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল; সেটা কেবল সাবলটার্ন স্টাডিজ কর্তৃকই নয়, বরঞ্চ সকল জাতীয়তাবাদী সংস্কারক দ্বারাও। সমস্যা ছিল যে সংস্কারকরা, তা বিপ্লবী হোন বা জাতীয়তাবাদীই হোন,সর্বদাই সংখ্যালঘু ছিলেন। এবং তারা চারপাশের ভারতের জনগণের দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছিলেন যে, এরা আমাদেরই লোক, কিন্তু আমি যেখানে আছি তারা সেখানে নাই। এবং আমাকে কোনোভাবে তাকে আমার পর্যায়ে তুলে আনতে হবে। অতএব, শুরু থেকে জাতীয়তাবাদ ও বিপ্লবী ভারতের পুরো প্রকল্পটাই ছিল একটা চেতনা উন্নত করার প্রকল্প। এবং দার্শনিক ও তাত্ত্বিকভাবে চেতনাটাই ছিল সাবলটার্ন স্টাডিজের প্রধান সমস্যা। এই কারণে রণজিৎ গুহ হেগেলের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং চেতনার সমস্যার দার্শনিক উপায় হিসাবে Phenomenology of Spirit-কে ব্যবহার করেছিলেন। তারপর এটিকে কাঠামোবাদের দিকে ঠেলে দেন।

এখন মার্ক্সবাদের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল; লেভি স্ট্রসের মতো একজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিন্তক কাঠামোবাদকে ব্যবহার করে ইউরোপীয় আধিপত্যের সমালোচনা করছিলেন। ভারতে যারা আমাদেরকে পাঠ করছিলেন তারা ভেবেছিলেন তারা আমাদের লেখাপত্রে যা পাঠ করছেন তা নিছকই উপনিবেশিক প্রাচ্যবাদী পুনরুৎপাদন, যা কিনা অরি মেইন বা অন্যান্যরা তাদের লেখাপত্রে তৈরি করেছিলেন। এবং সেটা হয়েছে আংশিকভাবে আমাদের দোষে এবং আংশিকভাবে ভারতীয়রা কাঠামোবাদী চিন্তায় প্রশিক্ষিত না হওয়া জনিত পরিস্থিতির কারণে। এবং ১৯৮৮ সালে ক্রিস বেইলির সাবলটার্ন স্টাডিজ খারিজ করার এইটাই ছিল কারণ। খারিজ করার এই পদ্ধতি এখনো অব্যাহত রয়েছে, বিবেক চিব্বার পর্যন্ত। ফলে আমি মনে করি, কাঠামোবাদ কেন সাবলটার্ন স্টাডিজের পণ্ডিতদের মধ্যে আবেদন তৈরি করলো এই প্রশ্নটা এখনো লোকে খোঁজেনি। আমি সাম্প্রতিক কিছু লেখাতেও বলেছি যে, আমরা যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছিলাম সেগুলোর উত্তর হয়তো কাঠামোবাদে নাও থাকতে পারে, কিন্তু খোদ প্রশ্নগুলো কৌতূহলোদ্দীপক, এবং ভারতের ইতিহাস থেকে সেগুলো এখনো দূর হয়নি।

 

প্রশ্ন: আপনার কাজের দিকে ফিরে আসি। আপনি কি সংক্ষেপে বলবেন, প্রভিন্সিয়ালাইজ ইউরোপ বলতে আসলে কী বোঝায়? ইউরোপকে কেন প্রভিন্সিয়ালাইজ করতে হবে?

দী চ: আমরা সবাই রেঁনেসা থেকে আলোকায়ন পর্যন্ত ইউরোপীয় চিন্তার উত্তরাধিকারী। এই চিন্তা ব্যতীত ভারতে বহু আধুনিক সমালোচনার উত্থানই হতো না, যেমন আম্বেদকারের অস্পৃশ্যতার সমালোচনা। আমি আম্বেদকারকেও উদ্ধৃত করেছি যেখানে তিনি আশা পোষণ করছেন যে, ভারতীয় ইতিহাস যদি ফরাসী বিপ্লব থেকে শুরু হতো! (তিনি আসলে সেই বছরটা উল্লেখ করেছিলেন)। কিন্তু একইসময়ে ইউরোপসহ সকল সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ধারণা, চিন্তা ও চর্চার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা পুঁজিবাদ বা আলোকায়ন বা রেঁনেসার পূর্বগামী। ফলে সকল ইতিহাসে চিন্তার এই আধুনিক বর্গগুলোর সাথে অনুবাদের এক ধরনের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া জড়িত। আপনি যখন অনুবাদের কথা ভাববেন তখন আপনি সেই বর্গকে তার উৎসের জমিন থেকে পুরোপুরি আলাদা করতে পারবেন না। যদি আপনি সতর্কভাবে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন যে এমনকি যখন একজন ফরাসি চিন্তকের চিন্তাগুলোকে জার্মানে নেয়া হচ্ছে, বা একজন জার্মান চিন্তকের চিন্তাকে ইংরেজিতে নেয়া হচ্ছে বিষয়গুলো আসলে অনূদিত হচ্ছে। এবং অনুবাদ একটা পার্থক্য গড়ে দেয়, তা ছোট হোক বা বড়ো হোক। মূল বক্তব্য ছিল এটা বোঝা যে, পুঁজিবাদে আমাদের রূপান্তর আসলে নিজেকে  পুঁজিবাদের বর্গগুলোতে অনুবাদ করার ইতিহাসও বটে। ফলে, ‘প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ’ মানে মূলত অনুবাদজনিত সমস্যার প্রতি সচেতনতা। এর অর্থ হলো যে, যদিও ইউরোপীয়ান চিন্তাধারা আধুনিক বিশ্ব গঠনের একেবারে কেন্দ্রে ছিল, তবু অনুবাদের ইতিহাস সর্বত্রই পাওয়া যায়, খোদ ইউরোপেই। প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপের নতুন মুখবন্ধে আমি স্পষ্ট যুক্তি দিয়েছি যে, এসব ইতিহাস কেবল ভারত বা চীনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, বরঞ্চ ইউরোপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

 

প্রশ্ন: সাবলটার্ন স্কুল কি ইউরোপীয় বর্গের বিকল্প কল্পনা করতে সক্ষম?

দী চ: না, এটি সম্পূর্ণ বিকল্পের কল্পনা করতে সক্ষম নয়। দেখুন, আধুনিক যুগে যিনি কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে লিখেছিলেন তিনি হচ্ছেন ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস। আপনি গণতন্ত্রের চেয়ে আরো এগিয়ে যেতে পারেন, এবং দেখবেন রাজনৈতিক চিন্তার একেবারে মূল বিষয় হচ্ছে এই ধারণাটি যে মানব জীবনকে অবশ্যই সুরক্ষা করতে হবে। এটি ব্রিটিশ আমলের ধারণা ছিল না। এটা এমন একটা ধারণা যা ১৭ শতক থেকে ধীরে ধীরে বিকশিত হওয়া শুরু করেছিল। মানবজীবনকে সুরক্ষা করতে হবে এই ধারণাটির জন্য আমরা আধুনিক ইউরোপের কাছে ঋণী; তা ভালো হোক বা মন্দ হোক। আমি মনে করি না যে এই ধারণাটি মোঘল আমলে প্রচলিত ছিল।

 

প্রশ্ন: প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপের ২০০৭-০৮ এর সংস্করণের মুখবন্ধ থেকে আমি একটু বলতে চাই। প্রত্যেক সাবলটার্ন পণ্ডিতের বিরুদ্ধে এবং বিশেষত এই বইটার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সবচেয়ে শক্ত একটি সমালোচনাকে আপনি এখানে মোকাবিলা করেন। সমালোচনাটি হচ্ছে যে, আন্দোলনটা সাবলটার্ন থেকে ভদ্রলোকের [অভিজাত] দিকে চলে গেছে; আর্কাইভগুলো পুরোদস্তুর ভদ্রলোক প্রকৃতির এবং এটা আসলে সাবলটার্ন কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধারের যে কোনো প্রকল্পকেই ধসিয়ে দিয়েছে। আপনি এই সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে দিচ্ছেন এই বলে যে, যে ইতিহাসবিদ ভদ্রলোকী পরিবেশে থেকে উঠে এসেছেন তার জন্য সেই প্রসঙ্গে কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ- সর্বোপরি যেমন আপনি বলছেন, খোদ ক্রিটিকই পক্ষপাতিত্বের নিজস্ব ধারণা বহন করে। এটা মাথায় রেখেই প্রশ্ন করি, অভিজাত পরিবেশে বেড়ে ওঠা কোনো ইতিহাসবিদের পক্ষে কি নিম্নবর্গের স্বর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? অথবা আমরা যে চশমা চোখে বড়ো হয়েছি সেগুলো কী সর্বদা আমাদের দৃষ্টিকে ঘোলা করে দিবে?

দী চ: যখন এই সমালোচনাগুলো সাবলটার্ন স্টাডিজের দিকে তাক করা হয়, তখন লোকেরা আসলে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, রণজিৎ গুহ এবং আমার সম্পর্কেই কথা বলেন, কিন্তু তাঁরা ডেভিড হার্ডিম্যান বা শাহিদ আমিন সম্পর্কে বলেন না, যারা আসলে এখনো নিম্নবর্গের স্বর পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যেকোনোভাবেই এই সমালোচনা কিছু লোকের বিরুদ্ধে তাক করা হয়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা সামগ্রিক সাধারণীকরণ টানা হয়; এবং আমি জানি না কেন সেটা ঘটে, কিন্তু ঘটে। প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপ এর আদি সংস্করণে আমার মূল বক্তব্য ছিল যে, যদি আমাকে এমন কিছুতে প্রবেশ করতে হয় যাকে আমি আগে আধুনিকতার অনুবাদমূলক ভিত (underpinnings) হিসাবে বর্ণনা করছিলাম, তাহলে আমাকে এমন উৎসের দিকে যেতে হবে যেখানে ভাষাগত দিক থেকে সেই পাঠগুলোর [টেক্সট] ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ ছিল এবং যেখানে আমি অভিজ্ঞতা ও ভাষার মধ্যে নড়াচড়া করতে পারবো। আমার জন্য এই কারণে পদ্ধতিগতভাবে তথাকথিত হিন্দু ভদ্রলোকের কাছে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। (আমার বইয়ের ভূমিকার অধ্যায়ে একটা বাক্য ছিল যেখানে বলেছিলাম, আমি এমন দিনের দিকে তাকিয়ে আছি যখন বাংলার ইতিহাস হিন্দুর ইতিহাস হয়ে উঠবে না, কারণ পৃথিবীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান এবং কিছু সময়ের জন্য তাই ছিল।) ভদ্রলোকদের দিকে তাকানোটা ছিল পদ্ধতিগত। এবং যে ধরনের ভদ্রলোকের দিকে আমি তাকাচ্ছিলাম তারা সামাজিকভাবে নির্মিত ভদ্রলোক বর্গের মধ্যে সংখ্যালঘু ছিলেন।

উদাহরণস্বরূপ বিধবা বিষয়ক অধ্যায়টা দেখতে পারেন। ভদ্রলোক পরিবারে সঙ্ঘটিত নির্মমতা এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গভীর মানবতাবাদী সংবেদনশীল ব্যক্তিরা সবসময়ই সংখ্যালঘু ছিলেন। তারা ছোট গল্প লিখছিলেন, অন্যান্য জিনিস লিখছিলেন, এবং আপনি যদি ভদ্রলোক সমাজের দিকে তাকান তাহলে এই যুক্তি দেয়া খুবই কষ্টসাধ্য ছিল যে, উনিশ শতকের সংস্কারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি বেহাল দশায় পড়েছে। ফলে আমি আসলে বলেছিলাম যে, আমার বইয়ের জন্য হিন্দু ভদ্রলোকের যে অংশকে ব্যবহার করেছিলাম সেটা প্রায় একটি সামাজিক বর্গ যা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমার বিজ্ঞানের পটভূমি আমাকে বলে যে, মানবিকবিদ্যার লোকেরা বিষয়গুলো সতর্কভাবে পড়েন না, কারণ তারা একটি যুক্তির কাঠামোটা দেখার চেষ্টা করেন না। বিজ্ঞান পটভূমি থেকে আসার কারণে কখনো সখনো আমি এই ভেবে ভুল করি যে, ‘আচ্ছা, আমি সম্ভাব্য আপত্তিগুলো আমলে নিয়েছি, এইবার সামনে এগোতে পারি’। আমি বুঝতে পারি যে, যদি না নিজেকে পুনরাবৃত্তি করি, লোকেরা আমি যা বলছি তা শোনেন না। এটা মানবিকবিদ্যার পঠন, শুনানি ও মনোযোগের সাথে শোনার দারিদ্রতা সম্পর্কে জানান দেয় আমাকে। অন্যদিকে আপনি যদি জ্যামিতি করে আসেন, তাহলে আপনি জানেন যে পূর্ববর্তী ধাপ সম্পন্ন না করে আপনি আসলে পরবর্তী ধাপে যেতে পারবেন না। এটা খুবই হতাশাজনক অভিজ্ঞতা। লোকের অমনোযোগী হয়ে পড়ে এটা বুঝতে পারা এবং আপনি যদি এক বাক্যেই যে কোনো একটা সমস্যার সমাধান করেন যা কিনা আপনার পাঠ্যে গুজে দেয়া হয়েছে, তাহলে অধিকাংশ পাঠক পড়বে না। ফলে আপনাকে যা করতে হবে তা হচ্ছে এর পুনরাবৃত্তি করে যাওয়া।

 

প্রশ্ন: এখানে আরো একটি বিষয়ে একটু ফিরে আসা যাক। ওই মুখবন্ধে আরেকটা চমৎকার বাক্য পড়েছিলাম – ‘কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইরত ক্রিটিক্যাল চিন্তা নিজেই কুসংস্কার বহন করতে পারে। ক্রিটিক্যাল চিন্তা তার উৎসের জমিনের সাথে সম্পর্কিত।’ এখান থেকে আমি যা বুঝেছি তা হচ্ছে যে, সব সময় ক্রিটিক্যাল চিন্তাকে খোদ ক্রিটিকের পরিপ্রেক্ষিতেই স্থাপন করতে হবে। এই বিষয় সম্পর্কে যদি আপনি সর্বদা সচেতন থাকেন এবং সকল সমালোচককেও যদি সচেতন থাকতে হয় তাহলে যাকে শিথিলভাবে ‘অপর’ বলা যায় তার সম্পর্কে কীভাবে কেউ শুরু করতে পারবেন?

দী চ: আপনি বিপদ সম্পর্কে সচেতন; আপনি সবসময় জানেন না কখন এটা ঘটবে! এটা সবসময় সতর্ক থাকার প্রশ্ন। এজন্যই আমাকে সতর্ক থাকতে হবে এমনকি যখন আমি ভদ্রলোক উপাদান ব্যবহার করছি। এর অর্থ এই নয় যে, আমার চিন্তায় উপস্থিত সকল বিপদ আমি আমলে নিয়েছি। এখানে আমি হাইডেগারের কাছে ফিরে যাই যখন তিনি বলেন, ‘যেকোন চিন্তককেই ঝুঁকি নিতে হবে এবং ত্রুটির মার্জিনেই বসবাস করতে হবে’। আমি যা করেছি বা ভেবেছি তাতে যদি কেউ গুরুতর সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন, আমাকে সর্বদা এখানে উন্মুক্ত থাকার চেষ্টা করা উচিত।

 

প্রশ্ন: ইতিহাসবাদ বা হিস্টরিসিজম বিষয়ে সাবলটার্ন সমালোচনাটা কী?

দী চ: আমি যখন ইতিহাসবাদ শব্দটা ব্যবহার করি আমি একে বৈশিষ্ট্যযুক্ত করার চেষ্টা করি। সমস্যা হচ্ছে যে, জার্মানি থেকে শুরু হওয়ার পর এই শব্দ বহু অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে আপনি যখন এটা দেখবেন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। আমি মোটাদাগে এটা দিয়ে এমন এক ধারণাকে [আইডিয়া] বোঝাচ্ছিলাম যা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয়েছে। ফলে আপনি যদি বলেন এই বর্গগুলো সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হবে, তার মানে যে কোনো বর্গই এখনো তার শৈশবে রয়েছে, তবুও আপনি একে ঠাহর করার জন্য এর সম্পর্কে আপনি যথেষ্ট জানেন। আপনি যখন কোনো একটি পরিপক্ক বর্গ সম্পর্কে লেখেন তখন ধরে নিচ্ছেন যে, আপনি এর সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত বিকাশের গতিপথকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। এই কাঠামোতে ভাবনাটা হলো যে, এটা [মানে বর্গটা] শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই জিনিস ছিল, একেবারে অক্ষত। ফুকো এই ভাবনারই সমালোচনা করছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খোদ বর্গকে কেবলমাত্র অভেদ [unity] এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ অভেদ হিসাবে দেখাটা উচিত নয়। এটাকে অবশ্যই প্রতিমুহূর্তের সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও চর্চা দ্বারা দেখাতে হবে। আমার কাজের জন্য যেটা নেয়া হয়েছে, ইতিহাসবাদ হচ্ছে সকল সত্তাকে সময়ের সাথে ক্রমাগত বিকাশমান হিসাবে বিবেচনা করা কিন্তু সার বৈশিষ্ট্যগুলো বজায় রেখে – আপনি সবসময় এই বর্গ দিয়েই একে ঠাহর করতে পারবেন। এটা অনেকটা সময়ের সাথে সাথে আপনার পারিবারিক অ্যাালবাম বা নিজের ছবিগুলো দেখার মতো। আপনি ধরে নিয়েছেন যে, এখানে কোনো ধরনের ধারাবাহিকতা রয়েছে, ‘আপনি’।

এই বিকাশভিত্তিক ধারণার একটি রাজনৈতিক রূপও রয়েছে- আপনি বলতে পারেন, ‘ভারতীয় জনগণ প্রথমে সাবালক হয়ে উঠুক, তারপর আমরা তাদেরকে ভোটাধিকার দেব’। কিন্তু সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ধারণাটি এই ‘বিকাশ’ভিত্তিক চিন্তাধারা থেকে জন্ম নেয় নি। এটি আমাদের সমালোচনার যাত্রাবিন্দু।

 

প্রশ্ন : আপনার The Calling Of History শীর্ষক বইয়ের প্রসঙ্গে এবার আসা যাক। উত্তর-উপনিবেশবাদী অর্থে, কোন বিষয়টা প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপের মতো বইয়ের সাথে ‘দ্যা কলিং অব হিস্ট্রি’ বইয়ের সংযোগ ঘটায়? আমি এগুলোকে সত্যিই বিচিত্র কাজ হিসাবে দেখি। এটা সম্ভবত স্কলার হিসাবে আপনার বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলে, কিন্তু এখানে কি কোনো যোগসূত্র আছে?   

দী চ: প্রভিন্সিয়ালাইজিং ইউরোপে ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ে কিছু নির্দিষ্ট বিতর্কে অংশ নিয়েছিলাম। ১৯৮০-৯০ এর দিকে যখন এই বই নিয়ে কাজ করছিলাম তখন এই সবকিছুই ছিল মৌখিক ইতিহাস ও স্মৃতি বিষয়ক বিশদ বিতর্কের একটা অংশ। এটা এমন এক সময়ও ছিল যখন কিনা আদিবাসী ইতিহাস জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। আমি ইতিহাসের গণতন্ত্রীকরণ দেখতে পাচ্ছিলাম; ‘আমাদের এমন ইতিহাস আছে যা নিয়ে আমরা গর্বিত হতে পারি’- লোকের এমন দাবির ফলে খোদ ইতিহাস বিষয়ক আমাদের বোঝাপড়াতে মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছিল। মূলত যখন এটি একটি বিশেষ জ্ঞানের শাখায় (discipline) পরিণত হয়েছিল, তখন এটা ধরে নেয়া হয়েছিল যে, ইতিহাসবিদের কাজ হচ্ছে বিচারকের মতো সাক্ষ্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা। কিন্তু আমরা এমন এক সময়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিলাম, যখন কিনা লোকেরা বলা শুরু করছে তাদের সাক্ষ্যই তাদের ইতিহাস। আমি দেখতে পেলাম যে, লোকেরা এমন সব পদ্ধতিতে ‘অতীত’কে  দাবি করছিলেন, যা আসলে ইতিহাস যখন ডিসিপ্লিনে পরিণত হয়েছিল তখন সে পদ্ধতিগুলো খারিজ করা হয়েছিল। ফলে যদুনাথ সরকার এভাবে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছিলেন- যদি আজকে ঐতিহাসিক সত্যের ধারণা আমাদের চোখে সন্দেহজনক ধারণা হয়ে ওঠে, যদি আমরা ইতিহাস বা এমনকি তথ্যভ্রষ্ট অতীত বা তথ্যবাহী অতীতের চাইতে স্মৃতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেই তাহলে সত্যের প্রশ্নকে কোন বিষয়গুলো এতো মূল্যবান করে তোলে?

আমি তৎকালে ভারতে বিদ্যমান জাতীয়তাবাদের বহুমুখী ও বিচিত্র রূপের প্রশ্নের দিকে গিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলাম এবং দেশাত্ববোধক জাতীয়তাবাদের ঐতিহ্যের মধ্যে যদুনাথকে স্থাপন করার চেষ্টা করছিলাম, যা আদতে আরো বেশি বর্ধনশীল/বিকাশভিত্তিক ছিল। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম কেন একদা সত্য এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা আমাদের বর্তমানকে আপেক্ষিক করার ব্যাপারও, এবং এতে আলোকপাত করে এটাও বলা যে, আমরা আজকে যা করছি সবসময় যে তা-ই করা হয়েছে বিষয়টা এমন নয়। আমরা দাবি করতে পারি না যে আমরা আমাদের পূর্বসূরীদের চেয়ে আবশ্যকভাবে বেশি সঠিক। দাবি করতে পারি না যে, ইতিহাস ও জ্ঞান কেবল ধারাবাহিকভাবে উন্নত হচ্ছে, এবং তারা ভুল ছিল ও আমরা এখন সঠিক।

 

প্রশ্ন: এই বইতে আপনি যদুনাথ ও সরদেশাই এর মধ্যকার চিঠিপত্র হাজির করেছেন; যেগুলোকে উপনিবেশিক আমলের শিথিল ঐতিহাসিক গবেষণা হিসাবে তারা বিবেচনা করছিলেন সেগুলোর সমালোচনা করছিলেন সেখানে। তারা এই ধারণার প্রতি লেগে ছিলেন যে, ঐতিহাসিক গবেষণাকে অবশ্যই গুরুতর হওয়া উচিত, আপনাকে অবশ্যই আর্কাইভ ঘাটতে হবে, আসল দলিলাদি দেখতে হবে এবং ‘বস্তুনিষ্ঠ সত্য’ খুঁজতে হবে। বিশ শতকের শেষের দিকে এসে ইতিহাস রচনা হয়ে যায় একটা বয়ান বা ন্যারেটিভের বিষয়। নিঃসন্দেহে গবেষণা থাকবে, কিন্তু সেটা একটা বয়ান। যদুনাথ ও সরদেশাই কি তাদের সময়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন? যদি করে থাকেন, সেটা কি কোনোভাবে ‘ইতিহাসবাদ’ নিয়ে সাবলটার্ন সমালোচনার সাথে মিলে?

দী চ: এমনকি যদুনাথ ও সরদেশাই এর মধ্যেও প্রচুর টানাপোড়েন ছিল। এগুলো একটা অধ্যায়ে আমি দেখিয়েছি যেখানে সরদেশাই এর লেখাপত্র নিয়ে যদুনাথ খুবই সমালোচনামূলক ছিলেন। যখন আসলে আমি সরকারের বইয়ের সরদেশাই এর নিজস্ব কপিটা পড়ছিলাম, এবং দাগের পাশের মন্তব্যগুলো পড়ছিলাম, আমি বুঝতে পারছিলাম যদুনাথ যা লিখছিলেন তার প্রতি তিনি কতটা সমালোচনাপ্রবণ ছিলেন। এমনকি তাদের ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও এই টানাপোড়েনের মহড়া চলতো। যদুনাথকে অবশ্যই সেই বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হয়েছিল। অন্যথায় এই বন্ধুত্ব টিকতে পারতো না।

আমি যাকে ‘ইতিহাসের জনজীবন’ (public life of history) বলি তা বরাবরই উপস্থিত ছিল এবং আছে। যেভাবে ভারত এবং অতীত সম্পর্কিত তার বোধ গণতান্ত্রিক হয়েছে এর সাথেও এটা সম্পর্কযুক্ত। আমাদের গণতন্ত্র যেমন সাংস্কৃতিক লড়াইর ওপর জোর দিয়েছে তেমনি রাস্তার রাজনীতির রূপের ওপর জোর দিয়েছে। ভারতীয় গণতন্ত্র আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক করে তোলার চেষ্টার মাধ্যমে খুব একটা কাজ করেনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা স্বচ্ছ হওয়ার কথা ছিল ততটা নয়; জনগণের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি যতটা কর্ণপাত করা উচিত ছিল প্রতিষ্ঠানগুলো ততটা করে না। অন্যদিকে, একটা ঐতিহাসিক চেতনায় প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে, মানে আমরা আমাদের অতীতের সাক্ষী দিচ্ছি এটার বলার সক্ষমতার প্রশ্নে, আমাদের বরঞ্চ একটা সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। আজকাল আপনি বলতে পারেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, নাগরিক সাংবাদিকতা, সেলফোনের কারণে অতীত ও বর্তমানকে প্রত্যক্ষ করার প্রশ্নটা উচ্চস্বরে প্রকাশ পাচ্ছে। আজকাল আমরা সবকিছুই প্রত্যক্ষ করছি। যা ঘটছে সবকিছুর ‘সাক্ষী’ হচ্ছি আমরা, এমনকি দাদরির গণপিটুনির ঘটনার। এই পটভূমিতে, আপনি যদি গণতন্ত্রের এই দুটো দিক আছে বলে মনে করেন, মানে সাক্ষ্য, প্রত্যক্ষীকরণ ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক (উইটনেসিং) দিক এবং ফরেনসিক (মানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তথ্য কিংবা যে-কোন দাবি যাচাইবাছাই হওয়ার পদ্ধতি/ঐতিহ্য-অনুবাদক); আমাদের ফরেনসিক দিকটা দুর্বল রয়ে গিয়েছে, অন্যদিকে সাক্ষ্য ও অভিজ্ঞতাজনিত দিকটা বিষ্ফোরিত ও প্রসারিত হয়েছে। অভিজ্ঞতার কার্যকলাপের একটা লম্বা ইতিহাস রয়েছে। যখন বিভিন্ন গোষ্ঠী দাবি করছিল যে তাদের একটা ইতিহাস আছে এবং সেটা আর্কাইভে গিয়ে নথিভুক্ত করার দরকার নেই, কারণ অভিজ্ঞতাই সে ইতিহাসে প্রবেশের দ্বার। আমরা আমাদের বিবৃতিমূলক [টেস্টিমোনিয়াল] ঐতিহ্যের বৃদ্ধি ঘটিয়েছি এবং এই দিকে আমরা খুবই শক্তিশালী।

 

প্রশ্ন: আমি আরিফ দিরলিকের  The Aura of Postcolonialism এর একটা অংশ উদ্ধৃত করতে যাচ্ছি, আপনি সেটা Small History of Subaltern Studies প্রবন্ধে ব্যবহার করেছেন : ‘ভারতের উত্তর-উপনিবেশিক বুদ্ধিজীবীদের আলাপে যে সাধারণীকরণ দেখা যায় তার অধিকাংশই অভূতপূর্ব বা অভিনব বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বিস্তৃত পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো আবিষ্কার নয়। সাবলটার্ন স্টাডিজের ঐতিহাসিক লেখাপত্র দেখাচ্ছে, ১৯৭০ সালে সালে ইপি থম্পসন, এরিক হবসবম এবং অন্যান্যদের প্রভাবে ছড়িয়ে পড়া ঐতিহাসিক রচনার প্রবণতাগুলোকে ভারতীয় ইতিহাসচর্চাতে প্রয়োগ করা হয়েছে।’ এই আলোকে আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, কোন হিসাবে তাহলে সাবলটার্ন স্টাডিজকে উত্তর-উপনিবেশিক প্রকল্প বলা হবে?

দী চ: আমি আগেই যেমন উল্লেখ করেছি, দিরলিকের বয়ানের সাথে [সাবলটার্ন স্টাডিজের] গুরুতর ফারাক আছে। ওই ইতিহাসবিদদের দ্বারা আমরা প্রভাবিত হয়েছিলাম এই যুক্তিটা সম্পূর্ণ সঠিক, কারণ সামাজিক ইতিহাস ইংরেজ ভাষাভাষী ইতিহাস বিভাগগুলোতেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এবং আমরা সবাই হবসবম, থম্পসন ও অন্যান্যদের আবহেই এসেছিলাম। কিন্তু আপনি দেখুন, দিরলিক আসলে পশ্চিমা গণতন্ত্র ও আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্যটা ধরতে পারছিলেন না। ইপি থম্পসন বা হবসমের অকাট্য বয়ান হচ্ছে যে, শিল্পায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কৃষককে মৃত্যুবরণ করতে হয়, ফলে ইংল্যান্ডের কৃষকরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন। তারা চাকরিবাকরির সন্ধানে কারখানাজাত শহরে বেরিয়ে পড়েছেন এবং তারা কারখানার শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছেন; এবার তাদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে হবে। তারপর, তাদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে সময় লাগবে এবং ধীরে ধীরে তারা নাগরিকে রূপান্তরিত হওয়া শিখে ফেলবেন। এই গণতন্ত্রগুলো কৃষকের মৃত্যুর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু রাজনৈতিক কর্তা [সাবজেক্ট] হিসাবে কৃষকের জন্মের ওপর আমাদের গণতন্ত্র নির্ভর করেছিল। আমাদের এখানে কৃষককে প্রথমে শিক্ষিত হওয়ার জরুরত পড়েনি, বা প্রথমে কারখানার শ্রমিক হওয়ার জরুরত পড়েনি। যখন ভারতের লোকেরা ভোট প্রদান করছিল, তখন অধিকাংশ ভারতীয়-সমাজ মূলত কৃষক সমাজই ছিল। এটাই ছিল গুরুতর ফারাক; এবং বিকাশভিত্তিক ইতিহাসবাদকে (developmental historicism) প্রত্যাখ্যান করে এটাকেই আসলে আমি আমাদের ইতিহাস হিসাবে বর্ণনা করছিলাম। আমি মনে করি এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের একটা সত্যিকারের বিপ্লবী দিক ছিল। আমরা এই বিষয় নিয়ে লিখছিলাম। একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আমরা জানি না, ফরেনসিক অর্থে ভারতীয় গণতন্ত্র সফল হবে কিনা, অর্থাৎ বোঝাতে চাচ্ছি যে-কোন সাক্ষ্য বা বিবৃতিকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা, সত্যে পৌঁছানো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রক্রিয়াটা ভারতে যত দ্রুত কামনা করা হয় ততটা দ্রুত সবসময় উদঘাটিত হয়নি, কিন্তু গঠনের দিক থেকে ভারতীয় গণতন্ত্রের একটা বিপ্লবী চরিত্র রয়েছে। এটাই আমাদের লেখালেখিতে ধরা দিয়েছিল। আমি মনে করি, দিরলিক এই দিক থেকে সঠিক যে, উপরোক্ত ইতিহাসবিদরা আমাদেরকে প্রভাবিত করেছেন। কিন্তু আমরা কেবলই তাদের অনুকরণ করেছিলাম দিরলকের এই পর্যবেক্ষণ ভুল।

 

 

[1] সাবলটার্ন স্টাডিজের ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন প্রবন্ধে ‘unity in diversity’ এর বাংলা/সমার্থক হিসাবে ‘বিভেদের মাঝে ঐক্য’, ‘বিভিন্নতার মাঝে ঐক্য’ (পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ইতিহাসের উত্তরাধিকার);  ‘বিবিধের মাঝে মিলন’ (জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, ‘ভগ্নাংশের সমর্থনে: দাঙ্গা নিয়ে কী লেখা যায়?’। পাণ্ডের প্রবন্ধের অনুবাদ করেন পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও গৌতম ভদ্র); ‘প্রভেদের মাঝে ঐক্য’ (দীপেশ চক্রবর্তী, ইতিহাসের জনজীবন) ইত্যাদি পাওয়া যায়।

More Posts From this Author:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top