বাজার ব্যবস্থার নতুন বিন্যাস

Share this:

বর্তমান অবস্থা

দেখা যায় একজন কৃষক তার এক কেজি ফসল/সবজি বিক্রি করছে ১৫-২০ টাকায়, ভোক্তাকে তা কিনতে হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। তারমানে মাঝখান থেকে অপরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থার সুবিধাভোগী অর্থাৎ মধ্যস্বত্বভোগীরা  (অকৃষক) সরিয়ে নিচ্ছে তিনগুন বা তার অধিক লাভ। ঠকছে কে? ঠকছে কৃষক-ভোক্তা উভয়-ই। অনেক সময় কৃষকের উৎপাদন পর্যায়ে যে খরচ হয়, তার থেকে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে কৃষক বাধ্য হন—এমন ঘটনাও অহরহ দেখা যায় দুই-আড়াই টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে কৃষকের পটল, বেগুন, শসা, ঝিঙা; ভোক্তা তা কিনছে ২৫-৩০ টাকায়, তারমানে চক্রটি লাভ করছে দশগুণ বা তার অধিক। কৃষককে ধান বিক্রি করতে গিয়ে কিরকম পরিস্থিতির শিকার হতে হয় সেটা আজকাল কারো অজানা নয়। অন্যদিকে অধিক দামে পণ্য কিনতে গিয়ে ভোক্তার নাভিশ্বাস অবস্থা! সঞ্চয় দূরে থাক, কখনোবা ঋণের ভারে দিনানিপাত করতে হচ্ছে। এভাবে একটি কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার হতে হয় দেশের কৃষক-ভোক্তা উভয়কেই।

‘কৃষিপণ্য’ অর্থাৎ যেগুলো সরাসরি কৃষকের উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত যেমন চাল, ডাল, পেয়াজ, রসুন, বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি এইসব অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য যেগুলো না হলে সর্বজনের জীবনধারণ ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, অথচ কৃষকদের তার ফসল-শস্যদানার ন্যায্য মুল্য না পেয়ে পিঠ দেওয়ালে ঠেকবার অবস্থা।

উৎপাদনশীল মুনাফামুখী গোষ্ঠী পুরো বাজার ব্যবস্থাকে গিলে ফেলেছে। যেমন ধরুন আপনি বাজারে গিয়ে দোকানগুলোতে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বিশুদ্ধ আখের চিনি পাবেন না। সেগুলো সয়লাব হয়ে আছে ভারতীয় চিনিতে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিকর। অথচ প্রতিদিনের খাদ্যে নিয়তই যেহেতু চিনি ব্যবহৃত হচ্ছে সেখানে আঞ্চলিকভাবে এই বিশুদ্ধ পণ্যটার (কেমিক্যাল মুক্ত বা ভেজালহীন) বাজারজাত করা খুব করে কিন্তু সম্ভব ছিল। কিন্তু সেদিকে নজর না দিয়ে, সরকার দেশের স্বার্থসুরক্ষা না করে, উল্টো চিনিকলগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আবার ধরুন, লাল চাল স্বাস্থ্যগুণসমৃদ্ধ; অথচ বাজারে গেলে আপনি পাবেন মেশিনে কাটা সাদা চাল। লাল আটার বদলে পাবেন সাদা আটা-ময়দা। দেশি ফলের পরিবর্তে মূলত পাবেন হাইব্রিড, ফরমালিনযুক্ত বিদেশী ফল। তেমনিভাবে, দেশি মুরগীর পরিবর্তে এন্টিবায়োটিক-ক্যাডমিয়াম-ক্রোমিয়াম-হরমোন সমৃদ্ধ পোল্ট্রি ফার্মের মুরগী বা দেশি গরুর পরিবর্তে ফার্মেপালিত গরু। অথচ এখান থেকে মাত্র দশটা বছর আগেও আমরা দেশি মুরগী, গরু, ছাগল এগুলো অহরহ খেতে পেরেছি। দুই-আড়াই কোটি জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সেগুলো “নাই” হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের বাস্তবতা, বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী চক্রের লাগামহীন মুনাফার তাগিদ, সিন্ডিকেটচক্র, রাষ্ট্রআশ্রিত বিশেষ মহলকতৃক কৃষকের কৃষি জমি দখল, গ্রামকে শহর বানানোর রাষ্ট্রের নির্বোধ আয়োজন কিংবা এনজিও বা বিশেষ গোষ্ঠীকতৃক বিদেশী জাতগুলোর আমদানি সংকটের পেছনে কতোটা দায়ী তার হিসাবটা আমরা কি করেছি!

 

মাঠে ঠকে কৃষক, বাজারে ভোক্তা: সুবিধাভোগী মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজির প্রভাব: সুবিধাভোগী হচ্ছেন অকৃষক মধ্যস্বত্বভোগীরা

ধান

ধান উৎপাদনের বৈশ্বিক হিসেবে বাংলাদেশের* হিস্যা ৫ ভাগের মতো। ষষ্ঠ বৃহত্তম চাল উৎপাদক দেশ বাংলাদেশ। কোন কোন প্রতিবেদনে এই অবস্থান চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বলেও দাবি করা হয়। সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনীয় ক্যালোরির দুই-তৃতীয়াংশ আসে চাল থেকে।  জাতীয় আয়ের ছয় ভাগের এক ভাগ হিস্যা ধানচাষিদের অবদান।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষকদের মাত্র ১.৩৪ শতাংশ সরকার নির্ধারিত সংগ্রহ মূল্যে ধান বিক্রয় করতে পারে।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ জানাচ্ছেন, ধান-চালের ‘বাজার’ ব্যবস্থাটা মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের বিশাল এক আনন্দদায়ক ক্ষেত্র। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী জায়গায় এখানে অন্তত ৫-৬ স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার এবং অটো রাইস মিলগুলো (‘মিলার’ও বলা হয়)। বাংলাদেশে প্রভাবশালী মিলারের সংখ্যা মাত্র ৫০ বলে উল্লেখ করা হয়। তার মানে মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালীদের হাতে চালের বাজার কব্জা হয়ে আছে। উল্লেখিত ৫-৬ স্তরে মুনাফা সংগ্রহের পর ভোক্তার কাছে চালের দাম অনেক বেড়ে যায়। অথচ তা থেকে উৎপাদক কিছুই পায় না। এসব ধাপের প্রত্যেকটিতে ধান অর্থনীতির অ-চাষি সুবিধাভোগী। মধ্যস্বত্বভোগী প্রতি কেজি চালের মূল্যে প্রায় ১৮ টাকা বাড়তি যোগ করছেন।

দেশে মাথাপিছু চালের উৎপাদন বর্তমানে ২০৬ কেজির মতো। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মাথাপিছু প্রায় ৬০০ গ্রাম চালের হিসাবে এই উৎপাদন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বেশ সন্তোষজনক। উৎপাদন ও ভোগের এই সামঞ্জস্যতার কারণে বাংলাদেশে চাল আমদানি কিংবা রফতানি কোনটারই প্রয়োজন নেই। তার পরও চাল আমদানি ও রফতানি চলে সমানতালে। আর সেটা করা হয় শুধুমাত্র অকৃষক-ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর তাৎক্ষনিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরির জন্য। ২০২০ সালের শুরুতে সরকার একদফা চাল রফতানির ঘোষণা দেয়। সেসময়, ২০২০ এর ৩০ জানুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জুন পর্যন্ত ১৫ ভাগ হারে সরকার প্রণোদনা দিবে। অর্থাৎ ১০০ টাকার চাল রফতানি করলে পাওয়া যাবে ১১৫ টাকা।

গবেষণা বলছে বাংলাদেশের চালের বাজারের দাম বৃদ্ধির সাথে উৎপাদন হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই বললেই চলে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারের খাদ্যমজুদ সংক্রান্ত ঘোষনায় দেখা যায়: দেশে ১৩.৬৫ লাখ মে.টন চাল মজুদ রয়েছে। যা দেশের চালের চাহিদার মাত্র ৪ ভাগ মতো। জেনে আশ্চর্য লাগবে, সরকার কেনে মাত্র ৫-৬ লাখ টন ধান, উৎপাদন যখন প্রায় চার কোটি টন। চালও কেনে সরকার, ১১ লাখ টন, তবে সেটা সরাসরি রাইস মিলগুলোর কাছ থেকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির একটা তুলনা সামনে আনা যায়। ২০১৮-২০১৯ এ পশ্চিমবঙ্গের ধানচাষিরা প্রায় আড়াই কোটি টন ধান উৎপাদন করে। সেখানকার সরকার যার ৫২ লাখ টন কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। যা মোট উৎপাদনের ২০ ভাগের বেশি। এই কর্মসূচিকে সেখানে বলা হয় মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি)।

উলেখ্য, হাজার হাজার কোটি টাকা কৃষি সমাজকে ভর্তুকি দেবার কথা জানা গেলেও বাস্তবে এই বরাদ্দের প্রধান সুবিধাভোগী হয়ে দাঁড়ায় অকৃষি সমাজ—তথা বীজ ব্যবসায়ী, কৃষি যন্ত্রাংশের ব্যবসায়ী, সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীরা। জানা দরকার, ২০১৮-এর জুনে সমাপ্ত বছরে কৃষি বাংকের অপারেটিং কস্ট ছিল ৯৭৩ কোটি টাকা। যার মধ্যে বেতন ভাতায় তারা খরচ করেছে প্রায় ৮৩৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশে কৃষকের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ আসে কৃষি ব্যাংক থেকে।

অথচ সংবিধানে ‘মূলনীতি’ অংশে কৃষক ও কৃষিপ্রশ্নে বলা রয়েছে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে…কৃষক ও শ্রমিককে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তিদান’। এসব প্রশ্নে দেশ যদি বিপরীতমুখে চলে সাংবিধানিকভাবে তাকে প্রতিহত করার পথ কিন্তু নেই।আবার মালিকানা প্রশ্নে সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালিসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ।’ এই মালিক বা নিয়ন্ত্রক ‘কৃষিসমাজ বা কৃষক’ না বলে ‘জনগণ’ বলার মাধ্যমে অকৃষিসমাজকে সমানভাবে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর অকৃষিসমাজ অর্থাৎ ব্যবসায়ী—মুনাফালোভী গোষ্ঠী যখন কৃষিব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের অন্তর্ভুক্ত হয় তখন নিশ্চিতভাবে কৃষকদের স্বার্থ থেকে নিজেদের স্বার্থ তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলা চলে সংবিধানের একটি বক্তব্য অন্যটির সাথে সাংঘর্ষিক এবং বিপরীতার্থক।

আলতাফ পারভেজের মতে, বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ এর কথা বলা হলেও ধানের পুরো সাপ্লাইচেইন রেখে দেওয়া হয়েছে ‘বাজার’–এর হাতে।

আলু

রংপুরে এ বছর মৌসুমের শুরুতে চার টাকায় নেমেছে প্রতি কেজি আলুর দাম। যখন কিনা খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আলু ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে এতো কম টাকা দরে আলু কিনে লাভবান হচ্ছেন পাইকার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। জানা যায়, কৃষকদের কাছ থেকে চার টাকা কেজিতে আলু কিনে আড়তদারদের কাছে ছয়-সাত টাকা বিক্রি করেন পাইকাররা। এই আলু ব্যবসায়ীর কাছে ৯ থেকে ১০ টাকা বিক্রি করেন আড়তদার। ব্যবসায়ী সেই আলু নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন ১৩ থেকে ১৪ টাকায়। খুচরা ব্যবসায়ী সেই আলুর কেজি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন ২০ টাকা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৭ টাকা ৬০ পয়সা। কৃষক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে এ আলু প্রতিকেজি ৮ টাকা ৮৫ পয়সায় বিক্রি করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী তা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১২ টাকা ২০ পয়সায়। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এক কেজি আলু খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন ১৭ টাকায়। এতে পাইকারি ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন প্রায় ৪০ শতাংশ। খুচরা ব্যবসায়ী একই আলু সাধারণ ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন ২২ টাকায়। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কৃষকের ৭ টাকা ৬০ পয়সার এক কেজি আলু ভোক্তা কিনছে ২২ টাকায়। অর্থাৎ কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে এক কেজি আলু ৫ দফা হাতবদল হচ্ছে। দাম বাড়ছে ১৪ টাকা ৪০ পয়সা বা ১৯০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ছে পাইকারি থেকে ভোক্তার কাছে আসতে।

পেঁয়াজ

দেখা যায়, এ দেশে মৌসুম যখন শুরু হয়, তখন ভারতীয় পেঁয়াজ অবাধে আমদানি হয়। এতে করে কৃষক ন্যায্য দাম পান না। কৃষককে যদি ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা দেওয়া যেত, তাহলে দেশেই চাহিদার প্রায় সবটুকু উৎপাদন সম্ভব হতো। লাভ দূরে থাক,  উৎপাদন খরচ উঠাতেই কৃষককে যখন হিমশিম খেতে হয়, তখন দেখার কেউ নেই। কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা নিয়ে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা নেই। বাজার স্বাভাবিক অবস্থায়, কৃষকরা কেজিতে ৭-৮ টাকা লাভ করে। অথচ আড়তদাররা কৃষকের কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনে নিয়ে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে লাভ করে।১০ সিণ্ডিকেটের কারণে রাতারাতি এ নিত্যপণ্যটির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়ে যাওয়া অনেকটা স্বাভাবিক ঘটনা। দেশে পেঁয়াজের বাজারে সময়ে অসময়ে ব্যাপক অস্থিরতাও দেখা যায়। কয়েক বছর পরপরই এ ধরনের একটি সমস্যা তৈরি হয়। এক কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম তখন ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত হয়।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোনো কোল্ডস্টোরেজ নেই। কৃষকরা নিজেদের বাড়িতে দেশীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু তাতে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার হার বেশি হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য যে আধুনিক তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা থাকা দরকার, তা দেশে নেই। পেঁয়াজের জন্য ১২ থেকে ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের তাপমাত্রা দরকার। আর্দ্রতা থাকতে হবে ৩৫ থেকে ৪৫ এর মধ্যে। সংরক্ষণের অভাবে ৩০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়।১১

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের বাজারদরের তালিকা ও ২০২২-এর ফেব্রুয়ারির দামের তালিকা ধরে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোটা চালের দাম ১৫%, মোটা দানার মসুর ডাল ৭৭%, খোলা সয়াবিন তেল ৫৪%, চিনি ৪৯% ও আটার দাম ২১% বেড়েছে।১২

 

চাঁদাবাজি যখন পণ্যের মাত্রাছাড়া মূল্যবৃদ্ধির কারণ

সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বগুড়া থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার পর্যন্ত ২৪০ কিলোমিটার এই পথে অন্তত ১০টি স্থানে এক হাজার ৫০ টাকা দিতে হয় চাঁদা। এভাবে প্রতি ট্রিপে ১,০৫০ টাকা চাঁদার সঙ্গে যমুনা সেতুর টোল এক হাজার টাকা। এ ছাড়া জেলা পর্যায় থেকে রাজধানী পর্যন্ত আসতে প্রতিটি সবজিবাহী ট্রাককে মাসে দুই হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় পুলিশকে। পুলিশের গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও এই তথ্য রয়েছে।১৩ আরও রয়েছে বাজারে আসা ট্রাক প্রতি চাঁদা, পার্কিং এর নামে চাঁদা, ট্রাক থেকে পণ্য নামাতে চাঁদা, দোকানদারদের বসার জন্য প্রতি রাতে আদায়কৃত চাঁদাসহ নানা পর্যায়ের চাঁদাবাজি। জানা যায়, কারওয়ান বাজারে যেখানে ট্রাক রেখে মালামাল নামানো হয় ওই ফুটপাতের ভাড়া দিতে হয় এক থেকে দেড়হাজার টাকা। অন্যদিকে,  মাসিক ভাড়া ছাড়াও প্রতি রাতে বসার জন্য অস্থায়ী দোকানদারদের আরো ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।১৪,১৫ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) জানিয়েছে, সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ ও কাঁচাবাজারে প্রভাবশালীদের ‘গুপ্ত’ চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজি অনেকটা সরকারিভাবে টোল সংগ্রহের মতো হয়ে গেছে।১৬

এখন মাসিক চুক্তিতে বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে চাঁদা আদায় চলছে। জানা যায়, মাসে ২০০০ টাকা দিলে কার্ডটি পাওয়া যায়, যা দেখলে পুলিশ গাড়ি আটকায় না। বিশেষ এই কার্ড না থাকলে ২০-২৫ হাজার টাকা জরিমানার মামলা দেওয়া হয়। এই গাড়িটির মাসিক চুক্তিভিত্তিক অবৈধ কার্ডটি থাকার পরও, ঢাকা থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকটি জায়গায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নামে ৬০ টাকা এবং পরিবহন সমিতি ও লাইনম্যানের নামে ৪০০ টাকা দিতে হয়েছে। এই কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে সারা দেশে চাঁদাবাজি চলে। উল্লেখ্য,দেশে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ।১৬

সংবাদপত্রের একটি অনুসন্ধানের সারসংক্ষেপ এখানে উপস্থাপন করা হল: রাজশাহীর পবা থেকে ঢাকায় রওনা হওয়া একটা ট্রাক,সেটির ভাড়া ছিল ১৭ হাজার টাকা। প্রতি কেজি সবজিতে ভাড়া পড়ে দুই টাকার কিছু বেশি। গতকাল ঢাকার কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেল, পবায় যে ঢ্যাঁড়স প্রতি কেজি ২২ থেকে ২৫ টাকা ছিল, তা কারওয়ান বাজারে খুচরায় ৬০ টাকা এবং কারওয়ান বাজার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের হাতিরপুল বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ভাবে পবার ১৪-১৫ টাকা কেজির পেঁপে কারওয়ান বাজার ও হাতিরপুলে ৪০ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। পবার ১৮-২০ টাকার মাঝারি লাউ কারওয়ান বাজার ও হাতিরপুলে ৬০ টাকায় কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ১৬

পণ্য রাজশাহী/যশোরে দর ঢাকায় দর
ঢ্যাঁড়স ২২-২৫ ৬০-৮০
কাঁচা পেঁপে ১৪-১৫ ৪০
পটল ৩৫ ৬০-৮০
মাঝারি লাউ ১৮-২০ ৬০
বেগুন ২০-২৫ ১০০
শসা ১৫-২০ ১০০
বাঁধাকপি ১৩ ৩৮
কাঁচা মরিচ ২০ ৬০-৮০

 (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো১৬; যুগান্তর; কালের কণ্ঠ১৩)

সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন আসছে চাঁদাবাজিতে। কার্ড দিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়টি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর কার্ডের বদলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে চাঁদাবাজির টাকা নেওয়া হচ্ছে।১৭

একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পথে পথে চাঁদা দিতে না হলে রাজধানীতে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৩০ টাকা, বেগুন ৩৫ টাকা, শসা ৪০ টাকায় কেনা সম্ভব হতো।১৩

যখন সীমান্ত পার হয়ে ভারত থেকে গরু আসত, তখন গরুর মাংসের দাম কম ছিল। ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের হিসাবে, ঢাকায় ২০১৪ সালে ১ কেজি গরুর মাংসের গড় দাম ছিল ৩০০ টাকা। মাত্র ৫ মাস আগে গত অক্টোবরে গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কেজিতে বেড়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। শবে বরাতের দিন একলাফে কেজিতে ৫০ টাকা বাড়ানো হয়। আর সংযমের মাস রমজান সামনে রেখে বাড়ানো হয় আরও ৩০ থেকে ৫০ টাকা।১৮

মাংস ব্যবসায়ী সমিতি বলছে, হাট কর্তৃপক্ষ তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ইজারা আদায় করছেন। যেমন গাবতলী গরুর হাট ইজারা নেওয়ার শর্ত হলো, প্রতিটি গরুর সরকার নির্ধারিত খাজনা হবে ১০০ টাকা। কিন্তু এ শর্ত না মেনে ইজারাদারেরা অবৈধভাবে গরুপ্রতি চার বা পাঁচ হাজার টাকাও আদায় করছেন। এভাবে একটি গরু শহরের ভেতরে তিনটি হাটে স্থানান্তরিত হলেই গরুর দাম বেড়ে যায় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এর প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে মাংসের দামের ওপর। তাদের কথা, এ চাঁদা কমানো গেলে মাংসের দামও কেজিতে ১০০–১৫০ টাকা কমানো যাবে।১৮

অপর দিকে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বাজারে গোখাদ্যের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে বেড়ে গেছে গরুর উৎপাদন খরচ। সরকার গোখাদ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নিলে বাজারে মাংসের দাম কমে আসবে।১৮

প্রকৃতপক্ষে খামারির কাছ থেকে কসাই পর্যন্ত একটি গরু পৌঁছাতে তিন-চার হাত বদল হয়। প্রতি হাত বদলে বাড়ে গরুর দাম। আরেকটি তথ্য হচ্ছে, গত কয়েক বছরে গরু পালন আর প্রান্তিক খামারিদের হাতে নেই। রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংসদসহ বড় বড় ব্যবসায়ীর হাতে চলে গেছে। তাঁরাই এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।

ভারত থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ হওয়ার পর দেশে প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে গবাদিপশুর খামার বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে পশুর উৎপাদন আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ লাখ ৯৯ হাজার বেড়ে হয় ৫ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ গরু, ৪৫ শতাংশ ছাগল। বাকিগুলো মহিষ ও ভেড়া। দেশে জনপ্রতি মাংসের চাহিদা দৈনিক ১২০ গ্রাম। সে হিসাবে বছরে মাংসের চাহিদা ৭৪ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন। দেশে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন ছিল ৮৪ লাখ ৪০ হাজার টন। অর্থাৎ মাংসের উদ্বৃত্ত ১০ লাখ টন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০১৭ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া—সব মিলিয়ে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১২তম।১৮

 

কোম্পানির পণ্য: স্বাস্থ্যগুণ কিংবা প্রয়োজনীয়তা বিচার

ভালমন্দের দিক বিবেচনায় পণ্যদ্রব্যকে মোটাদাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক, যেগুলোর স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষায় জন্য দরকারি; দুই, যেগুলো স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর ও ক্ষতিকারক। মোটাদাগে পণ্যদ্রব্যের কোনগুলো স্বাস্থ্যকর আর কোনগুলো স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর সেটি নিরীক্ষা করা জরুরি। এজন্য একটা উপযুক্ত পরামর্শ হল, প্রথমেই আপনি যেকোনো একটা দোকানে ঢুকুন। তারপর এক এক করে সেখানকার পণ্যগুলোতে ভালোমতো চোখ বুলাতে শুরু করুন। ধরুন একটা চোখধাঁধানো মুদি দোকান। চাল, ডাল, তেল, পেয়াজ, রসুন এমনকিছু অতিদরকারি পণ্য বাদে—লোকাল কিছু পণ্য বাদে সেখানে আপনি কি কি দেখতে পাবেন? দেখতে পাবেন উন্নত প্যাকেটজাত চিপস, জুস, জেলি, চাটনি, ডালভাজি, কেক, বিস্কুট, চানাচুর, চকলেট, দুধ, হরলিক্স, কোল-ড্রিংকস, ত্বকের ক্রিম, চুলের তেল এগুলিই। খেয়াল করে দেখুন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর উন্নত প্যাকেটজাত এইসকল পণ্যগুলোর অহরহ বিজ্ঞাপন আপনি প্রতিনিয়ত টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে দেখছেন। আপনার সন্তান দেখছে। সেটা দেখেই আপনি কিংবা আপনার সন্তান সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন একটি পণ্য কেনার। চটকদার এবং ফলত মিথ্যাচারে ভরপুর একটি বিজ্ঞাপন আপনার-আপনার সন্তানের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। সামগ্রিকভাবে একেবারে অপ্রয়োজনীয়-অকেজো পণ্যগুলোর প্রতি জনসাধারণের চাহিদা সৃষ্টি করতে এভাবে প্রয়োজনগুলো সৃষ্টি করা হয় গণমাধ্যম দ্বারা। আমাদের দেশে সঠিকভাবে এইসব পণ্যগুলোর গুণমান যাচাই-বাছাই করলে দেখা যাবে এগুলোর অধিকাংশই মূলত ভয়াবহমাত্রার বিষাক্ত ক্ষতিকারকসব পদার্থ ও কেমিক্যালে পরিপূর্ণ। যার কোন স্বাস্থ্যগুণতো নেই-ই, সেগুলো ফলত আমাদের শরীরের জন্য ভয়াবহ মাত্রায় ক্ষতিকারক। এইসব বিষাক্ত পানীয়, ক্ষতিকারক ক্রিম, অস্বাস্থ্যকর খাবারের কারখানাগুলো অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা দিয়েই চলে। কারণ কর্পোরেটদের কাছে মানুষের ভালো তথা স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় থেকে মুনাফা বাড়ানোটা অনেক বেশি জরুরি বিষয়। তো অধিক মুনাফা তারমানে চাই লাগামহীন উৎপাদন। তো লাগামহীন উৎপাদনের এইসব পণ্যগুলোকে ঝরঝরে ফকফকা ও দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে চাই অধিক মাত্রায় কেমিক্যাল ও ক্ষতিকারক পদার্থ। সেসব কেমিক্যাল-ক্ষতিকারক পদার্থ ব্যবহারের সামান্য অনুমতি পর্যন্ত নেই তা হয় ফ্যাক্টরির রুটিনের সার্বক্ষণিক উপাদান। পুঁজিমালিকরা লাগামহীন মুনাফার তাগিদে আপনার স্বাস্থ্যসুরক্ষার বিষয় মাথায় নেন না। পণ্যের মেয়াদ শেষ! কারখানাতে কাজ করলে আপনার আশা করি দেখবার সৌভাগ্য হতো ইথাইল দিয়ে ঘষে কিভাবে মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্যের সিলমোহোর উঠিয়ে নতুন সিল বসানো হয়। কিংবা মেয়াদ উত্তীর্ণ—অনুমতি না থাকা কেমিক্যাল কিভাবে সেখানে অহরহ ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এগুলোর বৈধতা দেয় পঁচাগলা আমাদের এ রাষ্ট্রব্যবস্থা। এখানে যে কারখানার মালিক, সেই আবার মন্ত্রী-উপমন্ত্রী কিংবা তাদের নিকটজন। যাইহোক, এইসব মানহীন, অস্বাস্থ্যকর, ক্ষতিকর পণ্যগুলোকে জনগণের পক্ষ থেকে “না” বলবার সময় এসেছে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় তার সবগুলোকে আপনি হয়তো না বলতে পারবেন না। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন চাইলে যার অধিকাংশকেই ‘না’ বলা যায়।

আর একবার ভেবে দেখুন এসব স্বাস্থ্যহানিকর-ক্ষতিকারক পণ্যগুলো নির্ধারিত মূল্যেই কিনতে হচ্ছে, অথচ একজন কৃষক তার ক্ষেতের টাটকা ফসলের ন্যূনতম মূল্য পাচ্ছেন না।

 

নতুন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে

এমন একটি পণ্য ব্যবস্থার কথা ভাবতে পারি, যুক্তি ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে যার নাম হতে পারে তিন-চতুর্থাংশ পণ্য ব্যবস্থা বা কৃষক-ভোক্তা পণ্য ব্যবস্থা, উৎপাদক-ভোক্তা পণ্য ব্যবস্থা কিংবা অন্যকিছু। বিষয়টিকে এমনভাবে সূত্রবদ্ধ করতে পারি কিনা: Cp ≈ ¾ Sp, যেখানে Cp= Cost price (ক্রয়মূল্য) এবং Sp= Selling price (বিক্রয়মূল্য)। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, ভোক্তার ক্রয় দরের ৭৫ শতাংশ মূল্য বাধ্যতামূলকভাবে চাষি/উৎপাদক পাবেন। তার মানে একটি পণ্যের ক্রয়মূল্য যদি ৩০ টাকা হয়, তার বিক্রয়মূল্য ৪০ টাকা বা তার মধ্যে (দ্রুত পচনশীল পণ্য)  বা তার সামান্য বেশি (মিল বা কারখানায় প্রক্রিয়াজাত পণ্য) হবে। ‘তার মধ্যে’ বলা হচ্ছে কারণ যেহেতু পণ্যের মানের পার্থক্য থাকে এবং ‘তার সামান্য বেশি’ বলা হচ্ছে কারণ মানের পার্থক্য থাকার সাথে সাথে পণ্যটির প্রক্রিয়াজাত করতে নির্দিষ্ট একটা খরচ রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট টাকার বিপরীতে ±২ থিউরি প্রয়োগ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতি ২০ বা ৩০ টাকায় পচনশীল কৃষিজ পণ্যের জন্য -২ টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে এবং মিল বা কারখানায় প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে +২ টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, একজন কৃষকের কাছ থেকে এক কেজি করলা যদি ১৫ টাকায় কেনা হয়, তবে সেটা ভোক্তার কাছে অবশ্যই ২০ টাকা বা তার মধ্যে বেঁচতে হবে। যেখানে উচ্চমানের হলে সেটা ২০ টাকা, নিম্নমানের হলে ১৮ টাকা, মধ্যমানের ক্ষেত্রে ১৯ টাকা। আবার ধরুন, একজন কৃষকের কাছ থেকে এক কেজি পেঁপে যদি ১০ টাকায় কেনা হয়, তবে সেটা ভোক্তার কাছে অবশ্যই ১৩.৩৩ টাকা বা তার মধ্যে বেঁচতে হবে। যেখানে উচ্চমানের হলে সেটা ১৩.৩৩ টাকা, নিম্নমানের হলে ১২ টাকা, মধ্যমানের ক্ষেত্রে সাড়ে ১২ টাকা। একইভাবে, একজন আমচাষির কাছ থেকে এক কেজি আম যদি ৩০ টাকায় কেনা হয়, তবে সেটা ভোক্তার কাছে অবশ্যই ৪০ টাকা বা তার মধ্যে বেঁচতে হবে। যেখানে ৪০ টাকা উচ্চমানের ক্ষেত্রে, ৩৬ টাকা নিম্নমানের ক্ষেত্রে, কিংবা ৩৭-৩৯ টাকা মধ্যবর্তীমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য, যেমন এক কেজি ডাল যদি কৃষকের কাছ থেকে ৩০ টাকায় কেনা হয়, তবে সেটা ভোক্তার কাছে অবশ্যই ৪০ টাকা বা তার কিছু বেশি টাকায় (নির্দিষ্ট) বেঁচতে হবে। যেখানে ৪৪ টাকা উচ্চমানের ক্ষেত্রে, ৪০ টাকা নিম্নমানের ক্ষেত্রে, কিংবা  ৪১-৪৩ টাকা মধ্যবর্তীমানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

দ্রুত পচনশীল পণ্যগুলোর ক্রয়-বিক্রয় সেক্ষেত্রে স্থানীয় জনসমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। অন্যান্য সংরক্ষণশীল পণ্যগুলো যেমন চাল*, ডাল, ছোলা, তেল, লবণ, আটা, হলুদ, পেঁয়াজ (অত্যাধুনিক ব্যবস্থায় সংরক্ষণ সাপেক্ষে), রসুন, লবণ, বিভিন্ন মশলা এগুলোকে একটি ফেডারেশনের মাধ্যমে পরিচালিত করা যায়। স্থানীয় জনসমবায় দ্রুত পচনশীল পণ্যগুলোর বণ্টনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং ফেডারেশন তার আর্থিকসহ অন্যান্য সহায়তাকারী সেকারণে জনসমবায় লভ্যাংশের নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেশনকে প্রদান করবে। অন্যদিকে ফেডারেশন সংরক্ষণশীল পণ্যগুলোর দেখভাল করতে মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং জনসমবায় যেহেতু তার বিলি-বণ্টনের সহায়তাকারী সেকারণে ফেডারেশন লভ্যাংশের নির্দিষ্ট অংশ জনসমবায়কে প্রদান করবে।

ফেডারেশন সারাদেশে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করবে। ফেডারেশনের থাকবে সম্পূর্ণ নিজস্ব হিমাগার ও পরিবহণ ব্যবস্থা। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পণ্য সংরক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক হিমাগার থাকতে হবে। এছাড়া, সবজি-ফল যাতে নষ্ট না হয়, তার জন্য হিমায়িত যান প্রয়োজন। হিমায়িত সাধারণ যান ও হিমায়িত রেলে করে পণ্য পরিবহণ ইতোমধ্যে অন্যদেশে শুরু হয়েছে। ট্রাকের থেকে রেলে পণ্য পরিবহণ করা যায় অনেক বেশি। জানা যায় একটা ওয়াগনে ৯২৫ প্যাকেট পেঁয়াজ ধরে, ট্রাকে ধরে ৩০০ প্যাকেটের মতো। উল্লেখ্য, এই পরিবহণগুলো সকল ধরণের টোলের আওতামুক্ত থাকবে।

চাল (অন্যান্য অনেক দেশে যেমন গম) বাংলাদেশের মানুষের ক্যালরি চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ এবং প্রোটিনের প্রায় অর্ধেক পূরণ করে। সেকারণে এবং পণ্যটি পচনশীল না হওয়ায় এক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা প্রয়োজন। আলাপটা একটু পেছন থেকে শুরু করতে হয়। এক মন ধানে গড়ে ২৭ থেকে ২৮ কেজি চাল হয়ে থাকে। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে এক মন ধান বিক্রি হয় সাত শ থেকে আট শ টাকায়। সেক্ষেত্রে প্রতি মন ধান এক হাজার টাকা দরে কিনলে প্রতি কেজি চালের (এক মন ধানে ২৭ কেজি চাল ধরে) দাম আসে ৩৭ টাকা ০৩ পয়সা। আবার প্রতি মন ধানে গুঁড়া/ক্ষুদ পাওয়া যায় ১২ থেকে ১৩ কেজি। ধরলাম ১২ কেজি। এখন প্রতি কেজি গুঁড়া বা ক্ষুদ যদি ৮ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয় সেক্ষেত্রে প্রতি কেজি চালের বিপরীতে আরও ৪ টাকা বাদ যায়। তার মানে প্রতি কেজি চালের মূল্য দাঁড়ায় ৩৩ টাকা ০৩ পয়সা। এখন মিলের শ্রমিক ও যাতায়ত খরচসহ সাধারণ হিসাবে প্রতি কেজি চাল ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা যায়। যেহেতু ধানের প্রকারভেদ রয়েছে, যার মূল্যও সে অনুসারে কম বেশি হয় সেক্ষেত্রে ধানের দামের একটা ক্যাটাগরি করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মন প্রতি তা ১০০০ থেকে ১২০০ এর মধ্যে হতে পারে। চারভাগের একভাগ (২৫ শতাংশ) না হয়ে এখানে লাভ হবে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। তার চিত্রটা এখানে দেখানো হল:

কৃষকের প্রতি মন ধানের মূল্য প্রতি মন ধানে ২৭ কেজি চাল ধরে কেজিপ্রতি চালের মূল্য (টাকা) প্রতি কেজির বিপরীতে গুঁড়া বা ক্ষুদবাবদ ও শ্রমিক-যাতায়াত খরচ প্রতি কেজি চালের  বিক্রিত মূল্য (টাকা) প্রতি কেজি চালে রাজস্ব আদায় (টাকা)
-৪ +২
১০০০ ৩৭.০৩ ৩৩.০৩ ৩৫.০৩ ৩৬ ০.৯৭
১১০০ ৪০.৭৪ ৩৬.৭৪ ৩৮.৭৪ ৪০ ১.২৬
১২০০ ৪৪.৪৪ ৪০.৪৪ ৪২.৪৪ ৪৪ ১.৫৬

বলার অপেক্ষা রাখে না, চালের গুদামজাতকরণের জন্য দরকার হবে প্রতিটি উপজেলায় ‘কমিউনিটি স্টোরেজ’ তৈরি করবার। মনে রাখা দরকার বাজারের শক্তি এখানে প্রবেশ করলে কৃষক-ভোক্তা উভয়কেই ঠকানো হবে।

এই পুরো ব্যাপারটি শুধুমাত্র সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন সম্ভব। কিংবা বর্তমানে এমন কিছু দেশ বা অঞ্চল রয়েছে, যেখানে একই সাথে পুঁজিবাদী, প্রাণ-প্রকৃতিবাদী ও সমাজতন্ত্রবাদী ঝোঁক রয়েছে সেখানে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়ন বহুলাংশেই সম্ভব। তবে চাইলে পুরোপুরি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু বিশেষ খাতকেও সাম্যতার আলোকে (পুরোপুরি নয়) পরিচালন সম্ভব কিংবা সমাজে যাদের সবচেয়ে দরকার এবং যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি জনগণের সেই অংশকেও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত করা চলে।

 

নতুন ব্যবস্থার বাস্তবতা যাচাই

লেখক বিল ম্যাককিবেন-এর মতো দায়বদ্ধ পরিবেশবাদী কিউবা, ব্রাজিলের করিতিবা ও পোর্তো আলেগ্রে এবং ভারতের কেরালার বাজার ব্যবস্থাকে এভাবে আলোকপাত করেছেন যেখানে বাজারের শক্তিগুলোর উপর সবকিছু ছেড়ে না দিয়ে সামাজিক পরিকল্পনার উপর অনেকটা জোর দেওয়া হচ্ছে। যেখানে সমাধানের ট্র্যাজেডি হল, বড় বড় কোম্পানির বিনিয়োগ-উপযোগী নয়ন-মনোহর এবং আকর্ষণীয় প্রযুক্তি-প্রকৌশলের চমক নয়। এগুলো নিতান্তই গোষ্ঠীবদ্ধ প্রকল্প যার লক্ষ্য হল হাজার হাজার মানুষের অতি-সতর্ক যত্নশীল প্রয়াস।১৯ নতুন ‘বলিভারিয়ান অলটারনেতিভ ফর দি আমেরিকানস’ (আলবা) দলিলে বিনিময় মূল্যের থেকে গোষ্ঠীগত বিনিময় বা কাজকর্মের বিনিময়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।২০,২১ বাজারকে সমগ্র অর্থনীতির অগ্রাধিকার ঠিক করতে না দিয়ে যাদের সবচেয়ে দরকার এবং যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, জনগণের সেই অংশের মধ্যে সম্পদ ও সক্ষমতার পুনর্বন্টনের জন্য পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখানে লক্ষ্য হল সমাজের সবচেয়ে জরুরি ব্যক্তিগত ও সামুহিক চাহিদা, বিশেষত শারীরবৃত্তীয় চাহিদাগুলিকে মেটানো, যার মাধ্যমে সরাসরি প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্ন উঠে আসছে। যা টেকসই সমাজ গড়ার এক আবশ্যিক শর্ত। ভেনেজুয়েলার গ্রামাঞ্চলে কৃষির সবুজায়নের প্রচেষ্টাও চলছে।২২ ভারতে “সুফল বাংলা” প্রকল্পের অধীনে চাষিরা সরাসরি ফসল বিক্রি করতে বাজারে পাঠাতে পারে।২৩ ভারতের ১৩৪ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৮১ কোটি মানুষের মাঝে রেশন কার্ডের মাধ্যমে বাজার মূল্যের অর্ধেক দরে কিংবা অর্ধেকেরও কম দরে চাল, আটা, ময়দা, তেল, চিনিসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হয়।২৪ হিমায়িত রেলে করে পণ্য পরিবহণ ইতোমধ্যে ভারতে শুরু হয়েছে। এছাড়া অতি সম্প্রতি সরকার “কিসান রেল” চালু করেছে।

বাংলাদেশের একটি যুব বহুমুখী সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, তার আশা হল সমিতিকে একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলা, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা। তারা চায় প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে বাজার স্থাপন করতে। সেখানে ক্রয় ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। ক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ইউনিয়নের উৎপাদিত পণ্য কেনা এবং বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভোক্তাদের মধ্যে ন্যায্যমূল্যে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা হবে।২৫

 

মিল্ক ভিটা

বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড, যা মিল্ক ভিটা নামে পরিচিত। ১৯৭৩ সালে সমবায় ব্যবস্থাপনায় উৎপাদনে আসে মিল্ক ভিটা। প্রতিষ্ঠানটি দুগ্ধ খামারিদের সমন্বয়ে গঠিত এবং তত্ত্বাবধান করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়।২৬ প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সামগ্রী উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করা।২৭

মিল্ক ভিটা দেশের ৪২ জেলার ১৩৮টি উপজেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬০৮ সদস্যের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ লিটার কাঁচা তরল দুধ সংগ্রহ করে।২৮ মিল্ক ভিটার অধীনে বাংলাদেশের তরল দুধের ৭০ শতাংশ বাজার দখলে রয়েছে। মিল্ক ভিটাতরল দুধের পাশাপাশি ঘি, মাখন, আইস ক্রিম, মিষ্টি দই, মিষ্টিহীন দই, ক্রিম, চকোলেট,  লবঙ্গ বিক্রি করে। এর ক্ষুদ, মাঝারি ও বৃহৎ সবগুলো ইউনিট মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কর্মী রয়েছে।২৭  

গত কয়েক বছর ধরে কোথাও কোথাও দুধ সংগ্রহ কার্যক্রমে কোটা পদ্ধতি চালু করা, যখন তখন দুধ সংগ্রহ কমিয়ে আনা, কেন্দ্র থেকে দুধ সংগ্রহ বন্ধ রাখা, শ্রমিকদের তালিকাভুক্ত করতে ঘুষ নেওয়া এবং অনিয়মসহ নানা অসংগতির চিত্র পাওয়া গেছে।২৯,৩০ কয়েক বছর আগে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণেই সেখানকার এমডি আক্রোশের শিকার হন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, যিনি একই সাথে সরকারি দলের একজন প্রভাবশালী নেতা সরকারি আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে এমডিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেন।৩১ ফলে বোঝা যায় পাটকল, চিনিকলের মতো এখানেও একটা মহল অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অনিয়মসহ নানা তৎপরতায় লিপ্ত। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি দুধ, কনডেন্সড মিল্ক ও পানির ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।২৬

 

ভারতের সমবায় ব্যবস্থা

ভারত হল ‘সমবায়’ আন্দোলনের একটি অনন্য ভিত্তিভূমি, যা তৃণমূল স্তরের নাগরিকদের এবং তাদের গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। ১৮৯০ সালের দিকে যখন পশ্চিম মহারাষ্ট্রের কৃষকরা কৃষি ঋণের জন্য মহাজনদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করেছিল। স্বাধীনতার পর ভারতে এই ‘সমবায় আন্দোলন’  নতুন গতি পায়। সরকার বুঝতে পারে যে সমবায় খাত গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  তাই পঞ্চবার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় এই খাতের জন্য পরিকল্পনার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি গ্রামে অন্তত একটি সমবায় সমিতি করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছিল। এটি সমবায় খামার স্থাপনে সহায়তা করেছে। কৃষি বাজার থেকে, ভারতে এই সমবায় সমিতিগুলি ক্রেডিট সেক্টরে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য বৃহৎ মাপের সেক্টর যেমন: আবাসন ও উন্নয়ন, মাছ ধরার বাজার, ব্যাঙ্কিং ইত্যাদিতে বিস্তৃত হয়। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি গঠন করা হয়।

 

ভোক্তা সমবায় সমিতি

এই সোসাইটিগুলি মূলত ভোক্তাদের জন্য যারা কম দামে গৃহস্থালীর পণ্য কিনতে চায়। সোসাইটি সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে পাইকারি হারে প্রচুর পরিমাণে পণ্য ক্রয় করে এবং সেগুলি সদস্যদের কাছে বিক্রি করে, এইভাবে একজন মধ্যস্থতার প্রয়োজনীয়তা দূর করে। ক্রয়কৃত পণ্য নগদে সদস্য এবং অ-সদস্যদের কাছে বিক্রি করা হয়।

 

উৎপাদক সমবায় সমিতি

এই ধরনের সমিতিগুলি ছোট-আকারের উৎপাদকদের প্রতি নজর দেয়। উৎপাদন এবং বিতরণ সমবায়ের মধ্যে থেকে পরিচালিত হয়। এই উৎপাদনকারীরা হতে পারে কৃষক, আয়ুর্বেদিক ভেষজ ওষুধ উৎপাদনকারী, জৈব পণ্য বিক্রেতা, দুগ্ধ, মাছ চাষী, হস্তশিল্প বা তাঁত উৎপাদনকারী, কারিগর ইত্যাদি। উৎপাদনকারীরা তাদের সম্পদের মধ্যে পুল করে, উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ায় এবং প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী বাজারের মুখে ঝুঁকি কমায়। 

 

বিপণন সমবায় সমিতি

বেশিরভাগই কৃষকদের সুবিধার জন্য, এই সমিতিগুলি সম্ভাব্য সর্বোত্তম মূল্যে লাভজনকভাবে পণ্য বাজারজাত করার জন্য, কৃষকদের দর কষাকষির শক্তি বাড়াতে এবং ব্যক্তিগত বিক্রয় এবং বাজার শোষণের অবস্থা থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য কাজ করে। তারা কৃষকদের বাজার মূল্য সম্পর্কে শিক্ষিত করে, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ স্থিতিশীল করে, তাদের ঋণ পেতে সহায়তা করে এবং পণ্যের গ্রেডিং, পুলিং, প্রক্রিয়াকরণ এবং সংগ্রহে সহায়তা করে এবং নিরাপদ স্টোরেজ এবং নির্ভরযোগ্য পরিবহন সুবিধা প্রদান করে। গুজরাটের মিল্ক কো-অপারেটিভ, মাহা গ্রেপ, কটন মার্কেটিং কো-অপস এর কিছু ভালো উদাহরণ।

 

সমবায় কৃষি সমিতি

আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল কৃষক ব্যক্তিগতভাবে তার কৃষি উৎপাদন সর্বাধিক করতে এবং সর্বোত্তম মুনাফা অর্জন করতে কাজ করে। ফার্মিং কো-অপস হল কৃষকদের জন্য তাদের জমির অধিকার ধরে রাখার একটি উপায়, এবং জমি, পশুসম্পদ এবং যন্ত্রপাতি এগুলোকে একত্রিত করে এবং প্রদত্ত অবদান অনুযায়ী মোট আউটপুটে একটি অংশ উপার্জন করে। উন্নত কৃষি সমবায়ে, সদস্যরা প্রাক-বপন, বীজ, সার এবং সরঞ্জাম এবং যৌথ বিক্রয়ের জন্য একত্রে কাজ করে, তবে আলাদাভাবে জমি চাষ করে।

এছাড়াও রয়েছে, কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি যার মাধ্যমে শহুরে এবং গ্রামীণ আর্থিক সমিতিগুলি সদস্যদেরকে কম সুদের হারে ঋণ প্রদান করে, সদস্যদেরকে ঐতিহ্যবাহী মহাজনী সংস্থার বিশাল ঋণ থেকে রক্ষা করে, যা এক অর্থে একটি মৌলিক কিন্তু অত্যন্ত ব্যক্তিগতকৃত ব্যাংকিং ভূমিকা পালন করে। হাউজিং সমবায় সমিতি যা মধ্যম এবং নিম্ন-আয়ের গোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন সরবরাহ করে।

ভারতে ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ ডেইরি ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া লি. সমবায়ের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ক্রেতা যদি ৪৮ টাকা দিয়ে দু’প্যাকেট দুধ কিনেন, দুধের উৎপাদকেরা তাঁর মধ্যে ৩৯ টাকা পেয়ে থাকেন। তার কারণ, দেশজুড়ে সমবায়ের বিস্তৃত উপস্থিতি, যারা চাষিকে গুণমান ও ওজন অনুযায়ী ন্যায্য দাম দেয়। ভারতের ২৭টি রাজ্যের প্রায় ২ লাখ গ্রামের ১ কোটি ৬৩ লাখ দুগ্ধ খামারি নিয়ে এ ডেইরি ফেডারেশন বর্তমানে বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কার্যক্রমটি পরিচালনা করছে। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মধ্যে আছে যানবাহন, স্টোরেজ, প্রসেসিং, এবং প্রতিটি স্তরে তাপমাত্রা ও শুষ্কতা নিয়ন্ত্রণ। ২০১৮১৯ অর্থবছরে এ ফেডারেশনের ২৯.৭২ কোটি মার্কিন ডলার লেনদেন হয়েছে।৩২,২৩ জাতীয় পর্যায়ে এরকম ২০ টি সমবায় সমিতি ভারতে রয়েছে, যার উপকারভোগী ভারতের কোটি কোটি মানুষ।

ভারতের সমবায় সমিতি লিজ্জত, যা একসময় খুব ক্ষুদ্র ছিল, কিন্তু এখন ভারতের পাপড়ের বাজার সেই পাপড় নির্মাতা নারীরা দখল করে নিয়েছেন। ত্রিপুরার পাক্স ও ল্যাম্পস সমবায় সমিতির নিরবিচ্ছিন্ন পরিষেবার তালিকায় রয়েছেস্বল্প সুদে ঋণপ্রদাণ,কনজিউমার্স স্টোর্স, রেশনসপ পরিচালন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সারবীজকীটনাশক ঔষধ সরবরাহ করা, গ্রামীণ হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রোগী ও শিশুদের খাদ্য সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড।৩৩ ভারতের সবগুলো রাজ্যেই কৃষক-উৎপাদক শ্রেণির সহায়তায় এরকম নানাবিধ সুবিধা রয়েছে।

 

জাপান ও বিশ্বের অন্যত্র সমবায় ব্যবস্থা

জাপান সমবায়কে অর্থনীতির তৃতীয় খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাপানে ৯১ ভাগ কৃষক সমবায় সমিতির সদস্য। সমবায়ের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।জাপানে বর্তমানে ৩৬০০০ সমবায় সংগঠন, যা ৬ লাখ ৪০ হাজার কর্মচারীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যার সদস্য ৮০ মিলিয়ন মানুষ। জাপানের জেননোহ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ কৃষি সমবায় সমিতিগুলোর একটি ফেডারেশন। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে সারা দেশে ৯৪৫টি সমবায় ইউনিয়নের মাধ্যমে পরিচালিত এ ফেডারেশনের বর্তমান মূলধনের পরিমাণ ১০৮ কোটি মার্কিন ডলার এবং বার্ষিক টার্নওভারের পরিমাণ ৪৩০০ কোটি ডলার। জেননোহর কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে চালসহ দানাশস্য উৎপাদন, টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি উৎপাদন, কৃষি ব্যবসা কার্যক্রম, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ, প্রাণিসম্পদ উৎপাদন কার্যক্রম,ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন দ্রব্যাদি সরবরাহ, কৃষিজাত পণ্য রফতানি কার্যক্রম ইত্যাদি।৩২    

এছাড়া, নরওয়ের ৯৯% ডেইরি পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে সমবায়ের মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ডের জাতীয় মোট উৎপাদনের ২২% আসে সমবায় খাত থেকে। সিঙ্গাপুরের ভোগ্যপণ্য সমবায়গুলো মোট বাজারের ৫৫% নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্রান্সের প্রতি ১০ জন কৃষকের ৯ জনই সমবায়ী। কোরিয়ায় ৯০% কৃষক সমবায়ী, কুয়েতে খুচরা বাজারের ৮০% নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সমবায়ের মাধ্যমে।৩৪  

উল্লেখ্য, সমবায়ের সদস্যরা সমবায়ের মালিক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার তাদের ওপরই থাকবে, অধিকার তাদের কাছেই থাকবে। তবে বর্তমানে বিশেষ করে বাংলাদেশে সমবায় সমিতি অকার্যকর এবং আমলা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আছে। সেখানে আমলাদের কঠোর খবরদারি আছে। সমবায় আইনটাকে আমলাতান্ত্রিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটা আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। আইন, বিধিসহ নানারকম জটিলতার কারণে এ সমবায়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, দাঁড়াতে পারছে না।৩৫

 

ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগগুলি  

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের ব্যক্তি পর্যায়ের বেশকিছু উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এগুলো ঠিক কো-অপারেটিভ নয়, তবে এখানে প্রো-পিপল আপ্রোচ রয়েছে। যেখানে উৎপাদকরা সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন কিংবা এলাকার তরুণরা উৎপাদকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজটাকে এগিয়ে নিচ্ছেন। আবার যেমন ঢাকাতে অনেক তরুণরা দোকান দিয়েছেন, যেখানে গ্রাম থেকে পণ্য কিনে বেঁচে থাকেন।

যদিও এখানে মূলত হাতেগোনা কিছু পণ্যের সরবরাহ হয়ে থাকে। যা একজন ভোক্তার সর্বোপরি পণ্য চাহিদা মেটাতে খুব সামান্যই অবদান রাখে। এখানটাতে নানারকম প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। রাজশাহীর একজন আম উদ্যোগতার ভাষ্যমতে, “কুরিয়ারে আম আটকে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটা সমস্যা আডভান্স নিয়ে। কাঁচামাল ক্যাশ অন ডেলিভারি দেয়া যায় না। ফলে এডভান্স নিতে হয়। তো অনেকে এডভান্স পেমেন্টটা করতে চায় না। মানে ট্রাস্ট ইস্যু। আর কাস্টমারদের মধ্যে একটা ব্যাপার খেয়াল করি আমি মেয়ে আমি আমের বিসনেসের কি বুঝি এই টেনডেনসি কাজ করে খুব।” যশোরে অনলাইনে নকশিকাঁথা ব্যবসায় জড়িত একজন তরুণ উদ্যোগতা জানাচ্ছেন, “টাকা থাকলে আমি ঢাকাতে একটা আউটলেট দিতাম। মানুষ চোখে দেখলে চাহিদা বাড়তো। অনেকে অনলাইনে দেখে ৬-৭ হাজার টাকার প্রোডাক্টে ভরসা পায় না। অথচ একই জিনিস আড়ং থেকে ১৫-২০ হাজার টাকায় কিনে। ব্যাংকের যে সুদের হার তাতে করে ঋণ নেবার কোন ইচ্ছে আপাতত নেই।”

অনলাইনে পণ্য পাবার অনিশ্চয়তা, পরিবহণ ব্যবস্থার সংকট, যথাসময়ে ভোক্তার কাছে পণ্য না পৌঁছানো, কোয়ালিটির হেরফের, উৎপাদকের পণ্য সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকা, বছরব্যাপী পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারা (মৌসুমির ফলনগুলির ক্ষেত্রে বা স্টক ফুরিয়ে গেলে), মূলধন না থাকা এমনসব নানা সংকট সেখানে পরিলক্ষিত হয়।

 

বর্তমান মডেল ও প্রস্তাবিত নতুন মডেলের পার্থক্য নিরূপণ

বাংলাদেশের বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হল অউৎপাদনশীল গোষ্ঠী। অউৎপাদনশীল এই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না, আবার ভোক্তাকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে পণ্য কিনতে হয়। আবার সিণ্ডিকেটচক্র সময়-অসময়ে তাদের যতেচ্ছা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। মূলকথা অকৃষিসমাজের নিকট এখানে কৃষিসমাজ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।

নতুন মডেলে কৃষিসমাজ অর্থাৎ উৎপাদনশীল গোষ্ঠী দ্বারা ব্যবস্থাটা পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থায় কৃষকের বিক্রয়কৃত পণ্যমূল্যের সাথে ভোক্তার সরবরাহকৃত পণ্যমূল্য পরস্পর সম্পর্কিত। এখানে কৃষক যেমন তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন, তদ্রুপভাবে ভোক্তা সর্বনিম্ন ও স্থিতিশীল দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। যেমন বর্তমানে একজন ভোক্তাকে ১ কেজি চাল কিনতে হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। কৃষককে যখন প্রতিমণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে  ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। নতুন মডেল কার্যকর হলে, একজন কৃষক সর্বনিম্ন ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় প্রতিমণ ধান বেচতে পারবেন। ভোক্তা প্রতিকেজি চাল কিনতে পারবেন ৪০ টাকার কাছাকাছি মূল্যে।অনুরূপভাবে, বর্তমান ব্যবস্থায় একজন কৃষককে প্রতিকেজি শসা বিক্রি করতে হয় ২ থেকে ১০ টাকায়, একজন ভোক্তাকে যা কিনতে হয় ২০ থেকে ৩০ টাকা দিয়ে। নতুন ব্যবস্থায় একজন কৃষক প্রতিকেজি শসা বেচতে পারবেন সর্বনিম্ন ১৫ টাকায়। ভোক্তা যা কিনতে পারবেন ২০ টাকার মধ্যেই।

বর্তমান ব্যবস্থা জাতীয় আয় বাড়াতে সহায়ক নয়। এতে করে লাভটা যায় ব্যবসায়ী নামক মুষ্টিমেয় একটি অউৎপাদনশীল গোষ্ঠীর নিকট। নতুন ব্যবস্থায় দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে মুখ্য অর্থনৈতিক খাত হিসেবে কাজ করবে। কৃষক-ভোক্তার সুবিধাপ্রাপ্তির পাশাপাশি এটি এই জাতীয় আয় বাড়াতে যেমন সহায়ক হবে তেমনি সমাজের ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটাবে।

আবার বাংলাদেশের টিসিবি বা ওএমএস-এর খাদ্য সুবিধা কর্মসূচীর দিকটাও সামনে আনা যায়। যার মাধ্যমে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে কিছু সংখ্যক মানুষ বাজার অপেক্ষা কম দামে পণ্য কিনতে পারছে। সেটা পাবার জন্য মানুষের  যে প্রতিযোগিতা-ছোটাছুটি বা বিষয়টি কতোটা অমানবিক ও অমর্যাদাকর সে আলাপে এখন যাচ্ছি না। আপাতত এটাই বলা যে টিসিবি বা ওএমএস যে দামে স্বল্পমেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে কিছু মানুষের পণ্য দিচ্ছে, বর্তমান মডেল কার্যকর হলে তার থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে এবং সর্বজনের জন্য টেকসইভাবে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। সেইসাথে কৃষকরা সরাসরি তার সুবিধাভোগী হবেন। তাছাড়া টিসিবি বা ওএমএসের পণ্যের দামে স্থিতিশীলতা নেই। অনেকটা বাজারের মতোই এখানে এক লাফে পণ্যের দাম কয়েকগুন বেড়ে যায়। এই লেখাটা যখন লিখছি তখন টিসিবির ভোজ্য তেল আগের তুলনায় লিটার প্রতি ১০ টাকা ও মসুর ডাল প্রতি কেজিতে ৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।৩৬,৩৭টিসিবি বা ওএমএস মতো কর্মসূচিগুলোর জন্য কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় বেশিরভাগ পণ্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে কেনা হয়ে থাকে। ফলে এসব কর্মসূচি জাতীয় আয় বাড়াতে কিংবা কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কোন সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে না, বরং এখানকার অব্যবস্থাপনা ও লুটপাটের জন্য রাষ্ট্রকে ভর্তুকি গুণতে হয়।

 

রেশন সুবিধা প্রদানে নতুন মডেলের ভূমিকা

বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়ও সরকার চাইলে অনেক কিছু বাজার থেকে মুক্ত করতে পারে। বাংলাদেশের মিল্কভিটা যার প্রমাণ রেখেছিলো কিংবা ভারত যে প্রমাণ রেখে চলেছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন এই মডেলের প্রয়োগও বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে চাইলে সম্ভব। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি। নতুন এই মডেল প্রয়োগে স্ব স্ব পেশায় কৃষিজীবীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটলেও অন্যান্য পেশাজীবীদের (কারখানার শ্রমিক, ইটভাটার শ্রমিক, চা শ্রমিক) অবস্থার পরিবর্তনে বিশেষ কোন প্রভাব ফেলবে না। কারণ তার সাথে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবর্তনের প্রশ্ন জড়িত।  যে শ্রমিক ২৫০ টাকা মজুরিতে কারখানায় আজ কাজ করেন, তখন পরিবারের নিত্য দিনের খাদ্য চাহিদা মেটাতেই তাকে বাধ্যতমূলক ওভারটাইম করতে হয় কিংবা সাথে সাথে অন্য একটা পেশা বেছে নিতে হয়। অসুখ হলে চিকিৎসা করানো তার জন্য একরকম বিলাসিতা। থাকতে হয় বস্তিতে কিংবা জীর্ণশীর্ণ কোন বাড়িতে। এমতবস্থায় নতুন মডেল কার্যকরকরণ খাদ্য চাহিদা মেটাতে তাকে স্বস্তি দিবে বৈকি, কিন্তু অন্যান্য মৌলিক চাহিদা তখনও তার ধরাছোঁয়ার বাইরে। এজন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে অতিদরিদ্রদের রেশন ব্যবস্থার প্রয়োজনের দিকটা চলে আসে।     

 

বাংলাদেশের রেশন ব্যবস্থা উচ্ছেদের কারণ

বাংলাদেশে বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের জন্য কোনো রেশনব্যবস্থা চালু নাথাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত বাংলাদেশের শহর ও গ্রামে রেশনব্যবস্থা চালু ছিল। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯২ সালে রেশনব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হলেও রেশনের আওতা ও বরাদ্দ কমানোর তৎপরতা শুরু হয় সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে।৩৮ কল্লোল মোস্তফার মতে,  এই রেশনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল, রেশনের আওতায় বিতরণ করা ভর্তুকি মূল্যের খাদ্যশস্যের একটা বড় অংশ গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বদলে শহরের সচ্ছল নাগরিক, সরকারি কর্মজীবী ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ভাগে পড়ত, সেই সঙ্গে দুর্নীতি ও কালোবাজারির সমস্যা তো ছিলই। এসব সমস্যার সমাধানে যথাযথ উদ্যোগ নানিয়ে দাতা গোষ্ঠীনামে পরিচিত বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকেই রেশনের বদলে বিভিন্ন ধরনের শর্তযুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হতে থাকে, যার দৃষ্টান্ত হলো কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (১৯৭৪) এবং ভিজিডি (ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট১৯৭৫)। বাংলাদেশের রেশনব্যবস্থা উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে এসব বিদেশি সংস্থার প্রভাবের দৃষ্টান্তস্বরূপ মার্কিন সংস্থা ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ইউএসএইড) এবং বিশ্বব্যাংকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা যায়। ১৯৭৮ সালের ফুড ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের শুরু থেকেই [ইউএসএইড] মিশনের একটি লক্ষ্য ছিল রেশনব্যবস্থাকে ছোট করে আনা এবং একপর্যায়ে এর একটা বড় অংশকে উচ্ছেদ করে দেওয়া। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে দিয়ে রেশনে ভর্তুকি কমানোর ব্যাপারে সক্রিয় ছিল, এই প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ইউএসএইড-এর সাথে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা। রেশনব্যবস্থার তুলনায় ওএএমএস বা খোলা বাজারে চাল বিক্রির কর্মসূচিকে তুলনামূলক বেশি ন্যায্য ও কার্যকর এবং সরকারের জন্য তুলনামূলক কম অর্থনৈতিক বোঝা সৃষ্টিকারী বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।৩৯ এভাবে কথিত দাতা সংস্থার পরামর্শে বাংলাদেশের সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে রেশন বাবদ ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়া এবং রেশনের মূল্য বাড়িয়ে ক্রমেই বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে রেশনকে ক্রমেই অনাকর্ষণীয় করতে থাকে। ১৯৮৯ সালে মডিফায়েড রেশনকে গ্রামীণ রেশন’-এ রূপান্তরিত করা হয় এবং একপর্যায়ে ১৯৯২ সালে গ্রামীণ ও সংবিধিবদ্ধ উভয় ধরনের রেশনই বন্ধ করে দেওয়া হয়।৩৮  

বাংলাদেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ রেশন সুবিধা না পেলেও সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের রেশন দেয়া হয় যাদের মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কারারক্ষী ও ফায়ার সার্ভিস। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা রেশন সুবিধা ভোগ করেন। প্রতি মাসে পুলিশের সব সদস্য প্রতি কেজি চাল ২ টাকা ১০ পয়সা এবং প্রতি কেজি গম ১ টাকা ৭৭ পয়সা দরে রেশন হিসেবে পান। আনসার, কারারক্ষী, ফায়ার সার্ভিস ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মচারীরাও একই দরে চাল ও গম উত্তোলন করেন। বিজিবি সদস্যরা প্রতি কেজি ২ টাকা ৫৫ পয়সা দরে চাল ও ২ টাকা ১৫ পয়সা দরে গম উত্তোলন করেন। স্বামী-স্ত্রী, এক সন্তানসহ কারও পরিবারের তিন সদস্য হলে মাসে ৩০ কেজি চাল, ২৫ কেজি আটা, ৭ কেজি ডাল, ৬ লিটার তেল ও ৪ কেজি চিনি পেয়ে থাকেন। কারও পরিবারের সদস্য স্বামী-স্ত্রীসহ চারজন হলে প্রতি মাসে ৩৫ কেজি চাল, ৩০ কেজি আটা, ৮ কেজি ডাল, ৮ লিটার তেল ও ৫ কেজি চিনি পেয়ে থাকেন। স্বামী-স্ত্রীসহ সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য রেশন সুবিধা দেওয়া হয়। জানুয়ারি ২০২০ থেকে পুলিশ বাহিনীর চাকরিকালীন রেশন সুবিধা বাড়িয়ে আজীবন করা হয়েছে।৪০

 

ভারতের রেশন ব্যবস্থা

চাইলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থায় কিছু বিশেষ খাতকেও (কিংবা পণ্য) সমাজে যাদের সবচেয়ে দরকার এবং যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি জনগণের সেই অংশকে কার্যকর ও মজবুত গণ-বণ্টন ব্যবস্থায় বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত করা চলে। এমনই এক উদাহরণ রয়েছে গোটা ভারত জুড়ে। ভারতে বহু বছর ধরেই গণবণ্টনব্যবস্থা (পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম) চালু থাকলেও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন-২০১৩-এর মাধ্যমে গ্রামের ৭৫ শতাংশ এবং শহরের ৫০ শতাংশ নাগরিকের জন্য এটাকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক মৌলিক অধিকারে পরিণত করা হয়। ভারতীয় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন বা এনএফএসএ-র আওতায় দুই ধরনের রেশন কার্ড রয়েছে‒অতিদরিদ্রদের জন্য অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (AAY) এবং অগ্রাধিকারভুক্তদের জন্য প্রায়োরিটি হাউসহোল্ড (PHH) রেশন কার্ড। ভারতে রেশনের দোকান বা ফেয়ার প্রাইস শপের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ। রেশন কার্ডধারী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২৩ কোটি ৭৫ লক্ষ, যার সুবিধাভোগী ৮১ কোটি মানুষ। দেশটির ৭৪ শতাংশ পরিবারের কাছে রেশন কার্ড রয়েছে। রেশন কার্ডের মাধ্যমে পরিবারগুলো রেশনের দোকান থেকে ৩ টাকা কেজি দরে চাল ও ২ টাকা কেজি দরে আটা ক্রয় করতে পারে। AAY কার্ডধারী অতিদ্ররিদ্ররা প্রতি মাসে ৩৫ কেজি এবং PHH কার্ডধারীরা পরিবারের সদস্যপিছু পাঁচ কেজি করে চাল ও আটা ক্রয় করতে পারে।৪১,৩৯ তেল, চিনি, ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতে পারে বাজার মূল্যের অর্ধেক দরে। এনএফএসএ-র আওতায় কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের বাইরে বিভিন্ন রাজ্য সরকার যেসব রেশন কার্ড ইস্যু করে, যেগুলোকে বলা হয় নন-এনএফএসএ রেশন কার্ড। বিভিন্ন রাজ্য সরকার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী এসব নন-এনএফএসএ কার্ডধারীদের রেশন প্রদান করে থাকে। যেমন, মিজোরাম সরকার ১৫ রুপি দরে ৮ কেজি করে চাল সরবরাহ করে। মেঘালয় সরকার ১০-১২ টাকা কেজি দরে পরিবার প্রতি ৮ কেজি করে চাল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭-৮ টাকা কেজি দরে ‌১-৫ কেজি আটা সরবরাহ করে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের খাদ্য সুরক্ষা যোজনা রেশন কার্ড-১-এর মাধ্যমে ২ টাকা কেজি দরে ২ কেজি চাল এবং ৩ কেজি গম পাওয়া যায়।৩৯

কল্লোল মোস্তফার মতে, রেশনব্যবস্থায় চুরি, দুর্নীতি, অনিয়মের সমস্যা যে সমাধান অযোগ্য কোনো বিষয় নয়, তার দৃষ্টান্ত হলো ভারতীয় রেশনব্যবস্থা। যেসব অভিযোগে বাংলাদেশের রেশনব্যবস্থা পুরোপুরি উচ্ছেদ করা হয়েছে, সেসব অভিযোগ ভারতীয় রেশনব্যবস্থার বিরুদ্ধেও ছিল। কিন্তু ভারতে রেশনব্যবস্থার এই দুর্নীতি ও অনিয়মকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সেই রেশনব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করা হয়নি; বরং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আইনি অধিকারে পরিণত করা হয়েছে ও নানা ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।৩৯ এ রকমই একটি পদক্ষেপ হলো, ভারতের পুরো রেশনব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন অর্থাৎ রেশন কার্ডের জন্য আবেদন করা থেকে শুরু করে রেশন সংগ্রহ পর্যন্ত সবকিছুই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা। ফলে সব রেশনের দোকান ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত। অনলাইন রেশন কার্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে রেশন কার্ড বাতিল, অন্তর্ভুক্ত করা ও পরিবর্তন করার কাজ করা হয়। রেশন কার্ডের আবেদন করার পর তা মোবাইল থেকেই অনলাইনে ট্র্যাক করা যায়। রেশন কার্ড এবং আধার কার্ডের মধ্যে সংযোগ ঘটানোর কারণে রেশন কার্ড নকল বা জালিয়াতি করা সম্ভব হয় না। বেশিরভাগ রাজ্যের গুদাম থেকে রেশনের দোকান পর্যন্ত সাপ্লাইন চেইন অটোমেশন করা হয়েছে। গুদাম থেকে মালবাহী ট্রাক নির্ধারিত গন্তব্যে যাচ্ছে কিনা তা অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা যায়। রেশন দোকানদার ও রেশন সুবিধাভোগীদের মোবাইলে মেসেজের মাধ্যমে রেশন আসবার খবর পৌঁছে দেওয়া হয়। সরকার এখন নিজ দায়িত্বে রেশনের দোকানে রেশন পৌঁছে দেয়, আগে যা গুদামে গিয়ে ডিলাররা সংগ্রহ করতো। বায়োমেট্রিক্স পরিচয় ব্যবহারের কারণে একজনের রেশন জালিয়াতি করে আরেকজন তুলে নেওয়া সম্ভব নয়। যার প্রতিটি ট্রানজেকশন অনলাইন পোর্টালে আপডেট হয়ে যায়। কারো কোন অভিযোগ থাকলে বিনাখরচে হটলাইনে ফোন করতে পারেন কিংবা অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে অভিযোগ জানাতে পারেন।৪২রেশন বিতরণের তথ্য অনলাইনে আপডেট করার ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের পক্ষে নজরদারি করা সম্ভব হয় সংশ্লিষ্ট দোকান থেকে কী পরিমাণ রেশন বিতরণ করা হয়েছে, কী পরিমাণ বাকি রয়েছে। রেশন বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে বিনা খরচে নির্দিষ্ট হটলাইনে ফোন করে বা অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করে অভিযোগ জানানোরও ব্যবস্থা রয়েছে।৪৩ শুধু তাই নয়, রেশন কার্যক্রম তদারকি করার জন্য স্থানীয় অধিবাদীদের সমন্বয়ে একটা কমিটি রয়েছে। যারা প্রতিমাসে একবার রেশনের গুনগত মান যাচাই করেন। রেশনের গুনগত মান সন্তোষজনক কিনা কেন্দ্র থেকে সে সম্পর্কে অবগত হতে কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।এছাড়া, খাদ্যের গুনমান ঠিকঠাক আছে কিনা ও বণ্টনে কোনোরকম নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে কিনা তা দেখভাল করতে রাজ্য সরকার সোশ্যাল অডিট করে থাকে।৪৪ বর্তমানে ‘ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে কেউ খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারেন। অর্থাৎ কলকাতার কোনও ব্যক্তি যদি কর্মসূত্রে মুম্বই বা গুজরাট যান, তাহলে তিনি সেখানকার নির্ধারিত মূল্যের দোকানে কার্ড দেখিয়ে খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারেন। গোটা ভারতের পরিয়ায়ী শ্রমিকরা এর ফলে বিশেষভাবে উপকৃত হচ্ছেন।৪৫ 

 

রেশনব্যবস্থা কার্যকরকরণে নতুন মডেলের ভূমিকা

কৃষককে তার ফসলের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে এবং ভোক্তাকে কৃষকের প্রাপ্ত মূল্যের সাথে সমন্বয় রেখে একটা নির্দিষ্ট মূল্যে পণ্য সংগ্রহে নতুন মডেলের ভূমিকার কথা আমরা ইতোমধ্যে আলোকপাত করেছি। একইসাথে দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে এবং মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে নতুন মডেল কতোটা সহায়ক হতে পারে তা বলা হয়েছে। এবং নতুন এই মডেলটি যেহেতু পণ্য ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট সেক্টরে সীমাবদ্ধ, রাষ্ট্রের শ্রেণীর প্রশ্নকে বিলোপ করতে যার অবদান নগণ্য, তখন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশন ব্যবস্থা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে। তাই  এখন আমরা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে রেশনব্যবস্থা কার্যকরকরণে নতুন মডেলের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কথা বলবার চেষ্টা করবো।

বাংলাদেশে চলমান নিরাপদ খাদ্য কর্মসূচিগুলোতে যেমন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপণা দেখা দিচ্ছে, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশন সুবিধা চালু হলে বর্তমান ব্যবস্থায় একই পরিস্থিতি ঘটতে বাধ্য। চলমান এসকল খাদ্য কর্মসূচির জন্য কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার কথা থাকলেও তার বেশীরভাগ কেনা হয় ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে। সেক্ষেত্রে সরকারকে অধিক ভর্তুকিও গুণতে হয়। অপেক্ষাকৃত কম টাকায় কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনায় হয়তো সরকারের আগ্রহ নেই, নয়তো ব্যবসায়ীসিণ্ডিকেটগোষ্ঠীর কাছে সরকার জিম্মি। বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা একটা অউৎপাদনশীল গোষ্ঠী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই অউৎপাদনশীলঅকৃষিসমাজ পুরো কৃষিসমাজের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করে আছে। যে কারণে ব্যবসায়ীসিণ্ডিকেটচক্রের পদচারণায় বাজার অনেক বেশী অস্থিতিশীল। উল্লেখ্য, অন্যদিকে ভারতের* বাজার স্থিতিশীল, যেটা শুধু এখন নয়, বহু আগে থেকেই। বিষয়টি একই সাথে রাজনৈতিকও। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিপরীতমুখী। যেখানে কৃষকভোক্তা উভয়কেই নির্বিচারে মুনাফার তাগিদে নিঃস্ব চলে চলেছে মধ্যস্বত্বভোগী নামক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। এমতাবস্তায় বাজারকে উৎখাত করে কৃষকভোক্তা উভয়েই সুবিধাভোগী হতে পারে এমন একটি ব্যবস্থার আবেদন প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠে। আর নতুন মডেলটি এ কারণেই প্রাসঙ্গিক। সেক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা রাখেনা, মডেলটি কার্যকর হলে অপেক্ষাকৃত কম ভর্তুকি দিয়ে সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশন সুবিধা চালু করতে পারবে। নিরাপদ খাদ্য কর্মসূচিগুলোর মতো আয়োজনগুলি তখন প্রয়োজন ফুরাবে, কারণ নতুন পদ্ধতিতে তার চেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।     

        

নতুন মডেল: টেকসই ব্যবস্থা ও বাড়াবে জাতীয় আয়

গোটা পৃথিবীর জন্য দরকার একটি টেকসই পণ্য ব্যবস্থা। নতুন এই মডেলটি সমাজতান্ত্রিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন প্রচলিত  যেকোনো ব্যবস্থাগুলি থেকে অধিক কার্যকর ও টেকসই হয়ে উঠবার মতো উপাদানে সমৃদ্ধ। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা একটি দীর্ঘ সংগ্রামের প্রক্রিয়া। এই মডেলে পুঁজিবাদকে সমূলে আঘাত করবার মতো নানা উপাদান রয়েছে। যেসব দেশ বা অঞ্চলে একই সাথে পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রবাদী ঝোঁক রয়েছে অর্থাৎ বাজারের শক্তিগুলোর উপর সবকিছু ছেড়ে না দিয়ে সামাজিক পরিকল্পনার উপর অনেকটা জোর দেওয়া হচ্ছে সেখানটায় এই মডেলটি অধিক কার্যকর হতে পারে। পূঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন কোন জনবান্ধব সরকার জনকল্যাণ ও কৃষকভোক্তার ন্যায্যতার কথা ভেবে মডেলটি গ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া, মুনাফামূখীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত মুনাফা থেকে মুক্ত করে দেশের জাতীয় আয় বাড়াতে মডেলটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারবে।

 

 

 

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: এই লেখাটি প্রস্তুত করতে লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, কুলসুম হেনা, উৎসব মোসাদ্দেক আমাকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।                                        

 

টিকা

চাল: বিশেষ ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে বিধায় স্টার চিহ্ন (*) ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ: কৃষকদের বর্তমান অবস্থা বোঝাতে সবগুলো বাংলাদেশের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যার বেশিরভাগ উদাহরণ কৃষক-অবান্ধব অন্যান্য দেশের সাথে একইভাবে বা সামান্য পার্থক্য ব্যতিরেকে মিলে যাবে।

ভারত: নানা রকম সুযোগসুবিধা থাকা সত্ত্বেও, ক্ষেত্রবিশেষ ভারতেও এই মডেলটি কৃষক-ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে কাঁচাবাজারের পণ্য ও প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে। সেখানকার অনেক সমস্যা ও সংকটের চিত্র বাংলাদেশের সাথে মিলে যায়। একটা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভারতে প্রতি ১০০ টাকার জিনিসে আলুতে চাষি পায় ২৭ টাকা, পেঁয়াজে ২৯ টাকা, টম্যাটোতে ৩২ টাকা, ডালে ৬০-৬৫ টাকা (Ashok Gulati and Harshabardhan, Indian Express, Kolkata Edition, March 2021, pp.7; Supply Chain Dynamics and Food Inflation in India, RBI Bulletin, October 2019, pp-100)। কারণ এগুলো সরকার কিনে না। ফল-সবজির বেলা ছবিটা মিশ্র।

তথ্যসূত্র

১) চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ। প্রথম আলো, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯।

২) Rice in Bangladesh, Bangladesh Rice Knowledge Bank, BRKB, BRRI, Gazipur

৩) পারভেজ, আলতাফ। ধানচাষের প্রতিবেদন: যেখানে কাঠামোগত সহিংসতার শিকার হয় কৃষিসমাজ। ঢাকা: ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ।

৪) কৃষি উন্নয়নে সমবায় ব্যবস্থা কার্যকর হোক। যুগান্তর, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।

৫) K. A. S. Murshid and others, Bangladesh food market performance: Insstability, Integration and Institutions, BIDS, 2013, p.22-23.

৬) মির্জা, মাহা। লকডাউনে কৃষক ও ভুখা মানুষের অর্থনীতি। প্রথম আলো, ২০ এপ্রিল ২০২০।

৭) কৃষকের ৪ টাকার আলুর কেজি বাজারে কেন ২০? বাংলা ট্রিবিউন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২।

৮) রহমান, ইয়াসিন। মাঠে ঠকছেন কৃষক, বাজারে ভোক্তা। যুগান্তর, ০৯ এপ্রিল ২০২২।

৯) কৃষককে ন্যায্য দাম দিলে দেশেই উৎপাদন বাড়বে। প্রথম আলো, ৫ অক্টোবর ২০১৯।

১০) পেঁয়াজ আমদানি না করলে বাঁচতো কৃষক। ডিডাব্লিউ, ১৫ মে ২০২০।

১১) রহমান, জাহিদুর। পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে কত দেরি। সমকাল, ২৬ অক্টোবর ২০।

১২) আহমেদ, রাজীব ও চাম্বুগং, ড্রিঞ্জা। গরিব সংকটে, মধ্যবিত্ত দুর্দশায়। প্রথম আলো, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২।

১৩) বিশ্বাস, রেজোয়ান। দশ জায়গায় চাঁদা দিয়ে সবজির দাম চার গুণ। কালের কণ্ঠ, ১০ এপ্রিল ২০২২।

১৪) রাতের কারওয়ান বাজারে চলছে নীরব চাঁদাবাজি। ডিবিসি, ২৭শে ডিসেম্বর ২০১৯।

১৫) চলছে চাঁদাবাজি। ইনকিলাব, ২৬ আগস্ট, ২০২০।

১৬) আজাদ, আবুল কালাম মুহম্মদ। চাঁদা আদায় এখন মাসিক চুক্তিতে, দেওয়া হয় কার্ড। প্রথম আলো, ৭ এপ্রিল, ২০২২।

১৭) পারভেজ, আনোয়ার। সবজির ট্রাকে এখন ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’। প্রথম আলো, ২৬ এপ্রিল ২০২২।

১৮) আলিম-উজ-জামান, কাজী। গরুর মাংসের কেজি ৭০০ টাকা কেন, কোন যুক্তিতে। প্রথম আলো, ৮ এপ্রিল, ২০২২।

১৯) লাহিড়ী, আশীষ (সম্পা.)। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান ও মার্কসবাদ। কলকাতা: পিপলস বুক সোসাইটি, ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ।

২০) Lebowitz, Build It Now: Socialism for the 21st Century, August 2006  

২১) Istvan Meszaros. বিয়ন্ড ক্যাপিটাল । নিউ ইয়র্কঃ মান্থলি রিভিয়ু প্রেস, ১৯৯৫: ৭৫৮-৬০।

২২) David Raby, দা গ্রীনিং অভ ভেনেজুয়েলা । মান্থলি রিভিয়ু ৫৬, সংখ্যা ৫, নভেম্বর ২০০৪: ৪৯-৫২।

২৩) ভট্টাচার্য, স্বাতি ও সরকার, অশোক। ফসলের রাজনিতিঃ বাংলার চাষির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। কলকাতা: অনুষ্টুপ প্রকাশনী, ২০২১।

২৪) National Food Security Portal, Department of Food & Public Distribution, Government of India

২৫) শেখ, জসিম উদ্দিন। একটি সমবায়ী স্বপ্ন। প্রথম আলো, ০৫ নভেম্বর ২০১৫।

২৬) তুহিন, আহসান হাবীব ও আলী, শওকত। বেসরকারি খাতে ব্যবসা ছাড়ছে মিল্ক ভিটা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।

২৭) সমবায়ীদের সফল উদ্যোগ মিল্ক ভিটা। ডিসি নিউজ, ২৭ আগস্ট ২০১৯।

২৮) হক, মেসবাহুল। মিল্ক ভিটার সদস্যদের ১৩২ কোটি টাকা সহায়তার প্রস্তাব। বণিক বার্তা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১।

২৯) মিল্ক ভিটা কমিয়ে দিয়েছে দুধ সংগ্রহ, দিশেহারা খামারিরা। প্রথম আলো, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।

৩০) মিল্ক ভিটায় তালিকাভুক্তি নিয়ে অনিয়ম, বিক্ষোভ। প্রথম আলো, ১৮ এপ্রিল ২০১৪।

৩১) দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণেই এমডি আক্রোশের শিকার? মিল্ক ভিটা সমাচার। প্রথম আলো, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩।

৩২) কৃষি উন্নয়নে সমবায় ব্যবস্থা কার্যকর হোক। যুগান্তর, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০।

৩৩) খরাঙ। সমবায় সমূহের ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতায়ন। ত্রিপুরা রাজ্য সমবায় ইউনিয়ন, অরুন্ধুতিনগর, আগরতলা,পশ্চিম ত্রিপুরা।

৩৪) মুকুল, মনজুরুল আলম। আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস ও বাংলাদেশ। রাইজিংবিডি.কম, প্রকাশিত: ৪ জুলাই ২০১৫, আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২০।

৩৫) প্রচলিত সমবায় আইন সংশোধন করতে হবে। বণিক বার্তা, ১৮ জানুয়ারি ২০২২।

৩৬) টিসিবির মসুর ডালের দাম বাড়ল কেজিতে পাঁচ টাকা। প্রথম আলো, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২।

৩৭) দাম বেড়েছে টিসিবির তেল ও ডালের। সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৩ জানুয়ারি ২০২২।

৩৮) From parastatals to private trade: Lessons from Asian agriculture (2008), ed. Shahidur Rashid, Ashok Gulati, and Ralph Cummings Jr. Chapter 5. Pp. 105-106, Johns Hopkins University Press.

৩৯) মোস্তফা, কল্লোল। বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, টিসিবির দীর্ঘ লাইন ও ভারতীয় রেশনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত সর্বজনকথা, ৪ মার্চ ২০২২।

৪০) আমৃত্যু রেশন পাবে পুলিশ। দেশ রুপান্তর, ৩১ জানুয়ারি, ২০২০।

৪১) National Food Security Portal, Department of Food & Public Distribution, Government of India

এক দেশ, এক রেশন কার্ড’-এ আপনার সুবিধা কী? 

৪২) Short film on PDS reforms  (2019), Department of Food & Public Distribution, GoI, ২০ ডিসেম্বর ২০২০, ইউটিউব।

৪৩) Short film on PDS reforms II (2019), Department of Food & Public Distribution, GoI, ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ইউটিউব।

৪৪) Short Film Impact of PDS reform (2019), Department of Food & Public Distribution, GoI, ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ইউটিউব)।

৪৫) ‘ভারতে এক দেশ এক রেশন কার্ড চালু হচ্ছে’। প্রথম আলো,  ১৭ মে ২০২০।

     

More Posts From this Author:

    None Found

Share this:

Leave a Comment

Your email address will not be published.

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top