গ্রহদোষে গ্রহগুণ
সূর্য হলেন কমলযোনি। প্রধান পদ্ম। যদি চন্দনঘ্রাণ যুক্ত, তাহলে জীবন—আশা-আকাঙ্ক্ষা রঙিন দৃশ্যাবলি। যদি সূর্যের আকার পোড়ামাটির সেতার, তাহলে জাতক প্রকৃতির ক্যানভাস। যদি সূর্যের প্রতিবিম্ব ঈষৎ বাদামি, ডানার মতো উদার চোখের মণি তাহলে জাতক বিহঙ্গরাশির। সূর্যের রোদ্দুর যদি সবুজ কাচের যুবতীদুপুর, তাহলে হলদে প্রজাপতির ঢল, প্রতিটি মুহূর্ত দৈবপ্রতিম অরুণাচল।
রাহু আসলে একজন স্ফুলিঙ্গ। দাবানল প্রমাণ দীর্ঘউড়ান। রাহু আর শনি নবম চক্রে মিলিত হলে শুদ্ধ শতদল জাতকের কপালে। পক্ষীরাজ রাহুদেবের প্রিয় বাহন, সন্ধ্যাকাশ ঝরাপাতা, নির্জন। বৃষ্টিঘড়ির কাঁটায় ধারালো মেঘের শিমুল যদি বিনা কারণে অগ্নুৎপাত ঘটায় তাহলে অশনির সম্ভাবনা। তবে চিন্তিত হবার কারণ নেই। রাহুরাজার চোখদুটি ভারি সুন্দর! পক্ষীকূলের রিনিঝিনি, মায়ার শিশির , দু-হাত তুলে আশিসবাণী।
কেতু চঞ্চল গ্রহ। পার্বত্য অঞ্চলের অধিপতি। অন্তরদশা শেষ না-হতেই যদি অরুণোদয়, তবে জাতক অতি উজ্জ্বল, স্বস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি কখনো অস্তাচলে জেগে ওঠে পুরাতন অঙ্গীকার তাহলে জাতক ধ্যানী এবং প্রাজ্ঞ, সম্ভ্রম করার মতো ব্যক্তিত্ত্ব। কিন্তু যদি কেতুগ্রহের কাঁধে হেলে পরে চাঁদ, যদি বিদ্যুৎবিপন্ন চন্দ্রনৌকার মাঝি, তাহলে জাতকের চোখে প্রবল শূন্যতা, ফ্যাকাসে ফুলপাতা, স্তব্ধতা!
মঙ্গলগ্রহ বইছেন দক্ষিণে। তাই বলে নয় যুদ্ধবিরতি। বরং তৃষ্ণা, অখণ্ড জ্যোতি। হোমানলে যদি প্রজ্জলিত, দুর্দান্ত জাতকের ভাগ্য। তবে দশম সুঘ্রাণের গর্ভে নিষিক্ত হলে রক্তচুনির পেয়ালা ঠোঁটের প্রাক্কালে পৌঁছেও যায় নিভে। ছায়ার ঝিলিক দেখে চিনে নিতে হয় মঙ্গলগ্রহের বিবরণ। তন্দ্রার আবেশ জড়ানো এই গ্রহটি রীতিমত ভক্তিমতী। আকাশ পাতাল জুড়ে প্রবল ঈশ্বরগন্ধ। প্রতিদিন নিশাকালে প্রাণধারাজলে নিজের মনটি ভেজালে মঙ্গলের ক্রোধ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়।
বুধ নয় তেমন ক্ষতিকারক, তবে চন্দ্রমার সঙ্গে জন্মবৃত্তান্ত মিলে গেলে জাতকের অর্থদণ্ড, ভোগান্তি। ঊষা এলাকার পাকদণ্ডীতে চড়াই-বসতি। শ্রাবণীসন্ধ্যায় এই গ্রহের মনে যদি শৈশব লুকোচুরি খেলে, তবে জাতকের জীবনে অঢেল জুঁইফুল, টগরের প্রশান্তি। রূপোর সিংহাসনে যখন বিশ্রামে বুধরাজ, তখন সূর্যের সঙ্গে মিত্রভাব। কাঞ্চনফুলের মতো জীবন! আকাশছোঁয়া শ্বেতপাথরের পর্যটন। বুধজাতক সংসারী নয়। মন বকপাখির মতো সাদা এবং উড়ুউড়ু।
বৃহস্পতি বিদুষী গ্রহ। অধ্যয়ন তাঁর একমাত্র ব্রত।পাঠগৃহ যদি করকমলের অগ্রভাগে বৃহস্পতির সঙ্গে জোট বাধে তাহলে জাতক বা জাতিকা দৈবপাঠকের আদর এবং আহ্লাদ পায়। এই গ্রহটি সম্পদের, সুস্বাস্থ্যের। তপোবনের শাখায় উড়ে এসে জুড়ে বসে যদি, তাহলে গন্ধরাজের মতো সুস্নিগ্ধ চরাচর। বৃহস্পতি নিজেই নিজের অধিকর্তা। নিরাকার দৃশ্য খেলতে খেলতে তাঁর গড়নটিও নিরাকার। তাঁকে দ্যাখা যায় না কখনোই, তবে যদি সৌরপথে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে জোনাকিলগ্নজাত ঋষিমুনির সঙ্গে তাঁর বন্ধুতা হয়, তাহলে খরপৃথিবীতে মরুপৃথিবীতে পুষ্পবৃষ্টি।
শুক্রগ্রহ এখন আছেন বুধসঙ্গে, রীতিমতো সঙ্গমদশায়। মধুসঙ্গ পান করা এই সময়টি তুমুল ধন-জন-হাসিপূর্ণিমার। জাতকের ভাগ্যে একের পর এক সুসংবাদ। তবে চারদিন বাদে তাঁর সঙ্গে সূর্যের মুখোমুখি দ্যাখা। জাতকের জীবন সামান্য টালমাটাল। তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। শুক্রদেব অহিংসনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর পছন্দের ভ্রমরটির নাম শ্বেতচামর। যে জাতকের করতলে শুক্র উচ্চস্থানে অবস্থান করেন, তাঁর জীবনটি শুধু ইচ্ছেমত ভালোটি।
রাজাধিরাজ শনিদেব যদি মহাদশায় টইটম্বুর, সূর্যাস্তের পায়ে পায়ে পেরেক, প্রতিপল ভ্রান্তি। যদি পল্লিগীতির সুরে নিজস্ব রুলটানা সুরে রূপকথার অলিগলি, তবে জাতকের জীবনে ভাগ্যোদয়, এক চিলতে কৃষিকাজেই মনোহরণ, গয়নাপাখির দেবজন্ম হয়। তিনি যদি মঙ্গল কারকের চতুর্থ দশায় প্রবল হোমযজ্ঞ এবং ফুলফসলপ্রদীপের অধিকারী, তাহলে জাতকের কপালে বিদ্যাপতির মথুরা, ব্রজবালকের বাঁশরি
মহামহিমা
যৌবনচঞ্চলা
নূপুর-গুঞ্জরিয়া
গ্রন্থাগার এবং ছবিঘর
ফিসফিস স্বর। গানগাওয়া স্তন
রক্তাভ কটাক্ষ দাপুটে হাসি
সম্ভ্রান্ত পরিবার
স্বভাবে তেজস্বিনী
গায়ের রং ফটফটে হরিণী
সেতারের মতো সাঁতারু সারেগামা
মেয়েলি মল্লার রাগপ্রধান ভুরু
সমর্পণের রুমালখানি আঁকা ভূণ্ডলে
ভ্রমণ সাধারণের চাইতে অধিক টিকালো
ফুলসাদা বনপথ ঊরু এবং ঊষা
পরন্তকালে রাজকীয় মাতৃবচন
শেষপটে আলোছটা নৃত্যকিরণ
কণ্ঠিবদলের আনাচে কানাচে
স্বর্ণশশীর সিঁদুররশ্মি যেমন
সূর্যাস্তসভা থেকে ফিরে
যে পাখি শরিকের ঘর, তাকে পূর্ণচেনা হলো না
তিরবিদ্ধ নদীকে বলা হলো না সুন্দরতম সংকীর্তন
মোহনাদিবসে হয়নি লেখা চাবি-কাঁধে শ্রাবণবিদ্যা
আশ্চর্যরাতে একটিও অবাকের স্তবক লেখা হয়নি
লিখব তাকে? কাকে? বিচ্ছুরণ এবং তারাবাতিকে?
পূর্ণসম্ভব মীড়? স্রোতস্বিনী? ব্যক্তিগত সঙ্গীতবাহিনী?
নাকি আদালতের সওয়াল নিয়তির জবাব!
যে মানুষের ফুসফুসে ফকিরের বসবাস
যে বাঁশির চুম্বনকালীন ঠোঁট অমল নির্যাস
যে কবিতার কণ্ঠে সতত যুদ্ধ আর মৃত্যু
যে কবি লাভা আর আতরের খুশবু
লেখা হোলো না তাঁর ভেষজ রক্তপাত
মহাজাগতিক সঙ্গীতের অশ্রু!
চোখের আলোয় দেখেছিলেম
পাখিমায়ের মতো উদগ্রীব। চাউনি কুসুমের মতো উদার।
দোতারার গর্ভে মজুত অযুত সৎশঙ্খ। যোগমুদ্রা শেষে জাগ্রত
ধরিত্রীদেবী। ধ্যানের জাল কেটে প্রকট সংসারসুখী যাত্রাপথ।
হিরন্ময় নিরালায় নম্র বিধুর স্মৃতিবতী।
পদ্মপাতায় ঠিকরে ওঠে ফুল্লনক্ষত্র। মধুর
কন্ঠে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আভা! গরদপাড় শুদ্ধঅগ্নি!
কত যুগ পরে এমন স্মিতহাস্য আশ্রয়,নির্মল প্রশ্রয়দায়িনী।
দেবালয়ে ফিরে যাওয়ার আগে নিস্তরঙ্গ জীবনের গোলাপটবে
তাঁরই রেখে যাওয়া স্নিগ্ধ ছায়া উপবনের সুখ সরবত শান্তি!
নিখিলপত্র পাঠ করে জেনেছি,আকাশছোঁয়া শ্লোকবতী তিনি
ফুল ফোটানোর ছলে যে-কোনো উচ্চারণ তাঁহাকেই আলিঙ্গন!
তামাকু সেবনের নিয়ম
প্রথমে তামাকুর চরিত্র বুঝে নিন। যদি দেখেন তামাকুর মন ছায়াগম্ভীর তাহলে সে কিন্তু আপনাকে টানবে ভূমিশয্যায়। যদি তামাকু হয় পতঙ্গরূপী তাহলে সাবধান। ধূম্রসেবন আগুনের সামনে একেবারেই নয়।
যদি তামাকু সরুদৃষ্টিতে গোপনবৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকায় তাহলে বুঝবেন এই তামাকু রহস্যধাতুর আলোড়ন। একে পান করবেন একদম একলা। এমনকি নিজেকেও নিজের সঙ্গে এক আসনে বসাবেন না।
রাঙামাটির সবুজ খাটিয়ায় বসে পান করতে হয় তামাকু। নইলে তামাকুর রং রূপ আর রঙ্গের তানপুরা খোলতাই হয় না।
পূর্ণিমার তপ্ত হাওয়ায় পিঠ সেঁকতে সেঁকতে চুমুক দিন তামাকুর পেয়ালাতে। অনুভব করবেন ভোলেবাবার কোলের দুলুনি। নইলে কিন্তু তামাকু স্বাদে আলেয়া গড়ন, সামান্য আলুনি।
তামাকু নেবেন সাত সরগমের। সঙ্গে পাঁচ-মাত্রা নীলাভ ঘূর্ণিরেখা। মহুয়ার শেকড়, আর মাধবীর ছোবল দু-ফোঁটা মেশাবেন। হালকা হাতে জলজ তুলিতে মেশাতে হবে। অন্দরের উষ্ণতা এবং বাহিরের তাপমাত্রা যেন হয় সমান সমান। মনে রাখবেন, এই মিশ্রণ গোলকধাঁধা নয়, গোলকধামের বিভাবরী।
চিতাবাঘ শিকারের আগে অতি অবশ্যই পান করবেন আঠারো মাত্রার তামাকু। এই তামাকু সেবন করতে হবে ঘোর বর্ষায় রঙিন লন্ঠনের ছাদনাতলায়। নইলে বাঘ নয়, বাঘের জামা পরা শেয়াল শিকারেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
যে তামাকু পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো চঞ্চল, অস্থির মনে তাকে কখনো সেবন করবেন না। স্থির মনে আকাশপ্রদীপকে প্রথমে সমর্পণ করবেন তামাকুপাতার তৈরি মায়ানগরী। এই প্রকার তামাকু পারুলফুলের শিলে
বেটে গ্রহণ করলে উত্তম ফল দেবে এবং স্বাদ বাড়বে চতুর্গুণ।
বিনামূল্যে পাওয়া যে তামাকু, তাকে গ্রহণ করার আগে অতি অবশ্যই স্নান। ভালো করে পরীক্ষা করে নেবেন পাতার গায়ে মাথায় কোনো তাবিজ বাঁধা নেই তো! যদি থাকে তাহলে সেই তামাকু সেবনের অনুপযুক্ত। আর যদি সেবন করতেই হয় তাহলে যেন সঙ্গে থাকে নিঠুর প্রণয়।
তুলারাশির তামাকু প্রতিদিন সেবন স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো। যদি এর সঙ্গে মিশিয়ে নিতে পারেন গোধূলির সন্ধ্যা-রং, তাহলে বহু যুগ পুরনো হাঁপানি এবং প্রেমরোগ সেরে যায়।
শ্মশানে জন্মানো তামাকু পাতা সেবন করতে হলে বেশ কয়েকটি জন্ম অপেক্ষা করতে হয়। যেদিন এই তামাকু হাতে আসে সেদিন কোথা থেকে যেন ঈগলের ডানাদুটি, ছোঁ-মেরে একেবারে সকালের ভাব বিকেলের আড়ি অবধি!
প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতা: সোমা দত্ত, তাঁর কবিতা
কবিতা তো দুই বাংলা মিলিয়ে হাজার লাখো। অজস্রই লেখা হচ্ছে। কিন্তু নবীন কবিদের মধ্যে কেন বেছে নিলাম সোমা দত্তকে! প্রশ্নটি নিজেই নিজেকে করি। তাঁর কবিতার মধ্যে এমন কী রহস্য? এমন কী লুটপাট করার মতো সৌন্দর্য আছে, যা আমাকে টেনে নিয়ে এল দৃষ্টিবিভ্রমের বৃষ্টিতে!
এই কবির কবিতা যেন একটি নিমন্ত্রণচিঠি, নির্মেঘ স্বরে পাঠকে জড়িয়ে ধরে। কবিতারা যেন কথাবলা ময়ূর, হাস্নুহানার পরিসরে নিজের রংরূপ বেলোয়ারি ঝরনা প্রকাশ করতে উদ্যত। কিন্তু উদ্ধত নয়। কবিতার মেঝে থেকে সিলিং-অবধি পৌঁছতে যতখানি সময় লাগে, তার চাইতে অনেক কম সময়ে শ্রীমতী সোমার কবিতা পাঠ করে আমি পৌঁছে যাই সৌরঠোঁটে, জিভ আর ত্বকের মজ্জায়।
এইখানেই কবির সাফল্য। মুগ্ধতার ভারে পাঠককে আহুতি আর আলাপনের চৌকাঠে পৌঁছতে পারে।
এই কবির কয়েকটি পংক্তি যদি তুলে না ধরি, তাহলে আলোচনা পূর্ণ হয় না।
না, এই ঘরের জানলা থেকে বড় বেশিদূর দেখতে পাই না আর
অই পাশের বাড়ির বারান্দা, ওদের তিন টুকরো ঘর, আর ওদের ছোপ ছাপ
মধ্যের কৃপণ জমিতে কষ্টের বেড়ে ওঠা পোষা দেবদারু,
বেড়ে গেলে যার বাড় ছেঁটে দেওয়া হই অই ততোটুকু
কবিতার নরম কণ্ঠ শেখায় সরল অংকের শোভা। এই শোভা সন্ধ্যাপ্রদীপের মতো আলোর কুটির। জোনাকির বাড়ি ঘরে আলোপ্রদায়িনী ঝুমকোলতা। পাঠককে যারপরনাই পেঁচিয়ে ধরে। ছবিজীবনের সিংহভাগ এই কবিতার পেখমের কলম। যা আঁকে যতটুকু আঁকে, তাতেই ঝুলি ভরে ওঠে। কবিতা শান্তির, কবিতা পবিত্র এক শিবির। সোমার কবিতা আমাকে কোলাহলহীন হতে বলে। ছলাকলাহীন হতে শেখায়।
আরেকটি কবিতা। এই কবিতায় যতোবার অবগাহন, ততবার মেদুর শুক্লস্নান। আকারে শিশু, কিন্তু মর্যাদায় প্রাজ্ঞ। অলৌকিক মন্থন শেষে অবিনশ্বর একজন দিগন্ত। আসুন, প্রজাপতির মতো ঝুপ করে এই কবিতার পর্যটনে একটু ছটাক ভ্রমণ সেরে আসি,
পুরনো বৃষ্টিরা নেমেছে এখন
নতুন বৃন্তে যৌবনমুখী বৃষ্টির ডালপালা
বলেছে আবার আসবো
আটঘাঁট বেঁধে নাম পরিচয় নিয়ে আসবো
যা আমার নেই এবং কোনোকালেই ছিল না
তা নিয়ে সংশয় না রেখেই
কবিতার শুরুটাই এমন যেন এক নিভৃতবাসে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি বহুকাল। কবির কলমে ভর করেছে কলমকারির সেতার। সুফলা ভাব-ভাষা পেরিয়ে কবির কলমে উথলে উঠল নরম সূর্য আর আলোর দ্রবণ। কী টাটকা! এবং হাতেগরম। বাহির আর অন্তরের স্পন্দন এবং প্রাণ–দুই-ই আমাকে হাত ধরে পৌঁছে দিল অস্তিত্বহীন এক অববাহিকার দিকে।
রাজনীতি সমাজনীতি নয়,এই কলমে ভর দিয়ছেন স্বয়ং সরস্বতী। কবি সোমার ভাবন-অঞ্চলের বিস্তার দেখে শুনে মনে হয়, কবির রক্তে কবিতার যে হিমোগ্লোবিন, তা বহু প্রাচীন। বেশ কয়েক বছর কবিতার সঙ্গে সহবাস না-করলে এমন পংক্তি উচ্চারণ করতে পারে না কলম। কবি শক্তিমতী তো বটেই, কলমটিও যারপরনাই উর্ধ্বমুখী। কবি এবং কলম যখন একত্রে পরমায়ুরেখার গভীরে প্রবেশ করে, তখন কবিতার আনন্দের শেষ থাকে না। কল্পচিত্রের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কবিতা তখন গ্রহ তারা এমনকি পৃথিবীরও তোয়াক্কা করে না।
পোকার মতো চেপ্টে গেছি যে জীবনে, তার নাম বাংলা সাহিত্য
প্রথম পৃষ্ঠার শহীদ আমার ব্যাকরণ, দ্বিতীয়তে বানান
তৃতীয় অধ্যায় মায়ের মতো, অপভ্রংশ
এই তিন পঙক্তিতে ভ্রমণ সেরে শুনতে পেলাম সমূহ সম্ভাবনা। ঘটনাক্রম কাল এবং পরিসরের ঠিকানা পেরিয়ে কবি তৃষ্ণার্ত তীরন্দাজ। তাঁর ভাবনায় অপূর্ব তেষ্টা, কবিতানদীর প্রত্যন্ত জলাঞ্চলে অহরহ সাঁতার এবং ডুব। হাতে রয়েছে কলমবৃক্ষের ছায়া। মায়াবতী রঞ্জাবতীর কাছ থেকে পাওয়া উপহার অদ্ভুত সুন্দর দুইটি ডানা। কবি মাঝে মাঝে জলের বুকে মুখ ডুবিয়ে খুঁজে পাচ্ছেন নীলচে চৌকো আত্মদর্শনের ঘুড়ি। কখনো ভিজে শৈবালের স্নানঘরে লুকনো নিটোল কুহুশান্ত অমরাবতী!
ঘরের মধ্যে একটি আকাশ থাকে,
অসময়ে সময়ে নীচে নেমে এসে চড়ে বসে ছাতির ওপর ,
তখন শুধু অই ব্যলকনি ভরসা
ওখান থেকে বাইরের আকাশ, সূর্য, চাঁদ আর গ্রহণ স্পষ্ট—
দেখা যায়, সবকিছুর ন্যুনন্তম বেঁচে থাকা
কবিতা তো নয়। হালকা হ্রদে ভেসে ভেসে মাস্তুল ছুঁয়ে আরো অনেক দূর—চেতন আর অবচেতনের ঝাঁপিবারান্দায় পৌঁছনো! এক পেয়ালা চায়ের থেকেও অনেক দূরে যেখানে,
অভিমানের গাঢ় বাদামী রং ফিকে হয়েছিল।
ভালবাসার গোলাপি আভা ফুটে উঠেছিল পছন্দের বেডকভারে,
আলস্যের মদিরতা অস্ফুট ম্যাজেন্টা রঙে ফুঁ দিয়ে উড়িয়েছিল চুল…
শ্রীমতী সোমার কবিতার অনেকটা জুড়েই রয়েছে নিরাকার বাতাসের কক্ষপথ। অলঙ্কারহীন গহনাহীন অথচ চূড়ান্ত মেধাময় দীর্ঘদিন। এই কবিকে কখনোই অস্বীকার করা যাবে না। কারণ তাঁর কলমের এনভেলপে লুকনো নিজেকে আবিষ্কার করার মতো পরাক্রম আর সম্পদ। আছে তেপান্ন পৃষ্ঠা জাদুকরী আবর্তন। আছে আশ্চর্য আহ্নিকগতি, কম নেই মোটেও আলো আর আলেয়ার যৌথ দেওয়ালগিরি।
কলমটির বাম চোখে উঁকি দিয়ে দেখি, কী দারুণ শিকারা, অনবদ্য দেহবল্লরী, ডান চোখে সাংকেতিক রূপকথা। সঙ্গীতের আবহ কবিতার কিনারায় বসে টানছে দাঁড়। ছলছল মাঝদরিয়ায় বনবিবির হাসি। টগরফুলের বাসি জ্যোৎস্না পান করে কে যেন কবিতার বুক বরাবর ফসল ফলাচ্ছে প্রচুর।
পাঠকের দারুণ প্রাপ্তি। দু-হাত ভরে তিলোত্তমা সংসার। দারুচিনির আয়না। পাঠক দেখতে পাচ্ছে নিজেকে, এমনকি কবিতার চোখের তারাফুলদুটিও, গন্ধবকুলের মেরুনপনাও প্রকাশিত হচ্ছে দিনযাপনের চোরাবালি পেরিয়ে।
এমনভাবে চোখ রেখেছ যেন ছিনিয়ে নেবে বিপদসীমা
মরশুম বাড়ন্ত হলে কাঁচাবাজারে দাম ওঠে
আর বর্ষা কেঁপে উঠলে গাছের গোড়া পচে
সে কি আর বুঝতে বাকি আছে এখনো?
