অভিমত | বাকস্বাধীনতা, মানবীয় কর্তাসত্তা এবং বাংলাদেশের সংবিধান | সারোয়ার তুষার

0

বাংলাদেশ এক নজিরবিহীন কঠিন সময় পার করছে। সরকারের বিপদজনক সিদ্ধান্ত এবং পদ্ধতিগত সিদ্ধান্তহীনতার ফলে বাংলাদেশের মানুষ আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। তাদের জীবন-জীবিকা-মর্যাদা এক প্রচন্ড শ্বাসরোধী শাসনপ্রণালীর কাছে জিম্মি হয়ে আছে। প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় অক্সিজেন-আইসিইউ-টেস্টিং এর জন্য হাহাকার দেখতে পাচ্ছি আমরা। হাসপাতালের সামনে আক্রান্ত মানুষের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকার ছবি ভাইরাল হতে দেখছি আমরা। অন্যদিকে মানুষকে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুরক্ষা দিতে ব্যর্থ রাষ্ট্রের অন্য চেহারাও দেখছি। সেই চেহারা অত্যন্ত বীভৎস। করোনা মহামারি সংক্রমণের পর থেকে মানুষকে স্বাস্থ্য-জীবিকা সহ নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রতি সঙ্গত ক্ষোভ জানাতে গিয়ে নানামুখী নিপীড়ন আর রোষানলের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের উপর চালানো হচ্ছে মামলা গ্রেফতার এমনকি গুমের মতো  স্টিমরোলার। সরকারের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এবং তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ফেসবুকে সরকার সমালোচনাকে ‘অপরাধ’ হিশেবে সাব্যস্ত করে ইতোমধ্যেই মামলা ও গ্রেফতারের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। লেখক-কার্টুনিস্ট-শিল্পী-শিক্ষক-শিক্ষার্থী-রাজনৈতিক কর্মী-সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট কেউই বাদ যাচ্ছে না এই তালিকা থেকে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ব্যবহার করা হচ্ছে যাবতীয় ভিন্নমত, সমালোচনাকে স্তব্ধ করার হাতিয়ার হিশেবে।

 

অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ আজকে জৈবিক এবং রাজনৈতিক দুই অর্থেই শ্বাস নিতে পারছে না। এক প্রচণ্ড সহিংস সার্বভৌম ক্ষমতার নিপীড়নের সম্মুখে নজিরবিহীনভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের জীবন। আবার এই নিপীড়নকে বৈধতা দেয়ার সমস্ত মতাদর্শিক হাতিয়ারও আগের তুলনায় বেশি সক্রিয়। সরকার সমালোচকদের ‘পশু’র সাথে তুলনা করার নজিরও দেখা যাচ্ছে।

 

এমতাবস্থায় , বাক স্বাধীনতার প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই জনপরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতার বর্তমান অবস্থা কী? বাকস্বাধীনতা কেন ও কীভাবে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নের সাথে জড়িয়ে থাকে? বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া কেন আমরা বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক সংকটকেই আর মোকাবেলা করতে পারব না? এই প্রশ্নগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে এই ভূখণ্ডের মানুষের যাবতীয় অন্টলজিকাল সম্পর্ক।

 

 

বাকস্বাধীনতা এবং মানবীয় কর্তাসত্তা

প্রথমত যেটা বলা দরকার, বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে ন্যূনতম কোন ছাড় দেয়া সম্ভব নয়। কারণ বাকস্বাধীনতা কেবল কথা বলার স্বাধীনতা নয়। বাকস্বাধীনতা মানুষের মানবীয় অস্তিত্বের সাথে বিজড়িত ব্যাপার। আর বাকস্বাধীনতা হচ্ছে সেই জিনিস যা মানুষকে তার জৈবিক অস্তিত্বের ঊর্ধে নিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক প্রাণীতে পরিণত করেছে। অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা তথা ভাষার স্বাধীনতা মানুষের খোদ অস্তিত্বের সাথে জড়িয়ে আছে। এটা ছাড়া মানুষ আজকে প্রজাতি হিশেবে বিকাশের যে স্তরে আছে সেই স্তরে তাকে কল্পনা করা যায় না। ভাষা এবং কল্পনার সাথে সৃজনশীলতা আর  শারীরিক শ্রম যুক্ত হয়েই মানুষের সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং মানুষের যাবতীয় কল্পনাপ্রতিভা , সৃজনশীলতা সম্ভব হয়ে ওঠে ভাষার কারণে। ভাষা নাই মানে মানুষের জৈবিক স্তর থেকে উত্তরণ নাই , মানুষের সৃজনশীলতা , কারিগরি ক্ষমতাও নাই। সুতরাং বাকস্বাধীনতা এতটাই ইনহেরেন্ট অস্তিত্ব মানুষের। এটা কোন ‘উদার’ রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে ‘দেয়’ না ; বরং মানুষই নানাবিধ সামাজিক চুক্তি, আইন-শাসনতন্ত্র বানায় এই ইনহেরেন্ট বাকস্বাধীনতাকে ফ্যাসিলিটেট করার জন্য।

 

এই কথাগুলো বলার দরকার হলো কারণ অনেকের ধারণা বাকস্বাধীনতা ‘উদার’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার উপজাত। অবশ্যই বাকস্বাধীনতাহীন কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলার কোন সুযোগ নেই, কিন্তু বাকস্বাধীনতাকে কেবল রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে জড়িয়ে ভাবার মুশকিল হলো, যা (ভাষা) মানুষের মানবীয়তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা অন্যের, কোন ‘বৈধ’ কর্তৃপক্ষের বদান্যতা, উদারতার বিষয়ে পরিণত হয়। কোন ‘বৈধ’ অথরিটি যদি যথেষ্ট উদার হয়, তাহলে আমাদের কথা বলার অধিকার থাকবে, আর যদি অথরিটি কর্তৃত্বপরায়ণ হয় তাহলে আমাদের বাকস্বাধীনতা সে ‘হরণ’ করবে। গভীর ভাবে ভাবলে এটা স্পষ্ট হয়, এই ধরনের যুক্তিতর্কের মধ্যেই মানুষের সহজাত বাকস্বাধীনতা হরণের বীজ নিহিত থাকে। এক্ষেত্রে হরণকৃত বাকস্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার আকুতি, দেনদরবার জানাতে হয়। যা আমার মানবীয় সত্তার নিঃশর্ত উপাদান, তাকে প্রথমত রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার বিষয়ে পরিণত করে, সেই জিনিস খোয়ানোর পরে ফিরে পাওয়ার আবেদন জানাতে হয়। কোন সন্দেহ নেই এতে করে মানুষের কর্তাসত্তাও রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন হয়ে পড়ে।

 

এই তাত্ত্বিক পাটাতনের উপর দাঁড়িয়েই আমরা বাকস্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষের যাবতীয় ডিসকোর্সকে মোকাবেলা করতে চাই। এই কারণেই বাকস্বাধীনতা এবং মোটের উপর মানুষের মানবীয় সত্তা সম্পর্কিত কমনসেন্স বদলানো অত্যন্ত জরুরি। আমরা যদি আজকে থেকে বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, যা কিছু মানুষের মানবীয়তার অংশ, তা কোন পরিস্থিতিতেই এমনকি কোন ‘বৈধ’ কর্তৃপক্ষও হরণ কর‍তে পারে না, তাহলে কিন্তু মানুষ হিশেবে আমাদের মৌলিক অধিকারসমূহও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে না।

 

মানবীয়তা হলো মানুষের সেই জিনিস যা যেকোন প্রকারের রাজনৈতিক সংকটের শর্তাতীত। মানবীয়তা প্রাণী হিশেবে মানুষের বিকাশের সেই উত্তরণ যা কোন তথাকথিত ‘মহান’ রাজনৈতিক শাসনকে নিরঙ্কুশ করার স্বার্থে কম্প্রোমাইজ করা যায় না।

 

বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মানুষের মানবীয়তার সাথে সম্পর্কিত করে বোঝার কমনসেন্স তৈরি করতে হবে। তাহলে আমরা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকে এই চ্যালেঞ্জ করতে পারবো যে কথা বলার অধিকারের জন্য আমরা রাজনীতির উপর নির্ভরশীল না। কথা বলা আমাদের মানবীয়তার অংশ। বাংলাদেশের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্মরণে রেখে কথাগুলোর তাৎপর্য অনুধাবন করা খুবই জরুরি।

 

 

বাকস্বাধীনতা এবং সংবিধান

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে বাকস্বাধীনতা দিতে পারে না। বরং আধুনিক রাষ্ট্রনৈতিক পরিসরে আইন-শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যই থাকে যেন তা নিঃশর্ত বাক স্বাধীনতাকে কন্টেইন করতে পারে। এই পর্যায়ে এসে আমরা বাংলাদেশের সংবিধানের বাক স্বাধীনতা সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট ধারাটি পরখ করব। এটা জরুরি এই কারণে যে , ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আজকে যখন চিন্তা , বিবেক , বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার কুখ্যাতি অর্জন করেছে এবং ভিন্নমতাবলম্বী সমস্ত মহলের তরফ থেকে এই আইনকে তীব্রভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে, তখনও অনেকেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধীতা করতে গিয়ে বলছেন, এই আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, এই আইন সংবিধান প্রদত্ত বাকস্বাধীনতাকে হরণ করছে। তাদের উদ্দেশ্যের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হচ্ছে, তারা যেন ধরেই নিয়েছেন সংবিধানে অনিবার্যভাবে বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা আছে এবং সংবিধানে বাকস্বাধীনতাকে রুদ্ধ করার কোন বন্দোবস্ত যেন থাকতেই পারে না! আসলে বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে যেভাবে ‘যদি’ , ‘কিন্তু’ , ‘সাপেক্ষে’র বেড়াজালে বন্দি করা আছে, কেউ যদি এই ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখে তাহলেই পরিস্কার হবে , আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তো বটেই, এমনকি চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সংবিধানের ধারাতেই নাগরিকের বাকস্বাধীনতাকে গ্রেফতার করার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।

 

 

 

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ ধারায় চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে তা বলা আছে। সেই ধারা অনুযায়ী :

 

৩৯।(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।

 

৩৯। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা , বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক , জনশৃঙ্খলা , শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা , মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে

 

(ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের

এবং

 

(খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার

নিশ্চয়তা দান করা হইল।”

 

রাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা’, বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক, ‘জনশৃঙ্খলা’ , ‘শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে’ আইনের দ্বারা আরোপিত ‘যুক্তিসঙ্গত’ বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে আপনাকে আমাকে চিন্তা প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশ সংবিধান। কিসে যে রাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা’ বিঘ্নিত হবে , কিসে যে বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক বিঘ্নিত হবে , কিসে যে জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট হবে , শালীনতা ও নৈতিকতার মানদণ্ডটাই বা কী হবে তা কে জানে!

 

সমস্ত ক্ষমতা যদি হয় একব্যক্তিতে সমর্পিত , রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যদি ন্যূনতম স্বায়ত্তশাসন না থাকে , কে কোথায় থাকবেন বা থাকবেন না সবই যদি ফয়সালা করেন প্রধান নির্বাহী তাহলে সরকারের ‘নিরাপত্তাহীনতা’ই তো রাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা’হীনতা বলে গণ্য হতে পারে!

 

বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’  সম্পর্ক ব্যাপারটাই বা কী? ধরা যাক, বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি বর্ডারে ভারত রাষ্ট্রের ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ পলিসির সমালোচনা করেন, সেটা যে বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক নষ্ট করছে বলে গণ্য করা হবে না তার নিশ্চয়তা কী? ভারত তো কেবল বিদেশী রাষ্ট্র না , রীতিমতো ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ !

 

একইভাবে সৌদি আরবে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া , লাশ হয়ে ফের‍ত আসা নারীদের পক্ষে দাঁড়ালে , সৌদিরাষ্ট্রের সমালোচনা করলে, সেটাও তো বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে!

 

শালীনতা ও নৈতিকতার সাপেক্ষেই বা বাকস্বাধীনতা কন্ডিশনাল হবে কেন? শালীনতা , নৈতিকতার কোন সর্বজনীন সংজ্ঞা সম্ভব নয়। এরকম বিধানের সাপেক্ষে বাক ও চিন্তার স্বাধীনতাকে গ্রেফতার করার মানে হলো, ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধ , রুচি , বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মানুষের মধ্যকার নানাবিধ বৈচিত্র‍্যকে বিরোধ ও বিদ্বেষ হিশেবে জিইয়ে রাখা।

 

আজকে অমুক মতাদর্শের লোকেরা একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকলে, তাদের মনে হতে পারে তমুকের চিন্তা-সক্রিয়তা ‘শালীনতা’ ও ‘নৈতিকতা’ বিরুদ্ধ। কাল আবার তমুক মতাদর্শের লোকেরা ক্ষমতায় যেতে পারলে অমুকদের নানাবিধ প্র‍্যাক্টিসকে ‘অশালীন’ ও ‘অনৈতিক’ ঘোষণা করে আইন দ্বারা তাদের শায়েস্তা করতে চাইতে পারে।

 

নিম্ন আদালত যদি প্রত্যক্ষভাবে নির্বাহি বিভাগের অধস্তন থাকে, উচ্চ আদালতের বিচারপতি, প্রধান বিচারপতি যদি রাষ্ট্রপতি তথা নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে আপনি নিশ্চই আশা করতে পারেন না আদালত তার ‘স্বাধীন’ বিবেচনার মাধ্যমে সবসময় ‘শালীনতা’ ও ‘নৈতিকতা’র সঠিক ব্যাখ্যাই করবে।

 

তাহলে আপনার মতাদর্শ/দল ক্ষমতায় থাকলে ‘শালীনতা’ ‘নৈতিকতা’র ‘সঠিক’ ইন্টারপ্রিটেশন হবে, আর অন্য কোন পক্ষ ক্ষমতায় থাকলে ‘বেঠিক’ইন্টারপ্রিটেশন হবে, ব্যাপারটা আদৌ তা নয়। এমনকি আপনি যদি ‘সঠিক’ ব্যাখ্যাও করে থাকেন, তারপরেও সম্ভাবনা থেকে যায় অন্য কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এটার বেঠিক ব্যাখ্যা করবে।

 

কারণ কারোর ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। আজ আপনি ক্ষমতায় আছেন, কাল অন্য কেউ আসবে। নিজের ‘শুদ্ধতা’র জোরে যে শর্তসাপেক্ষ আইনকে আপনি ‘সঠিক’ মনে করছেন, কালকে সেই আইনই আপনার বিরুদ্ধে নিপীড়নের বর্ম হিশেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

 

সুতরাং, কে ক্ষমতায় আছে তার সাপেক্ষে প্রশ্ন-জবাবদিহিতাহীন একচেটিয়া নিরংকুশ ক্ষমতাকে ‘ভালো’, ‘মন্দ’ জ্ঞান না করে, মোটের উপর লাগামহীন স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর বিপদের জায়গাটা বুঝতে পারা উচিত। এরকম ক্ষমতাকাঠামোর অধীন শর্তসাপেক্ষ অধিকার আসলে অধিকার নয়, পুরো ব্যাপারটাই ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, বদান্যতার ব্যাপারে পরিণত হয়। আমরা নিশ্চই কোন মৌলিক অধিকারের জন্য ক্ষমতাসীনদের মুখাপেক্ষী থাকতে ইচ্ছুক নই।

 

চিন্তা ও বাক স্বাধীনতা বিষয়ক সংবিধানের এই আইন দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, আর দশটা আইনের মতো স্বাভাবিক একটা আইনেই বাক-চিন্তা-বিবেকের স্বাধীনতাকে এইভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। মরার উপর খাড়ার ঘা হিশেবে আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ‘বিশেষ’ আইন!

 

সুতরাং, আমাদের স্বীকার করে নেয়া ভালো বাংলাদেশের সংবিধান অবধারিতভাবে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করে না।

 

এইরকম কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো যে রাষ্ট্রব্যবস্থায় থাকে আর মানুষের কাছে জবাবদিহি করা ন্যূনতম ব্যবস্থা যে সরকার ব্যবস্থায় থাকেনা সেটা বহাল রেখে সর্বোচ্চ শক্তি খরচ করে  হয়তো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আমরা বাতিল করাতে পারবো, কিন্তু গণবিরোধী আইন বানানোর ব্যবস্থাকে বদলাতে পারবোনা। আজকে আমাদেরকে এই আইন বানানোর ক্ষমতার উৎসে যেতে হবে। নয়তো দেখা যাবে ৫৭ ধারার মতোই, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও হয়তো বাতিল হবে কিন্তু এরচেয়েও ভয়ংকর কোন নিবর্তনমূলক আইন ঠিকই প্রণয়ন করা হবে। আর কে না জানে কেন্দ্রীভূত জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতাকাঠামোই যাবতীয় স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের অন্যতম পূর্বশর্ত! তাই আর যাইহোক কেন্দ্রীভূত জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতাকাঠামো বহাল রেখে এদেশের মানুষের আর কোনো মুক্তি নেই। তাই আমাদের আজকের ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই যেমন গণবিরোধী আইন বাতিলের লড়াই তেমনি কেন্দ্রীভূত জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতাকাঠামোকে গণক্ষমতায় পরিণত করারও লড়াই। যে ক্ষমতাকাঠামো বাকস্বাধীনতার মতো নিঃশর্ত মৌলিক অধিকারকে শর্তের কঠিন শৃঙ্খলে গ্রেফতার না করে, ধারণ করবে। করোনা ও করোনা পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেন সেই সত্যই উন্মোচন করছে আমাদের সামনে।

 

 

 

Sarwar Tusher is an author and activist. Interested in studying the state, power, authority, sovereignty, violence, and social relations. Co-authored the book Somoyer Beyobacched (2019). Writes on a regular basis in various blogs and journals. Active member and organiser of Rashtrochinta.

 

Share.

Leave A Reply

Translate »