বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও জনগণের বিরুদ্ধে অনন্ত ‘যুদ্ধ’ | সহুল আহমদ ও সারোয়ার তুষার

0

সারা দুনিয়া যেখানে করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, করোনার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করছে, সেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সরকার যেন তার জনগণের বিরুদ্ধেই অঘোষিত এক ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। দুই উপায়ে এই ‘যুদ্ধের’ বাস্তবতা উৎপাদন করা হচ্ছে। একদিকে, নজিরবিহীন বিপদজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তহীনতার মাধ্যমে জনগণের একটা বড়ো অংশের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে যারা এমনতর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিচ্ছেন রাষ্ট্র বিভিন্ন আইনী মারপ্যাঁচের মাধ্যমে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা শুরু করেছে। তাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া-দীর্ঘদিন ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গ্রেফতার দেখানো-মামলা দায়ের করা সহ নানাবিধ হয়রানি ও নিপীড়ন করা হচ্ছে।

 

গত ৫ মে ইফতারের আগেই বাড্ডা থেকে র‍্যাব পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ দিদারুল ভূঁইয়াকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। দিদারুলের স্ত্রী জানান, ‘ইফতারের কিছুক্ষণ আগে দুইটা মাইক্রো নিয়ে ১১-১২ জন লোক আসে বাসায়। তারা র্যা ব পরিচয় দেয়। আমাদের কোনো কিছু বলতে না দিয়ে ইফতারের ঠিক দুই মিনিট আগে তারা দিদারকে তুলে নিয়ে যায়।’ এসময় তারা দিদারের দুটো সিপিউ, ল্যাপটপ, ওনার ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়ে যায়; তার স্ত্রীকে বলা হয়, কিছু কথাবার্তা বলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।

 

মিডিয়ার তরফ থেকে র‍্যাবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে, এই নামে কাউকে তারা তুলে আনেন নি, এমন কোনো অভিযানও তারা চালান নি। পরিবার ও স্বজনদের তরফ থেকে র‍্যাবের অফিসে যোগাযোগ করা হলেও তারা অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণ পর মিডিয়ার মারফতে জানতে পারি লেখক মোশতাক আহমদকেও একই কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন (৬ মার্চ) সকালে দিদারুলকে থানায় হস্তান্তরের একটা সংবাদ পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে থানা থেকে সেটা অস্বীকার করা হয়।। দেখা যায়, মোশতাক আহমেদের সাথে কার্টুনিস্ট কিশোর আহমেদকেও গ্রেফতার করা হয়েছে একই অভিযোগে।

 

দিদারুলের পরিচিতজন রমনা থানায় গেলে জানানো হয়ে যে, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে র‌্যাব-৩ সাংবাদিক, কার্টুনিস্ট, এক্টিভিস্টসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রমনা থানায় মামলা করেছে। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে, কার্টুনিস্ট আহম্মেদ কবির কিশোর, ব্যবসায়ী মোস্তাক আহম্মেদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য মো দিদারুল ইসলাম ভূঁইয়া, মিনহাজ মান্নান, প্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিল ও সাহেদ আলম, সায়ের জুলকারনাইন, আশিক ইমরান, ফিলিপ শুমাখার, স্বপন ওয়াহিদ, ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনকে। কিন্তু দিদারুলকে তখনো রমনা থানায় হস্তান্তর করা হয়নি, র‍্যাব-৩ থেকেও দিদারুল কোন কাস্টোডি স্বীকার করা হয়নি। দিদারুল কোথায় আছেন জানতে চাইলে ইনভেস্টিগেশন অফিসার বলেন, দিদারুল ভূঁইয়াকে রমনা থানায় না পাওয়া গেলে আমরা তাকে ‘পলাতক’ ধরে নিব। অবশেষে, সন্ধ্যায় দিদারুলকে রমনা থানায় হস্তান্তর করার সংবাদ পাওয়া যায়, কিন্তু জানানো হয়, দিদারুল সহ চারজনকে নাকি ‘সকালে’ই থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাছে তার নাগরিকদের জীবন কতটা উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে তার একটা নজির হিসেবে দিদারুলের ঘটনাকে তুলে ধরা হলো। দিদারুল কি করেছেন তার চেয়ে জরুরি বিষয় হলো তার সাথে ঘটে যাওয়া এই পুরো ঘটনা বা প্রক্রিয়াটা। রাষ্ট্রীয় বাহিনী যে কোনো সময় যেকোনো ধরণের পরোয়ানা বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় যে কাউকে তুলে নিয়ে যেতে পারে, এবং বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে থানায় হাজির করার আগ পর্যন্ত (দিদারের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ ঘন্টা, সাংবাদিক কাজলের ক্ষেত্রে ৫৪ দিন!) একটা বড়সড় সময় একজন নাগরিককে স্রেফ ‘উধাও’ করে দিতে পারে। দিদারের ভাগ্য ‘সুপ্রসন্ন’ হওয়ায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে তিনি আবার ‘আসামী’ হিশেবে জনসম্মুখে হাজির হতে পেরেছেন, কিন্তু সাংবাদিক কাজলসহ অনেকের উদাহরণ আমাদের সামনে জ্যন্ত রয়েছে যারা আরো অনেক লম্বা সময় ‘উধাও’ ছিলেন, অনেকেই এখনো ‘উধাও’ আছেন। পাঠক লক্ষ্য করুন, র‍্যাব তথা আলোচ্য মামালার ‘বাদী’ কয়েকজন নাগরিককে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করা হলো, তারপর প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার পরে থানায় হস্তান্তর করার পর আটকের কথা স্বীকার করা হলো, অথচ মামলার এজহারে ঊল্লেখ আছে আটকের দিন অর্থাৎ ৫ মে রাত ১১ টায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নগুলো হাজির হয়, আটকের দিনই যদি মামলা করা হবে তাহলে আটকের পরেরদিন পর্যন্ত কাস্টোডি অস্বীকার করা হলো কেন? খোদ মামলার ‘বাদী’ কেবলমাত্র রাষ্ট্রের একটি বাহিনী হওয়ার এখতিয়ারেই কি অভিযুক্তকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? মামলা দায়ের করার সাথে সাথেই কি কেউ ‘আসামী’(এজহারে ঠিক এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে) হয়ে যায়? তাহলে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরুই হয় কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে কাস্টডি অস্বীকার করার মাধ্যমে এবং অভিযুক্তকে ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে, সেই আইনি প্রক্রিয়ার আদৌ কি কোন নৈতিক ভিত্তি আছে? সেই আইনি প্রক্রিয়া ন্যায়বিচার তো দূরে থাক, এমনকি প্রতিশ্রুত ‘স্বচ্ছ’ বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতেও কি সক্ষম? এখানে এটাও উল্লেখ করা জরুরি যে, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত কাউকে সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন এবং আটকের ৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই আটকের কারণ জানাতে বলেছেন। তাহলে খোদ রাষ্ট্রপক্ষ যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে আদালত অবমাননার মাধ্যমে, সেই রাষ্ট্রপক্ষই কোন এখতিয়ারে কারো বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্র’ এর অভিযোগ তুলতে পারে? অন্যত্র আমরা দেখিয়েছি, নির্বাহী ক্ষমতার দ্বারা এই আদালত ‘অবমাননা’র উৎস আসলে একব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো।

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে ছাত্রলীগ নেতার করা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নৃবিজ্ঞানী বখতিয়ার আহমেদ ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে  ফেসবুকে লিখেছিলেন: ‘গ্রেফতার বিচার ব্যবস্থার খুব আপৎকালিন প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল। কোনো অভিযুক্ত যখন মুক্ত অবস্থায় ভিকটিমের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিত হুমকি হতে পারেন, কোনোভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করতে পারেন, কিম্বা বিচার এড়ানোর জন্য পালিয়ে যেতে পারেন, সেক্ষেত্রেই কেবলমাত্র আদালতে মামলা হওয়া কাউকে বিচার চলাকালিন সময়ে গ্রেফতার করে কারাগারে রাখবার কথা। এসব কারণ ছাড়াই মামলা হওয়া মাত্রই কাউকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালে বিচার নিজেই শাস্তি হয়ে যায়, কাউকে শায়েস্তা করবার ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কারণ বিচারে শেষমেষ নির্দোষ প্রমাণ হলে তার কারাগারে যাওয়ার ভোগান্তি কিম্বা ক্ষয়ক্ষতির দায় আমাদের বিচার ব্যবস্থা নেয় না।’

 

বছর দুয়েক আগে ভারতের পাঁচজন অ্যাক্টিভিস্টকে গ্রেফতারের প্রেক্ষাপটে রোমিলা থাপার সহ পাঁচজন বিশিষ্ট নাগরিক একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন; যার শুরুর কথাটাই ছিল: ‘arrest should be the last step of an investigation, not the starting point for one…’

 

দিদার, কিশোর এবং অন্যান্যদের বেলায় আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে একেবারে বিপরীত। রাষ্ট্র এখানে প্রক্রিয়া শুরু করেছে এমনকি ‘গ্রেফাতার’ এর মাধযমেও নয়, বরং ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে, এবং রাষ্ট্রীয় খোলা ময়দান থেকে কিছু সময়ের জন্য ‘উধাও’ করে দিয়ে। করোনার এই মহাবিপর্যয়ের সময় যখন আগে থেকেই আটক থাকা বিভিন্ন মামলার আসামীদের জামিনে কিংবা স্থায়ী মুক্তি দেয়া হচ্ছে, সেখানে কেবলমাত্র মত প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনার মত যৌক্তিক কাজকে ‘অপরাধ’ সাব্যস্ত করে লেখক-সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট-কার্টুনিস্টদের মামলা দায়ের করার শুরুতেই ‘আসামী’ সাব্যস্ত করে কারাগারে প্রেরণে করা হয়েছে। এহেন চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও জিঘাংসা সম্পর্কে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)এর এশিয়া পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস যথার্থই বলেছেন:

‘কেবল একটি অনিরাপদ ও স্বৈরাচারী সরকার কার্টুনিস্ট, সাংবাদিক এবং নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের জন্য মহামারিকে ব্যবহার করে। কেবল ব্যাঙ্গো-বিদ্রূপ পোস্ট করার কারণে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন মামলা দায়ের না করে বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনাগুলো গ্রহণ করা উচিত এবং কোভিড -১৯-এর বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়াতে যেকোনো ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করা উচিত।’

 

দিদারুল বা কিশোরদের কোন কাজের জন্য তুলে নেয়া হয়েছে বা গ্রেফতার করা হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। তারা সকলেই যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের মত প্রকাশ করে যাচ্ছিলেন; ভেড়ার পালের মত রাষ্ট্র বা সরকারকে অনুসরণ না করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সমূহের সাথে নিজেদেরকে ক্রিটিক্যালি অ্যাংগেজ করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। দিদারুল ফেসবুকে একটিভিজম করতেন, কিশোর কার্টুন আঁকতেন। কিন্তু নাগরিক হিসেবে এই ‘স্বাভাবিক’ কাজগুলোকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে যে ভাষায় চিহ্নিত করা হলো, সেটাই রাষ্ট্রের সাথে এখানকার নাগরিকের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে তোলে। কোনো সন্দেহ নেই সেই সম্পর্ক ঔপনিবেশিক।

 

একেবারে মূলধারায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্র উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতির জনক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মহামারী সম্পর্কে গুজব’, ‘রাষ্ট্র/সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অভিপ্রায়ে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তি ছড়ানো’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থানীয় এমপির সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় ‘মানহানি হয়েছে’ অভিযোগ তুলে সুনামগঞ্জের একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে। ‘সবুজ ধান’ কাটার ভিডিও শেয়ার করার কারণে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে, অভিযোগ ‘সরকার বিরোধী প্রচারণা’ এবং ‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়’। কিছুদিন পূর্বে সাংবাদিক তাসনীম খলিলের বাসায় গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা হুমকি দিয়ে এসেছেন, তিনি নাকি বিদেশে বসে রাষ্ট্রের ‘ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করছেন। মার্চের মাঝামাঝি থেকে মহামারী নিয়ে বিবিধ লেখালেখির কারণে কমপক্ষে ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগের মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে। ১০ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কমপক্ষে তিনটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা দায়ের করা হয়েছে; গত এক সপ্তাহে ৮ জন সাংবাদিককে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয়েছে। মহামারী নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখার কারণে তিনজন সরকারি কলেজের শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে, বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে করোনা সংক্রান্ত গবেষণা করবার কারণে তদন্ত চলছে।

 

অর্থ্যাৎ, দেখা যাচ্ছে দিদারুল, কিশোরদের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়, করোনা সংক্রান্ত আলাপ আলোচনার শুরু হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র/ সরকার ভাবের ‘মূর্তি’ উদ্ধার করার চেষ্টা নিয়োজিত আছেন। মহামারীর সঙ্কট মোকাবিলা করার চেয়ে তাদের মূল নজর হচ্ছে অন্যকিছু মোকাবিলা করা: এখানে যে সঙ্কট আছে এবং ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে সেই সত্য বচন কেউ উচ্চারণ করতে না পারে সেইজন্য নাগরিকের মুখে তালা মারা। সহিংস সার্বভৌম ক্ষমতার সম্মুখে নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকারহীন শুদ্ধ ‘বেয়ার লাইফ’ তথা বধযোগ্য প্রাণ হিশেবে উন্মোচন করা। ফলে আমরা মোটেও অবাক হই না যখন দেখি, বাংলাদেশে প্রথম যেদিন করোনাভাইরাসে রোগী শনাক্ত হয়, ৮ মার্চ ২০২০, ঠিক সেই দিনই নিপীড়নমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর আইনবলে বাংলাদেশ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালা-২০২০ জারি করে। শুরু হয় ব্যক্তি ও সমাজকে স্থায়ী ‘কোয়ারেন্টাইন’ করার নয়া বাস্তবতা।

 

সরকারী বয়ানে একটা বিষয় সুস্পষ্ট যে, রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে বর্তমানে আসলে কোনো ফারাক নেই, তিনে মিলে একাকার। এবং, একের ভাবমূর্তি তাই অন্যেরও ভাবমূর্তি, একের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া মানে অন্যেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া। এসবের যুগপৎ সম্মিলন ঘটেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেলায়। অন্যত্র আমরা ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন ও রাষ্ট্রের সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্যে সম্পর্ক দেখিয়েছি।

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘নিরাপত্তা’ আসলে কার নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে? যে কেউই এই আইনে চোখ বুলালে টের পাবেন এই আইন মূলত সরকার, রাষ্ট্র আর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ফারাক ঘুচিয়ে এই তিনটি পৃথক সত্তাকে একক সত্তায় পরিণত করেছে। যেকোনো একটির যৌক্তিক সমালোচনা করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ নেমে আসতে পারে।

 

এই আইনে ব্যবহৃত ‘রাষ্ট্রের সুনাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, ‘ধর্মীয় অনুভূতি’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা’, ‘মিথ্যা ও অশ্লীল’ ইত্যাদি শব্দবন্ধকে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এই আইনের বাস্তবিক প্রয়োগ আমাদের এটাই ভাবতে বাধ্য করছে যে, এসব শব্দবন্ধ অস্পষ্ট রাখাই এই আইনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সরকারের সমালোচনা করলেই এই শব্দবন্ধসমূহের অস্পষ্টতাকে পুঁজি করে ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে গণ্য করে এই আইন প্রয়োগ করা হতে পারে। ফলে, এ আইন আসলে শুদ্ধ নিপীড়নমূলক ক্ষমতার উপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ‘নিরাপত্তা’র স্বার্থেই প্রণীত।

 

আইনের ‘ডিজিটাল’ শব্দকে আধুনিক বলে মনে হলেও, সত্য হচ্ছে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্টস’ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্র তার ঔপনিবেশিক চরিত্রই উন্মোচন করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এ অঞ্চলের মানুষকে প্রজা জ্ঞান করতো, তাই তাদের যাবতীয় লুটপাট-দুর্নীতিকে নিরঙ্কুশ, জবাবদিহির ঊর্ধে নেয়ার স্বার্থে তারা দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন’ প্রণয়ন করেছিল। আমাদের রাষ্ট্র ও তার কলকব্জাগুলো যে ঔপনিবেশিক এবং সে যে ক্রমাগত আরো বেশি ঔপনিবেশি্ক হয়ে উঠতে চায় (কারণ, এতেই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ফায়দা) তার চরমতম নমুনা হচ্ছে ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইন।

 

এই যে দিদারুলদের ‘সন্ত্রাসী’ কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হলো, আমাদের কাছে এটা ‘অন্যায়’ বলে মনে হলেও ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের বরাতে এই তুলে নিয়ে যাওয়া ‘আইনত’ সঠিক। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যদি মনে হয় তার ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ বা ‘মান-সম্মান’ হুমকির সম্মুখীন তাহলে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে। অর্থাৎ, দিদারুলদেরকে এইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার যাবতীয় রাস্তা এখানে করে দেয়া আছে। ফলে, কোনো ধরণের তত্ত্বের মধ্যে না গিয়েই, একেবারে বাস্তবিক নজির আমাদেরকে দেখাচ্ছে যে, যাবতীয় ভিন্নমতকে ক্রিমিনালাইজ ও অসম্ভব করে তোলাই এই আইনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সকল নাগরিকের চিন্তার উপর আইনীয় সেন্সরশিপ হাজির করার মাধ্যমে একটা ভিন্নমতহীন ‘জ্বী হুজুর’ ধরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার নিয়ামক এই আইন। এই আইন এক অন্তহীন ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি করে। রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার তাত্ত্বিকদের তত্ত্বের এমন বাস্তব রূপে হাজির হওয়ার নজির বোধহয় খুব অল্পই আছে।

 

দিদারুল, কিশোর, মুশতাক আহমেদ, তাসনীম খলিলসহ এই মামলার শিকার আরো অসংখ্য ব্যক্তির সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা হতে পারতো বাক স্বাধীনতা বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে। কিন্তু, যে ভূখণ্ডের মানুষ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষায় এতো রক্ত ঝরালো, এতো লড়াই-সংগ্রাম করলো, তার কাছে গণতন্ত্রের জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরার কিছু নেই। বরঞ্চ, এটা উন্মোচন করা দরকার যে, এতো কাঙ্ক্ষিত একটা রাষ্ট্রে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কীভাবে ও কোন ধরণের আইনি-প্রক্রিয়ায় ব্যহত হচ্ছে, কেনো এখানে গণতান্ত্রিক কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারছে না।

 

উপরোক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘গুজব’ প্রচারের কথা বলা হচ্ছে; উপরোক্ত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ‘গুজব’ বা ‘মিথ্যা’ কি না সেটা প্রায় সকলেই জানেন। এও জানেন যে, ‘গুজব’ রেটরিক বর্তমান রেজিমের নিপীড়নের নয়া হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সরকার বিরোধী যেকোন বক্তব্য-বিশ্লেষণকে ‘গুজব’ বলে সাব্যস্ত করা হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো গণবিরোধী, নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা প্রথমত এবং প্রধানত ‘সত্য’ , ‘মিথ্যা’ , ‘গুজব’ এর এক একচেটিয়া বাস্তবতা উৎপাদন করে; যেখানে সরকারি বয়ান মাত্রই ‘সত্য’, সরকারবিরোধী যে কোন বয়ানই ‘মিথ্যা’। এরকম স্বৈর-বাস্তবতায় ‘গুজব’ তথা অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস হয়ে ওঠে সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের একমাত্র হাতিয়ার। ‘গুজব’ এর জয় হোক!

 

স্পষ্ট করে বলা দরকার, পদ্ধতিগত ‘গুজব’ তৈরির কারখানা আসলে খোদ রাষ্ট্রই; রাষ্ট্র যখন অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত না করবে কিংবা নিজদের অনুকূল একপেশে, জবাবদিহিতাহীন তথ্যের বাস্তবতা তৈরি করবে এবং জনগণ যখন তথ্যের অভাব বোধ করবে, কেবল তখনই ‘গুজবে’র উর্বর জমিন তৈরি হয়। করোনার শুরুতেই বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া মনিটরিং কমিটি বিষয়ক আলাপ-আলোচনা আমাদের মনে আছে। বিশেষ করে, রাজনীতিবিদরা সত্য গোপন করছেন এই সন্দেহের চেয়ে বেশি আর কোনো কিছুই গুজব ও ভয়ে ইন্ধন জোগায় না। ভয় ও আতঙ্ক গুজবের পালে হাওয়া দেয়। একদিকে করোনার মতো এমন মহামারী সময়ে জীবন ও জীবিকা নিয়ে আতঙ্ক ও ভয়, অন্যদিকে কর্তব্যক্তিদের পক্ষ থেকে লাগামহীন মিথ্যার ফুলঝুরি- উভয়ে মিলে গুজবের জমিন তৈরি করছে। কিন্তু, মুশকিল হলো, যারা রাষ্ট্রের এই ‘গুজব’ তৈরির প্রক্রিয়ার সমালোচনা করছিলেন, রাষ্ট্রের চোখে তারাই ‘গুজব’ সৃষ্টিকারী বলে চিহ্নিত হন। এমনকি কেউ ‘গুজব’ ছড়ালে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা, কেউ ‘কটূক্তি’ করলে, ‘সঠিক’ উক্তি হাজির করা সরকারের দায়িত্ব (তা নাহলে আর সমস্ত কিছুর উপর ‘বৈধতা’ আরোপের ভিত্তিটাই বা কী?); মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতার সীমাকে আমরা এতদূর পর্যন্ত বুঝি।

সরকারের সমালোচনা করা যাবে না কেন? রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না কেন? সমাজে কি ভিন্নমত থাকবে না? মত প্রকাশের স্বাধীনতা কি থাকবে না? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এমন মৌলিক বোঝপড়াগুলোকেও ‘আইনি’ প্রক্রিয়ায় রদ করা হচ্ছে। ফলে, আমাদের চোখের সামনেই আমরা ফ্যাসিবাদী ও একচেটিয়াতন্ত্রের উলঙ্গ আস্ফালন দেখতে পাচ্ছি।

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে যে অঘোষিত ‘স্বাভাবিক জরুরি অবস্থা’ জারি আছে, করোনাকালে সেটার নগ্নরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। ফলে, এখানে রাষ্ট্রের কাছে করোনা মোকাবিলার করার চেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ভিন্নমতাবলম্বী বা সমালোচকদেরকে মোকাবিলা করা, অন্য অর্থে খোদ জনগণের বিরুদ্ধে অন্তহীন এক ‘যুদ্ধে’ লিপ্ত হওয়া; ব্যক্তি ও সমাজকে রাষ্ট্রের উপনিবেশে পরিণত করা। মজলুম জনতার এত রক্ত, এত ‘দাম’ দিয়ে ‘কেনা’ এই বাংলা আজ এ কোন লেবিয়াথানের খপ্পরে? এ কোন মহাদানবীয় ‘রাষ্ট্রসোরাস’ আজ আমাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে?

 

ডিজিটাল ‘নিরাপত্তা’ আইনের মত কুখ্যাত নিবর্তনমূলক আইনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সক্রিয়তার যেমন কোন বিকল্প নাই, ঠিক তেমনি বিকল্প নাই এহেন স্বৈরাচারী আইন প্রনয়ণ করতে পারার মত একব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণক্ষমতাতন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপনের, যে গণক্ষমতাতন্ত্র হবে: ‘রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রাণহীন যন্ত্রপাতিওয়ালা বর্তমান রাষ্ট্র-সংগঠনের জায়গায় স্বাধীন মানব-সম্প্রদায়সমূহের একটা সঙ্ঘ’; গঠনের দিকে থেকে হায়ারার্কিমুক্ত, আনুভুমিক ও ফেডারেটিভ। আর তা কেবল সম্ভব, ‘যাবতীয় অর্থনৈতিক একচেটিয়া এবং সমাজের মধ্যকার যাবতীয় জবরদস্তিমূলক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবলুপ্তির মাধ্যমে।’

 

সর্বাত্মক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সত্য বলার দায়ে দিদারুল, কিশোররা দণ্ডিত। কিন্তু আমরা তো জানি: In a time of universal deceit, telling the truth is a revolutionary act…

 

 

 

Sohul Ahmed, activist and author. Topics of interest are politics, history, liberation war and genocide. Published Books: Muktijuddhe Dhormer Opobabohar (2017), Somoyer Bebyocched (2019), and Zahir Raihan: Muktijuddho O Rajnoitik Vabna (2020)

 

Sarwar Tusher is an author and activist. Interested in studying the state, power, authority, sovereignty, violence , social relations. Co-authored the book Somoyer Beyobacched(2019) . writes on a regular basis in various blogs and journals. Active member & organiser of Rashtrochinta.

 

 

 

 

 

Share.

Leave A Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate »