‘বিয়ের প্রলোভন’, ধর্ষণ ও প্রতারণা বিষয়ে

Share this:

‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ সংক্রান্ত বেশ কিছু আলাপ চোখে পড়লো। আলাপগুলোর মূল বক্তব্য হচ্ছে- এই ধরনের ঘটনা মোটেই ধর্ষণের মতো সিরিয়াস  বিষয় না, এগুলো প্রতারণার পর্যায় পড়ে।

এই আলাপটাকে আমি একটু এগিয়ে নিতে আগ্রহী।

সঙ্গমের আগে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা আসলে প্রতারণার পর্যায়েও পড়ে না। সঙ্গমের আগ মূহুর্তে কারো কাছে থেকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি আদায় করা বরং সিরিয়াস ধরনের ব্লাকমেইল। এই ধরনের ব্লাকমেইল’কে বরং ক্রিমিনাল অফেন্সের আওতায় আনা উচিৎ।

তো এখন প্রশ্ন আসতে পারে, একজন নারীর কী কেবল মাত্র নিজের স্বামীর (ভবিষ্যৎ) সাথেই সহবাসের আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে না? অবশ্যই পারে। তা নিয়ে তো সমস্যা নেই।

আলাপটা আরেকটু সহজ করি,

এই পৃথিবীতে যারা একদিনের জন্যেও প্রেম করেছে, এক মূহুর্তের জন্য হলেও তাদের বেশিরভাগ মানুষই ভেবেছে সঙ্গীর সাথে স্থায়ীভাবে একসাথে থাকার কথা। সেকথা তারা হয়তো পরস্পরকে জানিয়েছে একাধিকবার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকল প্রেমের পরিনতি স্থায়ীভাবে বসবাসের দিকে আগায়নি, আগাতে পারেনি এবং সকলের ক্ষেত্রে তা হয়তো কোনোদিনই আগাবে না।

নারী ও পুরুষ’সহ এই পৃথিবীতে যত বাইনারি নন-বাইনারি জেন্ডারের মানুষের বসবাস, সময়ের সাথে সাথে তাদের প্রত্যেকেরই রুচি বদলায়, অভ্যাস বদলায়, চাহিদা বদলায়, আগ্রহ আর আকাঙ্ক্ষা বদলায়, বদলায় প্রয়োজন এবং আবেগ।  আবেগ স্থায়ী কিছু না। স্থায়ী কিছু না কোনো সম্পর্কও। সবকিছুই পরিবর্তনশীল এই মহাপৃথিবীতে।

এবার ধরুন, একেবারে মন থেকেই যদি কেউ তার সঙ্গীকে জানায় যাপিত জীবনের সমগ্র সময় একসাথে ভাগবাটোয়ারার বিষয়ে, এবং পরবর্তীতে যদি তার আগ্রহ বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, সঙ্গীর সম্পর্কে আবেগ বদলায় এবং ধীরে ধীরে তাকে অপছন্দ করতে শুরু করে, তাহলে কোন যুক্তিতে মানুষ তেমন কারো সাথে থাকতে চাইবে?

চাইবে না। এটাই স্বাভাবিক। এটাই নিয়ম। এটাই সাইন্স।

নিছক আবেগেবন্দী প্রতিশ্রুতিকে উদ্ধৃত করে আপনি যদি বলেন- সে আপনার সাথে প্রতারণা করছে তাহলে সেটা হবে মানুষের সমগ্র অগ্রগতিকে, পরিবর্তনশীলতাকে, চিন্তা করার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ফ্রি উইলের বিরুদ্ধে একটা মৌলবাদী অবস্থান।

এর মধ্য দিয়ে হবে মানুষের মনজগতের পরিবর্তনশীলতাকে সরাসরি অস্বীকার করা। অস্বীকার করা হবে চিন্তা এবং চর্চার স্বাধীনতার ইতিহাসকে।

প্রতারণা তখনই হয়, যখন কেউ কোনো কিছু নেবার পরিবর্তে কোনো কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। সঙ্গমে নেবার মতো তেমন কিছু নেই। এই ক্রিয়ায় অংশ নেয় দুজনই। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি পরিশ্রম দুজন মানুষেরই প্রায় সমান হয়। ক্যালরি ক্ষয় হয় দুজনেরই। দুইজনের প্লেজারে হয়তো তারতম্য ঘটতে পারে, তবে সঙ্গমের মধ্য দিয়ে কারো কাছে থেকেই কারো নেবার মতো কিছু নেই অভিজ্ঞতা ছাড়া।

সঙ্গমে বিনিময়ের কোনো বিষয় নেই৷ বিষয়টা যৌথতার। যৌথতা থেকে একজন বেরিয়ে আসতে চাইলে সেটা তার সিদ্ধান্তের ব্যাপার (নারী, পুরুষ’সহ সকলের ক্ষেত্রেই)। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা বরং দৃষ্টিকটু বিষয়, নিজেকে ভোগের পণ্য হিসেবে স্বীকার করার সবচেয়ে নোংরাতম কৌশল।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি কী নারীরা সঙ্গীকে দেয়নি কোনোদিন? তারা কী ব্যর্থ হয়নি প্রতিশ্রুতি  রক্ষা করতে? হয়েছে। লক্ষকোটিবার হয়েছে। এই বাংলায়, এই জমিনেই হয়েছে।

কিন্তু সঙ্গমের পর, বহুকাল-বহুকাল পরেও যদি তারা সেই প্রতিশ্রুতি থেকে নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় সরে আসে- তাতে কোনো নারীর নামে ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ মামলা করা যায়না। আইনে সে উপায় নেই।

যায়না কারণ, উক্ত আইনে নারী কেবলই ভোগের বস্তু। সে আবার কীসের প্রতিশ্রুতি দেবে? প্রতিশ্রুতি তো দেবে ভোক্তা। পুরুষ। ভোগ করার পর মালিকানা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরুষের। পুরুষই যেহেতু মালিক আইনের চোখে৷

কিন্তু, নারী তো কোনো পণ্য না। পুরুষের ভোগ্যপণ্য তো অবশ্যই না। পুরুষের তুলনায় কোনোভাবেই কম মানুষও নয় নারী। ঐতিহাসিক বিবর্তন দেখলে বরং নারীকেই মনে হয় পুরুষের তুলনায় অধিক মানুষ।

যে কৃষি সভ্যতার উপর বিরাজ করছে আমাদের সমগ্র বর্তমান, সেই কৃষি সভ্যতার সূচনা নারীর হাতেই। নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচনা করা সমগ্র সভ্যতার অপমান ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু নারী নিজেই যখন নিজেকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে জাহির করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, যখন এই ধরণের পুরুষতান্ত্রিক আইনের আশ্রয় নেয়, তখন সেটা হয় সমগ্র প্রজাতির চিন্তার অগ্রগতিকেই অপমান করা।

কিন্তু এতে সমাজের ৮-১০ জন সাধারণ নারীর কোনো দোষ আসলে নেই। সিংহভাগ নারীকে বড়ই করা হয়েছে ভোগ্যপণ্য হিসেবে, অনেককে শিক্ষি দীক্ষা দেওয়া হয়েছে কেবলই বিত্তশালী বাড়িতে বিয়ে দেবার বাসনায়। একটার পর একটা বিউটি প্রডাক্টের বিজ্ঞাপনে চাউর হয়েছে নারীর পরিবেশে সেই শৈশব থেকেই।

এমন একটা পুঁজিতান্ত্রিক-পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে নারীরা যখন নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে নিজেরাই এগিয়ে আসে, তখন আসলে অবাক লাগে না।

কিন্তু অবাক লাগে যখন এইসব বিষয় বুঝেও কোনো নারী এই ধরণের পুরুষতান্ত্রিক আইনের আশ্রয় নেয়, তার সাথে থাকতে চায়না এমন পুরুষকে আইনি হুমকির জোরে একসাথে থাকতে বাধ্য করে, যখন কাউকে দখল করতে চায় সে মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে।

এ ধরনের আচরণকে সাধারণ বাংলায় বলে ছ্যাচড়ামি।

অবশ্য এসব মামলায় জড়িয়ে যাওয়া পুরুষদের জন্য হাসিও পায়। শেষপর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের কঠিন শিকার যে পুরুষ নিজেই- এ বিষয়ে তবুও তারা বুঝতে পারেনা। তবুও পুরুষতন্ত্রের ক্ষমতাকাঠামের সমস্যা খুঁজে পায়না পুরুষেরা। সংস্কারের প্রয়োজন মনে করে না নারীর উপর থেকে কর্তৃত্ব হারাবার ভয়।

এই আইনটির এবং এর প্রয়োগের সবচেয়ে বাজে বিষয় হচ্ছে- এই আইনে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে তেমন কোনো মেরিট লাগেনা। চাইলে যেকোনো নারীই যেকোনো পুরুষের বিরুদ্ধে এই মামলা করে বসতে পারে যে কোনোদিনই, এমনকি প্রথম পরিচয়ের পরদিনও৷

অভিযোগ প্রমাণ হওয়া না-হওয়া তো আদালতের বিষয়। এবং কঠিন বিষয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি তো মানুষ বহুজনকে সাক্ষী রেখে সাধারণত দেয়না, কোনো দলীলে দস্তখত করেও দেয়না এই প্রতিশ্রুতি, দিলে দেয় মৌখিকভাবে, যার কোনো সাক্ষী থাকে না, প্রমাণ থাকে না। মাললা হবার পর থাকে শুধু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায়।

যৌথ সুখশ্রম চর্চার পর, বহুকাল-বহুকাল পর একজন পুরুষ হঠাৎ জানতে পারে- যার সাথে হয়েছিল একদিন ভালোবাসার লেনদেন, সেই নারীই এখন তাকে অভিযুক্ত করেছে ধর্ষণের অপরাধে।

শেষপর্যন্ত বিচারের ফলাফল কী হয় না-হয় তা তো খুবই সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু যখন কারো নামে ধর্ষনের অভিযোগ আসে,নিতান্তই ক্ষমতাবান পেশাদার ধর্ষক না হয়ে থাকলে তার জীবনটা তখন আর জীবন থাকে না। পরিনত হয় ঘৃণার দানবাক্সে।

ধর্ষণ খুবই সিরিয়াস একটা বিষয়, এতোটা সিরিয়াস যে ‘ধর্ষণ’ শব্দটা উচ্চারণ করতে গেলেও গলায় আওয়াজ আটকে যায়, লিখতে গেলে আঙুল থেমে যায় কীবোর্ডে।

বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের মতো মামলাগুলো যখন সামনে আসে, তখন জনমনে হারায় এ শব্দের গুরুত্ব, ধর্ষণ শব্দটাও ধীরে ধীরে পরিনত হতে থাকে রীতিমতো তামাশা আর উপহাসের শব্দ হিসেবে।

ধর্ষণের মতো বিষয় পৃথিবী থেকে বিলীন হওয়া জরুরী,  তবে যতদিন ধর্ষণ আছে, ততদিন এই শব্দের ভয়াবহতা রক্ষাও জরুরী।

‘নো মিন্স নো’ বলে একটা ব্যাপার আছে এই পৃথিবীতে। আছে ‘সম্মতি’ নামক একটা চিন্তাও।

‘না’ শব্দটার ক্ষমতা অনেক। কেউ না করার পরেও জোর করে কারো সাথে কিছু করতে চাইলে তা যেমন ভয়াবহ অপরাধ। কেউ কারো সাথে থাকতে না চাইলে জোর করে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা করাটাও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

প্রতারিত হবার মতো কিছু এখানে নেই৷ মানুষ গতিশীল। মানুষের জীবন বদলায়, যাপন বদলায়, ইচ্ছে আর আকাঙ্ক্ষা বদলায়। প্রতারণা তখনই হয় যখন কিছু নেবার বিনিময়ে কিছু দেবার কথা থাকলেও তা দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানায়। দেহশাস্ত্র বিষয়ক সম্পর্কে এ ধরনের কোনো বিনিময় ব্যবস্থা নেই। ব্যবস্থাটা যৌথতার। যৌথতা থেকে কেউ সরে যেতে চাইলে তা ধর্ষণ তো নয়ই, এমনকি কোনো প্রতারণাও নয়।

বরং আরো বহু ধরনের যাপন থেকে যেভাবে মানুষ নিজেকে সরিয়ে নেয় একান্ত নিজের প্রয়োজনে, এটাও তেমনই এক সরিয়ে নেওয়া।

নিজের সিদ্ধান্তে বাঁচার ইচ্ছের নাম প্রতারণা অবশ্যই নয়। নারীর ক্ষেত্রেও নয়, পুরুষের ক্ষেত্রেও না।

 

Shoikot Amin is an anti-authoritarian poet and activist from Bangladesh. He believes in equal rights for all human beings on this planet and the right of every other living being to live free.

 

More Posts From this Author:

Share this:

2 thoughts on “‘বিয়ের প্রলোভন’, ধর্ষণ ও প্রতারণা বিষয়ে”

  1. rahman mofiz

    আলাপটা গুরুত্বপূর্ণ। লেখাটাও ভালো হইসে। ধধন্যবাদ সৈকত ❤️

    1. শেখ ফাহিম আহমেদ

      বেশ ভালো আলোচনা হয়েছে।♥

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শুদ্ধস্বর
Translate »
error: Content is protected !!
Scroll to Top