ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ক্রিটিকাল থিওরি ও ফ্রেডরিখ নিৎসে

Share this:

মানবপ্রজাতি তার ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে শুরু করে সামাজিক বিভিন্ন স্তরে বিভাজিত।এ বিভাজন প্রবণতার সাথে ক্ষমতা বিভিন্নভাবে তার সম্পর্ক গড়ে তুলে। বৈচিত্র স্তরের মধ্যে ক্ষমতা বিন্যাস বৈচিত্রভাবে উপস্থিত থাকে। ক্ষমতার সক্রিয় অবস্থানের উৎপত্তিসন্ধানের জন্য নিৎসের চিন্তাভাবনাকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের অন্যতম তাত্ত্বিক এডোর্নো তার বিভিন্ন লেখায় ব্যবহার করেছেন।ধ্রুপদী মার্কসবাদী পদ্ধতি থেকে সরে এসে এটি যেনো ক্ষমতা সম্পর্ককে উন্মোচনের ক্ষেত্রে এক “স্বতঃস্ফূর্ত” ও “ক্রিটিকাল” অবস্থান।ক্ষমতা সম্পর্কের বৈচিত্র মূল্যবোধের অবস্থানের কারণে মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছাসমূহের কর্তাসত্তা হয়ে ওঠার যে সংকটের মধ্যে আছে, সেই সংকটগুলোর উৎসের প্রতি ক্রিটিকাল সম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিলো ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ক্রিটিকাল থিওরির অন্যতম লক্ষ্য।এজন্য ক্রিটিকাল থিওরিকে তার সামাজের কতগুলো বিশ্বাস চর্চা এবং অবদমনমূলক সমাজ কাঠামোর মোকাবিলা,ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ করতে হয়।নব্য মার্কসবাদের চিন্তক হিসেবে ক্রিটিকাল থিওরি মার্কসবাদকে নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশের অনিবার্যতাকে সম্ভবপর করে তুলে।এটি প্রথাগত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে পরিহার করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার উৎপত্তিসন্ধানের বৈচিত্র পর্যায়ে দিকে নজর দেয়।ক্রিটিকাল থিওরির মূল ঝোঁক ছিলো সামাজিক সংকটগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা।

 

ক্রিটিকাল থিওরি, মার্কসবাদ ও নিৎসে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের মাধ্যমে নিৎসের চিন্তার পুনঃশক্তিসঞ্চার ঘটে৷ ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ক্রিটিকাল থিওরি বিকাশের ক্ষেত্রে নিৎসের চিন্তা দ্বারা এডোর্নো এবং হরখেইমাররা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।প্রথম প্রজন্মের তাত্ত্বিকরা বিশেষত এডোর্নো নিৎসের বিভিন্ন ধারণাকে তার তত্ত্বসমূহের মধ্যে নিয়ে এসেছেন।তারা এমন একসময় নিৎসের চিন্তার উপর নির্ভর করে ক্রিটিকাল থিওরির বিকাশ ঘটান যখন নিৎসের চিন্তাগুলো রাজনৈতিকভাবে “বিপদজনক” হয়ে উঠতেছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জার্মানিতে অন্যতম দুইজন দার্শনিক নিৎসে এবং হাইডেগারের বিভিন্ন গ্রন্থসমূহকে নিষিদ্ধ করা হয়।হাইডেগার এবং নিৎসকে ছাটাই এবং বাতিলের প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ছিলো।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটগুলো নিৎসে তার জিনিওলজির মাধ্যমে উন্মোচন করেছেন সেগুলো প্রথম প্রজন্মের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকদের তাড়িত করেছে।এডোর্নো নিৎসের উৎপত্তিসন্ধান পদ্ধতিকে নিজেদের মতো করে বোঝাপড়া ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে ক্রিটিকাল থিওরিসমূহের সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। বিশ্বযুদ্ধ,বর্ণবাদ,জাতিবিদ্বেষের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল সক্রেটিস, হেগেল বা মাক্সবার্দের ডায়লেক্টিকাল পদ্ধতির মধ্যে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা খুঁজে পেলো। এ পদ্ধতির মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে বাইনারি পদ্ধতির মাধ্যমে একটি শ্রেণীবিন্যাস তৈরি করে। সমস্যাসমূহের সমাধান সেই শ্রেণীবিন্যাসকৃত বিশ্লেষণের আলোকে দেখে। এ ধরনের বিশ্লেষণ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সামাজিক কতৃত্বের উৎসের সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে সাক্ষাৎ ঘটেনা।সাক্ষাৎ ঘটেনা বলেই ব্যক্তি নিজেই বিভিন্নভাবে অপরাপর ক্ষমতার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে।কেননা ক্ষমতা সম্পর্কিত বোঝাপড়া ও দৃষ্টিভঙ্গি তখন নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।যার ফলে খুব সহজে ক্ষমতা দ্বারা ব্যক্তির আচরণ প্রভাবিত ও নির্ধারিত হয়। ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিকতা বা মূল্যবোধ বিভিন্ন আদর্শিক বা বলপ্রয়োগ এপারেটাস কতৃক পরিচালিত হওয়ার ফলে ক্ষমতা তখন জ্ঞান, সত্য বা নৈতিকতার বিভিন্ন মূর্তরূপ আকারে হাজির হয়ে চর্চিত হয়।

ডায়লেক্টিকাল পদ্ধতির আরেকটি সমস্যা হচ্ছে এটি সমস্ত সমস্যাকে একটিমাত্র আদর্শিক বা কেন্দ্রিক  কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান করতে চায়।এজন্য কার্ল মার্কসের ক্ষমতা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা শুধুমাত্র উৎপাদনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো।কিন্তু সমাজের মধ্যে ক্ষমতার অবস্থান যেহেতু গভীর এবং বিশাল তাই মাইক্রোপলিটিক্স সম্পর্কিত বোঝপড়া ছাড়া প্রতিরোধ সম্ভব নয়।মার্কসবাদীদের মধ্যে এ বোঝাপড়ার প্রাথমিক প্রবণতা সূচনা হয় গ্রামসির মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিক এডোর্নো, হরখেইমার অথবা ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের মধ্যে।মার্কসবাদী ধারার মধ্যে লুই আলথুসারের মাধ্যমে ক্ষমতাকে বোঝাপড়ার একটি স্বাতন্ত্র্য রূপ তৈরি হয়। তবে গ্রামসি বা আলথুসারের ক্ষমতা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে যেখানে এডোর্নো এবং হরখেইমাররা ক্ষমতা সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা  রাষ্ট্রের পাশাপাশি সামাজিক-সংস্কৃতির বৈচিত্র এলাকায় বিস্তৃতি ঘটান।তারা ক্ষমতাকে রাষ্ট্রকেন্দ্রিকতার সীমা পরিসীমাকে ছাড়িয়ে আরো সূক্ষ্মভাবে খুঁজতে চেয়েছেন অনেকটা উত্তরাধুনিক চিন্তকদের মতো। এজন্য ফুকো ফাঙ্কফুর্ট স্কুলের প্রথম প্রজন্মের তাত্ত্বিকদের উত্থাপিত সমস্যাকে বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করতেন।

এডোর্নোদের ক্রিটিকাল থিওরি মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বে নতুন এক বাঁক নেয়।হেগেল এবং মার্কসবাদের পাঠককে তারা এক নতুন বিন্যাস ঘটায়।মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বকে আরো বেশি বোধগম্য ;মার্কসবাদী চিন্তার পরিসরকে গভীর ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বাইরের চিন্তাভাবনা থেকে কিছু গ্রহণ করেন,যেখানে নিৎসের চিন্তাভাবনা ছিলো অন্যতম।ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকরা নিজেদের চিন্তা ও তত্ত্বকে নির্মাণের লক্ষ্যে এনলাইটেনমেন্টের কেন্দ্রীয় কিছু ঐতিহ্যকে গভীরভাবে পর্যালোচনা শুর।এনলাইটেনমেন্টকে প্রচন্ডভাবে সমালোচনা করলেও তাদের লক্ষ্য ছিলো ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের ধারাবাহিকতা আরো বেশি প্রসারিত করা। এজন্য এডোর্নো এবং হরখেইমার এনলাইটেনমেন্টের যৌক্তিকতার বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিভাজন করে তাকে ক্রিটিক করেন।হাবারমাস যেমন আধুনিকতাকে একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখেছন, এডোর্নো এবং হরখেইমার এনলাইটেনমেন্টকে দেখেছেন একধরণের অসম্পূর্ণ প্রকল্প হিসেবে। এজন্য তারা এনলাইটেনমেন্টের নতুন এক বিন্যাসের কথা বলেছেন।

 

ক্রিটিকাল থিওরি

ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ ছিলো ক্রিটিকের মাধ্যমে সামাজিক বাস্তবতা বিকাশের সহায়ক অবস্থান তৈরি করা।পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকরা বিশেষত এডোর্নো ও হরখেইমার এনলাইটেনমেন্টকে ক্রিটিক করে ক্রিটিকাল থিওরি প্রতিষ্ঠা করেন।ইউরোপীয় সমাজে স্বাধীনতার সাথে এনলাইটেনমেন্টের চিন্তার সম্পর্ককে তারা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে ”ভালো হোক আর মন্দ হোক আমরা এনলাইটেনমেন্টের উত্তরসূরি।” তাদের মতে এনলাইটেনমেন্টের ক্রিটিকের লক্ষ্য হচ্ছে একে তার ”অন্ধ আধিপত্যশীল” অবস্থান থেকে মুক্ত করে ”একটি ইতিবাচক প্রত্যয় হিসেবে প্রস্তুত করা৷”

ক্রিটিকাল থিওরি ইউরোপীয় চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে যে কাঠামো ছিলো এর বাইরে এসে নতুন ও স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটায়। ইউরোপের চিন্তার ক্ষেত্রে যে সকল তত্ত্ব বিশ্লেষেণের রূপরেখা ছিলো, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকরা সেগুলোকে পর্যালোচনার মাধ্যমে নতুন এক রূপ দেন।সে রূপ পূর্ববর্তী চিন্তাভাবনাগুলোকে গ্রহণ, বর্জন ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি নতুন অবস্থান তৈরি করে।এটি নতুন নতুন তত্ত্ব এবং বাস্তবতা নির্মাণ করে।এ বাস্তবতা আত্মমুক্তি ও আত্মনির্মাণের পথ দেখায়। ক্রিটিকাল থিওরির চিন্তকরা মার্কসবাদ দ্বারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত ছিলেন।কিন্তু তাদের চিন্তাধারা অর্থোডক্স মার্কসবাদ থেকে সরে এসে নতুন চিন্তার জোগান দেয়।ক্রিটিকাল থিওরি মার্কসবাদের নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে। এটি সনাতন মার্কসবাদের একরৈখিক চিন্তাকে বহুরূপত্ব প্রদান করে।ক্রিটিকাল থিওরি কোন একক যুক্তিতর্ক বা পূর্বানুমানকে সমর্থন করার পরিবর্তে সমসাময়িক অবস্থাকে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে।তাদের লক্ষ্য সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলোকে পর্যালোচনার মাধ্যমে কতৃত্বহীন সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করা। ইউরোপে তখন যে প্রধান প্রধান সমস্যা ছিলো বিশেষত শ্রমিক আন্দোলনও এন্টি-সেমিজম নিয়ে সমকালীন চিন্তকরা তেমন সরব ছিলেন না। ক্রিটিকাল থিওরির তাত্ত্বিকরাই প্রথমে এর বিরুদ্ধে সরব হন।তারা ক্রিটকাল পর্যালোচনার মাধ্যমে সামাজিক স্থিতাবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাময় পথ তৈরি করেন।ক্রিটিকাল থিওরি পুঁজিবাদ ও সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে পর্যালোচনার মাধ্যমে বিকল্প সামাজিক উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি করে।হরখেইমারের মতে ক্রিটিকাল থিওরির হচ্ছে ‘ সমাজকে সম্পূর্ণভাবে রূপান্তরের তাড়না।’এটি তত্ত্বও কর্মের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে মুক্তির পথ দেখায়।ক্রিটিকাল তাত্ত্বিকদের মধ্যে বিশেষভাবে এডোর্নো এবং হরখেইমার কতৃক দার্শনিক চিন্তাভাবনার প্রায়োগিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে সমাজ বিশ্লেষণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা লাভ করে। মনোবিশ্লেষণ ও সামাজিক মনোবিদ্যাকে ব্যবহার করে সামাজিক বিশ্লেষণের নতুন এক ধারা তখন তৈরি হয়। পরবর্তীতে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দ্বিতীয় প্রজন্মের মাধ্যমে ক্রিটিকাল থিওরির আরো বিস্তৃতি ঘটে।

 

ক্রিটিকাল থিওরির ক্ষমতার  দর্শন

এডোর্নো এবং হরখেইমার এনলাইটেনমেন্টের পর্যালোচনা ও ক্রিটিকাল থিওরির ভিত্তি স্থাপনের ক্ষেত্রে নিৎসের চিন্তাকে যতদূর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় তারা তা করেছেন। আর এটি করতে গিয়ে তারা নিৎসের জিনিওলজিক্যাল পদ্ধতিকে ব্যবহার করেছেন।কারণ এধরণের পদ্ধতি প্রথাগত ঐতিহাসিক সচেতনতা থেকে ভিন্ন।এটি ক্ষমতাকে তার উৎস,নীতিতত্ত্ব ও প্রচলিত সামাজিক প্রথাগত অবস্থানের প্রেক্ষিতে দেখতে চায়।এডোর্নো এবং হরখেইমার এনলাইটেনমেন্টের যে ক্রিটিক হাজির করেছেন তা নিৎসের মতোই যুক্তির ধারণাগত কাঠামো সম্পর্কে সংশয়াপন্ন।কেননা তারা মনে করেন লিবারেল ক্ষমতা “যৌক্তিক ফর্মের” মধ্য দিয়ে চর্চিত হয়।

নিৎসের লক্ষ্য ছিলো মানুষের কার্যক্রমের অর্থ ও সারসত্তা খোঁজা এবং এগুলোর সাথে ক্ষমতার যেভাবে মোকাবিলা হয় তার ব্যাখ্যা করা। এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে ইউরোপীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে নিৎসেই হচ্ছেন প্রথম চিন্তক যিনি এনলাইটেনমেন্টের ক্ষমতার “দ্বৈত সম্পর্ককে” উন্মোচন করেছেন।নিৎসের ভাষায় এটি একটি ‘অশুভ সচেতনতা ‘ তৈরি করেছে৷এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে এনলাইটেনমেন্ট সবসময়ই শাসনের শৈল্পিক  প্রযুক্তিকে তৈরি করেছে। ‘কনফুসিয়াসের চীন’ অথবা ‘রোমান সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায়’ ক্ষমতা ও শাসনতান্ত্রিকতার সাথে আলোকায়নের সম্পর্ক ছিলো। তবে এগুলোর সাথে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সাথে পার্থক্য হচ্ছে ক্ষমতা এবং আধিপত্যের অবস্থান আরো বেশি সূক্ষ্ম ও খাঁটি প্রকৃতির রূপ ধারণ করেছে।

তবে এ ক্ষমতা সম্পর্ক বিষয়ে এডোর্নো এবং হরখেইমারের অভিযোগ হচ্ছে এটি আত্ম-বিধ্বংসীমূলক।এই ক্ষমতাকে বিভিন্নক্ষেত্রে এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যে তার প্রথাগত বৈধতাকে নিজেই চ্যালেঞ্জ করে। আলোকায়িত ক্ষমতা তখন নিজেই নিজের সাথে বিদ্রুপ করে। ক্ষমতা একই সাথে তার কার্যবলির অনুগামী ও বিরোধী হয়ে ওঠে। এই ধরণের ক্ষমতার কার্যবলিকে নিৎসেও তার লেখায় আত্ম-বিধ্বংসী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।আত্ম-বিধ্বংসী হয়ে ওঠার পেছনের মূল কারণ হচ্ছে “আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক” ক্ষমতা চর্চা।আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক জ্ঞানভাষ্যের উৎস হচ্ছে ক্ষমতা,এটি ক্ষমতা তার নিজের মধ্যে লালন করে।আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার কারণই হচ্ছে মানবপ্রজাতি ও প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা। আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চার প্রবণতা প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্নধরনের জ্ঞানপ্রকল্প তৈরি করে।এ জ্ঞানপ্রকল্পগুলো সবসময় নিজেকে আত্ম-রক্ষার সীমাবদ্ধতা দিকে অর্থাৎ আধিপত্যের মানসিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে হবস ও ম্যাকিয়াভেল দর্শনের মাধ্যমে সেল্ফের আত্মরক্ষাকেন্দ্রিকতা বা “স্বার্থকেন্দ্রিকতা” প্রতিষ্ঠার সূচনা ঘটে যার বিকাশ ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠে।

আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক ডিসকোর্সগুলো জ্ঞানকে তার গন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করে।যার ফলে জ্ঞান বা যুক্তিবোধ কতৃত্ব পরিচালনা করার নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে পরিণত হয়।আত্ম-রক্ষার জ্ঞানভাষ্য সহিংসতা ও অন্যায্যতাকে আলোকায়িত যুক্তি কাঠামোর মাধ্যমে উসকে দেয়।যার ফলে বুর্জুয়া সমাজে নারী অথবা পরিবেশকে উপস্থাপনের মধ্যে তাদেরকে অক্ষম বা  ‘ক্ষমতাহীন’ করার প্রবণতা প্রবলভাবে বিদ্যমান।এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে এই বুর্জোয়া সমাজ হচ্ছে ‘দাস-মনিব’ সম্পর্কের কাঠামোগত ‘উত্তরাধিকার।’

জ্ঞান বা যুক্তিবোধের দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্রিটিক করার মধ্য দিয়ে এডোর্নো এবং হরখেইমার সমগ্র পাশ্চাত্যের জ্ঞানচর্চার সাথে ক্ষমতা ও দর্শনকে উন্মোচন করেন।এর মাধ্যমে মূলত তারা লিবারেলিজমের সীমাবদ্ধতা থেকে মানবমুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন।লিবারেল রাষ্ট্র, সংস্কৃতি কারখানা বা কোন ধরণের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রপঞ্চের কাছে  মানবমুক্তিকে যে শুধুমাত্র এপারেটাস হিসেবে ব্যবহৃত হয় তার অন্তর্দৃষ্টি সম্পর্কে একটি সচেতনতা তৈরি করা ছিলো তাদের ক্ষমতা সম্পর্কিত দর্শনের লক্ষ্য।যে সচেতনতার মাধ্যমে “আত্ম-রক্ষাকেন্দ্রিক সচেতনতা” থেকে মুক্ত “জীবনের উৎপাদন” হবে।১০

ক্রিটিকাল থিওরির চিন্তকরা ক্ষমতাকে মাইক্রোপলিটিক্যাল কতৃত্বের ভিতর দেখার চেষ্টা করে। যার ফলে এডোর্নো এবং হরখেইমার তাদের লেখায় পরিবেশের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছেন।যার মাধ্যমে তারা পরিবেশের উপর মানুষের যে অবিবেচনাপ্রসূত কতৃত্বকে প্রবণতার ক্রিটিক হাজির করেছেন৷

 

সংস্কৃতি কারখানা

লিবারেলিজম মূলত যৌক্তিক কাঠামোর গভীরে ঢুকে তার সংকটকে তৈরি করে। এর মধ্যে সামাজিক অগ্রগতির প্রলোভনকে জুড়ে দেওয়া হয়।অগ্রগতির রূপ বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হলেও কাঠামোবদ্ধ নিয়ম একই থাকে। এই নিয়ম বা যৌক্তিক কাঠামো হচ্ছে একধরনের পদ্ধতিগত ক্ষমতা। রেডিও টেলিভিশন অথবা কোন টেক্সটের ক্ষেত্রে জনগণকে প্রতিনিধিত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করলেও এগুলো জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণ অথবা আওতাভুক্ত নয় বরং তার বিপরীত অবস্থানটি সঠিক। অর্থাৎ জনসাধারণ বিভিন্নভাবে এগুলোর অধীন হয়ে পড়ে।আর এটাই হচ্ছে লিবারেল ক্ষমতাচর্চার সুদূরপ্রসারী সফলতা।জনসাধারণ সংস্কৃতি কারখানার নির্মিত চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিজেকে নিরন্তর আবিষ্কার করতে থাকে।এই আকাঙ্ক্ষা বা চাহিদা তার প্রকৃত চাহিদা নয়। তবে লিবারেল কাঠামোর মধ্যে আচ্ছন্ন থাকার কারণে সে এটিকে পুরোপুরিভাবে বুঝতে সক্ষম নয়।ফলে জনসাধারণ কখনো কখনো নিজের অবদমিত পরিস্থিতিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হলেও অবদমনের বৈচিত্র উৎসের সাথে প্রতিরোধমূলক যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়না৷

সংস্কৃত কারখানা হচ্ছে “প্রযুক্তিগত যৌক্তিকতা” ও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ।যে ক্ষমতাচর্চার ফলে জনসাধারণের মনে একধরণের রিসেন্টিমেন্ট তৈরি হয়।  জনসাধারণের রিসেন্টিমন্টাল দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ে সংস্কৃতি কারখানা কৌশলগত ও নিয়তান্ত্রিকভাবে কাজ শুরু করে।ফলে জনসাধারণের প্রতিরোধের বাস্তব প্রভাবের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। কেননা সংস্কৃতি কারখানার ফলে জনসাধারণের অবদমিত হওয়ার প্রকৃত উৎপত্তিসন্ধানের সাথে সাক্ষাৎ হয়না।অবদমিত জনসাধারণ তার কতৃপক্ষের কাছে যাওয়ার একটি জায়গা খুঁজেন এবং ব্যর্থভাবে মেকি আদারের কাছে পৌঁছেন যাদেরকে সংস্কৃতি কারখানা নির্মাণ করে।এর ফলে জনসাধারণ তার একই সংকটের ভিতর ঘুরপাক খেতে থাকে।যেহেতু মানবীয় পরিস্থিতি সসীম এবং সময় অসীম তাই এইধরনের ঘটনাগুলো নিরন্তর ফিরে আসে। এডোর্নো এবং হরখেইমার তাদের সংস্কৃতি কারখানা সম্পর্কিত তত্ত্বের মাধ্যমে জনসাধারণের এই অবদমিত পরিস্থিতি উৎসের দিকে আলোকপাত করেছেন।

ক্রিটিকাল থিওরির মতে সংস্কৃতির কারখানা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর সত্যিকারের ও স্বত:স্ফূর্তভাবে অস্তিতশীল হয়ে ওঠার প্রধান বাধা। কারণ সংস্কৃতি কারখানা ব্যক্তির হয়ে ওঠার বিভিন্ন কারণ বা শর্তাবলীকে নির্ধারণ করে দেয়।সংস্কৃতি কারখানার “পূর্বপরিকল্পিত” ও “জটিল” সম্পর্ক জনসাধারণের ইচ্ছাকে অবদমন ও নিয়ন্ত্রণের উৎস হিসেবে কাজ করে।১১ সংস্কৃতি কারখানার সাথে মানুষের যে সম্ভাবনাময় সম্পর্ক জারি থাকে তা হচ্ছে একধরণের ক্ষমতা সম্পর্ক।এডোর্নো এবং হরখেইমারের মতে সংস্কৃতি কারখানা লক্ষ্য হচ্ছে ‘উৎপাদিত মতাদর্শকে’ ‘বৈধতা’ দেওয়া।এটি এমন এক প্রযুক্তি যার মাধ্যমে ‘সমাজের উপর ক্ষমতা চর্চার’ অধিকার তৈরি হয়।১২

সংস্কৃতি কারখানা শাসক শ্রেণীর নৈতিকতার ধারণ করে এডোর্নো যে নৈতিকতাকে “সভ্যকরণের উৎস ক্ষমতা” হিসেবে চিহ্নিত করেন।১৩ এটি সমাজের বাস্তবিক, মূল্যবোধ ও নীতিকেন্দ্রিক পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রত্যেকটি ঘটনাকে জনসাধারণের নিকট উপস্থাপন করে।এই পর্যালোচনাগুলো হচ্ছে উদ্দেশ্যবাদী। অর্থাৎ পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র বা উদারতাবাদের মতো বিভিন্ন ডিসকোর্সের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যগুলোকে অর্জন করাই হচ্ছে মূখ্য, এগুলোকে যে উপায়ে বা প্রক্রিয়া অর্জন করা হয় তা মূখ্য নয়।

 

যবনিকা

ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তক হাবারমাস  ক্রিটিকাল থিওরির বিভিন্ন ধারণাকে পুন:সংস্কারের লক্ষ্যে  এডোর্নো এবং হরখেইমার চিন্তাকাঠামোকে জোরালোভাবে ক্রিটিক করেন।বিশেষত এনলাইটেনমেন্টের যুক্তির সমালোচকদের হাবারমাস ‘নব্য-রক্ষণশীল’ হিসেবে অভিহিত করেন। যুক্তিকে সর্বাত্মকভাবে সমালোচনার এ ঐতিহ্য নিৎসে থেকে ফ্রান্সে জর্জ বাতাইয়ের মাধ্যমে উত্তরাধুনিক চিন্তক দেরিদা এবং ফুকোর চিন্তায় প্রতিস্থাপিত হয়।১৪

যুক্তিকে হাবারমাস দেখেন ‘সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার’ যোগাযোগ কার্যাবলির বিষয় হিসেবে।১৫ সমাজের মধ্যে যুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশের ক্ষেত্রে অবশ্য তার মধ্যে ‘আত্ম-নিয়ন্ত্রণ’ ও ‘আত্ম-সমালোচনার’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।এটি সামাজিক গতিশীলতা, সচেতনতা ও ন্যাযতার বিষয়টিকে নিশ্চিত করে। হাবারমাস তার সমসাময়িক দার্শনিকদের যুক্তির সর্বাত্মক সমালোচনাকে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।যেখানে বিদ্রুপাত্মকভাবে যুক্তিকে ব্যবহার করেই যুক্তির গুরুত্বকে খাটো বা বিলুপ্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি এডোর্নো এবং হরখেইমারকে বিশেষভাবে সমালোচনা করেছেন।

হাবারমাস তার লেখায় এডোর্নো এবং হরখেইমারকে বুর্জোয়া সমাজের ‘ডার্ক’ লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।১৬ হাবারমাসের মতে এনলাইটেনমেন্ট দান্দ্বিকতার মধ্যে এডোর্নো এবং হরখেইমার যে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা ‘মিথ ইতিমধ্যে এনলাইটেনমেন্টে পরিণত হয়েছে ; এনলাইটেনমেন্ট মিথের দিকে ফিরে গেছে ‘ এ থিসিসটি বিভ্রান্তিকর ও পরস্পরবিরোধী। এনলাইটেনমেন্ট আদিম অবস্থানের নিকট আধ্যাত্মিক প্রত্যাবর্তন করার ফলে যেভাবে মিথে পরিণত হয়েছে,অনুরূপভাবে তারা নিজেরাও এনলাইটেনমেন্টকে সেই প্রত্যাবর্তনের কথা বলেছেন।উৎসের নিকট ফিরে যাওয়ার প্রবণতা অথবা তার পুনরুত্থান শক্তিকে ডুর্খেইম সামাজ সংহতি নিশ্চয়তার বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করতেন যাকে বিরোধপূর্ণভাবে এডোর্নোদ্বয় ধারণ করেন।১৭ কেননা তারা মনে করেন যুক্তি ‘ধর্মীয় অধিবিদ্যা থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলে এনলাইটেনমেন্ট তার নৈতিকতা ও বৈধতা হারিয়েছে।’১৮ তাদের এ মন্তব্য এনলাইটেনমেন্টের মিথ সম্পর্কিত প্রস্তাবনায় একটি স্ববিরোধী অবস্থান তৈরি করে।অন্যদিকে আধুনিক নৈতিকতার এধরণের সমালোচনা সর্বাত্মক সমালোচনার মতোই মানবমুক্তিকে জটিল করে তোলে।

 

 

তথ্যসূত্র

 ১)Michel  Foucault, Remarks  On Marx,Translated by R. James Goldstein and James Cascaito,Columbia University, New York(1991) p.117

২)Max Horkheimer and Theodor W. Adorno, Dialectic of Enlightenment Philosophical Fragment, Translated by Edmund Jephcott, 2002, Page xviii

৩)David Held,Introduction to Critical Theory : Horkheimer to Habermas, Polity Press,Oxford, UK, 2004,Page 14

৪) Ibid

৫)Max Horkheimer and Theodor W. Adorno,Ibid,p.68

৬)Ibid,p.36

৭)Ibid,p.42

৮)Ibid,p.71

৯)Ibid,p.65

১০)Ibid,p.50

১১)Ibid,p.95

১২)Ibid

১৩)Ibid,p.79

১৪)Edited by Maurizio Passerin d’Entrèves, Seyla Benhabib, Habermas and the Unfinished Project of Modernity: Critical Essays on The Philosophical Discourse of Modernity,1997,p. 53

১৫)Ibid,p.299

১৬)Ibid,p.106

১৭)Ibid,p108

১৮)Ibid,p.111

 

 

 

 

 

More Posts From this Author:

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top