ফসলের ক্ষেতে লড়াই ফলেছে আজ

Share this:

সাক্ষাৎকার 

 

শুদ্ধস্বর: আপনি কবিতার মাধ্যমে কী আবিষ্কার করার এবং বোঝানোর চেষ্টা করে থাকেন।

মন্দাক্রান্তা সেন: আমি কবিতার মাধ্যমে মূলত নিজেকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করি, ও সেটাই পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। তবে এও বলি, নিজেকে আবিষ্কার করাটাই আমার মূল উদ্দেশ্য, কাউকে কিছু বোঝানো নয়। যদি কেউ আমার কবিতা অনুধাবন করতে পারেন, সেটা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি।

কীভাবে আমি নিজেকে আবিষ্কার করি? হয়তো মনের মধ্যে গুমরে উঠছে কিছু কথা কিছু কান্না। তাকে প্রকাশ করতে পারছি না।আবার হয়তো-বা কখনও ডুবে যাচ্ছি অতল ভালো লাগায়, ভালোবাসায়, কেন তা হয়তো নিজেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, তখন আমার কবিতা পায়। মনের মধ্যে যে-ইতস্তত ছড়িয়ে পড়া যে-বিমূর্ত অনুভূতি, সে একটা আকৃতি ধারণ করে। আমার কীসের দুঃখ, কীসেরই-বা আমার গভীর আনন্দ, আমার কবিতাই তা জানে। তাকে আবিষ্কার করে। তার কথাই সে বলতে পারে, বলতে চায়। সে-কবিতা হয়তো-বা একটু জটিল, অন্তত খুব সহজে তার ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। তবু আশা রাখি, হয়তো-বা একই অনুভূতিতে, তাকে প্রকাশ করতে না-পেরে অসহায় ও মূক হয়ে আছে যে পাঠক, তার হৃদয় প্রকাশের ভাষা পায়। এখানে একটা মজা আছে।অনেক সময় আমি যা ভেবে কবিতাটি লিখেছি, তা সম্পূর্ণ অন্য অর্থ নিয়ে কোনও পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। তার হৃদয়কে ছুঁয়েছে।এভাবে বিভিন্ন পাঠকের কাছে তা ভিন্ন ভিন্ন উপলব্ধি নিয়ে গৃহীত হয়েছে। এও কম বড় পাওয়া নয়। এও বড়ো কম সার্থকতা নয়।এভাবে কবিতা লেখায় এবং পাঠকের পাঠে আমি নিজেকে নিত্য নতুন ভাবে আবিষ্কার করি। করে চলেছি।

উপরোক্ত কথাগুলো মূলত আমার ব্যক্তিগত নিভৃত উচ্চারণে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু যখন আমি সরাসরি রাজনৈতিক কথা বলি, সমাজ বদলানোর কথা বলি, তখন অবশ্যই সেই স্বপ্ন নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে চাই। এগুলো অপেক্ষাকৃত সহজ ভাষায় লেখা, প্রতিবাদের কবিতা, যাতে সাধারণ মানুষ তা পড়ে সচেতন হতে পারেন, সমাজ বদলানোর স্বপ্ন দেখতে পারেন, সেই সংগ্রামে উজ্জীবিতবোধ করেন। এই কবিতা শুধু কবি হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে আমার নৈতিক দায়িত্ব।

 

শুদ্ধস্বর: আপনি বর্তমান বিশ্বকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং বর্তমান ঘটনাগুলো আপনাকে লেখায় ক্ষেত্রে কীভাবে ভূমিকা রাখে?

মন্দাক্রান্তা সেন: বর্তমান বিশ্ব এক বিরাট ডামাডোলের মধ্যে দিয়ে চলেছে। অতিমারী, হানাদারি, অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক পালাবদল।এখন তো আর বিশ্বযুদ্ধ হয় না, চলে কূটনৈতিক টক্কর। এত কিছু নিয়ে আলাদা করে বলার কথা আমার নয়। আমি সাংবাদিক নই, আমি একজন কবি। আমি প্রতিবেদন লিখি না, কবিতা লিখি। তবু আমার লেখায় অবশ্যই উঠে আসে হামলাবাজ ইজরায়েলের প্যালেস্তাইনের ওপর ক্ষমার অযোগ্য দৌরাত্ম্য, মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনজাতির উদ্ধত উচ্ছেদ, এথনিক ক্লিনজিং, ব্রেক্সিক। আরসত্যি কথা বলতে, আমাদের দেশের কথাই তো বলে শেষ করা যাবে না। এটা একটা আধা-ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্র। এখনই আমার বামপন্থী লেখালেখির কারণে আমি দক্ষিণপন্থী শাসকের দু-চোখের বিষ, এরপর, কী হবে আমি জানি না। তবে একটা কথা, আমি ভয় পাইনা।

এককথায় বলতে গেলে, আমার কবি সত্তায় সমান্তরাল কিছু ধারা আছে, যার একটি মানুষের কথা বলে। অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষের কথা। বিশ্বজুড়ে তেমন মানুষের অভাব নেই, তাই আমার লেখার বিষয়েরও অভাব নেই। আমিও এই বাসিন্দাদের একজন , এখানে দাঁড়িয়েই আমি লিখছি, লিখে চলেছি। কাজেই বিশ্বের ঘটমান ঘটনাবলির প্রভাব আমার লেখায় আসতে বাধ্য।

 

শুদ্ধস্বর: কোন সাহিত্য-ফিকশন বা নন-ফিকশন বা কোন লেখক/লেখকরা আপনার নিজের লেখাকে প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত করেছেন; কারা এবং কীভাবে?

মন্দাক্রান্তা সেন: ছোটোবেলা থেকে আমি বিভূতিভূষণে মগ্ন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর আরণ্যক যে কতবার পড়েছি তার ঠিক নেই। সেতো এক আশ্চর্য দীর্ঘ কবিতা। মন খারাপ হলে এখনও তাঁর ছোটোগল্প খুলে বসি। মন ভালো হয়ে যায়। প্রকৃতির কণায় এত যে মণিমাণিক্য, তার খোঁজ পেয়েছি তাঁর লেখায়। একই রকমভাবে দেখেছি মনুষ্যহৃদয়কে, তার জীবনকে। কীভাবে মানুষের সাধারণ জীবনযাপন তাঁর লেখায় হৃদয়ের ফুল হয়ে ফোটে। আমার মনে হয়, আমার গদ্যরচনায় তাঁয় প্রাণ ও প্রেরণা আছে। আমিও সাধারণ মানুষের অতি সাধারণ জীবনযাপনের জীবনকাব্য লিখে যেতে চাই। তাইই আমার প্রাণের পাঁচালি।

আর আছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মানুষে মানুষে সম্পর্কের অসামান্য ধারাভাষ্যকার। তাঁর সেই সময়প্রথম আলো পড়ে হতবাক হয়েছিলাম। তখন আমি ইস্কুলবেলায়। ভাবতাম, বড়ো হয়ে তাঁর মতো লিখতে চাই। বড়ো হয়ে বুঝেছি, তা মোটেই সহজ নয়। লেখনী তাঁর হাতে বাধ্য, সরল, সুন্দর। সেটা চেষ্টা করলে যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য যে বিপুল গবেষণা! ও আমার কম্মো নয়।

এ তো গেল গদ্যের কথা। কবিতার কথা বলতে গেলে কাকে ছেড়ে কার নাম বলি। এই মুহূর্তে দু-একজনের কথা মনে আসছে। তাঁদের মধ্যে একজন সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখা পড়ে আমি নারী হয়েছি। নারীর ভাষা শিখেছি। সেখানে নারীর যন্ত্রণাই তাঁর কবিতার বিষয়, নারীর জীবনে সেখানে জীবনের উদযাপন। তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি নারীর যৌনতা তার দুর্বলতা নয়, তার শক্তি।

আরেকজনেনর কথা মনে এল, কাশ্মীরি কবি আগা শাহিদ আলি। অশান্ত ভূখণ্ড, তছনছ জীবন ঘিরে লেখা তাঁর কবিতা এক অনবদ্য কাব্যিক দলিল। আমি এর লেখায় এত মুগ্ধ যে, আমি এঁর প্রচুর কবিতা অনুবাদ করেছি।

 

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার কবিতাকে আকার দেয়?

মন্দাক্রান্তা সেন: তবে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মনের মধ্যে জমে জমে কবিতার আকার তো অবশ্যই নেয়। যেমন প্রেমে পড়ে পাতার পর পাতালিখি, বিরহতে তার বেশি, আর সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ। আর এভাবেই গড়ে ওঠে নতুন বই-এর পাণ্ডুলিপি। এবং, আশ্চর্য, সেই প্রেমিককে নিয়ে লিখে ফেললে আমার হৃদয়ে প্রেমের জ্বর ছেড়ে যায়। অবধারিত ভাবে আমি আবার পৌঁছাই পরবর্তী কবিতাগুচ্ছ, সেখানে আবার নতুন প্রেম, নতুন বিরহ, নতুন বিচ্ছেদ, নতুন কবিতা।

আর রাজনৈতিক কবিতা, সেও তো অভিজ্ঞতা জনিত লেখা। চোখের ওপর যখন দেখি মানুষ মরছে, প্রথমে ঝাঁপাই। এখন যেমন ত্রাণ সংগ্রহে দিন কেটে যাচ্ছে। রাত্রিবেলা যখন ল্যাপটপ খুলে বসি, তখন কি আর হাত দিয়ে প্রেমের কবিতা বেরোয়!

 

শুদ্ধস্বর: আপনার কবিতার বক্তব্য উচ্চারণ করতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকারণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তে এবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

মন্দাক্রান্তা সেন: অত ভেবে লিখি না। কবিতা আপনা থেকেই একটা ফর্ম নিয়ে নেয়। শব্দগুলোও পরপর আপনা থেকেই আসে, তবে হ্যা, কোথাও পরে সংযোজন-বিয়োজনের একটা প্রক্রিয়াও থাকে। আর কোন কবিতা কোন ফর্মে মানাবে, সেটাও একটা সহজাত আন্দাজ।মন্দাক্রান্তা ছন্দে আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদী কবিতা লিখব না।

যখন শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষ, শঙ্খবাবুর কাছে বাংলা মন্দাক্রান্তা ছন্দের পাঠ নিই, তিনি বলেছিলেন এই ছন্দে বাংলা কবিতা লেখা যায় না, তা ছন্দের ব্যায়াম হয় মাত্র। কিন্তু তারপর শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ও আমি এক রাত্রে পরপর প্রচুর লিখে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে শঙ্খবাবুকে দেখাতে নিয়ে যাই। মনে ভাবছিলাম, কোথাও একটা ভুল ঠিক হয়েছে, নইলে তিনি বলেছেন বাংলা কবিতা লেখা সম্ভব নয়, তবে আমরা একারাতে (আমি লিখেছিলাম চোদ্দোটা) এতগুলো লিখলাম কী করে। উনি আমাদের দু-তাড়া কাগজ নিয়ে বললেন, বোসো,আসছি। বলে পাশের ঘরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর, (মনে হচ্ছিল অনন্ত সময়) তিনি এঘরে এলেন। স্বভাবসিদ্ধ মৃদুস্বরে বললেন… মন্দাক্রান্তা হয়েছে, কবিতাও হয়েছে। বললেন…আমার যে লাফঝাঁপ করতে ইচ্ছে করচে। বললেন,…এটা বাংলা কবিতায় একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

এর বেশি কবি জীবনে আর বেশি কী পাওয়ার থাকে।

কিন্তু একটা ঝামেলাতেও পড়লাম। তখন যা লিখছি, সবই মন্দাক্রান্তায় আসছে, জোয়ারের মতো আসছে। বেরোতে পারছি না। যেন একটা ছন্দ আমার কবিতাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আমি মালিনী-তেও লিখছি। তবে মন্দাক্রন্তা আরও বেশি আগ্রাসী। এটা উপলব্ধি করে জোর করে মন্দাক্রান্তার নাগপাশ কেটে বেরিয়ে এলাম। ভাবের থেকে আঙ্গিক বেশি আশকারা পেয়ে যাচ্ছিল। এই প্রবণতা বর্জনীয়।

ফর্ম নিয়ে খেলাধূলা অনেক করেছি। আমি প্রধানত ছন্দের কবি, এখানে পরীক্ষানিরীক্ষা সহজ। মজাও পাই। তবে ওই যে, ফর্মকে কনটেন্টের মাথায় চাপতে দিই না। আসলে ছন্দ তো একটা বিজ্ঞান। আগে শ্রুতিনির্ভর চলনে লিখতাম, এখন বিজ্ঞানটা মাথায় রাখি। এতে কী হয়, কবিতা কবির বাধ্য হয়, লেখনীর স্থলনে ছন্দ ছন্নছাড়া হয় না।

আর বলতে হয়, আমার খুব প্রিয় বাংলা সনেট। আঠারো মাত্রার। হয়তো বেশ কিছুদিন লেখা হয়নি, লিখব বলে ল্যাপটপ খুলে বসেছি। গা গরম করার জন্য একেটা কি দুটো সনেট লিখে ফেলালম। সেই অনেকদিন পর আমার কবিতার হৃদয়বাড়ির উঠোনে পা রাখা। হাত রাখা।

হ্যাঁ, ফর্ম ভাঙাভাঙিও তো একটা জরুরি ব্যাপার। একই ছন্দে কত আর লিখতে বা পড়তে ভালো রাগে। এক ঘেয়ে হয়ে লেখা থামিয়ে দিই। ক-দিন পরে নতুন কবিতা নতুন আঙ্গিক নিয়ে আসে। নতুন প্রেম নিয়ে আসে, নতুন প্রতিবাদ নিয়ে আসে। সে এক নতুন কবিতার বই।

 

শুদ্ধস্বর: রাজনৈতিক কবিতা এবং সাধারণ কবিতার মধ্যে সাহিত্য ও শৈল্পিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব এবং সংহতি সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

মন্দাক্রান্তা সেন: একেবারে নিজের কথাই বলব। আমার লেখার প্রধান মাধ্যম এখন সোশাল মিডিয়া। সেখানে হাতে হাতে গরম প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। সেখানে বেশ কিছু মানুষজন আছেন, সমালোচনাই তাঁদের ওয়ে অফ সারভাইভাল। আমি যখন রাজনৈতিক বক্তব্য সম্বলিত কবিতা লিখি, তাঁরা আমাকে বিদ্রূপে বিদ্ধ করেন এই বলে যে এগুলো কি কবিতা? আপনি কবিই নন। আমি উত্তর দিইনা, কেননা,আমি জানি আমি সময়ের দলিল লিখছি আমার দ্বারা যেভাবে সম্ভব। অন্ধ্রপ্রদেশের বিপ্লবী কবিব গদর কি কবি নন, যিনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক কবিতার রূপকার (যে কবিতা কোথাও লেখা নেই, শুধু গাওয়া ছাড়া।)

আবার এনারাই, যখন আমি প্রেমের কবিতা লিখি, বলেন, এমন দুর্দিনে আপনি এসব কবিতা লিখছেন?

প্রথম প্রথম খুব প্রভাবিত হতাম। এমনকি চোখে জল চলে আসত। পরে পাত্তা না-দিতে শিখেছে। দেখেছি পাঁচশো জন আমার কবিতা ভালো বললে, চার-পাঁচজন মাত্র এসব উটকো সমালোচনা করতে ভালোবাসে। এদের মত পরিবর্তন করানো, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো কারণই নেই। দায়ও নেই।

আমার মনে হয়, রাজনৈতিক কবিতাও কবিতা হয়ে উঠতে পারে। তার মধ্যেও স্থান দিতে হবে শৈল্পিক গুণকে। কিন্তু  তাতে, কবিতার আরেক যে লক্ষণ, তার নিভৃত গূঢ় সংকেত, তা থাকলে চলবে না। সে কবিতা হয়ে উঠতে হবে জনমানুষের সম্মিলন স্বর, জ্যোৎনার মতো মায়াবী নয়, সূর্যকরোজ্জ্বল। তাকে হতে হবে মনোগ্রাহী, কিন্তু লঘু নয়। আর তার সমান্তরাল ধারায় আর যে কবিতা, সে কবিতা নির্জনে একার সঙ্গে একার কথোপকথন। মাথায় তখন অন্য এক ঘোর, যা পাঠকের ভালো কিনা তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

 

শুদ্ধস্বর: আপনার কবিতা কি জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে বলে আপনার ধারণা? এটি অন্যান্য জাতীয়তা বা ভাষাগোষ্ঠীর কাছে আবেদন রাখতে পারে বলে কি আপনার মনে হয়? তাহলে কীভাবে?

মন্দাক্রান্তা সেন: ধারণামাত্র নয়, বাস্তব। আমার কবিতা দেশের ও বিদেশের কিছুকিছু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরাজি, হিন্দি, ওড়িয়া, অহমিয়া এবং বিদেশে জার্মান, পোলিশ, ফরাসি, ফারসি, ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার মধ্যে ইংরাজি ও জার্মান অনুবাদগুলি বইআকারে প্রকাশিত। এছাড়া সরাসরি ইংরাজি ভাষায় লেখা কবিতাগুলিও দেশ ও বিদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত।

কবিতা একটা বিশ্বজনীন শিল্প। এর একটা আন্তর্জাতিক আবেদন আছে বলে আমি মনে করি। আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি। দেশও বিদেশের অন্য জাতীয়তা ও ভাষাগোষ্ঠীর সামনে যখনই কবিতা পড়ার ডাক পেয়েছি, উদ্যোক্তা ও শ্রোতারা চেয়েছেন যেন অনন্ত একটি কবিতা আমার নিজের মূল ভাষায় পড়ি। তাঁরা আমার ভাষায় আমার কবিতার অনুভূতিটুকু ছুঁতে চেয়েছেন, এবং হাততালি দিয়ে সানন্দে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্থাৎ কবিতার যে-কোনও ভাষার অন্তরায় অতিক্রম করে হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে।

আরেকটা ঘটনা বলি। গুন্টার গ্রাস কলকাতায় এসেছেন। ম্যাক্সমুলার ভবনে সন্ধ্যায় তাঁর কবিতা পাঠের বিরাট আয়োজন। তাঁর জার্মান মূল কবিতার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদও পড়া হবে। অনুষ্ঠানের দিন সকালে আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়র। ম্যাক্সমুলার ভবনের এক কর্তাব্যক্তি, এক বিখ্যাত কবি, জানালেন, জার্মান জানা এক তরুণের করা বাংলা অনুবাদগুলো ভালো হয়নি, আমাকে অনুবাদ করে দিতে হবে। বললাম আমি তো জার্মান ভাষা জানি না! উনি বললেন… তোমাকে এখুনি ইংরাজি অনুবাদগুলো পাঠাচ্ছি। করে দাও। তাঁর আদেশ অমান্য করা যায় ন। করলাম অনুবাদ। তারপর যা ঘটল তা অকল্পনীয়।

গুন্টার সাহের একটা করে মূল কবিতা পড়ছেন, আমি পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তাঁর একটি কবিতা পাঠের পর তার অনুবাদ পড়ছি।শ্রোতারা সবাই জার্মান ও জার্মান জানা বাঙালি। ভয়ে সারা হয়ে আছি। ভুল হলে ওরা আমাকে ছাড়বে না। কোনোরকমে অনুষ্ঠানশেষ হলো। মঞ্চ থেকে নামতে না নামতেই আমায় ঘিরে ধরল একদল তরুণ ছেলেমেয়ে। সংখ্যায় অনেক। সবাই জর্মান। তারা ইংরাজিতে আমাকে অভিনন্দনে ভাসিয়ে দিলো, বলল ..খুব ভালো অনুবাদ করেছ।

আমি তো অবাক, বললাম … তোমরা বাংলা জানো?

নাহ, ওরা কেউ বাংলা জানে না। তবু আমার অনুবাদ ওদের ভালো লেগেছে। কী করে? ওরা কলকলিয়ে যা বলল, তার সারাংশ এইযে, ওরা আমার পাঠ থেকেই বুঝেছে আমি ঠিকঠাক অনুবাদ করেছি। আগের অনুবাদগুলো ওরা দেখেছে, ওদের পছন্দ হয়নি।এগুলো খুব পছন্দ হয়েছে।

কবিতা কীভাবে অতিক্রম করল ভাষার বেড়া। ধরে রাখল তার অন্তর্গত মূল আবেদনটি।! কী অবাক!

 

শুদ্ধস্বর:  আপনি কি মনে করেন কবিতার সংক্রাম দিয়ে মানুষের ইতিহাস পালটানো সম্ভব? আপনার জবাবের পক্ষে বলুন।

মন্দাক্রান্তা সেন: খুব সম্ভব, সম্ভব।

সবাই কবিতা লিখতে পারে না। সবাই লড়াইয়ে পথেও নামতে পারে না। কিন্তু যখন বিপ্লব অনিবার্য হয়, তখন সব মানুষ যুদ্ধে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেভাবে পারে, তার নিজের নিজের সাধ্য ক্ষমতা সাহস প্রতিভা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে। কবিতাই তখন কবির অস্ত্র। এ-অস্ত্রকে ব্যবহারেযোগ্য করে তুলতে তাকে শাণিত করতে হয়। কীভাবে ব্যবহারযোগ্য? কবিতা প্রেরণা দিতে পারে। কবিতা মানুষকে পথে নেমে অত্যাচার অনাচার অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দেয়। মানুষের মুখে মুখে প্রতিবাদের ভাষা জোগায়।

আমাদের ঘরের উদাহরণ হিসেবে নিয়ে আসতে পারি সলিল চৌধুরীরর কবিতা, যাতে তিনি সুর সংযোগ করে গানে পরিণত করে আরো লক্ষ্যভেদী করেছেন। এই গানগুলি বাম আন্দোলনে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। আছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য, নজরুল ইসলাম, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, নবারুণ ভট্টাচার্য। এঁদের কবিতায় মানুষ তার সংগ্রামের সমর্থন পায়, পেয়েছে। এখনও এই কবিতাগুলি প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি, বরং ফিরে এসেছে নতুন করে। আর আমরা তো জানি, সুকান্ত তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘হে মহাজীবন’-এই লিখেছেন ‘প্রয়োজন নেই কবিতার কবিতার স্নিগ্ধতা/কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি/ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়/পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ অথচ এই কবিতাকে তিনি ছুটি দেওয়ার কথা বলেছেন কবিতাতেই। এ কবিতাই কালজয়ী হয়ে গেছে।

তবে এই প্রশ্নটি আমার মনেও যে আসেনি তা নয়। মনে হয়েছে, এই অসময়ে এই দুঃসময়ে কাব্যি করে হবেটা কী? আমি রাস্তায় নেমে এসেছি, গ্রেপ্তার বরণ করেছি, বিক্ষোভ মিছিলে হেঁটেছি, মার খেয়েছি, অনশন করেছি। কিন্তু বুঝেছি মানুষ, অত্যাচারিত ক্ষুদ্ধ জনতা, আমার সেই সশরীরে পথে নামার চাইতে আমার কবিতাকে বেশি করে চেয়েছে। আমি যখন জনসমাবেশে কবিতা বলি, জনতায় হাততালির ঢেউ ওঠে। ওরা কি আমার সনেট বোঝে? বোঝে আমি তাদের কথা বলছি। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি। আমার কবিতায় তারা প্রত্যেকে জনযুদ্ধের নায়ক। যখন পথসভায় দু-হাত ছড়িয় কবিতা বলি, পথচলতি লোক, সাইকেল আরোহীরা দাঁড়িয়ে পড়ে।হয়তো তারাও ভাবে, মেয়েটা আমাদের কথা বলছে। কেমন মিলিয়ে মিলিয়ে বলছে, বেশ তো! এগুলো আমার মনগড়া কথা নয়, জাজ্বল্যমান অভিজ্ঞতা।

আমি ইতিহাসের বদল বলতে বুঝি নিপীড়ির জনমানুষের মুক্তির ইতিহাস। শ্রেণিসংগ্রামের চূড়ান্ত জয়। এ-জয় আজও অধরা। এরজন্য, আগেই বলেছি, স্ব স্ব ক্ষেত্রে মানুষকে সংগ্রামে যোগ দিতে হবে। জিততে হবে। সেই জয়ের স্বপ্ন দেখানোর দায়িত্ব কবির।

কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা।

____________________________________

 

 

কবিতা

 

আলোদেশ 

এই দেশ গাঢ় অন্ধকারাবৃত, আলো কত দূর

আমরা কি ঘুমিয়ে আছি ? ধর্মের আফিমে নেশাতুর

মানুষ পরস্পরকে ধর্ম দিয়ে করছে বিচার

না, না, মানুষ তো নয়, শাসকের এই অনাচার

 

পরস্পরে একই হিংসা, একই প্রিয়বিয়োগের শোক

শান্ত হও, শান্ত হও, বলে সন্ধ্যাতারাটির চোখ

রাত্রি ঝাঁপিয়ে পড়ে, অন্ধকার আরো ভয়াবহ

এই অন্ধকার বড়ো নির্মম, বড়ো দুর্বিষহ

 

তবু জানি একদিন ঠিকই জয় করব মরণ

পরস্পরকে ভালোবেসে আলোদেশে সেই উত্তরণ

সেদিনের প্রস্তুতিতে বর্ণময় হয়েছে গোধূলি

অন্ধকারে ঢাকা দেশে আলতো হাতে আলোফুল তুলি

 

সন্ধ্যাতারা অন্ধকারে ঝিকিমিকি জ্বেলেছে প্রেরণা

রাত্রিই আনবে ভোর, তার আগে হেরো না হেরো না

 

 

কালের রাখাল

ক্রমে ক্রমে অতিক্রম করে যাব এমন আকাল

আবার মোহন বাঁশি বাজাবে এ-কালের রাখাল

শস্য শ্যামল হবে এ-দেশের রক্তেভেজা মাটি

আট ঘণ্টা খাটুনির প্রাপ্য মূল্য দেবে কারখানাটি

 

সব মেঘ কেটে গিয়ে ঝলসে উঠবে আকাশের নীল

শাপলা-ফোটানো দীঘি সেই রঙে রঙে অনাবিল

রাত্রের শান্ত চাঁদ আলো ঢেলে দেবে মধ্যযামে

সে আলো স্বপ্নেরই মতো ঝরে পড়বে শহরে ও গ্রামে

 

ফিরে আসবে ফিরে আসবে মানুষে মানুষে ভালোবাসা

মানুষই ঠেকিয়ে দেবে যতেক হিংসা সর্বনাশা

সে এক নতুন দেশ, আদিগন্ত প্রেমের বিস্তার

কে তুই দেশের শত্রু, ভবিষ্যৎ লিখে দিস কার ?

 

তোর সেই লেখা ভুল, আমরা তাতে দৃঢ় বিশ্বাসী

কালের রাখাল ঠিক বাজাবেই হিরণ্ময় বাঁশি…

 

 

যুদ্ধের বার্তা

পরোয়া করি না পরোয়া করি না আর যে

আমাকে মারবে? নির্দয় লাঠিচার্জে ?

কাঁদানে গ্যাসে বা প্রচন্ড জল কামানেই

এগোবো আমরা, এই সংগ্রামে থামা নেই

 

মার খেয়ে পথে লুটিয়ে পড়েছে যে সাথি

শাসকের সাথে নেই তার কোনও বেসাতি

সংগ্রামে নেমে অধিকার কেড়ে নেবে সে

প্রতিবাদ আজ জ্বলছে রাজ্যে, এ-দেশে

 

দমবন্ধ সে, তবু কলজেতে আছে দম

আজ তারই কথা লিখছে আমার এ-কলম

সে তো একা নয়, তার সাথে আছি আমরাও

শাসক পাগলা কুকুরের মতো কামড়াও

 

আমাদের নেই, নেই নেই জলাতঙ্ক

শেষমেশ ঠিক মিলিয়ে দেবোই অঙ্ক

কী ভয় দেখাবে যথেচ্ছ দাঁত খিঁচিয়ে

ভাবছ আমরা ভয়েই আসব পিছিয়ে !

 

হা হা হা, আমরা ফিরিয়ে দেবোই মারটা

বারবার তাই লিখি যুদ্ধের বার্তা

 

তোমার আমার এই যুদ্ধের বার্তা

 

 

জাগো হে কৃষক

জাগো হে কৃষক পরো হে যুদ্ধসাজ

ফসলের ক্ষেতে লড়াই ফলেছে আজ

তোমার অস্ত্র তোমার কাস্তেটাই

লড়ছি আমরা লড়েই বাঁচতে চাই

 

তোমার যুদ্ধে আমাদের সংহতি

শাসকের কাছে মানি না মানি না নতি

চলবে না দেশে প্রবঞ্চনার রাজ

ফসলের ক্ষেতে লড়াই ফলেছে আজ

 

কৃষক এবার বুক পেতে তুই দাঁড়া

দেখিয়ে দে তোর টানটান শিরদাঁড়া

ঘৃণ্য শাসক, নেই কো লজ্জা লাজ

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top