বাদাম পাহাড়ে

Share this:

বাদাম পাহাড়ে

 

পাশের বিছানায় ঘুমাচ্ছে মোহাইমেন।

জাঈদ, যাকে আমরা ফ্রয়েডীয় অধ্যাপক ডাকি, নিজের চেয়ারে বসা আর আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছি তারবিছানায়।

‘মোহাইমেন অদ্ভুত একটা ইচ্ছার কথা কখনও কখনও বলে,’ ঘুমন্ত মোহাইমেনের দিকে তাকিয়ে জাঈদ বলল।

‘কী ইচ্ছা?’

‘সে মেডিক্যাল সেন্টারের ছাদে উঠে ঢাক বাজাবে আর চিৎকার করবে।’

‘মানে কী?’

‘এর একটা ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা আছে।’

বুঝলাম, মনঃসমীক্ষকেরা সচরাচর যা করে, আশেপাশের সবাইকে তারা যেভাবে কেস-স্টাডির বিষয় করে তোলে, মোহাইমেনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। মোহাইমেন পড়াশোনায় ভীষণ উদাসীন। তা সে হতেই পারে। তার সামনেসিলেবাসের কোনো টপিক নিয়ে আলোচনা উঠলে তার মনে হয়, সে একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে সে খুব চুপ হয়ে যায় আড্ডায় যখন কোনো যৌন প্রসঙ্গ আসে। সে এমনভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে যেন বিষাক্ত কিছুর সংস্পর্শে এসেছে। এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার না। আর, মোহাইমেনএকটা জিনিস খুব ভালো বুঝতে পারে, সেটা হলো বন্ধুদের ভেতরকার প্রচ্ছন্ন-অপ্রচ্ছন্ন কলহ আর বিরোধ। এসবকিছু নিয়ে কথা বলতে সে খুব স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আর কোর্স সংক্রান্ত কোনো কথা উঠলে সে অকাতরে সবারপ্রশংসা করে যায়।

ক্যাম্পাসে যখনই আমি মোহাইমেনের মুখোমুখি হই, আমার মনে হয়, ও কিছু একটা হারিয়েছে। আমি ওকে বলি, ‘মোহাইমেন, কী তুমি হারিয়েছ বাদাম পাহাড়ে?’

জাঈদ বলে, ‘সে এক তালপুকুরে তার প্রিয় পিটারকে হারিয়ে ফেলেছে।’

জাঈদ ‘পিটার’ শব্দটা দিয়ে পুরুষাঙ্গকে ইঙ্গিত করে এবং ব্যাখ্যা করে বলে, তালপুকুর মানে যৌন নৈতিকতারনিষিদ্ধ জল, ওর জন্য যা সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে।

মোহাইমেন লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। বোকার মতো হাসে।

এখন ঘুমের ভেতর পাশ ফেরে মোহাইমেন।

আমি জাঈদকে জিজ্ঞেস করি, ‘মেডিক্যাল সেন্টারের ছাদে ঢাক বাজানোর ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা কী?’

‘খুব সোজা। ওর মনোচিকিৎসার হিস্ট্রি আছে। মেডিক্যাল সেন্টার একটা ইমেজ যা ওর হতাশার সঙ্গে যুক্ত। আর, ঢাকের কাঠি হলো পুরুষাঙ্গ, এবং ঢাক হচ্ছে যোনি। ঢাক পেটানোর ভেতর দিয়ে ওর যৌন বাসনার প্রতীকী প্রকাশঘটছে। আর ও যে চিৎকার করতে চাইছে, ওটা হলো সবাইকে জানাতে চাওয়া ইচ্ছার ক্রন্দন। এটা মোহাইমেনেরএকটা ইমপ্লিসিট ড্রিম, যা ও জেগে জেগে দেখছে।’

জাঈদকে সত্যি সত্যি ফ্রয়েডীয় অধ্যাপক মনে হয়, লাকাঁ-ইয়ুংও আছেন তার কব্জায়।

মোহাইমেনের ঘুম ভাঙে। একটা তোয়ালে নিয়ে সে বেরিয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর মুখ মুছতে মুছতে ফিরে আসে।

জাঈদকে খুব উৎসুক দেখায়। নিশ্চয়ই কিছু একটা মাথায় এসেছে। সে মোহাইমেনকে বলে, তোমার ঢাক বাজানোরইচ্ছাটা দারুণ!’

মোহাইমেন হাসে।

জাঈদ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে, ‘আচ্ছা মোহাইমেন, তুমি কি তোমার পিটারকে কখনও ধরে দেখেছ?’

সে লজ্জা পায়। তাকে খানিকটা বিমর্ষ দেখায়।

‘ওটা কিন্তু হাত-পা-নাক-কানের মতোই শরীরের একটা অঙ্গ। খুব আলাদা কিছু না,’ বলতে বলতে জাঈদমোহাইমেনের দিকে একটা বই এগিয়ে দেয়।

বইটা জাঈদের টেবিলেই ছিল। কিছুক্ষণ আগে আমি উল্টে-পাল্টে দেখছিলাম, তান্ত্রিক যৌনতা নিয়ে একটাসচিত্র বই।

জাঈদ ওকে বলে, ‘এটা পড়ো আর তোমার পিটারকে স্পর্শ করো।’

মোহাইমেন কৌতূহলী হয়ে বইটা হাতে নেয়।

আমরা মোহাইমেনকে ঘরে রেখে বেরিয়ে যাই। বটতলায় চা আড্ডার সময় মোহাইমেনের কথা আমার একবারওমনে পড়ে না। হলে ফেরার পথে জাঈদই আমাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে যায় আবার।

জানালার ভেতর হাত গলিয়ে একটা ছোট রড টেনে দরজা খোলে জাঈদ। ভেতরে ঢুকে দেখি, মোহাইমেন বালিশেমুখ গুঁজে শুয়ে আছে। বইটা পড়ে আছে মেঝেতে।

‘মোহাইমেন!’

সে মুখ তুললে তার দিকে তাকানো গেল না। চোখে পানি গড়াচ্ছে। কাঁপছে, যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে ওর উপরদিয়ে। বোঝা যাচ্ছে ভীষণ মুষড়ে পড়েছে। চোখে-মুখে অদ্ভুত একটা আকুতি, যেন শিগগিরই তাকে ফাঁসির মঞ্চেতোলা হবে, কিন্তু সে বাঁচতে চায়।

আমার মনে হয়, মোহাইমেন সত্যিই কিছু হারিয়েছে। নয়তো সে নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে কোনো একবাদাম পাহাড়ে, সেখানে কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে দিশাহীনভাবে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝরাপাতার ভেতর, আর নিজেরই পায়ের শব্দে চমকে উঠছে বারবার।

 

 

প্রশ্নোত্তর

শুদ্ধস্বর: গল্প লেখার ব্যাপারে আপনার তাড়নার জায়গাটা কোথায়? অর্থাৎ কোন বিষয় এবং ঘটনাগুলো আপনাকে গল্প লেখার জগতে পৌঁছে দিলো?

রায়হান রাইন: গল্প লেখার তাড়না অবশ্যই জৈবিক তাড়নার চেয়ে আলাদা কিছু। আমরা ক্ষুধা বা যৌন প্রেষণায় যেভাবে তাড়িত হই, গল্প লেখার তাড়না তো সেরকম কিছু না। কিন্তু একেবারে গোড়ার দিকে দেখলে, এই তাড়নার পেছনেও জৈব দেহের ভূমিকা আছে, যেভাবে আমাদের প্রাকৃত দেহ ভাষার অধীন হয়ে আমাদেরকে নানা এক্সপ্রেশনের দিকে ঠেলে দেয়। আমরা প্রতীকের অরণ্যে হারিয়ে ফেলা আমাদের সত্তাকে খুঁজি। এই তাড়নাটা সব শিল্পের মধ্যেই আছে, চিত্রশিল্প বা সংগীত যেটাই বলি না কেন।

কিন্তু ছবি না এঁকে বা সংগীত চর্চা না করে অক্ষর নির্মিত এক সন্মোহনী জগতের দিকে যে ছুটছি তার একটা বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত ছিল। শৈশব-কৈশোর জুড়ে আমাদের চারপাশে, খুব কাছাকাছি ছিলেন নানারকম কথক। তারা কাহিনি বলতেন-রূপকথা-উপকথা কিংবা কিংবদন্তির কাহিনি। ছিলেন পেশাদার কথকেরাও। তারা পুঁথিপাঠ করতেন। পালা করতেন। কখনও কখনও কেবল কাহিনি বলার জন্যেও কথক বায়না করে আনা হতো। এদের মধ্যে কোনো কোনো দল ঢোল-বাদ্যসহ পুঁথির কাহিনি বলতেন- কথার মাঝে মাঝে বিশেষ জায়গায় গান জুড়ে দিয়ে। ছিল বক্স থিয়েটার। আমাদের বাড়ির লোকেরাও এতে অংশ নিতেন। আমরা একই নাচারি পালার চার-পাঁচ দলের করা চার-পাঁচ রকম গীতাভিনয় দেখতাম। সেই সময় কাহিনির জগৎ দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা দারুণ এক সন্মোহনের জায়গা হয়ে ওঠে।

আমরা যে গল্প লিখি, সেগুলো যতই বাস্তবের বোধ তৈরি করুক, শেষ অব্দি তার সবই ইল্যুশন। কাজেই যে কুহকী জগৎটা শৈশব-কৈশোরে আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করেছে, হয়তো সেই জগৎটাই আবার খুঁজে নিয়েছি এক সময়, গল্প ব্যাপারটাকে আলাদা করে বুঝতে শেখার পর।

শুদ্ধস্বর: কীভাবে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং অভিজ্ঞতা আপনার গল্পকে আকার দেয়?

রায়হান রাইন: প্রথমে বলে নিই, আমরা যাকে অভিজ্ঞতা বলি সেটা থেকে বুদ্ধি বা কল্পনাকে আলাদা করা যাবে না। এটা বলছি, কারণ অভিজ্ঞতা ছাড়া বুদ্ধি বা কল্পনা কাজ করতে পারে না, আবার যখন আমরা ‌‌’কোনোকিছু’র ‘অভিজ্ঞতা’ নিই, তখনও সেই প্রক্রিয়ায় বুদ্ধি আর কল্পনার ভূমিকা থাকে। কেউ যখন আত্মজীবনী লেখেন সেখানে যেমন অভিজ্ঞতা প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে, তেমনই ফিকশন বা ফ্যান্টাসি লেখার সময়েও। ফিকশন লেখার সময় অভিজ্ঞতার উপাদান না থাকলে সেখানে বুদ্ধি বা কল্পনাশক্তি কাজ করবে না।

আমার ধারণা, অভিজ্ঞতা লেখার জন্য কেবল উপাদান যোগায় না, এটা লেখার শৈলীকেও উসকে দেয়। কোনো ঘটনা বা কাহিনিকে যখন আমরা বাস্তবে ঘটতে দেখি সেটা একটা আলাদা উপলব্ধি সৃষ্টি করে এবং এই উপলব্ধি হয়ে ওঠে সেই ভূমি যেখানে পা রেখে আমরা আকাশ অব্দি মাথা তুলতে পারি।

শুদ্ধস্বর: আপনি কি মনে করেন সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব কথাসাহিত্যের উপর রয়েছে বা থাকা উচিত? আপনার অভিজ্ঞতা এবং পঠনপাঠনের আলোকে বলুন।

রায়হান রাইন: শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা  নামের উপন্যাসটার কথা মনে পড়ল। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর দি আগলি এশিয়ান, মিলান কুন্ডেরার দি বুক অব লাফটার এন্ড ফরগেটিং এবং গিওর্গি কারাসলাভোভের ট্যাঙ্গো উপন্যাসের নামও চটজলদি মনে পড়ছে।

কথাসাহিত্য যে মানব পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করে, রাজনৈতিক বাস্তবতা তার অংশ। আরও সূক্ষ্ণভাবে দেখলে বর্তমানের রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে একটা অনিবার্য অংশ এবং প্রায় সর্বব্যাপী, কাজেই কথাসাহিত্যে এর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

বর্তমানের রাষ্ট্র কাঠামো এমন যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি, তার দেহ, বায়ো-পলিটিক্যাল দেহে পরিণত হচ্ছে। ক্ষমতার ন্যারেটিভ এখন জীবনের অতিক্ষুদ্র সব ঘটনার ভেতর দিয়েও নিজেকে জাহির করে। মানুষের প্রতিটি নড়াচড়া এবং অভিব্যক্তির ভেতর এখন শনাক্ত করা যায় রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকাশ। কাজেই সাহিত্যে একে এড়িয়ে যাওয়া মানে জীবন-পরিস্থিতির একটা অনিবার্য অনুষঙ্গকে এড়িয়ে যাওয়া।

তাছাড়া রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ফিকশনের এক অদ্ভুত যোগাযোগ আমরা উপলব্ধি করছি- রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন অনেক বেশি ফিকশানাল। রাষ্ট্রের যে রোমান্স সেটার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ফ্যান্টাসি। ক্ষমতা এই ফ্যান্টাসি  উদযাপন করে। সাম্প্রতিক কথাসাহিত্যের এক অমিত সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে এই বাস্তবতা।

শুদ্ধস্বর: এমন একটি ছোটোগল্প সম্পর্কে বলুন যা আপনাকে কাঁদিয়েছে বা আপনার চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা দিয়েছে।

রায়হান রাইন: আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‌‘কান্না’ গল্পটার কথাই প্রথমে মনে এলো। গল্পটা পড়ে বিষণ্ন না হয়ে উপায় নেই। তবে চিন্তা ও বোধকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয় আন্তন চেখভের ‘বাজি’ গল্পটা, এটা পড়ার পর বোধের ভেতর একটা ওলট-পালট ঘটে যায়, আমরা বুঝতে চেষ্টা করি, কী সেই রহস্য যা তরুণ আইনজীবীর বাজিতে জেতাটাকে অর্থহীন করে দিলো? আবার কোরীয় কথাসাহিত্যিক হান ক্যাংয়ের ‘দি ফ্রুট অব মাই উইম্যান’ গল্পটা অন্তর্গত রক্তক্ষরণ ঘটায়। অন্যদিকে মিলান কুন্ডেরার ‘এডওয়ার্ড ও ঈশ্বর’ চিন্তার ভেতর আলোড়ন সৃষ্টি করে, কিন্তু আমাদেরকে বিষণ্ন করে না।

তবে মিলান কুন্ডেরার ‘দি হিচহাইকিং গেম’ গল্পটা বোধকরি সব কটা ঘটনা একসঙ্গে ঘটায়- এই গল্প পাঠকের বোধকে যেমন নাড়িয়ে দেয়, তেমনই তাকে বিষণ্নও করে।

একটু আগে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ফিকশনের সম্পর্ক নিয়ে বলছিলাম। কুন্ডেরার হিচহাইকিং গেমে আমরা দেখতে পাই এক জুটিকে, এক যুবক এবং যুবতি, যারা ফিকশনের কবলে পড়েছে। তবে ঠিক স্কুইড গেম-এর মতো করে নয়, যেখানে খেলাটাই বাস্তব। হিচহাইকিং গেমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে বাস্তবকে। সেখানে ফিকশন আর বাস্তব পরস্পরের জায়গা নেয় এবং একটা ঘটনাগুলো একটা করুণ পরিণতির দিকে এগোয়। আমরা গল্পের শুরুতে দেখি, যুবক এবং যুবতি একটা গাড়িতে করে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে কোথাও। পথে গাড়িচালক যুবক গ্যাস নেওয়ার জন্য একটা গ্যাস স্টেশনে ঢোকে এবং যুবতি এগিয়ে যায় একটা কুঞ্জবনের দিকে, সেখান থেকে বেরিয়ে সে যুবকের জন্য অপেক্ষা করে এবং গাড়ি দেখতে পেয়ে কৌতুকবশে একটা খেলায় ঢুকে পড়ে, যেন সে এক অপরিচিত হিচহাইকার, এমনভাবে হাত নেড়ে গাড়িটাকে থামায়, খেলা বুঝতে পেরে যুবক জিজ্ঞেস করে, ‌‘কোথায় যাবেন?’যদিও তারা পরস্পরের পরিচিত কিন্তু মেয়েটি অপরিচিত এক মেয়ে হিসেবে যুবককে প্রলুব্ধ করে, যুবকও তাতে সাড়া দেয়, তাদের পুরনো সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলে রোমান্স। কিন্তু যুবতি যুবকের মধ্যে এমন এক চরিত্রের দেখা পায় যাকে সে ভয় পায়, সে ঈর্ষান্বিত হয়, যদিও সেটা ছিল খেলা, সে আতঙ্কিত বোধ করে, খেলা থেকে বেরোতে চায়, কিন্তু যুবক খেলা চালিয়ে যায়। ফিকশন বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। খেলার ভেতরকার ঘটনাগুলো তাদের গন্তব্যকে পাল্টে দেয়, শেষে যুবতি এক করুণ পরিণতির ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করে।

এই গল্প আমাদের পরিচয় এবং অস্তিত্বের ভিত নাড়িয়ে দেয় এবং গল্পের শেষে মেয়েটির মধ্যে যে হাহাকার জন্মে সেটা আমাদের অস্তিত্বের ভঙ্গুরতাকে  সামনে এনে আমাদেরকেও স্পর্শ করে এবং আক্রান্ত করে।

শুদ্ধস্বর: আপনার গল্প লিখতে আপনি কীভাবে কাঠামো, ভাষা এবং ব্যাকরণ নির্মাণ/ব্যবহার করেন? আপনি কি নিজস্ব ফর্ম গড়তে এবং ভাঙতে অভ্যস্ত?

রায়হান রাইন: সব গল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারগুলো একইভাবে ঘটে না।

কিছু ইমেজ কিংবা কিছু মুহূর্ত থেকে প্রক্রিয়াটা শুরু হতে পারে, কিংবা কাহিনির কিছু ভাঙা অংশ। তারপর কার্যকারণের একটা নেটওয়ার্ক পুরো আখ্যানটাকে স্পষ্ট করে তোলে। কোথায় ঘটনাগুলো ঘটছে, কী কী ব্যাপার চরিত্রগুলোকে তাড়িত করছে, কনফ্লিক্টটা কোথায়, এগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠলে পয়েন্ট অব ভিউ, ন্যারেটিভ স্টাইল ঠিক করার ব্যাপার আসে। এসব ব্যাপার হয়তো এতটা একরৈখিকভাবে ঘটে না। আসল ব্যাপার হলো আমি যা দেখছি, সেই দেখাকে কোন প্রক্রিয়ায় আমি প্রকাশ করতে চাই।

আমার সর্বশেষ গল্প সংকলন কয়েকটি সাদা কাঠগোলাপ-এর গল্পগুলো পরিমিত বাক্যে লেখা। গল্পগুলোর পরিসর এতই ছোট যে, সামান্য বাড়তি ঘটনা বা বাক্য যেন পাত্র উপচে পড়বে।

একটা আলাদা ফর্ম গড়ে উঠতে পারে যদি পুরো লিখন প্রক্রিয়া এবং লেখার বিষয়বস্তুকে একেবারেই আলাদা চোখে, ভিন্ন তল বা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারা যায়, সেখানেই নিহিত থাকে লেখকের অন্তর্দৃষ্টি, যা সৃষ্টি হয় লেখকের জীবনাভিজ্ঞতার বোঝাপড়া থেকে। আমি বিশ্বাস করি, লেখকের সচেতন প্রয়াস এটাকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই চেষ্টাটা আমাকে সব সময় করে যেতে হয়।

শুদ্ধস্বর: আপনার কাছে একটি সার্থক ছোটোগল্পের মূল উপাদান কী?

রায়হান রাইন: আমার ধারণা একটি মাত্র দিকের উপর এটা নির্ভর করে না। আর সার্থকতা কথাটারও নানান অর্থ আছে। তবে যদি ধরে নিই আকর্ষণীয় এবং মনের উপর তীব্র প্রভাব ফেলতে সক্ষম গল্পই সার্থক গল্প, তবে এমন গল্পের ক্ষেত্রে বেশি জরুরি ব্যাপার হলো কীভাবে গল্পটা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ ফর্ম বা ন্যারেটিভ স্টাইল। একই বিষয়বস্তু নিয়ে একাধিক গল্প বলা যেতে পারে, কিন্তু  আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে সেই গল্পটাই যার বলার ধরন অভিনব এবং বিস্ময়কর।

শুদ্ধস্বর: লেখকের রাজনৈতিক বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ? রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অন্যায্যতার বিরুদ্ধে লেখকের কোন ধরনের ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

রায়হান রাইন: লেখক নিজে এবং তার চরিত্রেরা যে পরিস্থিতির ভেতর বাস করে, আগেই বলেছি, সেটা এখন অনেক বেশি রাজনীতি দিয়ে নির্ধারিত, সেই রাজনীতি স্থানিক এবং বৈশ্বিক উভয়ই। বলেছি, মানব পরিস্থিতির মতো ব্যক্তির দেহটাও, তার সুখ এবং যন্ত্রণাসমেত, হয়ে উঠেছে অনেক বেশি বায়ো-পলিটিক্যাল। সমকালীন বাস্তবতাকে তাই রাজনৈতিক বোধ ছাড়া পুরোপুরি ধরা যাবে না।

আমরা এদেশে যে রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর বাস করি, অন্যায্যতা তার আঁতে মিশে আছে। সবচেয়ে মারাত্মক যেটা, আমরা দেশের মানুষজন এসবের সঙ্গে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, যেন সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে চলছে, কেবল চরম কিছু ঘটলে আমরা নড়েচড়ে উঠি। কিন্তু এই চরম পরিস্থিতিও নিত্যকার ব্যাপার হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে অন্যায্যতার বিরুদ্ধে একজন লেখক অবশ্যই ভূমিকা রাখবেন এবং সেই ভূমিকা নানাভাবে তিনি রাখতে পারেন। এটা ঠিক যে, এসব অন্যায্যতার প্রতিবিধান করতে হলে যেভাবে রাস্তার লড়াইয়ে শামিল থাকতে হবে সব সময়, এখন লেখককে যদি সেই লড়াই করে যেতে হয়, তিনি হয়তো আর লেখার টেবিলে ফেরার সময় পাবেন না। কিন্তু অনাচার এবং অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাকে কথা বলে যেতেই হবে।

শুদ্ধস্বর: আপনি এখন কী লিখছেন? আপনার বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।

রায়হান রাইন: লিখছি উপন্যাস। একটি গুপ্তহত্যার আগের দিনগুলো নামে এর একটা অংশ ছাপা হয়েছিল গত বছর একটা ঈদ-সংখ্যায়। উপন্যাসটা এখন শেষের পথে এবং ঘটনা-পরম্পরা যেদিকে এগোচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, নামটা পাল্টে ফেলতে হবে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বিষয় টর্চার, নির্দিষ্ট করে বললে, স্টেট টর্চার। অপহরণ এবং টর্চার সেলে নির্যাতনের পর শাফায়েত নামের চরিত্রটি তার নিজের সত্তা এবং কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে। নিজের হারানো কণ্ঠস্বর খুঁজতে গিয়ে সে পরিচিত একটা কণ্ঠ নিজের ভেতর শুনতে পায়, যে তাকে নিজের নিয়তি খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে অ্যাক্টররা ঘিরে আসতে শুরু করে। সে ভাবতে বাধ্য হয়, তাকে যদি মরতে হয়, ঠিক কোন উপায়ে, কী দিয়ে মারা হতে পারে তাকে? এভাবে এগোচ্ছে উপন্যাসটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
error: Content is protected !!