বাংলাদেশে কপিরাইট: আইন ও সংস্কৃতি সংকট

Share this:

বাংলাদেশে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির স্বত্ব, উপস্বত্ব বা উত্তরাধিকার নিয়ে যতটা সুস্পষ্ট আইনগত সুরক্ষা এবং প্রবল জনসচেতনতা আছে মেধাস্বত্বের  ক্ষেত্রে রয়েছে ঠিক তার বিপরীত চিত্র- আইনি উদাসীনতা, সাধারণ উন্নাসিকতা এবং যুগের সাথে সামঞ্জস্যহীনতা।

নিজের মেধা খাটিয়ে কেউ কিছু তৈরি করলে বেশিরভাগ মানুষই যেমন কাউকে ওসবের মালিকানা দিতে রাজি নন, তেমনি মনে করেন ওইসব সৃষ্টি যে কেউ নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার বা পরিবর্তনের অধিকার রাখেন।

সৃজনশীল মানুষের সৃজনকর্মও ব্যক্তিগত সম্পদ, মেধাস্বত্বের  মালিকানা ও উত্তরাধিকার সুরক্ষার আইন ও নীতিগত অধিকার সংশ্লিষ্টদের রয়েছে, এর লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ; এ বিষয়গুলো সাধারণভাবে সবাই জানলেও আইন ও অধিকারের বিস্তৃত পরিধি, কারা কারা এর পক্ষ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে মেধাসম্পদের অধিকার লঙ্ঘিত হতে পারে তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়।

মেধাসম্পদের অধিকারীরাও অনেক সময় জানেন না তাঁদের অধিকারের ক্ষেত্রগুলো, ফলে বঞ্চিত হন নিজের আইনগত অধিকার থেকে। এছাড়া যতটুকুই আইন আছে, তার প্রয়োগের পরিমাণ যেমন কম তেমনি বিদ্যমান আইনগুলো বর্তমান যুগের থেকে অনেক পিছিয়ে।

এর ফলে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে যথার্থ সম্মানী না পেয়ে সৃজনকর্মের স্রষ্টা যেমন বঞ্চিত হন, তেমনি অবস্থা আরো জটিল হয়ে পড়ে সৃজনকর্মের স্রষ্টার মৃত্যুর পর। এক্ষেত্রে উপযুক্ত আইন ও আইনের প্রয়োগ না থাকায় উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা হাতিয়ে নেয় তৃতীয় পক্ষ।

কপিরাইট একটি সার্বজনীন বিষয়। বিভিন্ন দেশের আইনে কপিরাইটের সংজ্ঞায় সামান্য তারতম্য থাকলেও মূল প্রতিপাদ্য একই। মূলত কপিরাইট দ্বারা মেধাসম্পদের ওপর প্রণেতার নৈতিক ও আর্থিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

World International Property Organization(WIPO) এর নীতিমালায় মেধাস্বত্বের  অধিকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাহিত্য বা নাটকের রচয়িতা, সংগীতের সুরকার ও গীতিকার, ছবির ফটোগ্রাফার, শিল্পকর্মের সৃজনকারী, চলচ্চিত্রের প্রযোজক, কম্পিউটার মাধ্যমে সৃজনশীল কর্মের ক্ষেত্রে সৃজনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

এছাড়া সব ধরনের সৃজনকর্মের অনুবাদ ও অভিযোজন ছাড়াও ডিজিটাল বিশ্বের প্রায় সবকিছুই কপিরাইট আইনের আওতাভুক্ত। সম্প্রচারিত কর্মের ক্ষেত্রে সম্প্রচার সংস্থা, মুদ্রণ শিল্পে প্রকাশক, কোনো অনুষ্ঠানের অভিনয়শিল্পীসহ অন্যান্য কলাকুশলীরও সংযুক্ত কপিরাইট অধিকার স্বীকৃত।

ইতিহাসে কপিরাইট ধারণার সূচনা প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। ষষ্ঠ শতকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সন্ন্যাসী সেন্ট কলাম্বা (৫২১-৫৯৭) একবার তাঁর শিক্ষক যাজক ফিনিয়ানের লেখা একটি ধর্মসংগীতের বই ধার নিয়ে কপি করে নেন। ফিনিয়ান ওই কপির মালিকানা দাবি করলেও কলাম্বা তা মানতে রাজি ছিলেন না। অবশেষে বিষয়টি আইরিশ রাজা রিঙ্গ ডিরমেইডের দরবারে পৌঁছে। রাজা কলাম্বার বিপক্ষে রায় দিয়ে বলেন “গাভীর কাছে তার বাছুর যেমন, একজন লেখকের কাছে তাঁর বইও তেমনি।” ফলে বইটির যে কপি আপনি করেছেন “তার মালিক ফিনিয়ান।”

এই রায়টিই ইতিহাসে মেধাসম্পদের অধিকার বিষয়ক পৃথিবীর প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

পনের ও ষোলো শতকে ইউরোপে বই ও অন্য মৌলিক সৃজনকর্মের স্বত্বাধিকারী ও তার অধিকার নিশ্চিত করতে তৈরি হয় কপিরাইট আইন।

১৮৮৩ সালে প্যারিস কনভেনশনে সৃষ্টিশীল মানুষের আর্থিক ও নৈতিক অধিকার প্রাপ্তির বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। ওই সম্মেলনে উদ্ভাবনী মেধা সম্পদকে দুভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগে থাকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রপার্টি’, যার মধ্যে রয়েছে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনের মতো বিষয়। অন্যভাগ ‘কপিরাইট’ যার আওতায় রাখা হয় সাহিত্য ও শৈল্পিক কাজের পরিমণ্ডল। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৮৮টি দেশ এ কনভেনশনের অনুস্বাক্ষরকারী।

কপিরাইটের অধিকারকে একধাপ এগিয়ে নেয় ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগোর উদ্যোগে ১৮৮৬ সালে অনুষ্ঠিত বার্ন কনভেনশন। এই কনভেনশনে সৃজনলগ্ন থেকেই সৃজিতকর্মের কপিরাইট আপনা-আপনি সুরক্ষা পাবে এমন সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্তে অনুস্বাক্ষর করে ১৯৯০ সালে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে উনিশ শতকের মধ্যেই কপিরাইট আইন পাশ হয়, ভারতে পাশ হয় ১৯১৪ সালে।

বাংলাদেশ অঞ্চলে, ব্রিটিশ উপনিবেশ কালে ১৯২৬ সালে পূর্ববঙ্গে সীমিত মাত্রার কপিরাইট আইন প্রণয়ন করা হয়। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কপিরাইট আইন বলবত ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ওই আইন সংশোধন করে পাকিস্তান আমলের আঞ্চলিক পেটেন্ট রাইট অফিসকে ‘রেজিস্ট্রার অফ কপিরাইট’-এর কার্যালয়ে রূপান্তর করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানটি একটি আধা-বিচার বিভাগীয় দপ্তর। বর্তমানে বাংলাদেশে কপিরাইট আইন ২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত) কার্যকর রয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে সৃজনকর্মের স্রষ্টার মৃত্যুর ৫০ বছর পর্যন্ত কপিরাইট স্বত্ব বলবত থাকলেও বাংলাদেশের আইনে তা ৬০ বছর। অধিকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর সৃজনকর্ম জনসম্পত্তি হিসেবে গণ্য হলেও কেউ তার মৌলিকত্ব নষ্ট করতে পারবে না। অর্থাৎ কেউ চাইলেই অ্যারিস্টটল, প্লেটো বা সক্রেটিসের সৃজনকর্ম সম্পাদনা বা সংশোধন করে প্রকাশ করতে পারবে না। একটা পর্যায়ে সৃজনকর্ম থেকে স্রষ্টার আয় বন্ধ হয়ে গেলেও তাঁর স্বীকৃতি থেকে যায়—এটি তাঁর নৈতিক অধিকার।

বাংলাদেশে বিদ্যমান কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের শাস্তি ছয় মাস থেকে চার বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার থেকে দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।

 

বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশে কপিরাইট আইনে অনুমোদনবিহীন নকল বা পাইরেসি রোধ করার কথা থাকলেও নকল বা পাইরেসির কারণে দেশের সৃজনশীল কর্মের নাকাল দশা। ইতোমধ্যে চলচ্চিত্র ও সংগীতশিল্পী ধস এসেছে, প্রকাশনা শিল্পের অবস্থাও বেহাল।

চলচ্চিত্রের পাইরেসির ফলে দেশের প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সংগীতের ক্ষেত্রে নতুন অ্যালবাম রিলিজ হওয়ার গতিও মন্থর। গীতিকার থেকে শুরু করে শিল্পী কারো মেধাসম্পদ রক্ষিত হচ্ছে না। রি-মিক্সের নামে সংগীতের মূল সুর ও শিল্পীর সম্মান ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। ইউটিউবের মাধ্যমে গান সম্প্রচারে আইনের কোনো মান্যতা নেই। একই ধারা চলমান নাটক ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে।

২০০৭-২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রতিবছর কেবল সঙ্গীত অ্যালবাম রিলিজ হতো প্রায় পাঁচশ’টি এবং বিনিয়োগ হতো ৫ কোটি টাকার অধিক। নকল ও পাইরেসির দাপটে এখন এ খাতে বিনিয়োগ কোটি টাকার নিচে নেমে গেছে, অ্যালবামের সংখ্যা একশ’রও কম।

বাংলাদেশে মুদ্রিত বইয়ের সবচে বড়ো চোরাই বাজার নীলক্ষেত। বর্তমানে নীলক্ষেতের সমানতালে বই পাইরেসি হয় বগুড়া ও চট্টগ্রামে। পাইরেসি চক্র এতটাই বেপরোয়া যে বাংলা একাডেমির অভিধান থেকে শুরু করে জনপ্রিয় লেখকদের বই সবই তারা নকল করে।

ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপক হারে চলছে অনুমোদনহীন পিডিএফ ও ই-বুকের প্রচার। যা একটি বইয়ের বিক্রিকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে নিয়ে আসে।

পাশাপাশি আছে আইডিয়া চোর। কয়েক বছর ধরে তৈরি একজনের আইডিয়া কয়েক মিনিটের মধ্যেই চুরি হয়ে যায়। সেই আইডিয়া থেকে তৈরি হয় সিনেমা, নাটক, গান এমনকি বইও।

বাংলাদেশে আইন যতটুকু আছে তার প্রয়োগ যেমন খুবই কম তেমনি এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সচেতনতারও  অভাব রয়েছে। যেমন সংগীতে কন্ঠশিল্পীর সংযুক্ত অধিকার থাকলেও কার্যক্ষেত্রে এর চর্চা প্রায় নেই।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট বা স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপিত অ্যাকাউন্টসমূহ কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনযোগ্য হলেও এর চর্চা প্রায় নেই। ইউটিউবসহ ডিজিটাল মিডিয়ার অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে মালিকানা স্বত্বের প্রমাণ হিসেবে কপিরাইট সনদ প্রয়োজন হয়—কিন্তু এই সনদ খুব কম লোকই সংগ্রহ করেন।

কপিরাইট সনদ না থাকায় অনলাইন পাইরেসি বা অবৈধ প্রচার বন্ধে অনেকে নিজের মালিকানা প্রমাণ করতে পারেন না, ফলে কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পান না।

দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সৃজনশীল ব্যক্তিরা সৃজনকর্ম রক্ষণে মুখে মুখে সোচ্চার হলেও সাংগঠনিকভাবে তাঁদের এগোনোর প্রয়াস কম।

আইনে কপিরাইট সমিতির কথা বলা হলেও বাংলাদেশে যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে কপিরাইট সংরক্ষণে স্টেকহোল্ডারদের কোনো দৃশ্যমান সমিতি নেই।

কপিরাইট বিষয়ে মধ্যস্থতার জন্য সিঙ্গাপুরের কপিরাইট লাইসেন্সিং অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সোসাইটি বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এমনকি নাইজেরিয়ায় ‘দ্য রিপ্রোডাকশন রাইটস সোসাইটি অফ নাইজেরিয়া’র মতো কার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকলেও আমাদের দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃক লাইসেন্সকৃত লাইসেন্সিং অ্যান্ড কালেক্টিং সোসাইটি ফর সিনেমাটোগ্রাফ ফিল্ম (এলসিএসসিএফ) মেধাসম্পদ সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে বিভিন্ন স্থান, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান থেকে রয়েলিটি প্রাপ্তিতে সহায়তা করে।

এ জাতীয় আরো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে রয়েলিটি প্রাপ্তির বিষয়টি সহজসাধ্য হবে এবং বৈধ কনটেন্ট ব্যবহারের উপযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।

বর্তমানে কপিরাইট অফিসে জনবলেরও সংকট রয়েছে। প্রতিবেশী অনেক দেশেই অনলাইন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি চালু হলেও আমাদের দেশের কপিরাইটকে e-Copyright Application System-এর আওতায় এখনো আনা হয়নি।

 

প্রস্তাবিত আইন ও কিছু প্রস্তাবনা

দেশের বিদ্যমান কপিরাইট আইনটি ২০১৭ সালে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে।

মোটা দাগে প্রস্তাবিত আইনে ‘কপিরাইট’ এবং শিল্পকর্মের সহজ সংজ্ঞা, রিলেটেড রাইটস, পাবলিক ডোমেইন, সংকলক প্রভৃতি বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। বেশ কিছু ধারা-উপধারা আধুনিকায়ন ও সহজীকরণ হয়েছে। এছাড়া

কপিরাইট সমিতি গঠন করে এক্ষেত্রে অবদান রাখার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।

লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে মৌখিক, সাংগীতিক, শারীরিক কসরত ও মূর্ত, অভিব্যক্তিসমূহ, লোকভাষা, চিহ্ন, প্রতীক, লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় অভিব্যক্তি, নতুন কোনো মূর্ত বা বিমূর্ত অভিব্যক্তিও সংযোজন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে ডিজিটাল মিডিয়া থেকে অর্জিত আয়ে প্রণেতার অধিকার সংরক্ষণ ও যেকোনো অননুমোদিত সম্প্রচার বন্ধে কপিরাইট অফিসকে ক্ষমতায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কপিরাইট আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ছয় মাস থেকে তিন বছর শাস্তিকে এক বছর থেকে পাঁচ বছর, জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি, টাস্কফোর্স গঠন ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কপিরাইট লঙ্ঘনজনিত মামলা দায়রা জজ ছাড়াও দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে বিশেষ আদালত গ্রহণ করতে পারে বলে বিধান সংযোজন করা হয়েছে।

 

প্রস্তাবিত কপিরাইট আইনে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে:

  • গ্রন্থস্বত্বের ক্ষেত্রে ৬০ বছরের স্থলে ৫০ বছর নির্ধারণ। কারণ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে ৫০ বছর।
  • গ্রন্থস্বত্ব হস্তান্তরের বলবত সময়সীমা ১০ বছর থেকে বৃদ্ধি করে ২০ বছর করা। (বিষয়টা ব্যাখ্যা করা লাগবে)
  • ই-বুকের ক্ষেত্রে যেন কেবল বৈধ কনটেন্ট ব্যবহার হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান যুক্ত করতে হবে।
  • বিদেশ থেকে প্রকাশিত বহুল চাহিদাসম্পন্ন যেসব বই শিক্ষা কার্যক্রমে পাঠ্য বা সহপাঠ হিসেবে বিবেচিত, সরকারি উদ্যোগে সে সব বইয়ের লাইসেন্স নিয়ে স্বল্প মূল্যে রাইট শেয়ারের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পাইরেসির প্রবণতা হ্রাস পাবে।
  • নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্য পুস্তকে সীমিত আকারে কপিরাইট সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
  • কোনো সৃজনকর্মের বৈধ স্রষ্টা যদি ওয়েবসাইট ভিত্তিক কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ করে সে ক্ষেত্রে সম্প্রচার বন্ধে আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • সংগীত, নাটক সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কপিরাইট লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা না পর্যবেক্ষণ পূর্বক দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কপিরাইট অফিসের তত্ত্বাবধানে টিম থাকার ব্যবস্থা।
  • রেজিস্ট্রার অফ কপিরাইটকে আইনের প্রায়োগিক বাস্তবতায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা অর্পণ এবং বিচারিক আদালতের সাথে ট্রাইবুনালের বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়।
  • কপিরাইট নিবন্ধন সরলীকরণ এবং অনলাইন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্বয়ং নির্দেশিকার প্রক্রিয়া তৈরি করা।
  • ISBN নম্বর প্রাপ্তির কর্তৃপক্ষ হিসেবে কপিরাইট অফিসকে দায়িত্ব প্রদান এবং যথার্থ ISBN নম্বর ব্যবহারের নিশ্চয়তা বিধান করা।
  • রিলেটেড রাইটস-এর আওতায় প্রকাশককে অন্তর্ভুক্ত করা। কারণ গানের ক্ষেত্রে গীতিকার ও সুরকার দু’জনেই রয়েলিটির দাবিদার হলে পাণ্ডুলিপিতে প্রাণ সঞ্চার করে বই তৈরি করে প্রকাশক, অতএব তার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
  • বর্তমানে ট্রেডমার্ক অফিস শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন আর কপিরাইট অফিস সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের। দুটো প্রতিষ্ঠানের কাজের মধ্যে সমন্বয় ও যোগাযোগ জরুরি।
  • আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য কপিরাইট অফিসের আর্থিক ও কাঠামোগত সমৃদ্ধি প্রয়োজন। রেজিস্ট্রার অফ কপিরাইটের পদমর্যাদা, কার্যপরিধিরও ব্যাপ্তি প্রয়োজন।

 

আমাদের দেশে আইন তৈরি ও সংশোধনী একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। নতুন আইনটি ইতোমধ্যে দু বছর ধরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত হয়ে জনপ্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এই আইনে লোকজ্ঞান থেকে শুরু করে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম পর্যন্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত হলেও আইনটি পাশ হতে হতে যদি ৩/৪ বছরের বেশি লেগে যায় তাহলে আইনটি পাশ হওয়ার পর দেখা যাবে তা ওই সময়ের জন্য হয়তো যুগোপযোগী নয়।

জাপান ও তাইওয়ানে কিছুদিন পরপর কপিরাইট আইন সংশোধনী হয়, যাতে কপিরাইট অধিকার পরিপূর্ণভাবে রক্ষা করা যায়। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল বিশ্বের মেধাস্বত্ব রক্ষণের জন্য আইনের নিয়মিত ও দ্রুত নবায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

সহায়ক সূত্র :

  1. কপিরাইট আইন, ২০০০ (২০০৫-এ সংশোধিত)।
  2. প্রস্তাবিত খসড়া কপিরাইট (সংশোধিত) আইন, ২০১৭।
  3. বাংলাদেশের কপিরাইট আইন, গাজী শামছুর রহমান, বাংলা একাডেমি ঢাকা।
  4. কপিরাইটের নানা প্রসঙ্গ, মঞ্জুরুর রহমান, জার্নিম্যান বুকস, ২০১৫, ঢাকা।
  5. বইমেলা ও বই সংস্কৃতি, খান মাহবুব, জাগৃতি প্রকাশনী, ২০১৫, ঢাকা।
  6. গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর আয়োজিত সেমিনারের মূল প্রবন্ধ (বিষয়: বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা) খান মাহবুব, ২০১৫, ঢাকা।
  7. সাক্ষাৎকার : জাফর রাজা চৌধুরী, রেজিস্ট্রার অফ কপিরাইট।
  8. কপিরাইট অফিস ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা ও ব্রুশিয়ার।
  9. ভারতীয় কপিরাইট আইন।
  10. সাক্ষাৎকার : জনাব দানিউল ইসলাম, কাউন্সিলর WIPO, সুইজারল্যান্ড।
  11. প্রস্তাবিত কপিরাইট (সংশোধিত) আইন ২০১৭ বিষয়ে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মশালার প্রবন্ধ।
  12. প্রস্তাবিত কপিরাইট (সংশোধিত) আইন ২০১৭ চূড়ান্তকরণে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত।
  13. কপিরাইট বিষয়ক বিভিন্ন ওয়েবসাইট (www.wipo.int)।
  14. Access to Information (a2i) Programme-এর ১৪০৭ তাং ২৩ মে, ২০১৭-এর সুপারিশ পত্র।
  15. সাক্ষাৎকার : সৈয়দ নওরীন জাহান, পরীক্ষক, কপিরাইট অফিস।
  16. বই, গোলাম মঈন উদ্দিন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।
  17. প্রবন্ধ: আমাদের সৃজনশীল গ্রন্থ ও মেধাস্বত্ব, সরকার আবদুল মান্নান।
  18. প্রবন্ধ: সমকালীন বিশ্বে কপিরাইট আইন: সম্প্রচার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিকাশ, ব্যারিস্টার ওলোরা আফরিন।
  19. প্রবন্ধ: সংশোধিত কপিরাইট আইন: প্রকাশকদের প্রত্যাশা: প্রবন্ধকার খান মাহবুব। তারিখ: ২৭ জুলাই ২০১৯ আয়োজনে।
  20. বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস ও বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি।
  21. গাজী শামছুর রহমান, বাংলাদেশের কপিরাইট আইন, বাংলা একাডেমি,ঢাকা।
  22. শিল্পী থেকে শ্রোতা, কপিরাইট অফিস পুস্তিকা, ঢাকা।

 

 

 

 

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top