প্রেম, বিয়ে, যৌনতা, সামাজিক বাধা ও মোরাল পুলিশিং

সম্প্রতি হেফাজত ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হক নারায়ণগঞ্জের একটি রিসোর্টে অবরুদ্ধ ও জেরার মুখোমুখি হন। এসময় তার সাথে ছিলেন একজন নারী। মামুনুলের ভাষ্যমতে নারীটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। অবকাশ যাপনের জন্য স্ত্রীকে নিয়ে তিনি রিসোর্টে এসেছিলেন। কিন্তু উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাগণ, স্থানীয় সাংবাদিক ও সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা তাদের  স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং বিবাহের প্রমাণস্বরূপ কাবিননামা দেখতে চান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে অনুমতি ছাড়া মোবাইল ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ ও তা লাইভ করা, ছবি তোলা সেইসঙ্গে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করার উৎসাহ ও অভিপ্রায় লক্ষ্য করা যায়। বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানান পক্ষীয় আলোচনা-সমালোচনা পরিলক্ষিত হয়। হেফাজতের অনুসারীগণ অবধারিতভাবেই ঘটনাটিকে সরকার ও সরকারি দলের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছেন। অবরোধ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মামুনুল হক ও  উপস্থিত হেফাজত কর্মী-সমর্থকগণ ‘জালিম’ সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করেছেন। অপরদিকে, আওয়ামী, সেক্যুলার, প্রগতিশীলদের কারও কারও মধ্যে খুশির জোয়ার বয়ে যেতে দেখা গেছে। ভাবখানা এমন, ‘পাইছি তরে বাগে’; ‘এইবার পালাবি কোথায়?’। পাশাপাশি বাম প্রগতিশীলদের একটি অংশ নারী-পুরুষের যৌন স্বাধীনতা ও নিরাপদ-নির্বিঘ্ন ব্যক্তিগত পরিসরের গুরুত্বকে তুলে ধরেছেন এবং পুলিশের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও হেনস্তার নিন্দা করেছেন।

উপরোল্লিখত ঘটনার আলোকে এই লেখায়  মুসলিম পারিবারিক আইনে বিবাহ, বিবাহ নিবন্ধন, শাস্তি, প্রেম-যৌনতায় সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, মোরাল পুলিশিং, স্বয়ং নারী সত্তাকে ‘অপরাধ’ ভাবা; এসব নিয়ে কিছু জরুরি আলোচনা ও বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হবে।

 

বিবাহ, বিবাহ নিবন্ধন ও শাস্তি

মুসলিম পারিবারিক আইনে বিবাহকে দেখা হয় চুক্তি হিসেবে। এই চুক্তি সম্পাদিত হয় বিবাহের জন্য সম্মত প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মধ্যে। দেনমোহর ধার্য করে, বিবাহের পক্ষদ্বয়ের মুক্ত সম্মতিতে ও দুজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর উপস্থিতি ও স্বাক্ষরে একটি মুসলিম বিয়ে বিধিবিদ্ধ আইন অনুসারে সম্পাদিত হয়। এখন কথা হচ্ছে,মামুনুল হক বা অন্য কেউ জিজ্ঞাসাবাদের মুখে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্ত্রীর সাথে বিয়ের প্রমাণপত্র তথা কাবিননামা দেখাতে না পারলে কি ধরে নেওয়া হবে তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক নেই কিংবা কাবিননামা না থাকার দরুন তাদের বিবাহ অবৈধ?

মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন – ১৯৭৪ এর ৫(২) ধারায় বলা হচ্ছে –

‘’ Where a marriage is solemnized by a person other than the Nikah Registrar, the bridegroom of the marriage shall report it to the concerned Nikah Registrar within thirty days from the date of such solemnization’’.

এই ধারা থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি একটি বিয়ে সম্পাদিত হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে তা নিবন্ধন করতে হবে। এবং সেটা করা না হলে ওই আইনের ৫(৪) ধারা অনুসারে পুরুষটি (স্বামী) শাস্তির মুখোমুখি হবে। এই শাস্তি সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল অথবা ৩ হাজার টাকা জরিমানা অথবা জেল-জরিমানা একসাথে হতে পারে। অর্থাৎ মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ও শাস্তিযোগ্য করা হলেও বিবাহকে কিন্তু বাতিল বা অবৈধ করা হয়নি। কাবিননামা ব্যতিরেকে বিয়ের সময় উপস্থিত সাক্ষীদের দ্বারা যদি বিয়েটির পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ানো যায়, তাহলে শরিয়া মতে ঐটাই বৈধ বিয়ের প্রমাণ। আর সেকারণেই মামুনুল হকদের মত ধর্ম ব্যবসায়ীদের কাছে আইনি নিবন্ধনের কাবিননামার চেয়ে কোরান-হাদিস সম্বলিত শরিয়া অস্ত্র ছুঁড়ে দেয়ার সুযোগ থেকে যায়। বাংলাদেশের পারিবারিক আইন এভাবেই শরিয়া ও রাষ্ট্রীয় আইনের পারস্পরিক সমর্থন সাপেক্ষে সদর্পে বিদ্যমান আছে।

 

প্রেম,যৌনতা, সামাজিক বাধা ও মোরাল পুলিশিং

মামুনুল হক যদি একজন নারীর সাথে তার মুক্ত সম্মতিতে হোটেল রিসোর্টে অবকাশ যাপন করতে যান তাহলে আইনের দৃষ্টিতে সেটা অপরাধ নয়। এমনকি বাংলাদেশের কোনও আইনে কোথাও বলা হয়নি যে, বিয়ে-কাবিননামা ছাড়া দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হোটেলে, রিসোর্টে সময় কাটাতে পারবেন না কিংবা তারা যৌন সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবেন না। তৃতীয় পক্ষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দুজন মানুষ তাদের একান্ত ব্যক্তিগত সময় কিভাবে উদযাপন করবেন সেটা নির্ধারণ করার কর্তৃপক্ষ তো আপনি-আমি হতে পারি না। রাষ্ট্র ও এর সংস্থাগুলোর হাতে সেই কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা রাষ্ট্রের সংবিধানও দিয়ে রাখেনি। তাই শুধুমাত্র  মতাদর্শিক বিরোধী পক্ষ হওয়ার কারণে কারও হেনস্তায় পুলক বা স্বস্তি অনুভব করলে, কারও ব্যক্তিগত পরিসর ও ব্যক্তিগত একান্ত সময় যাপনের স্বাধীনতার কথা ভুলে গেলে; এই ভুলে যাওয়া বুমেরাং হতে বাধ্য। আজ যদি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদ, জোর দেখানো রাজনৈতিক হেনস্তার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ‘যদি, কিন্তু, তবে’ ছাড়া উল্লখিত ঘটনার যথাযথ প্রতিবাদ করা না যায়, কালকে হয়ত আমাদের পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ কোনও সহনাগরিক এই জাতীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদিতার শিকারে পরিণত হবেন।

আদতে আমরা ওই কর্তৃত্ববাদিতার শিকার হয়েই আছি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এক দম্পত্তির হেনস্তা হওয়ার কথা নিশ্চয়ই আমাদের অনেকের মনে আছে। কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কায়েদে আজম স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন এএসআই মাসুদ ও তার সঙ্গে থাকা অপর তিন পুলিশ জানতে চান তাঁরা স্বামী-স্ত্রী কি না। জনাব আজম যখন বলেন যে তারা স্বামী-স্ত্রী, তখন পুলিশ তাঁদের কাছে কাবিননামা দেখতে চান। কাবিননামা দেখাতে না পারলে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। মিঃ আজম প্রশ্ন তোলেন, কোন বিবাহিত নারীপুরুষ কি কাবিননামা সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়?

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে পুলিশ দিনদুপুরে বগুড়া শহরের দুটি বিনোদন পার্কে অভিযান চালিয়ে শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ৩২ শিক্ষার্থীকে আটক করে সদর থানায় নিয়ে যায়। তাদের দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার পর অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

২০১৭ ও ২০১৯ সালের উপরোক্ত দুটি ঘটনায় আমাদের অনেকেই তখন প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখিও হয়েছিল। আমার জানা ও বুঝা মতে স্থান-কাল-পাত্রের উর্দ্ধে উঠে অন্যায়কে অন্যায় এবং মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মোরাল পুলিশিং করার অধিকার কারও নেই ; বলতে পারার সংস্কৃতিই হলো প্রগতিশীল ধারার সংস্কৃতি।

 

কিন্তু মামুনুল হকের ঘটনা নিয়ে আমরা এর ভিন্নতা দেখছি।  এই ঘটনায় প্রতিবাদ করতে না পারার কারণগুলো কি তবে এই –

  •  মামুনুল হক ও তার সংগঠন হেফাজতে ইসলাম নারীর প্রতি অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা পোষণ করে,
  • নারী পুরুষের প্রেম, প্রকাশ্য মেলামেশা, বন্ধুত্ব, বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের বিষয়ে তারা প্রতিনিয়ত ঘৃণার বাণী বর্ষণ করে,
  •   হেফাজত নারী বিরোধী ১৩ দফার স্রষ্টা,
  •  নারীকে সেক্স টয় ও সন্তান উৎপাদনের কারখানা ব্যতীত আর কিছু ভাবতে পারে না,
  •  হেফাজতের কারণে নারী নীতিমালা প্রণয়ন সম্ভব হয়নি,
  • নারীকে পর্দায় আবৃত করে গৃহবন্দি করে রাখতে চায় তারা,
  • কর্মজীবী গার্মেন্টস নারীদের তারা জেনাকারী ও যৌনকর্মী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।

 

উপরের সবগুলো কারণ বিবেচনায় থাকে বলেই আমরা হেফাজতের মতাদর্শকে প্রত্যাখান করি। হেফাজতের সাথে আমাদের লড়াইটা তাই মতাদর্শিক, ব্যক্তিক নয়। আপনি আমার আদর্শিক সহযোদ্ধা হওয়ায় আপনার উপর সংঘটিত রাষ্ট্রীয়-পুলিশী অন্যায়, জুলুমের বিরুদ্ধে যেমন দাঁড়ানোটা জরুরি, ঠিক তেমনি আদর্শিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি মামুনুল হকের উপর হওয়া হেনস্তার প্রতিবাদ জানানোটাও অবশ্যই জরুরি। মামুনুল হকের ঘটনাটি ভণ্ডামীর উজ্জল দৃষ্টান্ত সন্দেহ নেই। এরাই সভা-সমাবেশে, ওয়াজ মাহফিলে প্রতিনিয়ত নারী-পুরুষের প্রকাশ্য মেলামেশার বিরুদ্ধে কথা বলে, প্রথাগত নিয়ম ও ধর্মীয় বিধির নিগড়ে মানুষের যৌন সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার ঘোষণা দেয়। সেই তারাই যখন তাদের কথিত যৌনতার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন, তখন উক্ত ঘটনাটিকে ভণ্ডামী হিসেবে অবশ্যই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেহেতু হোটেলে বা রিসোর্টে বা অবকাশ যাপন কেন্দ্রে কোনো ধরনের প্রমাণপত্র ব্যতীত মানুষের মেলামেশা ও যৌনতা উপভোগের স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস রাখি, সেহেতু ভণ্ডামী জেনেও মামুনুল হকের ঘটনাটিকেও আমাদের সেভাবে দেখা উচিৎ। দাড়ি-টুপি-পাজামা-পাঞ্জাবি কিংবা নারীর ক্ষেত্রে বোরকা-হিজাব পরিহিত বিবাহিত বা অবিবাহিত যুগল হোটেলে যায় না,হোটেলে রাত কাটায় না, কাটাতে পারে না – এই জাতীয় গৎবাঁধা ধারণা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসা দরকার।

 

সংবিধান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার রক্ষাকবচ

বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের এই হেনস্তার বিপক্ষে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে বলা হয়েছে। যদিও  সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদের মতই ৪৩ অনুচ্ছেদেও ‘যদি, কিন্তু, তবে’র বাঘবন্দি ঘেরাটোপে নাগরিকের এই মৌলিক অধিকারের নিয়ন্ত্রিত স্বীকৃতি স্বীকার করা হয়েছে। অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে –

‘’রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, জনসাধারণের নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের

(ক) প্রবেশ, তল্লাশী ও আটক হইতে স্বীয় গৃহে নিরাপত্তা লাভের অধিকার থাকিবে; এবং

(খ) চিঠিপত্রের ও যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার থাকিবে।

মামুনুল হককে রিসোর্ট কক্ষে পুলিশি জেরার সময় ভিডিও ধারণ করা হয়েছে ও পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। মামুনুল হক ও তার স্ত্রীর মোবাইল কথোপকথনের রেকর্ড মূলধারার মিডিয়া ও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয়াদির গোপনীয়তা রক্ষার সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রের এজেন্ট সরকারের চোখে কোনও কারণে কেউ ‘খলনায়ক’ হয়ে গেলে তখন ওই নাগরিককে শায়েস্তা করার জন্য আইন-কানুন, বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে সেই নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। মতাদর্শিক বিরোধীপক্ষের উপর হলেও এই জাতীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বমূলক খবরদারি মানুষের সার্বজনীন মৌলিক অধিকারকেই সংকুচিত করে দেয়।

 

‘’নারীসহ আটক’’। নারীর ব্যক্তিসত্তার অস্বীকৃতি       

হোটেলে তল্লাশির ঘটনায় আমাদের নিউজ মিডিয়াগুলোর একটি সাধারণ ও অতি পরিচিত সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে ‘নারীসহ আটক’! তথাকথিত নৈতিকতা, জনশৃংখলা রক্ষার নামে মোরাল পুলিশিং এর ক্ষেত্রে নারীকে এভাবেই অব্জেক্টিফাই (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুরূপে উপস্থাপিত) করা হয়। নারীর মানবীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে নারীকে শনাক্ত করা হয় কেবলমাত্র যৌনতার প্রতীক হিসবে, যৌনাস্ত্র হিসেবে। নারী স্বয়ং এক্ষেত্রে একটি ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেন নারী এক অবৈধ অস্ত্র, প্রাণহীন একটি সত্তা, একটি বস্তু! ব্যক্তির সংরক্ষণে বেআইনি মালপত্র থাকলে যেমন আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনী ব্যক্তিটিকে আটক করে এবং তার হেফাজতে থাকা অপরাধ সামগ্রী জব্দ করে; তেমনি এসব ঘটনায় নারীটিও ওই অপরাধ সামগ্রীর মতই জব্দ তালিকায় যুক্ত হয়। রিসোর্ট কক্ষে মামুনুল হক ও তার নারী সঙ্গীর ক্ষেত্রে ঠিক একই সংবাদ শিরোনামের পুনরুৎপাদন ঘটতে দেখা গেছে। নারী সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে অপরাধ ও অপরাধ সামগ্রী হিসেবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

হেফাজত নেতা মামুনুল হকের সঙ্গীর সাথে হোটেলে অবকাশ যাপনরত অবস্থায় পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও হেনস্তার ঘটনাটি বেশ আগ্রহোদ্দীপক। হেফাজতের সাথে সরকার ও আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ২০১৩ সালের মে মাসের ৫ তারিখের পর থেকেই নিবিড় বন্ধুতাপূর্ণ অবস্থায় বিরাজ করতে দেখা যায়। সরকার বিভিন্ন সময়ে তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মোটামুটি প্রায় সবই পূরণ করে দিয়েছে। সম্পত্তিতে নারীপুরুষের সমানাধিকার সম্বলিত প্রস্তাবিত নারী নীতিমালা বাস্তবায়ন থেকে সরকার সরে এসেছে। তাদেরকে ৩২ কোটি টাকার রেলের জমি দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রস্তাবনা অনুসারে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সুপ্রিমকোর্টের সামনে অবস্থিত গ্রিক লেডি জাস্টিসিয়ার আদলে তৈরি ভাস্কর্য অপসারণ ও কওমি মাদ্রাসার দাউরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। ধৈর্য ধারণ করে থাকতে পারলে সরকার হয়তো তাদের ১৩ দফার সবগুলো দাবি একে একে মেনে নেবে। তাছাড়া সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের প্রয়াত প্রধান নেতা আহমদ শফীর নেতৃত্বে তারা আপ্যায়িত হয়েছেন। হেফাজতে ইসলাম অকৃতজ্ঞ নয়। সরকারের এসব উপঢৌকনের কথা তারা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। তাদের বিভিন্ন ভাষণে বক্তৃতায় সরকার ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আস্থা, বিশ্বাস ও ভালবাসার কথা বলতে তারা কখনওই কুণ্ঠিত হন না। ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ বিশ্বাস করেও এহেন কৃতজ্ঞতার প্রতিদানস্বরূপ তাঁরা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ অভিধায় ভূষিত করেছেন।

তাহলে হঠাৎ এমন কী ঘটলো যে হেফাজতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা মামুনুল হককে শায়েস্তা করার দরকার পড়লো?

এর কারণ খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমন বিরোধী আন্দোলন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের তাণ্ডব এবং এর অনতিকাল পূর্বে সংঘটিত সুনামগঞ্জের শাল্লায় সাম্প্রদায়িক হামলার  দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে। সাম্প্রতিকালে হওয়া এসব ঘটনা ও আন্দোলনে সংবাদপত্রের তথ্যমতে হেফাজত কর্মীগণ স্থানীয় লোকজনকে ধর্মীয় উসকানি দিয়ে ৬০-৭০ টি হিন্দু বাড়ি তছনছ করেছেন, লুটপাট করেছেন এবং হিন্দুরা প্রাণভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এরপর মোদিবিরোধী আন্দোলনে হেফাজত পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ করেছে, অগ্নি সংযোগ করেছে, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ’র স্মৃতিবিজড়িত সংগ্রহশালা পুড়িয়ে দিয়েছে, পাঠাগারে আগুন দিয়েছে। এইসব ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির শক্তির মহড়া দেখে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে। ঘটনার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ যা-ই থাকুক মোদ্দা কথা দেশের সেক্যুলার,প্রগতিশীল মানুষের ভেতরে যথেষ্ট ভয়ের সঞ্চার করেছে। কিন্তু মানুষতো ভীতিকর অবস্থার মধ্যে বসবাস করতে চায় না। সে পরিত্রাণ চায়, ভয় মুক্ত জীবন চায়। যে বা যারা বা যেসকল গোষ্ঠী তার ভয়ের কারণ তার বা তাদের বিনাশ কামনা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রবৃত্তি। মূলত এই ভয়টাই সরকারের সবচেয়ে জরুরি পুঁজি। সরকার চায় মানুষ ভয় পাক, ভয়ের মধ্যে থাকুক এবং মরিয়া হয়ে পরিত্রাণ খুঁজতে থাকুক। যেনো ‘ওয়েটিং ফর গডো’ নাটকের সেই গডোর প্রতীক্ষা। তখন সেই গডো হিসেবে, ত্রাতা হিসেবে মঞ্চে আবির্ভূত হবেন এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের প্রতিনিধি। সরকারের বন্ধু হেফাজত সৃষ্ট ভীতির মধ্যে সেই ২০১৩ সাল থেকে আমরা বসবাস করছি। সাউন্ড গ্রেনেড দিয়ে শাপলা চত্বর থেকে হেফাজত তথা ভীতি অপসারণে আমরা সেসময় আশ্বস্ত হয়েছিলাম। এখনও প্রতিবছর হেফাজতের কিশোর ছেলেদের কানেধরা ছবি ফেইসবুকে শেয়ার দিয়ে আমরা দিনটিকে উদযাপন করি। আসলে তো আমরা ভীতিমুক্ত হওয়ার আনন্দে স্বস্তির বর্ষপূর্তি পালন করি। কিন্তু আমাদের ভীতি কখনওই শেষ হয় না। শেষ হতে দেওয়া হয় না। হেফাজত, শফী, বাবু নগরী, মামুনুল হকরা রাজনীতির ময়দানে প্রাসঙ্গিক থেকে যান। তাদেরকে পেলেপুষে উপঢৌকন দিয়ে, জলসিঞ্চন করে ভীতি উৎপাদনকারী শক্তি হিসেবে জাগরুক করে রাখা হয়। মামুনুল হক ও তার সঙ্গীর হেনস্তা আমাদের ভীতির বটবৃক্ষে প্রশান্তির জলধারা হয়ে ধরা দেয়। এমতাবস্থায় ‘তুমি সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো’ গানটির কথা মনে পড়ে।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, মতাদর্শ নির্বিশেষে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, যৌনতার ব্যাপারে নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান জারি রাখা মুক্তবুদ্ধি এবং বুদ্ধির মুক্তির জন্য জরুরি। একইসাথে সম্পর্ক ও যৌনতা চর্চায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বাধানিষেধ, হস্তক্ষেপ, নজরদারির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য কাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত।  সচেতন, বুদ্ধিমান, সৃজনশীল প্রাণী হিসেবে আজ ও আগামীকে দেখতে পারা এবং সেই অনুসারে ক্রিয়ায়-প্রতিক্রিয়ায়, প্রতিবাদে-প্রতিরোধে-প্রতিকারে সক্রিয় থাকতে পারাটাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

 

 

Rahat Mustafiz is a writer and political activist, now living in Norway.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

More Posts From this Author:

    None Found

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
Scroll to Top